x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

শনির বচন | প্যাকেজের ফাঁদে

sobdermichil | অক্টোবর ১৬, ২০২১ |
শনির বচন

প্রায় গোটা দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ যখন বন্যায় বিপর্যস্ত সেই সময়ে মহালয়া থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত ছিলেন কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপের উদ্বোধনে। এও এক বড়ো পরিবর্তন। পরিবর্তন দুই দিক দিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষ দেশে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পুজো উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন। এবং হিন্দু শাস্ত্রমতে ষষ্ঠী’র উদ্বোধনের অনেক আগেই মহালয়া থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে বিভিন্ন মণ্ডপের উদ্বোধন শুরু হয়ে যাচ্ছে। পরের দিন থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়। তিন দিনের পুজো অনেক দিন আগে থেকেই ষষ্ঠী থেকে দ্বাদশী পার করে দিয়েছিল। পরিবর্তনের ধাক্কায় ষষ্ঠী থেকে মহালয়ায় এগিয়ে এসেছে। দুগ্গা ঠাকুরের পুজো এখন বারো থেকে চোদ্দ দিনের প্যাকেজ। হ্যাঁ এই প্যাকেজের দরকার আছে বই কি। মানুষ ফুর্তি করবে না? বিশেষ করে ক্লাবে ক্লাবে সরকারী কোষাগার থেকে পঞ্চাশ হাজার করে ফুর্তিভাতা ঢালার পর। মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগের সাফল্যে। এখন ধুমধাম করে লম্বা প্যাকেজে পুজো না হলে কাঁচা টাকা মানুষের হাতে হাতে ঘুরবেই বা কি করে? ফলে এই লম্বা প্যাকেজের সাথে রাজ্যের সাধারণ মানুষের অর্থনীতির প্রশ্নও কিন্তু জড়িয়ে। একটা পুজো মণ্ডপে খাবারের স্টল দিয়েও যদি তিন দিনের বদলে দশদিনও ব্যাবসা করা যায় তবে কত ঘরে মুখে অন্ন ওঠে, সেই হিসেবটাও তো রাখতে হবে। ফলে পুজোর প্যাকেজ যত লম্বা হবে কাঁচা টাকা তত বেশি মানুষের হাতে ঘোরার সুযোজ পাবে। মানুষ অর্থনীতির সোজা হিসেবটায় খুশি থাকে খুব। হাতে নগদ নারায়ণ এসে পৌঁছালেই মানুষ খুশি। দুর্গাপুজোর লম্বা প্যাকেজ আর ক্লাবে ক্লাবে ফুর্তিভাতা সেই বিষয়টিকে সত্য করে তুলতে পেরেছে। জনমানসে সরকারী দলের জনপ্রিয়তার ভিত্তি কিন্তু এই নগদ নারায়ণের দৌলতেই। তোলাবাজি কাটমানি ভাতামানি থেকে শুরু করে পুজো আর উৎসব জুড়ে একটা বড়ো অংশের মানুষের হাতে কাঁচা টাকা ঘুরে চলেছে। বেশ দ্রুত হারে। ফলে চাকরি না থাক। ব্যাবসা বাণিজ্য একচেটিয়া কারবারীদের হাতে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাক। কাঁচা টাকার এই চলাচল যতদিন সচল থাকবে। শাসকদলের জনপ্রিয়তা ততদিন ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাবে সন্দেহ নাই।

এই আলোচনা শাসকদলকে নিয়ে নয়। এই আলোচনা হিন্দু শাস্ত্রমতে দুর্গাপুজার নির্ঘন্ট নিয়েও নয়। এই আলোচনা আমাদের নিজেদেরকে নিয়েই। গ্রামের পর গ্রামে বন্যার জলে মানুষের দিশাহারা দশা। কয়দিন আগেই শহর কলকাতারও বিভিন্ন অংশ ঘন্টার পর ঘন্টা দিনের পর দিন জলমগ্ন ছিল। সেই জল নেমে যেতেই আমরা সব ভুলে ফুর্তিতে মেতে উঠেছি বেশ। আর আমাদের চোখ বানভাসি মানুষের দিকে নেই। টিভি চ্যানেলগুলি কোন মণ্ডপে মানুষের ঢল কত বেশি তাই মাপতে ব্যাস্ত। তারা আর বন্যার জল মাপছে না। আমাদেরও কোন মাথা ব্যাথা নাই বন্যার জল নিয়ে। আমাদের মাথা ব্যাথা মণ্ডপে মণ্ডপে জনজোয়ার নিয়ে। বন্যা দুর্গতের কি দশা হলো। তারা পর্যাপ্ত ত্রাণ সমগ্রী পেল কিংবা পাচ্ছে কিনা। সেই খবরে কার কি দরকার। রাজ্যের মন্ত্রীরা যে যার বারোয়ারি পুজো নিয়ে ব্যস্ত। কার পুজো কাকে টেক্কা দিয়ে যাবে। সব তোড়জোড় তাই নিয়েই। কোথায় কতটা বন্যার জল নামলো। কোথায় কতটা পরিমানে বাঁধ মেরামতির দরকার। কোথায় কাদের বাড়িঘর কি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রয়েছে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই কি করে মেরামত করা কিংবা গড়ে দেওয়া যায় নতুন করে। কোথায় কোথায় চাষের ফসল কতটা পরিমাণে নষ্ট হলো। কৃষকের আর্থিক ক্ষতি পুরণে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। নতুন করে কত দ্রুত কৃষিজমি গুলি পুণরায় চাষের কাজে তৈরী করে তোলা যায়। প্রভৃতি বিষয়গুলি নিয়ে আমাদের কোন ভাবনা নেই। কোনকালেই থাকে না। এই সব বিষয়গুলি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার জন্যেই তো আমরা সরকার গড়ে দিই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে। তারপর আমাদের আর ভাবনা কি। তাই অতিবৃষ্টি ও বন্যায় রাজ্যের ভুক্তভুগী মানুষদের দুর্গতি নিয়ে আমরা শহুরে জীবেরা আদৌ চিন্তিত নই। আমরা ততটুকুই চিন্তায় ছিলাম। যতটুকু জল আমাদের চলাচলের চৌহদ্দীতে দাঁড়িয়ে ছিল দিন কয়েক। সেই জলও নেমে গিয়েছে। আমাদেরও ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। এখন আমরা সকলে পুজোর প্যাকেজেই মশগুল। ফলে সরকারও নিশ্চিতে রয়েছে। মন্ত্রী বিধায়করাও তাই কাঁচি হাতে ঘুরে বেড়ালেন দিন কয়েক। কে কতগুলি পুজোমণ্ডপে কাঁচি চালিয়ে ফিতে কেটে পুজোর উদ্বোধন ঘটালেন। সেটাই আসল কথা।

কিন্তু এই যে পুজোর প্যাকেজ। সাথে তোলাবাজি কাটমানি আর রাজ্যজুড়ে ভাতামানির নানারকমের প্যাকেজ। এই প্যাকেজ কিন্তু একদিন ফুরিয়ে আসবে। সেদিন কিন্তু ঘরে ঘরে অন্ন বস্ত্রে টান পড়তে শুরু করে দেবে। বিশেষ করে আজও যে কয়জনের সরকারী চাকরী রয়েছে। তারা অবসর নিলে। আজও যে কয়জন, একচেটিয়া মুনাফাবাজির ভিতরেও স্বাধীন ব্যাবসা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তারাও একচেটিয়া মুনাফাবাজির করাল গ্রাসে ঢুকে গেলে। তখন কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠবে। বেকার ছেলে মেয়েদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান নেই। কয়কটি শপিংমল আর অনলাইন প্রো‌ডাক্টের ডেলিভারী বয় ছাড়া নতুন কর্মসংস্থান প্রায় শূন্য। সারা ভারত জুড়েই নতুন কোন ভারী শিল্পের পত্তন হওয়ার কোন খবর নেই। সম্ভাবনাও নেই। উল্টে বহু কল কারখানাতেই তালাচাবি পড়ে যাবে। রাজ্যের অবস্থা তো আরও এক কাঠি উপরে। গণ্ডায় গণ্ডায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সন্তানসন্ততিদের ঠেলে দিলেও কর্মসংস্থানের কোন রকম নিশ্চয়তা থাকছে না আর। মানুষের জীবন জীবিকার উপরে তার প্রভাব দিনে দিনে মারাত্মক হয়ে উঠতে থাকবেই। অবস্থা যত মারাত্মক হতে থাকবে পুজোর প্যাকেজ ভাতার প্যাকেজ কিন্তু সেই পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে না কোনভাবেই। ফলে দুর্নীতির প্যাকেজের উপরেই জোর পড়বে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তখন সবচেয়ে বড়ো সমস্যা দেখা দেবে একটা জায়গাতেই। কে কার কাছ থেকে তোলা আদায় করবে? কে কাকে কাটমানি দেবে। কোথা থেকেই বা দেবে। সেই ভাঁড়ার তো শেষ। ফলে শূন্য ভাঁড়ার নিয়ে কাটমানি তোলাবাজি’র অর্থ যোগাবে কারা?

অর্থাৎ আজকের কাঁচা টাকার যোগান কিন্তু যত বেশি মানুষের হাতে হাতেই ঘুরতে থাকুক না কেন। দিনে দিনে সেই টাকার পরিমাণ ক্ষয় হতেই থাকবে। কাঁচা টাকার চলাচলে নতুন সম্পদ গড়ে ওঠে না। নতুন সম্পদ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিমাণে ও সঠিক বিষয়ে লগ্নী। লগ্নীর পরিমাণ যেখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। উল্টে কমতে শুরু করে দিয়েছে। সেখানে নতুন করে কাঁচা টাকার জোগানই বা আসবে কোথা থেকে? তার সাথে যদি যুক্ত হয় পুঁজির নিস্ক্রমণ তাহলে তো আর কথাই নেই। রাজ্যের অর্থনীতি দ্রুতই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে বাধ্য। গত দশ বছরে তার বহু লক্ষ্মণ দেখা দিয়েছে প্রাথমিক ভাবে। বিশেষ করে কেন্দ্র সরকারে জলের দরে সরকারী সম্পত্তি বেচে দেওয়ার কার্ষক্রম রাজ্যের পক্ষে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘায়ের মতো হয়ে উঠবে। অন্তত সেই সম্ভাবনাই সমধিক। এমনিতেই রাজ্যের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা, কোনটাই বাঙালির হাতে নাই। ফলে বাঙালির অবস্থাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হতে বাধ্য। কাটমানি তোলাবাজি আর ভাতামানি দিয়ে সেই সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না ক‌োনভাবেই। না, এসব ভেবে আমাদের আজকের মৌতাত নষ্ট করার পক্ষপাতি নই আমরা। অবশ্যই। একটা ব্যবস্থা হঠাৎই হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ে যায় না। ভেঙে ভেঙে পড়তেও কিছুটা সময় লাগে। যার প্রথম পর্বে ভাঙনের শুরুটা ঠিকমতো টের পাওয়া যায় না সহজে। আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সেই রকমের। তাই বানভাসি মানুষদের দুর্গতির কথা ভুলে শহর নগর জুড়ে উৎসবে মেতে উঠতে আমাদের দুইবার ভাবতে হয় না। তিন দিনের দুর্গাপুজোকে টেনে টেনে বারো চোদ্দ দিনের প্যাকেজে মুড়ে দিলেও আমাদের অসুবিধে লাগে না। বরং উৎসাহ উদ্দীপনা আরও জমে ওঠে। শাসকদলের পিছনে পিছনে আমরাও লেগে থাকতে পারি। নো চিন্তা ডু ফুর্তিতে।

১৬ই অক্টোবর’ ২০২১
Read More »

শনির বচন | প্লেয়িং ইলেভেনে থাকা না থাকা

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

কবি গান বেঁধেছিলেন, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’। কবি জানতেন কিনা জানি না। সেই সোনার হরিণ কালে কালে রূপ বদলাতে থাকে। রামায়ণের যুগ থেকে আজকের রামরাজত্বের যুগেও। এই যুগে সোনার হরিণ যে অবতারে আবির্ভুত, সেই অবতারের হাল ফ্যাশনের নাম কিন্তু ‘প্লেয়িং ইলেভেন’। এতদিন নামটি ঠিক প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয় নি তেমন ভাবে। অন্তত কোন সাংসদ বিধায়ক নেতানেত্রী প্রকাশ্যেই অন ক্যামেরা প্রেস কনফারেন্সে প্লেয়িং ইলেভেনে থাকার জন্য ঝোঁক বায়নাক্কা দরকষাকষি করার কথা স্বীকার করেননি এমনভাবে। প্লেয়িং ইলেভেনে থাকা না থাকা নিয়ে রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয়টি বহু পুরানো‌ যদিও। অন্তত সংসদীয় গণতন্ত্রে আয়ারাম গয়ারামের যুগপর্ব জুড়েই। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে সেই প্লেয়িং ইলেভেনে থাকার বিষয়টি নিয়ে এমন অভুতপূর্ব স্বীকারক্তি কিন্তু এই প্রথম। প্রায় ঐতিহাসিক। মন্ত্রীত্ব, তাও আবার পূর্ণ মন্ত্রীত্বও নয়। হাফ মন্ত্রীত্ব। যে মন্ত্রীত্বে সরকারী ফাইল নাড়াচাড়া করারও শিকে ছেঁড়ে না সহজে। সেই হাফ মন্ত্রীত্বও চলে যাওয়ার বিষয়টি যে আসলেই রিটায়ার্ড হার্টের মতো গুরুতর সমস্যা। সেটিও জানা গেল এই প্রসঙ্গেই। না চোট যে গুরুতর সে কথা মাস খানেক ধরেই মালুম হচ্ছিল আম জনতার। হাফ মন্ত্রীত্ব থেকে ফুল মন্ত্রীত্ব পাওয়া তো দূর। একেবারে এপ্রিলফুল করে রিটায়ার্ড হার্ট করে দেওয়ার মতো আঘাত সামলানো সকলের পক্ষে সম্ভব নাই হতে পারে। সকলের পক্ষে সম্ভব হয়ও না। তাই দলবদলের একেবারে সূচনাপর্বেই প্লেয়িং ইলেভেনে থাকার বিষয়টি পাকা করে ফেলারও দরকার ছিল বই কি। অনেকটা বিয়ের আগে পাকা দেখার মতোনই আনুষ্ঠানিক হলেও গুরুত্বপূর্ণ। সুখের কথা, বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পথেই বিষয়টি আমজনতার কাছে পরিস্কার করে দেওয়ার ভিতর বাহাদুরী আছে বলতে হবে। হ্যাঁ এবারে প্লেয়িং ইলেভেনে ঠাঁই পাওয়া নিয়ে আর রাতের ঘুম বরবাদ করতে হবে না। উল্টে সমর্থক থেকে ফ্যানেদের ভিতরে জনপ্রিয়তার পারদকেও বেশ কিছুটা চড়িয়ে রাখা গেল। ফলে জননেতা না হোক সেলেব্রিটি হিসেবেও খবরের শিরোনাম থেকে নতুন দলের অলিন্দে রাজনৈতিক ফোকাসের কেন্দ্রবৃত্তেও নিজের একটা পাকা আসন তৈরী করে নেওয়ায় সুবিধে হলো বইকি। একেই বলে সোজা ব্যাটে খেলা। আয়ারাম গয়ারামের রাজনীতিতে, কে জানে একটা নতুন ট্রেণ্ড তৈরীর পথরেখা হিসেবে এই ঘটনা একটা স্থায়ি অভিঘাতও তৈরী করতে পারে বইকি।

পারুক বা না পারুক। সে ভবিষ্যতের কথা। আপাতত বঙ্গরাজনীতির রঙ্গমঞ্চ জুড়ে একজন রিটায়ার্ড হা্র্ট সেলেব্রিটি সাংসদের প্লেয়িং ইলেভেনে থাকা না থাকাই বঙ্গ রাজনীতির শিরোনাম। না, সবাই যে এমন সোজা ব্যাটে খেলতে দক্ষ তাও নয়। তাই বলে প্লেয়িং ইলেভেনে ঠাঁই পাওয়ার দীর্ঘ লাইনে রাজনৈতিক মুখের কোন অভাব নেই। এখন প্রশ্ন একটাই। প্লেয়িং ইলেভেনে ঠাঁই পাওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট দীর্ঘ লাইনে বহু আগে থেকেই যাঁরা মানত করে হত্যে দিয়ে পড়ে রয়েছে। তাদেরকে টপকিয়ে এমন সোজা ব্যাটে খেলে দিয়ে বেলাইন করার বিষয়টি সকলেই কি মুখবুঁজে মেনে নেবে? অবশ্য সেটা দলীয় নেতৃত্বের মাথাব্যথার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা ভোটার, কারুরই নাক গলানোর মতো বিষয় নয় সেটি। তবে এমন সোজা ব্যাটে বেলাইন করার ঘটনা সচারচর দেখা যায় কম। সব দলেই সব সরকারেই প্লেয়িং ইলেভেনে ঠাঁই পাওয়া নিয়ে দলীয় নেতানেত্রীদের ভিতর তীব্র রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকে। থাকবে। কিন্তু বিপক্ষ দলের কোন সৈন্য হঠাৎ রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে সহানুভুতির আবেগকে কাজে লাগিয়ে লাইন টপকিয়ে প্লেয়িং ইলেভেনে ঢুকে পড়বে সিং বাগিয়ে। সেটা হয়তো অনেকের কাছেই ততটা অভিপ্রেত ছিল না। থাকার কথাও নয়। কিন্তু নিন্দুকের কথা মতো যে দলে একটাই পোস্ট বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট। সেদলে টিকে থাকার একটাই মন্ত্র, ধৈর্য্য ও সহ্যশক্তি। একটাই পথ, পদলেহন আর তৈলমর্দন। একটাই কর্ম, বাধ্যতা আর মোসাহেবি। তারপর ‘সকলই তোমার ইচ্ছে। ইচ্ছাময়ী তারা তুমি। তোমার কর্ম তুমি করো মা। লোকে বলে করি আমি’। ‘আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী। আমি রথ তুমি রথী। যেমন চালাও চলি আমি’। হ্যাঁ সেইভাবেই, তেমন করে চলতে পারাই টিকে থাকার একমাত্র পথ। দলীয় কর্মীদের জন্য যে অনুশাসন। বিপক্ষ দলের রিটায়ার্ড হার্ট সৈন্যের জন্যও সেই একই অনুশাসন চালাতে গেলে তো আর আয়ারাম গয়ারামের রাজনীতি চালানো যায় না। ফলে আয়ারাম গয়ারামদের জন্য অনুশাসন কিছুটা শিথীল তো করতেই হয় সময় অসময়ে। না হলে চলবেই বা কি করে? আর সেই আয়ারাম যদি আবার সেলেব্রিটি তরুণ তুর্কী হন। যদি এমন সোজা ব্যাটে খেলার দক্ষতা ধরেন। তখন সত্যিই তো আর বলার কিছু থাকে না। সোজাসুজি সরাসরি প্লেয়িং ইলেভেনের নামের লিস্টে নাম টুকে নেওয়া ছাড়া। রাজনীতির নিয়মই যে সেরকম। কোন নিয়মই পরম নয়।

রাজনীতির পরম নীতি একটিই। প্লেয়িং ইলেভেনে থাকা। জনসেবা বা দেশসেবা একটা সাংবিধানিক পরিভাষা মাত্র। আসল কথা একটাই। যেভাবেই হোক আর যেমন ভাবেই হোক। প্লেয়িং ইলেভেনে থাকতে হবে। না, সাইডলাইনে অপেক্ষা করা সকলের জন্য শোভন নাই হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিজ কৃতিত্বেই জনপ্রিয় সেলেব্রিটি। যে জনপ্রিতাকেই রাজনীতিতে ইনভেস্ট করে সাংসদ বিধায়ক হওয়া। সেই ইনভেস্টারকেই যদি সাইডলাইনে বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তবে সে বিশ্বের যত বড়ো বৃহৎ দলই হোক না কেন। জীর্ণবস্ত্রবৎ পরিত্যাজ্য। ফলে যে সেলেব্রিটি এক দলের সাইডলাইন থেকে দলত্যাগ করে অন্যদলে লাইনবদল করবেন। তিনি তো সকলের আগে নতুন দলের প্লেয়িং ইলেভেনে থকার বিষয়টি নিয়ে সঠিক ভাবে দরকষাকষি করে নেবেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। অন্তত ভারতীয় রাজনীতিতে এর বাইরে অন্য কিছু ভাবা যায় কি? ভাবা সম্ভব আদৌ? ফলে এটা নতুন কোন ঘটনাও নয়। নতুন ইতিহাস গড়াও নয়। নতুন যেটি সেটি হলো একটা ওপেন সিক্রেটকে প্রকাশ্য দিবালোকে স্বীকৃতি দেওয়া। হ্যাঁ সেটা একটা বাহাদুরী বটে। সেকথা স্বীকার করতে হবে বইকি। কিসের জনসেবা। কিসের দেশসেবা। জনতার জন্য জনতা নিজেই যথেষ্ঠ। যার যেমন বুদ্ধির দৌড়। সে তেমন আখের গুছিয়ে নিক না। ক্ষতি কি। দেশনেতার কাজ একটাই, প্লেয়িং ইলেভেনে নিজের জায়গাটা পাকা করে নেওয়া। তবেই না জননেতা। তবেই না দেশনেতা। যে নেতা দলের ভিতরেই প্লেয়িং ইলেভেন থেকে ছিটকিয়ে যান। যিনি নিজ দলের প্লেয়িং ইলেভেনেই নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেন না। তিনি যত বড়ো সেলেব্রিটিই হোন না কেন। জনতার কাছে কিন্তু তিনি একটি বাতিল ঘোড়া। জনতার কাছে তাঁর তখন কোন মূল্য নেই। ফলে জননেতা হোক কিংবা দেশনেতা হোক। সেই পর্যায় উঠতে গেলে দল বা সরকার। দুইয়েরই প্লেয়িং ইলেভেনে নিজের জায়গা পাকা করে নিতে হবে। যতদিন সেই জায়গা পাকাপোক্ত। ততদিনই সেই দলের একনিষ্ঠ সেবক রূপে নিজেকে তুলে ধরাই আসল রাজনীতি। যেদিন সেই জায়গা হাতছাড়া হবে। সেদিন আর পিছন ফিরে তাকালে হবে না। যতই ট্রোল শুরু হোক না কেন। যত রকমই মিম তৈরী হোক না কেন। সেসব ভেবে লজ্জার মাথা খেয়ে বসে থাকলে আর জননেতা কিসের? লজ্জা ঘেন্না ভয় তিন থাকতে নয়। নীতি আদর্শ মানবিকতা তিন থাকতেও নয়। রাজনীতি এক অন্য ময়দান। এখানে লক্ষ্য একটাই প্লেয়িং ইলেভেন। সেই বৃত্তে থাকতে পারলেই রাজনীতি। করজোড়ে ভোটারের বাড়িতে দৌড়। আর সেই প্লেয়িং ইলেভেন থেকেই ছিটকিয়ে গেলে আর কোন মুখে জনতার কাছে মুখ দেখানো যায়? না, একবার প্লেয়িং ইলেভেন থেকে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে সাইডলাইনে বসে গেলে। একজন জননেতার পক্ষে সেটাই তার রাজনৈতিক মৃত্যু। কে’ই বা তেমন মৃত্যুর মুখোমুখী হতে চায়? আর আয়ারাম গয়ারামের সংসদীয় রাজনীতির হাঠ যতদিন খোলা থাকবে। ততদিন তো কোন কথাই নেই। দলেরও কোন অভাব নেই। দরকষাকষিরও কোন শেষ নেই। ফলে আয়ারাম গয়ারামদের জন্য সব দরজাই খোলা। সঠিক সময়ে সঠিক দরজায় একটা নক করা শুধু। তারপর ঝালমুড়ির স্মৃতি ঝাপসা হয়ে না গেলে তো আর কথাই নাই। ঝাপসা হয়ে গেলেও অসুবিধা নাই। নতুন করে একবার ঝালিয়ে নেওয়া যেতেই পারে ঝালমুড়ির সুখস্মৃতি।


১৯শে সেপটেম্বর’ ২০২১
কপিরাইট সংরক্ষিত
Read More »

শনির বচন | নাইন-ইলেভেন কুড়ি বছরের খতিয়ান

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

অপপ্রচার মিথ্যাচার ধোঁকাবাজি লোকঠকানো ফেকনিউজ আর মানুষ খুনের কুড়ি বছর। যার গালভরা নাম নাইন-ইলেভেন। না, আজও বিশ্বের কোন তদন্তে কোন আদালতে কোন দেশের আইনে এটা প্রমাণিত হয়ে যায়নি যে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার বিন লাদেন ও তার সংগঠন আলকায়দাই ধ্বংস করেছিল। এটাও প্রমাণিত হয়নি যে বিন লাদেনের সাথে তালিবানদেরও এই ষড়যন্ত্রে কোন যোগ ছিল। এমনকি আজও প্রমাণ করা যায়নি, সত্যিই কোন প্লেন টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে আঘাত হেনেছিল কিনা। কিন্তু বিশ্বের বরেণ্য পদর্থবিদরা এটা বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কোন প্লেনের পক্ষেই টুইন টাওয়ারকে ঐরকম ভাবে তাসের ঘরের মতো ধূলিস্যাৎ করে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয় যদি না আগে থেকেই টাওয়ার দুইটির ভিতরে বিস্ফোরক মজুত রাখা থাকে। কিন্তু প্রায় শতাধিক বিজ্ঞানী যে বিষয়ে নিঃসন্দেহ। সেই বিষয়টিকেও মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় চেপে যাওয়া হয়েছে। কোন আদালত কর্তৃকও কোন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকেও সেই বিষয়ে কোন তথ্য সম্প্রচারিত হয়নি। ফলে আসল সত্যগুলি এই কুড়ি বছর পরেও সাফল্যের সাথে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

না, কিভাবে টুইন টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল। ঠিক কোন কোন দেশ সেই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগত ভাবে কতক্ষণ আগে থেকে জানতেন টুইন টাওয়ার ধ্বংস হতে যাচ্ছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মাস খানেক আগে টাওয়ার দুইটি’র মালিকানা কার নামে বদল হয়েছিল। তিনি টাওয়ার দুইটির বীমা বাবদ কত টাকা লাভ করেছিলেন। সেইসব বিষয় নিয়ে বিগত কুড়ি বছরে যত তথ্য উঠে এসেছে সেই বিষয়ে আজ আমাদের আলোচনা নয়। আগ্রহী পাঠক ইনটারনেট সার্চ করে বিভিন্ন প্রামাণ্যসূত্র থেকে আসল সত্য ও তথ্যগুলির সন্ধান করে নিতে পারেন। আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি। দুনিয়া জুড়ে মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজির সিণ্ডিকেটের রকমসকম। টাওয়ার ধ্বংসের পরপরই ঘোষণা করে দেওয়া হলো বিন লাদেন ও তার সংগঠন আলকায়দা মার্কিন ভুখণ্ডে আত্মঘাতী বিমান হানা চালিয়েছে। না কোন তদন্তের পরে এই ঘোষণা করা হয়নি। ঘটনার আকস্মিকতার ভিতরেই সমস্ত প্রচার মাধ্যম একযোগ বিন লাদেন ও আলকায়দাকে কাঠগড়ায় তুলে দিয়েছিল। কারা কারা বিমান হাইজ্যাক করেছিল। তাদের ঠিকুজিকুলুজি সমেত ছবি ফলাও করে প্রচারিত হয়ে গেল। কি নিখুঁত পরিকল্পনা। এতবড়ো কাণ্ড ঘটে গেল। পুরো টুইন টাওয়ার ভষ্মীভুত হয়ে গেল। অথচ মহম্মদ আটার পাসপোর্ট কুড়িয়ে পাওয়া গেল ম্যানহাটনের রাস্তায়। সেটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল না। এবং অক্ষত অবস্থায় এসে উঠল মার্কিনদের হাতে। সারা বিশ্বকে বেকুব বানানোর অস্ত্র হিসাবে।

আসল গল্পের শুরু তার পর থেকেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই শতাব্দীর সেরা বাণী। হয় আমাদের সঙ্গে থাকো। নয় আমাদের আক্রমণের শিকার হও। অর্থাৎ মার্কিনশক্তির বশংবদ হয়ে তাদের দাসত্ব স্বীকার করে না নিলে মার্কিনশক্তির মিসাইল ও বোমারু বিমানের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে হবে। তা সে, যে দেশ বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। ফলে শুরু হয়ে গেল আক্রমণের অশ্বমেধ ঘোড়ার দৌড়। আফগানিস্তান আক্রমণের সময়ে মার্কিনশক্তি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিল। পৃথিবী থেকে তালিবানদের সমূলে বিনাশ করার কথা। জানিয়েছিল আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার কথা। জানিয়েছিল গোটা বিশ্ব থেকে টেররিজম নির্মূল করার কথা। ইরাক আক্রমণের সময়েও সেই একই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাঁধা গত। সাথে সাদ্দাম হোসেনের গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কারবার ধ্বংসের গল্প। লিবিয়ার গদ্দাফীর বেলাতেও একই কথার এপিঠ আর ওপিঠ। অর্থাৎ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের একটি ঘটনায় এই মার্কিনশক্তি বিশ্বের যেকোন দেশকে যেকোন সময়ে ধ্বংস ও পদানত করে দখল করার অধিকার পেয়ে গেল। আর বাকি বিশ্ব দুইবাহু তুলে মার্কিনশক্তির সেই অন্যায্য অধিকারকেই স্বীকৃতি দিয়ে দিল। একটা ধোঁকাবাজি সারা বিশ্বকেই মার্কিন শক্তির পদনত করে ফেলল। ফলে এক অনবদ্য ধোঁকাবাজিকেই প্রোপাগাণ্ডা হিসাবে চালিয়ে যাওয়া হল দুই দশক ধরে। বিশ্ব টেররিজমের বিরুদ্ধে বিশ্বের একমাত্র রক্ষাকর্তা না’কি মার্কিনশক্তি। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস কেন, গোটা মানব জাতির ইতিহাসে এর থেকে বড়ো ধোঁকাবাজি আর নাই।

বিশ্বরাজনীতির ণত্ব ষত্ব যাঁদের কিছুটা হলেও জানা আছে। তাঁরা জানেন। মার্কিন অর্থনীতি বিগত তিন দশক জুড়ে এই একটি ধোঁকাবাজির উপরেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে টেররিজমের চাষই মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখে। বিশ্বের নানা প্রান্তে যত বেশি টেররিজমের জুজু কায়েম হতে থাকবে। মার্কিন সমরবাণিজ্য তত বেশি ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকবে। আর সেই টেররিজমকে যদি ইসলামিক টেররিজম নাম দেওয়া যায়, তবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের খনিজতেলের বাণিজ্যকে মার্কিনশক্তির নিয়ন্ত্রণে ও স্বার্থে কায়েম রাখা যায় একদিকে। অন্যদিকে গোটা বিশ্বে ইসলামিক টেররিজমের জুজু দেখিয়ে অস্ত্র ব্যাবসার বাজার বাড়িয়ে তোলা যায়। আর এইখানেই নাইন-ইলেভেনের ধোঁকাবাজির আসল কার্যকরিতা। গোটা পৃথিবীকে বেকুব বানিয়ে রেখে দুই দশক ধরে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল লুঠের কারবার। আর অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে টেররিজমের চাষ চালিয়ে অস্ত্রবাণিজ্যের বাজার বৃদ্ধি করে মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখা। আর গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত আত্মপ্রচার আর অপপ্রচার। ক্রমাগত ধোঁকাবাজি আর মিথ্যাচার।

হ্যাঁ, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র আনাও সেইরকমই একটা ধোঁকাবাজি ছিল। আফগানিস্তানের মাটি থেকে তালিবানদের নির্মূল করে বিনাশ করাও সেই রকমই একটা ধোঁকাবাজি ছিল। বিশ্ব থেকে টেররিজম উৎখাত করাও সেই রকমই একটা ধোঁকাবাজি। ঠিক যেমন সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কারবারের অভিযোগও একটা ধোঁকাবাজি ছিল। এবং সব শেষে আফগানিস্তানে তিন লক্ষাধিক সৈন্যসহ আধুনিক সমারাস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও একটা বিপুল ধোঁকাবাজি ছিল। এত বড়ো ধোঁকাবাজি ছিল যে, কেবলমাত্র গাদা বন্দুকধারী হাজার ষাটেক তালিবানী পথে নামতেই সেই তিন লক্ষাধিক সৈন্যের সামরিক বাহিনী বেমালুম ভ্যানিশ! এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র। সেও আর এক ধোঁকাবাজি। ধরে ধরে মার্কিনশক্তির বশংবদ কজনকে একটা পুতুল সরকারে বসিয়ে দিলেই একটা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। মার্কিন বন্দুকের ডগায় নকল নির্বাচন সংঘটিত করলেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় না। না, আফগানিস্তান বা ইরাক। লিবিয়া বা সিরিয়া। কোথাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মার্কিনশক্তির লক্ষ্য নয়। প্রতিটি দেশেই একটা বশংবদ পুতুল সরকার স্থাপন করাই তাদের আসল এজেন্ডা। যে সরকার পেন্টাগনের কথায় দুইবেলা ওঠবোস করবে। মার্কিন অর্থনীতিকে পুষ্ট করতে থাকবে স্বদেশের অর্থনীতিকে শোষণ করে। এটাও মার্কিনশক্তির মূল এজেণ্ডা। সেই এজেণ্ডা সফল করে তুলতে গেলেই ধোঁকাবাজি অপপ্রচার মিথ্যাচার এবং ক্রমাগত ফেকনিউজ ছড়িয়ে লোকঠকানো সবচেয়ে কার্যকরি এক পথ। আর সেই পথের শ্রেষ্ঠ পথিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ঠিক এইদিনে যে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। আজ তার কুড়ি বছর পরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রাখলেই মার্কিন যড়যন্ত্রের বিষয়টি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে।

না, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি। মার্কিনদের বসানো পুতুল সরকার একদিনেই ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। না, মার্কিনশক্তি আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের নিঃশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায়নি। উল্টে সেই তালিবানদের সাথেই চুক্তি করে আফগানিস্তান ছেড়েছে। ছাড়ার আগে তালিবানদেরকে বিনারক্তপাতে কাবুলের মসনদে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এবং সেই দিপাক্ষিক চুক্তি মতোই বর্তমান তালিবান সরকার মার্কিন স্বার্থ পুরণে বাধ্য থাকবে। না, কোন দেশ থেকেই ইসলামিক টেররিজম নির্মূল করা হয়নি। বরং বিশ্বজুড়েই টেররিজমের জাল আরও বিস্তৃত হয়েছে। আর যত বিস্তৃত হয়েছে তত মার্কিন অস্ত্রবাণিজ্য বছর বছর ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ফলে শুধুমাত্র মার্কিনশক্তির স্বার্থে আফগানিস্তান সহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যই আজ প্রায় বিদ্ধস্ত। বিপর্যস্ত জনজীবন। বিপর্যস্ত অর্থনীতি। বিপর্যস্ত শিশুদের ভবিষ্যৎ। এবং বিপদগ্রস্ত নারীদের জীবন ও জীবিকা। ইসলামিক মৌলবাদ আরও বেশি করে শিকড় বিস্তার করেছে। নারী স্বাধীনতার পরিসর আরও বেশি করে সংকুচিত হয়েছে। শিক্ষা বিস্তার রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। ধর্মীয় উন্মাদনা ও মৌলবাদের উত্থান হয়েছে, ঠিক যেমনটা চেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসলামিক দেশগুলিতে ধর্মীয় উন্মাদনা ও মৌলবাদের বিস্তার না ঘটালে তাদেরকে শতকের পর শতক ধরে পাশ্চাত্যের স্বার্থের কাছে বশংবদ করে রাখা যাবে না। ফলে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ঠিক এই দিনে যে ষড়যন্ত্রের শুরু হয়েছিল ওয়াশিংটন ডিসি’র হেডকোয়ার্টার থেকে। বিগত কুড়ি বছরে তারই ফসল ঘরে তুলে ফেলেছে মার্কিণশক্তি ও তার দোসরেরা।

১১ই সেপটেম্বর’ ২০২১

Read More »

শনির বচন | আত্মরক্ষার সহজপাঠ

5 | সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২১ |
শনির বচন

প্রশ্নটা তালিবানরা আফগানিস্তান কিভাবে শাসন করবে তা নিয়ে নয়। আফগানিস্তান একটি বিদেশী রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে কখন কোন শাসক কি ধরণের শাসন ব্যবস্থা প্রচলন করবে সেটা সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিষয়। আমরা সেই শাসন প্রণালী সমর্থন করতে পারি। আবার সমর্থন নাও করতে পারি। কিন্তু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। আমাদের মাথা ঘামানো না ঘামানোর উপরে আফগানদের জীবন জীবিকা ভুত ভবিষ্যৎ কোনটিই নির্ভর করবে না। প্রশ্নটা বরং হওয়া উচিত, আমরা কি আমাদের দেশের বর্তমান শাসকের অধীনে সুখে শান্তিতে এবং সমৃদ্ধিতে রয়েছি? প্রশ্নটা হওয়া উচিত, আমাদের রাষ্ট্র কি আমাদের সংবিধানের আদর্শকে সঠিক মাত্রায় রক্ষা করছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত, যে সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কথা বলা রয়েছে আমাদের সংবিধানে, বর্তমান শাসকশ্রেণী কি সংবিধান নির্দেশিত এই শর্তগুলি যথাযথ ভাবে রক্ষা করে চলেছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত সংবিধান নির্দেশিত সমাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায় অর্থাৎ জাস্টিস কি ভারতবর্ষে অক্ষুণ রয়েছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কি সংবিধান প্রদত্ত ভারতীয় নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংস্কার পালনের স্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং ভক্তি আরাধনার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে সংবিধান নির্দেশিত সকলের জন্য সমান অধিকার ও সমান সুযোগসুবিধে আদৌ কি সুরক্ষিত রয়েছে? হ্যাঁ এই প্রশ্নগুলির প্রতিটির যথাযথ উত্তর পাওয়া এই সময়ের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নগুলি সকলের আগে নিজেকেই করা উচিত। আমাদের ভিতরে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক কি আদৌ এই প্রতিটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে? না, আফগানদের তালিবানী শাসনের খপ্পরে পড়ে কিরকম দুর্দশা ঘটতে চলেছে ভেবে সময় নষ্ট না করে আমদের অবস্থা বর্তমানে ঠিক কিরকম। সেই বিষয়টি নিয়েই বরং ভাবনা চিন্তা বেশি জরুরী।

সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের অধিকার এই সময়ের ভারতবর্ষে কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেটি যে কোন মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করলেই জানতে পারবে। পিছনে কোন রাজনৈতিক দল বা শিবিরের সমর্থন ছাড়া মত প্রকাশের অধিকার যাঁরাই প্রয়োগ করতে গিয়েছেন তাদের একটা বড়ো অংশই রাষ্ট্রের হাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। বিশেষ করে তাঁরা যদি সরকারের বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন তোলেন তো কথাই নেই। সরকার বা সরকারী দলের পক্ষ নিয়ে নিরন্তর ফেক নিউজ প্রচার করে গেলেও কোন অসুবিধে নেই। সরকার বিরোধী পক্ষের রাজনীতি নিয়ে যখন যা খুশি বলে গেলেও কোন অসুবিধে নেই। অসুবিধে শুরু হবে ঠিক তখনই। যখন কেউ সরকারের নীতি রীতি পদ্ধতি’র বিরুদ্ধে মুখ খুলবে। বর্তমান ভারতবর্ষে আদৌ কোন তালিবানী শাসন চলছে না। কিন্তু যে সংস্কৃতি চালু হয়ে গিয়েছে, সেটি হলো। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ততক্ষণই স্বীকৃত। যতক্ষণ সরকারের বিরুদ্ধে কোন কথা উচ্চারিত হচ্ছে না। এদিকে সংবিধান প্রদত্ত অধিকারে প্রতিটি ভারতীয়েরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু সেই সাথে সরকারের হাতেও একটি ব্রহ্মাস্ত্র রয়ে গিয়েছে। সেটি হলো ইউএপিএ। যে আইনের বলে সরকার যে কোন মানুষকেই যে কোন সময় যে কোন অজুহাতে আটক করে দিনের পর দিন কয়েদ করে রাখতে পারে। মাসের পর মাস বছরের পর বছর বিনা বিচারে এই আইনে আটক থাকার পরে যদি কোন ভাবে প্রমাণিতও হয়। সরকার বেআইনী ভাবে কাউকে আটক করে রেখেছিল। তাহলেও সরকারের শাস্তি বিধান সম্ভব নয় এই দেশে। মামলার দীর্ঘসূত্রীতা আর রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তিতে যে কোন সরকারই বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নির্বাচিত সরকার হলে তো আর কোন কথাই নেই। ফলে সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতাই বর্তমান ভারতবর্ষে কতটা সুরক্ষিত, প্রশ্ন রয়েছে সেখানেও। এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতাই যদি লঙ্ঘিত হয়, হতে থাকে। তবে গণতান্ত্রিক পরিসরই ক্রমশ সংকীর্ণ হতে শুরু করে দেয়। গণতন্ত্র মানেই, পাঁচ বছর অন্তর বুথে বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা নয়। গণতন্ত্র একটা অধিকার। যে অধিকারগুলি একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান স্বীকৃত। সেই অধিকারগুলিই যদি রাষ্ট্র কর্তৃক লঙ্ঘিত হতে থাকে। তাহলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হয়। আফগানিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকার কেন তালিবানের সমানে বিনা প্রতিরোধে ভ্যানিশ হয়ে গেল, সেই প্রশ্নের থেকে অনেক বড়ো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের হাতেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে না’তো? না, উত্তর অন্য কেউ দিলে তো হবে না। উত্তর দিতে হবে ভারতবর্ষের নাগরিকদের।

তখন যদি দেখা যায়, না সংবিধান প্রদত্ত সকল নাগরিক অধিকারগুলিই প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত রয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনে। তাহলে অসুবিধে নেই। কিন্তু যদি দেখা যায়, সংবিধান প্রদত্ত সকল নাগরিক অধিকারগুলি প্রত্যেক নাগরিকের জন্যেই সুরক্ষিত নেই। অর্থবান ও ক্ষমতাবান শ্রেণীর মানুষের জন্যেই শুধু সুরক্ষিত। তাহলে কিন্তু অসুবিধে রয়েছে। তখন আফগানিস্তান আর তালিবানের আলোচনায় নিজের দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করে রাখা যাবে না। গণতান্ত্রিক পরিসরগুলি যদি মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য, বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য, বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের জন্যেই কার্ষকর থাকে শুধু। তাহলে বুঝতে হবে ভারতবর্ষের অবস্থা আফগানিস্তানের থেকে খুব একটা ভালো নয়। সেখানেও তালিবান ও তালিবানপন্থীদের জন্যেই সকল অধিকার ও সুযোগ সুবিধে সংরক্ষিত থাকার কথা। অন্তত, সেটাই প্রথম তালিবানী শাসনে ছিল। সেই একই ধারা যদি ভারতেও চলতে থাকে, অর্থাৎ সরকারপন্থীদের জন্যেই সংবিধানের সকল অধিকার সুরক্ষিত। আর বাকিদের জীবনে সাংবিধানিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত নয়। অধিকাংশ সময়ে সেই অধিকারগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই দারস্থ হতে হচ্ছে আইন ও আদালতের। তাহলে কিন্তু বুঝতে হবে, ভারতবর্ষ আর আফগানিস্তানের ভিতরে পার্থক্য খুব বেশি নেই। আফগানিস্তানে হয়তো তালিবানী শাসনে আফগানরা নিরপেক্ষ আদালতের দারস্থ হতেই পারবে না। কিন্তু ভারতে পকেটে পয়সা থাকলে আদলতের দরজায় এখনো কড়া নাড়া যায় অন্তত। কিন্তু একটা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দেশে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বার বার আদালতের দারস্থই বা হতে হবে কেন? জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারেরই তো প্রধান দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে নাগরিককেই যদি তার সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে প্রতিবার আদলতের শরণাপন্ন হতে হয়, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই বলা চলে ভারতবর্ষে এক ছদ্মবেশী তালিবানী সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তালিবান হয়তো একটা বিশেষ দেশের এক বিশেষ রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু তাদের মতাদর্শ তাদের কর্মসংস্কৃতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গী’র মূল কথাই হলো জোর যার মুলুক তার। আর এটিকেই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে তালিবানী সংস্কৃতি। বাকি বিশ্বের আধুনিক সভ্যতার কোন অনুষঙ্গের সাথেই যার কোন সংযোগ নাই। সাযুজ্য নাই। এবং কেবলমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের কেন্দ্রেই সকল সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রীত। আমাদের প্রশ্ন, ভারতবর্ষেও কি এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগের কেন্দ্রে গোটা দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কার্যক্রম ও অভিমুখ পরিচালিত হচ্ছে না? যে কোন দেশ ও সমাজ যদি এই অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকে। তবে সেই সমাজ ও দেশ ক্রমেই কিন্তু বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। এবং সময়ের উল্টোমুখেই ফিরতে থাকবে। আর সামগ্রিক ভাবেই এই গোটা প্রক্রিয়াকেই তালিবানী ধারা বলা যেতে পারে। না, ভারতবর্ষে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। ভারতবর্ষে একটি সক্রিয় সংবিধান রয়েছে। ভারতবর্ষে একটি সক্রিয় বিচারব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে আফগানিস্তানের সাথে ভারতবর্ষের তুলনা চলে না। কিন্তু যে মুহুর্তে নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলি লঙ্ঘিত হতে শুরু করবে, যদি ইতিমধ্যেই করে থাকে। তবে নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষের অভিমুখ আর আফগানিস্তানের অভিমুখের ভিতর দূরত্ম ক্রমহ্রাসমান বলেই বুঝতে হবে। এবং ঘটনাক্রম যদি সেই দিকেই পরিচালিত হতে থাকে, তবে আফগানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে ভারতীয়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দিন সম্ভবত এসে গিয়েছে। এখন দিন এসে গিয়েছে কিনা, বোঝা যাবে কি করে? খুব সহজ উপায়। প্রশ্ন করতে হবে নিজেকেই। পূর্বেই বলা হয়েছে। নিজেকেই প্রশ্ন করে জানতে হবে দেশের সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের হাতে সুরক্ষিত কিনা। কিংবা কতটুকু সুরক্ষিত। সকলের জন্যেই সুরক্ষিত না’কি শুধমাত্র সরকারপন্থী বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্যেই তা সুরক্ষিত। এই সামান্য কয়টি উত্তরই আমাদের জানিয়ে দেবে আমরা ভারতীয়রা তালিবানের খপ্পর পড়া আফগানদের থেকে কতটুকু বেশি ভালো রয়েছি। আফগানদের জন্য আফগানরা ভাবুক বরং। আমাদের ভাবা দরকার আমাদের জন্য। কারণ আমাদের হয়ে অন্য কোন দেশ অন্য কোন জাতি ভেবে দেবে না। ফলে আমরাই যদি অন্যের জন্য ভাবতে বসে নিজেদের অবস্থা নিয়েই ভাবতে ভুলে যাই বা বড্ড বেশি দেরি করে ফেলি। তখন কিন্তু আমাদেরকে রক্ষা করতে কোন বিদেশী শক্তি এগিয়ে আসবে না। আর আত্মরক্ষা প্রত্যেকের জন্মগত অধিকার। কেউ সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। যদি না আমরা নিজে থেকেই সেই অধিকার বিসর্জন দিয়ে বসে থাকি।

৪ঠা সেপটেম্বর’ ২০২১
Read More »

■ রাহুল ঘোষ | ঘুম, ঘোর ও ঘ্রাণের উপকথা

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০২১ | |
শব্দের মিছিল


ঘুমঘোরে আছি। আসলে, ঘুমে নেই। যেটুকু আছি, ওই ঘোরেই। তবুও ঘোরের গায়ে ঘুমের একটা মেঘলা রঙ লেগে থাকে। তাকে ঝেড়ে ফেলা যায় না। অস্বীকার করা যায় না। তাই ঘুমঘোরে আছি। অথবা কোত্থাও নেই! এই যে 'কোথাও'-এর উপরে বাড়তি একটা 'থ', সেটাই এই থাকার বিশেষত্ব। না-থাকারও। ওখানে কিছু অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। অথবা খুব বিস্ময়ে যেন আক্ষরিকভাবেই 'থ' হয়ে গেল একটা মানুষ! স্তম্ভিত। নীরব। এবং অবশ্যই, নিস্তব্ধ। 

ঘোরের মধ্যে একটা গন্ধ লেগে থাকে। নিবিড় পাতার গন্ধ। জীবনের প্রিয় গন্ধগুলি আমি কোনোদিন ভুলিনি। প্রিয় স্বাদ ভুলিনি। গোপন পাতার ঘ্রাণ মেখে ঘুমোতে যাই; মধ্যযাম পার করে। অথবা ঘোরে যাই। ঘোর ঘন হলে, মুখের উপর কার যেন শ্বাস পড়ে! খুব চেনা শ্বাস। আমি তার নোজরিং দেখি। অথবা ঠোঁটের মুদ্রা। সামান্য অসমান দাঁতের ঝলক। অথচ আমার চোখ বন্ধ! ধড়ফড় করে উঠে বসি। যে-সময়ে উঠে বসি, তাকে ভোর বলা যায় না। অথচ রাতও নয়! সে এক অচিন সময়। সময়টাকে চিনতে পারি না। যাকে চিনতে পারি, সে তখন কোত্থাও নেই।

ওই যে বাড়তি একটা 'থ', তার উপরে জীবন জেগে থাকে। এবং মৃত্যুও। অপেক্ষা জেগে থাকে। এবং প্রার্থনাও। কিছু-কিছু অপেক্ষা মরে যেতে-যেতেও, থেকে যায়! যাপিত সময়ের থেকে রসদ নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু অপেক্ষা মানে, শুধু একটা বিশেষ 'কেউ'-এর জন্য নয়। লোকে যেটা সাধারণত ভাবে। একজন 'কেউ'-ও ভেবে রাখে তাই। অথচ অপেক্ষা মানে, বিশেষ একটা কিছুর জন্য। তার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। পরিধিও। একটা কাম্য পরিস্থিতি। যাকে বলে, ডিজায়ারেবল। একটা বিশেষ কেউ সেই চাওয়ার মধ্যে মানিয়ে গেল কি গেল না, সেই প্রশ্ন আলাদা।

অচেনা সময়ে ঘোর ভেঙে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। এখানে আমার একটা উত্তরের বারান্দা আছে। যেখানে উত্তর খোলা ছিল না, সেখানে পশ্চিমে ছিল। সেও কিছুটা উত্তরঘেঁষা। এখনকার বারান্দা থেকে দিগন্তরেখার দেখা মেলে। তবে একটু দূরে। হাইরাইজের বাধা পেরিয়ে। দিগন্তে কখন কোন তারা খসে গেল, তার খবর এই অসুস্থ সময় রাখে না। মানুষের নির্লিপ্তিও না! আমি এই সময়টাকে বুঝি। ভবিষ্যতের গর্ভে সে তার দায় রেখে যাবে। কিন্তু মানুষকে চেনা আজও সহজ নয়। বরং দিনকে দিন জটিলতর। দায় ঝেড়ে ফেলতে সে ভীষণ পটু! অথচ এখনও দিগন্তরেখায় আমার ফেলে আসা সাদা টি-শার্ট ওড়ে। বিষাদের মতো ওড়ে ডেনিমের ঘন নীল। একটা তামাটে রঙের উঠোন। দুটো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাত। শুধু মুখদুটো কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না বলে, চশমার দিকে হাতড়াই। এই ঘটনাক্রম দেখেই একদিন জন্মান্তরে বিশ্বাস এসেছিল।

তবুও মানুষ মূলত আত্মকেন্দ্রিক। কোনো আকুল আক্ষেপ থেকে উৎসারিত ত্রুটির ক্ষমা জানে না। অন্যায্য অন্যায়ে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার পাপ করে। তবুও কোনো অনুতাপ জানে না! চেনাজানা অপেক্ষার সঙ্গে তাই সে নিজের মনোভাবকেই জড়ায়। তাই তার মনে হয়, অপেক্ষার আর কোনো মানে নেই। এই অপেক্ষা অকারণ। আমি তাকে দোষ দিই না। এও এক পেরিফেরাল ভিশন। যার দেখার পরিধি যতটা। এখানে বিরোধের কোনো ব্যাপার নেই। আমি তার ওইসব ক্ষুদ্রতাকে উপেক্ষা করতে জানি। আমি কিছু নাভিজল চিনি। বিদায়লগ্নের চুম্বনগন্ধ চিনি। আমার ঘুমের গায়ে ওইসব বিচ্ছিন্ন বাস্তব লেগে থাকে। আমি এই বিধ্বস্ত সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখেছি। আমার ঘোরের গায়ে স্বপ্নসন্ধানী ভবিষ্যৎ লেগে থাকে।
Read More »

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.