x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

Advertisements

শনিবার, জুন ১৯, ২০২১

শনির বচন | স্বৈরতন্ত্রের উত্থান

5 | জুন ১৯, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

রাষ্ট্র কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার হরণ করে নিতে পারে? নিশ্চয় পারে। রাষ্ট্র যদি সামরিক শাসনের অধিকারে থাকে। রাষ্ট্র যদি স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণীর অধিকারে চলে গিয়ে থাকে। কিন্তু সংবিধান সম্মত কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার স‌ংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু বর্তমান ভারতে ঠিক সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে প্রতিবাদী কন্ঠগুলিকে দেশদ্রোহের আইনে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে গারদে ঢোকানো চলছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিনা বিচারে প্রতিবাদীদের কারান্তরালে দিন কাটাতে হচ্ছে। এইরকম মানুষের সংখ্যা নাকি শতাধিক। অন্তত সংবাদমাধ্যমগুলির সূত্র অনুসারে। হ্যাঁ কেউ কেউ কখনো সখনো জামিন পাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু মূল বিচার পর্ব ঝুলিয়ে রাখা থাকছে দিনের পর দিন। কারণ খুবই স্পষ্ট। যাঁরা নির্দোষ। দেশের কোন আইনেই তাঁদের দোষী প্রতিপন্ন করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রশক্তি সেই কারণেই তার সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচারপর্বকে ঝুলিয়ে রেখে নির্দোষদের বন্দী করে রাখতে চায়।

দেশর আইনকে সবচেয়ে বেশি কাঁচকলা কিন্তু রাষ্ট্রশক্তিই দেখাতে শুরু করে। যখন রাষ্ট্রশক্তি দেশের জনগণের বিরুদ্ধেই অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে দেয়। এই অঘোষিত যুদ্ধ যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো বিপর্যয় স্বরূপ। রাষ্ট্র যে মুহুর্তে সংবিধানের বিধি ভঙ্গ করে আইন প্রণয়ন করতে শুরু করে। সতর্ক দেশবাসী তখনই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠবে। সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক দেশে সেটাই নিয়ম। এবং দেশবাসীর রক্ষাকবচ কিন্তু সেই সংবিধানই। ঠিক সেই ভরসাতেই দেশবাসী রাষ্ট্রশক্তির অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ মুখর হবে, সেটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। গণতন্ত্র মানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের ভুয়ো প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে বুথে বুথে ভিড় জমানো এবং ভুল বোতামে আঙুল টেপাই নয়। গণতন্ত্র মানে মানুষের সকল মৌলিক অধিকারগুলির সংরক্ষণ এবং বিকাশ। গণতন্ত্র মানে রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশবাসীর সরাসরি অংশগ্রহণ। আর সংবিধান সেই অধিকারের রক্ষাকবচ। কিন্তু তাই বলে কোন রাজনৈতিক দল মানেই যেমন দেশবাসী নয়। তেমনি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারী ক্ষমতায় বসা মানেই দেশবাসীর উপরে যে কোন আইন চাপিয়ে দেওয়ারও অধিকার অর্জন নয়। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও শিবির ঠিক এই ভুলটাই করতে শুরু করে। একবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ফেললে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সংখ্যা মাত্র। সেটি যা খুশি করার সাংবিধানিক অধিকার নয়। নির্বাচিত রাজনৈতিক দল ক্ষমতা লাভ করে রাষ্ট্রশক্তি রূপে যখন ঠিক সেই ভুলটিই করতে শুরু করে দেয়। তখনই দেশবাসীর সাংবিধানিক অধিকার জন্মায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করার। এবং এইটি প্রতিটি নাগ‌রিকের মৌলিক অধিকারেরও বিষয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যা সম্পূর্ণ রূপে সংবিধান স্বীকৃত।

অর্থাৎ রাষ্ট্রশক্তি রূপে কোন নির্বাচিত সরকার দেশবাসীর উপরে যে কোন আইন চাপিয়ে দিতে পারে না। সেই আইনকে সংবিধানের সকল বিধি বিধান মেনেই তৈরী করতে হবে। এবং আইন যদি সংবিধানের কোন একটি ধারা উপধারাও লঙ্ঘন করে তৈরী করা হয়। তবে সেই আইন স্পষ্টতই বেআইনী। আইন প্রস্তুতকারী সরকার যত বড়ো নিরঙ্কুশ জনমতের অধিকারীই হোক না কেন। কোন সরকারই সংবিধান উল্লঙ্ঘন করে দেশের জন্য কোন আইন প্রস্তুত করতে পারে না। চাপিয়েও দিতে পারে না দেশবাসীর উপরে। দিলে দেশবাসীর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই আইনের সংবিধান লঙ্ঘনকারী দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করা এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠন করার। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠন করা মানেই দেশদ্রোহ নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করা নয়। বরং সংবিধান ভঙ্গকারী আইন প্রণয়ন করাই রাষ্ট্রদ্রোহের নামান্তর। এবং সেই আইন বলপূর্বক দেশবাসীর উপরে চাপিয়ে দেওয়াই প্রকৃত পক্ষে দেশদ্রোহ। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ সংগঠিত করার। সংবিধান লঙ্ঘনকারী আইন রদ করার ডাক দিয়ে দেশব্যাপী আন্দলোন গড়ে তোলার। সেই আন্দোলনের উপরে রাষ্ট্রশক্তি কতটা বর্বরোচিত আক্রমণ নামিয়ে আনবে। সেটি নিরঙ্কুশ ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকারের বিষয় হতে পারে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্ব, সেক্ষেত্রে সংবিধানের ধারা উপধারা অনুসারে দেশ ও দেশবাসীর রক্ষকবচ হয়ে ওঠার। আদালতও যদি সেই সময় কালক্ষেপ করতে শুরু করে দেয়। কিংবা সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতে থাকে। তবে সে দেশের গণতন্ত্রের তখন সত্যিই বড়ো দুর্দিন।

আমাদের মনে রাখা দরকার সংবিধান তৈরীর মূল উদ্দেশ্য কি। মূল উদ্দেশ্য দেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত রেখে রাষ্ট্রের কর্ম পরিচালনার রূপরেখা প্রস্তুত করা। রাষ্ট্রশক্তিকে তাই সংবিধান মেনেই দেশ চালাতে হয়। এবং রাষ্ট্রশক্তি সংবিধান মানতে বাধ্য। যে কোন সরকারকে এই কারণেই সংবিধানের নামে শপথ নিয়েই ক্ষমতার ভার নিতে হয়। কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে কোন অসাংবিধানিক আইন প্রণয়ন করা যায় না। করা গেলে, তখন আর সেই প্রজাতন্ত্র গণতান্ত্রিকও থাকে না। প্রজাতন্ত্রও থাকে না। হয়ে ওঠে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি। বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে সমগ্র দেশের উপরে দখলদারিত্ব কায়েম করার ব্রুটাল ফোর্স। বিশ্বের ইতিহাসে যার ঝুরি ঝুরি নমুনা রয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ব ইউরোপের ইতিহাসে। ও পরে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে। এশিয়ার ইতিহাসেও সেই ঘটনা কম ঘটে নি। কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দেশে দেশবাসী যখন টের পেতে শুরু করে। রাষ্ট্রশক্তির স্বৈরাচারী মুখ তার গণতান্ত্রিক মুখোশের আড়াল থেকে অল্প অল্প করে বেড়িয়ে পড়তে শুরু করে দিয়েছে। তখনই সচেতন নাগরিক মাত্রেরই আশু কর্তব্য। প্রথমেই বিড়াল কাটার চেষ্টা করা। অর্থাৎ সাংবিধানিক শক্তিতে সংবিধানের বিধিবিধানকেই হাতিয়ার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই রাষ্ট্রশক্তির অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামা। দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা। রাষ্ট্রশক্তিকে ক্রমাগত চাপে রেখে বাধ্য করা, তার স্বৈরতান্ত্রিক রিপুকে দমন করতে। না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পূর্বের নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটানো। এই সবই যে কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সংবিধান স্বীকৃত ও প্রদত্ত নাগরিক অধিকার। দেশবাসী সেই নাগরিক অধিকারের প্রয়োগ করতে গেলে রাষ্ট্রশক্তি তাকে আইনের পথে মোকাবিলা করতে পারে না। আর পারে না বলেই তখন আরও বেশি করে বেপরোয়া হয়ে উঠে বেআইনী পথে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে উদ্যত হয়। সেটাই গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো দুঃসময়। প্রজাতন্ত্রের পক্ষে মস্ত বড়ো বিপর্যয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ দেশেই এই ধরণের সংকট বহুবার এসেছে। মানুষই তার প্রতিরোধ করেছে। ফলে এই সংকটে মানুষকেই পথে নামতে হবে। কোন গোষ্ঠী ভিত্তিক স্বার্থহানীর উপলক্ষ্যে নামলে হবে না। রাষ্ট্রশক্তি ঠিক সেটাই চায়। চায় বলেই তার সকল রাজনৈতিক ছল বল কর্মকাণ্ডের অন্যতম দিশাই থাকে দেশের জনসাধারণকে নানা রকম গোষ্ঠীতে ভাগ করে রাখা। যাতে সমগ্র দেশ জমাট বাঁধতে না পারে। একতাই শক্তি। যেকোন রাষ্ট্রশক্তি অপশক্তি হয়ে উঠলে সেই একতার শক্তিকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। ফলে সে সদা সতর্ক থাকে দেশবাসী যেন কোনভাবে জমাট বাঁধতে না পারে। সেই লক্ষ্যে তার ছলেরও কোন অভাব হয় না। বিশেষ করে রাষ্ট্র যদি বহুভাষিক নানান জাতিভিত্তিক হয়। রাষ্ট্র যদি একাধিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমাবেশ হয়। তাহলে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলেই কেল্লাফতে। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সমগ্র দেশ কখনোই সামগ্রিক ভাবে এক হয়ে উঠতে পারবে না। ফলে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়া যায় নিশ্চিন্তে। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতি যদি ঠিক এই অভিমুখেই একবার পা বাড়িয়ে দেয়। দিতে পারে। তখন দেশবাসীর পক্ষে কাজটি সত্যিই বড়ো দুরূহ হয়ে ওঠে। আর ঠিক সেই কারণেই যে কোন দেশের বিশেষ করে কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের উচিত সদা সতর্ক থাকা। রোগের প্রথম লক্ষ্মণ দেখা দিলেই যেমন সুচিকিৎসা শুরু করা উচিত। এও ঠিক তেমনই এক রোগ। গণতন্ত্রকে মই বানিয়ে ক্ষমতা দখল করে স্বৈরতান্ত্রিক স্বরূপ ধারণ করা। সেই রোগের প্রথম লক্ষ্মণগুলি দেখামাত্র যদি দেশবাসী সচেতন না হয়ে ওঠে। যদি প্রথমেই সংঘবদ্ধ না হতে পারে। যদি প্রথমেই প্রতিবাদে গর্জে উঠে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াস না নেয়। তবে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি প্রতিদিন শক্তিবৃদ্ধি করতে থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে থাকায় তার হাতে যেহেতু সামরিক শক্তি, প্রশাসনিক শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি থাকে এবং পাশে থাকে শিল্পমহল। তার পক্ষে তখন শক্তির অপপ্রয়োগ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়ায়। আবার শিল্পমহলের সমর্থন ছাড়া গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হওয়া সম্ভব হয় না কোনদিন। সে অবশ্য অন্য ইতিহাস। আর এক আলোচনা।


১৮ই জুন’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত।


Read More »

রবিবার, মে ০৯, ২০২১

মৌমিতা ঘোষ

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

চুপচাপ বসে আছে মধুজা। রাত এখন বারোটা । একটা চেয়ার নিয়ে ব্যালকোনিতে বসে আছে।তিনতলার উপরে ওদের ভাড়ার ফ্ল্যাট। পাশে একটা বিশাল মাঠ। তাতে দুর্গাপুজো হয়, কালিপুজো হয়, মিটিং ও হয়, মেলাও হয়। আবার সকালে বাচ্চারা খেলে। বিকেলে বড়রা ক্রিকেট খেলে। মাঠটা বেশ বড়। এ অঞ্চলে এত বড় মাঠ আর নেই।এত রাতে দূরে একজন মা আর মেয়ে হাঁটছেন। রাত হওয়ার কারণে দূরে হলেও গল্পের শব্দ ভেসে আসছে। আলাদা করে কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না যদিও। মেয়েটির পরনে একটা টী শার্ট আর বারমুডা। মায়ের পরনে শাড়ি। মা নাও হতে পারে। মধুজা ভেবে নিয়েছে উনি মা ই। মধুজা বসে বসে ভাবছে এখনো এত রাতে দুজন মা মেয়ে হাঁটছেন মাঠে, ধুরন্ধর কিছু শকুন বাংলার দখল নিতে চাইছে, তারা এলে কি এরকম নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারবেন ওঁরা? মধুজা নিজে একটা কেয়ার ফ্রি লাইফ লিড করে। অনুষ্ঠান করে অনেক সময় দেরি করে বাড়ি ফেরে। কখনো অফিস ট্যুরে গেলে ফেরার ফ্লাইট তো রাতেরই হয় । কত রাত করে ফেরে।একা বেড়াতে যায়, একা খায়, একা সিনেমা দেখে। দক্ষিণ কলকাতার এই জমজমাট অঞ্চলটিতে কোনদিন রাস্তাঘাটে মারামারি দেখেনি ও। এমনকি ভয়ানক তর্কাতর্কি ও না। পাড়ায় পাড়ায় বরং গল্প, সবজিওয়ালার সঙ্গে বেশ আন্তরিক সম্পর্ক গৃহকর্তা বা কর্ত্রীর, ফুলের দোকানের ছেলে থুতু ফেলতে বারণ করলে তখনকার মতো হেসে গিলে নেয়, তর্ক করে না। এ অঞ্চলের ভোট করাতেও এসেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। এখানে গত বারো বছরে কখনো বুথ দখল, মারামারি দেখেনি ও ভোটের দিন।এই অঞ্চলে মধুজারা আছে বারো বছর। ওদের ভোট অবশ্য ভবানীপুরে। সেখানে ও দেখেনি কোনদিন ভোটে গন্ডগোল বিয়ে হওয়া ইস্তক।

ওই মা-মেয়েকে দেখে আশঙ্কার একটা ছায়া পড়লো মধুজার মনে। রাস্তার কুকুরগুলো তেড়ে চিৎকার করছে। ওদের সারারাতই কনসার্ট চলে। মা-মেয়ে চলে গেলেন। মধুজা বসে আছে। অলস। ফোন বন্ধ। এই যে দরজা জানলা খুলে মাঝরাত অবধি বসে রয়েছে এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র ঘরের মানুষটি নেই বলে। সে ট্যুরে গেছে। সুপ্রতিম থাকলে ননস্টপ টিভি চলে বাড়িতে। সুপ্রতিম থাকলে এখন তেড়ে ঝগড়া করতো দরজা খোলা রাখলে মশা ঢুকে যাবে বলে।সুপ্রতিম থাকলে এই নিরবচ্ছিন্ন অলসতা, এই ভাবনার অবসর কোথাও নেই।

কেন এরকম হয়? ধুপ করে একটা শব্দে চমকে ওঠে মধুজা। নাহ্। একটা বিড়াল লাফ দিয়ে পড়েছে। নিচের গ্যারেজের ছাতে। মিয়াঁও মিয়াঁও বলে এগিয়ে যায় সে।মধুজার হঠাৎ মনে পড়ে অর্পণের কথা। বহুদিন ধরে অর্পণ বলেছিল, ও মধুজাকে ভালোবাসে। মধুজা তখন একটিমাত্র সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। পাত্তা দেয়নি অর্পণকে। তারপর একদিন যেমন সবাই ই চলে যায় , ওটাই ভবিতব্য, তেমন ই চলে গেল সুহৃদ। মধুজা পড়েছিল সাংঘাতিক ক্রাইসিসে। অনেক দিন দোলাচল চলার পর একদিন মধুজা অর্পণের প্রস্তাবকে গ্রহণ করার কথা ভেবেছিল। ওরা অনেকে মিলে গিয়েছিল একটি অনুষ্ঠানে। প্রথমদিন অর্পণ ওকে যত রকম ভাবে প্রেম নিবেদন করা যায় ,করেছিল । দ্বিতীয় দিন পৌঁছেছিল ভাস্বতী। মধুজার বন্ধু।ওরা দুজনে মিলে অনুষ্ঠান করেছিল । তারপর রাতে অর্পণের জন্য মধুজা যখন অপেক্ষা করছিল গল্প করবে বলে, তখন প্রচুর মদ খেয়ে এসে অর্পণ বলে, " এই তোর বান্ধবী টা কিন্তু হেব্বি ডবকা। আলাপ করিয়ে দিবি।" লাথি মেরে বের করে দিয়েছিল ঘর থেকে অর্পণকে মধুজা।এরা এত নিষ্ঠুর কেন জানা নেই মধুজার।

এই যে ওর চারপাশে ফ্রিজে কী খাবার রেখেছে তাই নিয়ে গণপ্রহারে মরে যায় মানুষ, এই যে ডাইনি বলে আজ ও জ্যান্ত পুড়িয়ে দেয় মেয়েদের, এই যে অ্যাসিড অ্যাটাক, এই যে লাভ জিহাদ বলে জলজ্যান্ত বাঙালি ছেলেটিকে পুড়িয়ে দিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে তার ভিডিও করলো মানুষ, তাদের নৃশংসতা নিয়ে লেখা হয়, কথা হয়,হওয়া জরুরি। আর এই যে একজনের মনকে দলে পিষে যাওয়া ক্রমাগত, এই নৃশংসতা নিয়ে কোথাও লেখা হয়না, রেকর্ডেড হয়না এ অপরাধ।

কুকুরের ডাক ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে নিস্তব্ধতা। 'নাহ।শুই। রাত হল অনেক।'​

মধুজা ঘরে আসে। রজনীগন্ধা সুবাস ছড়াচ্ছে। ঘরের প্রতিটি কোণ ও আজ ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। এমনটা করতে ওর ভালো লাগে। সুপ্রতিম থাকলে রেয়ারলি সাজানো হয়। ফুলদানি কোথায় রাখা হবে নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়।আজ তিনটে ফুলদানিতে তিন রকমের ফুল সাজিয়েছে মধুজা। ড্রেসিং টেবিলে রাখা আছে গোলাপ । নানা রঙের গোলাপ গুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ও। মনটা ভোটের বাজারেও ভালো লাগে।ভোট , ভোট, ভোট। বিক্রি হওয়ার ভোট। কিনে নেওয়ার ভোট। মানুষের আস্থা জিতে তারপর তার সঙ্গে প্রতারণার ভোট। বাজার সরগরম। ঠিক এমনটাই হয় সংসারে, সম্পর্কে।প্রথমে আস্থা জিতে নিয়ে দলবদল করতে দেখেছে ও কত প্রেমিককে। ওই অর্পণের মতো। তোমার সঙ্গে সব কাজ ভাগ করে নেবো, বাচ্চা কে তোমার সঙ্গে আমিও দেখবো সমানভাবে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ে করে নিজের বাবা-মায়ের সুবোধ বাচ্চা হয়ে থাকে কতশত শুয়োরের বাচ্চা! তারপর মধুজার মতো তারা ঘরে বাইরে খেটে খেটে ফুরিয়ে যায়।আর মাঝে মাঝে নানা বক্তব্যে শুনতে পায় , তেমন কিছু করেনা ও।

এত কিছুর পরেও, এত ধোঁকাবাজির পর ও মানুষ ভালোবাসতে চায়। অস্থির , উনুন জ্বলা মাথাটাকে রাখতে চায় কারো বুকে। "সব ঝুট হ্যায়" জেনেও বিশ্বাস করতে চায়, নাহলে ওই মাথার উনুনটা আরো গনগনে হয়ে জ্বলে, আর পুড়িয়ে খাক করে। শোভনের চোখ দুটো দেখে নড়ে গেছে ওর ভিত।শোভন ওর চেয়ে অনেক ছোট। পাপ পূণ্য বোধ নেই মধুজার। বেঁচে থাকতে তঞ্চকতা করতে চায়না , নিষ্ঠুরতা দেখাতে চায় না, এই অবধি। ওর কাছে মানুষকে অকারণে পীড়া দেওয়াটাই পাপ। মানুষ কেন যে কোন জীবকেই। শোভন আর ও দুজনে জানে যে ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসে না। তবু ওই চোখের তারাটুকুতে উঁকি দেবে বলে কিছু অবাধ্য বিকেল এসে পড়ে ওদের মধ্যে। মধুজা প্রথম দিন থেকেই জানে শোভনের প্রেমিকা আছে। শোভন ও জানে সুহৃদের প্রতি আজ ও মধুজা কতটা দুর্বল। তবু নড়বড়ে একটা সেতু তৈরি হয়। কোথাও ভিত্তি প্রস্তর নেই তার। কোথাও ওয়ারেন্টি নেই।বিনি পয়সায় ওটুকুই পাওয়া যায়। তবু মধুজার খুব অস্থির লাগে মাঝেমাঝে। শোভনের প্রেমিকা বহুদিন ধরে ই আনস্টেবল। ও ও মধুজার মতো একবগ্গা হয়ে ভালোবাসে সেই মেয়েকে। সে মেয়ে সুহৃদের মতোই চলে যায়।​

​ শোভন দুদিন মনখারাপ করে থাকে। তিনদিনের দিন মধুজার সঙ্গে দেখা করে চুমু খায়। মধুজা জানে এটাও একটা টেম্পোরারি ক্রাইসিস।তবু একটা আশ্চর্য মমত্ব জাগে মানুষটার কষ্ট পাওয়া মুখটা দেখে। ও জানে ,ওর বান্ধবীরা শুনলেই বলবে প্রেমিকা আজ ধোঁকা দিলো, কাল তোর কাছে চলে গেলো ,এ কেমন ভালোবাসা? আবার মধুজা এটাও জানে একটা সম্পর্ক একদিনে ভাঙে না, কতদিনের কত রক্তাক্ত ইতিহাস থাকে তার মধ্যে। ধীরে ধীরে মানুষের মন বিমুখ হয়। আবার মন ই পড়ে থাকে। এই যে ও জানে যে ওই মেয়েটির প্রত্যাখ্যান শোভনকে এখানে নিয়ে এসেছে তাও ও শোভনকে প্রত্যাখ্যান করছে না, তার পিছনে কোন যুক্তি নেই।ওর ভালো লাগে, কিছুক্ষণ ভুলে থাকে ওই উনুনের আঁচ টা। ঘুমিয়ে পড়তে চায় মধুজা।এসিটা সতেরোতে সেট করে। আজ সকালে ফোন এসেছিল শোভনের। প্রেমিকার জন্য ভারি মনখারাপ, তাই ফোন করেছে। মধুজা যখন নিজের মনখারাপের কথা বলতে শুরু করলো ,ও ফোন রেখে দিল, আর শুনলো না। ওর কাছে মধুজা কয়েক মুহূর্তের রেফিউজ আর মধুজা একটা বড় গনগনে উনুনকে নিবিয়ে একটু জল চাইছে শোভনের কাছে , হাউ সিলি! ফোন করেনি আর মধুজা।শোভন ও করেনি। এভাবেই একদিন এই বিরতিগুলো অ্যাবসোলিউটের দিকে হেঁটে যাবে উদাসীন। এসব জানা মধুজার।​

প্রচন্ড ঠান্ডা ঘরে, কম্বলের তলায় শীতল হতে হতে মধুজা স্বপ্নে দেখে একটা বিশালাকার গিলোটিন, তার মাথা কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রশ্ন করার জন্য, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন, সংসার কে প্রশ্ন। জল্লাদের মুখটা সুপ্রতিমের মতো, নির্দেশ দিচ্ছে সুহৃদ। আর ও শেষবার চিৎকার করে বলছে; "আমি যে বারান্দায় বসে বসে ভাবছিলাম তোমার সঙ্গে কেন এভাবে বসে থাকা যায় না বারান্দায় গ্রিলের উপরে পা তুলে, কেন হাতটা ধরা যায়না স্বাভাবিক? বিশ্বাসঘাতক!"


Read More »

■ সুবর্ণকান্তি উত্থাসনী | বাঙালির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ভাষা অথবা চিড়িতন-রুহিতন-হরতন-ইসকাপন

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

বিপক্ষকে কোণঠাসা করে যে আধিপত্যবাদের বিষে দেশ ক্রমশই পতনের অভিমুখে ক্রমবর্ধমানতা বহাল রেখে চলেছে, তার বীজটি নিহিত মোদী জমানার প্রথম দফাতেই প্রতিটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে সুপরিকল্পিতভাবে শাসক ঘনিষ্ঠ হর্তাকর্তাদের সমারোহন পূর্বক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকারের করায়ত্তে আনয়নের প্রচেষ্টার অন্তরালে। একাধারে চলছে স্যোশাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে মানুষের এযাবৎ বঞ্চনার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সমন্বয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অপপ্রচার, অন্যদিকে পাকিস্তান-কে আপেক্ষিকতার তুলাযন্ত্রে চাপিয়ে ভ্রান্ত আগ্রাসী দেশপ্রেমের জিগির তুলে সরকার বিরোধীদের শিরে বিচ্ছিন্নতাবাদীর তকমা লেপন一সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে হামবড়া সরকারের ৫৬ ইঞ্চি ছাতির পরিচায়ক, মাহাত্ম্য প্রচারকারী সিনেমা তৈরি হয় অথচ ৪০ কেজি RDX কোথা থেকে এলো ইত্যাদি যৌক্তিক প্রশ্নের সুরাহা মেলেনা, প্রশ্ন করলেই জোটে "দেশদ্রোহী" আখ্যা।

গুজ্জু মস্তিস্কপ্রসূত এই নাটকের মহড়ায় রয়েছে বিবিধ মাত্রা। একদিকে স্যোশাল মিডিয়ার দৌলতে সামগ্রিক কেন্দ্র সরকারের সমার্থক হিসেবে উঠে আসা একটিই মুখ (সুপার হিউম্যান ফেস), নিজের কার্যক্রমেই গুজরাট অস্মিতা সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের নামাঙ্কিত মোতেরা স্টেডিয়ামের আধুনিকীকরণ সম্পন্ন করে নতুন নামকরণে জোড়া হয়েছে নিজের নামই, যার উদ্বোধন আবার হয়েছে কিনা সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে আসীন রাষ্ট্রপতির হাত দিয়ে। শুধু তাই নয়, স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে জনসমক্ষে কুম্ভীরাশ্রু, চড়া দাগের অভিনয় ও বর্তমানে অমূল্য সহানুভূতির এক পূর্নকুম্ভ আদায়ের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম দরিদ্রতা ও স্ট্রাগলের মিশেল সম্মিলিত রূপকথার অত্যাশ্চর্য বুনোটে সংখ্যাগরিষ্ঠের মস্তিস্ক প্রক্ষালন ইস্তক অন্ধত্ব দানে সমর্থ্য হয়েছে一 "মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়"। অপরদিকে সরকার-পরিচালিত রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট চ্যালাচামুন্ডারা, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের প্রজ্জ্বলনে ঘোড়া কেনাবেচা ও ইডির সাহায্যে বিরোধী দলগুলোকে হত্যা করায় তারা নিষ্ক্রিয় বিরোধীদের ভূমিকায় ও সেই শূন্যতা পুরণে বিকল্পরূপে উদ্ভাসিত দেশের মূল সম্পদ ছাত্র ও কৃষকদের নেতৃত্বহীনতার সুযোগে অগোছালো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সন্তর্পণে অনুপ্রেবশ করে আন্দোলনকে নানাভাবে কালিমালিপ্ত করার নিরন্তর অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ, উপাচার্যের সামনেই হকি স্টিক নিয়ে মার, ঢিল মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া一প্রতিবাদ দমনের এই কদর্যতা আবর্তিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশের প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে। মাসের পর মাস কৃষিবিল বাতিলের দাবিতে "জয় কিষান"-রা কনকনে শীতের রাতে ফাঁকা রাস্তায় বসে আছে অর্ধাহারে, কোলে সদ্যোজাত শিশু সম্বলিত মা, বুড়ো-বুড়ি। যখনতখন টিয়ার গ্যাস-লাঠিচার্জ, দেহের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে ভারী জলগাড়ি, রক্তের স্রোত ধুয়ে গেছে সবরমতী-র ঢেউয়ে一১০০ র বেশি মানুষ মারা গেলো, সাক্ষাতের সময় পেলোনা কৃষকদরদী সরকার। "It is a sin to be silent when it is your duty to protest"- আব্রাহাম লিঙ্কনের এই কথাটাই এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভারতের দিকে দিকে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকা一জেএনইউ তে, যাদবপুরে, আলিগড়ে,জামিয়া মিলিয়ায়। আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যেমন কিংবা "অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট", তেমনি ভারতবর্ষও তাকিয়ে রয়েছে তার ভবিষ্যৎ নাগরিকদের পানে। "তুমি আমায় মারতে পারো, বিনাশ করতে পার আমার শরীর। কিন্তু তুমি আমার মনকে জেলে ঢোকাতে পারবে না"- গান্ধীজী-র এই কথাটাও তো অনুরণিত হয় বারবার। কিন্তু এই প্রয়াস এতটাই তুচ্ছ যে তারপরও পেট্রোল-ডিজেলের দাম একশো ছুঁয়েছে। প্রতিনিয়ত রান্নার গ্যাসের উত্তোরত্তর মূল্যবৃদ্ধিতে গৃহস্থ মধ্যবিত্তের হেঁসেল বন্ধের উপক্রম। সরকার ব্যস্ত আদানি-আম্বানি জাতীয় পুঁজিপতিদের পদলেহনে।

সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা, পশ্চিমবঙ্গবাসী। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ一জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে নিয়ত, উঠছে নাভিশ্বাস। শিক্ষাপ্রাঙ্গন-প্রতিষ্ঠান ঘিরে লাগামছাড়া নৈরাজ্য, পঞ্চায়েত থেকে মন্ত্রীস্তর পর্যন্ত সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও দুর্বিনীত মনোভাব, সারদা-নারদা-ডেয়ারী-টেট一একের পর এক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক শাসকদল। একধার থেকে প্রায় সমস্ত সরকারী পরীক্ষা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। বাম জমানাতেও চাকরির ক্ষেত্রে দলীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার ছিলো কিন্তু এখন তো দলীয় কর্মীকেও চাকরি পেতে হয় ঘুষ দিয়ে। নিষ্কন্টক অখন্ড রাজ্যসুখ ভোগের লালসায় টাকা আর পুলিশের সাহায্যে তদানীন্তন মূল দুই বিরোধী বাম ও কংগ্রেসের একের পর এক নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে টেনে নিয়েছে দলে। শিল্প ধ্বংস করে এখন টিকে থাকার অভিপ্রায়ে ভোটের মুখে কাটমানির টাকায় জনসাধারণকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি কেবল। ফলতঃ বঙ্গের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘের ভ্রু-কুঞ্চন। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় অনশন আন্দোলন করে অসুস্থ হচ্ছেন পার্শ্ব শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা, কেন্দ্রের অনুকরণে অহম্ সর্বস্ব মুখ্যমন্ত্রীর সময় হয়না সাক্ষাতের।

সারা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ধর্মীয় মৌলবাদ একে অপরের কেবল শত্রু নয়, পরিপূরকও বটে। গাঁধীজীর স্বপ্ন, সর্বধর্ম নির্বিশেষে সমন্বিত এগিয়ে চলার বাণী, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় গৌণ, গ্রামকেন্দ্রিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় আর্থিক বিকাশের মাধ্যমে আত্মিক প্রসার一তাঁর হৃদয়ে সমুদ্রের মতো অতলান্ত গভীরতা এবং চিন্তায় আন্তর্জাতিকতার ব্যাপ্তি অনুভব করা খন্ডশিক্ষিত-ক্ষুদ্রমনাদের সাধ্যাতীত ছিলো। তাই ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায়ের জিগির তুলে গাঁধীজী-কে মুসলিম তোষক অভিধায় গালমন্দ পেড়ে একুশ শতকের ভারতবর্ষের অগ্রগতি সাভারকারের একদেশদর্শী মতবাদের উগ্রতম রূপ পরিগ্রহ করেছে। ব্যক্তিজীবনে ঘোষিত নিরীশ্বরবাদী সাভারকারের কাছে হিন্দু শব্দটি ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকে বরং অধিকন্তু এক অখন্ড জাতিসত্ত্বার পরিচয়। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো "হিন্দুত্ব" শব্দটি আদৌ হিন্দুইজম বা হিন্দুবাদের সমার্থক নয়, হিন্দুধর্ম বা বিশেষ কোনো ধর্মগোষ্ঠী বা ধর্মতত্ত্ব এই শব্দের নিহিত অর্থ নয়। এই 'ত্ব'- এর পরিধি হিন্দু ধর্মের 'শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণোক্ত" থেকে অনেক বৃহৎ। সাভারকার নিজের তৈরি শ্লোকে এই 'ত্ব' এর লক্ষণ নিরুপন করেছেন এইভাবে "আসিন্ধু সিন্ধু-পর্যন্তা যস্য ভারতভূমিকা/ পিতৃভূঃ পূণ্যভূশ্চৈ স বৈ হিন্দুরিতিস্মৃতঃ"। এই তত্ত্ব অনুসারে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের জন্মভূমি ভারতবর্ষ হলেও পূণ্যভূমি যেহেতু যথাক্রমে জেরুজালেম ও মক্কা-মদিনা, এইভাবে তাই তাঁরা হিন্দুবর্গভুক্ত নন, অতএব ভারতবর্ষের দাবি এদের নেই।তাঁর মতে ভারতবর্ষ শুধুমাত্র সেই ভারতবর্ষীয়দের一যাঁরা ভারতকে তাদের পিতৃভূমি ও আদিভূমি ও পূণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি一 আক্ষরিকভাবে কেবল তারাই এ দেশের নাগরিক। তবে এর থেকেও আশ্চর্যজনক এই যে, ব্যক্তিগত জীবনে ব্রাহ্মণ্যবাদের আদ্যন্ত বিরোধী সাভারকারের সার্থক উত্তরসূরীদের শাসনকালে বারবার নিগৃহীত হতে হয়েছে শুধু মুসলমান নয় দলিতদেরকেও।

ভারত বা ইউরোপের দেশগুলিতে যেমনটা হয়েছে একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলকে আশ্রয় করে প্রতিক্রিয়ানির্ভর মৌলবাদ, ইসলাম কিন্তু তা নয়। ইসলামি মৌলবাদ ক্রিয়ানির্ভর, অর্থ্যাৎ প্রতিপক্ষ, বিধর্মীর অনুপস্থিতিতেও ক্রিয়াশীল থাকে। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন তথাকথিত সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলি এবং মার্ক্সবাদী বামপন্থীদের প্রশ্রয়ে, ভোটব্যাংকের জন্য যেভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুসলিম তোষণ করে চলেছে(মৌলবী দ্বারা সংগঠিত), তারই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ হিন্দুত্ববাদের প্রসার। এই রাজ্যের বামপন্থী সরকার প্রকটভাবে না হলেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন করেছে সেই তোষণকে। বানতলা ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড, তসলিমা নারসিনকে কেন্দ্র করে কলকাতায় হিংসার স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরণ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর সেইসব স্মৃতি এখনো অনেকের মনে উজ্জ্বল। কিন্তু বঙ্গে হিন্দুত্বের বাড়বাড়ন্তের সবটাই মা-মাটি-মানুষের হাত ধরে। একদিকে বিরোধীদের উৎপাটিত করে একটা শূন্যতা বা ভ‍্যাকুয়াম সৃষ্টি করা এবং অপরদিকে প্রথমে NDA এর জোটশরিক রূপে এবং পরবর্তীতে একাধিক অপ্রয়োজনীয় কর্মকান্ড যেমন ইমাম ভাতা প্রদান অথবা ইসলামি পোশাক থুড়ি হিজাব পরে মাননীয়ার নামাজ পরার দৃশ্য – এইসব হিন্দুদের মনে বিরূপভাবে গেঁথে আছে। হিন্দুরা অস্তিত্বসংকটে রয়েছে এমনটা অনুভব করছে বলেই বঙ্গ হিন্দুত্ববাদ লালিত হতে হতে মহীরূহে পর্যবসিত। অপরদিকে কেন্দ্রীয় সরকার, রাম মন্দির স্থাপনের মধ্য দিয়ে হিন্দু একতার এক মহাহাস্যকর চিত্র তুলে ধরার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন। অর্থনীতি দুর্বলতর, নিম্নাভিমুখী আর্থিক বৃদ্ধি, অর্ধাহার অনাহার অপুষ্টি, স্কুল ড্রপ আউট, কর্মসংস্থানে ঘাটতি, নারীর নিরাপত্তার অধোগমন, অপরাধপ্রবণতার বাড়বাড়ন্ত, দুর্নীতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাববোধ一 এইসব জ্বলন্ত ইস্যু সরকারের সুকৌশলে ও মানুষের অন্ধত্বে অবহেলিত। তাবড় ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বিশেষজ্ঞরা তাই "এবারের ভোট মেরুকরণের ভোট" বলে আগাম ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মাঝে সমস্যা আরও ঘোরতর হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে বঙ্গে আশু ক্ষমতা দখল করতে ব্যগ্র তথাকথিত বর্গীদের সকলেই কিন্তু ওই ভূমিপুত্র। রাজ্যের শাসকদলের অযোগ্য দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বিনীত নেতারাই, যারা এককালে বর্তমানের হয়ে বুথ দখল করে ভোট লুন্ঠন করেছে, কাটমানির অসমবণ্টনের অভিযোগে অভিযুক্ত, সর্বোপরি নারদা কেসে সিসিটিভির সামনে বসে ঘুষ নেওয়ার দৃশ্যে জনপ্রিয়, আগত দলের শীর্ষ সম্পদ রূপে পরিগণিত হচ্ছে তারাই। চাটুকারিতায় পটু এইসমস্ত অযোগ্য নেতাদের হাতে রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হলে, যুক্তরাষ্ট্রীয় গঠনব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ যে অচিরেই কেন্দ্রের হাতের পুতুলে পরিনত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ প্রসঙ্গে দ্রুত কিছু তথ্য অবগতির প্রয়োজন অনুভূত হলো।২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপির আগমন "গুজরাট মডেল" জাতীয় মিথকে সামনে রেখে মোদিকে "বিকাশ পুরুষ" রূপে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে। গুজরাটে আর্থিক বৃদ্ধির হার ভালো অনেক দশক ধরেই কিন্তু ওই আর্থিক বৃদ্ধি কাজে লাগানোর বুদ্ধির অভাবে বাজার সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান তেমন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বৃদ্ধি হয়েছে মূলত পুঁজিনিবিড়, যে পুঁজিবাদকে এখনো প্রশ্রয় দিয়ে চলছে সরকার। অন্যদিকে সামাজিক সূচকের ক্ষেত্রে গুজরাট ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীপ্রগতি, শিশুপুষ্টি一 কোনও সূচকেই গুজরাটের অবস্থা ভালো নয়। ২০১৯ এর নির্বাচনে বিজেপির প্রচার থেকে উন্নয়ন শব্দটি বাদ পড়ে গিয়েছিল, বছরে ২ কোটি কর্মসংস্থান, প্রত্যেকের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা一 সবই মন কি বাতের নাম কা ওয়াস্তে ঢাকা পড়ে গেছিল। সামনে উঠে এসেছিল বালাকোট, পাকিস্তান, "হিন্দু খতরে মে হ্যায়"। এরপর থেকে GDP র পতন, সরকার বাঁচাতে সমস্ত সরকারি সম্পত্তির বিকেন্দ্রীকরণ一ব্যর্থতার একের পর এক সোপান অতিক্রম করেও কমেনি বগল বাজিয়ে প্রতিশ্রুতির মাত্রা। এমতাবস্থায় একটা বড়ো অংশের ভোটার যারা বর্তমানের সাথে সম্ভাব্য ভবিষ্যতের প্রতিও মোহ হারিয়ে বিকল্পের সন্ধানে রত, 28 শে ফেব্রুয়ারির ব্রিগেড সমাবেশ তাদের মনে জাগিয়েছে আশা। বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ মহাজোটের ভাগ্য তো ভবিষ্যৎ নির্ধারন করবে, এখন এটাই দেখার যে তারা কতটা যোগ্য প্রতিদ্বন্ধী রূপে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সমর্থ হয়।

"News of the ban on students participating in strike or similar demonstration imposed by the Haq. Ministry has highly agitated the student community. This I consider one more folly added by the Bengal Ministry to it's countless record... I apple to the Bengal Government on behalf of A.I.S.F. to remove this ban. Otherwise the struggle would not be confined to the Bengalis alone but the students from all part of India would come to participate in it and stand shoulder to shoulder with their brethren in Bengal in the latters' fight for maintaining and Granny civil liberties." তখন সালটা 1940। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশকের এক্কেবারে গোড়ার দিকে। বাংলা জ্বলছে মিথ্যা অপবাদের কলঙ্ক দূরীকরণে সর্বদল সংবলিত হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারন আন্দোলনের অগ্নিশিখায়, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছাত্রসমাজ। আন্দোলন স্তব্ধ করতে বদ্ধপরিকর সরকার পক্ষ ডি.পি.আই সার্কুলার জারি করলো 19 এপ্রিল তারিখে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় সমস্ত স্কুল-কলেজ ধর্মঘট, বিক্ষোভ প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ধর্মঘট বা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের তৎক্ষণাৎ বিতাড়ন করা হবে। বৃত্তিভোগী ছাত্রদের ওই বৃত্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সারা শহর গর্জে উঠলো এর প্রতিবাদে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছাত্ররা আরো বেশি আন্দোলনে সামিল হলো। সারা ভারত ছাত্র ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক এম.এল.শাহ্ প্রতিবাদ করে উপরোক্ত বিবৃতিটি পেশ করেন।

এর বহু আগে, তিরিশের দশকে ইসলামিয়া কলেজ ও বেকার হোস্টেল হয়ে ওঠে মুসলিম সমাজের রাজনীতি, শিল্প সংস্কৃতি চেতনার উন্মেষকেন্দ্র এবং এর রেশ ধরেই 1939 সালে কলকাতার কতিপয় প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীরা প্রতিষ্ঠা করেন রেনেসাঁ সোসাইটি নামে এক সংগঠন। 'দৈনিক আজাদ' এর সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন, 'আজাদ' এর যুগ্ম সম্পাদক মুজিবুর রহমান খাঁ পরবর্তীতে প্রখ্যাত কবি আব্দুল কাদের, আব্দুল মনসুর রহমান প্রমুখ এরসঙ্গে যুক্ত হয়ে এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটান। এই মুসলিম রেনেসাঁ সোসাইটি-ই ঠিক করে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাউজদৌল্লার লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধার এবং প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে ৩ রা জুলাই সিরাউজদৌল্লার মৃত্যু দিবস, 'সিরাজ দিবস' রূপে উদযাপন এবং হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবিকেও জোরদার করা হবে। এই মর্মে গঠিত হয় "সিরাউজদৌল্লা স্মৃতি কমিটি", যাতে ঠাঁই পায় অনেক হিন্দুও। ওই বছর ৩ রা জুলাই সিরাউজদৌল্লার মৃত্যুদিবসে সিরাউজদৌল্লা কে জাতীয়তার প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই এই ডাকে অভূতপূর্ব সাড়া দেয়। তৎকালীন সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যেও "সিরাউজদৌল্লা দিবস" পালনে জনগণের এই অংশগ্রহণ ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ঘটনা।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে বাংলায় তখন ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার চলছে। মুসলিমরা সরকারি সাহায্যের আশায় বুক বেঁধে থেকে যখন নিরাশ হল, তখন সুভাষচন্দ্র বসুর দ্বারস্থ হওয়াই শ্রেয় মনে করল। এই অবস্থায় প্রায় একবছর বাদে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে সুভাষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় আন্দোলনকারীদের মনোবল ও উৎসাহ অনেকগুণ বেড়ে গেল, যার সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে আবুল মনসুর রহমানের লেখায়- "...সিরাউজদৌল্লার প্রতি আমার মমত্ববোধ ছিলো অনেকদিনের। ছেলেবেলায় ছিল এটা বাংলার মুসলিম শাসনের শেষ প্রতীক হিসাবে। পরবর্তীকালে কংগ্রেস কর্মী হিসাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হওয়ার পর সিরাউজদৌল্লাকে বাঙালি জাতীয়তার প্রতীক রূপে গ্রহণ করার জন্য অনেক সহকর্মীর কাছে ক্যানভাস করিয়াছি। বাঙালির নাট্যগুরু গিরিশ ঘোষ ও খ্যাতনামা ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্র সিরাউজদৌল্লাকে এই হিসাবেই বিচার করিয়াছেন বলিয়াও বহু যুক্তি খাড়া করিয়াছি। কিন্তু হিন্দু কংগ্রেসকর্মীদের কেউ এদিকে মন দেন নাই। কাজেই সুভাষবাবুর মত জনপ্রিয় তরুণ হিন্দু নেতা এই মতবাদের উদ্যোক্তা হওয়ায় আমাদের আনন্দ আর ধরে না। দৈনিক কৃষকের সম্পাদকীয়তে এই মতবাদের সমর্থনে প্রচুর যুক্তি দিতে লাগিলাম।"

হলওয়েল মনুমেন্ট বিষয়টি সুভাষচন্দ্রের কাছে তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর চিন্তা ও মানসিকতার সামনে এক বিশেষ সুযোগ ও কর্তব্যরূপে উপস্থিত হয়। ওইসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কোণঠাসা হয়ে পড়া ও এর ফায়দা তুলে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলেই স্বাধীনতা মিলবে যেমন তেমনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রশ্নে তিনি ছিলেন বিশেষ ভাবিত। এরপর সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে বিপিসিসি (সাসপেন্ডেড) আন্দোলনে যোগদান ও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দিলে সব মহলেই সাড়া পড়ে যায়। বিপ্লবী দল বেঙ্গল ভলেনটিয়ার্স, অনীতা রায়-লীলা রায়ের শ্রী সংঘ প্রমুখ সংগঠনগুলি ধীরে ধীরে এই আন্দোলনে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে। ছাত্র ফেডারেশন তাদের দীর্ঘদিনের দাবি আদায়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাকে উৎসাহ ভরে সাড়া দেয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এই আন্দোলনে সমর্থন জানায়।

বিভিন্ন মহলের সমর্থন নিয়ে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠিত হয়, যার চেয়্যারম্যান নিযুক্ত হন সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং। ৩ রা জুলাই থেকে সত্যাগ্রহ শুরুর ঘোষণা হয়। প্রায় আচমকাই ২ রা জুলাই বেলা 2 টা নাগাদ মিঃ.জে.ভি.বি. জানভ্রিন (ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ) সুভাষচন্দ্রের সাথে সাক্ষাৎ করে ভারতরক্ষা আইনের ১২৯ ধারা অনুযায়ী গ্রেফতার করেন। ঐ দিনই রাতে অ্যালবার্ট হলে সুভাষচন্দ্রের গ্রেফতারির প্রতিবাদে কলকাতার নাগরিকদের এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সুভাষচন্দ্রের গ্রেফতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে অসমর্থ হয় বরং তার গ্রেফতারের প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন একই সুরে গাঁথা হয়ে যায়।

এরপর ৩ রা জুলাই ঢাকা জেলা কংগ্রেস কমিটির আহ্বানে মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট শহরে হরতাল পালিত হয়। স্কুল-কলেজ, দোকান, বাজার বন্ধ রাখা হয়। নোয়াখালি টাউন হলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যুক্তসভা থেকে অবিলম্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবি জানানো হয়। ময়মনসিংহে দোকান বাজার বন্ধ রাখা হয়, ছাত্র ধর্মঘট সংগঠিত হয়। কলকাতা কর্পোরেশন সভা সুভাষচন্দ্রের গ্রেফতারির প্রতিবাদে মুলতুবী হয়ে যায়। মুলতুবী প্রস্তাব পাঠ করেন এম.এ.এইচ. ইম্পাহানী (মুসলিম লীগ), সমর্থন করেন নরেশনাথ মুখার্জি (কংগ্রেস)।

৪ ঠা জুলাই সিলেট শহরের গোবিন্দ পার্কে প্রতিবাদ সভা করতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন দাস (সহ সম্পাদকーসিলেট কংগ্রেস কমিটি) সহ ৬ জন গ্রেফতার বরণ করেন। রাজশাহী শহরের টাউন হলে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের যুগ্ম আহ্বানে সুভাষ বসুর গ্রেফতারির প্রতিবাদে ও অবিলম্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবিতে এক উপচে পড়া জনসমাগমে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৫ ও ১০ ই জুলাই 'সুভাষ দিবস' নাম দিয়ে বাংলা ও ভারতবর্ষের দিকে দিকে ফরোয়ার্ড ব্লক ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলির ছাত্র সংগঠন, সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ ও প্রদেশ কংগ্রেসের মিলিত আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, রিপন কলেজ, বঙ্গবাসী কলেজ, বিদ্যাসাগর কলেজ সহ প্রায় সমস্ত কলেজের ছাত্ররা একাধিক মিছিল নিয়ে ইসলামিয়া কলেজ প্রাঙ্গণে বামপন্থী বি.পি.এস.এফ ও মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের ডাকা জমায়েতে যোগদান করে। ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ সভাস্থল ঘিরে রাখলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। সভার সভাপতি আব্দুল ওয়াসেকের বক্তব্য চলাকালীন পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষোভ চরম আকার ধারন করে। পুলিশ নির্দ্বিধায় বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ২০ জন আহত হয়। ৪ জন গুরুতর আহত অবস্থায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। ঘটনার খবর পেয়েই সরকার ও বিরোধীপক্ষের নেতৃত্ববৃন্দ শরৎচন্দ্র বসু, খান বাহাদুর হাসেম আলি খান, আব্দুল হামিদ, সন্তোষ কুমার বসু, মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী ঘটনার পরিদর্শন করেন। ছাত্রদের ওপর এহেন পুলিশি আক্রমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র ধিক্কার ও বিক্ষোভ তৈরি হয়। সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের জন্য আলাদা আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা করে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সেদিনই রাত্রে কোয়ালিশন পার্টির জরুরি সভা বসে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এক বিবৃতি দিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। ২৩ শে জুলাই বিধানসভায় ফজলুল হক ঘোষণা করেন কোয়ালিশন পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনুমেন্ট অপসারণ করা হবে এবং ইসলামিয়া কলেজের ঘটনার তদন্ত করা হবে। ২৪ শে জুলাই পুনরায় ছাত্ররা সম্মিলিত হয়ে বিধানসভা অভিমুখে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ ও আন্দোলনে গ্রেফতার হওয়া নেতাদের মুক্তির দাবিতে ডেপুটেশন জমা দিতে মিছিল শুরু করে। বিরোধী দলনেতা শরৎ বসু এক বিবৃতিতে আন্দোলন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান তবে সরকারের তরফে গ্রেফতার হওয়া নেতাদের মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আগস্ট মাসের শুরুতেও কারাবন্দীর সংখ্যা ছিল : হুগলি জেলে- ১৮৯, যশোর জেলে- ৭৯, প্রেসিডেন্সি জেলে- ৭৯ (এরমধ্যে ৩৭ জন তখনো বিচারাধীন)। ধীরে ধীরে কিছুজনকে মুক্তি দেওয়া শুরু হল, সুভাষচন্দ্র বসু রয়ে গেলেন কারান্তরীণ।

এবার আবার টাইমমেশিনে করে ফিরে আসা যাক বর্তমানে। একদিকে দাগী মুসলিম তোষণকারী দল, অপরদিকে দাগী হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজনৈতিক সংগঠন। বাম-কংগ্রেস জোটে ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান স্যেকুলার ফ্রন্ট (আই এস এফ)-এর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ভেতরে ও বাইরে নানা কটূক্তি ভেসে আসছে, প্রশ্ন উঠছে বাম-কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের মুখোশ নিয়ে। তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, "এই ব্রিগেড নিয়ে কথা বলা আসলে সময় আর রুচির পরিচয়। তবে লালঝান্ডা এভাবে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে দেখলে গ্লানিবোধ হয়। বাংলার মানুষ একটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মোকাবিলা করেছেন, অন্য মৌলবাদী চেষ্টাকেও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করবেন।" বিজেপির সবেধন নীলমণি সদ্য দলবদলু এক তরুণ(?) নেতা মন্তব্য করেছেন "বামপন্থীরা পাশে আব্বাস সিদ্দিকিকে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলবেন!" এর প্রত্যুত্তরে বিধান ভবনে সোমবার সিপিএম-কংগ্রেসের বৈঠকের পরে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, "যাঁরা এই সমালোচনা করছেন, তারা সম্যক ভাবে না জেনেই বলছেন। আইএসএফ শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করছে, এমন নয়। যদি সেইভাবে পরিচয় দেখতেই হয়, তাহলে বলতে হয়, তারা তফসিলি জাতি, জনজাতি, দলিত বা সাধারণ প্রার্থীও দেবে। তার জন্য প্রার্থীতালিকা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।"তাঁর আরো সংযোজন, "স্বাধীনতার সময় বা তার পর থেকে বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠন যে ভাবে চলেছে, তার সঙ্গে আইএসএফের ভাবনা ও পথ এক ও অভিন্ন নয়।" আইএসএফ দলটি ধর্মীয় মৌলবাদী হোক না হোক, তা পরের প্রশ্ন, মজা হলো আব্বাস সিদ্দিকি-কে ব্রিগেডের মঞ্চে দেখে যে দুটি দল কটাক্ষ ছুঁড়েছে বাম-কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে, তাদের মধ্যে একটি, কিছুদিন আগে পর্যন্ত সেই আব্বাসের সঙ্গে ঢলাঢলি করে বেড়িয়েছে, বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ অপর দলটি ওই বিশেষ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের উত্তরসূরি, যার সম্পর্কে নেতাজী বলেছিলেন যে ভারতের স্বাধীনতার চেয়ে কংগ্রেসের পতনের দিকে বেশি আগ্রহী ছিলো হিন্দু মহাসভা। হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলনে যখন বাম-কংগ্রেস-কৃষক প্রজা পার্টি সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করছে সেখানেও অদর্শিত ছিল হিন্দু মহাসভা। ১৯৪০ সালের মার্চে দলের মুখপত্রের সম্পাদকীয়তে সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছিলেন, হিন্দু মহাসভা ভারতীয় দলগুলির পরিবর্তে কলকাতা পুর নির্বাচনে ব্রিটিশদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, “… কয়েক জন হিন্দু মহাসভা নেতার নিযুক্ত কৌশলগুলি … আমাদের বেদনা ও শোকের কারণ সৃষ্টি করেছে। হিন্দু মহাসভা কোনো স্বচ্ছ লড়াই লড়েনি … (তাদের) প্রার্থীদের মধ্যে এমন লোকেরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা কংগ্রেস পুর সমিতি ভেঙে দেওয়ার জন্য তাদের সর্বস্তরের চেষ্টা করেছিল এবং সেই লক্ষ্যে ব্রিটিশ এবং মনোনীত কাউন্সিলর গোষ্ঠীর সহযোগিতায় কর্পোরেশনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পুনরায় নির্বাচিত করা হয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে কী ভাবে আচরণ করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।……… হিন্দু মহাসভা কর্পোরেশনকে ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে বাঁচানোর চেয়ে কংগ্রেসকে অপসারণ করার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার প্রমাণ দিয়েছে। এটা দেখাও এখনও বাকি আছে যে কর্পোরেশনে অন্য কোনো ভারতীয় দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে ব্রিটিশদের আধিপত্য প্রতিরোধ করার জন্য আরও আগ্রহ দেখাবে… ”

১৯৪০ সালে ফরোয়ার্ড ব্লক উইকলির একটি সম্পাদকীয়তে সুভাষ লিখেছিলেন, “দীর্ঘ দিন যাবৎ কংগ্রেসের কিছু বিশিষ্ট নেতা হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনে যোগ দিতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি আগের থেকে আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। যে কারণে কংগ্রেস নিজের গঠনতন্ত্রে নতুন একটি বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে। যার ভিত্তিতে হিন্দু মহাসভা অথবা মুসলিম লিগের কোনো সদস্য কংগ্রেসের সদস্যপদ পাবেন না”।

এমনটাও জানা যায়, কলকাতায় হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক প্রচারসভাকে একাধিকবার বিক্ষোভ দেখিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সুভাষচন্দ্রের যুব বাহিনী। শেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজেই ময়দানে নামলে তাঁকেও সেই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদই তাঁর ডায়েরিতে লিখে গিয়েছেন, “সুভাষ তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন যে ‘হিন্দু মহাসভা’ রাজনীতি করতে এলে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে তিনি তা আটকাবেন।"

ভোট আসন্ন শিয়রে। এমতাবস্থায় দীর্ঘকাল শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ে থাকা ৭%, ৫% ও ফুরফুরা শরিফের কৌলিন্যে জোটা আরো কিছু ভোট কুড়িয়ে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের পক্ষে সরকার গঠন তো দূরস্ত, ম্যাজিক ফিগারের লক্ষ ক্রোশের গন্ডী অতিক্রম করাই হয়তো অসাধ্যসাধন। কিন্তু মুঘল-ইসলামি যুগের পরবর্তী পরিচ্ছদে, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলন ও দেশভাগের পরবর্তী আরোকিছু সময় ধরে বাঙালি যেটুকু আধুনিক জাতিসত্ত্বাটিকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল, যুক্তফ্রন্টের সময় থেকে যার ক্ষয় শুরু হয় ও দীর্ঘ বাম আমল ও তৃণমূলের দশ বছরের অপশাসনের অব্যবহিত পশ্চাতে যা হিন্দি ও উর্দূ বলয়ের নিরন্তর আগ্রাসনে অতল কৃষ্ণগহ্বরে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তা অক্ষুণ্ন রাখার দায়িত্ব এই জোটের। ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বাঙালির ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার আলেখ্যে অন্তর্নিহিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তান এবং উত্তর ভারতের ব্যবসায়ীদের পূর্ব পাকিস্তানকে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্য আর এই লক্ষ্য নিয়ে তারা বিকশিত করতে চেয়েছিল উর্দুর সাংস্কৃতিক বলয়। আর এভাবেই তারা চেয়েছিল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের অথনৈতিক বিষয়টি উর্দুভাষীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কোমর ভেঙে দিতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ববাংলার) মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া-শিক্ষার্থীরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তাই তা প্রতিহত করতে নেমেছিল রাস্তায়। অতএব শুধু ভাষার আগ্রাসন প্রতিরোধ করার লক্ষ্য ছিল না ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের, এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। বর্তমান মোদি সরকারের আমলে বারবার পরিলক্ষিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনা। সর্বভারতীয় NEET পরীক্ষায় বাংলা ভাষাকে ব্রাত্য রাখা, UPSC-র প্রশ্নপত্র থেকে বাংলা ভাষার বহিস্করণ, সম্প্রতি নতুন শিক্ষানীতির (NEP2020) ধ্রুপদী ভাষার তালিকায় ঠাঁই পায়নি বাংলা ভাষা অথচ তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়ালাম এমনকি ওড়িশারও ঠাঁই জুটেছে। সম্প্রতি বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মন্তব্য করেছেন, "ওনারা আবেদনই করেননি। প্রশ্ন উঠছে, বাংলা মিডিয়ামে পড়ে কতজন জয়েন্টে বসতে পারেন? কতজনের যোগ্যতা আছে? মাস্টারমশাই ও নেতানেত্রীর ছেলেমেয়েরাও পড়ে না। সেখানে পড়ে মানুষ হওয়া যায় না। তাই জয়েন্ট দেয় না। ডিগ্রিধারী বেকার হওয়া যায়। আর তারা জয়েন্টে বসবে, পাশ করবে? সেই স্ট্যান্ডার্ড আছে? সকাল থেকে নাটক করছেন বাংলার মানসম্মান বাঁচাতে আগ্রহী হলে বাঙালির জন্য নাগরিকত্ব বিল আনছি। সংসদে বিলকে সমর্থন করুন।'' প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা ভালো, ঝাড়গ্রামে বাংলা মিডিয়ামেই পড়াশুনো করেছিলেন দিলীপ ঘোষ। কেন্দ্রীয় বাজেট, রেল বাজেট সবেতেই বাংলার কপালে নাচছে ফুটো কয়েন। আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলার জন্য কেন্দ্র সরকার আর্থিক বরাদ্দ ঘোষণা করে ১০০০ কোটি টাকা, যেখানে একই ইস্যুতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত উড়িষ্যা পায় অনেকবেশি আর্থিক অনুদান। পশ্চিমবঙ্গবাসী বিজেপির ১৮ জন প্রার্থীকে জয়ী করে সংসদে পাঠানো সত্ত্বেও না পেয়েছে সাকুল্যে একখানি পূর্ণমন্ত্ৰী, না ছিঁড়িছে শিকে। তৃণমূলের ২১ জন সাংসদ ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়েছে বাংলার হয়ে লড়ে অধিকার আদায় করে নিতে, মাঝখান থেকে করোনা ও আম্ফান আবহে চাল ও ত্রিপল চুরি করে যেভাবে গরীবের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে চৌর্যবৃত্তির অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে তা জনসাধারণকে বাকরুদ্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট।

 কালের নিয়মে অবক্ষয় সাধিত হয়, আবার বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কিন্তু নিহিত থাকে শৃঙ্খলার বীজ। এদিকে অসমে কংগ্রেস হাত মিলিয়েছে বদরুদ্দিনের সাথে, ওদিকে মহারাষ্ট্রে কিন্তু শিবসেনার হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন অনেকটাই প্রতিমিত করা সম্ভবপর হয়ে উঠেছে। ভোট আসে ভোট যায়, এই ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তির সঙ্গম লগ্নে দাঁড়িয়ে জোটের মূল লড়াই কিন্তু তৃণমূল-বিজেপির সঙ্গে নয় বরং বাঙালি সংস্কৃতি ও মননগত জাতিসত্তার সঙ্গে আরএসএসের "হিন্দু রাষ্ট্র" গঠনের প্রোপাগান্ডার।





Read More »

■ রাহুল ঘোষ | অন্তর্গত সংলাপের কাছে সারাক্ষণ

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

প্রকাশ্য স্তব্ধতার কাছে কিছুক্ষণ বসে থাকি। বাকিটা অন্তর্গত সংলাপের কাছে। চারপাশে আলোর কোলাহল। এখানেই থেমে থাকা ছায়াঘন চুপকথা দেখছে না কেউ। অথচ এখানে এক নিবিড় যাতায়াত ছিল। তার বুকে জমে থাকা নতজানু বিষাদকে ওই কোলাহল চেনেনি। সেকথা বলতে গিয়ে কুড়িয়েছি কত অভিশাপ! কাছেই একটা নদী। হঠাৎ সন্ধ্যা এলে, ফেরিঘাটে নেমে আসে যে ম্লান অন্ধকার ; তার মুখ এখানে কে মনে রাখবে!​

তবুও জলের আর এক নাম জীবন। রাতের বয়স হলে, পৃথিবীও অর্ধনিমীলিত হয়। নদীর ছলাৎ-জলে কোথাও ঘাই দিয়ে ওঠে জলজ মায়া। সে কি শুধুই বিভ্রম? স্বভাবে ডুবসাঁতার নেই বলে, কবে যেন নিমজ্জিত মৃত্যু পেয়েছিল নৌকো। সে কি শুধুই শিকার? জলেরও তো নিজস্ব কলরোল আছে। সেই কলরোল যেন শুধু তামাশায় মুখর। সে কি নিছকই বিদ্বেষ?​

নাকি, আরও কোনো গভীরের খেলা?

আসলে, ছায়ার কাছে আর কী চাওয়ার ছিল? পাওয়ার মতো আর কী ছিল ওই আলোর কাছে? বাতাসে ভাসতে থাকা বেনামি পাতা হয়ে ঝুলে থাকে কিছু-কিছু জীবন। তারপর ঠিকানা হারিয়ে একদিন ফিরে আসে অনিশ্চিত পায়ে। যার নিচে পথের অজস্র ফুটিফাটা এঁকে দিয়েছে পাথর। সেই দাগ আজ আর কোন উপশমে মিলাবে! যাবতীয় দুঃখবিলাসকে এড়িয়ে, কখন নীরব আর্তনাদ চিনে নেবে উচ্ছ্বসিত নদীজল?​

এও এক অদ্ভুত স্থিরতা!

সময়ের ধুলোখেলার কাছে এবারেও হেরে যেতে চলেছে অসহায় কিনারা। নদীর পাড় ভাঙে এইভাবে, যেন সে নিজেই গিলে খায় তার জলে চাষ করা জমিন! নিরাময়-ঠোঁট নিয়ে এইখানে দাঁড়িয়েছে যে, তাকে আমি কোথাও দেখিনি। ডুবে যাওয়া জীবন কীভাবে অচেনা লালিত্যের কাছে চাইতে পারে বেঁচেবর্তে থাকার ঠিকানা!​

আলোর মুখোশ নিয়ে চলমান শবেরা হেঁটে যায় শ্মশানের দিকে। এছাড়া আর কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নেই। কোনো এক দেবশিশুর আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিল দুঃখী জনপদ। কিন্তু তারও তো অন্তিমে লেখা আছে আত্মহননের গহীন!​

তবুও প্রতারণার জন্য শুধু রঙ আর চিহ্নদের দায়ী করবেন না, মহামান্য। অন্যরা কম কোথায়! বাস্তবে তো যার যতদূর পরিধি, "কেউ কথা রাখেনি"। একদা এক সুনীল-কবিতায় লিখিত হয়েছিল এই অমোঘ। মানুষকে ব্যবহার করে নেওয়ার কৌশলে সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে যারা, তাদের মুখেই সবচেয়ে বেশি মানবতা-গান উচ্চারিত হয়!​

কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।​

এর সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে চোরা-আক্রমণ। হীন ষড়যন্ত্র এবং স্থূল বিদ্রুপের চলমান। নগ্ন উল্লাসের ধারাবাহিক।​

ও হ্যাঁ, ব্যতিক্রমও থাকে। ব্যতিক্রম ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রম-ই।​

যারা পৃথিবীর আসল সংখ্যালঘু।​

তাহলে রঙ ও চিহ্নদের সেই বিরলের মধ্যে পাবেন কী করে! ওরা তো স্বভাবতই বৃহতের প্রতিনিধি! ওরা তো এই মাটিরই ফসল। এই তঞ্চক সমাজের সন্তান। ওদের ক্ষমতা বেশি, সুযোগও। তাই প্রতারণা বড়ো। সমাজকেন্দ্রিক। বাকিদের ক্ষমতা যতটা করে কম, প্রতারণাও ঠিক ততটা করেই ছোটো। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ব্যাপার এইটুকুই। সহজ এবং সরল। ওই যে বললাম, যার যতদূর পরিধি!​

এই যে এত অনিশ্চয়তা, এই মহামারী, এত আক্ষেপ, হাহাকার এবং সর্বনাশ; তবুও এখানে তাই ক্রোধের কোনো কমতি নেই! এত ক্রোধ নিয়ে মেদে এবং মদ্যে, উৎকোচে ও পদ্যে, ধান্দায় ও পানিতে, মিথ্যা রাহাজানিতে মানুষেরা কীভাবে সাবলীল বেঁচে থাকে? এমন ক্রোধের শীর্ষে তো চোখ থেকে ঘুম উড়ে যাওয়ার কথা!

ঠিক যেমন বিপরীতে, মায়ার শীর্ষদেশে, বেপাত্তা হয় ঘুম। এই যে ক্ষোভ ও ক্ষুণ্ণতার এত উপাদান, তবু্ও আশ্চর্য এক মায়া এখানে জমে আছে! অথচ কোনো মায়াকে অনিবার্য হতে না-দিলে, সবকিছু কত অনায়াস!​

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে নেমে আসছে অসম্ভব গম্ভীর একটা দুপুর। গাঙ্গেয় অববাহিকার উপর গাঢ় হচ্ছে একটা নিম্নচাপ-রেখা। ঝড় তো আসছেই। সঙ্গে বৃষ্টিও আসবে তো?

অসমাপ্ত ধূসর ফ্লাইওভারের কাছাকাছি নেমে আছে লেভেল ক্রসিং। থেমে আছে সারি-সারি চাকা। এখন একটা আপ-ট্রেন যাবে। খুব তাড়াতাড়ি আর একটা, ডাউন। দুইপারে থমথমে মুখে অপেক্ষা করছে একগাদা অধৈর্য চেহারা। অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই! ঠিক এইরকম সময়ে বিদ্যুৎনীল চলভাষ বেজে উঠতেই পারে। যেন প্রায় নিয়মমাফিক! ভেসে উঠতে পারে দুই-একটা রিংটোনের ঠিকানা।​

এই সময় বধির হয়ে যাওয়া ভালো।

অন্তর্গত সংলাপের কাছে প্রায় সারাক্ষণ বসে থাকি। জীবনরেখা থেকে খোঁজ দৃশ্যত মুছে গেলে, এখনও বিষণ্ণতা আসে। নামের লুকোচুরিতেই যদি গৃহহীনতা বরাদ্দ থাকে, জীবন আর কীভাবে পেতে পারে আশ্রয়ের দীর্ঘ আলিঙ্গন! তবুও অন্তর্গত সংলাপ আবার কখনও উচ্চারিত হলে, এই স্তব্ধতা নিশ্চিত ভেঙে দেওয়া যাবে।

Read More »

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত


শব্দের মিছিল

ফাল্গুনের শেষ গোধূলি বেলা... মরা বসন্ত গায়ে তখনো চিলতে শীতের আমেজ মেখে গুটি গুটি সন্ধ্যের শ্লথ আয়োজনে। অমলতাসের শিথিল বোঁটারা ধরে রাখতে পারেনি আর শুকনো পাতার মৃতদেহের ভার। মরে যাওয়া হলদে পাতা আর গুমনামি কোনো পাখির খসে পড়া পালক জড়াজড়ি করে পড়ে আছে বাগানের এককোণে। মাঝেমাঝেই মাতাল উদাসী বসন্ত বাতাসে তারা জড়াজড়ি করেই থাকে, ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টায়। চৈত্র আসছে... বাগানে, পুকুর ঘাটে, দূরের ঐ মজা নদীর মরা সোঁতায়, সদ্য তরুণীর উড়ন্ত আঁচলে, প্রাণপণে সাইকেলের প্যাডেল ঠেলা নব্য যুবকের গোঁফের রেখায়... কে জানে কার সর্বনাশ ঘটাতে! বাগানের দূরতম কোণে অনাদরে পড়ে থাকা ওই পাতার আর পালকের সখ্যর মতই বিবর্ণ আজ গোধূলির আকাশ। মায়াময় আকাশে মেঘসঞ্চার, কালো চাপ চাপ জলদ মেঘের ভেলা পরিক্রমণ করছে সেই সদ্য তরুণীর ঠিক মাথার ওপরকার আকাশ-উঠোন। সেই নব্য যুবকের আকাশই বা কম কিসে? গতরাতের বৃষ্টিরা অদৃশ্য ছাটের ছায়া হয়ে মন বেয়ে ঢুকে পড়েছে তার মায়ামাখা চোখের ভিতরখানে। পড়ার টেবিলের উপর মাথা নামিয়ে রেখে সে যখন জাগরণের ও স্বপ্নের ঠিক মধ্যিখানে, তখন আর কেউ কোথাও থেকে নিজের তরঙ্গ পাঠাচ্ছিলো কি তাকে? তার চেতন ও অবচেতনের দিগন্তরেখায় যে তখনো ক্রমাগত আসা-যাওয়া করে চলেছে একটি মুখ... যার গালে ফুরিয়ে আসা বিকেলের লালিমা। কেমন মায়াবিনী, নাকি কুহকিনী, নাকি শুধুই সর্বনাশিনী এক মেয়েমানুষ। যুবক বড়ো ধন্ধে। তার ঘরের নোনাধরা দেওয়ালের ঘোলাটে ছবি, পাল্লাভাঙা আলমারির তাকে সার দেওয়া বইগুলির মতোই তার অনুভূতিগুলোও অতীতের ধূসরতা নিয়ে তাকিয়ে আছে শূন্যে... জীবন্ত ফসিলের মতো।​

চৈত্র আসছে, ঠিক সেই সেদিনের মতো, যেদিন তার সর্বনাশ এসেছিলো। সেই সন্ধ্যের ঘনানো অন্ধকার মনে করিয়েছিলো একটি শিহরণ। প্রথম সে স্পর্শের আলুথালু শিহরণ। তারপর ঠোঁটের ওপরে নেমে আসা জোড়া ঠোঁটে সিগারেটের মৃদু গন্ধ। তারপর আর কিছু মনে নেই। সাক্ষী হয়ে রইলো শুধুমাত্র লম্বা অমলতাস। সেদিনও তার পাতা ঝরে পড়েছিলো... টুপ... টুপ... টুপ। হলদে সে শুকনো পাতারা তাদের ছুঁয়ে দিয়ে প্রাণ পেতে চেয়েছিলো। খসখস সড়সড় শব্দে ফড়ফড় করে উড়ে গিয়েছিলো বাগানের ঐ কোণের দিকে, যেখানে গুমনামি পাখিদের পালক গড়াগড়ি যেতো। পাতাগুলো উড়ে উড়ে গিয়ে সেই পালকের সাথে ঠিক এরকমই জড়াজড়ি করতো, নির্লজ্জের মতো। ভাগ্যিস ওদের ঠোঁট নেই! থাকলে হয়তোবা তাতেও চ্যাটচেটে ভিজে আওয়াজ উঠতো। সদ্য তরুণীর ঘামে লেপটানো চুল তখন নব্য যুবক আঙুলের ডগা দিয়ে সরাতে ব্যস্ত। আর মাধবীলতার মতো মাথা ঝুঁকিয়ে তরুণীও তখন মুখ লুকোতে ব্যস্ত পুরুষালি ঘামের গন্ধে ভেজা যুবকের সবুজ খাদির পাঞ্জাবির বুকে।

এ দৃশ্য হয়তো এখনকার নয়, হলোই বা সুদূর অতীতের, তবু তো এই দৃশ্য একদা চলমান ঘটমান অস্তিত্বের বিলাস হয়েই ছিলো। চলে যাওয়া দিনে, শতাব্দী-প্রাচীন কোনো লোকালয়ের আড়ালে হয়তো এই দৃশ্যায়ন হয়েছিলো। আজও হয়তো হয় সেই দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ। হৃদয়ের মধ্যস্থলে ঘটা করা ঘটে যাওয়া এক সর্বনাশের দৃশ্য এটি। তারপর গল্প এগোয় নিজের গতিতে। গ্রাম থেকে শহরে ডাক্তারি পড়তে আসা সেই যুবক, তার প্রনয়িণীকে রেখে এসেছিলো গ্রামে। কলকাতায় ভাড়া নেওয়া ঘরে অপটু হাতে তার অগোছালো ঘরখানা গুছিয়ে দেবার জন্যে ডেকে এনেছিলো তার সহপাঠিনীকে। মেয়েটি যুবকের ঘরে এসেছিলো এক ফাল্গুনের শেষ গোধূলি বেলায়। তখন গ্রামে তার প্রনয়িণী একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলো অমলতাসের তলায় তলায়। দূর আকাশে তখন মেঘসঞ্চার হচ্ছিলো। কালো জলদ মেঘ। ঝড়ের পূর্বাভাস, শনশন বাতাসে উড়ছে অমলতাসের শুকনো পাতা, কেমন পাক খেয়ে খেয়ে। প্রনয়িণী ভাবে কখনো তো এমন হয়নি। ভাবতে না ভাবতেই ঝড় উঠলো, চড়বড় করে বৃষ্টি... তীরের ফলার মতো? নাকি শঙ্করমাছের লেজের চাবুকের মতো?

কলকাতা শহরে যুবকের ভাড়া নেওয়া ঘরে তখন দু'জোড়া ঠোঁট মিলেমিশে একাকার, ঘামে লেপটানো পোশাক তখন বাড়তি আড়ম্বর। ঝড় থামতেই কনে দেখা আলো। কী নিঃঝুম চারিধার, ঝড় থামলে যেমন হয় আর কি! গ্রামে আঠেরো পেরোনো তরুণীর সংখ্যা অমিল। যথাসময়ে গ্রাম্য তরুণী স্বামীর সঙ্গে এক মাস সংসার করে কলকাতা শহর থেকে গ্রামে ফিরছে। সিঁথিতে তার ডগডগে সিঁদুর। কনকচাঁপা হাতে রিনিঠিনি বেজে ওঠা শাঁখা চুড়ি আয়োস্তি... স্বামীর কল্যাণ কামনায়। মন কেমন করা ভোঁ বাজিয়ে ট্রেন চলেছে হেলেদুলে... ঘটাং-ঘট... ঘটাং-ঘট ছন্দে। বিকেল ঘন হয়ে সন্ধ্যে হবো হবো। ট্রেন এসে দাঁড়ালো গ্রামের স্টেশনে। গত সপ্তাহে সেই যুবকটি কলকাতা থেকে ফিরে তরুণীকে আর দেখতে পায়নি। বুকে চিনচিনে এক গোপন ব্যথা নিয়ে যুবক এসেছিলো, গ্রামে ফিরে তরুণীর খবর পেয়ে কেমন এক স্বস্তিও হয়েছিলো তার। এবারে আবার তার ফেরার পালা। শহরে ফিরবে। ফিরতেই হবে। যে মনখারাপ সে রেখে এসেছিলো গ্রামের অমলতাসের তলায়, তাই আবার হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে এলো তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। সেই তরুণী এখন সদ্যোবিবাহিতা রমণী। পরস্ত্রী। একনজর দেখা, অপাঙ্গে একটু চোখাচোখি। সর্বনাশ ফিরে আসছে... শহর পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, অমলতাসের বন পেরিয়ে, অদূর অতীত পেরিয়ে। যুবকটির চোখ জ্বলে এই চৈত্রবেলায়।

হঠাৎ বড়ো শীত করে উঠলো নব্য যুবকের। এদিকে

তার কলকাতামুখী ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। হেলেদুলে আপন গতিতে চলেছে। তারপর কলকাতায় পৌঁছতেই বৃষ্টি নেমেছে, বৃষ্টির ছাটে অন্ধকার হয়ে এসেছে স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো, ঝিমন্ত বাল্বের আলো গড়িয়ে পড়েছে বিছানায় টেবিলে সর্বত্র। চুঁইয়ে আসা স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোআঁধারিতে ছায়ার বাস্তবতার উপস্থিতি। রাস্তা থেকে ভেসে আসা পথচলতি মানুষের বিষন্ন অবসাদ ভরা পদধ্বনিতে আর কটকট করে ডেকে চলা টিকটিকির ডাকেই কেবলমাত্র যেন প্রাণের অস্তিত্ব। এলোমেলো ভাঁজে অযত্নে পড়ে থাকা পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া খবরের কাগজেরা ডাঁই হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে, তাতে লেগে আছে বাসি খবরের গিজগিজে কালো কালো দাগ। নব্য যুবক অলস দুপুরে একলা তার নিজের ঘরে। সহপাঠিনী আর প্রণয়িনী দুজনেই সরে গেছে তার জীবনবৃত্ত থেকে। রেডিও থেকে ভেসে আসা সংবাদ পাঠকের গুরুগম্ভীর গলা, আবার কখনোবা খেয়াল বা ঠুমরির ছেঁড়াখোঁড়া সুর প্রতিবেশী কোনো বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে... এটুকুই নব্য যুবকের একান্ত অবসরযাপন... বা একমাত্র বিনোদন। নোনাধরা ঘরের দেওয়াল জুড়ে জানালার জংপড়া লোহার শিকের দীর্ঘতম ছায়া রচনা করেছে এক কারাগার... এই কারাগারেই যেন আজীবন বন্দী আছে নব্য যুবক। হঠাৎ তার সেই বদ্ধ কারাগারে ঢুকে পড়েছে চৈত্র বাতাস হু-হু শব্দে, সর্বনাশিনী ঘাতিকার মতো। ঢেলে দিয়েছে গ্যালন গ্যালন মনখারাপি বৈরাগ্যের স্পর্শে মেদুর অমলতাসের তলার ভেজা নোনতা স্মৃতির রাশি।

******

অভিরূপের মন্দ্র গম্ভীর গলার গল্পপাঠ থামতেই পায়রার ডানা ঝাপটানোর মতো হাততালির রেশ। অভিরূপ... ডাক্তার অভিরূপ গাঙ্গুলি... নামকরা কার্ডিওলজিস্ট... অর্থাৎ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তবে তার পাঠকেরা অবশ্য তাকে হৃদয় বিশেষজ্ঞ বলেই সম্বোধন করে। ডাক্তারবাবুর সার্জিক্যাল ছুরি আর কলম দুইই চলে সমান নিপুণতায়। লেখক শিল্পী পাঠক শ্রোতা সংসদ আয়োজিত বসন্তোৎসবে ডাক্তার অভিরূপ গাঙ্গুলি গল্পপাঠের আসর থেকে বেরিয়ে স্ত্রী মেঘনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। নিজেই গাড়ী চালাচ্ছে। আজ তাদের দু'জনের মধ্যে এক যোজনব্যাপী শীতল নীরবতা বিরাজমান। অনেকটা পথ এমনভাবেই চললো। যেন কয়েক আলোকবর্ষ পার। অভিরূপের চোখ সোজা সামনে, অভ্যস্ত হাত স্টিয়ারিঙে। ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে বেরোতেই মেঘনা স্টিয়ারিঙে অভিরূপের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখলো আলতো করে। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললো, "আমারও একটা অমলতাসের তলা ছিলো...!" অভিরূপের বুক থেকে একটা পাথর সরে গেলো যেন। ততক্ষণে আবার পরের সিগন্যালে গাড়ী দাঁড়িয়েছে। অভিরূপ নিজের ডানহাতটা স্টিয়ারিং থেকে তুলে মেঘনার হাতের ওপরে রেখে মৃদু চাপ দিয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো মেঘনার মোমঢালা চিকন মুখের দিকে, এই প্রথম বার... দশবছরের দাম্পত্য জীবনে। ফিসফিসে গলায় অভিরূপ বললো, "আমাদের বাগানে আমরা দু'জনে মিলে একটা অমলতাসের চারা লাগাবো, একদিন অনেক লম্বা হবে সেই অমলতাসটা। আকাশ ছোঁবে।" বাইরে রাতের ব্যস্ত শহর, আর ভেতরে মেঘনার সিঁথি ছুঁয়েছে তখন অভিরূপের বাঁ গাল।
Read More »
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google