x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

শনিবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০২০

শনির বচন | বাঙালির বড়দিন বড়দিনের বাঙালি

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৬, ২০২০ | | মিছিলে স্বাগত
বাঙালির বড়দিন বড়দিনের বাঙালি

আজ কিন্তু বড়দিন। বেশ, কিন্তু তাতে কি? কেন আজ তো দেদার ফূর্তি আর মস্তির দিন। সারাদিন হই আর হুল্লোর। পিকনিক আর ঘুরে বেড়ানো। পার্টি আর ড্রিংক্স। আর হ্যাঁ অবশ্যই কলকাতাবাসীদের মক্কা, আজ পার্কস্ট্রীট। না আজ বাঙালিকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলে দুষতে পারবে না। কি হিন্দু কি মুসলিম। আজ সকলের উৎসব। আজ সকলেই এক একজন সান্তাক্লজ। না, তার পেছনের ক্লজ কি কি। সেই বিষয়ে চিন্তা করা চলবে না। কোন জাদুতে হিন্দু মুসলিম বাঙালি মাত্রেই আজ খুশির পরব। সেই বিষয়ে ময়নাতদন্তে আমরা রাজি নই। আমরা জানি আজ মেরী ক্রিসমাস বলতে হয়। না বললেই গেঁয়ো ভুত। ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নি’। শুনিয়ে দেবে প্রগতিশীলরা। ফলে আমাদের সকলেরই মুখে আজ মেরী ক্রিসমাস। তা সে আমাদের আল্লা আর ভগবান যাই ভাবুন না কেন।

সারা বছর আমাদেরকে কেউ সাম্প্রদায়িক বললেও আমরা গায়ে মাখি না। কিন্তু আজ আমাদের সাম্প্রদায়িক বলার পথ বন্ধ। কেমন হিন্দু মুসলিম মিলে আজ আমরা সকলকেই কলোনিয়াল লিগ্যাসীর উত্তরাধিকার বহন করে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছি। বছরে অন্তত এই একটি দিন। সত্যি কি এটা একটা বড়ো খবর নয়? তাই আজ সত্যিই বাঙালি মাত্রেরই বড়দিন। আজ আমাদের মনটাও দিল দরিয়ার মতো বড়ো হয়ে ওঠে। আজ আমরা নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক মানের মানুষ বলে অনুভব করতে পারি। আজ কিন্তু আমরা বিশ্ব নাগরিক। তা সে বিশ্ব নাগরিকত্বের কোন পরিচয়পত্র আবিষ্কার হোক আর নাই হোক। বছরে অন্তত এই একটি দিন বাঙালি বিশ্ব নাগরিক। বিশেষ করে এ বি সি ডি জানা বাঙালি মাত্রেই। 

এই এ বি সি ডি না জানলে বাঙালির যে কি দুর্দশা হতো। সে আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। তাই তো বাঙালি অভিভাবক মাত্রেই স্বপ্ন দেখে গর্ভজাত সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়েই এ বি সি ডি’র সাথে পরিচিত হয়ে উঠবে দ্রুত থেকে অতিদ্রুত। আর হচ্ছেও তাই। বাঙালির ঘরে ঘরে এখন এ বি সি ডি’র চর্চা। আর সেই চর্চার সূত্রেও আজ সত্যিই আমাদের বড়দিন। আমরা বাংলার মতো আঞ্চলিক একটি ভাষার গারদ থেকে মুক্ত হয়ে এ বি সি ডি’ জানার শক্তিতে আজ বিশ্ববাসীর সাথে বড়োদিনের উৎসবে সামিল হতে সক্ষম। যে কোন বাঙালির কাছেই এ কম বড়ো কথা নয়। কে বলে বড়দিন শুধুই সাহেব মেমদের উৎসব। আমরাও কম সাহেব মেম নই। ফরফর করে ইংরেজি বলতে না পারলে আর কিসের শিক্ষিত হয়ে ওঠা। তাই বাঙালির পক্ষে ইংরেজি না জানার থেকে বড়ো লজ্জা আর নাই। হতেও পারে না। সেই ইংরেজি জানা বাঙালির কাছে আজ সত্যিই বড়দিন। কিন্তু তাই বলে ইংরেজি না জানা বাঙালিও পিছিয়ে নাই আজ। আজ তাদেরও হই হুল্লোর করার দিন। কেক কেটে উৎসব পালনের দিন। ডিজে বাজিয়ে নৃত্য করার দিন। ইংরেজি না জানলে বড়দিন পালন করা যাবে না, সে হতে পারে না। হ্যাঁ ইংরেজি জানা বাঙালি আর না জানা বাঙালির ক্লাস নিশ্চয়ই আলাদা। একদল পার্কস্ট্রীট কালচারে দীক্ষিত। তাদের জন্য বড়ো বড়ো ক্লাব হোটেল বার রেঁস্তোরা রয়েছে। অন্যদলের মস্তি’র জন্য মাঠঘাঠ রাস্তাঘাট পড়ে রয়েছে। 

মস্তিতে দুই দলই সমান। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কেক কাটা থেকে পানাহার। ক্লাসের তফাৎ থাকতে পারে। কিন্তু তাতে কি? দুই পক্ষই তাদের নিজেদের মতো করে বড়দিন পালনে অভ্যস্থ।

সত্যিই বড়োদিনের মহিমা কম নয়। এই একটি দিন বাঙালি ধর্মের বাইরে পা রাখার সুযোগ পায়। এবং সেই সুযোগটাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে নেয় মস্তি করতে। তাই বলে বাঙালিকে আজ কেউ খেষ্টান বলে গাল পারে না। কিন্তু ঈদের দিনে গরু খেলে বাঙালি হিন্দুর জাত যায়। অষ্টমিতে অঞ্জলি দিলে বাঙালি মুসলিমের যাত যায়। কিন্তু আজ খেষ্টানী গীর্জায় গিয়ে বড়দিন পালনে হিন্দু মুসলিমের জাত যাওয়ার ভয় থাকে না। সাগর পারের ক্রিসমাসের কি অপার মহিমা। একটু পয়সাকড়িয়ালা বাঙালির ঘরে ঘরেই প্রায় আজকাল সান্তাক্লজ আসে। কচিকাঁচাদের জন্য বিশেষ উপহার টুপহার রেখে যেতে রাতের অন্ধকারে। না, ভাগ্য ভালো তাতে হিঁদুয়ানী বা মুসোলমানি কোন কিছুতেই বাঙালির জাত যায় না। সান্তাক্লজ সত্যিই দেবদূত। দুই বাঙালিকে অন্তত এই একটি দিন কেমন এক ঘাটের জল খাইয়ে ছেড়েছে। না, তাতে বাঙালিরই মহিমা বৃদ্ধি পেয়েছে বই কি। বাঙালি আর যাই হোক কূপমণ্ডুক নয়। সে বছরে একটি দিন অসাম্প্রদায়িক চেতনার উত্তরাধিকার বহন করতে সক্ষম। এটা কম বড়ো কথা নয়। বাঙালির তাই আজ সত্য অর্থেই বড়দিন।

নিন্দুকেরা যতই অকথা কুকথা বলুক না কেন। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে বাঙালির পর ধন লোভে মত্ততা ও ভিক্ষাবৃত্তির আচরণের ঐতিহ্যে যতই আলোকপাতের চেষ্টা করুন না কেন, আমরা জানি বাঙালির হৃদয় কত প্রশস্ত। তাই তো সাগরপারের ভাষা সংস্কৃতিকে কেমন নিজের করে নিতে পেরেছি আমরা। তাতে প্রয়োজনে নিজের ভাষা সংস্কৃতি বিসর্জন দিতেও পিছপা নই আমরা। এমন প্রশস্ত হৃদয় আমাদের ছাড়া অন্য কোন জাতির রয়েছে? তাই আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য নিয়ে কটাক্ষও আমল দিচ্ছি না আমরা।

জানি অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন। বড়দিন যে মানুষটির স্মরণে। তাঁর চরিত্রের কোন গুণাবলী আমাদের মধ্যে রয়েছে? ক্রুশে বিদ্ধ হয়েও যে মানুষটি তাঁর হত্যাকারীদের কোন অভিশাপ দিয়ে যান নি। মৃত্যুর অন্তিম লগ্নেও যিনি ক্ষমার অবতার। প্রেমের বাণীকে নিজের জীবন দিয়ে সার্থক করে গিয়েছেন। সেই বড়ো মাপের মানুষটির কোন গুণাবলী বাঙালি গ্রহণ করেছে? যে এমন ঘটা করে তাঁরই জন্মদিনে উৎসব পালন? আজকের বড়দিন কি তখনই সার্থক নয়, যখন এমন একজন বড়ো মাপের মানুষের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে উঠবো আমরা? সত্যই তো। এও একটা চিন্তা করার মতো কথাই বটে।
না, না। সেকথা বাঙালিকে শোনানোর মানে হয় না। বড়োমাপের মানুষটির মতো আমরা বাঙালিরাও কি ক্ষমার অবতার নই? 
এই তো খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়। শ্রীচৈতন্যের মতো মানুষকে যাঁদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। সমাজের সেই উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদের ক্ষমতাকে কি আপামর বাঙালি ক্ষমা করে দেয় নি? না দিলে তো বাংলায় একটা সমাজবিপ্লবই হয়ে যেত। আজও আমাদের সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্তিত্বকে বেশ নেক নজরেই কি দেখা হয় না? তারপর সেই বর্গী এলো দেশে। সোনার বাংলাকে ছাড়খাড় করে দিয়ে চলে গেল। বর্গী’র অত্যাচারে লক্ষলক্ষ মানুষের প্রাণ গেল। আর লক্ষলক্ষ মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে পারি দিল নদী পার হয়ে। কই তাই বলে তো সেই বর্গীদের বংশধর আজকের মারাঠাদের উপরে বাঙালির কোন ক্ষোভ বিক্ষোভ নাই। আমরা তো সেই বর্গীদে’র অত্যাচারকেও ভুলতে পরেছি বেমালুম। ক্ষমা করে দিয়েছি মারাঠাদের। বরং আজ আমরা মারাঠাদের গনেশ উৎসবকেও আমাদের ঘরের উৎসব করে নিয়ে নতুন করে বর্গী বরণ করছি আবার। হ্যাঁ পশ্চিম বাংলার রাজনীতির কথাই এই বিষয়ে স্মরণ করা যেতে পারে। আমরা যে পরম ক্ষমাশীল। আড়াইশো বছর ধরে বাংলার অর্থনীতি শোষণ করে যে ব্রিটিশ ইংল্যাণ্ডকে আধুনিক করে তুলল। আমাদেরকে পরাধীন করে রেখে, আমাদেরই সম্পদ লুঠ করে যে ব্রিটিশ তাদের লণ্ডনকে সর্বাধুনিক করে তুলল, আমরাই তো সেই লণ্ডন ভ্রমণ করে ফিরে এসে নিজ সমাজে জাতে উঠি আজও। এত বড়ো ক্ষমাশীল জাতি বিশ্বে আর আছে না কি? আজও এ বি সি ডি জানা বাঙালির স্বপ্নের দেশ সেই বিলেত। একবার বিলেত না গেলে সমাজের চুড়ায় ওঠা মুশকিল নয় কি? আমরা যদি ক্ষমাশীল না হতাম, তবে আড়াইশো বছর ধরে আমাদের রক্ত শোষণ করা ব্রিটিশেরই এমন ভক্ত হয়ে উঠতে পারতাম কি আদৌ? তাই বাঙালি ক্ষমা করতেও জানে। প্রেমে পড়তেও জানে। এমন কি চরম শত্রুকেও খাল কেটে ঘরে ঢুকিয়ে আনতে আমাদের জুড়ি নাই কোন।

এই যে আজকের পশ্চিমবঙ্গ একটি মিনি ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছে। এই কি হতে পারতো। যদি না আমরা সকলকে আপনার বলে জড়িয়ে ধরতে পারতাম। আমরা কত সহজে অবাঙালিদের সাথে তাদের ভাষায় আলাপ করি বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়েই। যে বাংলার মাটির মালিকানার একটা প্রধানতম অংশই অবাঙালিদের দখলে চলে গিয়েছে আজ। কই তাই বলে তো আমরা আমদের জমি ফেরৎ চাইছি না? এই যে চৌদ্দ পুরুষের বাঙালির মাটির একটা বড়ো অংশই আজকের উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও আসামে ঢুকে বসে রয়েছে ব্রিটিশের বদান্যতায়। কই আমরা তো তাই নিয়ে কোনদিন একটা কথাও বলি নি। বলবোও না। যা গেছে তা গেছে। আমাদের থেকে অধিক প্রেম আর কোন জাতির রয়েছে? আজ পশ্চিমবাংলার বাঙালি মাত্রেই আগে ভারতীয়। তারপর মনে পড়লে তবে বাঙালি। এই যে নিজের আত্মপরিচয়টুকুও আমরা এমন ভাবে বিলিয়ে দিতে পেরেছি। এও কি কম ত্যাগ? স্বয়ং যীশুর আত্মত্যাগের থেকে কোন অংশে কম? কাঁটাতারের পূ্র্ব পারের বাঙালির আত্মপরিচয়ও আজ আর বাঙালি নয়। বাংলাদেশী। এবং মুসলিম। বাংলার আত্মার একটা অংশ যে কাঁটাতারের পশ্চিম পারে পড়ে রয়েছে, তাতে আজকের বাংলাদেশীদের কিছু এসে যায় কি? আর আসবেই বা কি করে। কাঁটাতারের এপারে বসে আমরাই তো তাদের বিদেশী বাংলাদেশী বলে মনে করি। বাঙালি বলে মনেও করি না। নিজেদেরও বাঙালি মনে করি না। বাংলাদেশীদেরও বাঙালি মনে করি না। বাংলাদেশীরাও ঊনিশবিশ তদ্রুপ। সেখানেও বাঙালির মূল পরিচয় আগে মুসলিম তারপর বাংলাদেশী। ফলে আমরা বাঙালিরা কাঁটাতারের যে পারেই থাকি না কেন। আমরা আমাদের নিজের জাতীয় পরিচয়টুকু সকলের আগেই বিসর্জন দিতে পেরেছি। এবং অন্য জাতি ধর্মের পরিচয়কে বুকে টেনে নিতে পেরেছি। এও কি কম বড়ো কথা? আমরা সত্যই অনেক বড়ো হৃদয়ের অধিকারী। অন্তত ব্রিটিশ জার্মান রুশ ইহুদী ফরাসীদের মতো ছোট মনের অধিকারী নই মোটে। তাই স্বয়ং যীশুর স্মরণে বড়দিন পালনের আমরাই প্রকৃত অধিকারী। আমরা ত্যাগ করতেও পিছিয়ে নেই। আমরা ক্ষমা করতেও অপারগ নই। বরং যে যে জাতি বাঙালির ক্ষতি সাধন করেছে, করছে। আমরা তাদেরকেই বুকে জড়িয়ে ধরার বাসনায়, তাদের পায়ে পড়ে থাকতে চাই। বাঙালির চরমতম শত্রুকেও বাঙালি যেভাবে ক্ষমা করতে পারে। না, বিশ্বে অন্য কোন জাতির সেই ক্ষমতা নাই। তাই বাঙালির আজ সত্যিই বড়দিন। বড়দিন আজ বাঙালির। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতোই কাঁটাতারে ক্ষতবিক্ষত বাঙালি কেমন অম্লানবদনে জাতির চরম শত্রুদেরকেও আপনার জ্ঞান করে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়ে ক্ষমাই পরম ধর্ম পালনে দিকপাল হয়ে উঠেছে। বড়দিনের বাঙালির তাই আজ সত্যিই বড়দিন।

২৫শে ডিসেম্বর’ ২০২০

শনিরবচন
Read More »

শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

■ শ্রীশুভ্র | সমাজবিপ্লবের পথ

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত
■ শ্রীশুভ্র | সমাজবিপ্লবের পথ


ব্রিটিশের দিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের মূল নীতি হলো, সমাজকে অশিক্ষিত করে রাখা। সমাজকে সাম্প্রদায়িক করে রাখা। আর মানুষকে করে রাখতে হবে অলস কর্মবিমুখ সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী। এবং দেশে এমন একটি শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে দেশ ও সমাজকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে তোলার মানসিকতা তৈরী করে দেওয়া হয়। ফলে একশ্রেণীর চতুর বুদ্ধিমান মানুষকে দিয়ে গণতন্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের গণতন্ত্রের এই হলো সার কথা। আর এই গণতন্ত্রে ধর্ম ও ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চাকে সবসময়ে উজ্জীবিত করে রাখতে হয়। এই কারণেই সমাজের সর্বস্তরে রাজনীতি আর ধর্ম দিয়ে সাধারণ মানুষকে সর্বদা ঘিরে রাখতে হবে। একদিকে রাজনীতি আর একদিকে ধর্মের দাসত্বে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে বেঁধে রাখা যাবে, তত বেশি মানুষকে অনেক বেশিদিন ধরে বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব হবে। আর এই সংখ্যাগুরু বোকা মানুষদের ভিড়কে ক্ষমতার স্বার্থে যখন যেভাবে খুশি ব্যবহার করা যাবে। এই যে একটি বোকা এবং অশিক্ষিত মানুষের ভিড়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভিড়কে ধরে রাখার কাজেই রাজনীতি ও ধর্ম পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজ করে যাবে।

যে কোন রাজনৈতিক দলই হোক না কেন। যে কোন ধরণের মতাদর্শই হোক। এই গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর সুযোগ ও সুবিধা গ্রহণ করেই রাজনীতিতে এগিয়ে চলায় বিশ্বাসী। ফলে কোন রাজনৈতিক দলই সমাজকে শিক্ষিত করে তুলতে নারাজ। একটি শিক্ষিত সমাজকে রাজনৈতিক স্বার্থে বলির পাঁঠা বানিয়ে রাখা সহজ সাধ্য নয়। বরং প্রায় অসম্ভব। করতে গেলে সম্পূর্ণ ফ্যাসিস্ট শক্তির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ছাড়া সেটি করাও সম্ভব হয় না। ফলে, উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক দলগুলির রাজনৈতিক কর্মসূচীর কোথাও সমাজকে শিক্ষিত করে তোলার মতো কোন দিশা, পরিকল্পনা কিংবা কার্যক্রম রাখা হয় না। অত্যন্ত সচেতন ভাবেই। উল্টে বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শিবিরগুলি অশিক্ষার বিস্তারকে কায়েমী করে রাখার জন্যই ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে সমাজের সর্বস্তরে সবসময় শক্তিশালী করে রাখার চেষ্টা করে থাকে। এদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা বড়ো সময়ই এই কাজে ব্যায় করা হয়। আর এই কারণেই দেখা যায়, এই দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির নেতানেত্রীরা মন্দির মসজিদে ঘন ঘন ঢুঁ মারে। এবং বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি হয় সবিশেষ। কে কত বড়ো ধার্মিক সেইটি প্রমাণ করার ধুম পড়ে যায়। এবং সাধারণ মানুষের ভিতরে বেশ একটা সাড়াও পড়ে যায়। নেতানেত্রীদের ধর্মীয় কার্যক্রমে ভক্তবৃন্দের উৎসাহ উদ্দীপনাও বৃদ্ধি পায় চতুর্গুণ। যার ছায়াপাত ঘটে ভোটের হিসাবে।

এই যে, দেশের বেশির ভাগ মানুষকে কার্যত অশিক্ষায় আপাদমস্তক মুড়ে রাখার রাজনীতি, এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সমাজ ও জাতি, দেশ ও রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে গেলে পথ একটাই। এবং সেই পথ সমাজ বিপ্লবের পথ। না, সমাজ বিপ্লব মানেই গুলি বোমা বন্দুকের কারবার নয়। সমাজ বিপ্লব মানেই গৃহযুদ্ধ নয়। সমাজ বিপ্লব মানে সমাজসংস্কার। আগা থেকে গ‌োড়া অব্দি সমাজ সংস্কার। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক দিশার হদিশ খুঁজে বের করতে হবে। কিভাবে একটি ক্লীব পঙ্গু সমাজকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো যায়। কিভাবে সমাজের প্রতিটি মানুষকে শিক্ষার সুযোগের আওতায় নিয়ে আসা যায়। কিভাবে শিক্ষার অধিকারকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে সমাজ বাস্তবতায় সত্য করে তোলা যায়। মানুষের ভিতর শিক্ষার প্রসার যত বেশি ও ব্যাপক হবে, মানুষের অবরুদ্ধ চেতনা তত বেশি মুক্ত হতে থাকবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ধারা ও উপধারাগুলি সম্বন্ধে মানুষ তত বেশি সচেতন হয়ে উঠবে। মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করার যে উপায় গুলি, সেইগুলি তত বেশি কমজোরি হয়ে পড়তে থাকবে। এবং ধর্মের আফিম ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চার সংস্কৃতি দিয়েও মানুষকে ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠতে থাকবে। শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথেই মানুষের আর্থিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠাও সমাজের সর্বস্তরে প্রসারিত হবে। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে এর কোন বিকল্প নাই। মানবসম্পদের উন্নয়নের হাত ধরেই একটি জাতির উত্থান সম্ভব হয়। অন্য কোন পথে সেই উত্থান সম্ভব হয় না। জাতির উত্থান প্রতিটি মানুষের ভাগ্য খুলে দিতে সক্ষম হয়। মানুষকে অনুন্নত জীবনযাপন থেকে তুলে নিয়ে আসতে গেলে জাতির উত্থান ছাড়া কোন পথ নাই।

কিন্তু দুঃখের বিষয় কাঁটাতারের দুই পারে পড়ে থাকা বাংলার সমাজ এই সত্য উপলব্ধি করতে প্রয়াসীও নয়। সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, নিজের আখের গুছিয়ে নিতেই ব্যস্ত। দেশের গোটা সমাজ নিয়ে তাদের ভিতরে প্রকৃত কোন সমবেদনা নাই। তার আসল কারণ, আমাদের দুই বাংলাতেই বাঙালি জাতীয়তাবোধের কোন উন্মেষ ঘটেনি আজও। একটি জাতির ভিতরে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ না ঘটলে সমগ্র জাতি সম্বন্ধে কারুর ভিতরেই প্রকৃত কোন সমবেদনা জেগে ওঠে না। দুর্ভাগ্যের বিষয় দুই বাংলার বাঙালিই এই বিষয়ে তুল্যমূল্য অবস্থানে আটকিয়ে। আজও অনেকের ভিতরেই জাতীয়তাবোধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীবোধের সমার্থক ও সমতুল। এবং অধিকাংশ বাঙালির চেতনার গভীরেই এই একটি অন্ধকার বদ্ধমূল হয়ে গেঁথে রয়েছে। গেঁথে রয়েছে বংশপরম্পরায়। গেঁথে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। গেঁথে রয়েছে সামাজিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যে। আর দুই বাংলার রাজনীতি সেই ঐতিহ্যকেই প্রতিদিন নিয়ম করে তা দেওয়ার কাজে নিষ্ঠার সাথে কর্মব্যস্ত। ফলে যে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কর্তব্য ছিল, সমাজকে সঠিক পথ দেখানোর। সেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সমাজকে ভুল পথে চালিত করতেই ব্যস্ত থেকেছে। রাজনীতির সাথে গাঁটছাড় বেঁধে। কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে। এই দুই ভাবেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সমাজকে কার্যত ভুল পথে ঠেলে দিয়েছে। যার সম্পূর্ণ ফয়দা তুলেছে প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী রাজনীতিই।

এবং একথাও সত্য, একটি সমাজ তার বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর প্রকৃতির উপর অনেক অংশেই নির্ভরশীল। দুই বাংলাই তার বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বর্তমান ক্লীবতা ও নীচতার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ফেলে রাখা ফাঁকা মাঠটা দখল করে নিয়েছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্বেরা। দেশসেবকের মুখোশ পড়ে সমাজটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দেওয়া কাগজের ঠোঙার মতো অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে। আর দুইবেলা দুর্নীতির পথটিকে একমাত্র পথে পরিণত করে নিয়ন্ত্রণ করছে সমাজ থেকে দেশ। রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিপরিসর। ফলে মানুষের হাতে অন্য কোন রকম বিকল্প আর অবশিষ্ট নাই। মানুষ প্রায় ক্রীতদাসের মতো সবসময় সময়ের সাথে ও অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে নিতে বাধ্য হচ্ছে। শুধুমাত্র অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। আর এই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ মানু্ষকে এমন ভাবেই ঠেলতে থাকা, যাতে খাদে পড়ে যাওয়ার থেকে বাঁচার জন্যে প্রয়োজনে আগাছা আঁকড়িয়ে ধরে হলেও সে টিকে থাকার চেষ্টা করে। আজকের দুই বাংলার রাজনীতি সেই আগাছায় পরিণত হয়েছে, যাকে আঁকড়িয়ে ধরেই নিরন্তর টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত আমজনতা।

ঠিক এই রকম পরিস্থিতি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে জমাট বাঁধা শুরু করতে হবে। স্বল্প সংখ্যক হলেও, মূল পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধিতে সক্ষম, হাতে গোনা কয়েকজন হলেও পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নাই। পরস্পরের হাত ধরতে হবে। কাছাকাছি আসতে হবে। সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিরন্তর চেতনার আদান প্রদানের সকল দরজা জানলাগুলি হাট করে খুলে রাখতে হবে। হবেই। চিন্তা ভাবনার আদান প্রদান ছাড়া কোন দিশা খুঁজে পওয়া সম্ভব নয়। তাই পরস্পর পরস্পরের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। সেখান থেকে যৌথশক্তিতে উঠে আসতে হবে, আপন গৃহের নিভৃত অন্তঃপুর থেকে। এই ভাবে একে একে বার হয়ে আসতে শুরু করলে, বাকিদেরও সাহস বৃদ্ধি পাবে। এবং দেখা যাবে, ক্রমেই একটি সদর্থক শক্তি জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। এইটি না হলে সমাজ সংস্কারের পথ তৈরী করা সম্ভব হবে না কোনদিনই। দুই বাংলার সমাজ সংস্কারের ফেলে রাখা কাজ শুরু না করতে পারলে, সমাজ বদলের দিন এগিয়ে আসবেই বা কি করে? আর সমাজ বদলের দিনকে এগিয়ে আনার সামগ্রিক প্রক্রিয়াই সেই সমাজ বিপ্লব। না, গোলাগুলি বোমা বন্দুক। গেরিলা বাহিনী ছাড়াও সমাজ বিপ্লবের এই এক পথ। বাংলা ও বাঙালির যদি কোন ভবিষ্যৎ থেকে থাকে তবে সেই ভবিষ্যতের চাবি একমাত্র এই সমাজ বিপ্লবের পথেই মিলবে। অন্য সব পথই গোলকধাঁধার পথ।

২০শে ডিসেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

Read More »

■ জয়তী রায় | রাজনীতি এবং দ্রৌপদী

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত
■ জয়তী রায় |  রাজনীতি এবং দ্রৌপদী

■ ১

পাঁচহাজার বছর ধরে জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা মহাভারত রোজ নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে। নতুন নতুন ব্যাখ্যা আসছে। তবুও দেখা যাচ্ছে, পাঠকের কৌতূহল বা আগ্রহ ক্রমশঃ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েই চলেছে।​

মহাভারতের দুটি মহল। একটি অন্তরমহল। অপরটি বহির্মহল।​

পারিবারিক কলহ থেকে উদ্ভুত মহাযুদ্ধ হল বহির্মহল। অন্তমহলে আছে গীতা আর দর্শন। রামায়ণ ভক্তিযোগের কথা বলে। মহাভারত ভক্তির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে নিষ্কাম কর্মযোগ। কর্ম করো কিন্তু ফলের আশা করোনা - গীতার সমস্ত উপদেশ আধুনিক মনস্তত্ত্বের বিচারে মানুষের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সাধন করতে সক্ষম।​

#
মহাভারত নিয়ে যখন কাজ করতে বসি, মনের ভিতর হতে উৎসারিত হয় আনন্দ। যদি বলো কেন? উত্তরে বলি, ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ পৌরাণিক গ্রন্থ মহাভারত, যা অধ্যয়ন করে আমরা তৎকালীন সমাজ ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি, সেগুলি যেন অজানা কিছু নয়। আজকের যুগে বসেও নিজের সময়ের প্রেক্ষিতে মহাভারতের যুগ চিনে নেওয়া - এটাই আনন্দ দিতে থাকে। বিশেষকরে চরিত্রগুলো। চরিত্রের ভিতর ঢুকলে দেখা যায়, সুখে, দুঃখে , ভালোবাসায়, হিংস্রতায়, চাওয়া পাওয়া সবকিছুতেই তাঁরা আমাদের কাছের মানুষ। এ গেল ভিতর মনের কথা। কেমন ছিল বাইরের জগৎ? ভূমি দখল, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, প্রেম , কামনা, আধুনিক যৌনতা, সন্তান জন্মে অপারগ হলে, বিকল্প ব্যবস্থা, দেবতা এখানে মানুষের প্রতিবেশীর মত। ঋষিমুনির হোমযজ্ঞ, আর্য অনার্য ভেদাভেদ। প্রশস্ত রাজপথ ধরে ছুটে চলেছে রাজকীয় রথ। শকট। নর্তকীর নুপূর কিঙ্কন বেজে উঠছে অভিজাত মহলে।​

রাজশেখর বসুর মহাভারত সারানুবাদ পড়লে জানা যায়, যে, এই সময় প্রায় সকলেই মাংস আহার করতেন। গোমাংস ভোজন চলত। মহাভারতের যুবতী বিবাহ প্রচলিত ছিল। রাজাদের পত্নী, উপপত্নী,দাসী থাকত। অশ্বমেধ যজ্ঞে বীভৎস বলি হত। উৎসবে শোভাবৃদ্ধির জন্য বেশ্যার দল নিযুক্ত হত।​

সুখের কথা, অতি প্রাচীন ইতিহাস ও রূপকথা সংযোগে উৎপন্ন এই পরিবেশে আমরা যে নরনারীর সাক্ষাৎ পাই তাদের দোষ গুণ সুখদুঃখ আমাদেরই সমান।

 

 মহাভারত একটি রত্ন -সাগর। এতে রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি প্রভৃতি সমস্তনীতি আছে। মহাভারতের একটি উল্লেখ্য দিক হল এর রাজনৈতিক কার্যাবলী। অদ্ভুত ব্যাপার, তখনকার রাজনীতির সঙ্গেও এখনকার ভাবধারার প্রচুর মিল খুঁজে পাই। পরিষ্কার স্পষ্ট স্বচ্ছ ভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা ধরা দেয় আমাদের কাছে। বিশেষকরে, নারীদের মধ্যেকার আধুনিক চেতনা, জীবন ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার মতামত দেখলে অবাক হতে হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে দেখব সেই সময়ের রাজ্য রাজনীতিতে দ্রৌপদীর ভূমিকা ঠিক কিরকম ছিল!​

: আগুন হতে জন্ম/ নিজেই যেন আগুন:

সর্বকালের সবচেয়ে আলোচ্য নারী চরিত্র যদি কেউ থেকে থাকে, সে হল দ্রৌপদী।​

হেলেন , ক্লিওপেট্রাকে স্মরণে রেখেই এমন মন্তব্য করছি। রূপ গুণ বিদ্যা বুদ্ধি নিয়ে মহাকাব্যের বহু নায়িকা স্মরণীয় কিন্তু সমগ্র পুরুষ জাতিকে অবহেলায় পায়ের কাছে ফেলে রাখার ক্ষমতা একমাত্র ছিল , দ্রৌপদীর।​

জন্ম কাহিনীই এত অদ্ভুত, যাঁর ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সীতাদেবীকে পাওয়া গিয়েছিল কৃষিক্ষেত্রে, যে ঘটনার উপযুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু, যজ্ঞআগুন হতে উদ্ভুত পূর্ণ বয়স্কা নারী ... এই ছবি মনে করলে , ভেসে আসে আগুনের মত তেজীয়ান কৃষ্ণবর্ণের মেয়ের অপরূপ রূপ।​

যজ্ঞসেনস্য দুহিতা দ্রুপদস্য মহাত্মনঃ।​
বেদিমধ্যাৎ সমুৎপন্না পদ্মপত্রনিভেক্ষণা।।
দর্শনীয়াহনবদ্যাঙ্গী সুকুমারী মনস্বিনী।​
ধৃষ্টদ্যুম্নস্য ভগিনী দ্রোণশত্রোঃ প্রত্যাপিনঃ।।

( আদি: ১৭৭: )

মহাত্মা দ্রুপদ রাজার কন্যা পদ্মনয়না দ্রৌপদী যজ্ঞবেদী থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। তাঁর কোনও অঙ্গই নিন্দনীয় নয়। অতি সুদৃশ্য এবং সুকোমল। দ্রোণশত্রু ধৃষ্টদ্যুম্নের ভগিনী। যাঁর নীলোৎপল তুল্য দেহের গন্ধ একক্রোশ দূর থেকেও বইতে থাকে।​

এহেন রূপসী কন্যার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে কাহিনী একটা ব্যাসদেব দিয়েছেন বটে, এবং সে কাহিনীর মধ্যে অবধারিত মিশে আছে রাজনীতি। দ্রোণাচার্যর সঙ্গে দ্রুপদের বিবাদ এবং দ্রোণ হত্যা নিমিত্ত যজ্ঞের বেদী থেকে দ্রৌপদীর উৎপত্তি। যজ্ঞের বেদী বলতে আগুন তো বটেই। ব্যাসদেব বলেছেন : বেদীমধ্যাৎ সমুথিতা।​

এমন একজন নারী, ভবিষ্যতে যাঁর ক্রোধের আগুনে আহুতি হবে গোটা ভারতবর্ষ। যাঁর মান রাখতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে পাঁচ ভাই। যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হবে গোটা মহাভারত। হাজার হাজার বছর ধরে যাঁর রূপ গুণের বর্ণনা করে শ্রান্ত হবে না মানব। হাজার বছর পরেও যাঁর আকর্ষণ এতটুকু কম হবে না কোনোদিন। পাঁচ পাঁচটি স্বামী, অগুন্তি পুরুষের কামনার আগুন যাঁকে ঘিরে আবর্তিত অথচ তিনি পঞ্চ সতীর এক সতী!

মনে রাখতে হবে, মহাভারতে গল্পের মধ্যে গল্প থাকে। ক্যামোফ্লেজ। উপরের আবরণ সরিয়ে ভিতরের অর্থের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। তবে সম্পূর্ণ সৌন্দর্য প্রতিবিম্বিত হবে। দ্রৌপদীর জন্ম যদি সাধারণ হত, তাঁর একটা ছেলেবেলা থাকত ধাপে ধাপে বড় হওয়া দেখান হত, তবে চরিত্রটির প্রতি আকর্ষণ প্রথম থেকেই সৃষ্ট হত না। দ্রৌপদীর আগে এসেছেন সত্যবতী, কুন্তী , গান্ধারী। প্রত্যেকেই ব্যতিক্রমী চরিত্র। কিন্তু , আপোষকামী। কুন্তী অবশ্যই লড়াকু চরিত্র। তবু, কোথায় যেন লকলক আগুন অনুপস্থিত। দ্রৌপদী প্রথম থেকেই দীপ্ত। প্রখর। তীব্র কণ্ঠে ঘোষনা করেন, যে পুরুষ তাঁর চুলে হাত দিয়েছে, তাঁর রক্ত ছাড়া আর চুল কোনোদিন বাঁধবেন না। কীচক থেকে শুরু করে যে যেখানে দ্রৌপদীকে অপমান করেছে, সেখানে আগুন জ্বলেছে। তবু, পুরুষ কামনা করেছে তাঁকে।​

:যাজ্ঞসেন্যা পরামৃদ্ধিয়ং দৃষ্টা প্রজলিতামিবঙ:

দ্রৌপদী যেন জ্বলছে। চলনে বলনে ব্যক্তিত্বে সে যেন এক অধরা নারী। রহস্যময়ী। যা পুরুষের বুকে জ্বালা ধরায়। দ্রৌপদীকে ঘিরে ভারতের রাজাদের লোভ হিংসা কামুকতা__আবর্তিত হয়েছে।​

দ্রৌপদী অর্থ আগুন। সেটাই মহাকবি বলতে চেয়েছেন। প্রধানা নায়িকার প্রবেশ হোক এমনভাবে , যাতে প্রথম আবির্ভাব থেকেই তাঁকে ঘিরে সৃষ্টি হবে চরম কৌতূহল ও আকর্ষণ। অগ্নির পাবক শক্তি সৃষ্টি আর ধ্বংসের প্রতীক। দ্রৌপদী ঠিক তাই। কাজেই , আমার বিচারে, দ্রৌপদীর জন্ম অলৌকিক নয়। প্রতীকী।

■ ২

ভারত রাজ নীতি/ কৃষ্ণ ও দ্রৌপদী

মনে করা হয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাল খ্রী পূর্ব ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি এবং তার কিছুকাল পরে মহাভারত রচিত হয়। সেইসময় ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ভারত। দলাদলি , রাজনৈতিক ডামাডোল , অরাজকতা , শোষণ ইত্যাদি চলছে।​

তখন ধীরে ধীরে উত্থান হচ্ছে যাদবকুলপতি শ্রী কৃষ্ণের।।​
কৃষ্ণ ছিলেন প্রাজ্ঞপুরুষ। দূরদর্শী। চতুর।​

Extremely clever firmly determined, an expert judge of time and circumstances. স্বপ্ন দেখছেন ভারতবর্ষ হোক এক অখণ্ড ধর্মরাজ্য। এ লক্ষ্যে প্রধান বাধা ছিলেন মগধরাজ জরাসন্ধ এবং তাঁর অনুগামীর দল। যেমন , কংস, শিশুপাল প্রমুখ। দুর্যোধন সমর্থন করতেন জরাসন্ধকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুরোটাই দখলে ছিল পূর্ব মধ্য ভারতীয়দের দখলে। বিশাল ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের রাজন্যবৃন্দ পারস্পরিক দ্বন্দ্বে মত্ত থেকে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়াসকে করেছিল সুদূর পরাহত। সর্বোত্তম সর্বভারতীয় এক রাষ্ট্র গঠনের মনোভাব বা দূরদর্শিতা তাদের ছিল না। মহাভারতের সময় বিশাল ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক ঐক্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভারতে একটি দৃঢ়রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি নিজের দিকে নিয়ে আসতে প্রথমেই নিধন করলেন মাতুল কংসকে। এবং , নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন ভারতের সর্বোত্তম নেতা হিসেবে।​

শ্রীকৃষ্ণের স্বপ্ন ছিল ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। যা হবে অখণ্ড। এক পতাকার ছত্র ছায়া তলে একত্রিত হবে সমগ্র ভারত। সেই রাষ্ট্রের কর্ণধার ঠিক করতে তিনি চললেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায়। কারণ, তাঁর অনুমান ছিল নির্ভুল। জানতেন ওই সভায় পঞ্চপান্ডব যেভাবেই হোক আসবে। তাঁরা তখন অজ্ঞাতবাস পালন করছে। কৃষ্ণ খুঁজে পাননি তাঁদের। আশা ছিল এখানে তাঁরা আসবেই। এবং , কৃষ্ণ মনে মনে ঠিক করেছিলেন, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হবেন আগামী দিনের কর্ণধার।​

দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভা। ভারতবর্ষের তাবৎ রাজাদের আগমন ঘটেছে সেখানে। তাঁরা প্রত্যেকেই ওই একটিমাত্র নারীকে কামনা করছিল। উপস্থিত ছিল পঞ্চপান্ডব। দ্রৌপদীর রূপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তাঁরা সকলেই।

রাজনৈতিক ডামাডোলের সময় দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর খুব গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রাষ্ট্রের তাবৎ ঋষিকুল সহ শ্রীকৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন সেখানে। এখানে বলে রাখা ভালো, ভরতের পূর্ব - দক্ষিণ শক্তির( জরাসন্ধ প্রমুখ) উপর উত্তর পশ্চিম ভারতের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সারা ভারত বর্ষ জুড়ে সে কা লে যে রাজ নৈতিক তথা কূটনৈতিক যুদ্ধ হয়েছিল, সেখানে শ্রী কৃষ্ণের প্রধান সহায় ছিলেন ঋষিকুল তথা ব্রামণকুল। ব্রামণ - ক্ষত্রিয় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জরুরি ছিল।

তথা দহ্তি রাজন্যো ব্রামণেন সমং রিপুম।​

অর্থ:ঋষি কুলের সহায়তা পেলে শত্রু জয় করা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে কিছুই না। উল্লেখ্য যে, যুধিষ্ঠির নিজে ক্ষত্রিয় হলেও, তাবৎ ঋষিকুলের সঙ্গে ধর্ম আলোচনা করতেন। বেদ বেদাঙ্গ নিয়ে গভীর চর্চা করতেন। সেজন্যে আগামী ভারতের নায়ক হিসেবে ঋষি কুলের প্রথম ও একমাত্র পছন্দ ছিলেন যুধিষ্ঠির।

সমস্যা হল, সেই সময় দুর্যোধনে র গুপ্তঘাতকের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পাণ্ডব ছিল অজ্ঞাত বাসে। স্বয়ম্বর সভায় ছদ্ম বেশে এসেছিল। তার পিছনেও কারণ ছিল। সেই সময় পঞ্চাল শক্তিশালী রাজ্য। সেই রাজ্যের একমাত্র কন্যাকে যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সমর্থ হবে, পরবর্তী কালে পঞ্চাল তার পাশে থাকবে। সুতরাং, দ্রৌপদীর বিবাহ নিছক বিবাহ ছিল না। তার পিছনেও ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। দ্রৌপদী কি জানতেন? এই উদ্দেশ্য মূলক বিবাহ সংঘটিত হতে দিতে সায় ছিল কি তাঁর? তথ্য বলে, তিনি অবগত ছিলেন। পিতা দ্রুপদ চেয়েছিলেন,কন্যার বিবাহ হোক অর্জুনের সঙ্গে। অর্জুন মহাবীর। জামাতা হলে সে হবে দ্রুপদের সহায়। নিতে পারবেন প্রার্থিত প্রতিশোধ, কুরুআচার্য ও একদা বন্ধু দ্রোণাচার্যের উপর। সেই জন্যই কঠিনতম শর্ত রাখা হল বিবাহের। যা ভেদ করা অর্জুন ব্যতীত আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না।​

লক্ষ্যভেদ অনুষ্ঠান শেষ হল।​

কি অপূর্ব বিভঙ্গমে , নিখুঁত নিপুনতায় , সংযত ভঙ্গিতে লক্ষ্যভেদ করলেন অর্জুন। প্রশংসার পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল রাজসভা জুড়ে। কৃষ্ণ বুঝে গেলেন, এই নিপুণ ধনুর্ধর আর কেউ নয়। স্বয়ং অর্জুন। এরপর আরো কিছু ঘটনা ঘটল সেখানে। অর্জুনের প্রতি ঈর্ষায় কর্ণ দুর্যোধন শাল্ব শল্য দ্রুনায়নী ক্রথ সুনিথ বক্র শিশুপাল প্রমুখ রাজারা ছদ্মবেশী অর্জুনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন ভীম অর্জুনের দাপুটে যুদ্ধ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল উপস্থিত সকলে। কৃষ্ণ নিশ্চিন্ত। পঞ্চ পান্ডব এখানেই আছে। নি :শব্দে বার্তা বিনিময় হল, ঋষিদের সঙ্গে। একটা সঙ্কটের সূচনা নজরে পড়েছে তাঁদের। সেটা কী? অর্জুনের দ্রৌপদী লাভের ফলে ঈর্ষার করাল ছায়া শুধু অন্যান্য রাজাদের আক্রান্ত করেনি, পঞ্চপাণ্ডবের বাকি চার ভাই স্পষ্টত কাম এবং ঈর্ষায় আক্রান্ত। এর ফল হতে পারে ভয়ানক। নাহ। কিছুতেই পঞ্চপান্ডব ঐক্যভঙ্গ করা সম্ভব না।​

তাই, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করলেও কুন্তীর আদেশ হল পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহ হবে দ্রৌপদীর। নারদ আর ব্যাসদেব বিধান দিলেন , এই ঘটনা দ্রৌপদীর পূর্ব জন্মে ছিল। সুতরাং বাধা কিসের?

আমার বিচারে, এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কুটিল সিদ্ধান্ত। পূর্বজন্ম কাহিনী সেই সময় পরিকল্পনা করেই বলা। কুন্তী আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন যে, কৃষ্ণাকে দেখে তাঁর পাঁচপুত্রই কামে জর্জর। তাহলে? পাঁচ ভাইয়ের যে ঐক্য , যা নিয়ে আগামী দিনে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে হবে,দ্রৌপদীর রূপ সে লক্ষ্যে বাধার সৃষ্টি করবে। ভ্রাতাদের মধ্যেকার ঐক্য বিনষ্ট হলে স্বপ্নভঙ্গ হবে স্বয়ং কৃষ্ণের। সুতরাং, বন্ধকপাটের আড়াল থেকে কুন্তীর আদেশ, নারদ আর ব্যাসদেবের অলৌকিক তত্ত্ব প্রণয়ন ...এবং অর্জুনের প্রেম বুকে নিয়ে বিবাহের পরে প্রথমরাত যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে অতিবাহিত করা। আর একটা কথা বলে রাখা ভালো, উক্ত স্বয়ম্বর সভায় অর্জুনের আগে কর্ণ প্রায় ভেদ করে ফেলেছিলেন ল লক্ষ্য। কিন্তু, সর্ব সমক্ষে সুত পুত্র বলে অপমান করে ফিরিয়ে দেন তাঁকে দ্রৌপদী। এ অপমান সহজে মেনে নেয়নি দুর্যোধন, কর্ণ প্রমুখ। দ্যুতসভায় দ্রৌপদীর চরম অপমান এই উপেক্ষার একপ্রকার প্রতিশোধ বলা যায়।​

রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত সেই নারীর জীবনের প্রতিটি রাত কেমন করে নির্বাহ হত? কেউ জানতে চায়নি কোনোদিন। তবে, আগুন হতে উদ্ভুত কন্যার ভিতরের ক্ষোভ বাইরে প্রকাশ পায়নি , এটা তাঁর চরিত্র মহত্ব। নীরবে নিভৃতে রাত দিন কাটিয়েছেন অর্জুনের প্রতীক্ষায়।​

■ ৩

অরণ্যবাস ও নিষ্ক্রিয় পঞ্চ পাণ্ডবের প্রতি দ্রৌপদীর উষ্মা।

দ্রৌপদীর জীবনে বঞ্চনা এসেছে বারবার। পঞ্চস্বামীর অকাতর সেবা করার পরেও যথোপযুক্ত সম্মান তিনি পেলেন কোথায়? দ্যুতক্রীড়ায় পণ রাখা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য সভায়​

বস্ত্র উন্মোচন , অসম্মানের শেষ সীমায় অবস্থিত করেও একবারের জন্য স্বামীদের দোষারোপ করেন নি। বরং তীক্ষ বুদ্ধির এই নারী স্থির মস্তিষ্ক থেকে যুক্তি প্রয়োগ করে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন তাঁদের। প্রখর ছিল তাঁর রাজনীতি বোধ। সাময়িক ভাবে তিনি উপেক্ষা করেছিলেন দুর্যোধন কর্ণ প্রমুখের অপমান। কিন্তু, ভুলে কিছুই যান নি। তখনো প্রস্তুত নন পঞ্চপাণ্ডব। দুর্যোধন অনেক বেশি ক্ষমতাবান। তাই, তিনি রইলেন সঠিক সময়ের অপেক্ষায়।​

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো, বিবাহের পূর্বে দ্রৌপদী আইন শিক্ষা করেছিলেন। একথা মহাভারতের বনপর্বে তিনি নিজ মুখে বলেছেন। এছাড়া, শ্রী নৃসিংহপ্রসাদভাদুড়ি মহাশয়,তার মহাভারতের অষ্টাদশী গ্রন্থের ৪৭৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন," তখনকার দিনে আইনের বই বলতে বৃহষ্পতি সংহিতা,শুক্র সংহিতা এই সব ই ছিল। পণ্ডিতের কাছে বৃহস্পতি নীতির পাঠ নিতেন প্রধানত দ্রুপদ রাজা। কিন্তু আইনের ব্যপারে দ্রৌপদীর এত আগ্রহ ছিল যে ওই পাঠ গ্রহণের সময় তিনি কোন কাজের অছিলায় সেখানে চলে আসতেন। এবং বৃহস্পতি নীতির পাঠ গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ আইন পড়তেন। এবং জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর এই শিক্ষা কাজে লেগেছিল, সন্দেহ নেই। যেমন, এই বনপর্ব।​

দ্বৈতবনে প্রবেশ করলেন পান্ডব। একদিন সেখানে এলেন কৃষ্ণ এবং দ্রৌপদীর পিতৃগৃহের লোকজন। দ্রৌপদী বুঝলেন সময় এসেছে। তিনি এও বুঝেছিলেন,যুধিষ্ঠির নরম স্বভাব। যুদ্ধ বিগ্রহ পছন্দ করেন না। তিনি আর দেরি করলেন না। কৃষ্ণ কে দেখা মাত্র নিজের সমস্ত অভিযোগ তুলে ধরলেন। একটার পর একটা ঘটনা পর পর সাজিয়ে তুলে তুলে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিলেন কোথায় কোথায় অন্যায় হয়েছে। বিচার হয় নি। বারংবার বলতে বলতে নয়ন যুগল মার্জনা করে নিশ্বাস ত্যাগ করে রাগতস্বরে কৃষ্ণ কে বললেন:​

: নৈব মে পতয়: সন্তি ন পুত্রা ন চ বা ন্ধবা:।​
ন ভ্রাতরো ন চ পি তা নৈব ত্বং মধুসূদন।।​

মধুসূদন! আমার পতিরা নেই। পুত্রেরা নেই। বান্ধবরা নেই। ভ্রাতারা নেই। পিতা নেই। এমন কি তুমিও নেই।

সত্য। দ্রৌপদী যেন নাথবতী হয়েও অনাথবৎ!

সেই মুহুর্তে পরিবর্তন ঘটে গেল পান্ডবপক্ষে। কৃষ্ণ অর্জুন ভীম প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে উঠে প্রতিশ্রুতি দিলেন, যুদ্ধ হবেই।​

যুদ্ধ ঘোষণা করা হল। রচিত হল নতুন ইতিহাস। প্রতিষ্ঠা হল ধর্মরাজ্যের। সফল হল কৃষ্ণের স্বপ্ন। পঞ্চ পাণ্ডবের পরিশ্রম। সমস্ত কিছুর পিছনে রয়ে গেল দ্রৌপদীর অপরিসীম অবদান। ভারতের রাজনীতির একদিকে আছেন কৃষ্ণ। অপরদিকে অবশ্য দ্রৌপদী। এই দুজন না থাকলে, যুধিষ্ঠির হয়ত পাঁচটি গ্রাম উপহার হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন।

তাই, মহাভারতের রাজনৈতিক দিক বুঝতে হলে, দ্রৌপদীর কথা জানতেই হবে। কঠিন ভূমিকা পালন করেছেন এই নারী। আজকের যুগেও তিনি সমান আধুনিক এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Read More »

■ তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় | শাপমুক্তির চিহ্ন

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত

■ তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় |  শাপমুক্তির চিহ্ন


সব পুরনো যেমন একসময় চাপা পড়ে যায় নতুনের নিচে, চলে যায় মহাকালের গহ্বরে, এই অভিশপ্ত বছরটাও তেমনি আর মাত্র কটা দিন পর চলে যাবে সকলের চোখের আড়ালে, ধরাছোঁয়ার বাইরে। একেবারে লুপ্ত হয়ে যাবে কিনা জানা নেই, কিন্তু প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো তার কাছে কোনো প্রাণী আশ্রয় চাইবে এমন আশ্বাস তাকে কেউ দেবে বলে মনে হয়না।

কেননা জীবন এবং জগতকে সে ছারখার করতে এসেছিল। যতটা পেরেছে করেওছে। ২০২০ খ্রিস্টাব্দ মানুষের জীবনে যেন এক অভিশাপের বছর, এমনটাই তো সকলে মিলে সাব্যস্ত করেছে সেই কবে, অতিমারি যখন আতংকের জাল প্রথম ছড়িয়ে দিতে শুরু করছিল সেই থেকেই। শুধু তো প্রাণহানি বা ভোগান্তি নয়, এ থেকে যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে মানুষের, বিশ্বের প্রতিটি দেশের, তার হিসাব তো এখনও করা হয়ে ওঠেনি। সে ক্ষতি শুধু তো অচল সংসার কিম্বা আর্থিক টানাটানি দিয়ে বোঝানো যাবেনা! অনেকদিন পৃথিবী থমকে থাকলে, মানুষ তার প্রাণের মানুষের কাছে আসতে না পারলে যা হয় তা তো অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেওয়া যায়না। একান্তে, অন্তরে সে বেদনা বেজে যায়। আসলে অনেক রকম ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে সবার অলক্ষ্যে।

মোটা দাগের ক্ষতগুলো তবু খালি চোখে দেখা যায়। অঙ্গে বিকৃতি আসে যে! কিন্তু আরও যে অসংখ্য ক্ষত তৈরি হচ্ছে জীবনে, কোভিড ছাড়াও আরও কত সংকট যে নেমে এসেছে মানুষের জীবনে, এই অভিশপ্ত বছরে তার বাড়বাড়ন্তও তো কম নয়। সেসবের আঘাত অন্তরাত্মা কে তছনছ করে দেয়, ওলট পালট করে দেয় যত মূল্যবোধের সঞ্চয়, তাকে তো পরিমাপ করা যায়না! তার কারণে যে মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যায় জীবনে, মননে, তার হিসাব মানুষ করবে কি করে?

সব ক্ষতির খবর হয়না। এখন যেমন করোনা ভাইরাসও আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ খবরের তালিকায় নেই। লেবাননে বিস্ফোরণ, ইরাকে গাড়ি-বোমা, ওখানে খুন ধর্ষণ, ওখানে বোমাবাজি, এই ধরণের খবরগুলোর মতো এতই গা সওয়া হয়ে গেছে যে আর সেগুলো আমাদের মনে তেমন উদ্বেগ জাগায়না। তাছাড়া এই সর্বনাশা বছর ভালো করে শিখিয়ে দিয়ে গেল কোন খবর টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কি দেখলে শুনলে মানুষের নিশ্চিত অগ্রগতি।

না, এরকম স্বপ্নভঙ্গের বছর চাইনি। এক একসময় মনে হয়, দুর্বিষহ এই বছরটাকে স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে মুছে দেওয়া যায় কি? অবশ্য গেলেও লাভ কি! যা ক্ষতি হয়ে গেছে তা আর পূরণ হবার নয়! তার চেয়ে এর চলে যাওয়াটাকেই বরং সেলিব্রেট করি।

ওঝারা যেমন ডাক পেলে এখনও ভুত ছাড়ানোর খেলা দেখায়, ভুতকে নির্দেশ দেয় ছেড়ে যাবার আগে কিছু একটা সংকেত দিয়ে যেতে, তেমনি এই অভিশপ্ত বছরটিকেও বলতে চাই, অনিবার্য নিয়মে যখন এই ভুবন ছেড়ে যাবে, যত আপদ বিপদ সব সঙ্গে নিয়ে যাও। আর যাবার সময় একটা এমন কিছু চিহ্ন রেখে যাও যেন আমরা দেখে বুঝতে পারি তুমি অভিশাপের চাদরটি তুলে নিয়ে গেছ। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জন্য একটা শাপমুক্তির চিহ্ন দরকার আমাদের।​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​

Read More »

■ তৃষ্ণা বসাক | বাংলা সাহিত্যে অন্নচিন্তা চমৎকারা

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | মিছিলে স্বাগত
■ তৃষ্ণা বসাক | বাংলা সাহিত্যে অন্নচিন্তা চমৎকারা


অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ অন্নই চেতনা
অন্ন ধবনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা
অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা
অন্ন অগ্নি বায়ু জল নক্ষত্র সবিতা
অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার
অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওঙ্কার

(অন্নদেবতা/ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

অন্ন শব্দের মূলে রয়েছে অদ ধাতু যার অর্থ ভোজন করা। অর্থাৎ যা কিছু ভোজন করা যায় তাইই অন্ন। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ মানলে, তাই, যেকোনো আহার্য বস্তুই অন্ন। আবার বঙ্গীয় শব্দকোষে অন্নের অন্যতম একটি অর্থ দেওয়া আছে- ‘যাহা ভূতেরা ভক্ষণ করে’। তবে প্রচলিত অর্থে ধান থেকে পাওয়া চাল ফুটিয়ে যে খাদ্য পাওয়া যায়, তাই অন্ন। কলিতে অন্নগত প্রাণ আর বাঙ্গালির তো আক্ষরিক অর্থেই অন্নময় জগত। তার শব্দভাণ্ডারেও অন্নকূট, অন্নক্ষেত্র, অন্নজল, অন্নজীবি, অন্নদা, অন্নদাতা, অন্নধবংস, অন্নপ্রাশনের ছড়াছড়ি। বাঙ্গালির সাহিত্যেও নানা রূপে এই অন্নের প্রকাশ। যা দেখে সত্যিই মনে হয় অন্নচিন্তা চমৎকারা।
স্বয়ং ভারতচন্দ্র বলেছেন
‘...
তুমি অন্ন দেহ যারেঃ অমৃত কি মিঠা তারে
সুধাতে কে করে সাধ এ সুধা ছাড়িয়া
পরশিয়া অন্ন-সুধাঃ ভরতের হর ক্ষুধাঃ
মা বিনা বালকে অন্ন কে দেয় ডাকিয়া।’

মেয়েসন্তানের ক্ষেত্রে মায়ের কাছে অনায়াসে পাওয়া অন্ন শাশুড়ির কাছে এসে,হয়ে যায় খোঁটা ।

‘যদি আহারের প্রতি বধূর কোন অবহেলা দেখিতেন তবে শাশুড়ি বলিতেন ‘নবাবের বাড়ির মেয়ে কিনা! গরিবের ঘরের অন্ন ওঁর মুখে রোচে না।’ (দেনাপাওনা/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আবার এই রবীন্দ্রনাথই পরিহাস করে বলেছেন-

‘দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন
চলে হুইস্কি সোডা আর মুরগি মটন’

যা অন্ন, তাই ভাত। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভক্ত’ থেকে যার অর্থ অন্ন বা খাদ্য। ইংরেজি ‘মীল’ শব্দটির সঙ্গে এর সখ্য টের পাওয়া যায় যখন দেখি খালি পেটে খাওয়া ওষুধের নাম প্রাগভক্ত অর্থাৎ বিফোর মীল। খাওয়ার পরে যে ওষুধ খেতে হয় তার নাম অধোভক্ত বা পোস্ট মিল। যাই হোক, বর্তমান প্রচলিত অর্থে ভাত, অন্য কোন আহার্য নয়, স্রেফ রোজকার নুনভাত, ডালভাত, দুধভাত বা মাছভাতের ভাত। নিজের সন্তানকে দুধেভাতে রাখার আকুতি শুধু ঈশ্বর পাটুনীর নয়, সব বাঙ্গালির। সেই ভাতের অভাব কখনো হয়নি বাংলা প্রবাদ প্রবচনে বা সাহিত্যে। ঘুরিয়ে বলা যায়, আর যাই হোক, বাংলাসাহিত্য এখনো হাভাতে নয়!

- ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না

- মায়ের বোন মাসি
কাদায় ফেলে ঠাসি
বাপের বোন পিসি
ভাত কাপড় দিয়ে পুষি।

-‘এসো ভাত, অন্নব্রহ্ম
জেগে ওঠো দরিদ্র এ দেশে
... সাদা ভাত

আহা ভাত, রক্তবীজ সৈন্যের মুদ্রায় হাজারে হাজারে এস
লক্ষ কটি অজুত বিজুত ভাত ঢেকে ফেল তৃতীয় বিশ্বের এই কংকাল শরীর’
(কৃষ্ণা বসু)

দুখে ক্যাওড়ারা জানে ভাতের ওপর কিছু হয় না

‘ভাত? ভাতের উপর জিনিস নাই। পাঁচদিন দুধ খান, অরুচি ধরে যাবে। এককথা ওই ছানাক্ষীরঘিয়ে। কিন্তু ভাতে অরুচি নাই। মাংস খাবেন দুদিন। ভাত খাবেন নিত্যদিন। সকালে খাবেন, দুপুরে খাবেন, রাতে খাবেন। শুধু নিজে খেলে চলবেনি। মাগকেও খাওয়াতে হবে। ভাত থেকে ভাতার। ভাত জুটতে না পারলে মাগ পালিয়ে যাবে।’

(দুখে ক্যাওড়া, রামকুমার মুখোপাধ্যায়।)

আর আমাদের দেশের কত মানুষ তো স্রেফ ভাত খান তরিতরকারি ডাল মাছের আভরণহীন স্রেফ সাদা ভাত।
‘বড় বড় মেটে হাড়িতে ভাত সিদ্ধ হয়েছে, অথচ কোন দিকে কিছু দেখা গেল না। ওরা বড় কাঁসার উঁচু থালাতে এক রাশ ভাত ঢেলেছে এক একজনের জন্য। শুধু ভাত নুনই না কৈ! আশ্চর্য এই যে ওই নিটোল স্বাস্থ্য শুধু এই উপাদানহীন ভাত খেয়ে।’

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

‘চোট্টি উঠল, ঘরে গেল। হরমুর মা ওকে থালা এগিয়ে দিল। ডাল আর ফেনা ভাত, এখন জঙ্গলে শিকার মেলে না। ওরা ডাল আর ফেনাভাত, তেঁতুলপাতার ঝোল, হাটে কেনা শুওরের মাংস এই সবই খায়। মিশনের লোকেরা খরা-আকালে খয়রাতি দিতে এলে বলে, এত কম পুষ্টির খাদ্য পেয়ে বেঁচে থাকার অভ্যাস আছে বলেই অনাহারে আদিবাসীরা মরে কম।’

(চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর, মহাশ্বেতা দেবী)

কখনো ফেনা ভাতের সঙ্গে আলুসেদ্ধ আর কাঁচা লংকা-তা-ই অমৃত।

‘সুপ্রীতি ভাত খেতে ভালবাসেন, ফেনা ভাতের সঙ্গে একটু আলুসেদ্ধ কাঁচা লংকা হলেই তিনি তৃপ্তি পান। সেই সামান্য ভাতটুকুও তাকে দেওয়া যাবে না।’

(পূর্ব পশ্চিম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

তবে কথায় বলে কত ধানে কত চাল। ভাত খেতে গেলে চাল চাই আর ধান থেকে চাল হয়ে ওঠা তো এক সন্তান জন্মের মতই দীর্ঘ যত্ননির্ভর প্রক্রিয়া। বাংলা সাহিত্যে সে বর্ণনার অভাব নেই।

‘এরপর ধান থেকে চাল তৈরি করার পালা। কড়ায় জল দিয়ে ধান ঢেলে উনুনে জ্বাল দিয়ে দিয়ে ভেপে উঠলে ধান ঢেলে দিতে হয় মাটির তৈরি ম্যাচলায়। তাতে জল ভরে দিতে হয়। পরদিন ‘ভাপানো’ ধান ‘সিদ্ধ’ করতে হয়। ধান ফেটে ভাত বেরিয়ে পড়ে তবে উঠনের রোদে ঢেলে, মেলে দিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। পাড়ার কোন মেয়ে ধান চাখতে জানলে গোটা চারেক ধান নিয়ে যেয়ে মাটিতে রগড়ে চাল বার করে দাঁতে ফেলে চিবিয়ে তাক করে দেখো। ‘চিঁড়ে-বেতে’ হলে আর একপিঠ রোদ পাইয়ে তুলে নাও। বেশিক্ষণ রাখলে সব চাল ফেটে যাবে। ভাত না খেয়ে খেতে হবে খুদের জাউ!’

(আব্দুল জব্বার)

ভাতের জল চড়িয়ে দেখা গেছে চাল বাড়ন্ত –এমন কত সংসারে হয়েছে।
‘ভাতের জল চড়াইয়াছিল, মা চাল ধুইতে গেল। চাল ধুইবার জন্য ধুচুনি হাতে করিয়া মাতা গালে হাত দিল। বলিল চাল কই? প্রফুল্লকে দেখাইল, আধ মুঠা চাউল আছে মাত্র তাহা একজনের আধপেটা হইবে না’

(দেবী চৌধুরানী, বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীশ্রী চৈতন্যচরিতামৃততে আছে ঘি চপচপে শালিধানের ভাত খাওয়ার লোভনীয় বর্ণনা।

‘মধ্যে পাত ঘৃতসিক্ত শাল্যন্ন স্তূপ
চারিদিকে ব্যঞ্জন ডোঙ্গা আর মূগসূপ’

চালের যে কত রকমফের ছিল তার নানা উদাহরণ আছে মঙ্গলকাব্যে। ছোটদের ছড়ায় আছে দাদখানি চালের কথা।

‘দাদখানি চাল
মুসুরির ডাল
চিনিপাতা দই
ডিমভরা কই’

এই দাদখানি এসেছে দাউদ খান থেকে। এই চাল নাকি দাউদ খানের খুব প্রিয় ছিল। পাওয়া যেত দিনাজপুর অঞ্চলে। ধানের নাম তো নয়, যেন কবিতার নাম। দুর্গাভোগ, জামাইলাড়ু, পুণ্যবতী, লক্ষ্মী প্রিয়, কনকলতা।

‘রেশনের চালে আমার রুচি নেই। না হয় না খেয়েই থাকবো! কিন্তু যেদিন খাব, সেদিন দাদখানি বা রূপশালি বা দেরাদুনের চাল। অথবা বরিশালের বালাম’

( চানঘরে গান , বুদ্ধদেব গুহ)

‘শীতে নবান্ন বাঙালিদের বড় পুরনো, বড় সুন্দর পার্বণ। সেই কবে কোন অতীতে যখন অঘ্রাণ মাস দিয়ে আমাদের বছর শুরু হত তখন লোকেরা হেমন্তের প্রথম ফসলের আলোচাল আর তার সঙ্গে কাঁচা দুধে নতুন গুড়, আখ আর কলা মিশিয়ে নবান্ন করে কৃতজ্ঞ চিত্তে দেবতাকে ভোগ দেওয়া শুরু করেন। নবান্ন অনুষ্ঠান আর নবান্ন স্বাদগন্ধ আমাদের ছেলেবেলার শীতের একটা সবচেয়ে আনন্দময় স্মৃতি। গায়ে গঞ্জে এখন নবান্ন থাকলেও কলকাতার বেশির ভাগ বাড়ি থেকে তা উঠে গেছে।’

(মাছ আর বাঙালি, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত)

‘ঘরে ঘরে নতুন সুগন্ধ, ধবধবে সাদা চাল শেষ রাতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন শিলনোড়ায় বাটা হচ্ছে, এতক্ষণ ধরে যে নারকেল কুরিয়ে স্তূপ করা হয়েছিল তাও বাটা হচ্ছে। গতরাতেই চাকা চাকা মিছরি ভেজানো হয়েছিল সেই মিছরির জলে ঐ চাল-বাটা, নারকেল –বাটা, ডাবের জল, গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে কলসিতে কলসিতে স্ত্রীলোকেরা তৈরি করেছে নবান্ন।’

(অক্ষয় মালবেরি, মণীন্দ্র গুপ্ত)

সিধের প্রধান উপকরণও এই চাল।

‘রামহরি লেটের বাড়ি থেকে এসেছিল একটি ভালো সিধে- মিহি চাল, ময়দা, কিছু গাওয়া ঘি, কিছু দালদা, তেল, তরিতরকারি এবং একটা মাছ’

(আরোগ্য নিকেতন, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়)

‘ধামা যুগলে থরে বিথরে সাজানো উৎকৃষ্ট বালাম চাউল, সুদৃশ্য মুগ ডাইল, সর্ষপ তৈল, গব্যঘৃত...’

(আয় মন বেড়াতে যাবি, সুব্রত মুখোপাধ্যায়)

অম্ল পানীয়- অম্লানি- আমানি। জলে ভাত ভিজিয়ে রাখলে যে অম্ল জল হয় তার নাম কাঁজি। সাধারণ ভাবে রাতে ভিজোনো ভাতকে পান্তা ও সকালে ভিজোনো ভাতকে পষ্টি বলা হয়।

প্রবাদে আছে ‘একে মা রাঁধে না পান্তা আর পষ্টি।‘ গরমে আমানি শরীর ঠান্ডা করে।

এক শ্বাসে সাত হাঁড়ি আমানি উজাড়ে (চণ্ডীমঙ্গল)
পান্তা আমানি পাইলে এখনি সুখেতে আহার করি (মনসামঙ্গল)

তো পান্তা খাওয়ার বর্ণনাও কম নেই বাংলা গল্প-উপন্যাসে।

‘যাহারা বলে গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাঁহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে, আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপ্র বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লংকা এবং চিংড়ি মাছের ঝাল চ্চচড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন’

(রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

‘সেখানে দুই ভাইবোন পাঁচুকাকা আর সুবিপিসি দুই কাঁসি পান্তা নিয়ে বসেছে। পোড়ানো শুকনো লংকা, লেবুপাতা আর নুন দিয়ে তারা পান্তা মেখে তারিয়ে তারিয়ে খায়’

(অক্ষয় মালবেরি, মণীন্দ্র গুপ্ত)

আর ভাতের বিস্তার তো বিস্ময়কর। সে একইসঙ্গে রোগীর ও ভোগীর। কখনো রুগীর পথ্য গলা ভাত তো কখনো রাজসিক বিরিয়ানি। আর তা অননুকরণীয় পরশুরামের কলমে।

‘আমি বলে গিয়ে তিনটি বছর ডিসপেপসিয়ায় ভুগছি, কিছু হজম হয় না, সব বারণ, দিনে শুধু গলা ভাত আর শিঙ্গি মাছের ঝোল, রাত্তিরে বার্লি – আর তুমি আমাকে পোলাও কালিয়ার লোভ দেখাচ্ছ! কি ভয়ানক খুনে লোক!’

(রাজভোগ, পরশুরাম)

‘বিরিয়ানি রান্নার? এক নম্বর বাঁশমতী চাল- এখন তার দাম পাঁচ টাকা সের, খাঁটি গাওয়া ঘি, ডুমো ডুমো মাংস, বাদাম পেস্তা কিশমিশ এবং হরেক রকম মশলা, গোলাপ জলে খোয়া খোয়া ক্ষীর, মৃগনাভি সিকি রতি, দশ ফোঁটা অডিকলন, আলু একদম বাদ। চাল আর মাংস প্রায় সিদ্ধ হয়ে এলে তার ওপর দু-মুঠো পেঁয়াজ কুচি মুচমুচে করে ভেজে ছড়িয়ে দিই, তার পর দমে বসাই। খেতে যা হয় সে আর কি বলব!’

(রাজভোগ, পরশুরাম)

তো মাছ ভাত, দুধ ভাত, ডাল ভাত, নিদেন পক্ষে নুন ভাতও জোটে না যখন, বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় ধান, চাল? সে আকালের মর্মান্তিক ছবি এঁকেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অশনি সঙ্কেত উপন্যাসে।

‘বিষ্টুপুর, ভাতছালা, সুবর্ণপুর, খড়িদিঘী প্রভৃতি গ্রাম থেকে ধানচাল জড়ো হয়ে আগে আগে নরহরিপুরের প্রসিদ্ধ চালের ও ধানের হাট বোঝাই হয়ে যেত- সেই হাটের অত বড় চালাঘর খালি পড়ে আছে- এক কোণে বসে শুধু এক বুড়ি সামান্য কিছু চাল বিক্রি করছে।
গঙ্গাচরণ কাছে গিয়ে বলল – কি ধানের চাল?
-কেলে ধান ঠাকুর মশায়। নেবেন? খুব ভালো চাল কেলে ধানের। কথায় বলে-

ধানের মধ্যি কেলে, মানুষের মধ্যি ছেলে-

বুড়ির কবিত্বের দিকে অত মনোযোগ না দিয়ে গঙ্গাচরণ ওর ধামা থেকে চাল তুলে পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। যেমন মোটা, তেমনি গুমো। মানুষের অখাদ্য। তবুও চাল বটে, খেয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচতে পারে।

... মানুষ কি এবার সত্যিই না খেয়ে মরবে? কিসের কুলক্ষণ এসব? পরশুও তো চালের দাম এত ছিল না। দুদিনে ষোল টাকা থেকে উঠল চব্বিশ টাকা এক মণ চালের দর- তাও এই মোটা, গুমো মানুষের অখাদ্য আউশ চালের!’ মানুষের সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষ দেখেই বোধহয় কবি লিখেছেন-

‘সে অন্নে যে বিষ দেয় কিংবা তাকে কাড়ে
ধবংস করো ধবংস করো ধবংস করো তারে।’





Read More »

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.