x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১

■ চিন্ময় ঘোষ | সন্ত্রাসের আগুন পুড়িয়ে দিচ্ছে মাতৃমুখ

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

সরাসরি রাজনীতির বিষয়বস্তু আমার আলোচ্য নয়। বা রাজনৈতিক মতান্তরের বিষয়টিও এখানে উপজীব্য নয়। কিন্তু ভাষার শরীরকে যুযুধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলি যখন কর্দমাক্ত করে, তা যদি মাত্রাতিরিক্ত​ হয়ে সহ্যসীমার বাইরে চলে যায় তখন তো আর চুপ করে বসে থাকা যায়না। বর্তমানের ভোটসর্বস্ব রাজনীতির আঙিনায় ভাষার, বিশেষত মাতৃভাষার, ও শব্দের অপব্যবহারে কী ভয়ানক রকম অনাচার ও অনাসৃষ্টির​ কারবার চলছে, সেই ভেবে শিউরে উঠতে হয়! ঠেকপ্রিয় বাঙালির ঠেকের ভাষাকেও তা হার মানিয়ে দেয়। এইখানে ক্ষমতাসীন​ অথবা​ বিরুদ্ধপক্ষ উভয়ই প্রতিযোগিতায় পরস্পরকে ছাপিয়ে​ যেতে চায়।​

​তাই ভোট সর্বস্ব রাজনীতির সৌজন্যে আমাদের এই সময়কালে​ অদম্যভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসংযম ও অসহিষ্ণুতা। তার জাঁতাকলে পড়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র ভাষা সন্ত্রাস! রাজনীতির বিতর্ক ও বক্তব্যে মানুষের জীবনের যা যা প্রয়োজন সেই সমস্ত বিষয়সমূহ চলে যাচ্ছে পিছনের সারিতে। এমনকি রাজনৈতিক যুক্তিতর্ককে উহ্য রেখে সরাসরি ব্যক্তি আক্রমণই প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই আক্রমণের ভাষা কোথাও কোথাও এমন কদর্য ও কুরুচিকর যে তা শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের সব সীমাকে অতিক্রম করে যায়। ভাবতে অবাক লাগে, সহনশীলতা এতো মাত্রায় কমে গেছে যে ' তুই-তো-কারি ' পর্যন্ত রাজনীতির মঞ্চে অক্লেশে জায়গা করে নিয়েছে।​
​রাজনৈতিক​ পরিমণ্ডলে প্রায় গোটা দেশের সঙ্গে আমাদের বাংলাতেও এই ভাষা হন্তারকদের ভীষণ দাপাদাপি। অকথ্য কুকথার বিষ ছড়িয়ে বেশ হাততালি পাওয়া যায়। পাবলিক খুব খাচ্ছে, এবং খাচ্ছে বলেই বেশ হিরো হিরো ভাব জাগে বক্তার মনে। লড়াইটা রাজনীতির কিন্তু​ বক্তব্যের লড়াইয়ে রাজনীতিহীন কথাবার্তার রমরমা।
রাজনৈতিক যুক্তিতর্কসহ আক্রমণের বদলে সৌজন্যের চূড়ান্ত সীমারেখা লঙ্ঘন করে শুরু হয়েছে ব্যক্তি কুৎসা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তি আক্রমণ। রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে তীক্ষ্ণ শাণিত এবং যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক এখানে ব্রাত্য। বরং রুচিহীন ও বিকৃত মনোভঙ্গিতে যথেচ্ছভাবে কুরুচিকর শব্দের প্রয়োগ করে সেই আক্রমণ শানানো হচ্ছে। এইভাবে ভাষার কৌলিন্যের অবক্ষয় এবং যথেচ্ছ তার অপপ্রয়োগ, বিশেষ করে, বাংলা ভাষায় নানা কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার আমাদের এই সুন্দর রত্নগর্ভ ও মধুরতম ভাষার গায়ে কালিমা লেপন করছে। সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে​ নানারকম শব্দ-বন্ধের জন্ম দেওয়া হচ্ছে। মিডিয়ার কল্যাণে বেশ হৈচৈও জমে উঠছে। বহুল প্রচারিত সেইসব শব্দব্রহ্মের নমুনার উল্লেখ এখানে নাই বা করলাম।​

​মুস্কিল হলো, মাঠময়দানের রাজনীতির চৌহদ্দি পেরিয়ে ইত্যাকার রুচিহীন শব্দ ও বাক্য সমূহ সংসদীয় রাজনীতির চত্বরেও ঢুকে পড়ছে। অসংযমী এই অনাচার ও ভাষা বিকৃতিকে বেশকিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন এবং এ ব্যাপারে দিব্যি তিনি তাঁর নিজস্ব পেটেন্টও দাবি করতে পারেন! এইসব ব্যক্তি সমস্তরকম শিষ্টাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁদের অসংযত আস্ফালনকে নিম্নতর রুচির আবহে টেনে এনে তীব্র ভাষা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছেন এবং এঁদের আচরণ ও বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান বা পুরাণের পরম্পরাগত কোন শিক্ষাই এনারা গ্রহণ করতে পারেননি।​

​সোশ্যাল মিডিয়ার জগতও এই ধরনের ব্যাধি ও সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্ত নয়। এই ব্যাধির সংক্রমণ এ ক্ষেত্রেও বেশ তীব্র। বিশেষ করে পরিমণ্ডলটি যদি রাজনীতি কেন্দ্রিক হয়। এখানেও যুক্তি আর সহনশীলতার বদলে অপছন্দের মত ও​ বক্তব্যকারীকে অশালীন ভাষায় এমন কি নানা অশ্লীল শব্দ দিয়ে বিশ্রীভাবে আক্রমণ করা হয়। সে সব ভাষা ও শব্দ না উচ্চারণযোগ্য না লেখার যোগ্য। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালগুলিতে তা আকছার ঘুরে বেড়াচ্ছে। বুঝতে পারিনা এরা কারা? ন্যুনতম রুচিও কি এদের নেই! ভিন্ন মত ও উক্ত মত পোষণকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওরা এতো অসহিষ্ণু কেন? কারণে অকারণে নানান অশ্লীল এবং কুরুচিকর শব্দের এমন যথেচ্ছ ব্যবহার কেন! সোশ্যাল মিডিয়ার জগত তো তাদের একার নয়, তবে এভাবে কেন তাকে কলুষিত করা! কষ্ট লাগে, যখন দেখি আমাদের পরমপ্রিয় গৌরবমণ্ডিত সুন্দর​ মাতৃভাষাকে কিছু দুর্বৃত্ত বিকৃত মানসিকতা নিয়ে এইভাবে নষ্ট করছে। বাঙালির দুর্ভাগ্য, কারণ এখানেও সেই এক -​ প্রকৃত শিক্ষার আর রুচিশীল মানসিকতার​ অভাব।​ সুতরাং মাতৃভাষার সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করবার​ দায়, তা যে কি এবং কেন, এদের চিন্তা চেতনা এবং স্বভাবগত ভাবনার​ হিসাবের মধ্যেই থাকেনা।​

​সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করবার​ আরও একটি দিক এই প্রসঙ্গে উল্লেখনীয়। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার বাসনা, পরিচিতি বাড়ানো আর ভাব বিনিময়ের এক সহজলভ্য উপায় হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা আজ সর্বজনবিদিত। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ইদানিং সাহিত্য চর্চার হিড়িক যেভাবে বাড়ছে একদিকে তা যেমন আনন্দদায়ক, অন্যদিকটি আবার তেমনই আশঙ্কা ও অপ্রীতিকর। কারণ, বিভিন্ন​ ধরনের লেখা তা সে গল্প, কবিতা বা অন্যান্য গদ্য যাই হোক, এখানেও লেখকের এবং পাঠক হিসাবে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মন্তব্যে বাংলা বানানের ভুল বা বিকৃতি চোখ এবং মনকে খুবই পীড়া দেয়। সাহিত্যানুরাগ ও সাহিত্যপ্রীতি অবশ্যই সুখের বিষয়। এতে ব্যক্তি-মন ও সমাজ-মন পরিশীলিত হয়ে ওঠে, বাংলাভাষার চর্চারও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু অনেকেই সেইসব লেখায় অযাচিতভাবে ভুল বানানের প্রয়োগ ঘটান। তাতে করে আমাদের প্রিয় মধুরতম এবং রত্নগর্ভ যে মাতৃভাষা তার প্রতি অযত্ন ও অবহেলার দিকটিই প্রকট হয়ে ওঠে। এই ধরনের অযত্ন পরিলক্ষিত হলে তা অবশ্যই হৃদয়কে ব্যথিত করে। ভয় হয়, পরবর্তী প্রজন্ম এই ভুলগুলিকেই সঠিক বলে ভাবতে​ অভ্যস্থ হয়ে পড়বে নাতো!
Read More »

■ শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় | ভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল


রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দু নিয়ে জোরাজুরি, তার জেরে বাংলাভাষার দাবি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন, ২১ ফেব্রুয়ারির ভাইয়ের রক্তে রাঙা ও দিনটির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতির ইতিবৃত্ত সবার কমবেশি জানা। কিন্তু প্রচলিত আলোচনায় যে দিকগুলো অনুল্লেখিত থেকে যায়, সেই পটভূমির দিকে একটু তাকানো যাক।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা স্বাধীনতার কিছুদিন পরেই পরেই করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্তাল হয়। কিন্তু পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয়তালিকা থেকেই বাদ দেয়। সেই সঙ্গে মুদ্রা ও ডাকটিকিট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজ়লুর রহমান মালিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর তড়িঘড়ি বিশাল প্রস্তুতি নিলে, তাতে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি বিশাল ছাত্র-সমাবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়। এই লক্ষ্যে ঢাকায় চলে ছাত্রদের মিছিল ও সমাবেশ। সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ বলেন যে, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ ‘নিরক্ষর’ ও যাবতীয় সরকারি পদের জন্য ‘অনুপযুক্ত’ হয়ে পড়বে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয়।

এরপর ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজী ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন ‘গণপরিষদ’ (Assembly member​ ) সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ইংরেজিতে দেওয়া বক্তৃতায় পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু নাগরিকের ভাষা হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন এবং সরকারি কাগজেপত্রে বাংলা অপসারণ করার কড়া প্রতিবাদ জানান। পার্লামেন্ট সদস্য প্রেমহরি বর্মণ, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। কিন্তু তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান গণপরিষদের (Constituent Assembly of Pakistan) সকল মুসলিম লীগ সদস্য এমনকি বাঙালী সদস্যরাও একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। খাজা নাজ়িমুদ্দিন সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, “পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক”। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মতে প্রস্তাবটি পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা হিসাবে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে”। শেষপর্যন্ত সংশোধনীটি গণপরিষদের ভোটাভুটিতে বাতিল হয়ে যায়। সংসদীয় দলে আপত্তির কারণেই বাংলাভাষী মুসলিম সদস্যরা সেদিন ধীরেন্দ্রনাথের প্রস্তাবের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র পরিক্রমায় সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। শেখ মুজিবর রহমানের অন্যতম সহযোগী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার দত্তকে পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনার ময়নামতী শিবিরে নৃশংস বর্বরতা সহ্য করে মরতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ভাষা আন্দোলনের প্রচলিত ইতিহাসে হিন্দু যোদ্ধাদের নাম খুঁজেই পাওয়া যায় না, যদিও বাংলাভাষার দাবি প্রথম তারাই উত্থাপন করেছিল বলে পাকিস্তানি সেনার অকল্পনীয় নৃশংসতা ও গণহত্যার শিকার হয়েছিল হিন্দু বাঙালীরাই।

যাই হোক, গণপরিষদে ঘটা ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বা তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের পড়ুয়াদের উদ্যোগে শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে। ২৯ ফেব্রুয়ারিও ধর্মঘট ঘোষিত হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফজ়লুল হক’ হলে ছাত্র-বুদ্ধিজীবিদের এক সমাবেশ-সভায় দ্বিতীয়বারের মত “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” (National Language Action Committee) গঠন করে ধর্মঘট কর্মসূচী গৃহীত হয়। সেইমতো ছাত্ররা ১১ মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানায়।

এর জেরে চলে ব্যাপক ধরপাকড় ও অবদমন। ১১ মার্চ নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১২-১৫ মার্চ চলে টানা ধর্মঘট। বেগতিক দেখে ১৫ মার্চ ১৯৪৮ খাজা নাজ়িমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। দুই পক্ষের মধ্যে ৮ দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে গ্রেফতারকৃত বন্দীদের মুক্তি, পুলিশের অত্যাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া, সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারের এই নমনীয়তার কারণ ছিল ১৯ মার্চ জিন্নাহ্'র ঢাকা আগমনের আগে পরিস্থিতি শান্ত রাখা। কিন্তু পাকিস্তানের স্থপতি ও গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ তাঁর প্রথম পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (অধুনা সোহ্রাবর্দি উদ্যান) তাঁর গণ-সম্বর্ধনায় বক্তৃতা রাখতে গিয়েই ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনও ভাষা নয়” [“State language of Pakistan is going to be Urdu and no other language]. খাজা নাজ়িমুদ্দিনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে একপেশে এবং চাপের মুখে সম্পাদিত বলে প্রত্যাখান করে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে রেডিও সম্প্রচারেও।

এই অসন্তোষের মধ্যে মওলানা আকরাম খানের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি’। ১৯৫০ সালের ৬ ডিসেম্বর এই কমিটি আবার ভাষা সংঘাত সমাধানের লক্ষ্যে এক বিচিত্র সুপারিশ করে – বাংলাভাষাকে আরবি হরফে লেখা। ভাগ্যিস ১৯৫৮ সালের আগে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। এই টানাপোড়েনে পেরিয়ে যায় দুই বছর। একদিকে পুলিস-প্রশাসনের বল প্রয়োগ, আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি; আর অন্যদিকে মুসলিম লীগের হামলা, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, মানবাধিকার হরণ। এই পরিস্থিতিতেই কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক – সমাজের সব স্তরের বাঙালীর মধ্যে অসন্তোষের বারুদ জমতে থাকে, যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি যখন পাকিস্তানের প্রথম বাঙালী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজ়িমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে জিন্নার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত তখন থেকেই, যা শুধু পূর্ববঙ্গে মাতৃভাষার অধিকারই ছিনিয়ে আনে না, মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে জন্ম দেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির।​

Read More »

■ সুব্রত ভট্টাচার্য্য | বিদ্যাপতি - বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরস্মরনীয় প্রত্যয়

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

সাধারনত: কোন যৌক্তিক বিবেক চিন্তাধারার কলাত্মক প্রকাশই হলো সাহিত্য যেখানে মানবিক আবেগ যেমন; সুখ, দু:খ, ভালোবাসা, আনন্দ, খুশি, ঘৃণা এবং সৌন্দর্য্যের প্রকাশ কোন এক ভাষার স্পর্শ দ্বারাই সম্ভব৷ খ্যাতিনামা চিন্তাবিদগণ বিশ্বাস রাখেন যে যদি মানুষ ভাষার প্রতি সম্পুর্ণ বোধ রাখে, তাহলে মনুষ্য-জড়িত সমস্যার​ প্রায় বেশির ভাগ অংশেরই সমাধান হয়ে থাকে৷ একমাত্র ভাষায় হলো মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, শৈক্ষিক এবং পেশার মুখ্য শক্তি৷ মানুষ তার অভিজ্ঞতাকে যেমন; আবেগ, প্রেম, ঘৃণা, আশা, শক্তি, জয় এবং দূঃখকে ধ’রে রাখার জন্য বিভিন্ন​ মাধ্যম অবলম্বন​ করেছেন;​ যেমন; সঙ্গীত, চিত্রাঙ্কন, মুর্তিকলা, লেখনী প্রভৃতি আর এই সবের মুলে ভাষা বোধের প্রয়োজন অপরিহার্য্য​ ঠিক যেমন​ জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য্য​ ৷​ সামাজিক জীবনকে একমাত্র সাহিত্যই প্রতিনিধিত্ব করে। সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব-মনের সৌন্দর্য্যকরণ এবং নিশ্চিত জ্ঞানের উপলব্ধি৷ যেহেতু সাহিত্যের প্রকাশ ঘটানোর জন্য প্রয়োজন কলা, সুতরাং সমস্ত কলাই হচ্ছে মানবজীবনের সৌন্দর্য্যের এবং সত্যের ভাব প্রকাশ আর এই ভাব প্রকাশের জন্য ভাষায় হলো একমাত্র অস্ত্র। এই অস্ত্রের সৃষ্টি বিশেষ কোনো সংবেদনশীল মহীয়ান মানব আত্মার দ্বারাই হয়েছে।

UNESCO-এর তত্তাবধানে​ "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" পালন করার জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে নির্ধারিত করা হয়। তাই, বঙ্গবন্ধুরা এই দিনটিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার জন্য​ "আ-মরি বাংলা ভাষা" - এই মাতৃভাষার সৃষ্টিকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ ক'রে ঐ সমস্ত মনিষীদের স্মরণ করার সৌভাগ্য পেয়ে থাকেন।। এই বাংলা ভাষার সৃষ্টির কথা উল্লেখ করতে হলে, অনেক সংবেদনশীল মহীয়ান মানব আত্মা আমাদের জীবনে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত এবং তাঁদের মধ্যে বিদ্যাপতি হলো এক অন্যতম​ এবং সেই সুত্রে​ উনাকেই শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও স্মরণ ক'রে উনার কৃতিত্ব প্রদর্শনের​ প্রতি দৃষ্টিপাত করা হলো।

‘বিদ্যাপতি’ শব্দটীর বাংলা আক্ষরিক অর্থ যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে এই রকম দাঁড়ায়-বিদ্যাকে পরিচালিত করার দক্ষতা য়ার মধ্যে বিদ্যমান, তাকেই বলা হয় বিদ্যাপতি৷ যেমন সৈন্যদের পরিচালককে বলা হয় সেনাপতি, কোন বিচারকে সার্বজনীন ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষমতা যার থাকে, তাকে আমরা বলে থাকি বিচারপতি, ইত্যাদি৷ ‘বিদ্যাপতি’ নামে কোন এক সংবেদনশীল মানব আত্মার পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়তো একটা ঐশ্বরিক পুর্ব পরিকল্পিত যোজনা, কারণ কোন ব্যক্তির নামের সঙ্গে কর্মের সামঞ্জস্যতার অনুরূপ মিলন সাধারণ ক্ষেত্রে একটি দুর্লভ অভিজ্ঞতা৷

যদিও বাংলা ভাষার উৎস ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা সংগোষ্ঠীর শাখা ইন্দো-আর্য, বিদ্যাপতির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে অবদান, তার ফলস্বরূপ উনাকে বাংলা ভাষার জনক হিসাবে গন্য করা হয়েছে৷ ভাষা রচয়িতা হিসাবে বিদ্যাপতির স্থান ইংরাজী সাহিত্য রচয়িতা শওসারের(Chaucer) অনুরূপ৷

বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির অনুমানিত জীবন কাল হলো ইংরাজীর​ ১৩৫২-১৪৪৮​ সাল এবং জন্মস্থান হলো বিহার রাজ্যের মিথিলায় অবস্থিত মধুবনী গ্রামের এক ব্রাহ্মন পরিবারে৷ তিনি রাজা শিব সিংহের রাজদরবারের সভাকবি ছিলেন এবং সেই জন্য তাঁর দ্বারা রচিত পদাবলীর ভনিতায় শিবসিংহ এবং উনার পত্নী লছিমাদেবীর নাম যুক্ত হয়েছে৷ কবি প্রতিভাকে প্রদর্শন করার যে উপযোগী অসাধারণ বুদ্ধি ও অনুভূতির প্রয়োজন তার পরিচয় বিদ্যাপতির দ্বারা রচিত কাব্য গ্রন্থ হলো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ এক বার রাজা শিব সিংহ যখন মুঘল শাসকের দ্বারা কারারুদ্ধ হন তখন বিদ্যাপতি তাঁর রচিত কবিতার দ্বারা মুঘল শাসকের মন জয় করেন এবং রাজাকে মুক্তি দেওয়ান৷

কালীদাসের সংস্কৃত ভাষায় রচিত কাব্যগ্রন্থ “কুমারসম্ভবম” এবং জয়দেবের “গীত গোবিন্দ পদাবলী” রচনার পরেই সাহিত্য জগতে স্থান পায় “বিদ্যাপতি পদাবলী” যেটা তিনি মৈথিলী ভাষায় রচনা করে ছিলেন৷ মৈথিলী ভাষা হলো বাংলা এবং হিন্দী ভাষার সংমিশ্রন যেখানে অধিকাংশ শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকেই প্রয়েোগ করা হয়েছে৷ বিদ্যাপতির পদাবলী হলো তাঁর দ্বারা রচিত শত-শত কবিতার সংগ্রহীত কাব্যগ্রন্থ যেটার মুল বিষয়বস্তু হলো ব্রজের গ্রামীণ কিশোরী রাধা এবং ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণের মধ্যে রঞ্জিত বিভোর প্রেমালেখ৷ বিদ্যাপতি যদিও প্রবাসী বাঙালী ছিলেন, প্রথমে কিন্তু তিনি মৈথিলী ভাষায় প্রেম সম্বন্ধীয় সঙ্গীত ও কবিতা রচনা করেছেন৷ আজও বিহার বাসীগণ তাঁদের বিবাহ মন্ডপে বিদ্যাপতি রচিত লোকগীত তাঁদের জীবনের একটা আনন্দের উৎস হিসাবে গন্য ক’রে থাকেন৷

প্রেম এবং ভক্তি বৈষ্ণব ধর্মের মুল নীতি হওয়াতে কবি জীবনের প্রারম্ভ কাল থেকেই বিদ্যাপতি মনে-প্রানে মানব প্রেম এবং ঈশ্বর প্রেমকে কামনা করেছেন৷ প্রেম ছাড়া মানুষের মূক্তি সম্ভব নয় – এরকম একটা ধারনা তাঁর জীবন দর্শনের অন্তর্গত৷ বাংলা প্রণয় কবিতায় ইন্দ্রিয়জ আবেগের এক অকুন্ঠ হৃদয় প্রকাশ তাঁর রচিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং শিব-দূর্গার ঈশ্বর প্রেমকথা থেকে বিদ্যাপতির উপরোক্ত দার্শনিক চিন্তাধারার পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি৷ বিদ্যাপতি প্রেম নিবেদনের প্রতি নিজেকে গভীর বিভোরের মধ্যে নিমাজ্জিত করেছেন যার প্রমাণস্বরুপ আমরা পেয়েছি বিদ্যাপতী পদাবলী৷ বিদ্যাপতির প্রেম ও ভক্তির প্রতি যে ঝুকায়মান প্রবণতা সেটাকে বিশ্লেষণ করলে ঠিক এরকম দাঁড়ায় – যেমন পাখীর জন্য পাখা, মাছের জন্য জল, বাঁচার জন্য জীবন ঠিক তেমনি আমার জন্য তূমি৷

যেহেতু রাজনীতি এবং ধর্ম মনুষ্য জীবনের আদর্শতাকে প্রতিফলিত করার দূটো মুখ্য অস্তিত্ব, বিদ্যাপতি তাঁর রচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় জ্ঞানের প্রদর্শন দিয়েছেন তাঁর পৌরাণিক প্রণয় সম্বন্ধীয় লোক কথার মাধ্যমে৷ বিদ্যাপতি তাঁদের জন্যই লিখেছেন যাঁদের স্বপ্ন এবং আশা অমরণশীল৷ ভারতীয় সাহিত্যে তাঁর অবদান অপরিমেয়৷ মহান–মহান লেখক এবং কবিগনের দ্বারা বাংলা ভাষা পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেয়েছে যার প্রমান আমরা পেয়েছি বিদ্যাপতি পদাবলীর ভাষা রুপান্তরনের মধ্য দিয়ে৷

ডক্টর আনন্দ কে. কুমারস্বামী – একজন মহান ভাষাবিদ, ইতিহাসকার, দার্শনিক এবং ভারতীয় সাংস্কৃতির খ্যাতিনামা বিদুষী, বিদ্যাপতির কবিতা এবং সঙ্গীতের প্রতি চৌম্বকের ন্যায় আকৃষ্ট হন এবং বিদ্যাপতি পদাবলীকে​ ১৯৪১সালে ইংরাজী ভাষায় রুপান্তরিত ক’রে সারা বিশ্বে পাঠক প্রেমীদের স্মৃতিকে করেছে জাগৃত এবং মুগ্ধ৷

পূর্বভারতীয় সাহিত্যের প্রতি বিদ্যাপতির প্রেম ও ভক্তি সমায়িত কবি প্রতিভা প্রবাহের প্রকাশতীব্রতা যে কতটা উচ্চমানের নৈতিক ধারক সেটা তাঁর দ্বারা প্রনীত “পূরুষ পরীক্ষা”, “দুর্গাভক্তি তরঙ্গীনি”, “বিবাদ সার” এবং অন্যান্য গীতমালা থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি৷ এমন-ই একটা গীত নমুনা প্রিয় পাঠক প্রেমীকদের কাছে তুলে ধরা হলো, যেটার দ্বারা ঘরোয়া পল্লী সমাজ চিন্তাধারাকে মৈথিলী ভাষার লোককথার মাধ্যমে বিদ্যাপতির হিন্দূ প্রেমীকদের হৃদয়ে এক অফূরন্ত প্রেমানন্দের গুঞ্জন প্রলেপ প্রদান করেছেন আর এই গুঞ্জন প্রলেপের উৎস​ যে প্রকৃতি সেটাও এই গীত নমুনাতে কবি বিদ্যাপতি বসন্তের মধুর আবওহাওয়ার দ্বারা মনকে সিঞ্চিত ক’রে প্রমান করেছেন:

‘নব বৃন্দাবন, নবীন তরুগণ,
নব নব বিকশিত ফুল৷
নবীন বসন্ত নবীন মলয়ানিল
মাতল নব অলিকুল৷
বিহরই নওল কিশোর৷
কালিন্দী-পুলিন-কুঞ্জ নব শোভন,
নব নব প্রেম বিভোর৷
নবীন রসাল-মুকুল মধু মাতিয়া
নব কোকিলকুল গায়৷
নব যুবতীগণ চিত উময়তাই
নব রসে কাননে ধায়৷
নব যুবরাজ নবীন নব নাগরী
মিলয়ে নব নব ভাতি৷
নিতি নিতি ঐছন নব নব খেলন
বিদ্যাপতি মতি মাতি৷’

১৮৮৪ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রথম আত্মকথা “ভানুসিংহের পদাবলীর” রচনা করেছেন যেখানে ১৫-টি পুরাতন এবং ৬-টি নূতন কবিতাকে সংযোজিত করা হয়েছে৷ রবি ঠাকুর এই সমস্থ কবিতা গুলো রচনা করার সময় বিদ্যাপতির কবিতা রচনার যে ভাবাত্মক ছন্দ সেটাকেই অনুস্মরন করেছেন আর এই কবিতাগুচ্ছের মধ্যে প্রথম কবিতাটা হলো – “সজনিগো-শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা” এবং দ্বিতীয় অন্যতম শ্রেষ্ট কবিতা হলো – “গহন কুসুম-কুঞ্জ মাঝে”, সুতরাং, অষ্টোদশক শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে, রবি ঠাকুরের রচিত ভানুসিংহের পদাবলীর দ্বারা বিদ্যাপতি পদাবলীকে প্রতিনিধিত্ব এবং উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আনন্দ কে. কূমারস্বামীর দ্বারা বিদ্যাপতি পদাবলীর ভাষা রুপান্তরন – সাহিত্য জগতে এটাই উপপাধিত করে যে চতুর্দশক শতাব্দীর কবি বিদ্যাপতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় প্রত্যয়৷

Read More »

শ্রীগোপী

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত

শব্দের মিছিল

হঠাৎ করেই যেন আমরা মুসলিম । তেমনি দুম করে আমরা হিন্দুও। ঠিক এমন করেই খুব দ্রুত বাঙালিও হয়ে উঠলাম। নতুন করে  আজ শেখ মুজিবের আদর্শে অনুপ্রাণিতও হলাম। এযেন ম্যাজিক। 

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং পেশীর প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি  রাজনৈতিক কারবারিরা  'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? 

সাধারণ ছাপােষা মানুষ  এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত।  এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?


শ্রীগোপী
উত্তরবঙ্গ



Read More »

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

■ ২২

ক্ষেমা আর খুয়া দুজনেই অত্যন্ত চিন্তা গ্রস্ত হয়ে ওঠে। ওদের দলের দুজন কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিরি কে দেখা যাচ্ছে না। কিরি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? মা আর মেয়ে দুজনে দুজনের দিকে আকায়। পূষন এই সময় তাদের ফেলে কেন শত্রু পক্ষের ছেলেটার পেছনে দৌড় দিল বুঝে উঠতে পারছে না ক্ষেমা। শিষ দিয়ে বারিক আর অন্য মেয়েদের সতর্ক করে ক্ষেমা। কিরিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেটা জানায়। আদোয়ার আহত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে খুয়া চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে তাদের অন্য দুজন কোথায় পালিয়ে গেছে।তারা খুয়ার কথার উত্তর দেয় না। ওদের কথা কি বুঝতে পারছে না লোকগুলো ,নাকি বলবে না। ক্ষেমা স্থির চোখে তাকায়। হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। উঠে যায় লোকগুলোর দিকে তাদের খুব মারতে থাকে। একজনের গা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ভাসিয়ে দেয় নদীর গোল গোল সাদা পাথর গুলো। বারিক এগিয়ে আসে। ক্ষেমার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে। ক্ষেমা যেন এত রেগে না যায় তার জন্যে প্রার্থনা করে।পরাজিত বন্দী কে অকারণ প্রহারে আকাশের গুম গুম করা দেবতা রুষ্ট হতে পারে। অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে ক্ষেমা। চোখ মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। থু থু করে নিষ্ঠীবন নিক্ষেপ করে লোক গুলোর ওপর। খুয়া আর অন্য যারা তখনও ক্লান্ত হয়ে যায়নি তারা ডাক দেয় কিরির নামে। নদীর দুই পাড়েই খুঁজতে থাকে। ​ তারা জানতে পারলো না। খুব অদ্ভুত ভাবে একটা বড় পাথরের পাশের বালির ভেতরের গভীর গর্তে কিরি কে দুটো লোক মুখে ছোট নুড়িপাথর ঢুকিয়ে দিয়ে হাত বেঁধে লুকিয়ে রয়েছে। অসহ্য ব্যাথায় কিরির দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। রাত অবধি কেউ কিরির খোঁজ পেল না। কিরির মা ক্ষেমা,বালিতে গড়িয়ে কেঁদে ফেলল। পূষনের যে কোন কাণ্ড জ্ঞান নেই তাই বলে বিলাপ করল। খুয়া চোখ মুছতে মুছতে ,মাকে সামলাবার চেষ্টা করে। বারিক আর মেয়েরা বন্দীদের যাতে দ্রুত মৃত্যু হয় সেই ভাবে হত্যা করে। সকলেই ধীর পদক্ষেপে গুহায় ফিরবার পথ ধরে। খুয়ার বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হয়। কিরি যদি মরে গিয়ে না থাকে তাহলে কোথায় গেল। সেখানে খুব কষ্টে নেই তো। বুকে মোচর দিতে থাকে তার। পূষন সাথে থাকলে ঠিক খুঁজে বার করা যেত। চোখের জল কিছুতেই থামছে না খুয়ার।
কিরি ব্যাথায় আর ভয়ে জ্ঞান হারাল। বালির অন্ধকার গর্ত থেকে বার হয়ে এলো আদোয়ার যোদ্ধাদের একজন। সে খুব সতর্ক হয়ে তাদের মৃত সহযোদ্ধাদের দেহ গুলোর কাছে গেল। পরীক্ষা করে দেখল তারা সবাই মৃত। 
অজ্ঞান কিরি কে রেখে অন্যজন বার হয়ে এল। আকাশে মরা জ্যোৎস্না। সাদা বালি, নদীর ওপরের সাদা সাদা পাথর অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে। তারা খুব ভালো করে চারপাশ দেখে চলেছে। কিরিকে মেরে ফেলবে নাকি নিয়ে যাবে দুজন বিস্তর আলোচনা করল। খালি হাতে ফিরে গেলে শাস্তি হয় যদি। কারণ তাদের সর্দার জাকু কে সাবুক বড় পছন্দ করে। আর জাকু ভাই জাকুজাকু খুব সাংঘাতিক। চড় থাপ্পড় তো কপালে আছেই। কিরিকে নিয়ে যাওয়াও ঝামেলা। কাঁধে তুলে নেয় একজন। জ্ঞান ফিরলে তখন হাঁটালেই হবে। রাস্তা গুলিয়ে যাতে না যায় তার জন্যে নদীর তীর ধরে তারা দ্রুত হাঁটতে লাগলো। কিরির মুখের পাথর টা দ্রুত চলার জন্যে আওয়াজ করে পাথুরে জমিতে পড়ল। পেছনে মৃতদেহ গুলো কতগুলো বুনো জন্তুর খাদ্যের উৎসবে পরিণত হল।

■২৩

মুগাকে একটা জল ভর্তি একটা বিরাট পাত্রের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হল। কোমরের ঘুন্সি থেকে ঘাস আর বাকলের টুকরো টা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেয়ে গুলো। একজন মহিলা এসে ঘষে ঘষে সারা শরীর পরিস্কার করে দিতে লাগল। এটা খুব অপছন্দের মুগার। মা মাঝে মাঝে এটা করে দেয়।তখন ছুটে ছুটে পালায় মুগা।​ কিন্তু একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ এই ভাবে তার গাঁয়ে হাত দিয়ে জোর করে এটা করবে, সেটা যে তার পছন্দ হচ্ছে না সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সে। জাকুজাকু একটা ভোঁতা লাঠি দিয়ে তাকে মৃদু আঘাত করে। পাত্র টি থেকে বার হয়ে আসে মুগা। আর খুব ঠাণ্ডা লাগে। সে ভিজে গায়ে হু হু করে আওয়াজ করতে করতে থাকে তাকে দেওয়ালের পাশে বসিয়ে দেওয়া হয়। লিয়ামের হাঁদা ছেলেকে,খুব যত্ন করে দুজন ছোট মেয়ে মিলে পরিস্কার করতে লাগল। ছেলেটা হাসি হাসি মুখে ব্যাপারটা সহ্য করছিল। ওর গলায় একটা পাথরের মালা ছিল। সেটা যেই খুলে নেওয়া হল, অমনি চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।মেয়েগুলো হেসে কুটোপাটি। জাকুজাকু এগিয়ে এসে তাকে আশ্বাস দিতে লাগলো তাকে আবার ফেরত দেওয়া হবে পাথরের মালা। কিন্তু ছেলেটা চিৎকার করে কেঁদেই চলল।মুগার খুব রাগ হচ্ছে। সে উঠে দাঁড়াল। খুব রাগের সাথে জাকুজাকু কে বলতে লাগল ফিরিয়ে দেবার কথা। জাকুজাকু তার দিকে তাকায় না। কান্নার আওয়াজে অনেক মানুষ সেখানে চলে এল। সাবুক এসে দাঁড়ায়। খুব দৃঢ় স্বরে জাকুজাকু কে কিছু একটা নির্দেশ দেয়। জাকুজাকু পাথরের মালা ফিরিয়ে দেয়।তাকে মেয়েদুটো খুব যত্ন করে লিয়ামের হাঁদা ছেলেকে গা মুছিয়ে দেয়। একটা ধবধবে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে দেয় শরীর। মুগা কে ডাকে এই মহিলা। মুগার গায়েরজল শুকিয়ে গেলেও মাথা থেকে জল গড়িয়ে ঘাড়ে পড়ছে। শীত করছে তার। মুগা আর লিয়ামের হাঁদা ছেলে কে হাত ধরে সবাই মিলে এবার নিয়ে চলে একটা ঘরের মধ্যে জাকুজাকু আর সাবুক আর তাদের সাথে থাকে না। সিঁড়ি দিয়ে নেবে যায়। মুগা দেখতে পায়

জাকুজাকু তার অস্ত্র অন্য কারো হাতে দিয়েদিল। মুগা সুযোগ খুঁজছে। এখান থেকে সে পালাবেই।তাকে বাবা আর মার কাছে সে ফিরে যাবেই।

ঘর টা বেশ অন্ধকার ঘরে বেশ কয়েকজন দশাসই লোক। হাতে পাতলা পাতলা ধাতব পাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা খুব বুড়ো লোক লিয়ামের হাঁদা ছেলেকে টিপে টিপে দেখে। হাঁ করিয়ে দাঁত পরীক্ষা করে। তারপর তাকে নিয়ে মেয়েগুলো ঘরের অন্য রাস্তা দিয়ে চলে যায়। মুগা কে এক ধাক্কা দিয়ে একটা লোক ঠেলে পাঠায় বুড়োর কাছে। মুগা রেগে গিয়ে চিৎকার করে। লোকগুলো হাসে। বুড়ো তার সারা শরীর টিপে টিপে দেখতে থাকে। বুড়োর গাঁয়ে ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। বুড়ো তার বুকে লাল রঙ দিয়ে কাটাকুটি একে দেয়। তাতে আঁশটে গন্ধ পায় মুগা। কোন পশুর রক্ত হবে। তাকে হাতে সুতোর দড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। লোকগুলো টানতে টানতে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে।বাইরে অনেক লোক। সাবুক, জাকুজাকু আরও যারা ছিল তাদের কেউ নেই। লিয়ামের হাঁদা ছেলেও নেই। কাউকে চেনে না মুগা। সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে এরা বেশ খানিকটা হাঁটিয়ে নিয়ে গেল। পাথরের চাতাল পার হয়ে একটা ছায়া ছায়া রাস্তা পার হয়ে, দুর্গন্ধময় ছোট পুকুর পার হয়ে, মুগা কে ওরা মাঝারি অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।একটা মাত্র জানালা আছে সেই ঘরে। ছাদ টা অনেক উঁচু। মুগা বুঝল সেখানে সে একা নয় আরও অনেকজন আছে।একটি ছেলে এগিয়ে এল হাসিমুখে। অজানা ভাষায় মুগাকে কি যেন বলল। মুগা খুব জোরে দরজায় আঘাত করতে শুরু করে। চিৎকার করে বলতে থাকে। সে এবার কেঁদে ফেলে। তাকে বাবা মার কাছে যেতেই হবে। আরও ছোট ছোট ছেলে গুলো তার দিকে এগিয়ে আসে। একজন তার মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে দেয়। অন্ধকার সয়ে এলে মুগা বুঝতে পারে বেশ দশ বারো জন তার বয়সি কিংবা তার চেয়ে ছোট ছেলে এখানে আছে।একজন তো মেঝেতে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। এই লোকগুলো এত বাচ্চাদের ধরে রেখেছে কেন? মুগার মা গল্প করত একটা দানবের, যে ছোট ছোট ছেলেদের কপকপ করে দানব খেয়ে নেয়। এখানে কি সেই দানব টা থাকে। বুকে খুব ভয় হল মুগার। ​ এবার কি করবে মুগা। আগে পালাতে পারলো না কিছুতেই। আবার কাঁদতে বসল মুগা। বাচ্চাগুলো গোল হয়ে তার চারপাশে বসে রইল কিছুক্ষন। তারপর তারা উঠে নিজেদের মধ্যে খেলা করতে লাগল।এরমধ্যে মুগার চেয়ে লম্বা একজন পাখীর শিস্ দিয়ে গান করছে।মুগার অবাক লাগলো। দানব এসে খেয়ে নেবে এরা কি জানে না!
মুগা ঠিক কি করবে জানে না। দরজা আঁকড়ে পড়ে রইল অনেকক্ষন। যে ছেলেটা মাটিতে শুয়ে আছে তার কাছে মাঝে মাঝে একটা খুব ছোট ছেলে এসে বসছে।সে মুগার দিকে তাকাল। মুগাকে ইশারায় ডাকে। মুগা চোখ মুছে উঠে এগিয়ে যায়। 
আকারে ইঙ্গিতে ছোট ছেলেটি বলে ছেলেটির পা ধরে ওকে একটু সরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে। অন্য আরও কয়েকজন এগিয়ে আসে। অসুস্থ ছেলেটি ওদের চেয়ে বয়সে বড়। প্রস্রাব করে ফেলেছে। মাটি ভিজে আছে। তাকে ধরে শুকনো জায়গায় নিয়ে যায়। তার গা খুব গরম। মায়ের গা মাঝে মাঝে গরম হয়।মা ঘরে শুয়ে থাকে। মুগার তখন খুব ভয় করত।‘যদি মা মরে যায়’ এই ভয়ে সে বেশী দূরে খেলতে যেত না। মা আবার উঠে বসলে তখন খুব আনন্দ হত মুগার।এ ছেলেটা চোখ খুলতে পারছে না। ওদের মধ্যে কে একজন জল এনে মুখে দিল। মুগার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। সে জলের পাত্র থেকে জলপান করতে গেল। আচমকা যে ছোট ছেলেটা তাকে ডেকেছিল সে মুগা কে বারণ করল। মুগা অবাক হল। জলের পাত্র তার হাত থেকে নিয়ে নিল ছোট ছেলেটা। কি ভাষায় বলছে মুগা বুঝতে পারছে না। অন্য আর একজন এগিয়ে এসে নানাভাবে বোঝাবার চেষ্টা করল। বেশ কিছুক্ষন পরে মুগা বুঝল। জল খুব কম আছে। এই অসুস্থ ছেলেটিকে জল দিতে হবে। তাই সন্ধ্যের আগে কেউ জল পাবে না। মুগা শুকনো জিব চেটে নিয়ে শান্ত হয়ে বসে। যে শিস্ দিয়ে গান করছিল সে হঠাৎ উচ্ছসিত হয়ে লাফালাফি করতে থাকে। অন্যরাও পাগলের মত নাচানাচি করতে থাকে। মুগা অবাক হয়। মুগা অবাক হয়ে যায়। দরজা খুলে যায়। চারজন দশাসই লোক প্রচুর খাবার নিয়ে ভেতরে আসে। মুগা এতক্ষনে বুঝতে পারে এরা খাবারের জন্যে অপেক্ষা করছিল। সবাই হুড়মুড় করে খাবার খেতে থাকে। এসব খাবার মুগা কোনদিন দেখেনি। খুব খিদে ছিল মুগার, দুহাতে মুখে দিতে লাগল। অসুস্থ ছেলেটিকে একটা লোক কাঁধে নিয়ে চলে গেল। কেউ তাকিয়েও দেখল না। মুগার এবার ঘুম পাচ্ছে। খুব ঘুম। ​

দুটো দিন যাবার পর মুগা বুঝতে পারে রোজ একবার খাবার দেওয়া হয়। খাবার খুব সুস্বাদু, আর পরিমাণে প্রচুর।খুব কম জল দেওয়া হয়। ছোট যে ছেলেটা তাকে জল খেতে দেয়নি তাকে সবাই খুব মান্য করে তার নাম বিন্নো। সব ছেলেগুলো কেই অনেক দূর দেশ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। বিন্নো এসেছে ঘন জঙ্গল থেকে। সে একটা নেকড়ে বাঘ কে বল্লম ছুঁড়ে মেরেছে। এখানে যারা এসেছে সবাই কিছু না কিছু বিশেষ কাজ করেছে। এই জায়গাটার নাম আদোয়া।একটা খেলা হবে। সেই খেলার জন্যে সব ছেলেদের এক জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। সাবুক এসে মুগার সাথে দেখা করে গেছে। সাথে সেই অদ্ভুত লোক ডিগা এসেছিল। সে সব বাচ্চাদের ভালো করে দেখে গেল। আজ চাঁদের রাত হবে। ছাদ খুব উঁচু হলেও ওপরের ছোট জানালা দিয়ে আলো আসবে তাই জানালো ওদের একটি ছেলে। ছেলেটি বলে দিতে পারে কখন সূর্য অস্ত যাবে। ও নাকি বৃষ্টির গন্ধ পায়। লিয়ামের হাঁদা ছেলেটা কে কোথায় নিয়ে গেল কে জানে! আজ ঠিক টার মা কাঁদবে। আলোতে নদীর ধার ভেসে যাবে। তাই দেখে মুগার দুষ্টুমির কথা ভেবে মা খুব কাঁদবে। ​ ​

■২৪

পূষন হাঁপায় আর হাঁপায়। আজ শরীর যেন আর পারছে না। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তবে কি এবার শেষ সময় এলো। বেশ কয়েক ঘণ্টা প্রায় নিঃসাড়ে থাকার পর আচমকা সেই বোটকা গন্ধ আর আস্বস্তিতে ঘুম ভাঙল পূষনের। চমকে উঠল। এই গন্ধ কে তো সে অনেক দূর রেখে এসেছিল। চারপেয়ে বড় বিড়াল প্রজাতির জন্তু। এই অঞ্চলের পাহাড়ি তৃনভুমি তাদের সাম্রাজ্য। বিশ্রাম পেয়ে কিছুটা শক্তি ফিরে পেয়েছে সে। পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল সে। গন্ধটা এতো তীব্র।মনে হচ্ছে খুব কাছেই আছে। নিজের আত্মবিশ্বাস আছে পূষনের যুদ্ধ করার। কিন্তু তাকে যে চারপেয়েটা শিকার করার জন্যে ওত পেতে ছিল সেটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার।পূষন দেখতে পেল। সিংহী টা বড় বড় লম্বা ঘাসের মধ্যে স্থির হয়ে বসে পূষন কে দেখছে। কোন পাথর বা লম্বা লাঠি কিছুই নেই পূষনের কাছে। সে বুঝে গেল যদি সিংহীর লাফ দিয়ে পড়ার আগে তার বেশী কাছে চলে যেতে পারে তাহলে পূষনের সুবিধা হবে। পূষন বহু দিন পর আজ যুদ্ধ করবে। সিংহী আড়মোড়া ভাঙে। সেও যুদ্ধের গন্ধ পায়।পূষন দ্রুত দৌড় শুরু করে প্রতিপক্ষের দিকে। আকাশে লাল রঙ।পূষন একবার মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখে আকাশে। এমন লাল সেদিন ছিল। মার ছিঁড়ে যাওয়া শরীরের পাশে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন লাল আকাশ দেখে ছিল।চোয়াল শক্ত হয় পূষনের। সাধারণ ভাবে তার যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করে না। সে দৌড় বন্ধ করে । এবার সিংহীর পা গুলো দেখা যাচ্ছে। গোলাপি জিব, চোখের স্থির দৃষ্টি সব কিছু স্পষ্ট। পূষন স্থির হয়। হাতের মুঠো শক্ত করে। গভীর ভাবে শ্বাস নেয়। দ্রুত দৌড় শুরু করে।যে ভাবে ছোটবেলায় নদীর জলে ঝাঁপ দিত ঠিক সেই ভাবে সিংহীর ওপর ঝাঁপ দেয়। সিংহী গর্জন করে অথে।সামনের দুই থাবা দিয়ে পূষন কে আহত করার চেষ্টা করে কিন্তু পূষন তার পিঠের ওপর অদ্ভুত কায়দায় উঠে যায়। চেপে ধরে কণ্ঠ নালী। ধারাল নখে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে পূষন। কিন্তু বেশ খানিকক্ষণ নাছোড় আক্রমণে সিংহী আর শ্বাস নিতে পারে না। স্থির হয়ে যায় তার দেহ। পূষনের ক্ষতস্থান দিয়ে রক্তস্রোত বয়ে যায়। পূষন জ্ঞান হারায়।

পূষনের জ্ঞান এলো কিছুক্ষনের মধ্যে। তার পাশে বিরাট ​ সিংহী নিঃস্পন্দ শুয়ে আছে।আর চমকে উঠল সেই সিংহীর পেটের দিকে তাকিয়ে। একটি শিশু সিংহ আরাম স্তন্যপান করে করছে।ছ্যাঁত করে উঠল পূষনের সে তো তাহলে একজন মাকে মেরে ফেলেছে। এই শাবকের কি হবে! পূষন হাঁটু মুড়ে বসে কেঁদে ফেলে তার শরীরে শক্তি বড় কম। তার ক্ষত স্থানের ব্যাথা আর কৃতকর্মের দুঃখ তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে কাঁদতে থাকে তার ভাঙা গলায় আওয়াজ করে। শাবকটি স্তন্যপান থামিয়ে অবাক হয়ে তাকে দেখে। কিন্তু ভয় পায় না। সন্ধ্যে নামছে। সারা আকাশ জুড়ে রঙ। পাথুরে ঘাস জমিতে ঠাণ্ডা বাড়ছে। তবে গাছগুলো খুব শিগ্রি ফুল ফোটানোর আয়োজন করছে। এই ঋতু শেষ হলে, বরফের সময়।

তখন আবার পাতা ঝরিয়ে ফেলতে হবে। ​ ​

Read More »

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.