ঊষসী ভট্টাচার্য | কল্প-দ্রুম

ঊষসী ভট্টাচার্য | কল্প-দ্রুম

স্টেশনের রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলে একটা ঝুপড়ি পাওয়া যায়। এখানে সবই খুব গায়ে-গা ঘেঁষে থাকে। প্রেম-যৌনতা -চুরি- খিদে-জলের অভাব-দুর্গন্ধ সব, সবই। স্টেশনের পাশে আরোও কিছুটা হেঁটে গেলে একটা ভিখিরি গলি। ওখানে রোজ রোজ সব ভিখিরি জড়ো হয়। টাকার ভাগ বাটোয়ারা হয়, গালি-গালাজ হয়,নেশা-ভান হয়, পাঁচ টাকার ডাল ভাত খাওয়া হয়। ভিখিরি গলির পাশে ভাঙাচোরা দু-একটা ঘর আছে। ঝামেলা সামাল দেবার ঘর,পুলিশেরা আসে, খুলে যায় হুক-বোতাম-বোতল-ফোয়ারার জল। মুখ বন্ধ দারিদ্রের পান্তার নুন জুটুক না জুটুক, কিছু জোঁক পার্মানেন্ট।

স্টেশনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে রোজই চোখে পড়ে এসব। আজ ওনার কোনো তাড়া নেই, তাই চোখ বেশিই দেখে। স্টেশনের ভিড় আপাতত কম। ট্রেন আসতে আরো মিনিট দশেক সময় হাতে আছে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বছর পঁচিশ এর একটি যুবক। ছিমছাম চেহারা। পরনে হালকা হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবি,কাঁধে ঝোলা ব্যাগ,চোখে হালকা কাজল টানা। স্টেশনে এমন কিছু ভিড় নয় যে ছেলেটির গায়ের ওপর উঠে যাওয়াই একমাত্র ফাঁকা ফ্লাইওভার হবে। তবুও, বেশ ক'জন ছেলেটিকেই ধাক্কা মেরে, গায়ের ওপর পড়ে একজন মৃদু স্বরে বলে গেল-'লাগল মামণি'?

ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। স্টেশনে ট্রেনটি ঢুকতেই চলন্ত ট্রেনে কেউ কেউ উঠে পড়ল। একেকজনের ওঠা নামার স্কিল মারাত্মক হয়। ব্যালেন্সের খেলায় এরা চূড়ান্ত। পাশের ছেলেটিকে আর দেখা গেল না, উনি কেন ওকে খুঁজছেন কে জানে। অন্বেষণ ওই কয়েক সেকেন্ডের,তারপর ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যায়। ট্রেনে উঠে আজ সিট পাওয়া গেল। তিনজনের সিটে চারজন,বেশ মানিয়ে যায়। সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা মেয়েটিকে বসার কথা বলবেন কী বলবেন না,ভাবতে ভাবতেই, অফার আসে অন্যকোথাও থেকে। পাশের লোকটি দাঁড়িয়ে বসতে দিল মেয়েটিকে। মেয়েটি সাইডে বসতে চাওয়ায়, উনি(এক্স) তৃতীয় স্থানে ঢুকে বসলেন। ট্রেন চলছে। স্টেশন আসছে। একেরপর এক ডালমুট ওয়ালা, দিলখুশ ওয়ালা যাতায়াত করছে। চুলের ক্লিপ, হাতের চুড়ির কেনাকাটায় মুখর হয়ে উঠছে কামরা। এসব লেডিস কমপার্টমেন্টে বেশি চলে, তবে আজকাল এদিকটাতেও বেশ জমে উঠেছে। জানালা দিয়ে সরষের ক্ষেত, ফুলের সারি হু হু করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। শহরে থাকতে থাকতে ডিজেল আর ড্রয়িংরুম বোরিং হয়ে ওঠে। দূরে ট্যুর না হোক, ছোটোখাটো ট্রেন সফরও মন্দ লাগে না।

অনেকক্ষণ জানালায় চোখ রাখতে রাখতে, অনেককিছু মনে পড়ছিল। পথ পেরিয়ে, দূরে যেতে যেতে কত কী মনে আসে। হঠাৎ ঘোর ভাঙল, পাশের মেয়েটির নড়াচড়ায়। ও কেমন যেন, ছটফট করছে, মেয়েটির আলতো তাকিয়ে বোঝা গেলনা কিছুই। ট্রেনে ক্রমে ভিড় বাড়ছে, বাচ্চা মেয়ের শৌখিনতায় তা হয়তো বিরক্তির কারণ। আবারো জানালার দিকে চোখ গেল, ট্রেনটা এবার যে স্টেশনের দিকে ছুটছে, সেই স্টেশনে এককালে খুব আসা হোত। আজকাল .... সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব পালটায়, যাতায়াত, যাতায়াতের কারণ-উদ্দেশ্য..

নাহ,মেয়েটি বড়ই বেশি ছটফটে অকারণে ছটফট করেই যাচ্ছে। আত্মমগ্নতার কোনো সুযোগ নেই, পরের স্টেশন নেমে যেতে হবে। সিট ছেড়ে উঠতেই,মেয়েটি এক ঝটকায় ভেতরে ঢুকে এল, পাশের দাঁড়ানো ভদ্রলোক হতচকিত হয়ে প্যান্টের চেইন ঠিক করতে লাগলেন। চোখে চোখ পড়ার আগে ওই লোকটা মিশে গেল ভিড়ে। মেয়েটির চোখ-মুখ ততক্ষণে লাল, সারা শরীর প্রায় কাঁপছে। অপরপ্রান্তে বসে থাকা বছর বাইশের মেয়েটি লুকিয়ে গোগ্রাসে রুটি আলুভাজা শেষ করছিল। স্টেশন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই, সে ব্যাগের মুখ বন্ধ করে লাফিয়ে নামল স্টেশনে।

এই স্টেশনের বাইরেই একটা চায়ের দোকান, দুটি ছেলে বসে বেকারত্ব, প্রেম-ভবিষ্যত-চাকরি-ব্যবসা এসব নিয়ে কথা বলছিল। স্টেশনের আশে পাশে তিনটি বাচ্চা ভিখিরি ঘুরে বেড়াচ্ছে এ ওর পায়ে পায়ে। টোটো,অটো আসছে যাচ্ছে। কচুরির দোকানে পেট মোটা লোকটা লেচি পাকিয়ে পাকিয়ে হাতের তালুতে চেপ্টে চেপ্টে লুচি ছুঁড়ে দিচ্ছে তেলে।গোল গোল ছোটো ছোটো দুটো লুচি আর এক হাতা ডাল ৬/- টাকা। প্লেটের পর প্লেট খুব বিক্রি।


"Who are you?
Are you in touch with all of your darkest fantasies?
Have you created a life for yourself where you can experience them?
I have. I am fucking crazy.
But I am free."
Lana Del Rey

একটা ঘোড়া ছুটছে,ছুটছে তো ছুটছেই। ঘাস জেগে উঠছে কুঠার ফলার মতো। তার গায়ে লেগে আছে বিন্দু বিন্দু রক্ত। ঘোড়ার উপর বসে থাকা এক কান-মুখ-অবয়বহীন চোখ। আশে পাশে খসে পড়ছে, উচ্ছিস্ট-মাংসপিন্ড। ঘোড়া সারা গায়ে কেটে যাওয়া দাগ,ছুটতে ছুটতে-নিজেরই চলায় রক্তাক্ত-ক্লান্ত। আছড়ে পড়ছে মাটিতে,না ঘাসের মতো কুঠার ফলায়। পড়ছে কিন্তু মরছে না। অবয়বহীন চোখ,আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। গাঢ় নীল অন্ধকার। কী এক তীব্র গন্ধ।

জলের বোতলটা পড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে ঘুমের মধ্যেই আলো জ্বালাতে গিয়ে বোতলটা পড়েছে। লোডশেডিং। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।অন্ধকারে, অন্য কোন্ এক অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে। মোবাইল ঘড়ি বলছে ৩ টে বেজে ৩১ মিনিট। অন্ধকারে চেনা পথও অচেনা লাগে। ব্যালকনির দরজা খুললেই, নির্জন শহরের থেমে থাকা। দূরের আকাশে কী যেন চিকমিকি আলো, নাহ চোখের ভুলও হতে পারে৷ এমন সময় সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস থাকলে বেশ হোত। দেশলাই বা লাইটারের আলো-শব্দও কিছুটা নির্জনতা ভাঙে। হাতে সিগারেট, মাথার মধ্যে হাজারটা জট, দৃশ্যটি ভাবতেও কী স্টাইলিশ না?

আপাতত এটুকুই ভাবি, বাকি কথা পরে হবে ...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন