x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২০

LOST INSIDE পুজোর গান

sobdermichil | অক্টোবর ১৮, ২০২০ | |
lost_inside নিবেদিত
টিম_ইনসাইড প্রযোজিত 
পুজোর_গান 
পুজোর গান




Read More »

শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২০

শনির বচন

sobdermichil | অক্টোবর ১৭, ২০২০ | |
গোবলয়ের খপ্পরে

রাজনীতিতে মিছিল থাকবে। মিটিং থাকবে। জনসমাবেশ থাকবে। থাকবে রাজনৈতিক নেতা কর্মী। থাকবে সাধারণ জনতাও। থাকবে বিক্ষোভ সমাবেশ পথ অবরোধ থেকে শুরু করে সরকার বিরোধী অভিযান। এই সবই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে এসব কোনটিই নতুন কোন বিষয় নয়। এমনকি নতুন বিষয় নয় জনতা পুলিশের খণ্ডযুদ্ধও। ধস্তাধস্তি। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার দুরন্ত প্রয়াস। না, কোন কিছুই নতুন কোন সংস্কৃতি নয়। নতুন সংস্কৃতি হলো, রাজ্য রাজনীতিতে রাজনৈতিক মিছিলে ভিন রাজ্যের বহিরাগত নেতাকর্মী ভাড়া করে আনার প্রবণতা। যাদের জীবন জীবিকার সাথে পশ্চিমবঙ্গের কোন সংযোগ নাই। যাদের বাস এই রাজ্যেও নয়। রাজ্য রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি আগে ছিল না। এটি একেবারেই হাল আমলের ঘটনা। রাজ্যের জনগণের বিপুল অংশের উপরে ভরসা না থাকাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা যেতে পারে। সেই কারণেই ভিন রাজ্য থেকে লোক ভাড়া করে নিয়ে এসে মিছিলে ভিড় বাড়ানোর প্রয়াস। না, গণতন্ত্রের পক্ষে এই সংস্কৃতি শুভ নয়। একটি রাজ্যের রাজনৈতিক সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে সেই রাজ্যের রাজ্যবাসীর ক্ষোভ বিক্ষোভ থাকতে পারে। এবং থাকবেই। সেই ক্ষোভ বিক্ষোভের লক্ষ্য থাকে সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নীতিমালা এবং কর্মকাণ্ডের বিরোধীতা করাই। সংশ্লিষ্ট দলের নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ ইত্যাদি। কারণ দৈন্দিন জীবন যাপনের সাথে বিষয়গুলি সংশ্লিষ্ট। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের নানবিধ কর্মকাণ্ড ও নীতিমালার বিরুদ্ধেও জন বিক্ষোভ প্রদর্শন গনতন্ত্রেরই অন্যতম অংশ। কিন্তু এই সব কিছুর মূলেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মানুষের উপরে সরকারী কর্মকাণ্ডের নঙর্থক প্রভাব বিদ্যমান। যে প্রভাব ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের মাথাব্যাথার বিষয় নয়। রাজ্যবাসীই সেই বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ঠ। এমনটাই হয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে। এতদিন।

কিন্তু বিগত কয়েক বছরে চিত্রটা অনেকটাই বদলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির পরিকল্পনায়। এবং সমগ্র পরিকল্পনার স্ক্রিপ্টই রচিত হচ্ছে রাজ্যের বাইরে থেকে। পশ্চিমবঙ্গ তথা বাংলা ও বাঙালির একটি স্বতন্ত্র অস্তিত, সত্তা এবং সংস্কৃতি বর্তমান। যে সংস্কৃতি উত্তর ভারতীয় গোবলয়ের সংস্কৃতির থেকে সম্পূর্ণত ভিন্নধর্মী। ভিন্ন প্রকৃতির। আমাদের এই স্বাতন্ত্রই আমাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। কিন্তু এবারে সুপরিকল্পিত আঘাতটা আসছে সেই স্বতন্ত্র সত্তার উপরেই। সেই আঘাতের সূত্রপাতই হলো রাজ্য রাজনীতিতে গোবলয়ের সংস্কৃতির আমদানী করা। আমাদের মনে রাখতে হবে রাজ্যবাসীর মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি কিন্তু অবাঙালি জনজাতি। যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। আর সেটিই হচ্ছে গোবলেয়র রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমদানী করে নিয়ে আসার প্রধান অনুঘটক। ভাষা ও সংস্খৃতির সমানধর্মীতার কারণে খুব সহজেই ভিন রাজ্যের বাসিন্দারা রাজ্যবাসীর এই এক তৃতীয়াংশের মতো জনজাতির সাথে মিশে যেতে পারে। বাইরে থেকে বোঝা দায়, কে রাজ্যের বাসিন্দা। আর কে ভিন রাজ্যের ভাড়াটে রাজনৈতিক কর্মী। এবং এই ভিনরাজ্যের ভাড়াটে রাজনৈতিক কর্মীদের সহায়তা নিয়ে রাজ্যবাসীর এক তৃতীয়াংশের বেশি অবাঙালিকে পাশে নিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরী করা শুরু হয়ে গিয়েছে। যে সমীকরণে যত বেশি পরিমাণে বাঙালিকে সংযুক্ত করা যাবে তত সফল হয়ে উঠবে নির্দিষ্ট পরিকাল্পনা মাফিক রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা দখল করা। সেটিই পাখির চোখ এখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের। আমাদের বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য নিজের পায়ে কুড়াল মারা। ফলে রাজ্যের বাইরে বসে তৈরী করা যে স্ক্রিপ্টের দৌলতে পশ্চিমবঙ্গে গোবলয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমদানী করা হচ্ছে, বাঙালির একটি অংশ আগ বাড়িয়ে সেই স্ক্রিপ্টের সফল রূপায়নে কাঁধ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাঙালির ধর্মই তাই। এই আত্মঘাতী চরিত্রের কারণেই আজ বাংলা একধিক টুকরোয় বিভক্ত। বাংলার জমি ঢুকে গিয়েছে বিহার ঝাড়খণ্ড উড়িষ্যা ও আসামে। বাঙালি নির্বিকার। অবশিষ্ট ভুখণ্ডকে দুই ভাগ করে দিয়ে মাঝখানে কাঁটাতার বসিয়ে পরস্পর বিদেশী সেজে তোফা আনন্দে মশগুল আমরা। এদিকে রাজ্য রাজনীতিতে ভিনরাজ্যের অবাঙালিদের দাপট প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। আমরা বাঙালিরাই তাতে মদত দিচ্ছি বেশি করে। সেদিনের মীরজাফরের ব্রিটিশভক্তির মতো।

এবং ভিন রাজ্যের এই ভাড়াটে সৈনিকদের মাধ্যমে গোবলয়ের রজানীতির আরও একটি সংস্কৃতি আমদানী করা হচ্ছে। অত্যন্ত সচেতন ভাবেই। সেটি হলে অস্ত্র মিছিলের রাজনীতি। রাজনৈতিক বিক্ষোভ সমাবেশে বিশেষ গুণ্ডাবাহিনী থেকে শুরু করে ভাড়াটে রাজনৈতিক কর্মীদের কোমরে আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে খুনোখুনির ঘটনা নতুন নয়। নতুন হলো রাজনৈতিক মিছিলে জনসমাবেশে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের কোমরে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি। বিষয়টি ভয়াবহ। আরও ভয়াবহ এই কারণে যে সেই ঘটনার পক্ষ নিয়েই ওকালতি করে চলেছে বিশেষ রাজনৈতিক শিবির। এর ফল কিন্তু মারাত্মক। বাকি রাজনৈতিক দলগুলিও যে এই অন্যায় পথে পা বাড়াবে না, তার নিশ্চয়তা কি? ফলে এ এক নতুন প্রতিযেগিতার সম্মুখীন রাজ্য রাজনীতি। কোন দলের নেতা কর্মীদের হাতে কত বেশি আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে। সেই সমীকরণেই ঠিক হবে কোন দলের মিছিল বা জনসমাবেশের গুরুত্ব কত বেশি। এটি বাঙালির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল না কোনকালেই। কিন্তু গোবলয়ের আধিপত্যের হাত ধরে রাজ্য রাজনীতিতে এই অসুখ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতবেগে। কথায় বলে ভয়ে ভীতিতে ভক্তি। গোবলয়ের রাজনীতির সেটিই অন্যতম সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিই কি তবে রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যত গতিপথ ঠিক করে দেবে?

হ্যাঁ একথা অবশ্যই সত্য যে, রাজ্য রাজনীতিতে দুর্বিত্তের সংযোগ নতুন কোন ঘটনা নয়। সব রাজনৈতিক দলই দুর্বৃত্তদের শেষ আশ্রয় এবং প্রথম ভরসাস্থল। রাজনৈতিক গুণ্ডামী এখন একটি পেশা। বহু বাঙালি যুবকই এই পেশার সাথে জড়িত। কালো টাকা সাদা করার মতোনই গুণ্ডা বদমায়েশ দুর্বৃত্ত সমাজবিরোধীরা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠতে উঠতে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে একবার জনপ্রতিনিধির তকমা পেয়ে গেলেই কেল্লাফতে। বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীরই অতীত এইভাবেই গড়ে উঠেছে। এটা এরাজ্যের বহুকাল আগের সংস্কৃতি। তবুও এই সংখ্যাটি রাজ্য রাজনীতিতে কোনদিনই কোনভাবেই নির্ণায়ক ভুমিকা নিতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলি ভোট দখলের স্বার্থে এই শ্রেণীর নেতাকর্মীদের ব্যাবহার করে থাকে। কিন্তু দলের নীতিনির্ধারণে মতাদর্শ নির্মাণে এদের কোন ভুমিকা থাকতো না। কিন্তু গোবলয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এরাই রাজনীতির শেষকথা। আমাদের রাজ্যেও সেই শেষকথা বলার সংস্কৃতিই কি তবে শুরু হতে চলেছে? অন্তত সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে লক্ষ্য রাখলে সেই ভয় হওয়াই স্বাভাবিক।

ফলে যেকোন সচেতন রাজ্যবাসীই আজ বেশ আতঙ্কগ্রস্ত। এ কোন সংস্কৃতির খপ্পরে পড়লাম আমরা। যেখানে রাজনৈতিক মিছিলে তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র থাকাটাই বৈধতা পেতে চলেছে দিনে দিনে? এখন থেকে আর লুকিয়ে নয়। জনসমাবেশ মিটিং মিছিলে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে হবে। আরও দেখতে হতে পারে, বিভিন্ন রাজনৈতিক অক্ষের ভিতর অস্ত্র প্রতিযোগিতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

ফলে সাম্প্রতিক রাজনীতির গতি প্রকৃতির এই নতুন দুইটি দিকই কিন্তু ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে আমাদেরকে। ভিন রাজ্য থেকে ভাড়াটে রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিয়ে এসে রাজনৈতিক আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি। এমনিতেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বেচাকেনার গোবলয়ের সংস্কৃতি চালু হয়ে গিয়েছে আমাদের রাজ্যেও প্রায় এক দশক হল। ফলে রাজ্য রাজনীতিতে অর্থবল এবং বাহুবলই এখন শেষ কথা বলবে। জনসাধারণ ভয়ে ভীতে সেই বাহুবলী শক্তিকেই ক্ষমতায় নিয়ে আসবে বলে বিশ্বাসী আজকের বিশেষ রাজনৈতিক শক্তি। যারা পশ্চিমবঙ্গে শুধুই যে গোবলয়ের রাজনীতি আমদানী করছেন তাই নয়। গোটা পশ্চিমবঙ্গকেই গোবলয়ের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছেন এক পা এক পা করে।

কিন্তু বাঙালি কি সত্যই জেগে উঠবে কোনদিন? না কি এইভাবেই দিবানিদ্রা দিয়ে খাল কেটে কুমীর নিয়ে আসতে থাকবে। একজন মীরজাফর খাল কেটে যে কুমীর নিয়ে এসেছিল। তাতেই বাংলার জমি চলে গিয়েছে বিহার ঝাড়খণ্ড উড়িষ্যা আর আসামে। অবশিষ্ট অংশ ভাগ হয়ে গিয়েছে পরস্পর বিদেশী সেজে। আজ আর অখণ্ড বাংলার কোন অস্তিত্বই নাই। গড়ে ওঠেনি সার্বভৌম বাঙালি জাতিসত্তা। এই সব কিছুর মূল অনুঘটক পলাশীর প্রান্তরের সেই মীরজাফর। আর আজ বাংলার রাজনৈতিক প্রান্তরে গোবলয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে যারা খাল কেটে নিয়ে আসছেন, তারা কি চান বাংলা ও বাঙালির শেষ চিহ্নটুকুও বিলীন হয়ে যাক? পশ্চিমবঙ্গ বিলীন হয়ে যাক গোবলয়ে। মহিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের পেটে।

১৭ই অক্টোবর’ ২০২০
Read More »

শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২০

শনির বচন

5 | অক্টোবর ১০, ২০২০ | |

আসুন মৃতদেহ নিয়ে ভোট কুড়াতে যাই। আমাদের রাজ্যে এই কৌশলটি বহু ব্যবহারেও আজও ভোঁতা হয়ে যায় নি। বরং দিনে দিনে ধারে ও ভারে এর ওজন ও কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছে বই কি।

আসুন মৃতদেহ নিয়ে ভোট কুড়াতে যাই। আমাদের রাজ্যে এই কৌশলটি বহু ব্যবহারেও আজও ভোঁতা হয়ে যায় নি। বরং দিনে দিনে ধারে ও ভারে এর ওজন ও কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছে বই কি। যে কোন খুন ধর্ষণ হোক না কেন। একবার একটা ডেডবডি বাগিয়ে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। তারপরে ডেডবডি যদি কোন রাজনৈতিক দলের দলীয় সম্পত্তি হয় তো কথাই নাই। ডেডবডির মালিক জীবদ্দশায় কতজনের ডেডবডি ফেলে দিয়েছিলেন কি দেন নি। সেটা কোন বড়ো কথা নয়। বড় কথা রাজনৈতিক পথ অবরোধে নিজ দলের ডেডবডি’র মতোন অস্ত্র ভারতীয় গণতন্ত্রে খুব কমই আছে। এমনকি ডেডবডি যদি নিজ দলের দলীয় সম্পত্তি নাও হয়। তাহলেও অসুবিধা নাই। শুধু যে কোন একটা ডেডবডি হাইজ্যাক করতে পারলেই হয়। তাহলেই রেলের চাকা বাসের চাকা থামিয়ে দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। রাজনৈতিক শক্তির কার্যকারিতা। মানুষের মনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সব কিছু ওলোট পালোট করে দেওয়ার ক্ষমতার বিষয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণার সঞ্চার হবে। ভয়ে ভীতে সমীহ আদায়ের যে ফর্মুলায় ভারতীয় উপমহাদেশের গণতন্ত্র টিকে থাকে। সেটিও দৃঢ় হবে। পরবর্তী বা আসন্ন নির্বাচনে অধিকতর ভোট নিশ্চিত করতে এই ডেডবডি নিয়ে রাজনীতি অধিকাংশ সময়েই সফল হয়ে ওঠে। শুধু ডেডবডি পাওয়াটাই আসল কথা। 

বিয়াল্লিশ জন ‌জওয়ানের ডেডবডি কেমন নিরঙ্কুশ জয় এনে দিল একটি নির্দিষ্ট রজনৈতিক শক্তিকে। সেটা দেখে ভারতবাসী মাত্রেই ভারতীয় গণতন্ত্রে ডেডবডির বিপুল কার্যকারিতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ফলে পথেঘাটে যখন তখন রাজনৈতিক দলের পতাকায় আবৃত ডেডবডি নিয়ে পথ অবরোধ, মিছিল মিটিং, ডেববডি বগলদাবা করে ইটবৃষ্টি, টায়ারে অগ্নিসংযোগ, পার্শ্ববর্তী দোকানপাট ভাঙচুর ইত্যাদি প্রতক্ষ্য করতে হয়, হবে আমাদের। তাতে মৃতপ্রায় রোগী অবরুদ্ধ এম্বুলেন্সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লেও বুঝতে হবে। মানতে হবে রাজনীতির রঙিন পতাকায় আবৃত ডেডবডির মূল্য জীবিত কিংবা অসুস্থ মানুষের জীবনের থেকেও অনেক বেশি দামী ও মূল্যবান। ভারতীয় এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে ডেডবডির এ হেন কার্যকারিতা দিনে দিনে অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে। 

ফলে আমাদের দেশের রাজনীতিতে খুন ধর্ষণ যাই হোক না কেন এক বা একাধিক ডেডবডির জন্য অনেকেই হয়তো চাতক পাখির মতো বসে থাকে। রাজনৈতিক আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তুলে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে। শুধু হারানো জমি পুনরুদ্ধারই নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিসর ও শক্তি বাড়িয়ে নিতেও ডেডবডির মূল্য অপরিসীম। অপরিসীম মূল্য সংসদীয় নির্বাচনে জয় হাসিল করতেও। আগেকার দিনে সমাজে প্রতাপশালী নৃপতি নরবলি দিয়ে যেমন তাঁর ক্ষমতার মদমত্ততা রক্ষা ও বিস্তার করতে যাগযজ্ঞ পুজাআচ্চার আয়োজন করতেন। বিষয়টি অনেকটাই সেইরকমই। সেদিনের সেই যাগযজ্ঞ আজ আর নাই। কিন্তু নির্বাচনী যজ্ঞ রয়েছে। সেদিনের নরবলি প্রথা আজ আর নাই। কিন্তু দলীয় পতকায় আবৃত ডেডবডি আজও রয়েছে। ফলে ভারতবর্ষ রয়েছে ভারতেই। শুধু সময় সুযোগ মতো এক বা একাধিক ডেডবডি জোগার করে ফেলতে পারলেই হলো। প্রয়োজনে ডেডবডি হাইজ্যাক করতে হলেও পিছুপা হলে চলবে না। রাজ্যরাজনীতিতেও এই ডেডবডি হাইজ্যাকের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এবং অনেক সময়েই একই ডেডবডি দিয়ে যুযুধান দুই রাজনৈতিক পক্ষের ভিতর লড়াই কাজিয়াও লেগে যায়। এ বলে আমার দলের ডেডবডি। ও বলে ওর দলের ডেডবডি। জীবিত মানুষের মূল্যের থেকেও তখন ডেডবডির মূল্য নিলামে চড়ে বাড়তে থাকে। এটাই তো গণতন্ত্রের মহিমা। 

আসলে মুশকিলটা হয়েছে গোড়াতেই। ইউরোপে গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল সমাজদেহের অভ্যন্তর থেকেই। বাইরে থেকে রাষ্ট্রূীয় ক্ষমতায় তাকে সমাজের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। সমাজ উপলব্ধি করেছিল ক্ষমতাশালী নানান গোষ্ঠীর পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের যাঁতাকল থেকে জনগণের মুক্তির একটিই পথ। সেটি গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। ফলে সেখানে গণতন্ত্র আর নির্বাচন। রাজনীতি আর ভোট সমার্থক নয়। গণতন্ত্র সেখানে জীবনযাপনের একটি সামাজিক পদ্ধতি। রাষ্ট্র সেই পদ্ধতির রক্ষক মাত্র। তাই সেই সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ভালোমন্দ সুরক্ষা নিরাপত্তা সমৃদ্ধি ও বিকাশের বিষয়গুলি দেখাশোনা করার দায়িত্ব ও কর্তব্যই রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। এই কারণেই ইউরোপ আমেরিকায় গণতন্ত্র মানুষের বিকাশ ও সমৃদ্ধির রাজপথ। 

কিন্তু গোড়ায় গণ্ডগোল। আমাদের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তর থেকে গণতন্ত্রের জন্ম হয় নি। সাগর পারের কমিউনিজমের মতোই ডেমোক্রেসিও সাগর পারেরই। একদমই ভারতী সংস্কৃতিজাত নয়। সেই সাগর পারের ডেমোক্রেসি জোর করে বলপূর্বক আমাদের সমাজের উপরে চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশ। ফলে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে দেশের সমান্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে সামিল হয়েছে। আর পাইক বরকন্দাজের বদলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতা দখলের এক মাত্র পথ ঐ বাহুবলে বুদ্ধিবলে প্রচার অপপ্রচারের শক্তিতে ভোট ক্যাপচারের মাধ্যমেই। রাজনৈতিক নীতি নৈতিকতার বদলে ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতিই যখন মূল চালিকা শক্তি। এবং রজকোষের উপরে প্রভুত্ব করাই যখন মূল উদ্দেশ্য। তখন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ডেডবডির মতো বন্ধু আর কে আছে। তাই একটা পুলওয়ামা একটা গোটা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত করে দিতে পারে। এই কারণেই আসন্ন রাজ্য নির্বাচনের আগে যে দল যতগুলি ডেডবডি হাইজ্যাক করতে পারবে, সেই দলই নির্বাচনী লড়াইয়ে ভোটের ময়দানে এডভান্টেজ পাবে তত বেশি। 

যত বেশি ডেডবডি। তত বেশি গণ্ডগোল পাকানোর সুবিধা। তত বেশি ভাঙচুর অবরোধ ইটপাটকেল বৃষ্টি অগ্নি সংযোগের সুযোগ। তত বেশ‌ি বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের বিরুদ্ধে প্রচার অপপ্রচারের দামামা বাজানোর পথ খুলে যাওয়া। তত বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ তুলে জনগণের সমবেদনা জোগারের অজুহাত। এই যে একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির জন্মের আসল কারণটাই হলো, যে গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে এই সংস্কৃতির জন্ম। সেই গণতন্ত্রের জন্ম আমাদের সমাজ জাত নয়। এবং আমরা সেচ্ছায় এই গণতন্ত্রকে দত্তকও নিই নি। আমাদের উপর জোর করে এই তন্ত্রটিকে চাপিয়ে দেওয়ায়, আমাদের দেশের ক্ষমতালোভী সামন্ততান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলির পোয়াবারো হয়েছে। ব্রিটেশের ছেড়ে যাওয়া গদিতে এরা পালা করে বসে গোটা দেশ জুড়ে শোষণ কার্য চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সেই প্রাক ব্রিটিশ যুগের সামন্ততন্ত্রের মতোই। সামন্ত রাজাদের জায়গা নিয়েছে আজকের সাংসদ বিধায়করা। তাদের পিছনে দলীয় নেতাকর্মী। আর তাদের ডান হাত শিল্পপতিরা। বাম হাত ধর্মগুরু সহ ধর্মের ঠিকাদাররা। এটাই ভারতীয় ইউনিক গণতন্ত্র। 

আমার আপনার ডেডবডির কোন মূল্য থাকুক আর নাই থাকুক। রাজনৈতিক শিবিরের হাইজ্যাক করা ডেডবডির মূল্য এক বা একাধিক লোকসভা কিংবা বিধানসভার আসন জয়ের সমতুল্য। না ইউরোপ আমেরিকা সহ প্রথম বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্রের চেহারা এমন বীভৎস নয়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের যে দেশেই গণতন্ত্র। সেই দেশেরই এটাই আসল চেহারা। এই নগ্ন বীভৎস গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতেই আমরা বাধ্য। বাধ্য আমাদের সাংবিধানিক অধিকার বলে প্রাপ্ত দায়িত্বেই। এবং আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই বীভৎস ও বেআব্রু চেহারার কারণেই দেশের উজ্জ্বল মেধাবী তরুণ তরুণীরা প্রজন্মের প্রজন্মে ধরে রাজনীতির আঙিনা থেকে নিজেদেরকে শতহস্ত দূরে রেখেছে। আর সেই ফাঁক পুরণ করতেই অশিক্ষিত মূর্খ কিন্তু ধুর্ত ও চালাক অসাধু ও অসৎ মাস্তান ও দুর্বিত্তরা বেশি করে রাজনীতির আশ্রয়ে থেকে নিজেদের সকল দুর্নীতিকে সুরক্ষিত রাখার রাজনীতি করে চলেছে। দেশের সংবিধানকেই হাতিয়ার করে। এটি আরও চমকপ্রদ বিষয়। আর আমাদেরকে সেই সংবিধান দেখিয়েই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে তাদেরকেই নির্বাচিত করে রাজকোষ লুঠ করার অধিকার অর্জনের জন্য নির্বাচিত করতে বাধ্য করা হচ্ছে দিনের পর দিন। দশকের পর দশক। আমরা ভোটের আগে ডেডবডি নিয়ে রাজনৈতিক নৃত্যকলা দেখতে থাকবো। আর যত বেশি ডেডবডি তত বেশি উজার করে ভোট দিয়ে কালসর্প ঢুকিয়ে নিয়ে আসব ক্ষমতার অলিন্দে। এই পথেই এগিয়ে চলেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্য। 

১০ই অক্টোবর’ ২০২০


Read More »

শনিবার, অক্টোবর ০৩, ২০২০

শনির বচন

sobdermichil | অক্টোবর ০৩, ২০২০ |

ভিড়ের চাপ

অবশেষে আদালতের রায়ে ঘটনার আঠাশ বছর পর জানা গেল, জনতার ভিড়ের চাপে ধুলিস্মাৎ হয়েছিল পাঁচশ বছরের প্রাচীন বাবরি মসজিদ। আঠাশ বছর আগের লাইভ টেলিকাস্টে টিভির পর্দায় আপনি কি দেখেছিলেন ভুলে যেতে হবে আপনাকে সেই কথা। আদালতের রায়ই চূড়ান্ত। এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমি আপনি সেই রায় শিরোধার্য করে মাথায় তুলে নাচতে বাধ্য। আমরা মানতে বাধ্য, পাঁচশ বছর ধরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা বাবরি মসজিদ শুধু ভিড়ের চাপেই তলিয়ে গেল। ভারতীয় নাগরিকদের ভিড়ের চাপের এত শক্তি! সত্যই জানা ছিল না কোন ভারতবাসীর। কিন্তু ভারতীয় জনতার ভিড়ের চাপের এমন কার্যকারিতা জেনে অন্তরে সত্যিই পুলক সঞ্চার হচ্ছে বইকি। পুলকিত হচ্ছেন সেই সব ব্যক্তিবর্গও যাঁরা সেইদিন মস্ত বড়ো বড়ো হাতুরী শাবল গাঁইতি নিয়ে পাথর কাটার সরঞ্জাম নিয়ে জনতার ভিড়ের চাপের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। আর পুলকিত হচ্ছেন ঘটনার মূল কুশীলব বেকসুর খালাস হওয়া বত্রিশ জন জীবিত নেতানেত্রী। এমন একটা মহাভারতীয় ভিড়ের চাপের স্রষ্টা হিসাবে ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে শত শত শতাব্দী। বাবরি মসজিদ আজ আর দেখা যায় না। কিন্তু অযোধ্যার ইতিহাসে বাবরি মসজিদ চিরস্থায়ী হয়ে রইবে সন্দেহ নাই। 

বহুদিন আগের, শ্রদ্ধেয় তপন সিংহের একটি সিনেমার সংলাপ আজ প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছে। এইখানেই প্রতিভাধর শিল্পস্রষ্টাদের শ্রেষ্ঠত্ব। সময় ও সমাজের নাড়ির স্পন্দন টের পান তাঁরা আমাদের অনেক আগেই। সংলাপটা আজ প্রায় সকলেই জানেন, “মাষ্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি”। হাড়হিম করে দেওয়া সেই হুমকি’র অসীম কার্যকারিতা সম্বন্ধে কোন ভারতবাসীরই মনে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। আঠাশ বছর বাদে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় আদালতের রায়ে সেই হুমকি’র সুরই প্রচ্ছন্ন যেন। মসজিদ ধুলিস্মাৎ হয়েছিল জনতার ভিড়ের চাপে। অর্থাৎ আমি আপনি সেদিন লাইভ টেলিকাস্টে কিছুই দেখি নি কিন্তু। আমাদের এই না দেখার উপরেই এখন নির্ভর করতে শুরু করবে আমাদের দেশপ্রেম। এবং হিন্দুত্ব। আমরা কে কতখানি বেশি হিন্দু। সেটি নির্ভর করবে আমরা সেদিনের খবরে কে কতটা কম দেখেছিলাম আসল ঘটনার ছবি। তারই উপর। আর যাঁদের বাড়িতে সেদিন টেলিভিশনের সেট ছিল না। যে প্রজন্ম সেদিন জন্মেছিল না। লোকমুখে শোনা কথায় বিশ্বাস করার দায় নাই তাঁদেরও। লোকশ্রুতিই যে বাস্তব সত্য তার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। জানি আমরা। শুধু আদালতের রায়ে লোকশ্রুতির ভিত্তিতে রামমন্দিরের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব স্বীকৃত হতে পারে। সময় ও সুযোগ বুঝে। শাসকের ইচ্ছা ও অনিচ্ছার উপরে। তার বাইরে লোকশ্রুতির সত্যতা নিশ্চয় কেউ স্বীকার করবো না আমরা। 

ভিড়ের চাপের এই তত্ব ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন একটি যুগের সূচনা করে দিল সন্দেহ নাই। দিল্লীর সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলিম নিধনও নিশ্চয় এই ভিড়ের চাপেই ঘটে গিয়েছিল। পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া। রাজনৈতিক নেতানত্রীদের প্ররোচনা ছাড়াই। ফলে সেই ঘটনাতেও ভিড়ের চাপের এই একই তত্বে বেকসুর খালাস যাবতীয় অভিযুক্ত। অবশ্য যদি তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত হন তবেই। লকডাউন পর্বে হুগলীর তেলেনিপাড়ার বীভৎস দাঙ্গাও নিশ্চয় এই ভিড়ের চাপেই ঘটে গিয়েছিল পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি আগামীতে ভারতবর্ষ জুড়ে এমন ভিড়ের চাপে আরও অনেক কিছুই ধুলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের আবাসগৃহ থেকে শুরু করে প্রাচীন স্থাপত্য ইত্যাদি। বামিয়ানের সেই বৌদ্ধমূর্তি ধ্বংসের মতোই। এবং টিভির পর্দায়, কিংবা নিজের পাড়াতেও আমরা যাই দেখি না কেন। আইন আদালতের রায়ে প্রমাণ হয়ে যেতেই পারে, আমরা কিন্তু কিছুই দেখি নি। 

এই যে আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি’র শাসন। আর তার সাথে জুড়ে ভিড়ের চাপের তত্ব। এই দুই তত্বই আজ ভারতবর্ষ শাসন করছে। না তাই বলে এই কথা ভাবার কোন কারণ নাই, এই শাসনপর্ব একেবারে হাল আমলের ঘটনা। বিশেষ একটি শক্তিই ভারতবর্ষে এই তত্ব আমদানী করেছে। কথায় বলে যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার সময় থেকেই এই তত্ব রাজত্ব শুরু করে দিয়েছিল। স্বাধীনতার নাম দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মূল শর্তগুলি কি ছিল। সেই বিষয়েও আমাদেরকে কিছুই না দেখার শাসনে বেঁধে রাখা হয়েছে সাত দশকের বেশি সময় ব্যাপী। এবং সেই ভিড়ের চাপের তত্বেই আমরা জানতে ও মানতে বাধ্য হয়েছি, স্বাধীনতা এসেছে অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের হাত ধরেই। ভিড়ের চাপের তত্বের মহিমা এমনই অমোঘ ও সুদূর প্রসারী। এই ভিড়ের চাপের তত্ব ও কিছুই না দেখার শাসন চলছে আমার আপনার পাড়া থেকে শুরু করে আমাদের সমাজিক জীবনের প্রতিটি অলিগলি থেকে রাজপথে। এটাই আধুনিক ভারত। আধুনিক ভারতীয় ঐতিহ্য। প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরই সেই ঐতিহ্যের সার্থক উত্তরাধিকারী। কোন একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দিকে আঙুল তুলে নিশ্চিন্তে বসে থাকার উপায় নাই। নতুনত্ব এইটিই  যে, আজ সেই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার আদালতের রায়ে স্বীকৃত হয়ে গেল। যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। 

সারা ভারতে একটি বাবরি মসজিদ থাকলো কি থাকলো না। একজন সাধারণ ভারতবাসীর তাতে বিশেষ কিছুই এসে যায় না। সেইখানে কয়টি রাম মন্দির গজিয়ে উঠবে কি উঠবে না। তাতেও সাধারণ ভারতবাসীর কিছুই এসে যায় না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হাতের নাগালের বাইরে বেড়িয়ে যাওয়া। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসতে থাকা। এবং অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ঘনীভুত সঙ্কটের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় বাবরি মসজিদ রামমন্দির। এবং নয় বলেই লক্ষ্য করে দেখতে হবে, ২০১৯ এর নভেম্বরে রামমন্দির নির্মাণের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কোন গণআন্দোলন সংঘটিত হয় নি। কিন্তু পরের মাসেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে গোটা ভারত কেঁপে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভে। যেকোন শাসকের কাছেই এই বিষয়টি বিপদজনক। যে কোন শাসকই চাইবে এই বিপদ থেকে যে কোন উপায়ে নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে। আর সেই গদি টিকিয়ে রাখার জন্য এই ভিড়ের চাপের তত্ব এবং আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’র শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইটি হাতিয়ার। তাই বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার এই রায় এতটা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। ঐতিহাসিক এই কারণেই যে শাসকের গদি রক্ষার অন্যতম একটি হাতিয়ার “ভিড়ের চাপ” -কেই আদালত আইনী স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলো। ফলে, যে যেখানে শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত। আদালতের এই রায় তাদের কাছে অন্যতম রক্ষাকবচ হয়ে উঠবে। উঠলো। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শ রাজনৈতিক স্বার্থ ও উদ্দেশ্য নির্বিশেষে এই রায় ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরের কাছেই মেঘ না চাইতেই জলের মতোন এক অমোঘ আশীর্বাদ। ফলে আমাকে আপনাকে মাথা পেতে আদালতের রায়কে মেনে নিয়ে ভিড়ের চাপের তত্বকেও স্বীকার করে নিতে হবে। এবং কিছুই না দেখতে পাওয়ার শাসনকেও শিরোধার্য করে নিয়ে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা তত্বকেই আঁকড়িয়ে ধরতে হবে। যস্মিন দেশে যদাচার কাছা খুলে নদী পার। 

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, কোন ঘটনাই শেষ কথা নয়। ভিড়ের চাপের এই তত্বের উপরেই বিশ্বের নানা প্রান্তের স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান ঘটেছে। বারবার। ইতিহাসের অভিমুখে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো সমস্ত স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির আঁতুর ঘরই ছিল এই ভিড়ের চাপের তত্ব। এক এক দেশে এক এক সময়ে সুযোগ মতো সেই আঁতুর ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন এক একজন মুসোলিনী হিটলার প্রভৃতি। কিন্তু সেই ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃত ভিড়ের চাপ কাকে বলে। সেই ইতিহাসই সাক্ষী, আর এক ভিড়ের চাপে মুসোলিনীর শেষ পরিণতি। সেই ভিড়ের চাপেই আফিমখোর চীনের ভাগ্য বদলিয়ে গিয়েছিল ঐতিহাসিক লংমার্চে। সেই ভিড়ের চাপেই সম্ভব হয়েছিল দুনিয়া কাঁপানো রুশ বিপ্লবের। তারও অনেক আগে সেই ভিড়ের চাপেই পতন হয়েছিল বাস্তিল দূর্গের। 

না সেই ভিড়ের চাপকে ভয় করে না এমন কোন স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির জন্ম হয় নি আজও। হয় নি বলেই সব স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিকেই ভয় ভয় দিন কাটাতে হয়। প্রকৃত ভিড়ের চাপ যেন দানা না বাঁধতে পারে। প্রকৃত ভিড়ের চাপকে ঠেকিয়ে রাখার নামই আবার সংসদীয় রাজনীতি। গণতান্ত্রিক পরিসরে জনগণকে বিভ্রান্ত বিচ্ছিন্ন এবং বিকল করে রাখার জন্যই ‘আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি’ এর কঠোর শাসন। আদালতের রায় দিয়েই হোক আর পুলিশ কিংবা মিলিটারীর বন্দুক দিয়েই হোক। নিদেন পক্ষে ভিড়ের চাপের তত্ব খাড়া করেই হোক। যে তত্বে বাবরি মসজিদ ধুলিস্মাৎ হয়ে যায়। দিল্লী জ্বলে ওঠে। তেলেনিপাড়া পুড়তে থাকে। 

■ কপিরাইট লেখককর্তৃক সংরক্ষিত


Read More »

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০১, ২০২০

চিত্রাভানু সেনগুপ্ত

sobdermichil | অক্টোবর ০১, ২০২০ |

বসন্ত আমার নয়

।।পর্ব_১।।  মাতলা নদীর কোলে সবুজে ঘেরা ছোট্ট একফালি গ্রাম বুধখালি। এই গাঁয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রামকানাই মল্লিককে একডাকে চেনেনা এমন মানুষ মেলা ভার।​ বিদ্যায়-বুদ্ধিতে রামকানাইয়ের জোর কতটা সেকথা সঠিকভাবে সকলের জানা না থাকলেও আপদে বিপদে মানুষ এককথায় রামকানাই ডাক্তারের টোটকা পুরিয়া দিয়ে দিব্যি কাজ চালিয়ে নেয়। ছোটখাটো জ্বরজারি, পেটের ব্যামো, ব্যথা-বেদনা এসব রোগে গাঁয়ের মানুষ চোখ বুজে রামকানাইকেই ভরসা করে। গায়ের একটু দূরে একটা ছোট্ট ডাক্তারখানা আছে অবশ্যি, সেখানে এক নামকরা এলোপ্যাথি​ ডাক্তার বসেন, তবে তাঁর দক্ষিণাও বেশ অনেক.... পঞ্চাশ টাকা। সেখানে কানাই ডাক্তারকে দশ-বিশ যে যা ঠেকায় তাই দিয়েই হোমিওপ্যাথিক পুরিয়া দিয়ে দেয়। গায়ের সক্কলে জানে কানাই ডাক্তারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। বাপ ঠাকুরদার অর্জিত পৈত্রিক সম্পত্তি নিতান্তই কম নয়।​ কত গরীব দুঃখী মানুষকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ওষুধ দেবার সময় হাতে আবার কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন...." শুধু ওষুধ খেলে কাজ হয় কখনো? সাথে খাবার খাতি হবে।"​ গায়ের মানুষ সম্ভ্রমে মাথা নোয়ায় রামকানাইয়ের সামনে।​

​ডাক্তারের দুইটি সন্তান, পবিত্র আর সরোজিনী।​ পবিত্র অনেক চেষ্টা করেও মাধ্যমিকে দুইবার অকৃতকার্য হয়ে এখন পৈত্রিক জমিতে টুকটাক চাষাবাদ আর একটা ছোট্ট মুদির দোকান খুলেছে। ধারদেনা করে একটা ছোটখাটো ভটভটিও কিনে ফেলেছে। সপ্তাহে একদিন চাষের সবজি নিয়ে কলকাতায় যায়। বাপের হোমিওপ্যাথি পুরিয়াতে তার মন বসেনা। সরোজিনী পবিত্রর থেকে বছর চারেকের ছোট, তাতে আবার পাশ দিয়েছে বড় ভাইয়ের থেকে একটা বেশি। মাধ্যমিক টপকেছে, উচ্চমাধ্যমিক অবধি গিয়ে ইংরাজিটা সামাল দিতে পারেনি। বাবা বলেছেন...."ঠিইক পারবি। সামনের বছর মন লাগিয়ে চেষ্টা কর, আর খালি ঘরে বসে কি করবি? আমার সাথে কাজ কর, কম্পাউন্ডারিটা শিখে নে। তোর দাদা তো আর আমার ধারা রাখলো না। তুই অন্ততঃ রাখ। আমারও তো বয়স হয়েছে। সরোজ এখন দিন-রাত রোগীর ওষুধ দেওয়া, প্রেসার মাপা, ইঞ্জেকশন দেওয়া শিখছে। সকালে সদর থেকে আসা নতুন ওষুধের বান্ডিলের সাথে তালিকা মিলিয়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখছে কাঠের আলমারিতে। ঘরের পেছনের বাগান পেরিয়ে ছুটে এসে জানালার শিক ধরে জোরে ডেকে উঠলো ছোট্ট দশ বছরের বালক কালি......

__সরোজু দিদিই...সরোজু দিদি আছো?"

__"ওওমা! কালি , এতো হাঁপাচ্ছিস কেন?"

__"তাড়াতাড়ি চলো গো সরোজু দিদি, রেণু দিদি ডাকছে।"

__"কেন রে?"

__"সে তো বে' করে বৌ নে আসচে গো দিদি।"

সরোজ হেসে বললো....."কে রে? কে আবার বে' করলো?"

__"গোবিন্দ দাদা গো!"

হাত কেঁপে উঠলো সরোজের।​ অবিশ্বাসের সুরে, কাঁপা গলায়​ জিজ্ঞাসা করল...."ক্কে? ক্কার কথা বললি? কোন গোবিন্দ?"

__"আমাদের গোবিন্দ দাদা গো। লাল টুকটুকে শাড়ি পরা ডাগর বৌ নে' এসে নেমেছে ফেরি ঘাটে। সবাই দেখতে গেছে গো। তুমি যাবেনা?"

হাতের শিশি দুটো ফেলে দিয়ে​ বাড়ির পেছনের কলা বাগানটা পেরিয়ে , সরু মেঠো রাস্তা ফেলে বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে সিধে দৌড়ে খানিক এগিয়েই দেখতে পেল, ওওই দূরে ইট বাঁধানো পথের উপর দিয়ে একখানা পেল্লায় টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে এগিয়ে চলেছে গোবিন্দ। তার সাথে পা মিলিয়ে লাজুক চালে হেঁটে চলেছে এক নববিবাহিতা বধূ। লাল চেলিতে​ ঢাকা​ মুখের আড়ালে লুকানো চোখদুটো দিয়ে পথ চলতে পিছিয়ে পড়ছে কখনো। গোবিন্দ মাঝে মধ্যে থামছে , বধূটি কাছে এলেই আবার চলার গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলছে গন্তব্যে। সারা গায়ের বৌ-ঝিয়েরা জড়ো হয়ে এগোচ্ছে পিছু পিছু। ওরা বৌ দেখতে এসেছি নাকি তামাশা বোঝা ভার।

​রূপার নুপূর যেন বেড়ি হয়ে আঁকড়ে ধরলো সরোজুর আড়ষ্ট পদযুগল। শরীরটা অকস্মাৎ বেশ অবশ হয়ে চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সব। হৃদয়ের অন্তঃকোনে অতর্কিতে কোথা থেকে এক তুফান আছড়ে পড়ে তোলপাড় করে দিচ্ছে, এক মুহুর্তে ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত করে তুলছে জীবনের সকল স্বপ্ন, দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে সব ভাবনাচিন্তা আর চাহিদাগুলো। হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো,​ মাটিতে বসে পড়লো সরোজু। ছোট্ট কালি ভিড় লক্ষ্য করে খানিক এগিয়ে গিয়ে আবার পেছনে ফিরলো।

__"ও দি, কি হল ? যাবেনা বউ দেখতে?​

__"না,"

__"তবে আমি যাই?"

__"হু" (মাথা নাড়লো সরজু) ।

সরোজুর মুখের সামনে উবু হয়ে বসলো কালি।​

__" কি হয়েছে দি? শরীর খারাপ?"

বাঁশের ঝাড়ে ভর দিয়ে কোনমতে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালো সরোজু। পেছন ফিরে বাঁশবন পেরিয়ে​ হেঁটে চলল গায়ের পেছনে ভাঙাচোরা মন্দিরের দিকে।

​ ​ওদিকটা বেশ বুনো ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা।​ খুব একটা জন মানবের আনাগোনা থাকেনা সেদিকে। মন্দরটি বহু সেকেলে আর জরাজীর্ণ, আজ কোন বিগ্রহের অস্তিত্বও নেই সেখানে। বহুদিন পরিত্যাক্ত হওয়ায় আজ সে স্থান ক্রমে ডেঁয়ো ইঁদুর আর বিষধর সাপ খোপের ডেরায় পরিনত হয়েছে। কালি চেঁচিয়ে​ ​ বলল.....

__"কোতায় যাও দি? মন্দিরে? ওখেনে সাপ আচে.....এই এত্তো বড়!! হাঁ করে মানুষ গিলে খায়!! মা ওকানে যেতে না করেছে।"

সরোজ হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে মাটির থেকে একটা ঢিল তুলে ছুঁড়ে মারলো কালির দিকে।

__ " যাহঃ, যা বলছি! খবরদার বেশি জ্যেঠামো করবি না। তুই বৌ দেখ গে যা!"

কালি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো সরোজের দিকে। এমন নিরিহ ভালো মানুষ দিদির হঠাৎ এমন উগ্র আচরণ, কই আগে তো কখনো তার চোখে পড়েনি? চুপ করে চেয়ে রইল সরোজুর যাত্রা পথের দিকে। সম্বিত ফিরে পেলো সরোজিনী,​ শান্ত গলায় ডেকে বলল.....

__" কালি, শোন!......আমি যে মন্দিরে যাচ্ছি কাউকে জানাস না, কেমন! "

__" কাউকে না? রেণু দিদিকেও না?"

__"কাউকে না বুঝলি?"

কালি নত শির নেড়ে বলল..."আচ্ছা।"

শিথিল পায়ে ধীরে ধীরে মন্দির প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালো সরোজ। মন্দির না বলে তাকে ভগ্নস্তুপই বলা ভালো।​ লোনা ধরা দেওয়ালে শিকড় বিছিয়ে আশ্রয় করেছে অশ্বত্থ এবং আরো নানান নাম না জানা জংলা উদ্ভিদ। দেওয়ালে ধরেছে বড় বড় ফাটল, কোথাও আবার দেওয়ালটা কেবল সীমানাটুকু ঘিরে তার অস্তিত্ব রক্ষা করে আছে ।

মাথার উপর এক বিরাট পাকুড় গাছের শত সহস্র ঝুড়ির বেষ্টনীতে শিকলের মত বাঁধা পড়েছে পুরাতন দেবলয়খানি। ছাদের একদিকের চির এমন বিপদজনক হয়ে আছে, যে কোন সময় ভেঙে পড়তে পারে। এই মন্দিরের প্রতিটি আধাখন্ড সোপান, প্রতিটি ইটের সঙ্গে সরোজুর​ পরিচিতি বড় গভীর। সেই বিজন আলয়টিতে দেবতার বাস কেবল সরোজুর বিশ্বাসে।​ মন্দিরের মূল ঘরটির পেছনে লাগোয়া একচিলতে ছোট্ট কুঠুরী। একসময় কত নিরালা স্বাচ্ছন্দ প্রহর কেটে গেছে সে ঘরে। কত রঙিন আর স্বপ্নালু ছিল সব দিন। আজো দেওয়ালের উপর জ্বলজ্বল করছে পাশাপাশি দুটি নাম..... সরোজু আর গোবিন্দ।

সিঁড়ির একপাশে বসে মনে মনে বলে উঠলো সরোজু....

__"একি করলে ঠাকুর? কার অপরাধের দায়ে কাকে সাজা শোনালে? তোমার কি চোখে নেই? তুমি পাথর?​ তুমি অন্ধ? এমন করে বিনা দোষে নিজের সন্তানকে দন্ড দিলে?​ এ তোমার কেমন বিচার প্রভু? আজ দেখতে চাই তোমার​ ক্ষমতা। মিথ্যে করে দাও, এসব এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন করে দাও। নাহঃ, আজ আর চোখ খুলবো না আমি, কিছুতেই না।"

সিঁড়ি উপর মাথা ঠুকে বদ্ধ নয়না এক পাষাণ মূর্তির ন্যায় পড়ে রইলো সরোজিনী।

​ ​.......চলবে

■ লেখক পরিচিতি

Read More »
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.