x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

শনিবার, আগস্ট ০৮, ২০২০

শনিরবচন

sobdermichil | আগস্ট ০৮, ২০২০ |
রাম নাম সত্য হ্যায় / শনিরবচন

অনেকের পরিবরেই কালাশৌচ চলছে। সদ্য প্রিয়জন বিয়োগব্যথায় পরিবারসুদ্ধ সকলেই শোকে মুহ্যমান। না তাদের কাছে এটা উৎসবের সময় নয়। এমন আকস্মিক মৃত্যু তো কারুরই অভিপ্রেত নয়। কেউই প্রস্তুত ছিলো না এই করোনাকালের জন্য। কেউই প্রস্তুত ছিল না এই মহামারীর জন্য। সেই শোকের সময়ে, পারিবারিক কালাশৌচ চলার ভিতর কোন পরিবারই কোন উৎসবের আয়োজন করে না। এটাই আবহমান ভারতীয় রীতি। এই কারণেই দেখা যায়, কালাশৌচ চলাকালীন পারিবারিক ভাবে সামাজিক কোন উৎসব অনুষ্ঠানেও যোগ দেওয়ার রীতি নাই। এমন কি ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠান থেকেও কালাশৌচ চলাকালীন নিজেদের সরিয়ে রাখাই ভারতীয় সংস্কৃতি। কিন্তু সম্প্রতি সেই ভারতীয় সংস্কৃতির রীতি রেওয়াজ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের বিশাল উৎসব আয়োজিত হয়ে গেল সেই অযোধ্যায়। ঠিক যখন আবিশ্ব করোনা সংক্রমণের তালিকায় ২০ লক্ষ ২৭ হাজার ৭৪ জন ভারতীয় নিয়ে ভারতবর্ষ তৃতীয় স্থানে অবস্থানরত। এবং অতি দ্রুত ব্রাজিলকে টপকিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের দৌড়ে এগিয়ে চলেছে অপ্রতিহত গতিতে। আর আবিশ্ব মৃত্যুর তালিকায় ৪১ হাজার ৬৩৮ জনের ভবলীলা সাঙ্গ করে ভারতবর্ষ পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। যে কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দেশেই এটা রাষ্ট্রীয় শোকের সময়। ধর্মীয় উৎসবের সময় নয়। রাজনৈতিক সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠান আয়োজনের সময়ও নয়। সাম্প্রদায়িক অস্মিতা প্রদর্শনেরও সময়ও নয়। আহ্লাদে পেশীশক্তির প্রদর্শনে নৃত্য করারও সময় নয়। ৬ লক্ষ ৭ হাজার ৩৩১ জন এই মুহুর্তে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে যে দেশে, সেই দেশের শারীরীক ভাবে সুস্থ জনগণের একটা বড়ো অংশই তখন অযোধ্যায় মন্দির শিলান্যাসের আনন্দে উৎসবের উন্মদনায় উন্মত্ত! এই যে মানসিক অসুস্থতা, আবিশ্ব করোনাকালে এই অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশে ভারতবর্ষের এই বিশ্বরেকর্ডও লিপিবদ্ধ হয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়।

ইতিহাসের পাতায় একজন বেহালাবাদক নীরোর কথাই লিপিবদ্ধ ছিল এতদিন। অগ্নিদগ্ধ রোম নগরীর মৃত্যুর আর্তনাদের সুরকে ছাপিয়ে বেহালার ছরে সুর চড়িয়ে ছিলেন বেহায়া নীরো। যে ইতিহাসের কোন ভাগীদার ছিল না এতদিন। কিন্তু না। এখন আর নীরোকে একমেবাদ্বিতীয়ম বলা যাবে না। ভাগীদার কোন একজন বিশেষ ব্যক্তিও নয়। একটা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। একটি জনসম্প্রদায়ের এক বিশেষ অংশ। প্রায় অর্ধ লক্ষ স্বদেশবাসীর মৃত্যুর প্রহরে এত বিশাল আয়োজনে উৎসব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে আমরা দেখিয়ে দিলাম আমরাও পারি। বেহালা বাজাতে। 

সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় রাজনীতির প্রভাবে সামাজিক পরিসরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যাগযজ্ঞ ইত্যাদির ঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। অনেকেই নতুন করে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। যতটা না ধর্মীয় কারণে, তার থেকে অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রসূত হয়ে বিশেষ রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখানোর কারণে। সেই রাজনৈতিক আস্ফালনে আমরা ভুলে গেলাম, এটা রাষ্ট্রীয় শোকের সময়। এটা হিন্দুধর্মের রীতি রেওয়াজ অনুসারেই কালাশৌচের কাল। এক শ্রেণীর উগ্র হিন্দুয়ানী ধ্বজাধারীদের হাতে সেই হিন্দু সংস্কৃতির আবাহমান কালের এই রীতির রাম নাম সত্য হ্যায় হয়ে গেল অযোধ্যায়। 

না তাতে আমাদের কি? কিই বা এসে গেল? যাদের ঘরে আজ প্রিয়জন বিয়োগে রান্না চড়ে নি। যাদের ঘরে আজ একমাত্র উপার্জনশীল মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে কোভিড-১৯, তারাই জানে কালাশৌচের মূল্য। তারাই উপলব্ধি করছে প্রিয়জন হারানোর জ্বালা। তারাই বোঝে শোকতাপের নিদারুণ কষ্টের যাতনা। হাজার হাজার ঘরে যখন এই কাহিনী। তখন রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে মহাকাব্যের কিংবদন্তী নায়কের নামে মন্দির শিলান্যাসের যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানের উন্মত্ত উৎসব। এ শুধু ভারতবর্ষেই সম্ভব। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি। এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে যখন লক্ষ লক্ষ পরিবারে সংক্রমিত অসুস্থ প্রিয়জনের জীবন নিয়ে টানাটানি চলছে। রাষ্ট্র তখন চল্লিশ কেজি ওজনের রূপোর ইট নিয়ে টানাটানি করছে। মহাকাব্যের নায়কের নামে। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন তার নাগরিকের জন্য অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ থেকে শুরু করে হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি করে করোনার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, আমরা তখন থালা বাজাই। আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালি। কোটি কোটি টাকার পুষ্পবৃষ্টি করি। অতিরিক্ত মূল্যে যুদ্ধ বিমান কিনে আমাদের সামরিক শক্তির বিজ্ঞাপন দিই। কালাশৌচের কালেই নির্মাণ উৎসবের উন্মত্ত আনন্দে মাতি। হাসপাতালের বদলে মন্দির নির্মাণ করি। হিন্দু ধর্মের রীতি রেওয়াজেরই রাম নাম সত্য হ্যায় করে ছাড়ি। না তাতে আমরা ধর্মচ্যুত হই না। বরং আরও বেশি করে ধর্মীয় পেশীশক্তির আস্ফালনে উন্মত্ত হয়ে উঠি। এটাই কি নতুন ভারতীয় সংস্কৃতি তবে? এটাই কি একবিংশ শতকে পৌঁছিয়ে ভারতীয়ত্বের পাসপোর্ট? 

এই নতুন ভারতীয় সংস্কৃতিকে মাথায় তুলে নৃত্যরত না হলেই তুমি আর ভারতীয় নও। দেশদ্রোহী। এই যে অশনি সংকেত আজ চারিদিকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচারিত হচ্ছে, এরও নিশ্চয় একটি সুনির্দিষ্ট পরিণাম অপেক্ষা করছে সমগ্র ভারতবাসীর কপালেই। সেই পরিণতি থেকে কেউ কি আলাদা করে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হবে? হবে কি হবে না। পারবে কি পারবে না। সেকথা জানা যাবে আজ নয়। আগামীতে। কিন্তু আজ যদি আমরা গান্ধারীর মতো চোখে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ফেটি বেঁধে মহাকাব্যের নায়কের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে, সেই জয়ধ্বনিকেই ভারতীয়ত্বের পাসপোর্ট বলে স্বীকার করে নিই। তবে সেটি নিজের পায়েই কুড়ুলের কোপ মারার মতোন বিষয় হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা এক উন্মত্ত দিশাহীন নির্মম নৃশংস সমাজ উপহার দিয়ে যাবো। আগামী প্রজন্ম কেন ইতিহাসও সেদিন আমাদের ক্ষমা করবে কি? না কি আজকের এই সম্মিলিত পাপের বোঝা থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে শুরু হবে অভুতপূর্ব এক মুক্তিযুদ্ধ? জানি না আমরা। কিন্তু সম্ভাবনা থেকেই যায়। অনন্ত ইতিহাস আমাদের সেই ইঙ্গিতই দেয় বারবার। ইতিহাসই প্রমাণ করেছে এক যুগের পাপ ধুতে আর এক যুগের মহাসংগ্রামের জন্ম হয়। 

ভারতবর্ষ আজ প্রমাণ করেছে, ভারতীয়দের শোক দুঃখের সাথে ভারতবর্ষের আর কোন সংযোগ সূত্র নাই। দেশের লোক রোগে ভুগে মরুক। না খেতে পেয়ে মরুক। বাস ট্রেনের অভাবে কোটি কোটি ভারতবাসী হাজার হাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মরুক। ঝড়ে বন্যায় মহামারীতে মরতে থাকুক। তাতে ভারতবর্ষের কি? ভারতবর্ষের তাতে কি এসে যায়? কারণ ভারতবর্ষ জানে একশ ত্রিশ কোটি মানুষের ভিতর সুইস ব্যাঙ্কে জমানো কালো টাকার কারবারীদের, দেশের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে চলে যাওয়া বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীদের, দেশের জনগণকে শোষণ করে ফুলে ফেঁপে ওঠা হাতে গোনা শিল্পগোষ্ঠীদের, এবং বিশেষ কয়েকজন ব্যাংক লুঠেরাদের সুরক্ষা দিয়ে সুরক্ষিত রাখতে পারলেই ভারতবর্ষ টিকে যাবে। তাতে একশ ত্রিশ কোটি ভারতবাসীর কত লক্ষ মানুষ মরলো কি বাঁচলো তাতে ভারতবর্ষের কিছু এসে যায় না। যে ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে এই এতকিছু সেই ধর্মের রীতিরেওয়াজের রাম নাম সত্য হ্যায় করে দিলেও কিছু এসে যায় না। শুধু দেশ জুড়ে আরও আরও মন্দির প্রতিষ্ঠা করে যেতে হবে। না হলে জনগণ বলে পদার্থটাকে ধর্মের আফিমে বশীভুত করে রাখা সম্ভব হবে না। ভারতবর্ষই জানে, ধর্ম নয়। ধর্মের কোন অস্তিত্বের আর প্রয়োজন নাই। ধর্মের আফিমটুকুর চাষ করে গেলেই হবে শুধু। সারা দেশ জুড়ে ধর্মের সেই আফিমের চাষ শুরু হয়ে গিয়েছে। একেবারে উন্নত প্রকৌশলে। এই বিষয়ে ভারতবর্ষ গোটা বিশ্বে একমেবাদ্বিতীয়ম। সেই প্রথম স্থান ধরে রাখতেই আজ ধর্মের রাম নাম সত্য হ্যায়ের এত বড়ো আয়োজন। এশুধু পঞ্চবার্ষিকী প্রকল্পই নয়। আরও বৃহৎ এর পরিকল্পনা। আরও গভীর। আরও সর্বাত্মক। 


৮ই আগস্ট’ ২০২০ /কপিরাইট লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত


Read More »

শুক্রবার, আগস্ট ০৭, ২০২০

◆ কাজী রুনা লায়লা খানম / বাইশে শ্রাবণে

sobdermichil | আগস্ট ০৭, ২০২০ | |
কাজী রুনা লায়লা খানম / বাইশে শ্রাবণে

সময়ের গভীর অসুখ এখন। এ বড় সংকট কাল!  বড় বিপন্ন এ মানবসভ্যতা। এ বছর তোমার নামে হয়তো বাঁধা হবে না কোনো মঞ্চ। সকালের প্রভাতফেরীতে গেয়ে উঠবেনা কচিকাঁচাদের সম্মিলিত স্বর " আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো দহন দানে।" সকাল সকাল পবিত্র স্নান সেরে লালপেড়ে গরদের শাড়িখানি পরে খোঁপায় রজনীগন্ধার মালা জড়িয়ে একবুক নিবেদন নিয়ে গানের দিদিমনি মঞ্চে উঠবেন না। মাইকে শোনা যাবেনা "জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।"  স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সুললিত মার্জিত স্বর ভেসে আসবেনা "আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুণী উঠলো রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠলো আলো পুবে পশ্চিমে!"  এ কবিতা শুনতে শুনতে সত্যকার আলো হয়ে জ্বলে উঠতে দেখবেনা স্যরের চোখ মুখ! স্কুলের ছেলেমেয়েদের নাচের মুদ্রায় আজ আর ফুটে উঠবেনা "আমার মুক্তি আলোয় আলোয়" কিংবা চন্ডালিকার সেই অতুল্য দৃশ্য "যেই মানব আমি, সেই মানব তুমি ...।"শুধু সোশাল মিডিয়ায় গ্রুপে গ্রুপে চলবে তোমার এডিট করা ছবির প্রদর্শন। তোমার গানে কবিতায় ছয়লাপ হবে সমাজমাধ্যমের দেয়াল। শুধু তোমার অক্ষর হতে ক্ষরিত আলোয় ভরে উঠবে কিনা কোনো বুকের পাঁজর সেটাই জানা হবেনা । তবু বাইশে শ্রাবণ আসবে। আসবে নিজস্ব মহিমায়। 

সংসারের তেল নুন লকড়িতে আকন্ঠ ডুবে থাকা মেয়েটি এ বছর পাঁচটা সংসারী চোখের অগোচরেই গীতবিতানের অক্ষরনদীতে সেরে নেবে পবিত্র স্নান।পঞ্চপ্রদীপ সাজাবে,পুবের দেয়াল হতে নামিয়ে আনবে তোমার বাঁধানো ছবির ফ্রেম। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে যত্নে মুছে নেবে অদৃশ্য ধুলোর কণা। যত্নে চন্দন আঁকবে তোমার দ্যুতিময় কপালে। ধূপদানে সাজাবে চন্দনগন্ধা ধূপ। কাঠমালতি আর গন্ধরাজে নৈবেদ্যের থালা। আর আপনমনে মন খুলে গাইবে "...যা কিছু জীর্ণ আমার দীর্ণ আমার আপন হারা, তাহারই স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা ....শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ..." হাঁটুজল নদীটির বাঁকে তোমার সাথে যার অলৌকিক সাক্ষাৎ ঘটেছিলো!

আজীবন বাউন্ডুলে মেয়ে। গাছেদের মজলিশে যার নিত্য আনাগোনা, যে জানে হাঁটুজল মুজনাই কার ছোঁয়া পেয়ে অমন ভরা যুবতী হয়ে ওঠে। শ্রাবণের সাথে তার গোপন সম্পর্কের নাড়িনক্ষত্র। জানে লেবুফুলের সাথে জোনাকিদের নিভৃত অভিসারের হালহকিকত! আকাশের মুড সুইংএর খবর যার নখদর্পণে সে কি সইতে পারে "রাঁধার পরে খাওয়া, আর খাওয়ার পরে রাঁধা?" দু পায়ে তার হাজার বাঁধন, জীবনজুড়ে সহস্র তার বাধা। গোপন রাতে পাঁজর পোড়ে। ফোঁটা ফোঁটা রক্তক্ষরণ হয়।  পিঠ ঠেকে যায় চারদেয়ালে। মুখ থুবড়ে পড়ে।আর প্রতিবার প্রার্থনায় নতজানু হয় তোমার অক্ষরের কাছে "....ওহে পবিত্র ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো।" তুমি আলো চোখে এসে দাঁড়াও নিভৃত উঠোন খানিতে।খাদের কিনার হতে  বুকে ভর করে উঠে দাঁড়ায় মেয়ে তোমাকেই আঁকড়ে! 

কতোবার ভেঙেছে সে  নিভৃতে একাকী। মন মরে গেলে কতোটা জরুরী বলো শরীরী বেঁচে থাকা? যদি ক্ষয়ে যায় শব্দের পরমায়ু?যদি নিভে আসে অক্ষরের আলো, ঠোঁটের কোলাজে আঁকা সলাজ হাসিটি বলো হতে পারে কতোটা জোরালো? ভেতরঘরের অবাধ্য বারিষনামা। ভাঙাচোরা মন আর তালিতাপ্পির জীবনে  সিঁধকাঠি নিয়ে এগিয়ে আসে কেউ কেউ। নিঃস্ব করে রেখে যায় বন্ধুবেশী হাত। দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হয়েছে প্রহর, অযাচিত অবাঞ্ছিত রাত।দীপ নেভা সেই রাতে সমস্ত কালোর ভিতর ফুটে ওঠে তোমার অনশ্বর দুটি চোখ।একলামেয়ে এভাবেই পূর্ণ হয়ে ওঠে  "সকালবেলায় চেয়ে দেখি, দাঁড়িয়ে আছো তুমি এ কী! ঘরভরা মোর শূন্যতারই বুকের 'পরে"

©কাজী রুনা লায়লা খানম

Read More »

◆ শ্রীশুভ্র / আবার বাইশে শ্রাবণ!

sobdermichil | আগস্ট ০৭, ২০২০ | |

◆ শ্রীশুভ্র / আবার বাইশে শ্রাবণ!

বাইশে শ্রাবণ? তবে তো আজ একটু স্মরণ করতেই হয় মানুষটিকে। মৃত্যুদিন বলে কথা। ধুপধূনো রজনীগন্ধার মালা মৃতের ফটোতে। আবৃত্তি গান। লাইভ নৃত্য। আর রবীন্দ্ররচনা। সেই স্কুল জীবনের পরীক্ষার খাতার মতো। রবীন্দ্রনাথ কে ছিলেন। আর কি করেছিলেন। সেই রচনার ধারাই চর্বিতচর্বন সারা বছর বিশেষ দুটি দিন। ক্যালেণ্ডারের তারিখ মিলিয়ে। পঁচিশে বৈশাখ হলে জন্মদিনের সুরে। আর বাইশে শ্রাবণ হলে শ্রাদ্ধবাসরের সুরে। হ্যাঁ সুরটা ঠিক মতো ধরে রাখা চাই। নাহলে তাল কেটে যাবে। ভদ্রলোক দুটি খুব দামী কথা বলে গিয়েছিলেন। আরাধ্য দেবতার পুজোর ছলেই তাকে ভুলে থাকার কথা। আর গঙ্গাজলেই গঙ্গাপূজা করার কথা। জানি না, তিনি কোনদিন আঁচ করতে পেরেছিলেন কিনা, তাঁর এই আপ্তবাক্য বাঙালি তাঁকেই একদিন ফিরিয়ে দেবে। কি আশ্চর্য্য না? একটি মানুষ, জীবন ও ইতিহাসের গভীর অনুধ্যান থেকে তাঁর স্বজাতির দুইটি মুদ্রাদোষের দিকে বিশেষভাবে আলোকপাত করলেন। অথচ সেই স্বজাতি, আপন চরিত্রবলে সেই মুদ্রাদোষকেই আজ রবীন্দ্রসংস্কৃতিতে পরিণত করে ছেড়েছে। 

সত্যই আমাদের জবাব নাই কোন। আমাদের রবিপুজোর আড়ালে আমরা কেমন সর্বাত্মক ভাবে মানুষটিকেই সরিয়ে দিয়েছি। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের দিনযাপনের অভিমুখ থেকে। না। সরিয়েই বা আর দিলাম কই। কারণ গ্রহণ করলে তো তবে সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ। আমরা কি ভদ্রলোককে আমাদের জীবন সংস্কৃতিতে গ্রহণ করেছিলাম কোনদিন? আমাদের বছরের এই দুইটি দিনে রবিপুজোর আড়ালে আমরা কেমন সুন্দর করে আমাদের কৃতকর্মসহ সমগ্র মানুষটিকেই আড়াল করে রেখে দিয়েছি। আরও সত্য করে বলি বরং? সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছি আমরা রবীন্দ্রনাথকে। আর সেই সাথে বছর ভর রবীন্দ্রসঙ্গীতে রবীন্দ্রকবিতায় রবীন্দ্রনৃত্যে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোয় আমাদের দায়িত্ব সেরেছি। এ যেন অনেকটা গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদানের মতো। 

আমাদের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, ও রাষ্ট্রিক জীবন। সর্বত্র আমরা এই মানুষটিকে বিশেষ ভাবে অগ্রাহ্য করতে করতে এতটাই অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি যে, সেই সত্য বাস্তবতাটুকুও আর অনুভব করতে পারি না। মনে আছে ভদ্রলোক একদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাঙালিকে বাঁধতে পথে নেমে ছিলেন, রাখী হাতে? সেই বাঙালিই একদিন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ব্রিটিশের কাছে বাংলা ভাগের দাবি জানিয়েছিল? এবং সেই দাবি পুরণের জন্য ১৯৪৬শে নিজেদের মাথা নিজেরাই কাটতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পরস্পরের উপরে। রবিঠাকুর নামক সেই মানুষটি মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছরের ভিতরেই বাঙালি রাখী ফেলে রক্তাক্ত করেছিল নিজের হাত। কবি যে হাতে রাখী ধরিয়ে দিয়েছিলেন ১৯০৫ সালে। মাত্র চার দশক পরেই সেই হাত রক্তের পিপাসায় সাম্প্রদায়িক হিংসায় মেতে উঠেছিল। কত শিশু অনাথ হয়েছিল? কত নারী পথের ভিক্ষারী হয়ে গিয়েছিল। কত মা তার সন্তান হারিয়েছিল? মনে পড়ে আজ কোন বাঙালির? আজ এই যে বাইশে শ্রাবণে যার ফটোয় মালা দিচ্ছি। সেই মানুষটিকে ১৯৪৬-এ মনে পড়ে নি তো আমাদের।

আজ ২০২০ তে এসেও লকডাউনেও তেলেনিপাড়ায় দাঙ্গা লাগে! এইসময়ের রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডার হাঁড়িকাঠে মাথা গলিয়েই তো আজ আমরা আরও বেশি করে হিন্দু হচ্ছি। মুসলিম হচ্ছি। এবং ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে সেই সাম্প্রদায়িক বিষ ঝেড়ে দিয়ে আসছি ভোটের বোতামেই। আমরাই, যাদের একজন রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন। ভারতের অন্যান্য জাতিসমূহের কিন্তু এমন একজন রবীন্দ্রনাথ নাই। আমাদের ছিল। আমরা রাখি নি তাকে। তাঁর সোনার বাংলাকে কেমন মাখনের ভিতরে দিয়ে ছুরি চালানোর মতোন কেটে দুই ভাগ করে দিয়েই না তবে আমাদের রবিপুজো? আমাদের পঁচিশে বৈশাখ। আমাদের বাইশে শ্রাবণ।

এই সেই ভদ্রলোক। যিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশের পাঠশালায় পড়লে স্বদেশী হয়ে ওঠা যাবে না। যাবে না সমগ্র জাতিকে শিক্ষার আলোর বৃত্তে টেনে নিয়ে আসা। তাই এই মানুষটিই মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সাথে তুলনা করে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রচলন করতেই গড়ে তুলেছিলেন শান্তিনিকেতন। আর আজ আমরা? পেটে বাচ্চা আসতেই ইংরেজি স্কুলের ফর্ম তুলতে লাইনের দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করে ফেলছি। না তাতে আমাদের কারুরই মাথা কাটা যায় না। আমরা তো আর পঁচিশে বৈশাখের মানুষটির শিক্ষায় শিক্ষিত নই। আমরা সেই ব্রিটিশের পত্তন করা মুখস্তবিদ তৈরীর কারখানায় গড়ে ওঠা এক একটি মহমূার্খ। তাই আমরাই আজ তাঁর মাতৃদুগ্ধের ফরমুলা নিয়ে ব্যঙ্গ করে থাকি। যে মানুষটি জাতির সার্বিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে বিশেষ করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, আমারা সেই মানুষটির সেই পথকেই অবরুদ্ধ করতে শিক্ষাকে দিনে দিনে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে এসেছি। কারণ আমরা জানি, সকলেই সমান শিক্ষিত হয়ে গেলে, তাদের আর শোষণ করা যাবে না প্রয়োজন মতো। প্রয়োজন মতো আর তাদেরকে সমাজের নীচুতলায় বেঁধে রেখে দাবিয়ে রাখা যাবে না। যাবে না, সমাজে আমাদের উচ্চাসনের বেদীকে টিকিয়ে রাখা। তাই শিক্ষাকে দিনে দিনে এমন ভাবেই মহার্ঘ্য করে দাও, যাতে সমাজটা অন্তত দুইটি শ্রেণীতে বিভাজিত থাকে। শিক্ষিত আর অশিক্ষিততে। 

হ্যাঁ এটাই আমাদের শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ নামক সেই বিরল প্রজাতির মানুষটির থেকে হাজার যোজন দূরবর্তী থাকার শিক্ষা। তিনি বাঙালিকে অসাম্প্রদায়িক করে একজাতি এক প্রাণ করতে চেয়েছিলেন। কার্জনের বঙ্গবিভাগ প্রতিরোধ করতে পথে নেমে ছিলেন ১৯০৫ সালে। লিখেছিলেন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন এক হউক এক হউক, এক হউক হে ভগবান। না ভগবান নিশ্চয় সেদিন কবির অপরিণামদর্শীতায় মুচকি হেসে ছিলেন। তাই আমরাই আজ খণ্ড বিখণ্ড থেকে গর্ববোধ করি। কেউ এক হওয়ার কথা বললেই তাকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দিই। পঁচিশে বৈশাখই হোক আর বাইশে শ্রাবণ। মানুষটি চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের মাথা কাটা যায় না। সমগ্র জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার যে কর্মযজ্ঞে তিনি আমাদের আহ্বান করেছিলেন। সেই কর্মযজ্ঞকে দক্ষযজ্ঞের মতো পণ্ড করতেই আমাদের ‌যাবতীয় সাধনা। তারপরেও আমরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে পুজোর আয়োজন করি। মাতৃভাষাকে সর্বতো ভাবে কোনঠাসা করে দিয়ে নিজেদের জীবন থেকে প্রায় ছেঁটে ফেলে দিয়েও আমরা রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ করি। না তাতেও আমাদের জীহ্বা খসে পড়ে না। 

এই মানুষটিই না আমাদের মূল অসুখটিকে চিহ্নিত করে বলে ছিলেন, আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া। আর কি করলাম আমরা? এক একটি শিবিরে মাথা মুড়িয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের লাভ লোকসানের হিসাব কষতে কষতেই বৃদ্ধ হয়ে গেলেম। শুধু তাই নয়। নিজের অসুখটিকে পরবর্তী প্রজন্মের ভিতরে আরও সর্বাত্মক করে ইনজেক্ট করে দিয়ে গেলাম। কচি সন্তানকে অভিভাবকই শিখিয়ে দেয় সহপাঠীকে ঈর্ষা করার মন্ত্র। সেই সন্তান কখনো বুকের ভিতর বিশ্বলোকের সাড়া পাবে? ‌

না আমরা তাঁর পথে হাঁটার বান্দাই নই। আর হাঁটবোই বা কেন? আমাদের রক্তে না দুর্নীতির ভাইরাস। আমরা ঘুষ নিয়ে ঘরণীর ঘাড়ে সোনার হার পড়িয়ে দেবো। তাতে আপন স্ত্রীর চোখেও আমাদের ঘাড় হেঁট হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নাই। আমাদের শিক্ষার বনেদ এতটাই দৃঢ়। আমরা দুধে জল দিয়ে বিক্রী করবো। সেই দুধেই আমাদের জাতি অপুষ্টিতে বেড়ে উঠবে। তাতে আমাদের কি? আমাদের ব্যক্তিস্বার্থে, এমন কোন দুর্নীতি নাই আমরা যার সাহায্য নেবো না। সেই আমরাই দুই বিঘা জমি আবৃত্তি করে আসর মাতিয়ে দেবো। কিংবা দেবতার গ্রাস আবৃত্তি করেই রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই কুসংস্কার ছড়াতে থাকবো বেশি করে। অভিভাবক হয়ে পণের দাবিতে অটল থাকব। ছেলে বৌ পোড়ালে। ছেলেকে আড়াল করতে সমস্ত সোর্স কাজে লাগাবো। সেই আমরাই আবার রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে সমাজচেতনা নিয়ে থিসিস লিখবো। কি মঞ্চ কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেবো। পরীক্ষা পাশের সিলেবাসে গোরা থাকলে, মুখস্ত করা নোট লিখে গোরার ভারতবর্ষ আবিষ্কারের তত্ব লিখে নম্বরের তত্বতালাশ করবো। আবার সেই আমরাই পরিবর্তীত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অপশক্তিকে ভোট দিতে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবো। 

হ্যাঁ তাই বলে আমাদের রবীন্দ্র অনুরাগে কোন খাদ নাই। ক্যালেণ্ডারের তারিখ মিলিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যতরকম ভাবে নাচা যায়, সব রকম ভাবেই নাচবো। এবং নাচাবো। পঁচিশে বৈশাখ থেকে বাইশে শ্রাবণ। বছর ভর। বছরের পর বছর। আমরা যারা বাঙালি। কাঁটাতারের দুই পারে। মাঝখানের নোম্যন্স ল্যাণ্ডে বাংলার নিয়তি হয়তো রবীন্দ্রনাথকেই বুকে নিয়ে অপেক্ষা করে আবারো এক রবীন্দ্রনাথের জন্য। একজন রবীন্দ্রনাথ দিয়ে তো আর বাঙালির রক্ত শোধন করা যায় নি। 


২২শে শ্রাবণ’ ১৪২৭ 

© শ্রীশুভ্র

Read More »

◆ সুমনা সাহা / শ্রাবণ রাতের এক নিভৃত আলাপে রবি-ঠাকুরের সঙ্গে

sobdermichil | আগস্ট ০৭, ২০২০ | |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২২শে শ্রাবণ
আবার এসেছে। শ্রাবণ-ধারাপাতের কাল। দুটো দিন গেছে গুমোট গরমে, প্যাঁচপ্যাঁচে ঘামে। সব কাজ সেরে, রাত্রি ঘন হলে পরে বসেছি, ‘পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন’। এমন সময় সে এসেছে...রিমঝিম ধারা বরিষণ! আহা! মন আমার গান গেয়ে উঠল, ‘আজি বরিষণ মুখরিত, শ্রাবণ রা...তি/স্মৃতি-বেদনার মালা একলা গাঁথি’ ...গুনগুনিয়ে উঠতেই জলের ছাঁটে জানালার পাশে বই-এর টেবিল গেল ভিজে। ভালো করে বৃষ্টির দাপাদাপি দেখব বলে জানলা বন্ধ করে ব্যালকনিতে গেলাম। এমন শ্রাবণ দিনে জানি না কেন, রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়তে ইচ্ছা করে। ঐ ‘ঠাকুর’-প্রেম তো আজকের নয়! বর্ষা আর রবি-ঠাকুর মিলেমিশে মনের ঘরে সেই কোন্ ছোটবেলা থেকে! খুব যখন বৃষ্টি পড়ে, বাতাসে জোর জলের ছাঁট, জানলার কাঁচে বিদ্যুতের নীলচে শিখার ঝলকানি...তখন কেমন শুদ্ধ ভাষা জেগে ওঠে মনে। ‘সমানে বৃষ্টি পড়ছে, মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে’—এইসব কথার মধ্যে সেই আমেজটাই নেই। ‘অবিশ্রাম বারিধারা ঝরিতেছে, মেঘের মন্দ্রধ্বনি শোনা যাইতেছে, গগনের বুক চিরিয়া সৌদামিনী ঝলসিয়া উঠিতেছে’—শুনলেই মন স্থির হয়ে আসে। 

ব্যালকনিতে একলা দাঁড়িয়ে আছি। চতুর্দিকে অন্ধকার। একে লকডাউনের বাজার। তায় বৃষ্টির ঠাণ্ডা আমেজ। তায় রাত্রি বারোটা। ঘরে ঘরে ছাপোষা মানুষ করোনার আতংককে ‘বহুযুগের ওপারে’ দাঁড় করিয়ে ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ বিহার করছে। ঝলসে ওঠা বিদ্যুতের শিখায় চমকে চেয়ে দেখি, আবছা অন্ধকারে পাশের ইজিচেয়ারে দীর্ঘদেহী মানুষটি, ও কে? তাঁর আবক্ষ ঋষির মত শুভ্র শ্মশ্রু, এ যে আমার জন্মজন্মান্তরের চেনা মানুষ! ঠাকুর, আপনি! 

স্মিত হাসি ওই মুখে, ‘গোল করিস নে। আয়, বোস।’
কি ভাগ্যি! কি ভাগ্যি! আমার রবি-ঠাকুর আজ আমার এত কাছে! অস্ফুটে বলি, 

‘তবে আপনার পায়ের কাছটিতে বসি!’ 
তিনি নিশ্চুপে বৃষ্টি দেখছেন। আমি দেখছি তাঁকে। নীরবতা ভঙ্গ করে বলি, ‘এখনই ভাবছিলাম, গল্পগুচ্ছ নিয়ে বসব।’

‘তাই বুঝি? তা গল্পগুচ্ছের কোন্ গল্পটা পড়া হবে, শুনি?’
মহানন্দে বলি, ‘আপনার কাছে প্রকৃতিকে অনুভব করতে শিখেছি। বৃষ্টি ঝরলেই আপনার গানই মনে আসে। কেবল বৃষ্টির অনুষঙ্গ আপনার গল্পেও তো কতবার এসেছে!’ 

‘কোন্ কোনটা একটু মনে করিয়ে দে দিকিন্।’
ছোটবেলাকার বারম্বার পঠিত ‘বলাই’-এর বৃষ্টি আসার একটি বর্ণনা কবিকে মনে করাই—

“পুবদিকের আকাশে কালো মেঘ স্তরে স্তরে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ায়, ওর সমস্ত মনটাতে ভিজে হাওয়া যেন শ্রাবণ-অরণ্যের গন্ধ নিয়ে ঘনিয়ে ওঠে; ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ওর সমস্ত গা যেন শুনতে পায় সেই বৃষ্টির শব্দ”— সমস্ত শরীর দিয়ে, সমস্ত মন দিয়ে এমন ভাবে বৃষ্টি হয়ে যাওয়া শব্দে-স্পর্শে-গন্ধে...আর কোথায় পাই! 

কবির চোখে বলাই-এর দৃষ্টি। বললেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই আমি বর্ষা বড় ভালোবাসি। একসময় লিখেছিলুম, ছেলেবেলার কথা—“বাল্যকালের দিকে যখন তাকাইয়া দেখি তখন সকলের চেয়ে স্পষ্ট করিয়া মনে পড়ে তখনকার বর্ষার দিনগুলি। ... আরও মনে পড়ে শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘনবৃষ্টির ঝম্ ঝম্ শব্দ মনের ভিতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে; একটু সেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন এই বৃষ্টির বিরাম না হয় এবং বাহিরে গিয়া যেন দেখিতে পাই, আমাদের গলিতে জল দাঁড়াইয়াছে এবং পুকুরের ঘাটের একটি ধাপও আর জাগিয়া নাই।”

কবির চোখে হাসি দেখে উৎসাহে বলি, ‘আরও বলি কবি। কি অপরূপ লিখেছিলেন আপনি ‘অতিথি’-র সেই বর্ষণমুখর রাত্রির বর্ণনা—“দেখিতে দেখিতে পূর্বদিগন্ত হইতে ঘনমেঘরাশি প্রকাণ্ড কালো পাল তুলিয়া দিয়া আকাশের মাঝখানে উঠিয়া পড়িল, চাঁদ আচ্ছন্ন হইল—পুবে-বাতাস বেগে বহিতে লাগিল, মেঘের পশ্চাতে মেঘ ছুটিয়া চলিল, নদীর জল খল খল হাস্যে স্ফীত হইয়া উঠিতে লাগিল— নদীতীরবর্তী আন্দোলিত বনশ্রেণীর মধ্যে অন্ধকার পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিল, ভেক ডাকিতে আরম্ভ করিল, ঝিল্লিধ্বনি যেন করাত দিয়া অন্ধকারকে চিরিতে লাগিল। সম্মুখে আজ যেন সমস্ত জগতের রথযাত্রা— চাকা ঘুরিতেছে, ধ্বজা উড়িতেছে, পৃথিবী কাঁপিতেছে; মেঘ উড়িয়াছে, বাতাস ছুটিয়াছে, নদী বহিয়াছে, নৌকা চলিয়াছে, গান উঠিয়াছে; দেখিতে দেখিতে গুরু গুরু শব্দে মেঘ ডাকিয়া উঠিল, বিদ্যুৎ আকাশকে কাটিয়া কাটিয়া ঝলসিয়া উঠিল, সুদুর অন্ধকার হইতে একটা মুষলধারাবর্ষী বৃষ্টির গন্ধ আসিতে লাগিল। কেবল নদীর এক তীরে এক পার্শ্বে কাঁঠালিয়া গ্রাম আপন কুটিরদ্বার বন্ধ করিয়া দীপ নিবাইয়া দিয়া নিঃশব্দে ঘুমাইতে লাগিল”—আলোর ঝলকানিতে, বাতাসের ও নদীর বেগে, ভেক ও ঝিঁঝিঁর ডাকে এক প্রবল আয়োজনে আসছে ঘনঘোর বর্ষা আর এই তুমুল বর্ষণ-মুখর রাত্রির সম্পূর্ণ বিপরীতে যেন নির্বাণ তুল্য শান্তিতে একটি সুপ্তিমগ্ন গ্রামের অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা...প্রবল শব্দ ও আলোর পাশে, অখণ্ড নীরবতা ও অন্ধকার! যেন সাদা কালো ছবি! এমন ছবি গোটা বিশ্বের সাহিত্যেই বা কটা আছে?’

কবি চুপ করে রইলেন। অনেকক্ষণ আমাদের মাঝে কেবল বৃষ্টি পড়ার শব্দ। তারপর আবছা স্বরে বললেন, ‘তুমি তো আমায় এখন ভুলেই গিয়েচ!’ 

ভুলিনি, কবি, ভুলিনি, বাঙালী যেদিন আপনাকে ভুলবে, সেদিন হবে তার সর্বনাশের। আপনার ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের কথা বলি, অমন লেখা আর কি হবে? প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এমন নিবিড় গভীর মিলন মাখানো... যেমন দেহচেতনায় সম্পৃক্ত হয়ে থাকে দেহ-স্বতন্ত্র আত্মা! যখন গণ্ডগ্রামের পোস্টমাস্টার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বালিকা রতনের কুসুমের মতো নিষ্পাপ মনটি নিজের অজান্তে ব্যথিত করে চলে যাচ্ছেন, সে বর্ণনা ব্যাখ্যা করার ভাষা নেই—“যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাড়িয়া দিল, বর্ষাবিস্ফারিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মতো চারি দিকে ছলছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন-- একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, “ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি”- কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে- এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।” 

জগতের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার ছবি দেখেও প্রতিকার করার বিষম কষ্ট-স্বীকারের ভয়ে এহেন দার্শনিক তত্ত্বের উদয় শিক্ষিত মানুষ মাত্রেই বিলক্ষণ জানেন। বর্ষা বিস্ফারিত নদী ও ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির উপমায় যেভাবে আপনি রতনের বহুকষ্টে সামলে রাখা উদ্গত অশ্রুর বেগ বোঝালেন, তার তুলনা নেই। 

কবি হাসলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা কি এসব পড়ে? পোস্টমাস্টারের ‘রতন’-কে বিখ্যাত করলেন সত্যজিৎ রায়। সেও বা এখন কে দেখে? ‘হটস্টার’ আর ‘প্রাইম ভিডিও’-র ওয়েবসিরিজের রমরমা এখন। যা যায়, তা যায়। স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী অনুরাগীরা কামারহাটিতে গিয়ে গোপালের মা-কে দর্শন করে ফিরে আসার পর তিনি অস্ফুটে তাঁদের বলেছিলেন, “আহা! আজ তোমরা যা দেখে এলে, এই হল প্রাচীন ভারত! উপবাস, ঈশ্বর-বিরহে নীরব অশ্রুপাত...এসব দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর ফিরে আসবে না!”  

কবির কণ্ঠে অভিমান স্পষ্ট। বললাম, ‘আপনি আমাদের রবি ঠাকুর। এই ‘ঠাকুর’ শুধু পদবী নয়। এ এক অন্যরকম ঠাকুর। এই ঠাকুরের মধ্যে দিয়ে আপামর বাঙালী বাংলা মায়ের মুখ চিনতে শেখে। সবে আধো আধো বুলি ফুটতে আরম্ভ করেছে সেই কচি বয়স থেকেই সহজ পাঠের হাত ধরে, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’, ‘ছোটখোকা বলে অ আ শেখেনি সে কথা কওয়া’ দিয়ে শুরু হল আমার স্কুলবেলাকার ‘ঠাকুর’ দেখা। তারপর ছোট্ট দুই পনিটেল দুলিয়ে যখন স্কুলে যাতায়াত আরম্ভ হল, পাড়ার ফাংশনে ‘আমি যদি দুষ্টুমি করে চাঁপার গাছে চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি’, কিম্বা ‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে’ আবৃত্তি মুখস্থ করতে করতে আপনার হাত ধরে কল্পনার রঙিন পাখা মেলে কতদূর পথ চললাম। আরও বড় হলাম। বয়ঃসন্ধির কিশোরী বেলা এল, মেঘ করলে তখন অজানা মনখারাপ, তখনও আপনার গানের হাত ধরেই ছিলাম ঠাকুর—‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’।
 
তারপর? তারপর তো তোমার জীবনে অন্য ‘ঠাকুর’ এলেন!
লক্ষ্য করছি, ঠাকুর আমায় ‘তুমি’ সম্বোধন করছেন! সত্য স্বীকার করেই বলি, ‘হ্যাঁ, একটা সময় আরেক ‘ঠাকুর’ এলেন মন জুড়ে। তিনি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। অনেকগুলো শব্দ চিনতে শিখলাম—‘নিত্য-অনিত্য-বিবেক-বিচার’। জীবন নামক ফলটির ওপরের খোসা ছাড়িয়ে ভিতরের শাঁসের দিকে নজর দিতে চাই এখন। বিবেকানন্দ পড়েছি, তাঁর পত্রাবলীতে রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিষয়ক মধুর রসের কীর্তন, প্রেম পর্যায়ের শৃঙ্গার ভাব উদ্বোধক রবীন্দ্রসঙ্গীত দেশ ও জাতিকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে, এমন মন্তব্য পড়েছি এবং ওপরের অর্থ না ধরে কথাগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝার চেষ্টায়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ‘মাতৃভাব শুদ্ধভাব’ প্রভৃতি বাণীর গূঢ়ার্থের আলোয় স্বামীজীর কথা থেকে বিষয়ের গুরুত্ব ও সত্যতা হৃদয়ঙ্গম করেছি। যুগান্তব্যাপী পরাধীনতায় জাতির মেরুদণ্ডহীনতা সারিয়ে তুলতে হলে সাধারণ্যে কিছু ভাব অপ্রচারিত থাকাই প্রয়োজন। কিন্তু এসমস্তই জাগ্রত মনের যুক্তির উপস্থাপনা। ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের মাঝে যেমন দিন-রাত, রাশিয়া-রাসবিহারী মোড় সব আশ্চর্য জাদুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, স্বপ্নের সে গুণ বাদল দিনের সজল হাওয়ায় আছে নিশ্চয় খানিকটা। তাই প্রাক্তন প্রেমিকের মত তখন ‘রবি-ঠাকুর’ মন জুড়ে আসেন... ‘ঘন শ্রাবন ধারা যেমন বাঁধন হারা, বাদল বাতাস যেমন ডাকাত আকাশ লুটে ফেরে’... 

কবির কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস। ধীরে ধীরে স্বগতোক্তির মত বললেন, ‘নরেন্দ্র তো পরবর্তী কালের আমার মনের ভাঙচুরগুলো দেখলে না! সে যে স্বল্পায়ু হয়ে বেঁচে গিয়েছে। আর আমার দীর্ঘ জীবনে একের পর এক কেবল আঘাত। সে আঘাত সয়েও আমার কলম রক্ত নয়, ঝরিয়েছে কুসুম।’ 

বললাম, ‘আমি জানি সে কথা কবি। কিন্তু সে বিতর্ক আজ থাক।’  

কবি বলে চললেন, ‘জানো, তোমায় বলি, পরমহংস মহাশয়ের জন্ম শতবার্ষিকীতে তাঁরা আমায় বলতে এসেছিলেন। সবশুদ্ধ ধর্মসম্মেলনের যে ১৪ টি অধিবেশন হয়, তার মধ্যে অন্তত একটিতে সভাপতিত্ব করতে বলেছিল।  প্রথমে রাজী হইনি। শরীর আমার ভালো ছিল না। বললুম, দেখুন স্বামীজী, আমি যখনই কোন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছি, তা সে যেখানেই হোক, দেখেছি কেবল বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোল। এমনকি পরস্পর মারামারি ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটতে দেখেছি। আপনি কি চান আপনাদের অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আমি আরেকবার এই ধরনের ঘটনার মধ্যে গিয়ে পড়ি?’ তখন সেই স্বামীজী বললেন, ‘আমি আপনাকে কথা দিতে পারি যে আমাদের অনুষ্ঠানে ওইরকম কিছু হবে না।’ আমি জানতে চাইলুম, সভা কোথায় হবে। তাঁরা বললেন, কলকাতার চিৎপুর রোডের টাউন হলে। আমার বয়স তখন ছিয়াত্তর বছর। আমি অসুস্থ। আমার পক্ষে টাউন হলের সিঁড়ি ভেঙে ওঠা সম্ভবই ছিল না। অগত্যা রাজী হওয়া গেল না। তিনিও দমবার পাত্র নন। বললেন, তবে তাঁরা কলেজ স্কোয়ারের পুবদিকে, ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠান করবেন, সেক্ষেত্রে সিঁড়ি ভাঙার প্রয়োজন হবে না।  

শেষপর্যন্ত রাজী করিয়েই ছাড়ল তাঁরা, বললুম, ‘যেতে পারি, একটা শর্তে। আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আমার বক্তব্য পাঠ করেই আমি সভা ছেড়ে চলে আসব। আমি চলে আসবার পর সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন কে?’ 

তাঁরা তখন ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকার (‘প্রবাসী’-পত্রিকার ও) প্রখ্যাত সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে রাজী করালেন, আমার অনুপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করার জন্য। তা আমারও মনঃপূত হল। 

পরে আমি তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলুম, ‘ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউট হলে বড়জোর ১৫০০-১৬০০ শ্রোতা বসতে পারে। কয়েক হাজার লোক হয়তো বাইরে থেকে যাবে আর ভিতরে ঢোকবার জন্য হট্টগোল করবে। নানা গণ্ডগোল পাকিয়ে আপনাদের সভা পণ্ড করবার চেষ্টা করবে। তার কি করবেন?’ 

তাঁরা তখন বললেন, ‘দেখবেন এমন অবাঞ্ছিত কিছু হবে না। হলের বাইরে, কলেজ স্কোয়ার পার্কে যে পাম গাছগুলি আচে, তাতে আমরা অনেকগুলো লাউডস্পিকার লাগিয়ে দিয়েছি। ওই পার্কে বিশ হাজার লোক জড় হলেও তারা ধর্মসম্মেলনের সমস্ত বক্তৃতাই ভালভাবে শুনতে পাবে।’ 

এরপর আমার আর আপত্তির কিছু থাকে না। ৩ মার্চ নির্দিষ্ট সময়ে সভা আরম্ভ হওয়ার আগে আমাকে নিয়ে এঁরা যখন মঞ্চের দিকে এগুচ্ছে, দুজন দর্শক তখন মারপিট শুরু করেছে। একজন চেয়ার তুলেছে অপরজনকে মারতে। ওই স্বামীজী দেখলুম বেশ তৎপর! তিনি ছুটে গিয়ে দুজনকে থামালেন এবং দুজনকে বেশ দূরে দূরে বসিয়ে দিয়ে এলেন। আমি যখন হলে ঢুকি, তখন হল সম্পূর্ণ শান্ত ও নিস্তব্ধ। অন্যান্য বক্তা ও সংগঠকরা মঞ্চের উপর চেয়ারে বসলেন। কেবল আমার জন্য তাঁরা একটি আরামকেদারার ব্যবস্থা করেছিলেন।’
এই পর্যন্ত বলে ঠাকুর হাসলেন। তিনি একটু হাঁপিয়ে গিয়েছেন। আমার কৌতূহল বাড়ছিল। বললাম, ‘তারপর কি হল কবি?’

কবি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘সব বিখ্যাত গুণী মানুষ এসেছিলেন। এই যেমন ধরো, সরোজিনী নাইডু, ব্রিটিশ রাজবংশের বিখ্যাত লেখক স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ড প্রমুখ। ওই স্বামীজী মাঝেমধ্যেই এসে আমার শরীরের খোঁজ নিচ্ছিলেন। আমি কোন অসুবিধা বোধ করছি কি না, সেদিকে তাঁদের খুব খেয়াল! চমৎকার ব্যবস্থা করেছিলেন মিশনের সাধুরা! আমি চেয়ারে বসেই লিখিত ভাষণখানি পাঠ করলুম। পড়তে আধা ঘণ্টার মত সময় লেগেছিল। কিন্তু প্রায় ১৫০০ শ্রোতা নিবিষ্ট মনে বসে শুনলেন সেই বক্তৃতা। কি বলব তোমায়, হলে একটি সূঁচ পড়বারও শব্দ হয়নি। আমার শর্ত ছিল বক্তৃতার পর চলে যাওয়ার। কিন্তু বিশ্বাস কর, সমস্ত অনুষ্ঠানটি এমন ছিমছাম ও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছিল যে আমার বড় ভাল লাগছিল! আমি আগাগোড়াই বসে ছিলুম। স্বামীজীরা বারম্বার এসে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, আমার কোন কষ্ট হচ্ছে কি না অতক্ষণ বসে থাকতে, কিন্তু আমি তাঁদের আস্বস্ত করলুম। রামানন্দ-র আর সেদিন সভাপতির আসনে বসা হল না। তাঁকে বুঝি অন্য একদিন সভাপতি করেছিল। পরদিনও, অর্থাৎ ৪ মার্চও তাঁরা আমার সংবাদ নিতে এসেছিলেন, আগের দিনের অতখানি ধকলের পর আমি কেমন আছি, তা জানবার জন্য। আমি তাঁদের বলেছিলুম, ‘স্বামীজী আমি ভালই আছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এত দর্শকের উপস্থিতি সত্বেও এরকম শান্তিপূর্ণ সভার অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম। রামকৃষ্ণ মিশনের সংগঠন ক্ষমতায় আমি সত্যিই অভিভূত। আপনারা সত্যই একটি বড় কাজ করেছেন। যদিও তাঁরা বিশ্বাস করেন শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের কৃপাতেই সব সম্ভব হয়েছে।’

আমি আপ্লুত হয়ে বলি, ‘সেদিনকার ভাষণে কি বলেছিলেন, মনে আছে?’
কবি বললেন, ‘তা আজও স্পষ্ট মনে আছে বৈকি! বলেছিলুম,   

“Friends, 
When I was asked to address this distinguished gathering, I was naturally reluctant, for I do not know if I can be called religious in the current sense of the term, not claiming as my possession any particular idea of God, authorized by some time-honoured institution. If, in spite of all this, I have accepted this honour, it is only out of respect to the memory of the great saint with whose Centenary the present Parliament is associated. I venerate Paramahamsa Deva because he, in an arid age of religious nihilism, proved the truth of our spiritual heritage by realizing it, because the largeness of his spirit could comprehend seemingly antagonistic modes of sadhana, and because the simplicity of his soul shames for all time the pomp and pedantry of pontiffs and pundits.”

[মূল ভাষণঃ The Religions of the World, published by the Secretary, The Ramakrishna Mission Institute of Culture, Calcutta, 1938, pp. 124-133] 

(কবির শ্রীরামকৃষ্ণ শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রামকৃষ্ণ মিশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব সংক্রান্ত উপরোক্ত বিবরণ স্বামী সম্বুদ্ধানন্দ-এর মূল ইংরাজি প্রবন্ধের অনুবাদ, রয়েছে The Global Vedanta, Vedanta Society of Western Washington, Seattle, pp. 3-4; উৎসবের প্রধান অঙ্গ ছিল বিশ্বধর্ম সম্মেলন, ১৯৩৭ সালের ১-৮ মার্চ পর্যন্ত। দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন; তথ্যসূত্র- ‘নিবোধত’ পত্রিকা, মার্চ-এপ্রিল সংখ্যা-২০১৪ )
  
আমি বলেছিলুম, “আমি পরমহংসকে শ্রদ্ধা করি, কারণ এই নাস্তিকতার যুগে তিনি আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করিয়া ছিলেন। তাঁহার হৃদয়ের ঔদার্য, পরস্পরবিরোধী সাধনার সত্যকে উপলব্ধি করিয়াছিল এবং তাঁহার সরলতা ঐশ্বর্য ও পাণ্ডিত্যের আড়ম্বরকে ধিক্কার দিয়াছিল।”(৩ মার্চ ১৯৩৭)

তাঁদের অনুরোধে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি চার লাইনের শ্রদ্ধার্ঘ্যও অর্পণ করেছিলুম—“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা/ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা/তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে/নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে/দেশ-বিদেশের প্রণাম আনিল টানি/সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।” 

তোমার প্রিয় বিবেকানন্দ, সে আমাদের কাছে নরেন্দ্র নামেই পরিচিত ছিল, ও তো তোমার ঠাকুরকে দুটি গান শোনাত—‘সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে’ আর ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’—ও দুটো গানই যে আমারই রচনা ব্রাহ্মসঙ্গীত গো! তোমাদের রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের বহু বরেণ্য সন্ন্যাসী আমার পূজা পর্যায়ের গানগুলো খুব পছন্দ করতেন, বেশ গাইতেনও। তোমাদের মিশন থেকে ভজনসঙ্গীতের যে একটি সঙ্কলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তো আমার পূজা পর্যায়ের ৩০ টির বেশী গান আছে, সে কথা জানো তো?

আমি একটু সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেললাম, বার বার তোমার ঠাকুর, তোমাদের মিশন এমন কেন বলছেন? আপনি তো ভালো করেই জানেন, বাঙালির তিন ‘র’-এ আসক্তি—রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ আর রসগোল্লা! একথা কি ঠিক নয়, আপনি রামকৃষ্ণ ও তাঁর দলকে একহাত নিয়েছিলেন? একথাও তো আপনি লিখেছিলেন যে, “কালীর উপাসনা যারা টিকিয়ে রাখে তারা সুস্থ, সঠিক ও সৎ মানসিকতার মানুষ হতে পারে না।”২ 

কবি—ওকথা লিখেছিলুম কেন জানো? বলিদান আমি সহ্য করতে পারি না। ছেলেবেলায় কালীমন্দিরে পশুবলী দেখার যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেই স্মৃতি আমার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।’

আমি— আমার কষ্ট হয় এই ভেবে যে, আপনার ও শ্রীরামকৃষ্ণের চেতনার মূলে আধ্যাত্মিকতা। তবু কোথায় যেন আপনারা মিললেন না। আমার ঠাকুর, রামকৃষ্ণও বলী দেখতে পারতেন না। তাই পরবর্তী কালে বেলুড় মঠে শক্তি পূজায় স্বামী বিবেকানন্দ যদিও পশুবলী দিতে চেয়েছিলেন, শ্রীশ্রীমা তাঁকে এই বলে নিবৃত্ত করেন, “তোমরা সন্ন্যাসী। সকল প্রাণিকে অভয় দেওয়াই তোমাদের কাজ।” অতএব মঠে সেই থেকে পশুবলী নিষিদ্ধ হয়েছে এবং কুমড়ো, আখ প্রভৃতি বলী হয় অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিপূজায়। বিকল্প বলী শাস্ত্রসম্মত ও প্রচলিত। আপনি ‘রূপ ও অরূপ’ প্রবন্ধে এক জায়গায় লিখেছেন, “শুনা যায় শক্তি-উপাসক কোনো একজন বিখ্যাত ভক্ত মহাত্মা আলিপুর পশুশালায় সিংহকে বিশেষ করিয়া দেখিবার জন্য অতিশয় ব্যাকুলতা প্রকাশ করিয়াছিলেন—কেন না ‘সিংহ মায়ের বাহন’। শক্তিকে সিংহ রূপে কল্পনা করিতে দোষ নাই—কিন্তু সিংহকেই শক্তিরূপে যদি দেখি তবে কল্পনার মহত্বই চলিয়া যায়। ... যদি তাহা (কল্পনা) কোন এক জায়গায় আসিয়া বদ্ধ হয় তবে তাহা মিথ্যা, তবে তাহা মানুষের শত্রু।” 

এখানে ‘শক্তি উপাসক কোন একজন মহাত্মা’ বলতে তো আপনি শ্রীরামকৃষ্ণকেই বুঝিয়েছেন? কিন্তু এমন ভাবনা আপনার মনে এসেছে, এটা ভাবতে আমার ভালো লাগে না। আপনি কি করে ধরে নিলেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণ সিংহকেই শক্তি রূপে দেখেছিলেন? আপনার এই অযথার্থ ও অসতর্ক মন্তব্য ও হিন্দুর প্রতিমা পূজার বিরূপ সমালোচনা কত মানুষকে সমস্যায় ফেলেছে, তা জানেন? শ্রীরামকৃষ্ণ কি কালীকে কেবল মৃন্ময়ী বা হিংসা ও রক্তপ্রিয়া দেবী মনে করতেন বলে আপনি কি সত্যি বিশ্বাস করেন? তিনি অনুভূতির চরম স্তরে আরূঢ় হয়ে তন্ত্রের কালী ও উপনিষদের ব্রহ্মকে এক ও অভিন্ন বোধ করেছিলেন। 

কবি কিছুক্ষণ স্পন্দহীন। ধীরে ধীরে বললেন, “কি জানো? একটা মানুষের কতগুলো লেখা পড়ে তাঁকে ধরতে চেয়ো না। সে সময় বাবামশাই (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রয়াত হলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজের দায় তখন আমারই কাঁধে এসে বর্তালো। হিন্দু উপাসনা ও উপাসকদের ভুল ধরা এবং ব্রাহ্মসমাজের উপাসনার শ্রেষ্ঠত্ব দেখানো—এসমস্তই তখন আমার অন্যতম দায়বদ্ধতা হয়ে উঠেছিল। আমার ভাইঝিকে একখানা চিঠি লিখেছিলুম, ১৯২৫-এ, সেখানা পড়লে বুঝতে পারতে...”

কবির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, “মনটা কিভাবে ভিতরে ভিতরে লেখা সম্বন্ধে হরতাল নেবার পরামর্শ করছে। টাকা ছুঁলেই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের যে রকম সর্বাঙ্গে আক্ষেপ উপস্থিত হত কলম ছুঁতে গেলেই আমার সেরকম হয়।” এই চিঠির কথা বলছেন তো? 

“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ১৯৩০-এ যখন ইউরোপ যাই, নিজেই ফরাসী লেখক ও বিখ্যাত মনীষী রোম্যাঁ রোল্যাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলুম। আমি নিজে থেকেই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে উসকে দিই আলোচনায় আরও জানব বলেই। উনি সেসব কথাবার্তা তাঁর ডায়রিতে লিখে নিয়েছিলেন। পরে সে ডায়রি প্রকাশ হয়েছে এমনকি বাংলায় অনুবাদও হয়েছে বলে শুনেছি। সেসব কি তুমি পড়েছ?”

আমি— না, তা আমার পড়া হয়ে ওঠেনি। 
কবি— তাহলে আরও বলি শোন সখী।
আমি— কি বললেন আমায়? সখী? আবার বলুন কবি! 
কবি হাসলেন, ভুবন ভোলানো সেই হাসি। বললেন, “শোন সখী, আমার ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে কম করেও তিনবার তুমি তোমার ঠাকুরের নামের উল্লেখ পাবে। ‘পথ ও পাথেয়’-তে লিখেছিলুম, ‘...রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ, শিবনারায়ণ স্বামী ইঁহারাও অনৈক্যের মধ্যে এককে, ক্ষুদ্রতার মধ্যে ভূমাকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য জীবনের সাধনাকে ভারতবর্ষের হস্তে সমর্পণ করিয়াছেন।’ আরও বলি শোন, স্বামী শ্যামানন্দের নাম শুনেছ? উনি আগে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সাধু ছিলেন, পরে সঙ্ঘ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি একখানি বই লেখেন, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কাব্যলহরী।’ ৫৭৪ পৃষ্ঠার বই, আমায় ধরলে, ভূমিকা লেখবার জন্যে। লিখে দিলুম, “স্বামী শ্যামানন্দ পদ্যছন্দে শ্রীরামকৃষ্ণ কাব্যলহরী রচনা করেছেন, ইহার যথার্থ মূল্য সরল ভক্তির। ভক্তেরা ইহা শ্রদ্ধাপূর্বক গ্রহণ করিবেন সন্দেহ নাই।”৩

তাহলে তো দেখছি শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে আপনার কোনও বিরোধ নেই। 

আনমনা ভাবে কবি বলে চললেন, “দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা থেকে এক মাস্টার, যতদূর মনে পড়ছে জয়নগর ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক মহাশয়, চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলেন, আমি শ্রীরামকৃষ্ণকে কেমন দেখেছি। তার উত্তরে লিখেছিলুম, “সমস্ত দেশের লোকের চিত্তে তিনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) প্রবল ভক্তির সঞ্চার করেছেন তারই মধ্যে তাঁর মহত্ব সপ্রমাণ ও তাঁর কীর্তি চির প্রতিষ্ঠিত হয়ে রইল। আমি যদি তাঁকে সম্পূর্ণভাবে চেনবার সুযোগ না পেয়ে থাকি, সেটা আমারই পক্ষে আক্ষেপের কারণ হয়েছে।” (১৯৩৩-এ ত্রিষ্টুপ মুখোপাধ্যায়কে লেখা)

আমি— আমারও একথা বারম্বার মনে হয়। মত ও পথের কিছু পার্থক্য থাকলেও আপনাদের দুজনেরই চেতনার কেন্দ্রে রয়েছেন ঈশ্বর। আপনারা উভয়েই অধ্যাত্মবাদী ও সমন্বয়মুখী। যে ঔপনিষদিক ব্রহ্মে আরোপিত হয়েছে আপনার হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা, দেশ-কালের সীমা উত্তীর্ণ যে অমৃত উপলব্ধির কথা আপনার একাধিক রচনায় প্রকাশ পায়, সেই পুরুষই কি রামকৃষ্ণ বিগ্রহে মূর্ত হয়ে ওঠেনি? ঈশ্বরের প্রতি শান্তভাব, দাস্যভাব, সখ্যভাব, বাৎসল্য ভাব ও মধুর ভাব আরোপ করে শ্রীরামকৃষ্ণের আপন সাধনা, সিদ্ধি ও সাধন-পথ নির্দেশ, আপনিও কি সেভাবে কখনো প্রকৃতি প্রেমে একাত্ম হয়ে, কখনো মধুর ভাবে প্রেম পর্যায়ে, কখনো দেশ মাতৃকার প্রতি প্রেমে দেশাত্মবোধক বীর ভাবে, কখনো পরম সাধন ধনের উদ্দেশ্যে পূজা পর্যায়ের গানের মধ্যে দিয়ে আপনার হৃদয়ের ষোড়শোপচার আরাধনা করেননি? আপনার সমন্বয়ের আদর্শ—‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে’ আপনি দেশে-বিদেশে সর্বত্র প্রচার করেছেন, সর্কীর্ণতার নিন্দা করেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’ মন্ত্রে কি সেই আদর্শই চরম রূপ পরিগ্রহ করেনি? আপনি যখন বলেন, “একবার অন্তরের দিকে চোখ ফেরাও...তোমার এই সুগভীর নির্জনতার মধ্যে তোমার এই অন্তহীন চিদাকাশের মধ্যে তাঁর এই অদ্ভুত বিরাট লীলা—দিনে রাত্রে অবিশ্রাম। এই আশ্চর্য প্রভাতের দিকে পিঠ ফিরিয়ে একে কেবলই বাইরের দিকে দেখতে গেলে এতে আনন্দ পাবে না, অর্থ পাবে না”৪—একথা তো শ্রীরামকৃষ্ণের সেই উপদেশের প্রতিধ্বনি—“ধ্যান করবার সময় তাঁতে মগ্ন হতে হয়। উপর উপর ভাসলে কি জলের নিচে রত্ন পাওয়া যায়?... আগে ডুব দাও, ডুব দিয়ে রত্ন তোল, তারপর অন্য কাজ।”৫  আপনি বলেছেন, “প্রতিদিন সকল কর্মের মধ্যে আমাদের সাধনাকে জাগিয়ে রাখতে হবে। এই সাধনাটিকে আমাদের গড়তে হবে।”৬ শ্রীরামকৃষ্ণও সব কাজের মধ্যে ঈশ্বরচিন্তার জাগপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কথা বলতেন, নানা ভাবেই বলেছেন সেকথা, পিঠের ফোঁড়ার উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন ফোঁড়া হলে সব কাজের মধ্যেও মনের এক অংশ পড়ে থাকে ফোঁড়ার ব্যথার উপরে, কিম্বা নষ্ট মেয়ের ঘরের সব কাজ করা ও মনে মনে সর্বদা উপপতির চিন্তা করা, কচ্ছপ জলে চড়ে বেড়ালেও আড়ায় রাখা ডিমের দিকে মন পড়ে থাকা—কত রকম করেই বলেছেন। 

কবি হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, “যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু/এবার এ জীবনে/তবে তোমায় আমি পাইনি যেন/ সে কথা রয় মনে/যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই/শয়নে স্বপনে।/এ সংসারের হাটে/আমার যতই দিবস কাটে,/আমার যতই দু হাত ভরে ওঠে ধনে,/তবু কিছুই আমি পাইনি/যেন সে কথা রয় মনে।/যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই/ শয়নে স্বপনে।”৭ 

আমার চোখ জলে ভরে এল। বললাম, ‘জানি কবি। জীবন সায়াহ্নে এসে ‘জীবনদেবতা’-কে উদ্দেশ্য করে আপনার যে আকুতি ফুটে উঠেছে গানে, কবিতায়, প্রবন্ধে বারম্বার, সে জীবনদেবতার খোঁজ তো প্রতিটি মানুষের অন্তরে অন্তহীন! আপনি যে তাঁকে চলার পথে সঙ্গে থাকার অনুরোধ করেছেন’—“হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো, দাও গো আমার হাতে
ধরব তারে, ভরব তারে, রাখব তারে সাথে
একলা পথের চলা আমার করব রমণীয়।”৮  
তাঁকে আপনি ‘বন্ধু’ ডেকেছেন, ‘সখা’ বলেছেন, সে তো রামকৃষ্ণের ঐ ‘মা’। ঐ যে বলেছেন,           
“বন্ধু রহো রহো সাথে
আজি এ সঘন শ্রাবণপ্রাতে।
ছিলে কি মোর স্বপনে সাথিহারা রাতে।।
বন্ধু, বেলা বৃথা যায় রে
আজি এ বাদলে আকুল হাওয়ায় রে—
কথা কও মোর হৃদয়ে, হাত রাখো হাতে।।”৯ 

কবির চোখে উদাস দৃষ্টি, বললেন, ‘আসলে কি জানো? আমার ভাবটি হল, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়...’, যে কথা স্বীকার করেছি নানাভাবে, “বস্তু যা পেয়েছি তার চেয়ে রস পেয়েছি অনেক বেশী। আজ বুঝতে পারি এই জন্যেই আমার আসা। আমি সাধু নই, সাধক নই, বিশ্বরচনার অমৃত-স্বাদের আমি যাচনদার, বারবার বলতে এসেছি ‘ভালো লাগল আমার।’১০ 

বৃষ্টির বেগ খুব বেড়ে উঠেছে। আমরা দুজনেই মগ্ন হয়ে শুনছি অবিরাম ধারাপাতের শব্দ। নীরবতা ভঙ্গ করে কবি গেয়ে উঠলেন দু’কলি, আমার পরম সৌভাগ্যে আমি নিজেই অধীর! 

“আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা আপন সে কি,
অন্ধকারে হঠাৎ তারে দেখি।।
যবে দুর্দম ঝড়ে আগল খুলে পড়ে,
কার সে নয়ন ‘পরে নয়ন যায় গো ঠেকি।।
যখন আসে পরম লগন তখন গগন-মাঝে
তাহার ভেরী বাজে।
বিদ্যুৎ-উদ্ভাসে বেদনারই দূত আসে,
আমন্ত্রণের বাণী যায় হৃদয়ে লেখি।।”১১  

প্রবল বর্ষণে কবির গান শুনতে শুনতে কী এক অপূর্ব আবেশে হৃদয় মন জুড়িয়ে গেল। ভাবলাম, সকল বিরোধ ও মিলনের শেষে, একদিন সাঙ্গ হয় সকল চাওয়া-পাওয়ার হিসেবনিকেশ, চলে যেতে হয় এ পান্থভূমি ছেড়ে বিজন নিরুদ্দেশ! জানা নেই কোন্ সে নতুন দেশে, কোন্ সে নতুন বেশে, কোন্ নব জননীর কোলে জাগবো আবার হেসে!   

অস্ফুটে বলি, ‘ঠাকুর, আপামর বাঙ্গালির হৃদগগনে সৌরভমন্থর মননে তোমার গানের নিত্য আসন পাতা, যখন যন্ত্রণা পাই, আমার মনের ঘরে, নিঃশব্দ পদসঞ্চারে, বেদনবেলায় বেজে ওঠে, ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে, জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে’, ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা’-য় রামকৃষ্ণ-ঠাকুরের উপাসনায় রবি-ঠাকুরের গানের নৈবেদ্য সাজিয়ে দিই!  

পাখির ডাকে চোখ মেলে দেখি, বর্ষণ-ক্ষান্ত শান্ত আকাশ, শান্ত বাতাস, প্রশান্ত গম্ভীর সকাল। দূর থেকে ভেসে আসা পরিচিত সুরে মনে পড়ে, এমন শ্রাবণ দিনে রবি-ঠাকুর ‘সুর’লোকে চলে গেছেন। আজ বাইশে শ্রাবণ।    



তথ্যসূত্র—
(১) ‘বর্ষা ও শরৎ’, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্ররচনাবলী, ১০ম খণ্ড (জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)। 
(২) রম্যাঁ রোল্যাঁ-র ডায়রি থেকে (স্বামী মেধসানন্দ, ‘নিবোধত’ পত্রিকা, মার্চ-এপ্রিল, ২০১৪)। 
(৩) সাধক ও কবি: শ্রীরামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ, তুহিনশুভ্র ভট্টাচার্য, কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শ্রীরামকৃষ্ণ সংখ্যা, শারদ ১৪১৮।  
(৪) রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী, কলকাতা (১৩৯৫), ৭ম খণ্ড। 
(৫) শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত, উদ্বোধন কার্যালয় প্রকাশিত অখণ্ড সংস্করণ (২০১৩), পৃষ্ঠা-৭৩।
(৬) রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী, কলকাতা (১৩৯৫), ৭ম খণ্ড।
(৭) গীতবিতান, পূজা (বিরহ) পর্যায়, রাগ-কাফি, তাল-একতাল, রচনাকালে কবির বয়স-৪৮ বছর।
(৮) গীতবিতান, পূজা (বন্ধু) পর্যায়, রাগ-সাহানা, তাল-ঝাঁপতাল, রচনাকালে কবির বয়স-৫৩ বছর।
(৯) গীতবিতান, প্রকৃতি (বর্ষা) পর্যায়, রাগ-ভৈরবী, তাল-মধ্যমান, রচনাকালে কবির বয়স-৬৪ বছর।
(১০) আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, দশম খণ্ড (জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার), পৃষ্ঠা-২২০। 
(১১) গীতবিতান, পূজা (বিশ্ব) পর্যায়, রাগ- বৃন্দাবনী সারং, তাল-তেওরা, রচনাকালে কবির বয়স-৬৪ বছর। 

Read More »

বুধবার, জুলাই ২৯, ২০২০

◆ কৃষ্ণা রায় / নিঃশঙ্ক চিকিৎসক বিদ্যাসাগর

sobdermichil | জুলাই ২৯, ২০২০ | |
কৃষ্ণা রায় / নিঃশঙ্ক  চিকিৎসক বিদ্যাসাগর
বিদ্যাসাগরের জন্মের দু”শ বছর উপলক্ষ্যে অনেক বিদগ্ধ আলোচনার ভিড়ে  তেমন করে প্রকাশ পায়নি তাঁর জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত , নির্ভীক শিক্ষক ও  শিক্ষা প্রশাসক, পুস্তক প্রণেতা এবং পুস্তক ব্যবসায়ী বিদ্যাসাগরকে আমরা চিনি।  আমাদের আলোড়িত করে তাঁর জীবন জোড়া  অপরিসীম মানব দরদ , দক্ষ  পরিচালনায় সমাজ সংস্কার এবং সর্বার্থেই অক্লান্ত সমাজ সেবার কাজ।  আর এই শেষের কাজটি  ভাল রকমে করার জন্য  তিনি তাঁর সমকালে হয়ে  উঠেছিলেন এক  ডিগ্রীবিহীন  স্বশিক্ষিত নিঃশঙ্ক  চিকিৎসক। ডাক্তার ঈশ্বর  বিদ্যাসাগর। সেই বিদ্যাসাগরের কথা হয়তো বা আমরা অনেকেই তেমন করে জানিনা। 

সেকালে কি  বাংলায় ডাক্তার ছিলনা? সেখানে  বিদ্যাসাগরের মত  অন্যতর শাস্ত্রে পন্ডিতের নাক গলানোর কি দরকার ছিল?  তাও জীবনের প্রান্তিক পর্বে !  উত্তরে নির্দ্বিধায় বলা যায় , ব্যবস্থা ছিল তো বটেই।  ১৮৩৫ সালে কলকাতায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর পাশ্চাত্য  মতে চিকিৎসা- বিদ্যার চর্চা যথেষ্টই হোত।  পাশাপাশি দেশীয় আয়ুর্বেদ , হাকিমি চিকিৎসার ব্যবস্থাও পুরোমাত্রায় বজায় ছিল।

বিদ্যাসাগরের এই  কাজে এগিয়ে আসার কারণ আর কিছুই নয়, তাঁর বিজ্ঞান- মনস্ক মনের  কাঠামোয় সদা জাগ্রত  সেই অপার সেবাপরায়ণতার মনোবৃত্তি,  যা তাঁকে  তাড়না করেছিল দরিদ্র- আর্ত মানুষের রোগের চিকিৎসার জন্য স্বল্প ব্যয়ে  নিরাময় যোগ্য এক নতুন ধরণের  প্রায়োগিক চিকিৎসা্-ব্যবস্থায় ।   বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি চর্চার কেন্দ্রে হয়তো  ছিল  দেশের অগণিত দরিদ্র – অসহায় মানুষের বেদনায়  সেই জীবন প্রমাণ এমপ্যাথি,  অর্থাৎ নিজের দারিদ্র ভরা শৈশব অথবা  কৈশোরের অভিজ্ঞতায় যা তিনি নিবিড় ভাবে জেনেছিলেন, দুঃখ  -দুর্দশা তাড়িত  মানুষের জন্য সেই  নিজস্ব অনুভব  ক্ষণমুহূর্তের জন্য  ভোলেন নি। একই স্পন্দনে অনুভব করেছিলেন তাদের দুর্দশার মাত্রা।  তাই  হয়তো প্রথামাফিক চিকিৎসক না হয়েও তাঁর নিঃসংশয়ে চিকিৎসকের ছদ্মবেশ নেওয়া, তারই জন্য প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় দাঁড়িয়ে সমাজ সেবার ভিন্নতর রূপ আশ্রয় করা।  

আগ্রহের পটভূমিঃ  
সময়টা  ছিল ১৮৬৬ সাল। বহুদিন ধরে বিদ্যাসাগর  দুরন্ত শিরোঃপীড়ায় ভুগছিলেন , প্রচলিত চিকিৎসায় কোন রকম উপশম ঘটছিলনা । সেই বিপদ থেকে তাঁকে, সারিয়ে তুললেন কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলের পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে শিক্ষিত,অগ্রণী চিকিৎসক, ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল দত্ত, ভারতে  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়  অন্যতম পথপ্রদর্শক।  হোমিওপ্যাথি! এই বিচিত্র চিকিৎসা বিদ্যার  আবিষ্কারক  ছিলেন ১৭৫৫ সালে জন্ম নেওয়া  জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল  হানিম্যান। প্রথাগত ভাবে পাশ্চাত্য চিকিৎসা-শাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও সমকালীন চিকিৎসা পদ্ধতির আসুরিক প্রয়োগ পদ্ধতি দেখে  তিনি  বীতশ্রদ্ধ  হয়েছিলেন।  এক সময় উইলিয়াম কিউলেন্স এর “ আ  ট্রিটিস অন মেটেরিয়া মেডিকার” অনুবাদ করতে গিয়ে দেখলেন পেরুভিয়ান গাছের ছাল থেকে পাওয়া সিঙ্কোনা, ম্যালেরিয়া রোগ সারায়। রসায়নে বিশেষ পারদর্শী মানুষটি  নিজের ওপর   এই রসায়নের প্রয়োগ করে দেখলেন তার নিজের শরীরেও ম্যালেরিয়ার মত রোগ লক্ষণ  দেখাচ্ছে । আরও বেশ কিছু রসায়নের এই ধরণের প্রভাব লক্ষ্য করে  তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, যে সব বস্তু বা  জিনিস কোন সুস্থ মানুষের দেহে্ কোন বিশেষ  রোগ লক্ষণ দেখাতে পারে, সেই একই জিনিস  ওই বিশেষ রোগ বৈশিষ্ট্য যুক্ত রোগীকে নিরাময় করতে পারে।  মতবাদটির  ব্যাখা করলেন এই ভাবে, “লাইক কিউরস লাইক” ।   ১৭৯৬ সালে এই ভাবনা থেকে জাত নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতির  নাম দিলেন  হোমিওপ্যাথি। অনেক বস্তুর ওপর পরীক্ষা করে,  তাদের প্রয়োজন মত লঘু দ্রবণ  তৈরি করে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রভাব দূর করলেন।  ১৮১০ সালে প্রকাশিত হল তাঁর  বিখ্যাত বই “ দ্য অরগ্যানন অফ হিলিং আর্ট”,  পরে লিখলেন  আরেকটি বই “মেটেরিয়া মেডিকা পুরা”,  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাপেক্ষে রোগ নিরাময়ের তথ্যাদি ও রিপোর্ট। ৮৮ বছরের জীবনকালের এই বিজ্ঞানীর চিকিৎসা-দর্শন বিদ্যাসাগরকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করেছিল।  ১৮৪৩ সালে  হানিম্যানের  মৃত্যু হলেও এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি  ততদিনে সারা পৃথিবীতে আদৃত হয়ে গেছে।  ভারতে হোমিওপ্যাথি  চিকিৎসা প্রবেশ করে ১৮৩৯ সালে,  ড জন মারটিন হনিগরারগার এর মাধ্যমে,  পাঞ্জাবের মহারাজা হরি সিং এর  অসাড় স্বরতন্ত্রী ও উদরীর  চিকিৎসায়।  ১৮৪৭-৪৮ সালে  ভারতে ঘটে  যাওয়া  কলেরার মহামারিতে   দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোরে এসে চিকিৎসা করলেন আরেক হোমিওপ্যাথি - চিকিৎসক  ড স্যামুয়েল ব্রুকিং।  ততদিনে  জার্মান ও সুইডিশ মিশনারিরা অল্প খরচে  ভারতের সাধারণ মানুষ এবং সেনানীদের   চিকিৎসা করছিলেন।   

কলকাতায় ১৮৫১ সালে  এলেন বিখ্যাত ফরাসী  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ড তৌনেরে( Tonnere)।  উৎসাহী রাজেন্দ্রলাল দত্ত তাঁর কাছে কিছুটা প্রশিক্ষণ পেলেন। তিন বছর পরে ১৮৬৬ সালে  ইউরোপ থেকে কলকাতায়  এলেন আরেক বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ ডাক্তার  ড টি বেরেনি( T.Bereigny), খুব সাফল্যের সঙ্গে  তিনি কলকাতায় চিকিৎসা শুরু করলেন । ইতিমধ্যে বিদ্যাসাগরের পরামর্শে হোমিওপ্যাথি  চিকিৎসায় অভ্যস্ত রাজেন্দ্রলাল তাঁর কাছে  আরো নিষ্ঠা ভরে  এই  চিকিৎসা পদ্ধতির প্রশিক্ষণ নিলেন এবং প্রাকটিশ করতে লাগলেন । কিন্তু  তখনও তাঁর কাছে তেমন লোক সমাগম হয়না।  এ বিষয়ে স্মরণ করা যাক বিদ্যাসাগরের সহোদর  শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের স্মৃতি চারণ,  “অনেকে বলিতে লাগিল, যদি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ভাল এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় আপনার পরম বন্ধু,  তবে তাহাকে অগ্রে কেন না চিকিৎসা করেন” ? এই সময়ই বিদ্যাসাগর,   তাঁর এই প্রায় সমবয়সী বন্ধু ডাক্তার রাজেন্দ্রলালের  হোমিওপ্যাথি  চিকিৎসায়   কয়েক দিনের মধ্যেই পুরোনা মাথাধরা রোগের চিকিৎসার সুফল পেলেন । সুফল ফেলেন আরও কিছু সমকালীন মানুষ। উপকার পেলেন  ভীষণ ভাবে কোষ্ঠবদ্ধতায় আক্রান্ত  ও আর কিছু অসাধ্য-সাধন ব্যাধিতে কাতর  রাজকৃষ্ণ  বন্দ্যোপাধ্যায় ।  বিদ্যাসাগরের   অন্যতম জীবনীকার বিহারীলাল সরকারের ভাষায়, “ এ হেন রোগে কেবল হোমিওপ্যাথিকের বিন্দুপানে আরাম হইল দেখিয়া  বিদ্যাসাগর মহাশয় বিস্মিত হইয়াছিলেন” আশৈশব যুক্তিনিষ্ঠ বিদ্যাসাগর চিকিৎসার ফল দেখে  নিশ্চিত  ভাবে এর গুরুত্ব বুঝতে পারলেন।  আরেক জীবনীকার চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়” তিনি যখন বুঝিলেন যে এই বিন্দু বিন্দু ঔষধ সেবনেও উপকার হইয়া থাকে, তখন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। ঔষধের উৎকৃষ্টতা, মূল্যের অল্পতা এবং সেবনের সুবিধা সন্দর্শনে তিনি ইহার সুপ্রচারে প্রাণপণ সাহায্য করিতে লাগিলেন ।“  বিদ্যাসাগরের আগ্রহ হবেনা কেন? তিনি তো জানেন, উনিশ শতকের দারিদ্র লাঞ্ছিত, ম্যালেরিয়া, কলেরা , প্লেগ ইত্যাদি  মহামারী অধ্যুষিত  তাঁর স্বদেশে,  এমন স্বল্প ব্যয়ের চিকিৎসা –পদ্ধতির ব্যবহার  যথার্থ  এবং বাস্তব সম্মত। ইতিমধ্যে রাজেন্দ্রলাল দত্ত  ও ড তৌনের, ১৮৫০-৫১  সালের ম্যালেরিয়া আক্রান্ত অনেক রুগীকে সারিয়ে তুলেছে।  ব্রিটিশ সরকার তখন  দেশীয় প্রাচীন  আয়ুর্বেদ  বা হাকিমি চিকিৎসাকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ)।  আবার পাশ্চাত্য ঘরানার  চিকিৎসায় দেশীয় মানুষের তেমন আস্থা গড়ে ওঠেনি। এই অবস্থায় ইউরোপীয় ঘরানার এই  নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতি অবলম্বন করলে দোষ কি?  উনিশ শতকের  অন্যতম  এই প্রাণপুরুষ ,  চিন্তায় মননে ফরাসী- জার্মান  দর্শন –সংস্কৃতির মুগ্ধ সমর্থক ,  স্বল্প ব্যয়ে, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন এই বিদেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতিকে মনে প্রাণে গ্রহণ করলেন , বিশ্বাস করেছিলেন এর মাধ্যমেই দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন বিত্তের মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা পাবে। তাই নিজে বিষয়টি  সঠিক ভাবে অবগত হওয়ার চেষ্টা করলেন , উদবুদ্ধ করলেন , নিজের ভাই  দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ও আরো পরে  আরেক ভাই ঈশানচন্দ্রকে। এই ঈশানচন্দ্রের  উত্তরাধিকারী-রাই পরবর্তীতে ভারতের  হোমিও -চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বিশেষ  মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছেন।  শুধু নিজের ভাইদের নয়,  সে কালে তাঁর  আরো অনেক অনুগত মানুষজনকে শিক্ষার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন রাজেন্দ্রলাল দত্তের  দাতব্য চিকিৎসালয়ে । সেই সব শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসা করতে লাগল। তবে  এই প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের সব চেয়ে বড় কীর্তি  সে কালের বিশিষ্ট এলোপ্যাথি ডাক্তার, ভারতে বিজ্ঞান গবেষণা প্রচারের আদি পুরুষ, মহেন্দ্রলাল সরকারকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়  উৎসাহিত করায় । এ প্রসঙ্গে সুন্দর স্মৃতিচারণ করেছেন বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন। “মহেন্দ্রবাবু মধ্যে মধ্যে ভাবিতেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় ভারতে অদ্বিতীয় ব্যক্তি হইয়াও হোমিওপ্যাথির এত গোঁড়া কেন?  এক দিবস অগ্রজের সহিত অনেক বাদানুবাদের পর হোমিওপ্যাথি  চিকিৎসা কিরূপ তাহা পরীক্ষা করিবার জন্য তাঁহার নিকট স্বীকার করেন।   

এক দিবস মহেন্দ্রবাবু ও দাদা ভবানীপুরে অনারেবল দ্বারকানাথ মিত্র মহোদয়কে দেখিতে গিয়াছিলেন। তথা হইতে  উভয়ে বাটী আসিবার সময়ে এক শকটে আইসেন। আমিও উঁহাদের সমভিব্যাহারে ছিলাম। গাড়ীতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা উপলক্ষ্যে ভয়ানক বাদানুবাদ হইতে লাগিল, দেখিয়া শুনিয়া আমি বলিলাম ,  মহাশয় আমাকে নামাইয়া দেন । আপনাদের বিবাদে আমার কর্ণে  তালা লাগিল”।  সে সময়ে  ভারতে দ্বিতীয় এম ডি বিখ্যাত আলোপ্যাথি চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল এত সহজে রাজি হবেন কেন? তিনি স্থির করলেন এ বিষয়ে নিজে পরীক্ষা করবেন।   

ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান-সভার প্রতিষ্ঠাতা   উদ্যোগী মানুষটি শেষ পর্যন্ত নিজের তাগিদে  এই  চিকিৎসা- প্রণালী  পুংখানুপুংখ  রূপে অনুসন্ধান করে  নিশ্চিত হলেন ।  আলোপ্যাথি চিকিৎসা ত্যাগ করে সে কালে প্রতিপত্তিসম্পন্ন হোমিওপ্যাথ- চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ।  একই ভাবে এগিয়ে আসেন ড বিহারীলাল ভাদুড়ী, ডা অন্নদাচরণ খাস্তগির প্রমুখ।  এই তাগিদের পেছনের  মানুষ কিন্তু সেই দরিদ্র -প্রেমী , সমাজসেবক -  গোঁয়ার  পন্ডিতটি। 

শখ – শৌখিনতায় নয়, রীতিমত অধ্যাবসায়েঃ  
উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে আলোপ্যাথি চিকিৎসকদের পাশাপাশি সমাজের কিছু বিশিষ্ট মানুষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় আগ্রহী হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য  এরা হয়ত সকলেই বিদ্যাসাগরকেই অনুসরণ করেছিলেন । এই তালিকায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র , শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী  প্রমুখ। কিন্তু এদের সবার পূর্বসূরী বিদ্যাসাগর ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই অনন্য। কোন সাময়িক শখ অথবা শৌখিনতায় নয়,  ইউরোপীয় ঘরানার এই নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন শিক্ষার্থীর নিষ্ঠায়।  ছাত্র জীবনে যে নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে শিখেছিলেন সংস্কৃত সাহিত্য, ব্যাকরণ , ন্যায়, দর্শন; পরিণত বয়সে যে আকুতিতে শিখেছিলেন ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য;  জীবনের  প্রৌঢতবে এসেও  তাঁর মধ্যে শিক্ষার্থীর সেই আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।   এমন ভাবে শিখতে  কিন্তু কোন দীক্ষাহীন  অচিকিৎসককে দেখা যায়নি । কেমন ছিল  সেই অধ্যাবসায় পর্ব ? 

তাঁর সহোদর শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের কথায় , বিদ্যাসাগর মহাশয় , প্রতি বৎসর  প্রথমে বেরিনি কোম্পানি ও পরে থ্যাকার কোম্পানির  মারফৎ  অর্ডার দিয়ে বিলাত থেকে অনেক টাকার হোমিওপ্যাথি পুস্তক আনাতেন , তাঁর লাইব্রেরি এই সব বইতে ভরা থাকত ।   বিদেশে  সদ্য প্রকাশিত হোমিওপ্যাথি বই কিনে গোগ্রাসে পড়েছেন , ভাল করে অ্যানাটমি শেখার জন্য  নরকঙ্কাল অবধি বিদেশ থেকে কিনেছেন। তার জন্য প্রথামাফিক পাঠ নিয়েছেন সে কালের বিখ্যাত অ্যানাটমির অধ্যাপক ড চন্দ্রমোহন ঘোষের কাছে।  ড ঘোষের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে নিয়মিত পাঠ নিতে যেতেন । হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসায় রোগ- লক্ষণ  পর্যবেক্ষণ খুব  দরকারি ।  দরকার সে সব তথ্য নথিভুক্ত করা  যাতে পরবর্তীতে  রোগের অনুসন্ধান পর্বে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, নিরাময় সহজ হয়।   এর জন্য একেবারে  প্রথা মাফিক ভাবে  ডায়েরিতে নথিভুক্ত করেছেন রোগ লক্ষণ, রিপোর্ট  এবং  নিরাময় কাল। ইন্দ্রমিত্রের লেখা  বিদ্যাসাগরের জীবনীতে এ রকম নয় জনের কেস- হিস্ট্রির উল্লেখ আছে।  সে সব রোগের প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন, বমি ও হিক্কা,ক্ষুধামান্দ্য অম্বল, গোড়ালি ব্যথা, পেট ব্যথা, পাতলা মল,  নিতম্বে ফোঁড়া থেকে  শুরু করে জরায়ুর ক্যান্সার,  এমনকি অতিরিক্ত রজস্রাব , সাদা স্রাব ইত্যাদি মেয়েলি অসুখের উল্লেখ ও  প্রেস্ক্রাইবড ওষুধের কথা আছে। শেষোক্ত দুটি অসুখের রোগিনী  যথাক্রমে তাঁর কন্যা ও পুত্রবধূ।   একুশ শতকের পটভূমিতে যা সহজ ও  সবাভাবিক বলে মনে হয়, উনিশ শতকের পটভূমিতে  পুত্রবধূ অসংকোচে  গোপনীয় রোগের বিবরণ দিচ্ছেন  চিকিৎসককে এবং চিকিৎসক শ্বশুরমশাই স্বয়ং পুত্রবধুর  স্ত্রী রোগের চিকিৎসা করছেন , নথি রাখছেন , নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক  প্রচেষ্টা। চিকিৎসা-শাস্ত্রে কোন রকম ডিগ্রী না নিয়ে অকুতোভয়ে চিকিৎসা করেছেন একাদিক্রমে অনেক বছর, বেশ কিছু রোগের, যেমন  সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কিছু নিয়মিত অসুখ যেমন ঠান্ডা লাগা, জ্বর , পেট ব্যথা,   অম্বল ইত্যাদি। আর এই ব্যাপারে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগে থেকেছেন বয়সে ১৩ বছরের ছোট বিখ্যাত চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের সঙ্গে । ১৮৭৯ সালের ১২ই এপ্রিল পেট ব্যথায় কাতর মহেন্দ্রলাল চিকিৎসার  পরামর্শের  জন্য বিদ্যাসাগরের  সঙ্গে দেখা করলেন।  এক মাস পর, বিদ্যাসাগরের  নাতির শরীর খারাপের কারণে  তার চিকিৎসা করতে বিদ্যাসাগরের বাড়ি  গেলেন মহেন্দ্রলাল । বিদ্যাসাগর তাঁকে উপহার দিলেন লিবেন্থ্যালের লেখা হোমিও থেরাপি্টিক্স (Libenthal’s Homeo Therapeutics)। এক সপ্তাহ পর  মহেন্দ্রলাল শিশু রুগীর কুশল সংবাদ জানতে  পুনর্বার দেখতে এলেন  এবং বিদ্যাসাগরকে উপহার দিলেন হেইনিগসের আনালিটিক্যাল থেরাপিউটিক্স(Heineg’s Analytical Therapeutics)। এভাবেই দুই বিশিষ্ট মানুষ একে অপরের প্রেস্ক্রিপ্সানের  যথার্থতা যাচাই করে  নিয়েছিলেন  এবং  অব্যাহত  রেখেছিলেন  চিকিৎসা বিদ্যার সারস্বত প্রবাহ।

চিকিৎসক বিদ্যাসাগরঃ কিছু স্মৃতি, কিছু কথাঃ 
সারা জীবন অজস্র ব্যধিতে ভুগেছেন বিদ্যাসাগর।  খুব শৈশবে  প্লীহার অসুখএ আক্রান্ত হওয়া থেকে শুরু করে ক্রনিক পেট ব্যথা, কোষ্ঠবদ্ধতা, উদরাময়  রক্ত আমাশা,ইত্যাদি ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী ।  পরিণত বয়সে কাজের তাগিদে বিস্তৃত ভ্রমণ করতে হয়েছে হুগলী,  বর্ধমান, নদীয়া, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলার প্রত্যন্ত প্রান্তে। খুব কাছ থেকে দেখেছেন গ্রামের  দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য-পরিষেবাহীন দিনলিপি।   সামান্য  উপায় খুঁজে পেলে একজন অতি সংবেদনশীল মানুষ কি পারেন   সমস্যা থেকে মুখ ফেরাতে? বিদ্যাসাগরের চিরকালীন করুণাসিক্ত মন  সীমাহীন উৎসাহে  তৎক্ষণাৎ পরোপকারে প্রবৃত্ত হয়েছেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মনোনিবেশ সেই চিত্তবৃত্তিরই প্রকাশ। 
 
অধ্যাপক  ক্ষুদিরাম বসু  স্মরণ করেছেন , তাঁর একবার পেটের ব্যায়রাম হওয়ায় সেকালের বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক  ড প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার, ব্রজেন বাঁড়ুজ্জের ওষুধ কাজ দিচ্ছিলনা। বিদ্যাসাগর মহাসয় তাঁকে দেখতে এসে বই খুঁজে খুঁজে ওষুধ দিলেন, দু তিন বার সেই ওষুধ খাওয়ার পর সুস্থ হয়েছিলেন ।  সবয়ং মহেন্দ্রলাল সরকারের ওষুধ পাল্টে  দিয়ে বিদ্যাসাগর আরেক রোগী লালবিহারী দের লিভার অ্যাবসেস সারিয়েছিলেন। 
 
বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি  চর্চার অত্যন্ত মানবিক (নাকি ঐশ্বরিক )  বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর কারমাটড় বাস কালে দরিদ্র শিক্ষাহীন সাঁওতালদের সান্নিধ্যে। বিহারীলাল সরকার লিখছেন , “ সাঁওতাল প্রবল পীড়ায় শয্যাগত, বিদ্যাসাগর তাহার শিয়রে বসিয়া মুখে ঔষধ ঢালিয়া দিতেন , হাঁ করাইয়া পথ্য দিতেন, উঠাইয়া বসাইয়া মলমূত্র ত্যাগ করাইতেন, সর্বাঙ্গে হাত বুলাইয়া দিতেন” ----। এ আন্তরিকতার হদিশ পেয়েছে  শুধু  সাঁওতালরা নয়, সমাজের  বিভিন্ন বৃত্তের মানুষ আর এই প্রয়াসের বলিষ্ঠতা তাঁর আকৈশোরের অভ্যাস অথবা  বলা ভাল জীবন-ধর্ম। এই মরমী মনটি  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার  বহু আগে থেকেই ছিল। সে কোন কৈশোর কালে  বাবা ঠাকুরদাসের আশ্রয়দাতা জগদ্দুর্লভ  সিংহের পরিচিত কিছু মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে শুনে বালক ঈশ্বরচন্দ্র  বাবা ও দুই ভাই এর ভোজনের আয়োজন করে  অসহায় পাঁচজন রোগীর কাছে গেলেন । ক্রমাগত  বমি ও মলত্যাগে ক্লান্ত ও  পিপাসার্ত  মানুষগুলির জন্য স্থানীয় গৃহস্থ বাড়ি থেকে  জল এনে খাওয়ালেন,  ডাক্তার রূপচাঁদের বাড়ি থেকে বেদানা, মিছরি,  এক কলসি পরিষ্কার জল  এনে রোগীদের  খাওয়ালেন , নিজের হাতে বমি –মলমূত্র পরিষ্কার করে ধোওয়া কাপড় পরালেন । ডাক্তারের জল চিকিৎসায়  আর ঈশ্বরচন্দ্রের সেবায়  ক্রমে রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষে,  কলকাতার কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলে উপোসী মানুষকে নিজে হাতে  খাবার পরিবেশন করেছেন, বীরসিংহ গ্রামে অন্নসত্র খুলেছেন, বিদ্যাসাগরের কড়া হুকুম , যত টাকা খরচ হোক , কেউ যেন অভুক্ত না থাকে। ১৮৬৯-৭০ সালে বর্ধমানে এক ভয়ানক  জ্বরে প্রচুর মানুষ মারা যায়।  জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সেই সব মানুষদের বিদ্যাসাগর সেবা, ঔষধ , পথ্য দিয়ে সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করেছেন। সেই জ্বর ছিল প্রকৃতপক্ষে ম্যালেরিয়া। বিদ্যাসাগর এ রোগের  চিকিৎসার জন্য ডিস্পেন্সারি , ওষুধ-পত্রের ব্যবস্থা করে ক্ষান্ত হন নি, কলকাতায় এসে সে কালের  ছোটলাট গ্রে সাহেবের কাছে বিষয়ের গুরুত্ব বোঝান। এর ফলে সরকারী বদান্যতায় আরো অনেক ডিস্পেন্সারি  খোলা হল। বিদ্যাসাগরের ডিস্পেন্সারি থেকে শুধু ওষুধ পথ্য নয়, পয়সা ও  পরণের কাপড়  পর্যন্ত পাওয়া যেত ।  এই ডিস্পেন্সারির কাজে বিদ্যাসাগরকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন প্যারিচাঁদ মিত্রের ভাইপো ডাক্তার গঙ্গানারায়ণ মিত্র । ম্যালেরিয়া রোগীকে সেখান থেকে কুইনাইন দেওয়া হোত, প্রয়োজনে তাদের বাড়ি গিয়েও বিদ্যাসাগর স্বয়ং ওষুধ - পথ্য পৌঁছে দিয়ে আসতেন। বিদ্যাসাগরের এই অনন্য সাধারণ সেবার কথা  স্মরণ করেছেন আরেক বিশিষ্ট মানুষ রজনীকান্ত গুপ্ত , ১৮৮৩ সালে, “একদা তিনি (বিদ্যাসাগর  মশাই) প্রাতঃকালে ভ্রমণ করিতে করিতে এই নগরের প্রান্তভাগ অতিক্রম করিয়া কিয়দ্দূর গিয়াছেন , সহসা দেখিলেন একটি  বৃদ্ধা অতিসার রোগে আক্রান্ত হইয়া পথের পার্শ্বে পড়িয়া রহিয়াছে। দেখিয়াই তিনি ওই মললিপ্ত বৃদ্ধাকে পরম যত্নে ক্রোড়ে করিয়া আনিলেন এবং তাহার যথোচিত চিকিৎসা করাইলেন। দরিদ্রা বৃদ্ধা তাহার যত্নে আরোগ্য লাভ করিল”। 

আসলে বিদ্যাসাগর  সারাজীবন যখন যে কাজে নেমেছেন ,  সেখানে তাঁর নিষ্ঠায় কোন খাদ রাখেন নি, নিখুঁত কর্ম সম্পাদনকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা দেখা যায়নি।   চিকিৎসকের ডিগ্রী না  থাকলেও    তাঁর ছিল তন্নিষ্ঠ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অপার  ধৈর্য  এবং সীমাহীন  মমতা, যে গুণগুলি না থাকলে  একজন ডিগ্রীধারি চিকিৎসকও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারেন ।  কারমাটড়ে একদিন সকালে এক মেথর কাঁদতে কাঁদতে এসে তাঁকে বলল, আমার ঘরে মেথরানির কলেরা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রওনা হলেন বিদ্যাসাগর, ওষুধের বাক্স আর মোড়া নিয়ে এক ভৃত্য তাঁর সাথী হল। সারাদিন রোগিনীর কাছে থেকে, প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে তাকে কিছুটা ভাল দেখে সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে স্নানাহার করলেন । 

চিকিৎসক অগ্রজের আরও অন্তরংগ পরিচয় দিয়েছেন সহোদর শম্ভুচন্দ্র। ১৮৭৫ সালে তাঁর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, “দাদা প্রাতঃকাল হইতে বেলা দশ ঘটিকা  পর্যন্ত সাঁওতাল রোগীদিগকে হোমিওপ্যাথি মতে চিকি্ৎসা করিয়া থাকেন এবং পথ্যের জন্য সাগু , বাতাসা মিছরি প্রভৃতি  নিজ হইতে প্রদান করেন------ অপরাহ্ণে পীড়িত সাঁওতালদের পর্ণ কুটীরে যাইয়া তত্ত্বাবধান করিতেন”। এখানে লক্ষ্যণীয় তিনি  শুধু ওষুধ  দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না, যুক্তিনিষ্ঠ বিদ্যাসাগর জানতেন, পথ্য সঠিক না হলে শুধু ওষুধে রোগ সারেনা। 
কারমাটড়ে বিদ্যাসাগরের আরেক দিনের  জীবন কথা উল্লেখ করেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি দেখলেন সকাল থেকে অনবরত সাঁওতালরা তাঁর কাছে ভুট্টা নিয়ে আসছে, আর  তিনিও কোন রকম দরাদরি না করে সব ভুট্টা কিনে নিচ্ছেন। কিছুপরে হরপ্রসাদ দেখলেন প্রখর রোদে ঘর্মাক্ত বিদ্যাসাগর  হনহন করে আল পথ  ধরে হেঁটে আসছেন , হাতে একটি পাথরের বাটি।  হরপ্রসাদ  প্রশ্ন করাতে বিদ্যাসাগর জানালেন , কিছুক্ষন আগে একটি সাঁওতালী এসে খবর দিয়েছে, তার ছেলের নাক দিয়ে হুহু করে  রক্ত পড়ছে,  বললে, বিদ্যাসাগর, তুই  এসে যদি তাকে বাঁচাস। তাই আমি একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ নিয়ে গিয়েছিলাম ।  জানিস, এক ডোজ ওষুধেই ছেলেটার রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল। বিদ্যাসাগর আরও বললেন , এরা তো মেলা ওষুধ খায়না, অল্প ওষুধেই এদের উপকার হয়। 

হরপ্রসাদ আরও প্রশ্ন করে জেনেছিলেন , গ্রামটি বেশি দূরে নয়, মাত্র মাইল দেড়েক পথ ।  একুশ শতকে এসে ভাবতে অবাকই লাগে, পঁয়ষট্টি বছরের এক বৃদ্ধ প্রখর রৌদ্রে অনায়াসে  তিন মাইল পথ পরিক্রমা করে এলেন শুধুমাত্র দীন দরিদ্র অবহেলিত অন্ত্যজ মানুষের সেবায়। 

এই সেবার এক সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন জীবনীকার চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কারমাটড় থেকে বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে চিঠিতে লিখছেন বিদ্যাসাগর , “আমি কল্য অথবা  পরশ্ব আপনাকে দেখিতে যাইব স্থির করিয়াছিলাম, কিন্তু এরূপ দুইটি  রোগীর চিকিৎসা করিতেছি যে তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া কোন মতেই  উচিত  নহে।  এ জন্য দু চারিদিন দেওঘর যাওয়া রহিত করিতে হইল”। 

শুধু নিজে চিকিৎসা করতেন এমন নয়, ১৮৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর প্রায় দুশ টাকার বই , ওষুধ বিদেশ থেকে আনাতেন, বই পড়তেন নিজে, প্রয়োজনে মানুষকে উদবুদ্ধ করার জন্য বিতরণ করতেন , ওষুধ বিলোতেন দরিদ্র মানুষের চিকিৎসায়,  পুরোটাই মানব কল্যাণের নেশায় । তাঁর অতি বড় নিন্দুকেরাও কেউ বলেন নি বিদ্যাসাগর ডাক্তারি করেছেন ফি নিয়ে ।  ডিস্পেন্সারি করেছেন নিজের গ্রাম বীরসিংহে, সেখানে  নিজে গ্রামবাসিদের চিকিৎসা করেছেন , মেজভাই দীনবন্ধুকেও উৎসাহিত করেছেন এরই কাজে। বর্ধমান ফিভারের সময়  বিস্তীর্ণ  এলাকায় একই ভাবে ডিস্পেন্সারি  খুলে চিকিৎসা করেছেন , নিজের উদ্যোগে, প্রয়োজনে   সরকারি প্রশাসনের উচ্চতর স্তরে, সেখানে কোন রোগীর জাত –ধর্ম বিচার করেন নি । এখানে একটি কথা না বললেই নয়। যে কোন শাস্ত্রে পারদর্শিতার আড়ালে থাকে দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক শ্রম। হোমিওপ্যাথি বিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক  প্রথাগত শিক্ষা না পেলেও  তাঁর  স্ব-শিক্ষার  আন্তরিকতার কথা জানলে বিস্মিত না হয়ে পারা যাবেনা। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্পর্কিত বইগুলি তাঁর নিবিড় অনুরাগের হদিস দেয়।  বর্তমানে কলকাতায়  সাহিত্য পরিষদ ভবনে   রাখা আছে হোমিওপ্যাথি, চাইল্ড কেয়ার, সাইকোলজি , সাধারণ  স্বাস্থ্য - সম্পর্কিত  অজস্র বই।  শারীরবিদ্যায় প্রগাঢ অনুরাগ ও যথোচিত জ্ঞান না থাকলে কি আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মেয়েদের সহবাস সম্মতি বিলে  পূর্ব নির্দিষ্ট বারো  বছর বয়সটিকে  মান্যতা দিতে  আপত্তি জানান !  শুধু শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে নয়, তিনি জেনেছিলেন স্বদেশের মেয়েদের রজঃস্বলা হওয়ার বয়স বারো বছরে  স্থির থাকেনা, তেরো চোদ্দ এমন কি পনেরোতেও পৌঁছতে পারে।  এ ধারণা  পেতে তাঁকে  হয়ত বা  ভাবে সাহায্য করেছিল  বাঙ্লায় প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী, সংস্কৃত কলেজে একদা বৈদ্যক শ্রেণির ছাত্র, পরবর্তীতে পাশ্চাত্য চিকিৎসায় শিক্ষিত চিকিৎসক  এবং তাঁর  প্রিয়জন   পন্ডিত ও গবেষক মধুসূদন গুপ্ত ।

   সব শেষে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ না করলেই নয়। পুরোনো হাঁপানির রোগী বিদ্যাসাগর শীতকালে বিশেষ ভাবে কষ্ট পেতেন । তখন তাঁর অভ্যাস ছিল সকাল –বিকেল দুবেলা গরম চা পান। একদিন  চা পানের পর তাঁর মনে হল বেশ সুস্থ লাগছে, হাঁপানির টান যেন বেশ কিছু্টা কম, । গৃহভৃত্যকে  জিজ্ঞাসা করে জানলেন , সেদিনের চা   সে নিজেই তৈরি করেছে। বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন , চায়ের মধ্যে কি আদার রস মেশানো হয়েছে? গৃহভৃত্য বলল, না সেরকম কিছু সে করেনি, তবে তাড়াহুড়োয় কেটলিটি না ধুয়েই জল চাপিয়ে দিয়েছে। কেটলি খুলে দেখে বিদ্যাসাগর যুগপৎ বিস্ময় এবং ঘৃণা অনুভব করলেন। কেটলির মধ্যে দুটি আরশোলা পড়ে আছে। বিদ্যাসাগরের অনুসন্ধিৎসু মন বলল, এক কেটলি জলে যদি বেশ কিছু আরশোলা ফুটিয়ে , পরে সেই নির্যাস  অ্যালকোহলে ফেলে, ছেঁকে ও পরে লঘু দ্রবণ করে হোমিওপ্যাথি  ওষুধ বানান যায় । ভুবনকৃষ্ণ মিত্র লিখেছেন , এ ভাবে  হোমিওপ্যাথি মতে ওষুধ তৈরি করে তিনি  বহু রোগীকে না জানিয়ে এই ওষুধ সেবন করান ,  এবং বিনা ব্যয়ে বহু লোকের রোগের উপশম ঘটান ।  যে কোন যুক্তিনিষ্ঠ মন অপ্রাকৃত কিছু দেখলে অনুসন্ধানে ব্যস্ত হবেই। বিদ্যাসাগরও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রাচীন চীনা চিকিৎসা বিদ্যায় এই প্রাণিটির হাঁপানি সারানোর ভুমিকা কিন্তু স্বী্কৃত। আর বর্তমানে  হাঁপানির নিরাময়ে  হোমিওপ্যাথি ওষুধে এই  প্রাচ্যদেশীয়  তথা ভারতবর্ষীয় আরশোলা থেরাপির কথাও   কিন্তু  মান্যতা পেয়েছে। 
  
কিন্তু এই গবেষণার ইতিহাসে সেই সুপ্রাচীন সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত, সমাজসেবী  এবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ডিগ্রীহীন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক  বিদ্যাসাগরের আদি পরীক্ষাটির কথা হয়ত বা   একালের  হোমিওপ্যাথি গবেষকেরা কেউই জানেন না। 
---------------------


তথ্য সহায়তাঃ 
১।ক) শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন , বিদ্যাসাগর জীবন চরিত ও ভ্রম নিরাস , চিরায়ত প্রকাশ ন মার্চ ২০১৯, পৃঃ ৯৫
 খ) ঐ পৃ ৯৬
২।. উইকিপেডিয়াঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান
৩।  ড জি এম ফারুক, আধুনিক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা,  ৩রা জুলাই ২০১২।
 ৪। Dilli Homeopathic Anusandhan Parishad;  Origin and Growth of Homeopathy in India (http:// www, delhihomeo.com)
৫।ক) শঙ্কর কুমার নাথঃ ”চিকিৎসা বিজ্ঞানে আত্মমগ্ন ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগর; অজানা বিদ্যাসাগরঃ অনন্য দিশারি( গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ) বিদ্যাসাগর  চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র , কলকাতা ২০১৯, পৃ ৭১-৭২।
খ)ঐ পৃ ৭৩
গ)ঐ পৃ ৭৭-৭৮  
৬।ক) বিহারীলাল সরকার , বিদ্যাসাগর, ১৮৯৫, পৃ৪৮৯ 
খ)ঐ পৃ ৪৯১
গ) ঐ পৃ ৫০০-৫০১
৭।ক)চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় , বিদ্যাসাগর , ১৯০৯, পৃ ৫০১
খ) ঐ পৃ ৫০৩
গ)ঐ পৃ ৪৯৭ 
৮।ক) ইন্দ্র মিত্র , করুণাসাগর বিদ্যাসাগর,আনন্দ, কলকাতা,  ২০১২, পৃ১০২-১০৩ 
খ) ঐ পৃ ৩২-৩৬
গ) পৃ ৪২১
ঘ) পৃ৪২৩
ঞ)পৃ৪২৫
৯। Biswas B, Jhansi S, potu R, patel S et al  Physicochemical study of homeopathic  drug, Blatta orientalis . Indian J Res  Homeopathy  2018 :12: 125-31 
১০। ক) Brian A Hatcher. Vidyasagar: The Life and after Life Of an eminent Indian. Routledge, India  2019. P-97
খ) Ibid, p 99
গ) Ibid p100
 ঘ) Ibid, p 101 
১১। DattaGupta Mahua. Negotiating the Trajectory of a Marginal Medical  Discipline : Homeopathy in Colonial Bengal.  Ph. D Thesis submitted to the University Of Burdwan  2015.
১২। ক্ষুদিরাম বসুঃ বিদ্যাসাগর স্মৃতি, পঞ্চ পুষ্প, আষাঢ ১৩৬৬, পৃ২৯৩।
১৩। রজনীকান্ত গুপ্ত, স্বর্গীয় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৩, পৃ১৭
১৪। ভুবন কৃষ্ণ মিত্রঃ জীবতত্ত্ব, জন্মভূমি, ফাল্গুন ১৩০৮, পৃ ২৫০-৫১
  ১৫।   Hazra S,  Indian Renaissance Of Homeopathy.( https:// www. homeotimes.com  )
১৬।. Press Information Bureau, Govt Of India, President’s Secretariat, 22.08.2016. (https://pib.gov.in)
১৭। ড। শঙ্কর কুমার নাথ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের গোরার কথাও পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০১৯, পৃ২৫১-২৫৬।

 

Read More »
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.