x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

শনির বচন | নাইন-ইলেভেন কুড়ি বছরের খতিয়ান

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১ |
শব্দের মিছিল

অপপ্রচার মিথ্যাচার ধোঁকাবাজি লোকঠকানো ফেকনিউজ আর মানুষ খুনের কুড়ি বছর। যার গালভরা নাম নাইন-ইলেভেন। না, আজও বিশ্বের কোন তদন্তে কোন আদালতে কোন দেশের আইনে এটা প্রমাণিত হয়ে যায়নি যে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার বিন লাদেন ও তার সংগঠন আলকায়দাই ধ্বংস করেছিল। এটাও প্রমাণিত হয়নি যে বিন লাদেনের সাথে তালিবানদেরও এই ষড়যন্ত্রে কোন যোগ ছিল। এমনকি আজও প্রমাণ করা যায়নি, সত্যিই কোন প্লেন টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে আঘাত হেনেছিল কিনা। কিন্তু বিশ্বের বরেণ্য পদর্থবিদরা এটা বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কোন প্লেনের পক্ষেই টুইন টাওয়ারকে ঐরকম ভাবে তাসের ঘরের মতো ধূলিস্যাৎ করে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয় যদি না আগে থেকেই টাওয়ার দুইটির ভিতরে বিস্ফোরক মজুত রাখা থাকে। কিন্তু প্রায় শতাধিক বিজ্ঞানী যে বিষয়ে নিঃসন্দেহ। সেই বিষয়টিকেও মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় চেপে যাওয়া হয়েছে। কোন আদালত কর্তৃকও কোন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকেও সেই বিষয়ে কোন তথ্য সম্প্রচারিত হয়নি। ফলে আসল সত্যগুলি এই কুড়ি বছর পরেও সাফল্যের সাথে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

না, কিভাবে টুইন টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল। ঠিক কোন কোন দেশ সেই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগত ভাবে কতক্ষণ আগে থেকে জানতেন টুইন টাওয়ার ধ্বংস হতে যাচ্ছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মাস খানেক আগে টাওয়ার দুইটি’র মালিকানা কার নামে বদল হয়েছিল। তিনি টাওয়ার দুইটির বীমা বাবদ কত টাকা লাভ করেছিলেন। সেইসব বিষয় নিয়ে বিগত কুড়ি বছরে যত তথ্য উঠে এসেছে সেই বিষয়ে আজ আমাদের আলোচনা নয়। আগ্রহী পাঠক ইনটারনেট সার্চ করে বিভিন্ন প্রামাণ্যসূত্র থেকে আসল সত্য ও তথ্যগুলির সন্ধান করে নিতে পারেন। আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি। দুনিয়া জুড়ে মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজির সিণ্ডিকেটের রকমসকম। টাওয়ার ধ্বংসের পরপরই ঘোষণা করে দেওয়া হলো বিন লাদেন ও তার সংগঠন আলকায়দা মার্কিন ভুখণ্ডে আত্মঘাতী বিমান হানা চালিয়েছে। না কোন তদন্তের পরে এই ঘোষণা করা হয়নি। ঘটনার আকস্মিকতার ভিতরেই সমস্ত প্রচার মাধ্যম একযোগ বিন লাদেন ও আলকায়দাকে কাঠগড়ায় তুলে দিয়েছিল। কারা কারা বিমান হাইজ্যাক করেছিল। তাদের ঠিকুজিকুলুজি সমেত ছবি ফলাও করে প্রচারিত হয়ে গেল। কি নিখুঁত পরিকল্পনা। এতবড়ো কাণ্ড ঘটে গেল। পুরো টুইন টাওয়ার ভষ্মীভুত হয়ে গেল। অথচ মহম্মদ আটার পাসপোর্ট কুড়িয়ে পাওয়া গেল ম্যানহাটনের রাস্তায়। সেটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল না। এবং অক্ষত অবস্থায় এসে উঠল মার্কিনদের হাতে। সারা বিশ্বকে বেকুব বানানোর অস্ত্র হিসাবে।

আসল গল্পের শুরু তার পর থেকেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই শতাব্দীর সেরা বাণী। হয় আমাদের সঙ্গে থাকো। নয় আমাদের আক্রমণের শিকার হও। অর্থাৎ মার্কিনশক্তির বশংবদ হয়ে তাদের দাসত্ব স্বীকার করে না নিলে মার্কিনশক্তির মিসাইল ও বোমারু বিমানের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে হবে। তা সে, যে দেশ বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। ফলে শুরু হয়ে গেল আক্রমণের অশ্বমেধ ঘোড়ার দৌড়। আফগানিস্তান আক্রমণের সময়ে মার্কিনশক্তি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিল। পৃথিবী থেকে তালিবানদের সমূলে বিনাশ করার কথা। জানিয়েছিল আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার কথা। জানিয়েছিল গোটা বিশ্ব থেকে টেররিজম নির্মূল করার কথা। ইরাক আক্রমণের সময়েও সেই একই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাঁধা গত। সাথে সাদ্দাম হোসেনের গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কারবার ধ্বংসের গল্প। লিবিয়ার গদ্দাফীর বেলাতেও একই কথার এপিঠ আর ওপিঠ। অর্থাৎ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের একটি ঘটনায় এই মার্কিনশক্তি বিশ্বের যেকোন দেশকে যেকোন সময়ে ধ্বংস ও পদানত করে দখল করার অধিকার পেয়ে গেল। আর বাকি বিশ্ব দুইবাহু তুলে মার্কিনশক্তির সেই অন্যায্য অধিকারকেই স্বীকৃতি দিয়ে দিল। একটা ধোঁকাবাজি সারা বিশ্বকেই মার্কিন শক্তির পদনত করে ফেলল। ফলে এক অনবদ্য ধোঁকাবাজিকেই প্রোপাগাণ্ডা হিসাবে চালিয়ে যাওয়া হল দুই দশক ধরে। বিশ্ব টেররিজমের বিরুদ্ধে বিশ্বের একমাত্র রক্ষাকর্তা না’কি মার্কিনশক্তি। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস কেন, গোটা মানব জাতির ইতিহাসে এর থেকে বড়ো ধোঁকাবাজি আর নাই।

বিশ্বরাজনীতির ণত্ব ষত্ব যাঁদের কিছুটা হলেও জানা আছে। তাঁরা জানেন। মার্কিন অর্থনীতি বিগত তিন দশক জুড়ে এই একটি ধোঁকাবাজির উপরেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে টেররিজমের চাষই মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখে। বিশ্বের নানা প্রান্তে যত বেশি টেররিজমের জুজু কায়েম হতে থাকবে। মার্কিন সমরবাণিজ্য তত বেশি ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকবে। আর সেই টেররিজমকে যদি ইসলামিক টেররিজম নাম দেওয়া যায়, তবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের খনিজতেলের বাণিজ্যকে মার্কিনশক্তির নিয়ন্ত্রণে ও স্বার্থে কায়েম রাখা যায় একদিকে। অন্যদিকে গোটা বিশ্বে ইসলামিক টেররিজমের জুজু দেখিয়ে অস্ত্র ব্যাবসার বাজার বাড়িয়ে তোলা যায়। আর এইখানেই নাইন-ইলেভেনের ধোঁকাবাজির আসল কার্যকরিতা। গোটা পৃথিবীকে বেকুব বানিয়ে রেখে দুই দশক ধরে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল লুঠের কারবার। আর অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে টেররিজমের চাষ চালিয়ে অস্ত্রবাণিজ্যের বাজার বৃদ্ধি করে মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখা। আর গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত আত্মপ্রচার আর অপপ্রচার। ক্রমাগত ধোঁকাবাজি আর মিথ্যাচার।

হ্যাঁ, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র আনাও সেইরকমই একটা ধোঁকাবাজি ছিল। আফগানিস্তানের মাটি থেকে তালিবানদের নির্মূল করে বিনাশ করাও সেই রকমই একটা ধোঁকাবাজি ছিল। বিশ্ব থেকে টেররিজম উৎখাত করাও সেই রকমই একটা ধোঁকাবাজি। ঠিক যেমন সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কারবারের অভিযোগও একটা ধোঁকাবাজি ছিল। এবং সব শেষে আফগানিস্তানে তিন লক্ষাধিক সৈন্যসহ আধুনিক সমারাস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও একটা বিপুল ধোঁকাবাজি ছিল। এত বড়ো ধোঁকাবাজি ছিল যে, কেবলমাত্র গাদা বন্দুকধারী হাজার ষাটেক তালিবানী পথে নামতেই সেই তিন লক্ষাধিক সৈন্যের সামরিক বাহিনী বেমালুম ভ্যানিশ! এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র। সেও আর এক ধোঁকাবাজি। ধরে ধরে মার্কিনশক্তির বশংবদ কজনকে একটা পুতুল সরকারে বসিয়ে দিলেই একটা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। মার্কিন বন্দুকের ডগায় নকল নির্বাচন সংঘটিত করলেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় না। না, আফগানিস্তান বা ইরাক। লিবিয়া বা সিরিয়া। কোথাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মার্কিনশক্তির লক্ষ্য নয়। প্রতিটি দেশেই একটা বশংবদ পুতুল সরকার স্থাপন করাই তাদের আসল এজেন্ডা। যে সরকার পেন্টাগনের কথায় দুইবেলা ওঠবোস করবে। মার্কিন অর্থনীতিকে পুষ্ট করতে থাকবে স্বদেশের অর্থনীতিকে শোষণ করে। এটাও মার্কিনশক্তির মূল এজেণ্ডা। সেই এজেণ্ডা সফল করে তুলতে গেলেই ধোঁকাবাজি অপপ্রচার মিথ্যাচার এবং ক্রমাগত ফেকনিউজ ছড়িয়ে লোকঠকানো সবচেয়ে কার্যকরি এক পথ। আর সেই পথের শ্রেষ্ঠ পথিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ঠিক এইদিনে যে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। আজ তার কুড়ি বছর পরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রাখলেই মার্কিন যড়যন্ত্রের বিষয়টি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে।

না, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি। মার্কিনদের বসানো পুতুল সরকার একদিনেই ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। না, মার্কিনশক্তি আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের নিঃশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায়নি। উল্টে সেই তালিবানদের সাথেই চুক্তি করে আফগানিস্তান ছেড়েছে। ছাড়ার আগে তালিবানদেরকে বিনারক্তপাতে কাবুলের মসনদে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এবং সেই দিপাক্ষিক চুক্তি মতোই বর্তমান তালিবান সরকার মার্কিন স্বার্থ পুরণে বাধ্য থাকবে। না, কোন দেশ থেকেই ইসলামিক টেররিজম নির্মূল করা হয়নি। বরং বিশ্বজুড়েই টেররিজমের জাল আরও বিস্তৃত হয়েছে। আর যত বিস্তৃত হয়েছে তত মার্কিন অস্ত্রবাণিজ্য বছর বছর ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ফলে শুধুমাত্র মার্কিনশক্তির স্বার্থে আফগানিস্তান সহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যই আজ প্রায় বিদ্ধস্ত। বিপর্যস্ত জনজীবন। বিপর্যস্ত অর্থনীতি। বিপর্যস্ত শিশুদের ভবিষ্যৎ। এবং বিপদগ্রস্ত নারীদের জীবন ও জীবিকা। ইসলামিক মৌলবাদ আরও বেশি করে শিকড় বিস্তার করেছে। নারী স্বাধীনতার পরিসর আরও বেশি করে সংকুচিত হয়েছে। শিক্ষা বিস্তার রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। ধর্মীয় উন্মাদনা ও মৌলবাদের উত্থান হয়েছে, ঠিক যেমনটা চেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসলামিক দেশগুলিতে ধর্মীয় উন্মাদনা ও মৌলবাদের বিস্তার না ঘটালে তাদেরকে শতকের পর শতক ধরে পাশ্চাত্যের স্বার্থের কাছে বশংবদ করে রাখা যাবে না। ফলে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ঠিক এই দিনে যে ষড়যন্ত্রের শুরু হয়েছিল ওয়াশিংটন ডিসি’র হেডকোয়ার্টার থেকে। বিগত কুড়ি বছরে তারই ফসল ঘরে তুলে ফেলেছে মার্কিণশক্তি ও তার দোসরেরা।

১১ই সেপটেম্বর’ ২০২১

Read More »

শনির বচন | আত্মরক্ষার সহজপাঠ

5 | সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২১ |
শনির বচন

প্রশ্নটা তালিবানরা আফগানিস্তান কিভাবে শাসন করবে তা নিয়ে নয়। আফগানিস্তান একটি বিদেশী রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে কখন কোন শাসক কি ধরণের শাসন ব্যবস্থা প্রচলন করবে সেটা সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিষয়। আমরা সেই শাসন প্রণালী সমর্থন করতে পারি। আবার সমর্থন নাও করতে পারি। কিন্তু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। আমাদের মাথা ঘামানো না ঘামানোর উপরে আফগানদের জীবন জীবিকা ভুত ভবিষ্যৎ কোনটিই নির্ভর করবে না। প্রশ্নটা বরং হওয়া উচিত, আমরা কি আমাদের দেশের বর্তমান শাসকের অধীনে সুখে শান্তিতে এবং সমৃদ্ধিতে রয়েছি? প্রশ্নটা হওয়া উচিত, আমাদের রাষ্ট্র কি আমাদের সংবিধানের আদর্শকে সঠিক মাত্রায় রক্ষা করছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত, যে সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কথা বলা রয়েছে আমাদের সংবিধানে, বর্তমান শাসকশ্রেণী কি সংবিধান নির্দেশিত এই শর্তগুলি যথাযথ ভাবে রক্ষা করে চলেছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত সংবিধান নির্দেশিত সমাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায় অর্থাৎ জাস্টিস কি ভারতবর্ষে অক্ষুণ রয়েছে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কি সংবিধান প্রদত্ত ভারতীয় নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংস্কার পালনের স্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং ভক্তি আরাধনার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে? প্রশ্নটা হওয়া উচিত ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে সংবিধান নির্দেশিত সকলের জন্য সমান অধিকার ও সমান সুযোগসুবিধে আদৌ কি সুরক্ষিত রয়েছে? হ্যাঁ এই প্রশ্নগুলির প্রতিটির যথাযথ উত্তর পাওয়া এই সময়ের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নগুলি সকলের আগে নিজেকেই করা উচিত। আমাদের ভিতরে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক কি আদৌ এই প্রতিটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে? না, আফগানদের তালিবানী শাসনের খপ্পরে পড়ে কিরকম দুর্দশা ঘটতে চলেছে ভেবে সময় নষ্ট না করে আমদের অবস্থা বর্তমানে ঠিক কিরকম। সেই বিষয়টি নিয়েই বরং ভাবনা চিন্তা বেশি জরুরী।

সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের অধিকার এই সময়ের ভারতবর্ষে কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেটি যে কোন মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করলেই জানতে পারবে। পিছনে কোন রাজনৈতিক দল বা শিবিরের সমর্থন ছাড়া মত প্রকাশের অধিকার যাঁরাই প্রয়োগ করতে গিয়েছেন তাদের একটা বড়ো অংশই রাষ্ট্রের হাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। বিশেষ করে তাঁরা যদি সরকারের বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন তোলেন তো কথাই নেই। সরকার বা সরকারী দলের পক্ষ নিয়ে নিরন্তর ফেক নিউজ প্রচার করে গেলেও কোন অসুবিধে নেই। সরকার বিরোধী পক্ষের রাজনীতি নিয়ে যখন যা খুশি বলে গেলেও কোন অসুবিধে নেই। অসুবিধে শুরু হবে ঠিক তখনই। যখন কেউ সরকারের নীতি রীতি পদ্ধতি’র বিরুদ্ধে মুখ খুলবে। বর্তমান ভারতবর্ষে আদৌ কোন তালিবানী শাসন চলছে না। কিন্তু যে সংস্কৃতি চালু হয়ে গিয়েছে, সেটি হলো। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ততক্ষণই স্বীকৃত। যতক্ষণ সরকারের বিরুদ্ধে কোন কথা উচ্চারিত হচ্ছে না। এদিকে সংবিধান প্রদত্ত অধিকারে প্রতিটি ভারতীয়েরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু সেই সাথে সরকারের হাতেও একটি ব্রহ্মাস্ত্র রয়ে গিয়েছে। সেটি হলো ইউএপিএ। যে আইনের বলে সরকার যে কোন মানুষকেই যে কোন সময় যে কোন অজুহাতে আটক করে দিনের পর দিন কয়েদ করে রাখতে পারে। মাসের পর মাস বছরের পর বছর বিনা বিচারে এই আইনে আটক থাকার পরে যদি কোন ভাবে প্রমাণিতও হয়। সরকার বেআইনী ভাবে কাউকে আটক করে রেখেছিল। তাহলেও সরকারের শাস্তি বিধান সম্ভব নয় এই দেশে। মামলার দীর্ঘসূত্রীতা আর রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তিতে যে কোন সরকারই বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নির্বাচিত সরকার হলে তো আর কোন কথাই নেই। ফলে সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতাই বর্তমান ভারতবর্ষে কতটা সুরক্ষিত, প্রশ্ন রয়েছে সেখানেও। এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতাই যদি লঙ্ঘিত হয়, হতে থাকে। তবে গণতান্ত্রিক পরিসরই ক্রমশ সংকীর্ণ হতে শুরু করে দেয়। গণতন্ত্র মানেই, পাঁচ বছর অন্তর বুথে বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা নয়। গণতন্ত্র একটা অধিকার। যে অধিকারগুলি একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান স্বীকৃত। সেই অধিকারগুলিই যদি রাষ্ট্র কর্তৃক লঙ্ঘিত হতে থাকে। তাহলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হয়। আফগানিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকার কেন তালিবানের সমানে বিনা প্রতিরোধে ভ্যানিশ হয়ে গেল, সেই প্রশ্নের থেকে অনেক বড়ো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের হাতেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে না’তো? না, উত্তর অন্য কেউ দিলে তো হবে না। উত্তর দিতে হবে ভারতবর্ষের নাগরিকদের।

তখন যদি দেখা যায়, না সংবিধান প্রদত্ত সকল নাগরিক অধিকারগুলিই প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত রয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনে। তাহলে অসুবিধে নেই। কিন্তু যদি দেখা যায়, সংবিধান প্রদত্ত সকল নাগরিক অধিকারগুলি প্রত্যেক নাগরিকের জন্যেই সুরক্ষিত নেই। অর্থবান ও ক্ষমতাবান শ্রেণীর মানুষের জন্যেই শুধু সুরক্ষিত। তাহলে কিন্তু অসুবিধে রয়েছে। তখন আফগানিস্তান আর তালিবানের আলোচনায় নিজের দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করে রাখা যাবে না। গণতান্ত্রিক পরিসরগুলি যদি মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য, বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য, বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের জন্যেই কার্ষকর থাকে শুধু। তাহলে বুঝতে হবে ভারতবর্ষের অবস্থা আফগানিস্তানের থেকে খুব একটা ভালো নয়। সেখানেও তালিবান ও তালিবানপন্থীদের জন্যেই সকল অধিকার ও সুযোগ সুবিধে সংরক্ষিত থাকার কথা। অন্তত, সেটাই প্রথম তালিবানী শাসনে ছিল। সেই একই ধারা যদি ভারতেও চলতে থাকে, অর্থাৎ সরকারপন্থীদের জন্যেই সংবিধানের সকল অধিকার সুরক্ষিত। আর বাকিদের জীবনে সাংবিধানিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত নয়। অধিকাংশ সময়ে সেই অধিকারগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই দারস্থ হতে হচ্ছে আইন ও আদালতের। তাহলে কিন্তু বুঝতে হবে, ভারতবর্ষ আর আফগানিস্তানের ভিতরে পার্থক্য খুব বেশি নেই। আফগানিস্তানে হয়তো তালিবানী শাসনে আফগানরা নিরপেক্ষ আদালতের দারস্থ হতেই পারবে না। কিন্তু ভারতে পকেটে পয়সা থাকলে আদলতের দরজায় এখনো কড়া নাড়া যায় অন্তত। কিন্তু একটা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দেশে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বার বার আদালতের দারস্থই বা হতে হবে কেন? জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারেরই তো প্রধান দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে নাগরিককেই যদি তার সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে প্রতিবার আদলতের শরণাপন্ন হতে হয়, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই বলা চলে ভারতবর্ষে এক ছদ্মবেশী তালিবানী সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তালিবান হয়তো একটা বিশেষ দেশের এক বিশেষ রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু তাদের মতাদর্শ তাদের কর্মসংস্কৃতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গী’র মূল কথাই হলো জোর যার মুলুক তার। আর এটিকেই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে তালিবানী সংস্কৃতি। বাকি বিশ্বের আধুনিক সভ্যতার কোন অনুষঙ্গের সাথেই যার কোন সংযোগ নাই। সাযুজ্য নাই। এবং কেবলমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের কেন্দ্রেই সকল সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রীত। আমাদের প্রশ্ন, ভারতবর্ষেও কি এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগের কেন্দ্রে গোটা দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কার্যক্রম ও অভিমুখ পরিচালিত হচ্ছে না? যে কোন দেশ ও সমাজ যদি এই অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকে। তবে সেই সমাজ ও দেশ ক্রমেই কিন্তু বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। এবং সময়ের উল্টোমুখেই ফিরতে থাকবে। আর সামগ্রিক ভাবেই এই গোটা প্রক্রিয়াকেই তালিবানী ধারা বলা যেতে পারে। না, ভারতবর্ষে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। ভারতবর্ষে একটি সক্রিয় সংবিধান রয়েছে। ভারতবর্ষে একটি সক্রিয় বিচারব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে আফগানিস্তানের সাথে ভারতবর্ষের তুলনা চলে না। কিন্তু যে মুহুর্তে নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলি লঙ্ঘিত হতে শুরু করবে, যদি ইতিমধ্যেই করে থাকে। তবে নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষের অভিমুখ আর আফগানিস্তানের অভিমুখের ভিতর দূরত্ম ক্রমহ্রাসমান বলেই বুঝতে হবে। এবং ঘটনাক্রম যদি সেই দিকেই পরিচালিত হতে থাকে, তবে আফগানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে ভারতীয়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দিন সম্ভবত এসে গিয়েছে। এখন দিন এসে গিয়েছে কিনা, বোঝা যাবে কি করে? খুব সহজ উপায়। প্রশ্ন করতে হবে নিজেকেই। পূর্বেই বলা হয়েছে। নিজেকেই প্রশ্ন করে জানতে হবে দেশের সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের হাতে সুরক্ষিত কিনা। কিংবা কতটুকু সুরক্ষিত। সকলের জন্যেই সুরক্ষিত না’কি শুধমাত্র সরকারপন্থী বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্যেই তা সুরক্ষিত। এই সামান্য কয়টি উত্তরই আমাদের জানিয়ে দেবে আমরা ভারতীয়রা তালিবানের খপ্পর পড়া আফগানদের থেকে কতটুকু বেশি ভালো রয়েছি। আফগানদের জন্য আফগানরা ভাবুক বরং। আমাদের ভাবা দরকার আমাদের জন্য। কারণ আমাদের হয়ে অন্য কোন দেশ অন্য কোন জাতি ভেবে দেবে না। ফলে আমরাই যদি অন্যের জন্য ভাবতে বসে নিজেদের অবস্থা নিয়েই ভাবতে ভুলে যাই বা বড্ড বেশি দেরি করে ফেলি। তখন কিন্তু আমাদেরকে রক্ষা করতে কোন বিদেশী শক্তি এগিয়ে আসবে না। আর আত্মরক্ষা প্রত্যেকের জন্মগত অধিকার। কেউ সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। যদি না আমরা নিজে থেকেই সেই অধিকার বিসর্জন দিয়ে বসে থাকি।

৪ঠা সেপটেম্বর’ ২০২১
Read More »

■ রাহুল ঘোষ | ঘুম, ঘোর ও ঘ্রাণের উপকথা

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০২১ | |
শব্দের মিছিল


ঘুমঘোরে আছি। আসলে, ঘুমে নেই। যেটুকু আছি, ওই ঘোরেই। তবুও ঘোরের গায়ে ঘুমের একটা মেঘলা রঙ লেগে থাকে। তাকে ঝেড়ে ফেলা যায় না। অস্বীকার করা যায় না। তাই ঘুমঘোরে আছি। অথবা কোত্থাও নেই! এই যে 'কোথাও'-এর উপরে বাড়তি একটা 'থ', সেটাই এই থাকার বিশেষত্ব। না-থাকারও। ওখানে কিছু অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। অথবা খুব বিস্ময়ে যেন আক্ষরিকভাবেই 'থ' হয়ে গেল একটা মানুষ! স্তম্ভিত। নীরব। এবং অবশ্যই, নিস্তব্ধ। 

ঘোরের মধ্যে একটা গন্ধ লেগে থাকে। নিবিড় পাতার গন্ধ। জীবনের প্রিয় গন্ধগুলি আমি কোনোদিন ভুলিনি। প্রিয় স্বাদ ভুলিনি। গোপন পাতার ঘ্রাণ মেখে ঘুমোতে যাই; মধ্যযাম পার করে। অথবা ঘোরে যাই। ঘোর ঘন হলে, মুখের উপর কার যেন শ্বাস পড়ে! খুব চেনা শ্বাস। আমি তার নোজরিং দেখি। অথবা ঠোঁটের মুদ্রা। সামান্য অসমান দাঁতের ঝলক। অথচ আমার চোখ বন্ধ! ধড়ফড় করে উঠে বসি। যে-সময়ে উঠে বসি, তাকে ভোর বলা যায় না। অথচ রাতও নয়! সে এক অচিন সময়। সময়টাকে চিনতে পারি না। যাকে চিনতে পারি, সে তখন কোত্থাও নেই।

ওই যে বাড়তি একটা 'থ', তার উপরে জীবন জেগে থাকে। এবং মৃত্যুও। অপেক্ষা জেগে থাকে। এবং প্রার্থনাও। কিছু-কিছু অপেক্ষা মরে যেতে-যেতেও, থেকে যায়! যাপিত সময়ের থেকে রসদ নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু অপেক্ষা মানে, শুধু একটা বিশেষ 'কেউ'-এর জন্য নয়। লোকে যেটা সাধারণত ভাবে। একজন 'কেউ'-ও ভেবে রাখে তাই। অথচ অপেক্ষা মানে, বিশেষ একটা কিছুর জন্য। তার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। পরিধিও। একটা কাম্য পরিস্থিতি। যাকে বলে, ডিজায়ারেবল। একটা বিশেষ কেউ সেই চাওয়ার মধ্যে মানিয়ে গেল কি গেল না, সেই প্রশ্ন আলাদা।

অচেনা সময়ে ঘোর ভেঙে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। এখানে আমার একটা উত্তরের বারান্দা আছে। যেখানে উত্তর খোলা ছিল না, সেখানে পশ্চিমে ছিল। সেও কিছুটা উত্তরঘেঁষা। এখনকার বারান্দা থেকে দিগন্তরেখার দেখা মেলে। তবে একটু দূরে। হাইরাইজের বাধা পেরিয়ে। দিগন্তে কখন কোন তারা খসে গেল, তার খবর এই অসুস্থ সময় রাখে না। মানুষের নির্লিপ্তিও না! আমি এই সময়টাকে বুঝি। ভবিষ্যতের গর্ভে সে তার দায় রেখে যাবে। কিন্তু মানুষকে চেনা আজও সহজ নয়। বরং দিনকে দিন জটিলতর। দায় ঝেড়ে ফেলতে সে ভীষণ পটু! অথচ এখনও দিগন্তরেখায় আমার ফেলে আসা সাদা টি-শার্ট ওড়ে। বিষাদের মতো ওড়ে ডেনিমের ঘন নীল। একটা তামাটে রঙের উঠোন। দুটো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাত। শুধু মুখদুটো কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না বলে, চশমার দিকে হাতড়াই। এই ঘটনাক্রম দেখেই একদিন জন্মান্তরে বিশ্বাস এসেছিল।

তবুও মানুষ মূলত আত্মকেন্দ্রিক। কোনো আকুল আক্ষেপ থেকে উৎসারিত ত্রুটির ক্ষমা জানে না। অন্যায্য অন্যায়ে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার পাপ করে। তবুও কোনো অনুতাপ জানে না! চেনাজানা অপেক্ষার সঙ্গে তাই সে নিজের মনোভাবকেই জড়ায়। তাই তার মনে হয়, অপেক্ষার আর কোনো মানে নেই। এই অপেক্ষা অকারণ। আমি তাকে দোষ দিই না। এও এক পেরিফেরাল ভিশন। যার দেখার পরিধি যতটা। এখানে বিরোধের কোনো ব্যাপার নেই। আমি তার ওইসব ক্ষুদ্রতাকে উপেক্ষা করতে জানি। আমি কিছু নাভিজল চিনি। বিদায়লগ্নের চুম্বনগন্ধ চিনি। আমার ঘুমের গায়ে ওইসব বিচ্ছিন্ন বাস্তব লেগে থাকে। আমি এই বিধ্বস্ত সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখেছি। আমার ঘোরের গায়ে স্বপ্নসন্ধানী ভবিষ্যৎ লেগে থাকে।
Read More »

ত নি মা হা জ রা

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০২১ | |
শব্দের মিছিল

ঠিক রাত সাড়ে বারোটায় যমুনার ফোন এলো, বৌদি ঘুমোলে?​

কলকাতায় থাকার সময় যমুনা আমার বাড়িতে কাজ করত, আমি তো অনেকদিন প্রবাসে।।​ ফোন নং আছে ওর কাছে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আমার সাধ্যমতো কিছু পাঠাই হয়ত পেটিএম মারফৎ।।​

-এতো রাতে কী ব্যাপার যমুনা?​ বুঝিবা বিপদ। বুকটা ধড়াস করে ওঠে।।​

যমুনা খিলখিল করে হাসে, বৌদি এই করোনা আসা ইস্তক দিনে কাজ তো সব ঘরে ছাড়িয়ে দেছে গো। তাই একোন রেতে কাজ করি,তাই রাত জাগি ।।​

রাতে কি কাজ যমুনা??​

সেই আদিম কাজ গো বৌদি, যে কাজ আইনের ছাপ মারা বৌ বিনমাইনায় করলে তারে সোহাগপনা কয় আর ট্যাকা নিয়ে করলে কয় বেশ্যাগিরি।। আবার খিলখিল করে হাসে যমুনা।। যেন দারুণ আমোদ।।​

দ্যাকো বৌদি ঘরদোর আমার আর নিজের ছিল​ কবে,কিন্তু পুষ্যি ছিল ঘাড়ে এক গাদা, একোনো আচে। বাপ,মা,এন্ডিগেন্ডি ভাইবুইন একপাল।। তোমাদেরই সাতঘরে ঘুরে ঘুরে নিজের ঘর ভেবে​ কত্ত যে যত্ন করে ঘরকন্নার কাজ সারতুম আর থাকতুম। স্বপ্ন দেকতুম আমারও একদিন এট্টা ঘর হবে।। মাস গেলে দেশে ট্যাকা পাঠাতুম।।​

ঘরে ঘরে ভালো কাজে বাহবা, ফাঁকি মারলে গালমন্দ।।​

ঝিগিরির ঘরকন্না করতে গিয়ে যেমনটি তকতকান কইর্যে ঘর মুছতুম, বাসন পোস্কার করতুম, জামা কাপড় আছাড় মেরে মেরে কাচতুম, তেলমশ্লায় কষে কষে গরগরে করে টক- ঝাল-লোনতা -মিঠে রাধতুম,​ এখনো তেমন পুরুষ মানুষ মুছে, পোস্কার করে, আছাড় মেরে মেরে কেচে, আগুনে চড়িয়ে রেঁধে বরকন্না করে বেড়াচ্ছি বৌদি।। হেব্বি মজা।।

নগদা কাজে নগদা ট্যাকা। আমার এই গতরখানায় এত যে রস, এত যে আস্বাদ তাতো কুনোদিন টের পাইনি গো বৌদি।। মিনসে গুলানের নাল ঝরা চোখ আর নেকড়ের মতো দাঁত দেকে বুজি আমুও একট্টা নোভের খাদ্দ।।​

যে মড়াদের মরণের ডর নেই গো এই মহামারিতে এট্টুকুনি, কিংবা তারাও আমার মতো হ্যাংলা ক্যাংলা হাড় মরক্কুট্টে, মরার আগে তারা সব মরণ কামড় মারতে আসে আমার গতরে।।

আর আমিও টেইম বুজে একোন বেলাকে শরীল বিকুচ্চি। হ্যাঁ বৌদি, ব্যালাকে যদি রেশন, ক্যারাচিন সব বিক্কিরি হয়, মেয়েমাগীর মাংসই বা বাদ যাবে কেন নিজের ঘরকন্না তো আর করা হল না, ভাবলাম মরে যদি যাই তার আগে চুটিয়ে বরকন্না করেই মরি।।

কি খিলখিল করে হেসে উঠলো যে যমুনা,যেন ভারি মজার প্রসঙ্গ।।

​ওর হাসির ধাক্কায় ঘূর্ণিঝড় লেগে এইসব মহামারীর হামাগুড়ি দিয়ে আসা থাবা, ক্ষিধে, চাপা উৎকন্ঠা,​ আইন, সমাজ, যৌনতার মেকি রাংতাগুলো সব উড়ে খুলে ন্যাংটো যেতে থাকলো হু হু করে।।

​প্রতিমাসে ওর পুরো সংসারের দায়িত্ব নিই এমন সাধ্য তো আমার নেই, কিইবা শুকনো উপদেশ দেব অন্য কাজের।উপদেশে তো আর পেট ভরে না এতগুলো জীবের।।​

বল্ল, হ্যাঁ বৌদি, তোমাকে ফোন কচ্চি অন্য কারণে, কাকে আর বলি, ঝা রোগ নিয়ে আসচে সব, মরে আমি আজ নয় কাল অবিশ্যি যাবো নিঘঘাত। তা,তুমি তো অনেক নেকাঝোকা করো,​ আমায় নিয়ে একখান গপ্পো লিখো তো তোমার ওই ছাপা বই কাগোচে, বেশ একখানি টক-ঝাল-লোনতা-মিষ্টি​ মরণভাতারি বরকন্নার গপ্পো।



[গত বৎসরের একটি সত্যঘটনা অবলম্বনে লিখিত ]
Read More »

মহাশ্বেতা রায়

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০২১ | |
শব্দের মিছিল

কলিংবেলের আওয়াজে একটু অবাক হলেন সমীর। সবেমাত্র বাগানের গাছপালায় জল দিয়ে, গোড়া নিড়িয়ে, ঘন্টা দুয়েক পরিশ্রম করে , হাত-পা ধুয়ে গরম চায়ের কাপ নিয়ে আয়েশ করে বসেছেন। মায়ের ঘরে মা'কেও চা দিয়ে এসেছেন। অণিমা বাসন মেজে, রান্নাঘর পরিষ্কার করে দিয়ে চলে গেছে। আজ শনিবার, আজ বিকেলে ছাত্রদের পড়তে আসার কথাও নেই। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। কে এল এখন? সহকর্মী অলক কিংবা শান্তুনু? নাকি পাড়ার কেউ?

দরজা খুলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে খানিকক্ষণ থমকে গেলেন সমীর। ততক্ষণে তাঁর অতিথি একগাল হেসে, একটু হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন,

"কেমন আছেন সমীরবাবু? চিত্রা কোথায়? দেখুন কেমন আপনাদের সারপ্রাইজ দিতে এসে গেলুম।"

সাময়িক থতমতভাব কাটিয়ে ,"আরে কী কান্ড..." ইত্যাদি বলতে বলতে যাঁকে ভেতরে আহ্বান জানালেন সমীর, তিনি কুন্তলা, সমীরের স্ত্রী চিত্রার স্কুলের বান্ধবী। বছর কয়েক আগে অনেক চেষ্টায় চিত্রার বাপের বাড়ির নতুন ঠিকানা যোগাড় করে আবার স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। ছোটবেলায় নাকি দক্ষিণ কলকাতায় একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন , ক্লাসে পাশাপাশি বসতেন, টিফিনে ঝালমুড়ি ভাগ করে খেতেন। এর আগেও একবার এসে ঘুরে গেছেন সমীর -চিত্রার বাড়ি, কিন্তু সেবারে বাড়িতে চিত্রা উপস্থিত ছিলেন, মেয়ে ঝিমলি,ছেলে টুকাই উপস্থিত ছিল। হইহই করে কেটেছিল দুই-তিন দিন। এবারের পরিস্থিতিটা একেবারেই আলাদা।

চিত্রার মায়ের শরীরে বহুদিন ধরেই নানারকমের সমস্যা । দুইদিন আগে চিত্রার ভাই প্রণব ফোন করে জানিয়েছেন যে তাঁদের মায়ের শারীরিক অবস্থায় বেশ অবনতি হওয়ার ফলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই খবর পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিত্রা কলকাতায় যেতে চান। এখন গরমের ছুটি চলছে, তাই সমীর এবং চিত্রা, দুজনেরই স্কুল ছুটি। টুকাইয়ের তো ছুটি বটেই। ঝিমলি তো বছর দুয়েক হল সে শহরেরই বাসিন্দা। তাই টুকাইকে নিয়ে চিত্রা মাত্র গতকালই বিকেলের ভল্‌ভোতে কলকাতা গেছেন। এদিকে সেই কলকাতা থেকেই কিনা চিত্রার প্রিয় বান্ধবী আজ তাঁদের এই আসানসোলের বাড়িতে উপস্থিত। ইশ, আসার আগে যদি একবার চিত্রাকে ফোন করে নিতের কুন্তলা! - চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করার ফাঁকে ভাবতে থাকেন সমীর। ইতিমধ্যে সমীরের মা বেরিয়ে এসেছেন তাঁর ঘর থেকে। কথা বলছেন কুন্তলার সঙ্গে। ভাগ্যিস মা আছেন বাড়িতে, বুলিদের বাড়ি চলে যান নি। বুলি সমীরের বোন, শহরের আরেক প্রান্তে তার বাস। মা মাঝেমাঝেই মেয়ের বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিনের জন্য থেকে আসেন। মা না থাকলে,একা বাড়িতে এক স্বল্প-পরিচিতা, অনাত্মীয়া অতিথিকে কীভাবে আপ্যায়ন করতেন, ভেবেই গায়ে জ্বর এল সমীরের।

"আসলে মাসীমা, আমার তো আসার প্ল্যান ছিল না...পাড়ার একটা দলের সঙ্গে বোলপুর গেছলুম শুক্রবার, রবিবার তো ফিরেই যেতুম...সেখানে আমাদের হোটেলে এই আপনাদের আসানসোলের পাঁচ ছয়জন ছেলে ছিল...ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই চিত্রার জন্য বড্ড মন কেমন করল, তাই ওদের সঙ্গেই আজ চলে এলুম...বল্লুম, ভাই আমাকে একটু চেলিডাঙ্গার মোড়ে নামিয়ে দিও...তো এই তো মোড়ের কাছেই দিব্যি নামিয়ে দিয়ে গেল..., কালকেই আবার দিনে বেরিয়ে যাব, পরশু আবার ওনার রাতে দিল্লি যাওয়া আছে কিনা...কিন্তু চিত্রাটাই যে থাকবে না কী করে জানব বলুন তো মাসিমা..." বলে হাহা করে হেসে ওঠেন কুন্তলা।

"একা একা অচেনা ছেলেদের গাড়িতে চড়ে চলে এলে তুমি? ভয় করল না?" খানিক অবাক স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন সমীরের মা।

"আরে মাসিমা, অত ভয় পেলে কি আর নিজের মনে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে পারব নাকি?... রুবুর বাবাও রাগারাগি করে মাঝেসাঝে, আমি পাত্তা দিই না... ওহ হো, এই যে, এটা আপনার জন্য মাসিমা" বলে ব্যাগ থেকে মিষ্টির এক বড়সড় প্যাকেট বের করে, রমার হাতে দিয়ে, আরাম করে সোফায় পা তুলে বসেন কুন্তলা।

এইজন্যই এই মেয়েটিকে বিশেষ পছন্দ করেন না রমা । এমনিতে আর কী...ফোনটোন করে মাঝে মাঝে, ফোন করলেই প্রণাম জানায়, জোর করে তাঁকে ফোনে ডেকে কথা বলে। কিন্তু বড্ড হই হই করছে যেন সবসময়ে। দুই ছেলে মেয়ের মা, স্বামী নাকি বিরাট ডাক্তার, একা একা কাদের বা সঙ্গে বোলপুর বেড়াতে গেছিল, আবার আরেক অচেনা দলের সঙ্গে আজ আসানসোল। আবার কাল ফেরত যাবে কলকাতা। বউ মানুষের এত হইহই, এত একা একা নিজের মত ঘোরাঘুরি একেবারেই মেনে নিতে পারেন না রমা। তাঁর শান্ত, বাধ্য ছেলের বউ-এর এমন একখানা বন্ধু ছিল, আবার এই এতবছর পরে হঠাৎ সে পুরনো বন্ধুকে খুঁজেও পাবে, সে আর কে জানত? এই যে চিত্রা বেয়ানের শরীর খারাপের খবর পেয়েই সমীরকে ছাড়া দৌড়াল, সেটা কি পারত আর কয়েক বছর আগে হলে? নেহাত এখন নাতনি নিজেই কলকাতায় হস্টেলে থাকে, নাতিটা ডাকাবুকো হয়েছে,সে তার কান্নাকাটি করা মা'কে বলল," আমি তোমাকে মামাবাড়ি নিয়ে যাব, বাবা আর ঠাম্মা থাক এখানে..." , আর বলেই বিকেলের ভল্‌ভো বাসের টিকিট কিনে এনে ড্যাং ড্যাং করতে করতে মা'কে নিয়ে চলে গেল। বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গভীর রাতে কলকাতায় যায় কেউ? তবে ছেলেও আজকাল অনেক নরম হয়ে গেছে বুঝতে পারেন রমা, তাই আর কিছুই বলেন নি। বললেও কি শুনত কেউ?

সে যাকগে, এখন একে আবার রাতে কী খেতে দেবে সমীর, কোথায় শোয়ার ব্যবস্থা করবে কে জানে! সংসারের কাজকর্ম থেকে রমা অনেকদিন হল ছুটি নিয়েছেন। রান্না-বান্না একেবারেই করেন না। পুজো-আর্চা, বই পড়া, টিভি দেখা নিয়েই থাকেন। নিত্যদিনের আমিষ-নিরামিষ দুই রান্নার ভারই চিত্রার ওপর। চিত্রা একবেলারও কম সময়ের মধ্যে ছেলের জন্য ফ্রিজ ভর্তি রান্না করে রেখে গেছে, তাতে তার দিন তিনেক চলে যাবে। তাঁর রাতে বরাদ্দ দুধ-খই, আর দিনের নিরামিষ দুটো তরকারি চিত্রা করে রেখে গেছে। পরশু মেয়ে ঠিক জামাইয়ের হাত দিয়ে রান্না করে কিছু পাঠাবে বা নিয়ে আসবে। তাঁদের মা-ছেলের রাতের খাবার গোছানো আছে। এর জন্য তাহলে কি ভাত চাপানো হবে? চিত্রার বন্ধুর জন্য ভাবার খুব শখ নেই তাঁর। কিন্তু যখন এসেই পড়েছে, তাই যতক্ষণ না যায়, ততক্ষণ অবধি যাতে যত্ন আত্তি কম না হয়,সেটা না ভেবে আর পারছেন কই? ওদিকে অতিথি তো গরম চায়ের কাপ হাতে মোবাইল ফোন বাগিয়ে তার বান্ধবীকে ফোন করছে আর বকবক করছে। সমীর ও বসার ঘরেই চায়ে চুমুক দিচ্ছে, তার মুখ দেখে তো বোঝা যাচ্ছে না কী ভাবছে।

"আপনি কি রাতে ভাত খান, নাকি রুটি? ..." সমীরের প্রশ্ন শুনে , এই প্রথম মনে হল কুন্তলা একটু বিব্রত ।

"আপনাদের খুব অসুবিধায় ফেলে দিলুম না?... আমার ভাত-রুটি সব চলে ,আপনি ভাবছেন কেন সমীরবাবু...মাসিমা, আমি নিজেই একটু ভাত করে নেব...ঘি-মাখন আছে তো কিছু? ওতেই হবে, আমি রাতে খুব কম খাই, একেক দিন তো খাই ও না...স্কিপ করি..."

কুন্তলার কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার কলিং বেল বাজার আওয়াজে দরজা খুলতে গেলেন সমীর।

একটু পরেই সমীরের পেছন পেছন অফিস ব্যাগ কাঁধে ঘরে ঢুকল বিশ্বজিৎ।

"কেমন আছেন দিদা?" একগাল হেসে রমাকে প্রণাম করল বিশ্বজিৎ, সম্পর্কে সে রমার মেয়ে বুলির ভাশুরপো,দমদমে থাকে, ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করে। কিন্তু বিশ্বজিৎ বুলিদের বাড়ি না গিয়ে এখানে কেন?

"ওমা, বিশ্ব...কেমন আছ তুমি?এখানে? ... তুমি জানতে না বুলিরা নেই?"

"আরে না না দিদা, জানলে কি আর আসি! আমার এদিকে ট্যুর ছিল, সকাল থেকে দুর্গাপুর হয়ে আসানসোলে এসেছি বিকেলের দিকে, কাজ সেরে বেরোতে দেরি হয়ে গেল, এখন আর কলকাতার দিকে ফিরব না ভেবে কাকার বাড়িই তো গেলাম প্রথমে...আগেও তো কত এসেছি এরকম...গিয়ে দেখি তালা...তখন ফোন করাতে কাকা-কাকিমা বলছেন ওরা বর্ধমান গেছেন, বরযাত্রী হয়ে, ফিরতে ফিরতে তো রাত পেরিয়ে যাবে...কাকিমাই বললেন আজ রাতটা আপনাদের এখানে থেকে যেতে...খুব অসুবিধা হল না?"

"এহে...তুমি যাওয়ার আগে ফোন করনি?"

"করেছিলাম মামা, কিন্তু ওরা কেউ ফোন তোলেনি তখন...বিয়েবাড়ি তো, বুঝতেই পারছেন...আমি কাল ভোরেই বেরিয়ে যাব মামা..." কুন্ঠিত স্বরে জানায় বিশ্বজিৎ। তারপরে আরও মৃদুস্বরে জানতে চায়,"মাইমা? টুকাই...ঝিমলি ...কেউ নেই?"

"না হে, কেউ নেই... বলছি তোমায়...আগে হাত মুখ ধোও...দাঁড়াও তোমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দিই..." ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সমীর দেখলেন প্রায় রাত আটটা।

বাকি সময়টা হুশ হুশ করে কেটে গেল। সবার জন্য আরেক কাপ করে চায়ের জল বসিয়ে চিত্রাকে ফোন করলেন সমীর। সংসারের কাজে তিনি খুব অপটু নন, চা-ভাত-ডাল করা কিংবা দুধ ফোটানো, পাঁউরুটি সেঁকে নেওয়া গোছের কাজ তিনি করে নেন, কিন্তু এই হঠাৎ জোড়া অতিথির প্রায় নাটকীয় আগমনে চিত্রার সুনিপুণ উপস্থিতির অভাব বোধ করছেন সমীর। একজন স্বয়ং চিত্রার বন্ধু, একজন বোনের শ্বশুরবাড়ির মানুষ। একজন প্রাণের টানে এসেছেন, একজন প্রয়োজনে। এমন যেন মনে না হয় যে চিত্রা নেই, তাই যথেষ্ট আদর যত্ন হল না। রাতের খাওয়া হতে হতে প্রায় এগারোটা বাজল। সমীর এক ফাঁকে বেরিয়ে গিয়ে গিয়ে কিছু দরকারি বাজার করে এনেছিলেন। চিত্রার কথামত ফ্রিজের মাপা খাবার আর বের করলেন না। ডাইনিং টেব্‌ল্‌ ঘিরে বসে মহা উৎসাহে সবাই চায়ের কাপ হাতে গল্প জমালেন। আলু ছুলে, পেঁয়াজ কুচিয়ে দিলেন কুন্তলা। ডিমসেদ্ধ, আলুসেদ্ধ, পেঁয়াজ -কাঁচালংকা দিয়ে মুসুর ডাল সেদ্ধ আর মাখন দিয়ে গরম ভাত খাওয়া হল সবাই মিলে। শেষ পাতে পাড়ার 'সুমধুর মিষ্টান্ন ভান্ডার'-এর টাটকা তৈরি ভাপা সন্দেশ। রমা দুধ-খই-এর সঙ্গে সন্দেশ খেলেন। কুন্তলার আনা চমচম রেখে দেওয়া হল জলখাবারের জন্য। সঙ্গে দেওয়ার জন্য পাউরুটি, কলা নিয়ে এসেছেন সমীর।

খাওয়ার পরেও সবার গল্প আর শেষ হতে চায়না। বিশ্বজিতের সঙ্গে ততক্ষণে কুন্তলার খুবই ভাব জমে গেছে। আগামিকাল রবিবার, তাই ভোরের কোলফিল্ড ধরার বদলে একটু বেলায় জলখাবার খেয়ে দুজনে ভল্‌ভো বাসে করে কলকাতা ফিরবেন স্থির হয়েছে। বিশ্বজিৎ ঢাকুরিয়ার দিকে গেলে তাঁর বাড়ি যেন সে অবশ্যই যায়, ঠিকানা-ফোন নম্বর নেওয়া হয়ে গেছে। কুন্তলা রমাকেও ঘুমাতে যেতে দেন নি। বলেছেন,"আজ চলুন মাসিমা, আমরা সারারাত আড্ডা মারি,রোজই তো নিয়ম করে ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যান, একদিন নাহয় রুটিন বদলালেন...!" অন্যদিন সমীরদের বাড়িতে সাড়ে দশটার মধ্যে সব আলো নিভে যায়, আজ রাত বারোটার পরেও প্রায় সব ঘরে আলো জ্বলছে। জোরে জোরে কথা শোনা যাচ্ছে। চিত্রা সাড়ে এগারোটা নাগাদ একবার ফোন করেছিলেন। তাঁর স্বামী অনভ্যস্ত হাতে কেমন যত্ন করেছেন অতিথিদের, জানতে চেয়েছেন। আগামিকাল দুজনে কখন বেরোবেন, কী খেয়ে বেরোবেন ,কাকে কোথায় শুতে দিতে হবে, ধোয়া চাদর-বালিশের ঢাকা কোথায় আছে, ভালো বিস্কুটের প্যাকেট কোথায় রাখা সেসবের খোঁজ নেওয়া, খোঁজ দেওয়া হল।

চিত্রার বুদ্ধিমতই সমীর নিজেদের শোবার ঘরে কুন্তলার শোবার ব্যবস্থা করলেন। বিশ্বজিতের বিছানা হল বসার ঘরের ডিভানে। দুটো বিছানার জন্য দেওয়াল আলমারি খুলে ধোয়া চাদর- বালিশ ঢাকা বেরোলো, বক্স খাটের ভেতর থেকে মশারি বেরোলো। দুই অতিথিকে জলের বোতল, বাথরুমের আলোর সুইচের অবস্থান বুঝিয়ে সমীর নিজে শুতে গেলেন মায়ের ঘরে থাকা ফাঁকা চৌকিটাতে। মেয়ে ছুটিতে বাড়ি এলে ওটা ব্যবহার করে। চৌকিটা লম্বায় ছোট, একটু অসুবিধা হবে। কিন্তু এক রাতের ব্যাপার, থাক। অতিথিদের আরাম যত্ন আগে। কুন্তলা অবশ্য মায়ের ঘরে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাছে সারারাত গল্প করতে হয়, সেই ভয়ে রমা সেই প্রস্তাব নাকচ করেছেন।

চিত্রা-সমীরের যুগল শয্যার একপ্রান্তে শুয়ে সারাদিনের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে কুন্তলা ভাবলেন, তাঁদের তিনতলা বাড়িতে দুটো আলাদা গেস্ট রুম আছে। এমন করে নিজেদের বেডরুম অতিথিদের জন্য ছেড়ে দিতে হয় না। দিতে হলে তাঁর রাশভারী, প্রখ্যাত চিকিৎসক স্বামী, টুবু-রুবুর বাবা সেটা মেনে নিতেন ? চিত্রাটা স্কুলে পড়ায়, শাশুড়ি আর স্বামীর নিয়ন্ত্রনে থাকে, কিন্তু আজ তিনি আড্ডার মাঝে মাঝে লক্ষ্য করেছেন, দূরে থেকেও এই সংসারটার চাকাগুলো চলছে চিত্রার নির্দেশেই। তাঁর সংসারে চারজন মানুষের হুকুম তামিল করতে সর্বদা তিন জন মানুষ হাজির। বাড়িতে তাদের প্রতাপ কুন্তলার থেকে বেশি। কুন্তলা তিন দিন বাড়ি না থাকলে কারোর বিশেষ হেলদোল হয় কি? হেলদোল না হল তো বয়েই গেল,আমি বাপু অত ভাবতে পারব না, ইচ্ছে হলেই বেড়াতে বেরোব...একটু আগে মাসিমাকে বললাম যদিও, রুবুর বাবা রাগারাগি করে...কিন্তু সে মানুষটা তো সত্যি রাগারাগি করে না। যদি করত, তাহলে কি আমি নিজেকে আটকে রাখতাম? কে জানে । ... বিশ্ব ছেলেটা ভালো, ওর সঙ্গে রুবুকে বেশ মানাবে, কিন্তু রুবু তো আর শুধু আমার মেয়ে না, ওর ডাক্তার বাবা কি মেডিকাল রিপ্রেজেন্টেটিভ জামাই মেনে নেবে?...লোকটা মন্দ না, কিন্তু এইরকম পরিস্থিতিতে পড়লে সমীরের মত কাউকে রেঁধে ডাল-ভাত খাওয়াবে না, বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে কাজ চালিয়ে দেবে...আমি কি সমীরের সঙ্গে বিজনের তুলনা করছি?...

অন্ধকারের মধ্যে ফেসবুকে ঝিমলির প্রোফাইল চেক করতে করতে বিশ্ব মনে মনে অনুযোগ করল, তোমার বাড়িতে একটা আস্ত রাত কাটিয়ে গেলাম, আর তুমি নেই, ভাবা যায়? তুমি এই সামার ভ্যেকেশনে স্পেশাল টিউশন করবে বলে কলকাতায় বসে আছ? জানো, তোমাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ডস রিকোয়েস্ট পাঠাব ভাবি, কিন্তু সাহস করে আর পাঠাই না...কে জানে, তুমি যদি ব্যাপারটা খারাপভাবে নাও, কাকিমাকে খারাপ কিছু বল, সেটা খুব অস্বস্তিকর হবে... নাহয় বলব না কোনো দিন, তোমাকে ঠিক কতটা চাই, কিন্তু আজ তো দেখা হতে পারত, তাই না?

আজ ও সারারাত জাগতে হবে, এমনিতেই ঘুম আসে না, তারপরে এতই দেরী হয়েছে শুতে, ভেবে শ্রান্ত এবং অল্প বিরক্ত অনিদ্রার রোগী রমা কপালে মাথা ধরার মলম ঘষতে ঘষতে ভাবলেন, ছেলেটার ওপর দিয়ে সন্ধ্যেটা খুব যাহোক গেল। কীভাবে কী হবে ভাবতে গিয়ে আমারও আধকপালীটা ফিরে এল। কুন্তলা মেয়েটা বড্ড কথা বলে,বকে বকে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। চিত্রা স্কুলে কী করে জানা নেই, বাড়িতে তো তার কথা কইবার ফুরসত নেই। মা'কে দেখা অনেক হয়েছে, সে মেয়ে এখন ফিরলেই পারে। চিত্রা-টুকাই দুজনেই নেই, বাড়ি ফাঁকা লাগছে।

পাশের বিছানায় , ছোট চৌকিতে, একটু অসুবিধার মধ্যে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে সমীর ভাবলেন, কাল সকালে চিত্রাকে বলে দেবেন, আরও কয়েকটা দিন কলকাতায় থেকে আসতে। কুন্তলা এতদূর এসেছিলেন , চিত্রার উচিত ওঁর সঙ্গে দেখা করে তবেই ফেরত আসা। সমীরকে ফেলে, ঝিমলি-টুকাইকে ফেলে, শাশুড়ির অনুমতির তোয়াক্কা না করে , বোলপুর তো দূর অস্ত, বাপের বাড়িও কোনোদিন যান নি চিত্রা। এবার নাহয় নিয়মের অল্প বদল হোক। তেমন অসুবিধা হলে সমীর নাহয় মা'কে বুলির কাছে রেখে আসবেন। ছেলেমেয়েও আছে সঙ্গে, ওদের বলে দেবেন ওদের মাকে নিয়ে অন্যান্য আত্মীয়, চিত্রার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে আসবে। ততদিন সমীর ঠিক কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন।


Read More »

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.