স্বপন পাল | ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না

স্বপন পাল | ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না

রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা, তার ওপরে বসলো রাজা, ঠোঙা ভরা বাদামভাজা, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। সুকুমার রায়ের এই ছড়া প্রায় সকলের জানা। গান হয়েও শোনা অনেকের। রাজার মাথায় একটাই চিন্তা, নেড়া ক'বার যায় বেলতলাতে। এর সমাধান বলে দেয় এক ভিস্তিওয়ালা। সে বলে তার পরিচিত নেড়া মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশবার বেলতলাতে খেলতে আসে।

সুকুমার রায় বহু বিষয়ে সুপণ্ডিত এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখা শিশুপাঠ্য ছড়াগুলি আপাতভাবে মনে হতে পারে শিশুদের গড়গড়িয়ে পড়ার মতো সুন্দর এবং কিছুটা অদ্ভুত ছড়া। কিছু বাক্য ব্যবহার কখনো অবান্তর মনে হতে পারে, মনে হতে পারে এক গতিশীল ছন্দের প্রয়োজনে কবি এমন বাক্যের ব্যবহার করেছেন। আমি আপাতত এই একটি ছড়া বা কবিতাকে পড়বার জন্য বেছে নিয়েছি।

একটি ঘটনা বর্ণনার ঢংয়ে বলা ছড়ায় প্রথমেই একটি রাজার চরিত্র এসেছে। যে ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা নিয়ে রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজায় গিয়ে বসেছে। ইঁটের রঙ লালচে, লাল রঙ রোদের তাপের বেশীটাই শোষণ করবে ও মাটির থেকেও বেশী উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। গ্রীষ্মের দুপুরের কথাই ছড়াটিতে বলা হয়েছে। গ্রীষ্মের দুপুরে কেউ শখ করে ইঁটের পাঁজায় বসতে যাবে না। বসবে তখন, যখন মাটিতে বসার বদলে তার উঁচু স্থানে বসার অবচেতন অভ্যাস তৈরী হয়েছে। সে স্থান উত্তপ্ত হলেও উপায় নাই, অবশ্য রাজার আসন নানা কারণে উত্তপ্ত হতে পারে। সে তো সাধারণের মতো বসার জন্য মাটিকে বেছে নিতে পারে না, সে যে রাজা। সে বিচলিত হলে জনগণ চঞ্চল হয়ে ওঠে “হায় কি হলো” বলে। ওদিকে ছড়ার শেষ অংশে ভিস্তিওয়ালা ঢিপ করে প্রণাম করে দু’পায় তার, যা দিয়ে রাজা যে সম্মানিত সেটা বোঝা যায়।

তবু সুকুমার রায় এই ছড়ার রাজাটির ছবি এঁকেছেন একটি বালক যেন, যার কোমরে তরোয়াল জাতীয় কিছু কিন্তু হাতে শ্লেট- পেন্সিল। খানিকটা যেন লিয়রের আঁকা চরিত্রের মতো। এ সেই গবু মন্ত্রীর হবু রাজা নয়তো ? 

আমরা পূর্বতন থেকে বর্তমান অব্দি খুঁজে দেখলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে কি স্বৈরতন্ত্রে কি গণতন্ত্রে এ রকম জোকার সদৃশ প্রশাসক প্রচুর দেখেছি, দেখবোও আরও।

ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা নিয়ে রাজা তো তপ্ত সিংহাসনে থুড়ি রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজায় গিয়ে বসলো। আশপাশের সকলে দেখতে বাধ্য হলো, কারণ তিনি রাজা। কি দেখলো তারা ? দেখলো রাজা ঠোঙা থেকে বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। এ আবার কি ? খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না কেন ? বোঝাই বা যাচ্ছে কি ভাবে যে রাজা গিলছে না ? সে আর আশ্চর্য কি ? গিলতে গেলে আমাদের গলায় থাকা অ্যাডামস অ্যাপল ওঠে নামে, যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান। পাবলিক দেখছে রাজা বাদাম ভাজা মুখে দিচ্ছে চিবোচ্ছে কিন্তু গিলছে না। এমন হয় নাকি ? হয় হয়তো, সংকটময় সময়ে এমন হতেও পারে। ভাবনায় পড়েছে যে রাজা। আচ্ছা বাদাম ভাজা কি কেউ খিদেয় পেট ভরাতে খায় ? মনে হয় না। খায় খুব সম্ভব আমোদ প্রমোদ উপভোগ কালে বাড়তি আনন্দের জন্য। তাহলে রাজামশাইয়ের জীবনের আমোদে সংকট উপস্থিত হয়নি তো ?

মানব সভ্যতায় কৃষিকাজ একটি সুমহান অগ্রগতি। কৃষিকাজে না নামলে মানুষ তার নিজের প্রজাতির বাড়বৃদ্ধির কারণে পশু-পাখির প্রজাতিগুলির ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনতো ও শেষ পর্যন্ত মানব প্রজাতিরও। এখনও পশুপালক যাযাবর সম্প্রদায় পৃথিবীতে কিছু কিছু থাকলেও তা এত বেশী নয় যে বাস্তুতন্ত্র তাতে বিঘ্নিত হবে। কৃষির পরপরই যে পেশায় মানুষ আগ্রহী হয়ে পড়ে তা হলো বানিজ্য। নিজের দেশ থেকে পণ্য নিয়ে দূরের দেশে গিয়ে তার পরিবর্তে সেদেশের অচেনা অজানা বস্তু ও সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে বহু বছর পর বহু কষ্ট সহ্য করে কিছু অসমসাহসী মানুষের দল বানিজ্য করেছে। তারা দেশ আবিস্কার করেছে, পথ আবিস্কার করেছে। আর একদল মানুষ জীবিকা হিসেবে বেছে নেয় বিনোদন। কৃষিকাজের বিরতিতে বা বানিজ্য করে ফেরা মানুষের ক্লান্তি কাটাতে বিনোদন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তখনকার দিনে কোন ইন্ডাস্ট্রি তো ছিল না। তাঁতী, ঘরামি, কুমোর, কামার, ছুতোরের প্রয়োজন সমাজে ছিল, কিন্তু চাষে ফসল না ফললে এরাও নিরুপায় হয়ে নিজের সামান্য জমিতে কিছু না কিছু ফলানোর চেষ্টা করতে বাধ্য হতো, না হলে অনাহার। সে অর্থে কৃষিকর্ম সকলেই জানতো। যাই হোক গোষ্ঠীপতি বা রাজা এই সব জীবিকার মানুষদের পৃষ্ঠপোষণ করতেন। রাজার কাজ ছিল এদের সুষ্ঠু ভাবে দেখাশোনা ও রক্ষা করা। রক্ষা করতে গেলে বিশেষ করে বন্য জন্তু বা দস্যু-তস্করের থেকে প্রজা তথা এইসকল জীবিকার সাধারণজনদের বাঁচাতে গেলে একদল প্রশিক্ষিত মানুষের দল বা সেনাদল লাগবে। তাদের খাওয়া পরা, অস্ত্র-শস্ত্র, তাদের পরিবার ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন অনেক খাদ্য-বস্ত্রের সংস্থান। তাই রাজা খাজনা বা ট্যাক্স আকারে সেই ব্যয়ভার ওই সকল জীবিকার মানুষদের থেকে আদায় করে নিতেন। আমরা আজও সেই নিয়মেই চলি। রাজা চাইতেন যেন তাঁর কৃষিতে অনেক ভাল ও বেশী ফসল উৎপাদন হয়। চাইতেন বানিজ্যের মাধ্যমে যেন অনেক লাভ হয়। অনেক নতুন জ্ঞানের বিনিময়ে সম্পদশালী হয়ে ওঠে দেশ।

আমাদের যে রাজা বাদাম ভাজা খেতে খেতে ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে সে আদৌ তেমন কোন রাজা নয়, বরং এক কৌতুক চরিত্র। কৌতুক চরিত্র তো কোন বাস্তব চরিত্রের অনুকরণ হয়, তাই না ? বাস্তবে যা নেই বা যার চর্চা নেই তা নিয়ে কৌতুক হয় কি করে ? 

আসলে চরিত্রটি জনগণেশের নির্বাচনে জিতে আসন বা সিংহাসনে বসা এক একটি চরিত্রের প্রোটোটাইপ যা এখনও বাস্তবে খুঁজলে পাওয়া যাবে। তবু একটা খটকা রয়ে যাচ্ছে ওই খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না অনুসঙ্গে। গিলে ফেললে শরীরের পুষ্টি হবে। কিন্তু তা না করে জিভে স্বাদ নিচ্ছে কিন্তু শরীরে পুষ্টি দিচ্ছে না।

আমি এক ডায়াবেটিক মানুষকে দেখেছি যিনি খুব মিষ্টি ভালবাসতেন কিন্তু রক্তে শর্করার কারণে ডাক্তারের কড়া নিষেধ মেনে তিনি মিষ্টি মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ চিবিয়ে ফেলে দিতেন, গিলতেন না, পরে মুখ ধুয়ে নিতেন। না এ রাজার কাজকর্ম তেমন নয় বলেই মনে হয়। হয়তো আজকের দিনের রাজনীতি করা নেতাদের মতো হতে পারে, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। পরে ওগড়াতে হচ্ছে তদন্তে অন্যায্য প্রমাণ হলে। হয়তো না গেলার কোন তত্ত্ব আছে, কারণ সব খাওয়া তো লুকিয়ে হয়নি।

রাজা গরমে কাতর হয়ে পাবলিককে বলছে বৃষ্টি নামাতে। যেন কোথাও জলের ফোয়ারা আছে, কল ঘোরালে দারুণ জলের ধারা নেমে এসে চারদিক ঠাণ্ডা করবে। তা নয়, রাজা জানে জনগণ শ্রম দিতে পারে, বৃষ্টি নামাতে পারে না। এদিকে এই ছড়ায় ভিস্তিওয়ালা মানুষটির একটা বড় ভূমিকা আছে। সে তার আন্দাজ মতো একটা জবাব তুলে দিয়েছে রাজার হাতে। যদিও ছড়ায় কোথাও নেই যে তার সেই উত্তর মান্যতা পেলো। ভিস্তিওয়ালার কাজ কি ? সে একটা বহনযোগ্য বড়সর চামড়ার থলি বা ব্যাগ যা কাঁধে ঝুলিয়ে বহন করা যায় তাতে করে পুকুর, নদী বা কুয়ো থেকে তোলা জল ভরে যেখানে প্রয়োজন সেখানে বা যার প্রয়োজন তাকে পৌঁছে দেয়। বহু আগে কর্পোরেশনের ভিস্তিওয়ালা থাকতো যারা ধুলো ওড়া রাস্তা জল ঢেলে ধুয়ে পরিস্কার রাখতো। গরমের দিনে জল ঢেলে রাস্তা ঠাণ্ডা করতো। খুব পরিশ্রমের কাজ। লেখাপড়া জানা বুদ্ধি খাটিয়ে জীবিকার্জন করতে পারবে এমন মানুষ ভিস্তিওয়ালার চাকরী করতে যেতো না। সে যাই হোক রাজার ইঁটের পাঁজার সিংহাসন রোদের তাপে বসার উপযুক্ত নেই। ভিস্তিওয়ালা এগিয়ে আসতে পারে তা জলে ভিজিয়ে তাপ কমাতে। ভিস্তিওয়ালার উপস্থিতি প্রয়োজনে। কিন্তু সে যখন উপযাজক হয়ে সমাধান বাৎলে দেয় ও তারপর নাটকের যবনিকা পতন তখন মানতে হয় এটি যথার্থই হবু রাজা, তার গবু মন্ত্রী হলো ওই ভিস্তিওয়ালা।

এখন রাজাটি কি ভাবছিলেন ? যা তাঁকে আমোদ প্রমোদের বাদাম ভাজা গলাদ্ধকরণে নিশ্চেষ্ট করে রেখেছিল ? তা হলো, পুঁথির পাতে লেখা আছে নেড়া যায় বেলতলাতে কিন্তু কোথাও লেখা নেই কয়বার সে বেলতলায় যায়। এবং রাজাকে ভাবনায় ফেলেছে সে যদি লক্ষবার বেলতলায় যায় তবে তা আটকায় কিসে। হক কথা। পাবলিক তো সত্যিই বেলতলায় বারবার গিয়ে থাকে। যদি ধরে নিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ভোটবাক্স, বর্তমানে ইভিএম সেই বেলতলা তবে জনগণের ওখানে যাওয়া ছাড়া উপায়ই বা কি ? জানে সবাই মাথায় বেল খসে পড়তেই পারে। যে জিতে লোকসভা, বিধানসভার দখল নেবে, সে বা তারা প্রথমে প্রতিশ্রুতি ভুলবে ও জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গবে। বেলতলায় যাবার ফল মাথা পেতে বেলের পতন নেওয়া, এ ছাড়া আর কি। তবু পথ যে ওই একটাই, বেলতলার রিস্ক থাকলেও জনগণের যাবার দ্বিতীয় আশাব্যঞ্জক পথ নেই। অন্য সব পথ ভয়ঙ্কর। ভিস্তিওয়ালা জানায় নেড়া নামের ছেলে তাদের পাড়ার বেলতলায় মাসে কম করে পঁচিশবার খেলতে আসে। ভিস্তিওয়ালার জানার কথা নয় পুঁথির পাতে কোন নেড়ার কথা বলা আছে। আসলে নেড়া আমরা সবাই, আমরা যারা পাবলিক। গণতন্ত্রে আদর করে বলা হয়েছে পিপল। হ্যাঁ, জনগণ তো আদরের বস্তু। যেমন আদরের হয় ছাগলের সন্তানের মধ্যে বিশেষত কালো পাঁঠাগুলো। আদরের অবশ্যই ডিম দেওয়া হাঁস-মুরগিগুলো, দুধ দেওয়া গাই-গরুগুলো। উৎপাদনে অক্ষম হলে এদের কি দশা হয় তা অজানা নয় কারো। তাহলে রাজার প্রয়োজনে উৎপাদনশীল থাকতে হবে। সে না হয় হলো। সিংহর পা ভেঙ্গে গেলে সে অনাহারে মরে যায় বটে কিন্তু সক্ষম সিংহরা তার চামড়া ছাড়িয়ে বাজারে বেচতে যায় না। কিন্তু বেলতলা দিয়ে যে পথটি গেছে সে পথ দিয়েই আমাদের চলতে হবে। চলতে যখন হবেই তখন মাথায় শিক্ষা ও জ্ঞানের একটা সুরক্ষা পাগড়ি বাঁধতে ক্ষতি কি। নিজের নিজের মাথা তো বাঁচবে। বর্তমানের ভাষায় অন্যের পরিয়ে যাওয়া টুপির হাত থেকে বাঁচতে নিজের মাথা নিজের দখলে রাখলেই মঙ্গল। রাজার সঙ্গে অবরে সবরে আমোদ প্রমোদে বাদাম ভাজা আমরাও খেতে পারবো। খাবো এবং গিলবোও।

সুকুমার রায় এভাবেই কত গভীর বার্তাগুলি হেসে হাসিয়ে আমাদের কণ্ঠস্থ করিয়েছেন, এক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের মতো। অমর হয়ে থাকবেন তিনি।


1 মন্তব্যসমূহ

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন