x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

শনির বচন | স্বাধীনতা না গোলামী?

sobdermichil | জুলাই ২৪, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

কি বিচিত্র এই দেশ। যারা রাষ্ট্রদ্রোহের সাথে জড়িত। তাদের সাতখুন মাফ। কারণ তাদেরই হাতে দেশের শাসন ক্ষমতা। অর্থনৈতিক ক্ষমতা। সামরিক ক্ষমতা। এই তিনটি ক্ষমতা থাকলেই নিজের দেশ ও স্বদেশবাসীর জীবন নরক করে দেওয়া যায়। দেশর সম্পত্তি বিক্রী করে দেওয়া যায় জলের দরে। দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বিদেশী শক্তির সাথে গাঁটছাড় বেঁধে দেশবাসীর পিছনে বাঁশ দেওয়াও যায়। যে বাঁশের গালভরা নাম পেগাসাস। আহা পক্ষীরাজ ঘোড়ার দেশে বাঁশের নাম পেগাসাস। না যায় দেখা। না পাওয়া যায় টের। না শোনা যায় শব্দ। না যায় তারানো। সে শুধু চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। অন্যের মাইক্রোফোন অন্যের ক্যামেরা চালিয়ে সব কিছু চুরি করে নিয়ে পাচার করে দিচ্ছে ইজরায়েলে। আচ্ছা এই পেগাসাস যদি পাকিস্তানের হতো। ইজরায়েলের না হয়ে? যদি চীনের হতো? এতক্ষণ দেশশুদ্ধ মানুষের বুদ্ধির গোড়া খানিকটা হলেও হয়তো জল ঢুকে যেত। কে দেশদ্রোহের কাজে যুক্ত।
কিন্তু এ যে ইজরায়েল। সাহেবসুবোর দেশ। খোদ মার্কীনদেশের জামাই আদরে থাকা নয়নের মণি। সেই দেশে আমাদের দেশের সকল গুপ্ত তথ্য চলে গেলে কি আর এমন ক্ষতি? বিশেষ করে ভারত মাতা কি জয়ধ্বনির মালিকরা যখন ইজরায়েলকে শত্রুদেশ বিবেচনা করে না। বরং পরম মিত্র বড়ো ভাই মার্কীন দেশের পরম মিত্র যে দেশ। সেই দেশ ভারতবর্ষেরও মিত্র না হয়ে যাবে কোথায়? 
তা যাক। ইজরায়েলে ভারতীয় তথ্য গেলে ক্ষতি নেই। কি ভাগ্গিস চীন পাকিস্তানের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গিয়েছে গোটা দেশ। পেগাসাস যদি শত্রু দেশের হতো। কত বড়ো ক্ষতি হয়ে যেত এতক্ষণ ভারতবর্ষের। একটা বড়ো ফাঁড়া থেকে রক্ষা পেয়েছে দেশ। বরং এই তো ভালো হলো। ইজরায়েলের মতো ত্যাঁদড় একটি দেশ ভারতবর্ষের পাশে থাকলে চীন পাকিস্তান জব্দ হবে। সাথে বড়ো ভাই মার্কীন দেশের নজরদারী তো রয়েইছে। না, ভারতবর্ষ সব দিক দিয়েই আজ চীন পাকিস্তান থেকে সুরক্ষিত। বাছাধনদের আর ট্যাঁফুঁ করতে হচ্ছে না। হ্যাঁ আমাদের দেশের সরকার বিরোধীরা একটু নাচানাচি চীৎকার চেঁচামেচি করবে কদিন। করে নিক। এবার তো বুঝতে পেরে গিয়েছে কার লেজে পা দিতে যাচ্ছিলো? এখন নাকি আবার শোনা যাচ্ছে, বিরোধী জোট হবে। শুনে মানুষ হেসে গড়াগড়ি। এই তো এদের অবস্থা। নিজেদের মোবাইল সেটও সুরক্ষিত রাখার ক্ষমতা নাই। তারা নাকি নিতে চায় দেশ শাসনের ভার! বলিহারি স্বপ্ন। দেশের সুরক্ষা এদের হাতে গিয়ে পড়লেই হয়েছে। চীন পাকিস্তান ছিঁড়েকুড়ে খাক আর কি।

তার থেকে এই ভালো হলো। ইজরায়েলের মতো একটি মহাশক্তিশালী দেশ। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তির দেশ এইভাবে ভারতের পাশে থাকলে দেশবাসী নিশ্চিন্ত। ভারতের নাড়িনক্ষত্র যাঁদের নখদর্পনে থাকবে। তারাই তো পারবে ভারতের সুরক্ষার সঠিক বন্দোবস্ত করতে, নাকি। এই সোজা কথাটা দেশের মানুষকে আজ বুঝতে হবে বইকি। তিনি শাসন ক্ষমতায় এসেই এই কথাটা বুঝেছিলেন বলেই না, নেতানেহু থেকে ট্রাম্পকে জিগরি দোস্ত বানিয়ে নিয়েছিলেন। কবে কোন দেশপ্রধান এই কাজ এমন সাফল্যের সাতে করতে পেরেছে শুনি? দুই দিকে দুইজনকে দেশের দুই পাশে খাড়া করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন সময় মতো। না হলে চীন পাকিস্তান কি বসে থাকতো এতদিন? ইজরায়েল ভারত আমেরিকা বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবি হোক। আর সেই বন্ধুত্বের পথে বাধা দিতে এলে লড়াই তো বাঁধবেই! আজ যাঁরা বর্তমান শাসক দল বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চে পেগাসাস ইস্যুতে দেশব্যাপী মহাজোট গড়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাঁরা কিন্তু আসলেই ভারতবর্ষের ভালো চান না। যে মানুষটি ভারতবর্ষকে ইজরায়েল ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাঁটছাড় বাঁধতে উদয়াস্ত কাজ করে চলেছেন। তাঁকে শাসন ক্ষমতা থেকে হটানোর স্লোগান দেওয়া মানেই তো ভারতবর্ষকে চীন পাকিস্তানের খপ্পরে ফেলে দেওয়া। আর এর থেকে বড়ো দেশ বিরোধী দেশদ্রোহের কাজ আর হয় নাকি? ফলে পেগাসাস ইস্যুতে যাঁরাই বর্তমান শাসক দলের বিরোধীতায় পথে নামবেন। তাঁদেরকেই প্রকৃত দেশদ্রোহী হিসেবে চিনে নিতে হবে এবারে।

না, উপরের ন্যারেটিভটা আদৌ মনগড়া কিছু নয়। এটাই অন্ধভক্তদের ন্যারেটিভ হয়ে উঠতে পারে। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই হয়েও গিয়েছে এই কয়দিনে। অনেকেই ভিতরে ভিতরে খুব খুশি। পেগাসাসের কীর্তিকাহিনী জানতে পেরে। অনেকেই আশান্বিত। যাক আর কোনদিন বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলিকে দিল্লীর মসনদে বসতে হচ্ছে না। পেগাসাস একাই সকলের হাঁড়ির খবর আগাম জানিয়ে দিতে পারবে হোম মিনিস্ট্রিকে। আর সেই বুঝে বিরোধী দলগুলির সব ট্যাঁফু দিনের আলো দেখার আগেই চুপষে দেওয়া যাবে মাখনের ভিতরে ছুরি চালানোর মতন করে। তার সাথে সিবিআই, ইডি, এনআইএ, সেবি, ইনকাম ট্যাক্স, ইউএপিএ ইত্যাদির মতো হাতের বাকি তুরুপের তাসগুলি কাজে লাগিয়ে দিলে তো কথাই নাই। বিরোধী ঐক্য বিরোধী জোট, সব দফারফা! আর দেখতে হচ্ছে না। অনেকের কাছেই এখন পরিস্কার। কিভাবে নির্বাচনে পরাজিত হয়েও ক্ষমতায় বসার পথ তৈরী করা হয়। অনেকের কাছেই পরিস্কার কার্ণাটক মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে কিভাবে সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের সরকার গড়া হয়। পেগাসাস এই সব কিছুই এখন দিনের আলোর মতোন পরিস্কার করে দিয়েছে। আর তাতেই অন্ধভক্তদের ভিতরে উৎসব শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। না, সেই উৎসব অবশ্যই লোক দেখিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে টেলিকাস্ট করার বিষয় নয়। সেটুকু লজ্জাশরম না থাকলে আবার বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। ফলে গদি টালমাটাল হওয়ার থেকে রক্ষা পেতে সেইটুকু লজ্জাশরম ধরে রাখতেই হবে। তাই চারপাশ বেশ নিস্তবদ্ধ। পেগাসাস নিয়ে বেশি উচ্যবাচ্য শোনা যায় না। যেটুকু শোনানোর দরকার। সেইটুকুই শুনিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের। ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গল্প শুনিয়ে। দেশের মানুষের জন্য সেইটুকুই যথেষ্ঠ। বাকিটুকু ম্যানেজ করে নিতে পারবে মিডিয়াতন্ত্র এবং অন্ধভক্তকুল।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলি? তাঁদের সামনে এই মুহুর্তের যেটি দায়িত্ব। তারা কি আদৌ সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ধরে? ষাট কোটি টকার বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে যেভাবে গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায় ইনজেক্ট করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন বিরোধী শিবিরগুলির পক্ষে। আজ এইসময়ে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ষাট হাজার কোটি টাকার রাফায়েল কেলেঙ্কারীর ঘটনাতেও যখন ঘটাতে দেখা যায়নি। তখন বিরোধী শিবিরগুলির উপরে জনগণের বিশেষ ভরসা আছে বলে মনে হয় না আদৌ। ফলে পেগাসাস ইস্যু বিরোধী দলগুলিকে কতটুকু পুষ্টি জোগাবে। সন্দেহ থেকে যাচ্ছে যথেষ্ঠই।

কিন্তু সচেতন নাগরিক? তাঁদেরও কি কোন ভুমিকা থাকা উচিত নয় এইরকম একটি সময়ে? যেখানে সংবিধান লঙ্ঘন করে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরে দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এইভাবে শতশত মানুষের মোবাইল হ্যাকিং করানো হচ্ছে একটি বিদেশী দেশকে দিয়ে। সেখানে সচেতন নাগরিকরা যদি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কবে মাঠে নামবে সেই প্রত্যাশায়, তবে দেশের জন্য ভালো কিছু আশা করা সত্যিই কঠিন কিন্তু। মানুষের বোঝা দরকার। ভারতীয় গণতন্ত্রের এই মুহুর্তের সবচেয়ে বড়ো বিপদ হলো, ভরসাযোগ্য নির্ভরশীল কোন বিরোধী রাজনৈতিক শিবির না থাকা। গণতন্ত্রের সবলতা নির্ভর করে সবল বিরোধী পরিসরের উপরেই। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই রকম বড়ো বিপদ এর আগে কোনদিন দেখা যায় নি। এমনকি পঁচাত্তর সালের জরুরী অবস্থা জারীর সময়েও বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর এমন নিদারুণ ভাবে সংকীর্ণ ও দূর্বল হয়ে পড়েছিল না। ফলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটনাও সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের জনতার হাতের কাছে কোনরকম শক্তিশালী বিরোধী পরিসর নেই। এই না থাকাটাই অন্ধভক্তদের বারবাড়ন্তের পক্ষে সহয়াক হয়ে উঠেছে বিপুল ভাবে। যার সুফল ভোগ করছে শাসকদল। ফলে সচেতন নাগরিকদের ভেবে দেখতে হব। ভারতীয় গণতন্ত্রের এইরকম মুমূর্ষু অবস্থায় মুখে কুলুপ এঁটে ঘরে বসে থাকা উচৎ হবে কিনা। পেগাসসের মতো কাণ্ড যদি কোন রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন না হয়। তাহলে তার পরিণাম কিন্তু ভয়াবহ হতে বাধ্য। পরবর্তী সময়ে যে দলই শাসন ক্ষমতা দখল করুক না কেন। তারাও এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে একই কাজ করে যাবে। ব্যক্তি মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষা করার মতোন আর কোন রক্ষাকবচ থাকবে না সেক্ষেত্রে। যে কোন সুস্থ গণতন্ত্রে ব্যক্তি মানুষের প্রাইভেসির বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক শর্তের ভিতরে পড়ে। এটা ভেবে বসে থাকলে সত্যিই বিপদ রয়েছে যে, ওসব পেগাসাস ফেগাসাস সাধারণ মানুষের জন্য নয়। সাধারণ মানুষের প্রাইভেসি নিরাপদই থাকবে। সেই বিশ্বাসে ভরসা করাও যা, চোরাবালির উপরে নিশ্চিন্তে লাফানোও তাই। আজকে যে সরকার বিদেশ থেকে শত শত কোটি টাকায় পেগাসাস ভাড়া করছে। কাল যে সেই সরকারই স্বদেশী পেগাসাস তৈরী করে ফেলতে সক্ষম হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? বিশেষ করে এই ইন্টারনেট আর মোবাইল প্রয়ুক্তির যুগে আসলেই কারুর প্রাইভেসিই আর সুরক্ষিত থাকার কথা নয়। যদি না জনদরদী জনকল্যাণমুখী স্বদেশী সরকার গড়া যায়। এখন দেশবাসীকেই ঠিক করে নিতে হবে। জনগণ কি চায়? গোলামী না স্বাধীনতা? কোনটি!


২৪শে জুলাই’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
Read More »

শনির বচন | সুপ্রীম প্রশ্ন

sobdermichil | জুলাই ১৭, ২০২১ |
sobdermichil

সকালের সংবাদপত্র খুলে চোখ কপালে উঠে গেল। সুপ্রীম কোর্ট থেকে নাকি বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে এই কথা জেনে যে, ব্রিটিশ প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রদ্রোহ আইন এখনো বাতিল করা হয় নি। দেশের সুপ্রীম কোর্ট, দেশে কোন কোন আইন চলছে আর কোন কোন আইন বাতিল করা হয়েছে সেই বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়? এও কি সম্ভব? নাকি সংবাদপত্রের ছাপার ভুল? সুপ্রীম কোর্টের বিস্মিত হয়ে ওঠা সত্যিই এক সুপ্রীম বিস্ময় সন্দেহ নাই, যদি সংবাদপত্রের সংবাদ নির্ভুল হয়। ব্রিটিশ তার শাসনকালে, অবাধে ভারতবর্ষের সম্পদ লুন্ঠন যজ্ঞকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই এই রাষ্ট্রদ্রোহের আইন চালু করেছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। আজ ২০২১। দেশের সুপ্রীম কোর্টের কি জানার কথা নয়, আজও সেই রাষ্ট্রদোহ আইন শুধু চালুই রয়েছে তাই নয়। প্রায় নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই এই আইনের অপব্যবহার করা হয় রাষ্ট্র কর্তৃক? এবং বিগত আট দশকে দেশের কোন সরকারই এই আইন বাতিল করেনি? কোন রাজনৈতিক দলই এই আইনের বাতিলের দাবিতে দেশ জুড়ে গণআন্দোলন সংঘটিত করেনি কখনো। এখানে সাধারণ ভাবে একটি প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যায়। আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে। আমরা যাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নই। আমরা যাঁরা আইনের ছাত্র নই। আমরা যাঁরা দেশের সংবিধান কোনদিন পড়েও দেখিনি। সুপ্রীম কোর্টের কর্ম পরিধি কি কেবলমাত্র দাখিল করা মামলার ভিতরেই সীমাবদ্ধ? একমাত্র তখনই সুপ্রীম কোর্ট দেশের সংবিধান দেশের আইন নিয়ে মাথা ঘামাবে, যখন সেই বিষয়ে কোন মামলা দাখিল হবে কোর্টে? তার আগে নয়? না, এই বিষয়ে আমরা সত্যই অন্ধকারে। সাধারণ ভাবে আমাদের একটা আশা থাকে। দেশে প্রণীত আইনগুলি ঠিকঠাক সংবিধানের ধারাগুলি মেনে করা হচ্ছে কিনা অন্তত সেই বিষয়ে সুপ্রীম কোর্টে একটি নজরদারীর ব্যবস্থা থাকবে। কোর্ট দেখবে, নির্বাচিত কোন সরকার দেশের সাংবিধানিক ধারাগুলির বিরুদ্ধে গিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করে কোন আইন প্রণয়ন করছে কিনা আদৌ। সুপ্রীম কোর্ট যদি এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল না থাকে। তাহলে যেকোন দেশের নাগরিকই চুড়ান্ত অসহায় বোধ করতে বাধ্য। নির্বাচিত সরকার সবসময় শাসকদলের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবে। সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষত ভারতবর্ষের মতো ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বারা আরোপিত গণতন্ত্রে। যে দেশগুলিতে স্বাধীনতা এসেছে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চলে গিয়েছে। তাদের জায়গায় শাসনক্ষমতার অক্ষে ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক শিবিরগুলি। এই শিবিরগুলি তাদের রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থেই ব্রিটিশের প্রবর্তিত রাষ্ট্রদ্রোহের আইন আজও চালু রাখবে সেটাই স্বাভাবিক। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই হয়েছে। না, দেশের সুপ্রীম কোর্ট এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়। এমনটা ভাবা কষ্টকর। তাহলেও কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গিয়েছে বলেই মনে হয়। না হলে একটি স্বাধীন দেশে সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী কোন আইন দশকের পর দশক চালু থাকে কি করে? কি করে তার অপব্যবহারও সংঘটিত হতে থাকে দিনের পর দিন?
এখানে খুব স্বাভাবিক ভাবে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। অন্তত উচিত বলেই মনে হয়। কবে অসুখ করবে তবে ওষুধ খাবো। তখন চিকিৎসা করাবো ভেবেও শরীরের প্রতি কোনরূপ যত্ন না নিয়েও বসে থাকা যায় নিশ্চিন্তে। আবার যাতে অসুখ বিসুখ থেকে নিরাপদে থাকা যায়, সেই উদ্দেশে নিয়মিত শরীরের যত্ন নেওয়ার দিকে অধিকতর যত্ন নেওয়াও যেতে পারে। 
এখন প্রশ্ন হলো কোনটি অধিকতর বাস্তবোচিত? যে কোন দেশের সুপ্রীম কোর্ট সম্বন্ধেও কি এই একই প্রশ্ন উঠতে পারে না? কবে রাষ্ট্র কর্তৃক সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী কোন আইনের অপপ্রোয়গ হবে। কবে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ সুপ্রীম কোর্টে মামলা দাখিল করবে। তারপর সুপ্রীম কোর্ট নড়েচড়ে বসবে। সেরকমটি হওয়াই ঠিক? নাকি, সুপ্রীম কোর্টের নিয়মিত নজরদারীতেই নির্বাচিত সরকারের কাজকর্ম থাকা দরকার। বিশেষত সংবিধানের ধারাগুলিকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশে? প্রশ্নটির আসল উদ্দেশ্য হলো দেশের সংবিধানের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই। দেশের সংবিধান সুরক্ষিত না থাকলে দেশের জনগণ কখনোই নিরাপদ থাকতে পারে না। বিদেশী শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে যেমন দেশবাসীর সুরক্ষার প্রয়োজন। ঠিক তেমনই সংবিধান লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রশক্তির হাত থেকেও দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার প্রয়োজন। আর সেই সুরক্ষা দিতে পারে একমাত্র দেশের সুপ্রীম কোর্টই। সুপ্রীম কোর্টই দেশের নাগরিকের সাংবিধানিক নিরাপত্তা দিতে পারে। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব কি সুপ্রীম কোর্টের নয়? না, আমরা দেশের সুপ্রীম কোর্টের বিরুদ্ধে আঙুল তুলছি না আদৌ। আমরা নিশ্চিত হতে চাইছি। আমাদের নিরাপত্তার প্রধান অভিভাবকরূপে সুপ্রীম কোর্টের আশ্রয়ে থাকার। সংবিধনের আত্মরক্ষার নিজস্ব কোন সামর্থ্য থাকে না। সংবিধানের সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে সুপ্রীম কোর্টের হাতেই। আর সেখানেই সাধারণ নাগরিকের শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয় নিশ্চিত হওয়া দরকার। এই মুহুর্তে যাঁরা যাঁরা রাষ্ট্রের রোষানলে পড়ে শাসক দলের রাজনৈতিক গোষ্ঠস্বার্থে বিনা বিচারে গারদের ওপারে পড়ে রয়েছেন দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। তাঁরা কিন্তু এই সংবিধান বিরোধী সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের অপপ্রয়োগেরই শিকার। আশার কথা সুপ্রীম কোর্ট এতদিন পড়ে একটু নড়ে চড়ে বসতে চাইছেন। কিন্তু একথাও তো ঠিক। সুপ্রীম কোর্ট যদি সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী প্রতিটি আইনকেই বাতিল বলে রায় দিয়ে রাখতো। তাহলে কিন্তু শাসকদলগুলির রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থের বলি হতে হতো না এত এত মানুষকে এত এত দশক ব্যাপী। এখানেই আমরা, সাধারণ দেসবাসী সুপ্রীম কোর্টকেই সুপ্রীম ভুমিকায় দেখতে প্রত্যাশী। কে কবে সংবিধান লঙ্ঘনকারী কোন আইনের অপপ্রয়োগের শিকার হয়ে সুপ্রীম কোর্টে মামলা দাখিল করবে। তবে সুপ্রীম কোর্ট সামান্য নড়ে চড়ে বসার প্রয়াসী হবে। না, আমরা সাধারণ বুদ্ধির মানুষ। আমরা তেমনটি দেখতে চাই না। আমরা আশা করতে চাই। সুপ্রীম কোর্ট এমন ভাবেই সক্রিয় থাকুক। যাতে দেশের কোথাও সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী কোন আইন চালুই না থাকে। দেশের প্রতিটি আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়মিত ব্যবধানে বিচার করে দেখুক সুপ্রীম কোর্ট। এই কাজটি নিশ্চিত করতে পারলে। তবেই আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলি খর্ব করার আর কোন সহজ উপায় থাকবে না কোন রাষ্ট্রশক্তির কাছে। শাসক দলগুলির রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থে বলি হতে হবে না অন্যায়ের প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠা প্রতিবাদী কন্ঠগুলিদের। আজ যাঁদের অনেকেই আইনের অপপ্রয়োগে গারদের পিছনে। আজও যাঁদের কেউ কেউ সেই কারান্তরালেই মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন বিনা বিচারে।

নির্বাচিত সরকার সবসময়েই শাসক দলের রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থে পরিচালিত হয়। এটাই গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। এক একটি নির্বাচিত সরকারের এক এক রকমের গোষ্ঠীস্বার্থও থাকতে পারে। কিছু কিছু গোষ্ঠীস্বার্থ সমাজের কোন কোন অংশের মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে দেয়। গণতন্ত্রের নামে নির্বাচিত সরকার যে দিকে সম্পূর্ণ চোখবুঁজে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই সেই অংশের মানুষের বিপক্ষে অবস্থান করতে থাকে। সেই সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কার আশ্রয় খুঁজবে? অবশ্যই আইন এবং আদালতের। সবসময়েই যে আইন ও আদালত নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে পারে তাও নয়। যে কোন গণতান্ত্রিক দেশেই তার ভুরি ভুরি নিদর্শন রয়েছে। সেই সময়ে সাধারণ মানুষের একমাত্র রক্ষাকবচ কিন্তু দেশের সংবিধান। আর সেই সংবিধানের একমাত্র রক্ষাকবচ, দেশের সুপ্রীম কোর্ট। ফলে যে কোন গণতান্ত্রিক দেশেই সুপ্রীম কোর্টের ভুমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সুপ্রীম কোর্টকেই সাধারণ মানুষ শেষ আশ্রয় হিসাবে দেখতে প্রত্যাশী। কিন্তু আইনের অপপ্রোয়গের পরে নয়। অপপ্রয়োগের আগেই প্রতিটি আইনের সাংবিধানিক বৈধতার বিচার করার পরিসর সুপ্রীম কোর্টে থাকা দরকার। আমাদের মূল প্রশ্ন ঠিক এইখানেই। আমরা যাঁরা সাধারণ মানুষ। যাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নই। যাঁরা আইনের ছাত্র নই। যাঁরা কোনদিন দেশের সংবিধানের পাতা উল্টিয়েও দেখিনি। তাঁরা তো আশা করবোই। কোন মামলা দাখিলের পরে নয়। সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘনকারী কোন আইনের অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে যাতে কাউকে মামলা দাখিল করতেই না হয়, সেইটুকুই নিশ্চিত করুক বরং দেশের সুপ্রীম কোর্ট। যেকোন দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। না হলে গণতন্ত্র এইভাবেই শাসকদলের রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থেই পরিচালিত হতে থাকবে।


১৬ই জুলাই’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত




Read More »

শনির বচন | শূন্য থেকে শুরু

sobdermichil | জুলাই ১০, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

সদ্য সমাপ্ত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের সামূহিক ভরাডুবির পর, ফ্রন্টের বড়ো শরিক তাদের সদর দপ্তর থেকে ভরাডুবির প্রধান কারণ হিসেবে নির্বাচনী প্রচারে পদ্মফুল শিবিরের বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে না পারার কথাই স্বীকার করে নিয়েছেন। খুব ভালো কথা। এরপর দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ সূর্যকান্ত মিশ্র সম্প্রতি স্বীকার করলেন, তাঁদের বিজেমূল তত্ত্বই একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল। কিন্তু নেতার এই কথা কর্মী সমর্থকদের একটা বড়ো অংশই এখনো স্বীকার করতে রাজি হচ্ছেন না। তাঁদের সাফ কথা, তাঁরা যে গ্রাউণ্ড রিয়্যালিটির সাথে যুদ্ধ করছেন প্রতিদিন, সেখানে বিজেমূল শক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয় তাঁদের। ফলে নেতা ও কর্মী সমর্থকদের এক অংশের ভিতরে মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে বিজেমূল তত্ত্বকে নিয়েই। ২০২১’র রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও সদ্য গজিয়ে ওঠা আইএসএফ-এর সাথে যে জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই জোট গঠনকেই বহু মানুষ বামফ্রন্টের ভরাডুবির অন্যতম কারণ বলে ধরে নিয়েছেন। তাঁদের যুক্তির পিছনে যথেষ্ঠ কারণও রয়েছে। এবারের নির্বাচনে পদ্মফুল শিবিরের প্রচারের প্রধান অভিমুখ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। তাঁদের আশা ছিল রাজ্যের সমগ্র হিন্দু ভোটের একটা বড়ো অংশের উপরে কব্জা করে নেওয়া। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, বাকি হিন্দু ভোট তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের ভিতর ভাগ হয়ে যাবে। সাথে রাজ্যের মুসলিম ভোটের একটা বড়ো অংশই সদ্য গজিয়ে ওঠা আইএসএফের ঝুলিতে চলে গেলেই তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম ভোট ব্যাংকে ধ্বস নামবে। ফলে সামগ্রিক ভোট শেয়ারে তাঁরা বাজিমাত করে বাকি দলগুলির থেকে কয়েক কদম এগিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। রাজ্যবাসী তাঁদের এই হিসাব মতো ভোট দিলে ফলাফল সত্যসত্যই তাঁদের আশানুরূপই হতো সন্দেহ নাই। কিন্তু এবারের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা যতই রাজ্যবাসীকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন, রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশ ততই নির্বাচনকে সম্প্রদায়িক বিভাজনের উল্টো মুখে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই দেখেছে। অর্থাৎ, এবারের নির্বচনী লড়াইয়ে পদ্মফুল শিবির হিন্দু মুসলিম ন্যারেটিভে লড়তে চেয়েছিল। ঠিক যে কারণে ঘাসফুলের মুসলিম তোষণ নীতির বিরোধীতায় তাঁরা সবচেয়ে বেশি সরব হয়ে উঠেছিল। 
উল্টোদিকে, রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশই এবারের নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে এই রাজ্যে প্রতিহত করতেই বুথে বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কারণ তাঁরা জানতেন একবার রাজ্যের শাসনভার কোন সাম্প্রদায়িক শক্তির কব্জায় চলে গেলে, গোটা রাজ্যের পক্ষেই এক ঐতিহাসিক সর্বনাশ হয়ে যাবে।

দুঃখের বিষয়। এবং অত্যন্ত পরিতাপের কথা। রাজ্য বামফ্রন্ট এই সহজ কথাটি সময় মতো বুঝতে পারেনি। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল একদশকের তৃণমূলী অপশাসনের অবসান। যেভাবেই হোক সেই অপশাসনের অবসানের লক্ষ্যেই তাঁরা যাবতীয় লড়াই জারি রেখেছিলেন। ঠিক যে সময়ে, রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশই উপলব্ধি করেছিলেন, এক দশকের তৃণমূলী অপশাসনের অবসানের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যকে সাম্প্রদায়িক শক্তির কব্জা থেকে রক্ষা করা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২১’র বিধানসভা নির্বাচন একটি বড়ো মাইলস্টোন হয়ে থাকলো। রাজ্য বামফ্রন্টের ভ্রান্তনীতির পক্ষে ঠিক এই কারণেই রাজ্যাবাসীর একটি বড়ো অংশই সমর্থন জ্ঞাপন করতে পারেননি। তাঁরা জানতেন, তৃণমূলী অপশাসনে রাজ্যের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। সেই ক্ষতিও একসময়ে সামাল দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে। কিন্তু গোটা রাজ্যের শাসনভার একটি সাম্প্রদায়িক শক্তির কব্জায় একবার চলে গেলে যে মহাসর্বনাশ ঘটে যাবে। বহু দশক এমনকি শতাব্দীও লেগে যেতে পারে। সেই সর্বনাশের হাত থেকে বাংলা ও বাঙালিকে উদ্ধার করতে। ফলে ছোট সর্বনাশকে মেনে নিতেও তাঁরা দ্বিধা করনেনি। মহা সর্বনাশের হাত থেকে বাংলা ও বাঙালিকে রক্ষা করতে। ঠিক এই কারণেই নির্বাচনী পর্বে লেসার ইভিল তত্ত্বের আমদানি করা হয় এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে। রাজ্যের জনগণেরও একটা বড়ো অংশ এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়েই নির্বাচনে রায় দান করেছেন। না, রাজ্য বামফ্রন্ট এই গ্রাউণ্ড রিয়ালিটি রিয়্যালাইজ করে উঠতে পারে নি। উল্টে নিজের পায়ে কুড়ুল মারার মতোই ফ্রণ্টের এক শ্রেণীর কর্মী সমর্থকরা ২১শে রাম ২৬শে বাম তত্ত্বকে নির্বাচনী হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। হয়তো তাঁদের নির্বাচনী কৌশল এটাই ছিল যে, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। পদ্মফুল চাষ করে ঘাসফুল সাফ করা। অনেকটা যেন পাড়ায় পাগলা কুকুরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাঘ ডেকে আনার মতো বিষয়। হয়তো তাঁদের আশা ছিল, রাজ্যবাসী তৃণমূলের অপশাসন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তিকে একবার রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় বসালে রাজ্যজুড়ে যে তাণ্ডবলীলা চলতো পাঁচ বছর ধরে, তাতে জ্বলে পুড়ে ২৬শের নির্বাচনে রাজ্যবাসীর পক্ষে বামফ্রন্টের কোলে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকতো না। অর্থাৎ বামফ্রন্টের একটা অংশের কর্মী সমর্থকবৃন্দ রাজ্যবাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন। ২০১১ সালে রাজ্যবাসী বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে কোন কোন সর্বনাশ ডেকে এনেছে! এবং সেটি তাদের পুরোপুরি বোঝার দরকার রয়েছে। সোজা বাংলায় যাকে টাইট দেওয়া বলে। তাঁরা ঠিক সেটিই চেয়েছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল রাজ্যবাসীকে সম্পূর্ণ টাইট দিতে অন্তত একবার সাম্প্রদায়িক শক্তির শাসনের তাপে ও চাপে রাখা দরকার। তাই কি তাঁরা ২১শে রাম ২৬শে বাম তত্ত্বকে বাজারে ছেড়েছিলেন?

রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশই এই তত্ত্বকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়ে রাজ্যকে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতেই বরং লেসার ইভিল তত্ত্বকেই গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। না, বামফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচার রাজ্যবাসীর এই অংশের কাছে আদৌ ভরসা যোগ্য বলে মনে হয়নি। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, বামফ্রন্টের পক্ষে ভোট দিলে সেই ভোট সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হবে। এবং তাঁরা জানতেন বরং ঘাসফুলের পক্ষ ভোট দিলে সেই ভোট সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আপাতত ভাবে প্রতিহত করতে সফল হবে। ২১শের নির্বাচনী ফলাফলে তাই স্পষ্ট, রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশই লেসার ইভিলকে মেনে নিয়েও রাজ্যকে সাম্প্রদায়িক শক্তির কবল থেকে রক্ষা করতেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এবং তাঁদের প্রয়াসই সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদেরকে হিন্দু মুসলিমে ভাগ করার অপপ্রয়াস। উল্টে এই নির্বাচনে রাজ্যের ভোটাররা মূলত সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। পক্ষে রয়েছেন রাজ্যবাসীর প্রায় ৩৮% ভোটার। আর বিপক্ষে প্রায় ৪৮% ভোটার। ফলে বাম ও কংগ্রেস এবং সদ্য গজিয়ে ওঠা আইএসএফ বিধানসভায় সম্পূর্ণ ভাবেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। রাজ্যবাসীর সচেতন অংশের নাগরিকরা বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন রাজ্যের সামনে সবচেয়ে বড়ো সঙ্কট সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান। অথচ রাজ্য বামফ্রন্ট সেই সত্যকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন এবারের বিধানসভা নির্বাচনে। তাঁদের আশা ছিল, নিরন্তর বিজেমূল তত্ত্বের প্রচার করতে পারলেই রাজ্যবাসী পদ্মফুল ঘাসফুল ছেড়ে কাস্তে হাতুরি হাতে তুলে নেবে। তাঁরা অনুধাবনই করতে পারেন নি রাজ্যের ভোটারদের একটা বড়ো অংশই সাম্প্রদায়িক শক্তির সমর্থনে চলে গিয়েছেন। যাঁরা রাজ্যের যত বড়োই সর্বনাশ হয়ে যাক। রাজ্যকে দিল্লীর হাতে তুলে দিতেই বদ্ধপরিকর ছিলেন। যাঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শরিক। যাঁরা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত শক্ত করতেই ২১শের নির্বাচনকে হাতিয়ার করতে ঝাঁপিয়েছে। উল্টো দিকে লেসার ইভিল তত্ত্বে বিশ্বাসীরা এই আসল গ্রাউণ্ড রিয়ালিটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সঠিক সময় মতোই। তাই তাঁরা সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়ে যায়, তারই জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন লাগাতার। বিফলে যায়নি তাঁদের সেই প্রয়াস। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজ্যবাসী সকলে মিলেই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ভোগ ভাগ হতে দেয় নি। মূলত তাঁদের প্রজ্ঞাতেই ২১শের নির্বাচন দ্বিমুখী নির্বাচনে পরিণত হয়ে যায়। সাম্প্রদায়িক শক্তি বনাম অসাম্প্রদায়িক শক্তি। ঠিক যখন পদ্মফুল শিবিরের প্রয়াস ছিল ভোটারদের সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে হিন্দু মুসলিমে বিভক্ত করার।

নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার পর, নির্বাচনী ফলাফলের দিকে নজর রেখে বামপন্থীদের অনুধাবন করতে হবে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের ভোটারদের ৩৮% সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত ধরে ফেলেছে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ভোট যে ভাগ হয়ে যায়নি। সেটা গোটা রাজ্যের পক্ষেই আশীর্বাদ স্বরূপ। আপাতত কিছুটা সময় হাতে পাওয়া গিয়েছে। রাজ্যব্যাপী সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণআন্দোলন সংগঠিত করতে না পারলে বামফ্রন্ট কিন্তু অচিরেই রাজ্য রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে। রাজ্যবাসী যেখানে অনুধাবন করতে পেরেছে, রাজ্যের সামনে আশু বিপদ সাম্প্রদায়িক শক্তির এই বিপুল উত্থান। ৩৮% ভোটারের সমর্থন পাওয়া মানে ত্রিমুখী চতুর্মুখী লড়াই হলে পদ্মশিবিরই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সফল হয়ে যেত। কপাল ভালো নির্বাচনের অভিমুখ দ্বিমুখী করতে সফল হয়েছিল সচেতন রাজ্যবাসী। এই সত্যটুকু বামফ্রন্ট শিবিরের বোঝা দরকার। আর দেরিতে হলেও সেই অনুধাবনটুকু করতে পেরেই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জোরালো অবস্থান না নিতে পারার কারণকেই নির্বাচনী ভরাডুবির অন্যতম কারণ হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। রাজ্যের ভোটারা যে বিজেমূল তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। নির্বাচনী ফলাফল কিন্তু তারই প্রমাণ। পদ্মফুল আর ঘাসফুলের ভিতর তলায় তলায় যে সম্পর্কই থাকুক আর নাই থাকুক। রাজ্যের ভোটারদের কাছে সাম্প্রদায়িকতার সমর্থন আর বিরোধীতাই মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল একুশের নির্বাচনে।

ভুল ভ্রান্তির অনুধাবন যত শীঘ্র হয় ততই মঙ্গল। কিন্তু সেটুকুই সব কথা নয়। মাত্র একদশক সময়সীমায় যতখানি রাজনৈতিক জমি ও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হয়েছে বামফ্রন্টকে। ততখানি রাজনৈতিক জমি ও গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেতে অনেক মেহনত করতে হবে। অনেক ঘাম ও রক্ত ঝরাতে হবে। অনেক খোলনলচে বদলাতে হবে। এবং সকলের আগে নিজেদের ভিশন ঠিক করে নিতে হবে। মিশনে পৌঁছাতে গেলে এই সুস্পষ্ট ভিশন থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরী। ক্ষমতায় ফিরতে গেলে আগে তাঁদের প্রধান বিরোধী দলের জায়গাটির দখল নিতে হবে। ঘাসফুলের অপশাসনের বিপ্রতীপে একটা গ্রহণযোগ্য বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে গেলে এই প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠাই এক এবং একটি মাত্র পথ। বিগত এক দশকে বামপন্থীদের সবচেয়ে বড় ব্লাণ্ডার হয়েছে রাজ্যের বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের দেখতে না চাওয়া। চৌঁত্রিশ বছরব্যাপী শাসন ক্ষমতায় থাকার দম্ভে ও অভ্যাসে ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও তাঁরা নিজেদেরকে শাসক বিরোধী শক্তিতে দেখতে চাননি। মুখ আয়নায় প্রতিদিন শাসকের মুখ দেখতে থাকার অভ্যাসকে তাঁরা এক দশকেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এইখানেই তাঁরা আটকিয়ে রয়েছেন। এই শাসকশ্রেণীর মনস্তত্ত্ব থেকে বেড়িয়ে না আসতে পারলে, রাজ্য বামফ্রন্টের পক্ষে রাজ্য রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা মুশকিল হয়ে যাবে। শুরু করতে হবে একে বারে শূন্য থেকেই। কিন্তু তার আগে প্রধান বিরোধী দলের জায়গাটি দখল করার লড়াইটা শুরু করাই আসল কথা। রাজ্য বামফ্রন্ট কি সেই পথ বেছে নিতে রাজি হবে? ফলে লড়তে হবে দুইটি ফ্রন্টে। একদিকে শাসক দলের দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরোধীতা। অপর দিকে রাজ্যবাসীর চেতনায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। আর সেইটি করতে গেলে সমান ভাবে কেন্দ্র সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠতে হবে। কেন্দ্রের দুর্নীতি ও জনবিরোধী নীতি ও আইনগুলির বিরুদ্ধে সরব হতে হবে মাঠে ময়দানে। সংগঠিত করতে হবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণআন্দোলন। কিন্তু এসব কোনকিছুই অনলাইনে ঘরে বসে মিম তৈরী করে হবে না। তার জন্যে মানুষের ভিতরে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আপদে বিপদে। রেড ভলেন্টিয়ার্সের মতো। কান্তি গাঙ্গুলির মতো। ভোট পাওয়া না পয়াওয়ার হিসেব ভুলে মানুষের দরজায় গিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। মানুষ কি চাইছে। তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি কি কি। মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে না পারলে, সমষ্টিগত সমস্যার কথা বলে জনসমর্থন পাওয়া সহজ নয়। এই সত্যটুকু বামপন্থীরা যত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবে। তত লাভ।

সেই সাথে মনে রাখতে হবে। বিশ্বায়নের হাত ধরে পরিবর্তিত জনমানসে স্থান পাকা করে নিতে গেলে পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকের বামপন্থী লড়াইয়ের মকশো করলে কোন লাভ হবে না। ফল হবে শূন্য। সময় বদলিয়ে গিয়েছে। যুগমানস পাল্টিয়ে গিয়েছে। এই সময়ের সমস্যা ও সঙ্কটকে অর্ধ শতাব্দী পূর্বের সমাধান দিয়ে দূর করা সম্ভব নয় আর। ফলে বামপন্থীদেরকে নতুন করে পথ খুঁজে নিতে হবে। সেটাই সময়ের দাবি। কিন্তু সে কাজ পাকা চুলের মাথাদের দিয়ে আর হবে না। কোনভাবেই। তাঁরা থেমে গিয়েছেন। নতুন দিনের কথা নতুন মানুষের ভাষা অনুধাবন করার শক্তি তাদের থাকার কথা নয় আর। সেটাই যুগধর্ম। ফলে পথ দেখাতে হবে নতুন প্রজন্মদেরই। তাতে ভুল হবে অনেক। কিন্তু সংশোধনবাদী মনকে সজীব ও সতেজ করে রাখলে, দ্রুত সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব হবে। এবং আরও একটি বিষয়ে পরিস্কার ধারণা রাখার দরকার রয়েছে। রাজ্যের সমস্যা একান্ত ভাবেই রাজ্যের। সেই সমস্যাকে সবসময়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে বিচার করতে গেলে, জনসমর্থন পাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ জনগণ সব কিছুর গভীরে গিয়ে পৌঁছানোর শক্তি ধরে না। তাঁর পাশে গিয়ে পৌঁছাতে গেলে তাঁর ভাষাতেই সংযোগ করতে হবে। এই একটি বিষয়ে অধিকাংশ বামপন্থীদেরই বিশেষ কোন ধারণা থাকে না। অর্থাৎ সমস্যার সাথে মোকাবিলা করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে ঝুঁকি থাকে। সেটি আসে সমস্যার তাত্বিক বিশ্লেষণ থেকেই। জনগণ তত্ত্বকথার ধার ধারে না। ফলে আগে জনমানসের ভাষার সাথে অভ্যস্থ হতে হবে নিজেদের। না হলে জনমানসের আশা আকাঙ্খার পাশে দাঁড়ানো সম্ভব নয় কখনোই। বামপন্থীদের আজকে বুঝতে হবে। তাঁরা কি বুঝছেন সেটা তত বড়ো কথা নয়। জনমানস কি বুঝছে সেটাই আসল কথা। জনগণকে বোঝাতে পারার দায় নিতে হবে না। জনগণের দাবিকে বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব তুলে নিতে হবে কাঁধে। জনমানসের সেই দাবির সাথে কত তাড়াতাড়ি ফাইন টিউনিং করে নেওয়া সম্ভব হয়, সেটাই মুখ্য। না হলে তাঁদের পক্ষে কখনোই আর জনমানসের সামনে প্রকৃত একটা বিকল্প পথ মেলে ধরা সম্ভব হবে না। জনগণ একটি অপশাসন থেকে মুক্তি পেতে আরও একটি অপশাসনের খপ্পরে পড়ে তখনই। যখন প্রকৃত একটা বিকল্প পথ কোন রাজনৈতিক শিবির প্রস্তুত করে দিতে পারে না। বিগত এক দশক সময়সীমায় বামফ্রন্ট ঠিক এই কাজটি করতেই ব্যর্থ হয়েছে ধারাবাহিক ভাবে। আর সেই পথ দিয়েই রাজ্যে উত্থান ঘটিয়েছে এক সংগঠিত সাম্প্রদায়িক শক্তি।

তাই যে কথা জনগণ বুঝে গিয়েছে, সেই কথা বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব এবারে বামপন্থীদেরই। একদশকের তৃণমূলী অপশাসনের থেকেও বড়ো সমস্যা, এই সম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানই। ফলে আশু বিপদের হাত থেকে আগে উদ্ধার করতে হবে রাজ্যকে। মনে রাখতে হবে রাজ্যের ৩৮% ভোটারই এই সাম্প্রদায়িক শক্তির খপ্পরে পড়ে গিয়েছে। ফলে যুদ্ধটা কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন যুদ্ধেই অংশ নিতে হবে। না হলে রাজ্য রাজনীতিতে সম্পূর্ণ ইতিহাস হয়ে যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। সেই সাথে মানুষের সামনে সুশাসনের একটা বিকল্প রাজনৈতিক পথরেখাও প্রস্তুত করে তুলতে হবে। সরকারী স্তরে প্রশাসনিক অদক্ষতার বিরুদ্ধে শাসকদলের প্রতিটি দূর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের প্রতিদিনের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে। জনগণ দায় পড়ে ভোট দেবে তবে বামপন্থীরা ক্ষমতায় ফিরবেন। এমন কষ্টকল্পনা থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই ভালো। আজকের জনগণের সম্যসার উত্তর খুঁজে পেতে হবে আজকের সময় বাস্তবতার শর্তাবলী থেকেই। এই রাজ্যের বিপদের হাত থেকে রাজ্যকে উদ্ধারের উপায় খুঁজে নিতে হবে রাজ্যের সমাজ বাস্তবতার ভিত্তিমূল থেকেই। আজকের বামপন্থীদেরকে গিয়ে পৌঁছাতে হবে রাজ্যের মর্মমূলে। না হলে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদের তত্ত্ব আউড়িয়ে ভারতব্যাপী সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে কাজের কাজ কিছুই হবে না। মাঝখান থেকে শাসক বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের দখল নিয়ে রাখবে চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির অক্ষগুলিই। জনগণকে তখন তাদের পাতা ফাঁদে আজ না হোক কাল ঠিকই পড়তে হবে।


৯ই জুলাই’ ২০২১
কপিরাইট সংরক্ষিত
Read More »

আপনার ফেসবুক একাউন্ট সুরক্ষিত?

5 | জুলাই ০৮, ২০২১ | | |
শব্দের মিছিল

আপনার FACEBOOK-এর সমস্ত তথ্য চুরি করছে এই 9 অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, আপনার ফোনে নেই তো?

অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের সাথে সর্বদা সুরক্ষা নিয়ে ঝুঁকি থাকে। থার্ড পার্টি লগইন সুবিধা চালু হওয়ার পরে এটি আরও বেড়েছে। Doctor Web নামের একটি ম্যালওয়্যার বিশ্লেষক 10টি এমন অ্যাপকে চিহ্নিত করেছেন যা ফেসবুকের ডেটা চুরি করছিল,  যেমন ইনবক্স, এলবাম এর লকিং ইমেজ, টাইমলাইন এর যাবতীয় পোস্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট।  এই  অ্যাপগুলির অধিকাংশ এখনও গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যায়, যদিও সেগুলি ধীরে ধীরে সরানো হচ্ছে। এই সমস্ত অ্যাপগুলি আপনার জন্য বিপজ্জনক। এগুলি সঙ্গে সঙ্গে ফোন থেকে মুছে ফেলা উচিত। আসুন জেনে নিই এই অ্যাপস সম্পর্কে ...

PIP Photo

PIP Photo একটি ফটো এডিটর অ্যাপ যা Lillians দ্বারা নির্মিত করা হয়েছে। এই অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে 5,000,000 বারেরও বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে।

Processing Photo

এটি একটি ফটো এডিটিং অ্যাপ্লিকেশন এবং 5,000,000 এরও বেশি ডাউনলোড করেছেন। এই অ্যাপটি hikumburahamilton তৈরি করেছে।

Rubbish Cleaner

এই অ্যাপটি ইউটিলিটি ক্যাটাগরিতে লিস্ট করা হয়েছে। এটি একটি মেমরি ক্লিনার অ্যাপ যা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে 1,000,000 বারেরও বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। এই অ্যাপ SNT.rbcl দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।

Horoscope Daily

এটি একটি রাশিফলের অ্যাপ যা 1,000,000 বারের বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। এই অ্যাপটি HscopeDaily momo দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।

Inwell Fitness

এটি একটি ফিটনেস অ্যাপ। গুগল প্লে স্টোরে কয়েক মিলিয়ন ফিটনেস অ্যাপ রয়েছে। এই অ্যাপ 5,000,000 বার ডাউনলোড করা হয়েছে তবে এটি ফেসবুকের পাসওয়ার্ড চুরি করেও ধরা পড়েছে।

App Lock Keep

এই অ্যাপ লকার অ্যাপটি 5 হাজারেরও বেশি ডাউনলোড হয়েছে। এই অ্যাপটি Sheralaw Rence দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।

Lockit Master

এই অ্যাপটি 5,000,000 বারেরও বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। এই অ্যাপ Enali mchicolo তৈরি করেছে।

Horoscope Pi

এটিও একটি রাশিফল ​​অ্যাপ্লিকেশন তবে মাত্র 1,000 লোক এটি ডাউনলোড করেছে যদিও এই অ্যাপটিও বিপজ্জনক। এই অ্যাপ Talleyr Shauna তৈরি করেছে।

App Lock Manager

এই অ্যাপ্লিকেশনটিও জনপ্রিয় নয় তবে এটি সুরক্ষার জন্য অবশ্যই বিপজ্জনক। মাত্র 10 জন এই অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন। এই অ্যাপটি Implummet col তৈরি করেছে।

উল্লেখিত  অ্যাপগুলো আপনার মোবাইলে ইন্সটল করা থাকলে এখুনি বিলম্ব না করে সম্পুর্ন ভাবে আনইন্সটল করে মোবাইল টির পাওয়ার বন্ধ করে দিন। কিছু পর মোবাইলটি সাধারণ ভাবেই চালু করে দিন।

যে কোন সোশ্যাল লিংক থেকে অ্যাপ, আপনার ফোনে আপনার মোবাইলে ইন্সটল করবেন না। গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটির রিভিউ এবং নীতিমালা দেখে ডাউনলোড করুন। মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু ফেসবুক নয় , যে কোন সোশ্যাল একাউন্টে হ্যাকাররা অতি সক্রিয়। সুতরাং সাবধান।
Read More »

শনির বচন | বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা

5 | জুলাই ০৩, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

“For the judiciary to apply checks on governmental power and action, it has to have complete freedom. The judiciary cannot be controlled, directly or indirectly, by the legislature or the executive, or else the rule of law would become illusory.” – N.V Ramana. Chief Justice Supreme Court of India.


না, ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নতুন কোন কথা বলেন নি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা সম্বন্ধে সকলেই ঠিক যেমনটি আশা করে থাকে, সেই কথাই তিনি বলেছেন মাত্র। আর এইখানেই উঠে পড়ছে খুব স্বাভাবিক কয়েকটি প্রশ্ন। হঠাৎ করে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে এমন একটি সর্বজনবিদিত কথা নতুন করে বলতে হলো কেন? হ্যাঁ এটা ঠিক যে, বিচারপতি এই কথাগুলি সর্বোচ্চ আদালতে বসে বলেননি। বলেছেন একটি অনুষ্ঠানে। কিন্তু ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, তিনি যেখানেই কিছু বলুন না কেন। সে কথার গুরুত্ব কিন্তু অনেক। ফলে তাঁর এই কথাকে কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা যদি নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন না হয়। তাহলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাই বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন রাখার দায় কিন্তু সকলের। বিচারব্যবস্থা একমাত্র সংবিধানের অধীনে থেকে দেশের আইন অনুযায়ী কাজ করবে। এমনটাই প্রত্যাশিত। সেখানে বিচারব্যবস্থার উপরে সরকার ও প্রশাসনের কোন প্রভাব থাকা কোনভাবেই কাম্য নয়। যদি থাকে, তবে বুঝতে হবে দেশের গণতন্ত্রই বিপন্ন। গণতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার এই পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি যে কোন সাধারণ নাগরিকের চেতনাতেই স্পষ্ট থাকে। অন্তত থাকারই কথা। তার জন্য কাউকে আইন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে হয় না। ফলে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি যে কথা বলেছেন, সেই কথা যে কোন সচেতন নাগরিকেরও কথা। সাধারন মানুষ দেশের সুপ্রীম কোর্টের দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু এই কারণেই। সুপ্রীম কোর্ট রাষ্ট্রযন্ত্রের উর্ধে উঠে সরকার ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন রায় প্রদান করবে। দেশের সংবিধান নির্দেশিত পথরেখা ধরে। যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকই সেই দেশের সুপ্রীম কোর্টের কাছে এমনটাই প্রত্যশা করে থাকে। অন্যথায় অসহায় নাগরিকের কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর বোধহয় কিছু করার থাকে না। এবং রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সংবিধান বিরোধী কোন পদক্ষেপও গ্রহণ করে। তবে সুপ্রীম কোর্টই একমাত্র তার বিরুদ্ধে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজকর্মের উপরেও সুপ্রীম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরী।

আমরা প্রায় প্রতিটি সচেতন নাগরিকই এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। প্রধান বিচারপতির এই কথাগুলি আমাদেরও কথা। তা সত্ত্বেও কেন তাঁকে এই কথা স্মরণ করতে হচ্ছে? বা স্মরণ করাতে হচ্ছে? প্রশ্ন তো এইখানেই। তাহলে কি আমাদের ধরে নিতে হবে। প্রধান বিচারপতি মনে করছেন। বর্তমান ভারতবর্ষে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার উপরে সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জারি করা শুরু হয়ে গিয়েছে? বিচারব্যবস্থা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে না? বাধা আসছে সরকার ও তার প্রশাসন থেকেই। বিচারব্যবস্থাকে সরকারী প্রশাসনের স্বার্থরক্ষা করে চলতে হচ্ছে? আমরা জানি না, প্রধান বিচারপতি তাঁর ভাষণে ঠিক এই কথাগুলিই বলতে চেয়েছেন কিনা। আমরা জানি না, এমনটাই তিনি নিজে বিশ্বাস করেন কিনা। কিন্তু এ কথা ঠিক। তাঁর বলা কথার ভিতরে এই না বলা কথাগুলিই কিন্তু উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। আমরা সেদিকে নজর দিতে নাও চাইতে পারি। কিন্তু আমরা নজর দিই আর না দিই। সত্য কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না তাই বলে। যাঁরাই একটু খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা জানেন। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে এনডিএ সরকার ন্যাশানাল জুডিশিয়্যাল এপয়েনমেন্ট কমিশন তৈরী করে। সারা দেশের সকল আদালতের বিচারপতি নিয়োগ করার জন্যে। খুব স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই বোঝা যায়। উদ্দেশ্য, সরকারের কিছু ইয়েসম্যানকে বিভিন্ন আদালতে নিয়োগ দিয়ে বিচারব্যবস্থার মাথায় বসিয়ে দেওয়া। কিন্তু এর আগে আমাদের সংবিধানের নির্দেশিত পথে সুপ্রীম কোর্ট কলেজিয়ামই বিভিন্ন আদালতে বিচারপতি নিয়োগ করতো। সেই ক্ষমতা সুপ্রীম কোর্টের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সদ্য নির্বাচিত এনডিএ সরকার নিজের হাতে নিয়ে নিতেই এই কমিশন গড়ে তোলে। যে কমিশনের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভাবেই নির্বাচিত সরকার তথা শাসকদলের হাতে থাকার কথা। আর এই কমিশনের মাধ্যমেই শাসকদল তার পছন্দ মতো বিচারপতিদের নিয়োগ করে দেশের আইন আদালত বিচারব্যবস্থাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়েছিল ২০১৪ সালে শাসন ক্ষমতা দখল করেই। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় নির্বাচিত হয়ে প্রথমেই সেই গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে তোলার ব্যবস্থার প্রথম ধাপ রচিত হয়েছিল এই কমিশন সৃষ্টির ভিতর দিয়েই। সুখের কথা, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে সুপ্রীম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই অসাংবিধানিক ন্যাশানাল জুডিশিয়্যাল এপয়েন্টমেন্ট কমিশনকে আইনসিদ্ধ ভাবে বাতিল করে দেয়।

একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। সরকারের পরিকল্পনা কোন অভিমুখে এগোতে চাইছে। সরকার সর্বতো ভাবেই দেশের বিচার ব্যবস্থার উপরে একটা সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে প্রত্যাশী। সুপ্রীম কোর্ট নয়। একটা সুপ্রীম সরকার গঠন করাই সরকারের লক্ষ্য। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের উপরে এমন চরম আঘাত এর আগে এসেছে বলে আমাদের জানা নেই। বিচারপতি রামানা কি তাহলে তাঁর ভাষণে এই পরিস্থিতির দিকেই ইংগিত করেছেন? তাই কি তিনি তাঁর ভাষণে খুব সুস্পষ্ট করেই বলতে চেয়েছেন, সরকারের ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ডের উপরে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যেই বিচারব্যবস্থার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় থাকা জরুরী? কারণ বিচারব্যবস্থাই যদি সরকার ও প্রশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রীত হতে থাকে। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে। তাহলে সত্যিই তো আইনের শাসন কথাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকের পক্ষে সে বড়ো সুখের সময় নয়। আর তখনই একাধিক প্রশ্ন ঘিরে ধরে। একটা সরকার যখন দেশের বিচারব্যবস্থার উপরে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে স্বচেষ্ট হয়ে ওঠার প্রয়াস করে। তখন বুঝতে হবে, সেই সরকার একটা পথে এগোতে না পারলে আরও দশটি পথ খুঁজে নেবে। আর এই আলোতে যদি আমরা ভাবতে শুরু করি। যদি বিগত সাত বছরের সময়কে বুঝতে চেষ্টা করি। তাহলে আরও ভালোভাবে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠতে পারে। আমরা দেখেছি সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে কর্ম থেকে অবসর গ্রহণের পরপরই একজন ভুতপূর্ব বিচারপতিকে রাজ্যসভার সদস্য হয়ে যেতে শাসকদলের প্রার্থী হিসাবে। এটও ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে বেশ অভিনব। এখন যিনি এইভাবে রাজ্যসভার সদস্য হয়ে গেলেন। শাসকদলের বদান্যতায়। তিনি যে শাসকদলের স্বার্থরক্ষায় পূর্বে কিছু করেন নি। তার নিশ্চয়তা কি? এই প্রশ্নগুলি ধামাচাপা পড়ে গেলে গণতন্ত্রের পক্ষেই অশনিসংকেত। ফলে সরকার যদি যে কোন ভাবেই হোক তার পছন্দের মানুষদেরকেই বিচারব্যবস্থার শীর্ষপদে বসাতে সক্ষম হয়ে যায়। তবে ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচারের বিষয়টিই প্রহসনের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। বিচারব্যবস্থাকে তাই সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখা ও স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে দেওয়ার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী।

এরই সাথে আমরা আরও একটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে চাইবো। বিচারব্যবস্থা শুধুমাত্র স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হলেই হবে না। তাকে ঠিকমত কাজও করতে হবে। অবশ্য এও ঠিক। বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন না হলে ঠিকমত কাজই বা করবে কোন পথে। আমরা দেখেছি, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপের প্রক্রিয়া নিয়ে সুপ্রীম কোর্টে দায়ের করা মামলার শুনানী আজও শুরুই হয়নি। ৩৭০ ধারা বিলোপের প্রক্রিয়া সংবিধান সম্মত ভাবে করা হয়েছিল কিনা। আজও সেই প্রশ্নের কোন মিমাংসা হলো না। অথচ চলে গেল প্রায় দু দুটি বছর। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ কতটা সংবিধান সম্মত। সেই বিষয়েও দায়ের করা মামলা আজও ঝুলিয়ে রাখা রয়েছে সুপ্রীম কোর্টেই। কেটে গিয়েছে দেড় বছরের বেশি সময়। উল্টোদিকে এই আইনের বিরোধীতায় পথ নামা বহু মানুষকে আজও বিনা বিচারে আটক থাকতে হচ্ছে। সুপ্রীম কোর্টে ঝুলছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। তিন কৃষি আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও প্রায় এক বছর হতে চলল মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু মামলা এখনো কোর্টে ওঠেনি। আন্দোলনরত কৃষকরা পড়ে রয়েছেন দিল্লীর সীমানায় রাজপথে। একটানা সাত মাস। দেশের আইন দেশের আদালত যদি ঠিক মতো কাজই করতে না পারে, তাহলে আইনের শাসন কথাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। যেকোন সংবিধান বিশেষজ্ঞরাই জানেন। সুপ্রীম কোর্ট যদি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে উপরিউক্ত মামাল দুইটির বিচার করে। তবে ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ অসাংবিধানিক বলে বাতিল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন মাসের পর মাস মামলা দুইটিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কোনরকম শুনানী শুরু হয় না ঠিকমত। তখন সত্যিই সন্দেহ জাগে। সত্যিই কি সুপ্রীম কোর্ট স্বাধীনভাবে কাজ করার মতো অবস্থায় রয়েছে? না কি তার উপরে সরকার ও তার প্রশাসনের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোন চাপ রয়েছে। যে কারণে মামলাগুলি এইভাবে দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা রয়েছে? আর ঠিক এইখানেই জাস্টিস রামানার বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমরা দেখি আর না দেখি। তাঁর কথাগুলিকে এড়িয়ে যাওয়ার সত্যিই কি আর কোন উপায় রয়েছে?

আবার এই সুপ্রীম কোর্টকেই আমরা দেখেছি সঠিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র লোক পরম্পরায় জনশ্রুতি ও বিশ্বাসের উপরে নির্ভর করেও রায় দান করতে। যে রায় বর্তমান শাসকদলের অন্যতম প্রধান ও ঘোষিত এজান্ডার পক্ষে গিয়েছে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাসে যে রায় সত্যিই অভিনব। অর্থাৎ ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার বিষয়টি আজ আর প্রশ্নের উর্ধে নয় কিন্তু। প্রশ্নের উর্ধে যে নয়। সেকথা সুপ্রীম কোর্টেরই প্রধান বিচারপতির দেওয়া ভাষণেই সুস্পষ্ট। অর্থাৎ আশনিসংকেত কিন্তু দেখা যাচ্ছে। আমরা দেখি বা না দেখি। এরই ভিতর আশার আলো একটিই। দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের প্রধান নিজেই এই অশনিসংকেত আমাদের সমানে তুলে ধরেছেন। এর একটা সদর্থক প্রভাব, আমদের সমাজে পড়া উচিৎ। মানুষের সচেতন প্রজ্ঞার একটা সমন্বিত ঢেউ ওঠা আবশ্যক। নাগরিক সমাজের অন্তর থেকে। না হলে এত বড়ো দেশের গণতন্ত্র আর বেশিদিন টিকবে বলে আশা করা কষ্টকর। গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ সংবিধান নিজে কোন কাজ করতে পারে না। তাকে নির্ভর করতে হয় দেশের বিচারব্যবস্থার উপরে। সেই বিচারব্যবস্থাই সংবিধানের হয়ে সংবিধানের অধীনে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করতে থাকে। আর সেই কাজের জন্যেই বিচারব্যবস্থার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা একান্ত জরুরী। জাস্টিস রামানা হয়তো ঠিক এই কথাটিই আমাদের অনুধাবন করতে বলছেন। কিন্তু আমরা কি শুনছি আদৌ? শুনবো তো? কারণ আমাদের হাতেই কিন্তু সঠিক সরকার নির্বাচনের দায় ও দায়িত্ব।


৩রা জুলাই’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত





Read More »

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.