x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

শনিবার, এপ্রিল ১৭, ২০২১

শনির বচন | কাজের মাসি কাজের মেশো

sobdermichil | এপ্রিল ১৭, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল sobdermichil

কথাটা সত্য। রাজনীতিতে কাজের মাসি কাজের মেশোরা আজ আর কল্কে পাচ্ছেন না বিশেষ। নির্বাচন আসলে এদের নিয়ে হইচই হয় না। মানুষ এদেরকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করতেও রাজি নয়। কিন্তু আজ থেকে কয়েক দশক আগেও অবস্থাটা এমন ছিল না। কাজের মাসি মেশোদের উপেরই জনতার ভরসা ও বিশ্বাস ছিল মূলত। কিন্তু দিনে দিনে একটা পরিবর্তন নেমে এলো রাজ্য রাজনীতিতে। কাজের মাসিদের জায়গায় অকাজের ধারীরা নেচে গেয়ে জায়গা করে নিতে শুরু করলো। স্নো পাউডার লিপস্টিক। মাসকারা ফাউন্ডেশন ইত্যাদিই রাজনীতিতে কল্কে পাওয়ার ফাউন্ডেশন হয়ে উঠতে থাকল। যার যত চড়া মেকআপ। তার তত জনপ্রিয়তার জৌলুশ। কাজের মাসি কাজের মেশোদের দিন গেল অস্তাচলে। অকাজের ধারীরাই মঞ্চজুড়ে জগঝম্প শুরু করে দিল। জনতাও পাগলু ড্যান্স দেখতে রাজনীতির ময়দানে ভিড় করতে শুরু করল। আর সেই ভিড়ের পালকে মশগুল রাখতে আরও বেশি সংখ্যায় অকাজের ধারীদের ডাক পড়তে শুরু করে দিল। পয়সাও মন্দ নয়। তারপরে নির্বাচনের টিকিট পেয়ে গেলে তো সোনায় সোহাগা। আর দলীয় রাজনীতির কলাকৌশলে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সাংসদ বিধায়ক হয়ে গেলে তো কেল্লাফতে। একেবারে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় চৌদ্দ পুরুষের জন্য জমি জায়গা স্থাবর অস্থাবর সম্পদ সম্পত্তি আর রাজনৈতিক প্রতিপত্তি। সাথে অকাজের লাইমলাইটে থাকার বিশেষ জনপ্রিয়তা। ফলে আর্থ সমাজিক রাজনীতির এই পট পরিবর্তনে প্রকৃত কাজের মাসিদের থেকে, কাজের মেশোদের থেকে হুজুগে জনতা মুখ ফিরিয়ে নিল।

দিন দিনে মানুষ ভুলতে বসলো। রাজনীতিতে কাজের মাসি কাজের মেশোদের গুরুত্বের কথা। এখন কাজের মাসি হয়ে উঠতে গেলে বিশেষ যোগ্যতা লাগে। যা অকাজের ধারীদের কোনদিনই থাকে না। এবং থাকে না বলেই তাদের দিয়ে রাজনীতিও হয় না। জনসেবাও হয় না। দেশ ও সমাজেরও কোন উন্নতি হয় না। শুধুমাত্র নির্বাচন জিততে প্রয়োজনীয় আসন জোগার ছাড়া এদের দিয়ে আর কোন উপকার হয় না। এখন নির্বাচন জিতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের জন্য জরুরী আসন সংখ্যার বাইরে এদের কোন কার্যকরিতাও থাকে না। দিনের পর দিন সান্ধ্য টিভিতে মুখস্থ সংলাপ বলে আর সিনেমায় নাচ দেখিয়ে উপার্জিত জনপ্রিয়তায় এঁরা নিজেদেরকে সেলিব্রেটি বলে মনে করে থাকেন। এবং জনতার দরবারে সেই সেলিব্রেটি পুঁজি ভাঙিয়েই ভোট ভিক্ষা করে থাকেন। তার বাইরে এদের জীবনে জনসংযোগের আর কোন দিগন্ত খোলা রাখেন না এঁরা। সমাজে জনসংযোগ বাদ দিয়ে রাজনীতি করার প্রবণতা একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে কাজের মাসি কাজের মেশোদের আর দরকার পড়ে না।

তাই অকাজের ধারীদের ভিড়ে দুই একজন কাজের মাসি মেশোদের দেখা পেলে জনতাও হাসাহাসি শুরু করে দিতে পারে। কারণ ততদিনে জনতার চেতনায় রাজনীতিতে কাজের মাসি মেশোদের গুরুত্ব উপলব্ধি করার মতো আর কোন শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। জনতা ততদিনে পাগলু ড্যান্সের সিলেবাস মুখস্থ করে ফেলেছে। ফলে জনতার চোখে ততদিনে মাসকারা বিভ্রম থেকে শুরু করে স্নো পাউডার লিপস্টিক ফাউন্ডেশনের মৌতাত জমে উঠেছে। সে স্ফূর্তি করতে চায়। মিছিলে হোক। মিটিঙে হোক। জনসভায় হোক। সে নাচতে চায়। ঠিক সেইভাবেই, যেভাবে নাচাতে অকাজের ধারীদের রাজনীতিতে নামানো হয়। হচ্ছে। এখন রাজনীতির এই সংস্কৃতিতে উন্নয়ন ও বিকাশের ঢক্কানিনাদে কাজের মাসি কাজের মেশোদের আওয়াজ চাপা পরে যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। জনতারও অতশত গুরুত্বপূর্ণ কথায় আগ্রহ নাই। সারদার টাকা কে খেলো। নারদায় কে টাকা দিল। সারদা নারদার টাকা নিয়ে কে কবে দল পাল্টালো। এসবে জনতার কি যায় আসে? জনতা শুধু দেখে নেবে, এতদিন কাটমানির রং ছিল নীল। এবার কাটমানির রং গেরুয়া হলো কি হলো না। কারণ শুধু কাটমানি খেলেই তো আর হবে না। মহাকাব্যের নায়কের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে খাচ্ছে কিনা, সেটাই বিচার্য্য। না হলে যে কাটমানি শুদ্ধ হয়ে উঠবে না। অশুদ্ধ কাটমানির বিরুদ্ধেই তো জনতাকে শুদ্ধ কাটমানির পক্ষে ভোটটা দিতে হবে। না হলে কাটমানি শুদ্ধ হবেই বা কি করে? না, শুধু কাটমানিও তো নয়। পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় তোলাবাজির ঠেকেও আগে দেখে নিতে হবে মহাপ্রভুর ছবি টাঙানো আছে কিনা। ভারতমাতার নামেও মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি উঠছে কি উঠছে না। না হলে তোলাবাজিকেও শুদ্ধ করা যাবে কি করে? সবকিছুই থাকবে। সবকিছুই চলবে। শুধু নাম মাহাত্ম্যে জয়ধ্বনি দিয়ে শুদ্ধ করে নিতে হবে, এই যা। কাজের মাসি কাজের মেশোদের কথা শুনতে গেলে জনতার তাই চলবে কি করে? জনতাও আবার নতুন বোতলের হদিশ পেয়ে গিয়েছে। পুরানো মদ নতুন বোতলে ঢেলে নেওয়ার অপেক্ষা শুধু। এতদিন বাংলা ব্রাণ্ডের বোতল নিয়ে ঘুরতে হয়েছে। প্রেস্টিজ তাতেই যা পাংচার হয়ে গিয়েছে। এখন আর বাংলা ব্র্যাণ্ডের বোতল নয়। খোদ গুজরাট নাগপুর ইউপী ব্র্যাণ্ডের বোতল। তার কেতাই আলাদা। চেকনাই দেখলেই বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার দশা। জনতাও হুঁশ হারিয়ে বহুৎ খুশ।
তাই এমন সময় কাজের মাসিরা এগিয়ে আসলে কার আর মেজাজ ঠিক থাকে? এখন মনের সুখে পদে ছাপ দিয়ে ঘাসফুল সাফ করে দুদণ্ড মৌতাত করে নেওয়ার সময়। কিংবা এক দশকের উন্নয়নের প্রসাদ নিয়ে সন্তুস্ট থেকে দিদিকে খুশি করার সময়। বিশেষ করে জনতার অনেকেরই আবার বাংলা ব্র্যাণ্ড না হলে নেশা ছুটে যেতে পারে। 
ঠিক সেই সময় এইসব কাজের মাসি কাজের মেশোরা আবার রাস্তায় কেন। তাদের অপেক্ষায় তো আর কেউ বসে নেই। জনতা উন্নয়নের এক্সপ্রেস আনিয়ে নিয়েছে কবেই। এখন আবার বিকাশের মেল দরজায় দাঁড়িয়ে হুইসেল মারছে। চড়ে বসলেই নগদ নারায়ণ। পদ্মছাপ শাড়ী, গেঞ্জি টুপি সব ফ্রীতে! অন্তত ২রা মে অব্দি। তারপর সেলিব্রেটিদের ছড়াছড়ি। কি উন্নয়নের এক্সপ্রেস। কি বিকাশের মেল। এখানে পাগলু ড্যাণ্স তো ওখানে দ্রৌপদী নৃত্য।

না না। বাংলার জনতার আর কাজের মাসি কাজের মেশোদের কোন দরকারই নেই। একদিকে চটিপিসি তো অন্যদিকে ঠগেন্দ্রনাথ। এ বলে আমায় দেখ। ও বলে আমায় দেখ। বাঙালিও তাই দেখেই যাচ্ছে। এ দেখার শেষও নেই কোথাও। শিল্প নেই। কৃষি গেল। দেশের সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়। কর্মসংস্থানের হদিশ নেই। না থাক। চপ আছে পকৌড়া আছে। ঢপ আছে ধরপাকর আছে। জাল ডিগ্রী আছে। জাল পেশা আছে। গালগল্প আছে। মন্দির মসজিদ আছে। পালা পার্বণ আছে। দয়া দাক্ষিণ্য আছে। লাইন বেলাইন আছে। ব্যাংকে সিঁদকাটা আছে। চাল চুরি আছে। রেল চুরি আছে। রঙ বদল আছে। নাম বদল আছে। না, শুধু দিন বদল নেই। কারণ একটাই। এদেশে এখন বেশি বেশি কাজের মাসি নেই। বেশি বেশি কাজের মেশো নেই। কাজ করার বাসনা নেই। কাজের হদিশ নেই। এদেশে এখন হাত সাফাইয়ের যুগ। যে যত বেশি সাফাই কর্মী। সে তত বড়ো পূজনীয়। সারদা হোক নারদা হোক। রেল বীমা ব্যাংক হোক। কৃষি হোক খনি হোক। এই সাফাই কর্মীরা জনতার চেতনাও সাফ করে ফেলেছে। তাই জনতা আজ আর চিন্তা করে না। হোয়াটসআপের সিলেবাস মুখস্থ করে নিজেদের ভিতরে আলাপ করে। এমনকি অবস্থা যখন বিলাপ করার মতো ভয়াবহ। জনতা তখন মুখস্থ সংলাপে প্রলাপ বকে আনন্দ পেতে বেশি আগ্রহী। তাই সেই জনতা কাজের মাসিদের কথায় পাত্তা দিতে যাবেই বা কেন। কেনই বা কাজের মেশোদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে যাবে। না জনতা এখন বাধ্য ছাত্র। সে কোন ট্যাঁফু করতে রাজি নয়। তাকে যেমন বলে দেওয়া হয়েছে। সে তেমন প্রতীকেই আঙ্গুল টিপবে। তারপর কি হতে পারে। কি হতে চলেছে। সেসব ভাবতে গেলেই তো সর্বনাশ। তখন যদি দমকল ডাকার মতো কাজের মাসি কাজের মেশোদের ডাকতে ছুটতে হয়? সেই ছোটা তো আর পাগলু ড্যান্স দেখতে যাওয়ার মতো নাচতে নাচতে হবে না। কিংবা ঠগেন্দ্রনাথের দাঁড়ি দোলানো বিকৃত বাংলা শোনার মতো হাসি তামাশার ব্যাপার হবে না। ব্যাপার যে গুরুতর। সেটা বুঝতে পারলে তো আর অকাজের ধারীদের করেকম্মে খাওয়া হতো না। তখন কাজের মাসি কাজের মেশোদের হাতে জনতা দেশের ভার তুলে দিতেই ভোটের লাইনে ভিড় বাড়াতো।



১৭ই এপ্রিল’ ২০২১
কপিরাইট সংরক্ষিত
Read More »

শনিবার, এপ্রিল ১০, ২০২১

শনির বচন | নির্বাচনী হাওয়া

sobdermichil | এপ্রিল ১০, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

কথায় বলে ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন। আর এখন শোনা যাচ্ছে, মোদী সরকার যা করে ভালোর জন্যেই করে। এই যেমন রাত আটটায় হঠাৎ ঘোষণা করে চার ঘন্টার নোটিশে নোট বাতিল। কোটি কোটি মানুষের লাইনে দাঁড়িয়ে এক দেশ এক পরিণতি’র আনন্দ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের পরম প্রাপ্তি। সেই লাইনে কতজন ভারতীয়ের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছিল। না, সেই হিসাবে আমাদের দরকার নাই। সরকারেরও দায় নেই সেই হিসাব দাখিলের। তবে শোনা যায়, নোটবাতিলের ধাক্কায় অতিরিক্ত কাজের চাপে প্রায় একশোর উপরে ব্যাংক কর্মচারীর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটছিল। সে তো হতেই পারে। দেশের ভালোর জন্য, দশের ভালোর জন্য শহীদ হওয়া সৌভাগ্যের কথা। তাদের উত্তরপুরুষরা সগর্বে পুর্বপুরুষের এহেন আত্মবলিদান নিয়ে আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে পারবেন বইকি। নোটবাতিলের ভালোর তো কোন শেষ নেই। এই নিয়ে পরবর্তীতে বহু লোকগাথা তৈরী হবে নিশ্চয়। ২০১৬’র নভেম্বরের আট তারিখের সেই ঐতিহাসিক রাত আটটার ঘোষণা মতো দেশ এখন জাল নোট মুক্ত নিশ্চয়। দেশে তারপর থেকে আতঙ্কবাদী জঙ্গীহানাও আর সংঘটিত হয় নি নিশ্চয়। না, পুলওয়ামার ঘটনা নেহাতই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ব্যাতিক্রম তো আর নিয়ম হতে পারে না। আর বিশেষ করে পুলওয়ামা না ঘটলে বালাকোট করা যেত না। বালাকোট না করলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে মানুষের কাছ থেকে শহীদদের নামে ভোটও চাওয়া যেত না। ফলে পুলওয়ামার শহীদদের আত্মবলিদান বিফলে যায় নি আদৌ। এবং সেই কালো টাকা। দেশ কালোটাকা মুক্ত হয়েছে কতটা সেই হিসাব তো রিজার্ভ ব্যাংক কবেই জানিয়ে দিয়েছে। সেই হিসাব তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশবাসীর বিশ্বাস। মোদী সরকার যা করে ভালোর জন্যেই করে।

তারপর একে একে জিএসটি চালু। এক দেশ এক কর ব্যবস্থা। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ। এবার কাশ্মীরে জমি বাড়ি কিনে কাশ্মীরী কন্যাকে বিবাহ করতে আর কোন বাধা নেই। বাধা নেই সেখানে ব্যাবসা ফেঁদে বসে পড়তেও। এক দেশ এক নিয়ম। অবশ্য এই একই কাজ সিকিম অরুণাচলপ্রদেশ নাগাল্যাণ্ড মনিপুর মিজোরামে গিয়ে করা যাবে না। তা না যাক। ওই সব অঞ্চলগুলি তো আর মুসলিম প্রধান নয়। যে তাদের টাইট দিতে হবে। এরপর রামমন্দির নির্মাণের মতো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। যা পাঁচশো বছরের ভিতর শ্রেষ্ঠতম কাজ। দেশ জুড়ে মন্দির নির্মাণ প্রকল্পে মানুষের কাছে দশ একশো হাজার টাকার কুপন বিলিয়ে দেশবাসীকেও মন্দির নির্মাণে সামিল করার দেশহিতৈষী উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর যা পূর্ববর্তী কোন সরকারই কার্ষকর করার হিম্মত দেখাতে পারেনি। ফলে এখন একটার জায়গায় দশটা রামমন্দির তৈরীর টাকা তোলা হয়ে গিয়েছে। দেশের কাজে মানুষের যোগদানের এমন সুযোগ জীবনে কবারই বা আসে। 
এরপর আরও এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা বলতেই হয়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯। যে কাজ স্বয়ং অটলবিহারীও করে দেখানোর সাহস পাননি। সেই কাজই মোদী সরকার করে দেখিয়েছে। এবার থেকে ঠিকমত কাগজপত্তর না দেখাতে পারলে নাগরিকত্ব হারানো হিন্দু মাত্রেই একটা সুবর্ণ সুযোগ পাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনের। 
শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলি থেকে অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে আসার প্রমাণ পত্র স্বরূপ সেই সব দেশের ভ্যালিড সরকারী নথী দেখাতে পারলেই শর্ত সাপেক্ষে ছয় বছর অপেক্ষা করলেই পাকাপাকি ভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে। কত বড়ো এক সুবর্ণ সুযোগ কাগজপত্তর হারানো হিন্দুদের হাতে তুলে দিয়েছে মোদী সরকার।

না মোদী সরকারের জনহিতকর পদক্ষেপ এখানেই শেষ নয়। করোনা মোকাবিলায় সেই রাত আটটার ঘোষণায় মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে দেশের সব ট্রেন বাস বন্ধ করে দিয়ে গোট দেশকে লকডাউন করে দেওয়া। দেশবাসীর প্রাণের দামের থেকে মোদী সরকারের কাছে অন্য কোন কিছুই বড়ো নয়। তাই তো থালা বাজানো। ঘন্টা বাজানো। প্রদীপ জ্বালানো। নয় মিনিট গোটা দেশকে অন্ধকারে মুড়ে ফেলে করোনা ভাইরাস তাড়ানোর মতো ঐতিহাসিক সব পদক্ষেপ। হ্যাঁ হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণা করে ট্রেন বাস সব বন্ধ করে দিয়ে কোটি কোটি পরীযায়ী শ্রমিকদের হাজার হাজার মাইল পথ হাটানোও কম হিম্মতের কাজ নয়। কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের ভোট হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি পূর্ববর্তী কোন প্রধানমন্ত্রী নিতে পেরেছে? তাতে কত হাজার পরিযায়ী শ্রমিক পথেই মারা পড়ে থাকলো। সেই হিসাব রাখার দায় নিশ্চয় মোদী সরকারের নয়। মোদী সরকারের দায়িত্ব একশো আটত্রিশ কোটি ভারতীয়ের। তাদের বাঁচাতে কয়েক হাজার পরিযায়ী শ্রমিক যদি পথেই মারা যায়, তাতে দেশেরই বা কি। আর দশেরই বা কি। আমরা তাই এইসব নিয়ে ভাবিত নই। দেশের ভালোর জন্যই মোদী সরকার নতুন শ্রম আইন নিয়ে এসেছে। দৈনিক আট ঘন্টা কাজের বদলে বারো ঘন্টা কাজের আইন চালু করতে। এই একটি আইনই প্রমাণ করে, মোদী সরকারের কাছে কাজই সব চাইতে বড় কথা। এমন ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বিশ্বে এই প্রথম। আশা করা যায়, অন্যান্য দেশগুলিও দৈনিক ১২ ঘন্টা কাজের আইন চালু করবে। মোদী সরকারই দেশে প্রথম বারের জন্য নাগরিক পঞ্জী চালু করার কথা ভেবেছে। তার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকাও বরাদ্দ হয়েছে। এই কাজ সম্পূর্ণ হলে কারুরই আর কোন চিন্তা থাকবে না নাগরিকত্ব নিয়ে।

না, এখানেও শেষ নয়। এই সরকারের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ দেশের যা কিছু বিষয় সম্পত্তি বাজার হাট সব কিছুরই বেসরকারীকরণ। ধাপে ধাপে সেই একমাত্রিক লক্ষে এগিয়ে চলেছে দেশ। ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের উপরে দিনে দিনে সুদের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। একাধিক ব্যাংককে মিলিয়ে দিয়ে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে নিয়ে আসা। যাতে পরবর্তীতে ব্যাংক বেসরকারীকরণের কাজে সুবিধে হয়। রেল থেকে শুরু করে বিমান। রাজপথ থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট। বিএসএনএল থেকে শুরু করে একাধিক সরকারী লাভজনক সংস্থাকে প্রথমে অলাভজনক করে দিয়ে প্রায় জলের দরে বিক্রী করে দেওয়ার দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা। হ্যাঁ এর জন্যেই হিম্মত লাগে। মানুষের ভিতরে সেই বিশ্বাসটুকু জন্মিয়ে দিতে হয়েছে। মোদী সরকার যা করে দেশের ভালোর জন্যেই করে। মানুষ আজ সেটাই বিশ্বাস করে। অন্তত বাঙালি তো করেই। এবং যত দিন যাচ্ছে আমাদের বাঙালিদের ভিতর এই বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে উঠছে। নাহলে এই যে নতুন কৃষি আইন। যার বিরুদ্ধে পাঞ্জাব হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা সব একজোট হয়েছে। লক্ষ লক্ষ কৃষক দিল্লীর সীমানায় মাসের পর মাস রাজপথে পড়ে রয়েছে। সাড়ে তিনশোর উপরে কৃষক শহীদ হয়েছেন। সেই কৃষি আইনের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকসহ আপামর বাঙালি গর্জে উঠছে না কেন? কারণ একমাত্র বাঙালিই বুঝতে পেরেছে নতুন এই কৃষি আইন দেশের জন্য কত ভালো। এবার থেকে কৃষির গোটা বিষয়টিই নিয়ন্ত্রীত হবে মুষ্টিমেয় শিল্পগোষ্ঠীর ইচ্ছেয়। সরকার তাতে কোনরকম বাধা দিতে পারবে না। আইন থাকবে শিল্পপতিদের পক্ষেই। এর থেকে ভালো কিছু হতে পারে কি? নতুন কৃষি আইনে রেশন ব্যবস্থা উঠে যাবে। খাদ্যশস্যের মজুতদারী আইনসিদ্ধ হয়ে যাবে। মজুতদাররা যতদিন খুশি খাদ্যশস্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে অগ্নিমূল্যে বিক্রী করতে পারবে। তাতে সরকার বা আইন কোন বাধা দিতে পারবে না। মোদী সরকারই এই প্রথম অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্যের তালিকা থেকে সব শস্যকেই বাদ দিয়ে দেওয়ার হিম্মত দেখাতে পেরেছে। পূর্ববর্তী কোন সরকারই যা সাহস করেনি। ইচ্ছে থাকলেও। এই যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের সংশোধন। এর ফলে বাজারে খাদ্যশস্যের মজুতদারী ব্যবসা রমরমিয়ে উঠবে। সেই ব্রিটিশ যুগের মতোন। হ্যাঁ তাতে অনেকেই না খেতে পেয়ে মারাও যেতে পারে। তাতে দেশের জনসংখ্যাবৃদ্ধি জনিত সমস্যারও আশু সমাধান হবে। যার কাছে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে। সেই খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকবে। যার যেমন সাধ্য। কিন্তু তাই বলে সরকার কেন সকলের দায় নিতে যাবে।

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে যেদিকে হাওয়া বইছে। তাতে রোজকার টিভি দেখে। রোজকার খবরের কাগজ পড়ে। মানুষ বুঝতে পারছে। মোদী সরকার যা করে ভালোর জন্যেই করে। আর সেই কারণেই মানুষ বিশেষ করে বাঙালি আজ বাংলাকে গুজরাটিদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে। বাংলায় এর আগে এমন সুবর্ণ সুযোগ আর আসেনি। গুজরাটিরা ব্যবসাটা ভালো বোঝে। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে কথা নিজ মুখেই বলেছেন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা মোদী সরকার যেখানে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ডবল ইঞ্জিন সরকারের ঘোষণা দিয়েই রেখেছে। সেখানে তো আর দ্বিতীয়বার ভাবার কোন দরকার নেই কিছু। সামান্য পেট্রল ডিজেল রোজকার রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ে ভাবলে দেশের জন্য আমরা ভাববো কখন? বছরে দুই কোটি চাকরি হয় নি তো কি হয়েছে? সরকারই সব করে দেবে এই বা কেমন কথা। নিজের চাকরি নিজে জোগার করে নেওয়ার হিম্মত রাখা দরকার। আর এবার তো মোদী সরকার বলেই দিয়েছে। বাংলার মানুষ ডবল ইঞ্জীন সরকার নিয়ে এলে প্রতিঘরে একজনের চাকরি বাঁধা। কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর। তাই ২০১৪ সালের বছরে দুই কোটি চাকরির কোন এক প্রতিশ্রুতির কথা ভেবে বসে থাকলে হবে? এটা ২০২১। এখন ঘরে ঘরে চাকরির প্রতিশ্রুতি। অন্তত ভোট পর্ব না মেটা অব্দি এই বিশ্বাসটা বুকে ধারণ করাই তো প্রতিটি দেশপ্রেমিকের আশু কর্তব্য। তারপর প্রত্যেকের ব্যংক একাউন্টে পনেরো লক্ষ করে টাকা ঢুকে যাওয়ার যে প্রতিশ্রুতির বিষয়ে স্বয়ং স্বরাস্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন, নির্বাচনী জুমলা বলে। এই প্রতিশ্রুতি সম্বন্ধেও যদি তিনি পরে একই কথা স্বীকার করে নেন, তবে বুঝতে হবে বুকের পাটা আছে। সত্যি কথা স্বীকার করতে কজনের সাহসে কুলায়? কিন্তু ডবল ইঞ্জীন সরকার গড়তে এরকম প্রতিশ্রুতির যে দরকার আছে। সেকথা কে না বিশ্বাস করবে। তাই বাঙালির অনেকেই আজ বিশ্বাস করছে। মোদী সরকার যা করে ভালোর জন্যেই করে। বাংলায় একুশের নির্বাচনে অন্তত সেরকমই একটা প্রবল হাওয়া উঠেছে। এখন দেখার সেই হাওয়া থাকতে থাকতে আমরা বাংলাকে গুজরাটীদের হাতে তুলে দিতে সফল হই কিনা। কারণ নিন্দুকের তো আর অভাব নেই রাজ্যে! তারা তো সব প্রচেষ্টা বানচাল করে দিতে উঠে পড়েই লেগেছে। ফলে বিশ্বাসটুকু ধরে রাখতে হবে শুধু। মোদী সরকার যা করে ভালোর জন্যেই করে। এখন সেই ভালো ঠিক কাদের জন্যে ভালো সেই বিষয়ে নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন। সে কথায় কান না দিলেই তো হলো। ভালো হওয়া দিয়ে কথা।

৬ই এপ্রিল’ ২০২১
কপিরাইট লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত




Read More »

শনিবার, এপ্রিল ০৩, ২০২১

শনির বচন | বঙ্গরাজনীতিতে বারমুডা

sobdermichil | এপ্রিল ০৩, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচার অভিযানে হুইলচেয়ারে আসীন মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বিরোধী দলনেতার বারমুডা তত্ব নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে জল ঘোলা হচ্ছে বিস্তর। বিরোধী পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে এক পা উঁচিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নাকি রাজ্যবাসীকেই অপমান করছেন। বিরোধী দলনেতার অশোভন মন্তব্য নিয়ে জল যতই ঘোলা হোক, রাজ্যবাসী যে তাতে বিরোধী দলনেতার উপরে ঘোরতর অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছে, এমনটাও বলা যাচ্ছে না। বরং অনেকেই বারমুডা পরিহিতা মুখ্যমন্ত্রীর কাল্পনিক ছবির কথা মনে করে ভিতরে ভিতরে আমোদ পাচ্ছেন হয়তো। নয়তো এমন চরম অশোভন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে রাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার কথা ছিল। যেকোন সভ্য সমাজেই এমন কুরুচিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে গোটা সমাজেরই গর্জে ওঠার কথা। কিন্তু এ হোল একবিংশ শতকের বাংলা। বিংশ শতকের নৈতিক আদর্শ ও বৌদ্ধিক প্রজ্ঞা এই শতকে আর আশা করার উপায় নাই। নাই বলেই, মুখ্যমন্ত্রীর অপমানকে রাজ্যবাসী নিজেদের অপমান বলে মনে করতে অপরাগ। কিছু কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর দলীয় সমর্থকদের উদ্যোগে প্রতিবাদ প্রদর্শন ছাড়া, বিষয়টি নিয়ে সাধারণ জনমানসে বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়নি। প্রতিক্রিয়া যতটুকু দেখা গিয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির অভিমুখেই। সরকারে ক্ষমতাসীন দল স্বভাবতঃই বিষয়টি নিয়ে ভোটের প্রচারে আসর গরম করে বিরোধী ভোটের কিছুটা নিজেদের দিকে টেনে আনার প্রয়াসী। অর্থৎ সবটাই নির্বাচনী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। বিরোধী দলনেতার এই কুরুচিকর বীভৎস মন্তব্য যে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই বেআব্রু করে দিলো তাই নয়। বাংলার সমাজ জীবনের অধঃপতনের চিত্রটিও সুস্পষ্ট করে তুলল। আমরা এমন একটা সময়ে এসে পৌঁছিয়েছি, যেখানে কুরিচকর মন্তব্যই রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইয়ে রাজনৈতিক নেতাদের তুরুপের তাস। যে নেতার মুখ যত খারাপ, তার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি তত বেশি। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতাদের পিছনে জনসমর্থনের যে ভিড়, সেটি অনেকটাই নির্ভর করে, কে কত নিকৃষ্ট মানের ভাষা ব্যবহার করতে পারে। কে কত নীচে নামতে পারে। যে নেতার মুখ যত খারাপ, তার জনসমর্থনের ভিত তত পোক্ত। এই যে রাজনৈতিক নেতানেত্রী ও অসামাজিক দুর্বৃত্তদের সংস্কৃতি এতটা কাছাকাছি চলে এসেছে। সেটি কিন্তু জনসমর্থনের ভিত্তিতেই ঘটেছে। নেতানেত্রীরা যদি দেখতে পেতো, মুখ খারাপ করলে, রুচির বিকার ঘটালে দুর্নীতিতে জড়ালে জনসমর্থন কমে যাচ্ছে, তবে যে যত বড়ো মাপেরই নেতা কিংবা নেত্রী হন না কেন। মুখ খারাপ করার সাহসই দেখাতে পারতেন না। দুর্নীতিতে জড়ানো তো দূরস্থান। প্রত্যেকটি নাগরিক জানে, কোন নেতা কোন নেত্রী কতটা সৎ। কতটা সভ্য। আর কতখানি অসৎ। কি পরিমাণ অসভ্য। কিন্তু সেই জানাও জনসমর্থনের ভিতে কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। বরং এটাই দেখা যায়, নেতা বা নেত্রী যদি নিপাট ভালো মানুষ কিংবা সৎ সজ্জন ব্যক্তি হন তবে তাঁর পিছনে জনসমর্থনের ভিড় কমতে কমতে একদিন শূন্য হয়ে যায়। বস্তুত আজকের দিনে রাজনীতিবিদ মাত্রেই এই সত্যটুকু জানেন। আর জানেন বলেই নিজেদের ভিতরে এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। কে কত বেশি নীচে নামতে পারেন। এ এক ভয়াবহ প্রবণতা। প্রতিটি দশক এই বিষয়ে পূর্ববর্তী দশকগুলিকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এগিয়ে চলেছে সবেগে পিছনের দিকে। গণতান্ত্রিক অধিকার এখন ভাষা সন্ত্রাসের অধিকার। নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দেওয়ার অধিকার। অন্যের ক্ষতি করার মতো ক্ষমতা অর্জনের অধিকার। আর নির্বাচনে জয়লাভ এই অধিকার গুলিকেই সুরক্ষিত রাখে। ফলে পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে শুরু করে লোকসভা নির্বাচন অব্দি সংবিধানই বস্তুত এই অপসংস্কৃতির রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে দশক থেকে দশকে। আরও ব্যাপক ভাবে। আরও সর্বাত্মক ভাবে। আরও সর্বজনীন ভাবে।

মুখ্যমন্ত্রী বারমুডা পরিহিতা হয়ে জনসমক্ষে হুইলচেয়ারে আসীন হবেন কিনা, বিষয় সেটি নয়। বিষয় হলো প্রকাশ্যে একজন বর্ষীয়সী মহিলাকে এই ভাষায় অপমান করার স্পর্ধাটুকুই। জনমানসে এই স্পর্ধাই জনসমর্থনের তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে। মূল বিষয় সেটিই। সমাজে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার যত অবরুদ্ধ হয়ে উঠবে, ততই এই অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটতে থাকবে। অনেকেরই স্মরণে রয়েছে, অভিনেতা তাপস পালের সেই বিখ্যাত নির্বাচনী ডায়ালগ। ঘরে ঘরে মেয়েদের রেপ করিয়ে দেওয়ার হুমকিসহ। তাপস পাল যে ঠিক এই ধরণের হুমকি দেওয়ার মানুষ ছিলেন, তাও নয়। কিন্তু রাজনীতির এই খোঁয়াড়ে টিকে থাকা ও বাকিদের থেকে স্পটলাইট নিজের দিকে টেনে আনার প্রাণান্তকর নিরন্তর প্রচেষ্টার অলিখিত প্রতিযোগিতার গাড্ডায় পড়ে গিয়েছিলেন। তারই পরিণতি সেই কুখ্যাত ডায়ালগ। কিন্তু যে রাজনৈতিক শিবিরের হয়ে তিনি সেই ডায়ালগ দিয়েছিলেন, সেই সময় সেই শিবিরের প্রতি মানুষের আস্থা ভালোবাসা জনসমর্থন কিন্তু তাতে এক ফোঁটাও কমেনি। বরং বৃদ্ধি পেয়েছিল বল্লেও ভুল বলা হবে না মোটেও। এটাই আমাদের সমাজের আসল চেহারা। ঠিক যেমন, ২০১৬’র বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক মুহুর্তে টিভির পর্দা জুড়ে ডজনখানেক দলনেতাকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিতে দেখেও মানুষ সেই নেতাদেরই ও তাদের দলকেই রেকর্ড ভোটে বিধানসভায় বিজয়ী করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। এটাই একবিংশ শতকের বাংলা। এটাই বাংলার সমাজচিত্র। এটাই নবজাতকদের সামনে আমাদের তৈরী করে রেখে দেওয়া পথ। এইভাবেই আমরা বাঙালিরা বিগত শতকের সকল অর্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এক নিঃশ্ছিদ্র অন্ধকারে পা রেখেছি।

মুখ্যমন্ত্রীকে বারমুডা পরে সবটা দেখানোর পরামর্শ সেই অন্ধকারেরই দৃপ্ত ঘোষণা। এবং ঘোষক খুব ভালো করেই জানেন এর ডিভিডেণ্ড আছড়ে পড়বে ইভিএমের একাউন্টে। এই যে জোর করে খারাপ কথা বলবো। খারাপ ভাবে বলবো। এই প্রতাপ রাজনীতিবিদদের বাকিদের থেকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে। 
একটা গোটা সমাজ যখন এইভাবে জনপ্রিয়তার পিছনে ছুটতে থাকে, তখন সুস্থ রুচি সুস্থ সংস্কৃতি সুসভ্য সামাজিক আদর্শ ইত্যাদি আশা করাই বৃথা। এখন কথা হলো, এই অপসংস্কৃতির মূল সুবিধে হলো একটাই। রাজনীতিবিদদের জনগণের কাছে কোন জবাবদিহির দায় থাকে না। 
রাজনীতিবিদরা জনসেবার নামে দলসেবা করে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নিয়েও নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। জনসাধারণ তাদের চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনভাবেই সমবেত হবে না। জমাট বাঁধবে না। প্রতিরোধ তৈরী করবে না। সমাজে তাদের মুখ খারাপ করা নিয়ে রসালো চর্চা হতে থাকবে। কিন্তু জনসেবার নামে আখের গোছানোর কার্যক্রমে বাধা পড়বে না আদৌ। জনগণ রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের নিয়ে সামাজিক তরজায় ব্যস্ত থাকবে মনের সুখে। সিধেঁল চোরের কাজ হলো গৃহস্থকে অন্যদিকে ব্যস্ত রেখে ঘর সাফ করে নেওয়া। রাজনীতিবিদদেরও কাজ জনসাধারণকে নানান ভাবে বিক্ষিপ্ত রেখে নিজেদের কাজ হাসিল করে নেওয়া। এই যে নানান ভাবে বিক্ষিপ্ত রাখার কার্যক্রম। অকথা কুকথা বলা গালিগালাজ করা, অবৈজ্ঞানিক তত্ব আউরানো ইত্যাদি হলো সেই কার্যক্রমেরই অংশ। রাজনীতিবিদরা তাই খুব সচেতন ভাবেই নিজেদর প্রতিদিনের সংলাপ সাজিয়ে নিয়ে মাঠে নামেন। তাঁরা জানেন কোন কথায় কতটা জল ঘোলা হবে। আর যত বেশি জল ঘোলা হবে তাদের পক্ষে মাছধরাও তত সহজ হয়ে উঠবে।

ঠিক এই কারণেই নির্বাচনী ভোটের বাজারে নেতা নেত্রীদের বিশেষ বিশেষ প্যাকেজ নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে দেখা যায়। জনগণের মাথা যত বেশি করে ঘুলিয়ে তোলা যাবে। ভোটের বাজারে আসন জেতা ততই সহজ হয়ে ওঠে। কারণ জনগণ তখন আর কোন জবাবদিহি দাবি করে না নেতা নেত্রীদের কাছ থেকে। তাদের মুখনিসৃত অকথা কুকথায় মজে থাকে দিনভর। খেয়াল করতে পারে না, এই নেতা বিগত পাঁচ বছরে ঠিক কোন জনসেবা মূলক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। জনগণের অপকার করার বদলে ঠিক কোন উপকারটি করেছেন। না, সত্যিই জনগণ তখন আর সে সব কথা জানতে চায় না। জনগণ সেই কথাটিই বরং শুনতে চায়, যে কথায় আমোদ পাওয়া যায় বেশি। যে কথা নিয়ে দুদণ্ড স্ফূর্তি করে নেওয়া যায়। রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন সম্পূর্ণ হলে সমাজের অবস্থা ঠিক এইরকমই হওয়ার কথা। আমাদের বাংলায় রাজনীতি আজ আমাদের ঠিক এইখানে নিয়ে এসেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর থেকে বাংলা ও বাঙালিকে মুক্ত করার মতো কোন শক্তি আজও তৈরী হয়ে ওঠে নি। তাই সামান্য বারমুডা পড়ার পরামর্শে জল যতই ঘোলা হোক না কেন। তাতে আমোদই রয়েছে। কোন প্রতিরোধ নেই। কোন বিকার নেই সমাজে এখন। কারণ গোটা সমাজটাই এখন বিকারগ্রস্ত। কোমায় আচ্ছন্ন।


২রা এপ্রিল’ ২০২১
কপিরাইট লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত
Read More »

শনিবার, মার্চ ২৭, ২০২১

শনির বচন | খেলা হবে খেলা হবে

sobdermichil | মার্চ ২৭, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

খেলা হবে খেলা হবে। না, খেলা হচ্ছে। খেলাই হয়ে চলেছে। এ এক অনবদ্য খেলা। যার কাছে কোন আর্জি নিয়ে পৌঁছাতে গেলে রীতিমত পাহারাদার চৌকিদার ডান হাত বাঁ হাত এই সোর্স ঐ সোর্স, সেজ দাদা মেজ দিদিদের অনুমতি পেলে তবেই পৌঁছানো যায়। স্বয়ং তিনিই আজ করজোড়ে নতমস্তকে আপনার দূয়ারে। ভোট প্রার্থীর অবতারে। মাত্র একটি ভোট। সেইটির জন্য কত মেহনত। দেশসেবার দায় কম বড়ো কথা নয়। দেশসেবার তাগিদে ঘরে ঘরে নেতা নেত্রীদের জন্ম হচ্ছে দুই বেলা। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে লোকসভা সাংসদ। একটা নির্বাচন। একটা টিকিট। একটা জয়। তাহলেই কেল্লাফতে। পরাজিত হলেও ক্ষতি নেই। নির্বাচনী খেলার শেষ নেই। আজ নয়তো কাল। এই আসনে নয়তো ঐ আসনে। একটা নির্বাচনে জিতে গেলেই পাঁচ বছর ধরে খেলে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। সাথে সকল রকমের সরকারী সুযোগ সুবিধে। রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি। অর্থনৈতিক বিত্ত বৈভব। এবং আইনকে নিজের পথে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনন্ত সম্ভাবনা। এমন ওজনদার খেলায় তাই খেলোয়ারের কোন অভাব নেই। রাজা প্রজার দেশ ভারতবর্ষ। শাসক ও শোষিতের দেশ ভারতবর্ষ। হাজার হাজার বছরের সংস্কৃতি। মাত্র দুইশো বছরের ব্রিটিশ শাসনে বিদেশী শাসকের পাঠশালায় গণতন্ত্রের পাঠ নিলে কি হবে। সেই গণতন্ত্রেই পঞ্চায়েত প্রধান থেকে লোকসভার সাংসদ অবতারে, সেই রাজা রাজাধিরাজদেরই সংস্কৃতি। একটা নির্বাচনী টিকিট। একটা আসন। একটা জয়। পাঁচ বছরের রাজত্ব। এই পাঁচ বছরের রাজত্বেরই গালভরা নাম ভারতীয় গণতন্ত্র। সেই রাজত্ব দখলের সরকারী সিলমোহর, নির্বাচনে জয়লাভ। সে যে ভাবেই হোক। ছাপ্পা, ধাপ্পা, বুথ দখল, ইভিএম হ্যাক যাই হোক না কেন। একবার সরকারী ঘোষণা হয়ে গেলেই হলো। খেলাটা এইখানেই। পাঁচ বছরের রাজত্বলাভ করতেই হবে। করলেই অর্থনৈতিক বিত্ত বৈভব, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি এবং সরকারী সুযোগ সুবিধে লাভে সরকারী সিলমোহর।

খেলাটা তাই হচ্ছেই। খেলাটা তাই চলছেই। নতুন করে খেলা হওয়ার কোন কথা নয়। রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের খেলায় জনগণকেও হুলিয়ে নেওয়া গিয়েছে। খেলে চলেছে নেতা নেত্রীরা। জনগণের পিণ্ডিচটকেই। অথচ সেই জনগণই এখন খেলা হবে খেলা হবে বলে হাত পা ছুঁড়ে নৃত্য করছে্। জনগনকে দিয়েই জনগণের সর্বনাশের ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার নামই নির্বাচন। সেটাই সকল খেলার পিছনের খেলা। সেটাই ভারতীয় গণতন্ত্র। প্রাক ব্রিটিশ যুগে বাহুবলই ছিল রাজত্ব দখলের ছাড়পত্র। অস্ত্রসম্ভার ছিল সেই বাহুবল। বাহুবলই আজও রাজত্বদখলের শেষ কথা। কিন্তু অস্ত্রের বদলে নি্র্বাচনী টিকিটই আজ রাজত্ব দখলের চাবিকাঠি। অস্ত্রের জায়গায় নির্বাচনী গণতন্ত্রকে ঢাল করে জনগণকে দিয়েই জনগণের পিণ্ডিচটকানোর দলিলে সহমতের ছাপ দেওয়ানোর কাজ চলছে। খেলাটা এখানেই।
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, দিনে দিনে নির্বাচিত বিধায়ক সাংসদদের বেতন, ভাতা, পেনশন, অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধে যত বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে, নির্বাচনী গণতন্ত্রের এই খেলায় 
খেলোয়ারের সংখ্যাও তত হুহু করে বেড়ে চলেছে। সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই দেশে সাংসদদের সংখ্যা দ্বিগুন করার প্রস্তাব এসে গিয়েছে। এবং সেই লক্ষ্যেই নতুন সাংসদ ভবন তৈরীর পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পরবর্তীতে দেখা যাবে রাজ্যে রাজ্যে বিধায়কের সংখ্যাও বিপুল ভাবে বৃদ্ধি করার জন্য পরিকাঠামো তৈরী করা শুরু হয়ে যাবে। জনগণের করের টাকায় ছড়ি ঘোরাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি স্বরূপ রাজা রাজাধিরাজদের সংখ্যা দিনে দিনে বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে চলেছে। তাই যত দিন যাবে নির্বাচনী খেলায় নতুন নতুন খেলোয়ারের ভিড় বাড়তেই থাকবে। আর জনগণকেও তাই নাচতে হবে খেলা হবে খেলা হবে বলে।

না, আগে দেশসেবার রীতি রেওয়াজ, নীতি আদর্শ ছিল ভিন্ন। আখের গুছিয়ে নিতে, রাজত্ব দখলের রাজনীতি করতে কেউ রাজনীতিতে ভিড়তো না। অত্যন্ত মেধাবী যাঁরা। দেশ ও দশের হিতের বিষয়ে ওয়াকিবহাল। তারাই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিত। কিন্তু সেদিন আর নাই। রাজনীতি এখন শুধুই একটা অর্থকরী পেশা নয়। রাজনীতি এখন রাজত্ব দখল ও বিস্তারের হাতিয়ার। গণতন্ত্র সেই দখলদারিত্বের রক্ষাকবচ। জনগণ সেই রাজত্বে শোষণের ক্ষেত্র। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে লোকসভার সাংসদদের বেতন ও পেনশন বন্ধ করে দিয়ে দৈনিক ন্যূনতম ভাতা চালু করে দিলেই রাজনীতির এই খেলার মাঠে খেলোয়ার খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধুধু মাঠে ঘুঘু চড়বে শুধু।

মাত্র একটা নির্বাচনী টিকিটের জন্যেই আজ তাই এত কাড়াকাড়ি। একটা টিকিট। পাওয়া আর না পাওয়া। কপাল খুলে যাওয়া আর না যাওয়া। আর নির্বাচন জিতে গেলে তো কথাই নেই। পাঁচ বছর ধরে ঘর গুছিয়ে তোলা। কেউ হিসাব নিতে আসবে না। বরং সম্পত্তি ও সম্পদ যত বাড়তে থাকবে। ভোটার তত বেশি করে সমীহ করতে শুরু করবে। যত বেশি ভোটারের সমীহ আদায় করা যাবে, তত বেশি নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে পরবর্তী নির্বাচন জেতার বিষয়ে। তাই ভোটারের সমীহ আদায় করার খেলাটাও চালিয়ে যেতে হবে প্রতিদিন। সেই খেলাটা চলছেই। সেই খেলাটা হতে থাকবেই।

এই খেলায়, যার যত বেশি প্রতাপ ও প্রতিপত্তি। বিত্ত ও বৈভব। সেই তত বড়ো খেলোয়ার। বিশাল মঞ্চ। শীততাপ নিয়ন্ত্রীত আরাম কক্ষ। শত শত গাড়ীর কনভয়। নেতা আসছেন। অজগর সাপের মতো গাঁদাফুলের মালা। নেতাকে বরণ করতে। মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি। চেল্যাচামুণ্ডাদের বিশাল প্রাচীর। সরকারী সুরক্ষা বাহিনীর নিঃশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। নেতা হাত নাড়বেন। ভক্তদের উদ্দেশে ঢপ দেবেন। বিরোধীদের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে যাবেন। জমে উঠবে খেলা। খেলা চলছে চলবে। হচ্ছে হবে। আজকাল আবার খেলা জমিয়ে গুলতে নতুন আয়োজন শুরু হয়েছে। নেতানেত্রীদের রোড শো। জনগণের সাথে পথ হাঁটার দিন শেষ। আজকাল পথহাঁটায় খেলা জমে না। যত বড়ো নেতা তত বড়ো রোডশো। চারচাকার মোটরচালিত রথে নেতা কিংবা নেত্রী। ডান হাত বাম হাত। সেজ নেতা মেজ নেত্রী পরিবেষ্টিত হয়ে। সাথে সরকারী নিঃশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। জনগণের করের টাকায় বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সরকারী চাকুরিরত কমাণ্ডো বাহিনীর সজাগ দৃষ্টি। রথে ভোট প্রার্থী নেতা। এগিয়ে চলছে রথ। সামনে পেছনে এগিয়ে চলেছে জনতার পাল। নেতার হাত মুঠো মুঠো ছেঁড়া পাপড়ি ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই জনতার পালের মাথায়। খেলা চলছে। মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি নেতানেত্রীর নামে। নির্বাচনে জিতিয়ে নিয়ে আসতে হবে। রাজত্ব দখলে সাহায্য করতে ভোট দিতে হবে নির্দিষ্ট চিহ্নে। নেতাদের সম্পত্তি সম্পদ আরও বেশি ফুলে ফেঁপে উঠবে পরবর্তী পাঁচ বছরে। তবেই না খেলা জমবে। আর জমিয়ে তোলার দায় সেই জনতার পালের।

না, এই খেলার কোন বিকল্প নেই। অন্তত ভারতীয় গণতন্ত্রে। ব্রিটিশের পত্তন করা এই গণতন্ত্র। সংবিধানের রক্ষাকবচ পাওয়া এই গণতন্ত্র। তার কোন বিকল্প পথ থাকার কথা নয়। নেইও। তাই একজনকে রাজত্ব থেকে উৎখাত করা মানে, আর একজনকে সেই একই রাজত্বে গদীয়ান করা। নাম ঠিকানা পাল্টিয়ে যাবে শুধু। দলীয় পতাকা ও প্রতীক পাল্টিয়ে যাবে শুধু। বাকি সব যেমন চলে, ঠিক তেমনই চলতে থাকবে। ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফীত হতেই থাকবে। শুধু অন্যের একাউন্টে। জনতার পাল রোডশোয়ের সামনে পিছনে যেমন হাঁটে, তেমনই হাঁটতে থাকবে। এবং খেলা চলতেই থাকবে। যেমন চলে। চিরকাল।

এখন এই খেলা কবে কিভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে, আদৌ হবে কিনা। সেকথা বলবে আগামী প্রজন্ম। যতদিন এই খেলা চলতে থাকবে। ততদিনই টিকে থাকবে এই গণতন্ত্র। রাজা ও প্রজা, শোষক ও শোষিতের গনতন্ত্র। নির্বাচনী ভোট ভোট খেলার গণতন্ত্র। হয় এ, নয় ও। ভোট যে দিকেই যাক, খেলা চলতেই থাকবে। জনগণের করের টাকা কার কার ঘরে উঠবে। কতটা বিপুল পরিমাণে উঠবে। খেলাটা সেখানেই। শুকনো আঙ্গুল চুষতে চুষতে জনগণের আঙ্গুল ক্ষয়ে যাক। হেজে যাক। শুধু নির্বাচনের পবিত্র দিনে ভোটটা দিয়ে যেতে হবে। খেলোয়ার যেই হোক না কেন।


২৬শে মার্চ’ ২০২১
কপিরাইট লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত
Read More »

শনিবার, মার্চ ২০, ২০২১

শনির বচন | বুদ্ধিজীবী সেলিব্রেটিদের’র বাজারদর

sobdermichil | মার্চ ২০, ২০২১ | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

সামনেই ভোট। বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। সারদা নারদা সিন্ডিকেন্ট কাটমানি তোলাবাজি ইত্যাদির দখল নিয়েই দুই পক্ষের ভিতরে জোর লড়াই। এক পক্ষ তাদের দশ বছরের অধিকার ছেড়ে দিতে নারাজ। অন্য পক্ষ সেই অধিকার কেড়ে নিতে মরিয়া। এক পক্ষের স্লোগান উন্নয়ন। অন্য পক্ষের স্লোগান রামরাজত্ব। এক পক্ষের অস্ত্র বহিরাগত তত্ব। অন্য পক্ষের অস্ত্র হিন্দুত্ব। এক পক্ষের অভিযোগ দাঙ্গাবাজির বিরুদ্ধে। অন্য পক্ষের অভিযোগ সংখ্যালঘু তোষণের বিরুদ্ধে। এক পক্ষের আস্তিনে মা ক্যান্টিন। অন্য পক্ষের আস্তিনে সিএএ। এক পক্ষ ঘোষণা করছে বাংলা ঘরের মেয়েকেই চায়। অন্য পক্ষ ঘোষণা করছে বাংলা ডবল ইঞ্জিন চায়। এক পক্ষ বলছে তোমরা আমাদের ভোট দাও আমরা তোমাদের সুরক্ষা দেবো। অন্য পক্ষ বলছে তোমরা আমাদের ভোট দাও আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো। কিন্তু কোন পক্ষই মানুষের কাছে গিয়ে জানতে চাইছে না। মানুষ ঠিক কি কি চায়। অথচ দুই পক্ষই জানে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা এবং সেলিব্রেটিরা কি কি চায়। তাই দুই পক্ষেই তাদের অবারিত দ্বার। শুধু তাই নয়। অন্য পক্ষের হয়ে ওকালতি করা বুদ্ধিজীবীদের এবং সেলিব্রেটিদের নিজ পক্ষে টেনে নিয়ে আসার বিষয়ে আবার ডবল ইঞ্জিনের স্বপ্ন ফিরি করা শিবিরের উৎসাহ এবং উদ্দীপনা দেখার মতোন। বিপক্ষ শিবিরের সাংসদ বিধায়ক মন্ত্রীদের ভাঙিয়ে নিয়ে আনাই নয় শুধু। তাদের বুদ্ধিজীবীদের ও সেলিব্রেটিদেরও নিজ গোয়ালে ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখার বিষয়েও তাদের শক্তি দেখার মতোন।

এবং এই বাংলার বুদ্ধিজীবী এবং সেলিব্রেটি। তাদের একটা বড়ো অংশই এই রাজনীতির কাজিয়ায় নিজের নিজের আখের গুছিয়ে নিতে মরিয়া। এই সেদিনও যে বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটি রাজ্য সরকারের ভ্রান্তনীতি, প্রশাসনিক অপদার্থতাগুলিকে ঢাকতে সান্ধ্য টিভির আসরে চিৎকারে কান ঝালাপালা করে দিতেন। ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের সকল অপকর্মের পক্ষে সওয়াল করতেন। তাদের একটা বড়ো অংশই এখন রং বদল করে অন্য পক্ষের ধামা ধরতে তাদের গোয়ালমুখো হয়েছেন। কেউ কেউ নির্বাচনী টিকিট পেয়েই ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে দিয়েছেন। এঁদের লক্ষ্য বিধায়ক পদ। এদের লক্ষ্য মন্ত্রীত্ব। নিজের নিজের পেশায় এঁরা কেউই আর সন্তুষ্ট থাকতে চাইছেন না। এঁরা জানেন রাজনীতি পেশা হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, কুবেরের ধনের আড়ত। কোন কোন বুদ্ধিজীবী কিংবা সেলিব্রেটি আবার বিগত দশ বছর আমের আঁটি চোষার মতোন নানান রকমের সরকারী সুযোগসুবিধা ভোগ করে এইবারে দলবদলের পর্বে সামিল হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁদের কাছে খবর আছে, ক্ষমতার পাশা ওল্টাচ্ছেই। নাহলে সুখে থাকতে ভুতে কিলানোর কথা ছিল না।
এইবারের রাজ্য নির্বাচনে এক অভুতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছে। বিগত দশ বছরে ফুলে ফেঁপে ওঠা সাংসদ বিধায়ক মন্ত্রী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী এবং সেলিব্রেটিরাও দলবদলের মিছিলে পা মিলিয়েছেন। এঁরা নিশ্চিত ক্ষমতা বদল হচ্ছেই। তাই ক্ষমতার বৃত্তে থাকতেই তাঁদের এই মিছিল। এক দলে থেকে সব সুযোগ সুবিধে ভোগ করে নিয়ে, এবার নতুন দলে যোগদান। কিন্তু মুখে তাঁদের একটিই বুলি। মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সত্যই মানুষের জন্য একটি দিনও কাজ করতে না পেলে, এঁদের বড়ো কষ্ট। দমবন্ধ হয়ে মারা পড়বেন। মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। আর মানুষের জন্য কাজ করতে দরকার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা সরকারে না থাকলে আর হাতে থাকবে কি করে?
সরকারে না থাকলে তো আর কাউকে কিছু পাইয়ে দেওয়া যায় না। আর কাউকে কিছু পাইয়ে দিয়ে কাটমানি জোগার করাই এই যুগে মানুষের জন্য কাজ। সেই কাজ কি শুধুই রাজনীতিবিদরা একচেটিয়ে ভাবে করে যাবে? বুদ্ধিজীবী এবং সেলিব্রেটিরাও সেই কাজ করতে সমান আগ্রহী। তাই তাদেরও নির্বাচনী টিকিট চাই।

রাজ্যের বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের রাজনৈতিক দর দিনে দিনে ক্রমেই উর্ধমুখী। রাজনৈতিক শিবিরগুলিও এঁদের জনপ্রিয়তার উপরে বিশেষ করে নির্ভরশীল। এঁরা সেকথা বিলক্ষণ জানেন বলেই নিজেদের বাজারদর সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। তাই ভোটের মুরশুমে স্বভাবতঃই সেই দর আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু তাতে কি। ভোটের বাজারে এদেশের রাজনৈতিক শিবিরগুলির অর্থের কোন অভাব থাকে না। তাই জলের মতো টাকা খরচ করতে এদের আপত্তির কোন কারণ নাই। বুদ্ধিজীবী সেলিব্রেটিদের সেটাই উপরি পাওনা। ফলে লাইন লেগেছে। নেতা মন্ত্রী সাংসদ বিধায়কদের পাশাপশি বুদ্ধিজীবী সেলিব্রেটিদের।

এই বুদ্ধিজীবী এবং সেলিব্রেটিরাই টিভি ক্যামেরার সামনে নীতি উপদেশ বাক্যে জনতাকে ধন্য করে থাকেন। যখন যে দলের পতাকার বাঁট ধরে থাকেন। তখন সেই দলের হয়ে কথা বলেন। এমন মসৃণ ভাবে বলেন, যেন শুনে মনে হবে নিজেরই জীবনদর্শনের কাহিনী শোনাচ্ছেন। সারা জীবনের অভিজ্ঞতার সার সত্য। যে শুনবে সেই ধন্য হয়ে যাবে। সেই একই বুদ্ধিজীবী সেলিব্রেটি আবার পাল্টি খেয়ে অন্য দলের পতাকার বাঁট ধরে ঠিক বিপরীত মতাদর্শের কাহিনী শোনাবেন। একই রকম মসৃণ ভাবে। দক্ষ অভিনেতা যেমন পরিচালকের নির্দেশিত চিত্রনাট্যের সংলাপ আউড়িয়ে যান। ঠিক একই রকম। যখন যে দলের ধামা ধরবেন। তখন সেই দলের রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট অনুসারে সংলাপ বলে যাবেন। এই বিষয়ে এঁদের দক্ষতা অভিনয়ের জগতে অস্কার পাওয়ার সমতুল্য।

রাজ্যবাসীও আজ এই বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের চক্রব্যূহে আটকিয়ে পড়েছে। এঁদের জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। যেখানে যাবেন। সেখানেই ভিড়। কে কি বলবেন। জানতে উৎসাহী জনতার অভাব নাই। টিভি খুললেই রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের পাশাপাশি এঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। এঁদের অনেকেই আবার সেই সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের হাত ধরেই পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছিলেন। শিল্প নয় কৃষি। এবার তাঁরাই সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে শিল্প গড়ার পক্ষ নিয়ে গলা ফাটাবেন। সেই শিল্প যদি আবাসন শিল্পও হয়, কোন ক্ষতি নাই। যখন যেমন স্ক্রিপ্ট। তখন তেমন সংলাপ। লক্ষ্য অপরিবর্তনীয়। রাইটার্স, নয় নবান্ন। সরকারী ক্ষমতার শেয়ার। পরিবর্তনীয় শুধু রাজনৈতিক পতাকা প্রতীক ও রঙ।

এই যে রাজনৈতিক পতাকা প্রতীক আর রঙ। এর কোনটাই সাধারণ জনগণের জন্য নয়। এইগুলি রাজনীতির সাথে জড়িত নেতা নেত্রী, শিল্পপতি, ব্যাবসাদার, এবং বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের জন্য। জনতাকে বশে রাখার মানদণ্ড। রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নেতানেত্রী ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের দিয়ে এই পতাকা প্রতীক ও রং বহন করিয়ে জনতাকে বশে রেখে থাকে। জনতা বশে থাকলেই ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকবে। জনতা বশে না থাকলেই ক্ষমতা হাতছাড়া। যখন যে পতাকা প্রতীক ও রঙ যত বেশি মিথ্যে যত বেশি জোরের সাথে প্রচার করতে পারবে, ততবেশি পরিমাণে জনতাকে বশীভুত করে রাখতে সক্ষম হবে। এটাই ভারতীয় রাজনীতির আসল চিত্র। নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভেতরের কথা। সেই গণতন্ত্রে বর্তমান সময়ে বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের জন্য একটা প্রশস্ত অঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। জনতাকে বশে রাখার প্রচার কার্যে। এঁরা জানেন, কখন কোন ভঙ্গিমায় জনতাকে কব্জা করা যায়। সংলাপ ঠিক করে দেবে রাজনৈতিক দল। তাদের নিজস্ব স্ক্রিপ্ট অনুসারে। বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিরা যোগ করবেন শুধু নিজস্ব ভঙ্গিমাটুকু। তাহলেই কেল্লাফতে। সংলাপ ও স্ক্রিপ্টের বদল ঘটবে। যখন যেদিকে হাওয়া, সেই অনুসারে। অপরিবর্তনীয় শুধু ঐ ভঙ্গিমাটুকু। যেটি বুদ্ধিজীবী ও সেলিব্রেটিদের নিজস্ব।

এই যে নিজস্ব এক ভঙ্গিমা। বুদ্ধিজীবী এবং সেলিব্রেটিদের। এটাই তাঁদের ইনভেস্টমেন্ট। এর দৌলতেই তাঁরা করে খাচ্ছেন এই বাংলায়। এই ভঙ্গিমা তখনই অর্জন করা সম্ভব হয়। যখন কেউ নিজস্ব মতাদর্শ বিসর্জন দিতে পারে। যখন কেউ আপন শিরদাঁড়া বন্ধক রাখতে পারে কোন না কোন রাজনৈতিক ক্ষমতার পায়ে। তখনই অর্জিত হয় এক নিজস্ব ভঙ্গিমা। যা দিয়ে মন ভোলানো সম্ভব জনতার এক বড়ো অংশকেই। দেশ গোল্লায় যাক। জাতি রসাতলে যাক। কিচ্ছু এসে যায় না। ইতিহাসে তাঁদের নাম মুছে যাক। ক্ষতি নাই। রাজনীতির বাজারে তাদের বাজারদর উর্ধমুখী রাখাই আসল কথা। যার মূল লক্ষ একটাই। আখের গুছিয়ে নেওয়া। আর কে না জানে আখের গুছিয়ে নেওয়ার কোন শেষ নাই। তাই যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

১৯শে মার্চ’ ২০২১
কপিরাইট লেখককর্তৃক সংরক্ষিত
Read More »

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.