x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

আখতার মাহমুদ

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ |
একটি ইঁদুর বিষয়ক মিথ
আমি সাহানাকে পছন্দ করি কী-না সেটা বলা মুশকিল। যদিও জানি; পছন্দ-মুগ্ধতা-প্রেম শব্দত্রয়ের উৎপত্তির পেছনে আছে কামনা আড়ালের তীব্র চেষ্টা। আপনি যে সংজ্ঞাতেই পছন্দ-মুগ্ধতা-প্রেম আঁকুন না কেন এরা ওই কামনায় গিয়েই থিতু হবে। কামনা- শরীরে। এর বিকল্প কিছু হয় না। আপনি পাখির নীড়ের মত চোখ আর মেঘ কালো চুল দেখে শত কবিতা লিখতে পারেন; সবই কিন্তু কামনার সরাসরি ইঙ্গিত। শরীরের। তবু আপনি অসরাসরি বলেন- পছন্দ-মুগ্ধতা-প্রেম। স্বীকার করতে দ্বিমত করেন চরমভাবেই। আমি আপনার চেয়ে আলাদা এবং সাধারণ নই বলে দ্বিধাহীন স্বীকার করি। কেননা আমি বিশ্বাস করি, শেষতক সব অনর্থক। এই মানবজীবন, একে অনর্থক মহৎ করার চেষ্টা, এই পৃথিবী-মহাবিশ্ব, কবি-কবিতা, সৎ-অসৎ সবই অনর্থক। একদিন সব নাই হয়ে যাবে। তার আগের-পিছের কিছু নিয়ে ভাবার কেউ থাকবে না। আমিও একদিন পঁচে গলে অস্তিত্বহীন হয়ে যাব। আপনিও।

অনেকেই বিশ্বাস করে মৃত্যুতে সব শেষ নয়; মৃত্যু বরং মহাকালের, চিরজীবনের দিকে নতুন যাত্রা। উপলব্দি করি- এসব ভ্রম। বিশ্বাস করি, ঈশ্বর-নিয়তি-শেষবিচার বলে কিছু নেই। তাই, যা আমি চাই চেতনে বা অবচেতনে; তা অস্বীকার কেন করব? মানুষ আমাকে অসৎ বলবে? লোভী বলবে? প্রতারক বলবে? মানবতা-বিবেক বর্জিত বলবে? যখন আপনি বিশ্বাস করেন শেষপর্যন্ত সবই শূন্যতা, সেখানে এসব শুনে আপনার কাজ কী? যখন আপনি নিয়তি-ঈশ্বর অস্বীকার করছেন তখন অসততা-প্রতারণা-মানবতা-বিবেক সার্বজনীন কোনো মানদন্ডেই দাঁড়ায় না। যে যার সুবিধে-বুঝ মত এসবের সংজ্ঞা স্থির করে চলে। আমিও করি।

সাহানা আমার ছাত্রী। একটু ভিন্নরকম ছাত্রী। আমার দুলাভাইয়ের-চাচাত ভাইয়ের-বন্ধুর-শ্যালকের স্ত্রী। স্বামীসমেত অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। তার আগে টুক-টাক ইংরেজি শেখা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিয়ম করে শেখার ধৈর্য সাহানার নেই। তাই প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থা। স্বামীর আবার হাত ছোট। ফলে, কোনো কলেজের প্রভাষক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পন্ডিত শিক্ষকের বদলে বহু হাত ঘুরে এই টিউশনি আমার হাতে। আমি ইংরেজিতে এম.এ পড়ছি। সুতরাং কম পয়সায় আমাকে দিয়ে কোনোরকমে কাজ চালিয়ে নেয়াটা যথার্থ ধরে নিয়েছে তারা। এই ধরণের টিউশনি আরামদায়ক। ছাত্র-ছাত্রীদের পাশ করানোর টার্গেট থাকে না। কোনোরকমে হাই-হ্যালো শিখিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এইসব টিউশনিতে আমি ইংরেজিতে গল্প করি। নিজের দেখা ঘটনাগুলো নিজের মতো করে নিজ বিশ্বাস মিশিয়ে বলি। আমি দেখেছি, এটা কাজে দেয়। ছাত্র-ছাত্রীরাও আগ্রহী হয়ে শোনে।

সাহানাকে পড়াই দুপুরে। উদ্দেশ্য দুটো। এক, এ-সময় তার স্বামী কাজে বাইরে থাকে। দুই, প্রায়শই লাঞ্চ করি এখানে। আমার মতো যারা মেসে থাকে তাদের জন্যে নিয়মিত বিনে পয়সায় দুপুরের লাঞ্চ একটি বিশাল সুযোগ। আর আমি চিরকাল সুযোগের সদ্ব্যবহারকারী। আজ আমার বিখ্যাত ইঁদুরের গল্পটি শুনিয়েছি তাকে। বিখ্যাত; কারণ, এ গল্পটি সবখানেই করি। কেবল একদম শেষে এসে জানাই, গল্পের শেষ দেখা হয়নি; তাই শেষ জানা নেই। শেষটা যে যার মতো ভেবে নেয়। নিজ নিজ বিশ্বাসে ব্যাখ্যা করে। গল্পটি সাধারণ। একটি মৃতুমুখী ইঁদুরের গল্প। কিন্তু গল্পটার আগে এবং পরে আমার মনে বারবার খেলছিল - আমি কী সাহানাকে কামনা করি? 

প্রশ্নটা জটিল। জটিল এ-কারণে যে, সাহানা কথা-বার্তায় বাকপটু না হলেও ওর ব্যক্তিত্বে একরকম শুদ্ধতা আছে। যে শুদ্ধতা আমাকে বোঝায়, সে কারো বৈধ নারী হয়েই সুখি। যদিও অমন সুখের কারণ আমার বোধগম্য না। মনে হয়, এসব ভাণ। শুদ্ধতার-বৈধতার চরম ভাণ। আমি মনে করি; এক-আধটু স্খলন এবং সমাজের চোখে যা পাপ তা বরং সংসার-সুখকে তীব্র করে!

তবে এটুকু বুঝি, সাহানা আমার গল্পগুলো শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে কপালে এসে পড়া চুলের গোছা কানের পেছনে পাঠিয়ে দিতে দিতে চুলের ভাঁজে তুলে রাখে আমার গল্প। নখ খুঁটতে খুঁটতে নখে নখে তুলে রাখে আমার গল্প। কিঞ্চিত-কদাচিত বেসামাল হয়ে পড়া ওড়না সামলাতে সামলাতে ওড়নার ভাঁজে তুলে রাখে আমার গল্প। অবচেতনে। সুদূর ভবিষ্যতের কোনো না কোনো চুল ঠিক করার মুহূর্তে, ওড়না সামলানোর মুহূর্তে কিংবা নখ খুঁটে চলার মুহূর্তে আমার গল্পগুলো বা গল্পাংশ ওর মনে পড়বে। 

তখন কি সে মুচকি হাসবে এটা উপলব্দি করে যে আমার অজস্র গল্পে অজস্র ইঙ্গিত ছিল স্খলনের? ইঁদুরের গল্পটাও কি মনে পড়বে ওর? এ-গল্পেও কি সে স্খলনের ঘ্রাণ খুঁজবে? অথচ এ গল্পটাতেই কেবল ব্যক্তিগত ইঙ্গিত নেই আমার। ব্যাখ্যা হয়তো আছে, কিন্তু ইঙ্গিত-ভাণ-ভন্ডামী কোনোভাবেই না। আচ্ছা নিষ্কলুষ বলেই কি গল্পটা আমি ভালবাসি? সবাইকে বলি? কে জানে! 

গল্পের শেষটা সাহানা নিজের মতো ভেবে নেয়। বলে, ‘আপনি মিথ্যে বলছেন। শেষটা জানেন আপনি। ইঁদুরটা নিশ্চয় বেঁচে গিয়েছিল।’ ‘অলৌকিকভাবে?’
‘হ্যাঁ। অলৌকিকভাবে।’
‘আমাদের পৃথিবীটা লৌকিক। লৌকিক পৃথিবীতে সাধারণ-সহজাত লৌকিক ঘটনাই ঘটবে। যুক্তি এবং আমার সহজাত প্রবণতা বলে, ইঁদুরটা মরবে। পৃথিবীতে অলৌকিক ঘটনা আশা করা অনুচিত।’
‘না! বেঁচে যেতেও তো পারে। কতজন কতভাবে বেঁচে যায়।’ স্তিমিত হয়ে বলে সাহানা।

আমি হাসি। কেবল সাহানা নয়, আমার জানা-শোনা প্রায় সকলেই ধরে নেয় ইঁদুরটা বেঁচে থাকবে। উপলব্দি করি, ইঁদুরটিকে মিথ করে তুলছি দিনকে দিন। হয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন আমার ইঁদুর বিষয়ক গল্প ছড়িয়ে পড়বে সমস্ত পৃথিবীতে। হয়তো গল্পটি পরিচিতি পাবে আদিম কোনো লেখকের নামে। কেউ হয়তো ধারণা করে বসবে এটি আড়ালে রয়ে যাওয়া ঈশপেরই কোনো গল্প। এমনও হতে পারে, ভবিষ্যতের আবেগে ভারাক্রান্ত মানুষেরা আমার গল্পের ইঁদুরকে সংগ্রাম, প্রতিবাদ, মানবতা আর স্থৈর্যের প্রতীক ধরে নিয়ে সেটার ভাস্কর্য বসাবে রাস্তার মোড়ে মোড়ে। তারও অনেক অনেক পরে হয়তো কোনো কোনো মানুষ সেসবকে পূজো করবে শক্তি ও সাম্যর্থের প্রতীক বিবেচনায়। ফুল দেবে, মোমবাতি জ্বালাবে ইঁদুরের পদতলে। এভাবেই মানুষ একে বানিয়ে নেবে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রক্ত-মাংসের মানুষদের এড়িয়ে মানুষেরা সমস্ত মানবিক মমতা, অর্থ, শ্রম ঢেলে দেবে নিষ্প্রাণ পাথরে.... ইঁদুরের মূর্তির গায়ে আঁচড়টি পড়লেও আন্দোলন-প্রতিবাদে উত্তাল হবে অজস্র রাজপথ....

যাই-হোক, যা কিছুই ঘটুক না কেন গল্পটি ডাল-পালা নিয়ে হলেও ছড়িয়ে   পড়ুক। কেননা গল্পটি নিষ্কলুষ এবং এতে ব্যক্তিগত ইঙ্গিত নেই।

সাহানাকে পড়িয়ে বের হয়ে দেখি দুপুরটা ভয়ানক তেজী। আমার গরম মাথা আরো গরম করে দেয় দুপুরটা। আজ লাঞ্চ সাধেনি সাহানা। হয়তো ইঁদুরের গল্প একটু বেশিই কাতর করেছিল, তাই সাধারণ ভদ্রতাবোধও ছেড়ে গিয়েছে তাকে। এখান থেকে মিনিট দশেকের দুরত্ব আমার মেসের। এল-এর মত শেইপে প্রতিদিন এখান থেকে হেঁটে যাই। মাঝপথে একটা এতিম রেলক্রসিং। ওটা পেরুলে পিচ্চি কামালের চায়ের দোকান। আমার চায়ের একমাত্র যোগানদাতা। ঘরে শুয়ে ফোন দিলেও কামাল দ্রুত চা পৌঁছে দেয়। বাড়তি পয়সা নেয় না। সময়টা ঝিমানোর। সাহানার এখান থেকে প্রতিদিন খেয়ে মেসে গিয়ে ঝিমাই। আর সাহানার স্খলনের দিবাস্বপ্ন দেখি। টের পাই, একটা বদভ্যাস হয়ে গেছে। টের পেয়েও এ-সকল বদভ্যাস জিইয়ে রাখা খারাপ নয় বলেই বিবেচনা করি। কোনো হোটেলে ঢুকে খেয়ে নিতে ইচ্ছে করল না। মেসে ফিরে দুটো ভাত চড়িয়ে ডিম ভেজে খেয়ে দিবাস্বপ্নে বুঁদ হবার জন্যে মন কাতর হয়ে পড়ে।

খালি পেটে সিগারেট ধরিয়ে ধীরে হাঁটতে শুরু করি। এ-সময় রাস্তাটা কোলাহলমুক্ত থাকে। ভরপেট ধীরগতিতে হেঁটে যেতে বেশ লাগে। আজ পেটখালি থাকায় উদাসীনতা আর বৈরাগ্য ভর করছে মনে। নিজেকে মনে হচ্ছে- দুঃখি, বঞ্চিত। নানারকম ভাবনা খেলে যেতে থাকে মনে। ইঁদুরের গল্পের শেষটা ওর ভাবনার থেকে আলাদা বলে, রাগ করে দুপুরে খাওয়ায়নি? এটা হতে পারে। মানুষের মনস্তত্ত্ব জটিল। 

আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে, গল্পটা ছিল নিষ্কলুষ এবং ওতে কোনো ইঙ্গিত ছিল না বলেই সাহানা রাগ করে ভাত খেতে বলেনি? হয়তো সে নীরবে আমার শত সহস্র ইঙ্গিতে হ্যাঁ বলে গেছে যা আমি বুঝিনি? এই যে, ইঁদুরের গল্পে কোনো ইঙ্গিত না পেয়ে রেগে দুপুরে খেতে বলেনি, এটাও আমার অজস্র ইঙ্গিতের বিপরীতে হয়তো একটি আবছা ইঙ্গিত? ভাবতেই উত্তেজিত হয়ে উঠি। মনে হতে থাকে, হ্যাঁ, এটা গুড সাইন। তার ব্যক্তিত্বের শুদ্ধতা আর বৈধ নারী হয়ে বাঁচার সুখ মুখোশ কেবল। উল্লাসবোধ করি আমি।

সামনেই রেললাইন। মেসের কাছে এসে পড়েছি বুঝতে পেরে আরো অস্থির হই। খেয়ে-দেয়ে এ-বিষয়ে গভীরে তলিয়ে ভাবা যাবে। দ্রুত পা বাড়াতেই দেখি- ভোঁতা ‘থপ’ শব্দের সাথে আমি হাওয়ায় উড়ছি। রেললাইনের মাঝখানে আছড়ে পড়ার মুহূর্তে চোখে পড়ে, একটি মিনি ট্রাকের অল্পবয়সী ড্রাইভার হতভম্ব আর ভয়ার্ত চোখে একপলক আমাকে দেখে নিয়ে দ্রুত পালাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলাম। আমরা উভয়েই দ্রুত রেলক্রসিং পেরুতে চেয়েছি। আর এ-কী করে সম্ভভ হল যে গাড়ির শব্দ বা হর্ণ কানে এলো না?

রেললাইন থেকে নিজেকে উঠিয়ে হেঁটে যাবার চেষ্টা করতেই খেয়াল করি শরীর এক ইঞ্চিও নড়ছে না। শরীরে সাড়া নেই। হাত, পা, কোমর কোথাও না। কেবল মাথা নাড়ানো যাচ্ছে কিছুটা। চিৎ হয়ে যথাসম্ভব মাথা উঁচু করে ডানে-বামে তাকিয়ে দেখি খাঁ খাঁ করছে নির্জন দুপুর। তেজী দুপুর। পিচ্চি কামালের চায়ের দোকান বন্ধ। কোথাও নেই কেউ। ক্লান্ত হয়ে মাথা রেলের স্লিপারে রাখতেই তীক্ষ্ন ব্যথা টের পাই শরীরে। বুঝতে পারি, মেরুদন্ড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। অসহ্য ব্যথায় জ্ঞান হারানো উচিত ছিল আমার। কিন্তু ব্যথাটা তার দাপটের পুরোটা আমাকে বোঝাবে বলেই হয়তো জ্ঞানটা আছে।

আতঙ্কের কাছে শরীর তুচ্ছ। এটা বুঝলাম- ট্রেনের হুইসেল কানে বাজায়। মাথার পেছন থেকে আসছে যেন এক প্রাগৈতিহাসিক দানবের হুংকার। যার মন নেই, আছে কেবল শরীর। লৌহ কঠিন শরীর। শরীরের ব্যথা ছাপিয়ে ভয়ানক আতঙ্ক এখন আমার। ট্রেন প্রথমেই নেবে আমার মাথা। সম্পূর্ণ ট্রেনটা আমাকে মসৃণভাবে কেটে যাবার পর আমার দু-তিনটে বা অসংখ্য টুকরো পড়ে থাকবে.... না দেখেও বুঝতে পারি আতংকে চোখ ঠিকরে বেরুনোর উপক্রম আমার। 

এটাই কী নিয়তি? অথচ চিরকাল নিয়তি অস্বীকার করে এসেছি। ভেবেছি, যেদিন চাইব ঠিক সেদিনই মৃত্যু আসবে। অথচ....  যত জোরে সম্ভব নিষ্ফল চিৎকার দিলাম- বাঁচাও! চিৎকারটা বাতাসে মিলিয়ে যেতে না যেতেই আমার ইঁদুরের গল্পটা মনে পড়ল। গল্প বলছি বটে, ওটা ছিল আমার দেখা সাধারণ ঘটনাগুলোর একটি। অবশ্য, সাধারণ ঘটনাগুলো কখনো সখনো মিথ হয়ে ওঠে। 

দীর্ঘদিন আগে কোথাও যাচ্ছিলাম রিক্সায়। একটি চার রাস্তার মোড়ে এসে ট্রাফিক পুলিশের শক্তিশালী হাতের ইশারায় রিক্সা থামে সিগন্যালের মাথায়। তখনি কোত্থেকে একটি ইঁদুর রাস্তা পেরুনোর ইচ্ছেয় দ্রুত দৌঁড়ে রাস্তার মাঝখানে পৌঁছে হতভম্ব হয়ে পড়ে। ততক্ষণে ট্রাফিকের ইশারায় অন্যদুপাশের গাড়ির চাকা গড়াতে শুরু করেছে। সময়টা ছিল ঝিম ধরা তেজী দুপুর। সেই কঠিন পিচঢালা রাস্তায় একটি দিশেহারা ইঁদুর। একা। দানবের মত এক একটা গাড়ি কী দুর্দান্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক! তার সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে। যেকোনো মুহূর্তে কোনো একটি চাকা হয়ে উঠবে তার মৃত্যুবাণ! 

একটি ইঁদুর অস্থির হয়ে ক্রমাগত ফাঁকা রাস্তা খুঁজছে। অসহায়, ভীতু, হতভম্ব ইঁদুর।- দৃশ্যটা আমাকে সম্মোহন করেছিল যেন। শেষে হাল ছেড়ে সে চুপচাপ এক জায়গাতেই স্থির হয়ে বসে যায়। যেন মেনে নিয়েছে নিয়তি। মনে হলো, সে মুহূর্ত গুণছে। অপেক্ষা করছে যে কোনো একটি দানবাকৃতি চাকার। অপেক্ষা করছিল, কখন থকথকে কাদার মত তার জীবন ছড়িয়ে যাবে কঠিন পিচের রাস্তায়। অপেক্ষা..... 

ক্ষুদে চারটি পায়ে তার অমিত শক্তি। গতিতে, বুদ্ধিতে সে ফাঁকি দেয় শিকারীদের। সে টিকে থাকে সংগ্রামে। প্রতিপদে জীবন কিনে নেয় সে, ছুটে...ছুটে...ছুটে। ছুটে চলাই- জয়, জীবন। স্থিরতা মানেই হার, মৃত্যু। এটা তো তার জানা কথা। তবে কি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই স্থির হয়ে গিয়েছিল সে? সে কি টের পেয়েছিল, মৃত্যু আসছে? অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু? তার স্থবিরতার সুযোগেই হয়তো একটি গাড়ি তার পেছনের একটি পা, লেজসমেত পিষে চলে যায়। সচল থাকলেই কি তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যেত না? তবু কেন স্থবিরতা তার?

এতে কি অলৌকিক কোনো ব্যাপার আছে? কোনো এক অলৌকিক ইশারাতেই কি সে স্থবির হয়েছিল? ওই আধখানা পিষে যাওয়া শরীরে মাথা উঁচু করে বাতাসে কিসের যেন ঘ্রাণ শুঁকে দেখে সে। কিসের ঘ্রাণ নিয়েছিল সে, মৃত্যুর? অলৌকিক কোনো ঘটনার? ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে দেয়ায় শেষ দৃশ্য দেখা হয়নি।

চারপাশে গমগম শব্দে কাঁপতে শুরু করে রেললাইন। ট্রেনটা একদম কাছে। প্রথমেই আমার মাথা নেবে ওটা। মুহূর্তগুলো ভীষণ ধীরে চলছে। উপলব্দি করি, সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে উপলব্দি করলাম, এক ভীষণ ভ্রান্তিতে জীবন কাটিয়েছি। মনে হলো, সামনে আবছা পর্দার মত ঝুলছে কিছু একটা। পর্দার ওপাশে পৌঁছে দেবে আমাকে প্রাগৈতিহাসিক দানবটা। এরপর অনন্তকাল হাহাকারে ছুটে বেড়াবে আমার আত্মা। 

কী করে যেন উপলব্দি করি, এক মহান সত্তা আছেন এবং কিছুই অর্থহীন নয়। মানুষের উপলব্দি ক্ষমতার বাইরে থেকে যে সত্তা দেখেন আমাদের কান্ড কারখানা। দুর্বল, মানবিক, অসৎ কান্ড-কারখানা। চোখ ফেটে জল আসে আমার। সাহানাকে বলেছিলাম, পৃথিবীতে অলৌকিক ঘটনা আশা করা অনুচিত। মাথার মাত্র কয়েক মুহূর্ত কাছে দানবটার অস্তিত্ব ভুলে জলভরা চোখে আমি একটি অলৌকিক মুহূর্তের প্রার্থনা আরম্ভ করি।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.