সুমনা সাহা | অমৃতসদনে চল যাই

সুমনা সাহা | অমৃতসদনে চল যাই

পর্ব- ৬ পঞ্চম পর্ব পড়ুন

পল: আমাদের পবিত্র মায়ের বিষয়ে এত খুঁটিনাটি তুমি কিভাবে জেনেছ?

লুক: আমি নিজে যে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি! যদিও সব কিছু তাঁর এতদিন পরে আর স্পষ্ট মনে নেই... আর কী ঝড়টাই না গিয়েছে তাঁর উপর দিয়ে, সে তো জানোই। তিনি এক ঘোরের মধ্যে বলছিলেন, আমি শুনে যাচ্ছিলাম, আমাদের প্রভুর কথা বলতে বলতে তাঁর মুখ আলোকিত হয়ে উঠছিল, সেসমস্ত দেখেতে দেখতে আমি তাঁর স্বর্গীয় দ্যুতিভরা মুখখানি আঁকবারও চেষ্টা করেছিলাম, কোনখানে তাঁর আত্মমগ্ন স্মৃতিচারণের মাঝখানে তাঁকে থামিয়ে প্রশ্ন করবার কথা সেসময় আমার মনে ওঠেনি।

পল: আমাদের প্রভুর জীবনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। সেকথা তুমি আমি দুজনেই জানি।

লুক: এমনকি তোমার সমস্ত অলৌকিক কাণ্ডকারখানার ব্যাখ্যাও আমি খুঁজে পাইনি কখনও। তোমার অনেকগুলো প্রচার অভিযানেই তো আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গে থেকেছি। কতবার কত ভয়ানক বিরুদ্ধ পরিবেশ আশ্চর্য ভাবে মসৃণ হয়ে যেতে দেখেছি। তোমার মনে আছে সেসব?

পল: কিছু কিছু মনে আছে। তবে অনেক কিছুই প্রায় ভুলতে বসেছি। তোমার যতটুকু মনে পড়ে লিখে রেখ। যদিও সেসব মোটেই আশ্চর্য কিছু না। প্রভুর সেই বাণী মনে নেই? “আমার উপর যার সর্ষে পরিমাণও বিশ্বাস আছে, সে যদি বিশাল মালবেরি গাছকে বলে, ‘যাও সাগরে গিয়ে গজাও!’ তখনই শিকড় শুদ্ধ উপড়ে গিয়ে মালবেরি গাছ সাগরেই জন্মাবে!” তাঁর উপর বিশ্বাস তো আমার গোড়া থেকে ছিল না, তবে তিনি আমাকে কৃপা করেছেন, তাঁর বাণী প্রচারের যন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, তিনি চেয়েছেন, তাই আমার তাঁতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস জন্মেছে। তাই আমি নিজের দেহটাকে বাঁচাবার কোনও চেষ্টা একেবারেই করিনি। আর তোমরা যেসব ঘটনাগুলোকে আশ্চর্য বলছ, সেগুলো অতি স্বাভাবিক ভাবে ঘটে গেছে একের পর এক। যেমন ভাবে প্রভু সিনাগগ-এ সাবাথ-এর দিন উপস্থিত হওয়া এক বিকলাঙ্গকে সুস্থ স্বাভাবিক করেছিলেন, দশ জন কুষ্ঠরোগীকে এক নিমেষেই রোগমুক্ত করেছিলেন, তাঁর কাজে নির্বাচিত করে তিনি তাঁর আরোগ্য করবার শক্তি আমার মধ্যেও সঞ্চারিত করেছেন, এ আর বেশি কথা কী? শুনেছি, তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন, “But you will receive power when the holy Spirit comes upon you, and you will be my witnesses in Jerusalem, throughout Judea and Samaria, and to the ends of the earth.” কবর থেকে উঠে আসবার পর চল্লিশ দিন ধরে তিনি তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্যদের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছে বারম্বার, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছেন, খাবার খেয়েছেন, উপদেশ দিয়েছেন, নানা বিপদ থেকে তাঁদের রক্ষা করেছেন, আগলেছেন...আরও কত ভাবে তাঁকে আজও মানুষ নিজেদের মধ্যে একান্ত নিজস্ব ভাবে অনুভব করছে, তাঁর জীবন্ত উপস্থিতি, সান্নিধ্য উপলব্ধি করছে, আমিও পেয়েছি বার বার তাঁর দর্শন, প্রতীক রূপে তিনি কত কীই না আমার অনুভবে জাগিয়েছেন! কিছু কিছু বলব তোমায়, লিখতে পার। হয়তো সেসব প্রয়োজন হবে আগামী দিনে প্রভুর সাম্রাজ্য মজবুত করতে।

আর হ্যাঁ, যে কারণে আমি তোমার অপেক্ষায় উতলা হয়েছিলাম... খুব দরকারি কয়েকটা চিঠি তোমাকে লিখে দিতে হবে আমার হয়ে। আমার অবস্থা তো দেখছই। এক হাত বাঁধা। আমার স্বাধীনতা কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি এরা। জানি না বিচারে কী সাব্যস্ত হবে। যন্ত্রণা পেতে ভয় পাই না। আমাদের প্রভুর থেকে বেশি যন্ত্রণা আর কেই বা ভোগ করেছেন, বলো? আমাকে যদি ক্রুশে চড়াতে চায়, আমি একটাই অনুরোধ করব। আমার শাস্তি প্রভুর সমান হতে পারে না। আমি তার যোগ্য নই। আমার শরীর যেন তারা ক্রুশে উলটো করে বেঁধে দেয়। মাথা নিচে আর পা যেন উপরে থাকে। কিন্তু এরা বড্ড দেরি করছে। যদিও আমি এখনও আশাবাদী। হয়তো ভাল কিছু ঘটবে। বিচারে সাজা হবে না, ছাড়া পাব।

লুক: তোমার তো অনেক অলৌকিক দর্শন হয়েছে, কখনও সেসব খোলাখুলি বলোনি। তুমি যদি চাও, সেসমস্ত আমি লিখে রাখি, ভাবীকালের খ্রিস্ট প্রচারক ও সাধকের জন্য, তাহলে আমাকে বলতে পারো। প্রভুর মত তুমিও প্রায় মসীহা হয়ে গেছ সাধারণের কাছে। ওই যে কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটিকে দেখছি, তোমার কাছে ঘুরঘুর করে, সে কে? তার চোখে তোমার প্রতি যে আনুগত্য দেখি, তার তুলনা হয় না। এমনকি আমাদের জেলারও তো তোমাকে খুবই শ্রদ্ধা করেন।

পল: অলৌকিক দর্শন? হ্যাঁ তা বলতে পারো বটে, কিন্তু অলৌকিক বলে কখনোই মনে হয়নি। দিনের আলোর মত একেবারে স্পষ্ট হয়ে সেই দৃশ্যগুলো আমার সামনে এসেছে, আদেশ পেয়েছি প্রতীকের আকারে, সমস্ত প্রতীকের ব্যাখ্যাও আমার মনে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। তার আরম্ভ তো সেই দামাস্কাসের পথেই। যখন দিব্য জ্যোতিতে চোখ ধাঁধিয়ে আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলাম। সেই জ্যোতি আমার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছিল সাময়িক ভাবে। সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি। তারপর কি ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি ফিরেছিলাম মনে করছ? কিভাবে ফিরে গেলাম আমি নিজের বাড়িতে ঐ অবস্থায় অতটা পথ পেরিয়ে? সে কি আমার আয়ত্তে ছিল? তারপর আনানিয়াস এল, আমার চোখের শুশ্রূষা করে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে। তিনিও কি আচমকাই চলে এসেছিলেন? তিনি তো আমাকে চিনতেন না, আমাদের গ্রামের মানুষ নন তিনি, অথচ তাঁর কাছেও এসেছিল প্রভুর বাণী। আনানিয়াস বলেছিলেন, আমি, সল, ভিন্ন মতের, আমি খ্রিস্টানদের অত্যাচার করি, সে খবর পৌঁছেছিল তাঁদের গ্রামেও। ভয়ে দুরুদুরু বক্ষে প্রভুর আদেশের প্রতিবাদও করেছিলেন তিনি। তবুও তাঁকে আসতেই হয়েছিল আমার কাছে। কারণ প্রভু জুড়ছিলেন। বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা তাঁর মেষ শাবকগুলোকে তিনি একত্রে মিলিয়ে দিচ্ছিলেন। আনানিয়াস এলেন। আমি ঐ ঘটনার পর সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলাম মৃতের মত, তিন দিন ধরে কিচ্ছু খাইনি। যা কিছু ঘটেছে এযাবৎ, মনের মধ্যে তন্ন তন্ন করে আমি তাঁরই বিশ্লেষণ করে চলেছি তখন। আনানিয়াস আমাকে দেখেই বুঝতে পারলেন, আমি সেই পুরনো সল নই, আমার উপর প্রভু ভর করেছেন। তিনি প্রভুর নাম স্মরণ করে আমার দুচোখের পাতায় নিজের হাত রাখলেন। শুকনো পাতা ঝরে পড়ার মত যেন আমার চোখের উপর থেকে সরে গেল অন্ধকার। আমি আবার দৃষ্টি ফিরে পেলাম। খ্রিস্টের পবিত্র নামে আমাকে ব্যাপটাইজ করলেন আনানিয়াস। তারপর আমার ‘দ্য ওয়ে’-র সঙ্গে পরিচয়ের পালা শুরু হল। গির্জায় যাতায়াত করতে আরম্ভ করলাম। সাইপ্রাস, ফিনিশিয়া, অ্যান্টিয়াক সর্বত্র ঘুরে ঘুরে প্রভুর বার্তা প্রচার করছিলেন স্টিফেন। তুমি জানো, তাঁকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হয়েছিল এবং সেই অত্যাচারীদের মধ্যে আমিও একজন। কোন মতাদর্শের বিরোধী হওয়া এক কথা, কিন্তু তাদের অত্যাচার করা, মেরে ফেলা, বন্দী করা থেকে আচমকা সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে সেই মত সমর্থন করা, প্রাণ দিয়ে তার প্রচার করা—মানুষকে আমার এই পরিবর্তন বোঝানো সহজ ছিল না। অথচ এটাই ছিল প্রভুর ইচ্ছা। প্রভু তার ব্যবস্থাও করেছিলেন। স্টিফেন শহীদ হওয়ার পরে অত্যাচারিত ‘দ্য ওয়ে’ বিশ্বাসীরা একত্র হতে আরম্ভ করলেন। সিপ্রিওটস, সিরেনিয়ান এঁরা অ্যান্টিওক-এ এসে যিশুর কথা গ্রীকদের বলতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে অ্যান্টিওক-এ অনেক মানুষ প্রভুর বাণী গ্রহণ করলেন। জেরুজালেমে এই সংবাদ পৌঁছালো। সেখানকার গির্জার পক্ষ থেকে বার্নাবাসকে পাঠানো হল অ্যান্টিওক-এ। বার্নাবাস মনেপ্রাণে খ্রিস্ট বিশ্বাসী, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। গির্জার জন্য তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিনি দান করেছেন। তাঁর নামের অর্থ ‘উৎসাহদাতা’, কাজেও তিনি ঠিক তাই। কত মানুষকে যে তিনি ‘ওয়ে’-তে নিয়ে এসেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাকে অ্যান্টিওক-এ নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি টারসাস এলেন। অ্যান্টিওক-এ টানা এক বছর আমি বার্নাবাস-এর শিক্ষানবিস থেকে কাজ করেছি, তাঁর কাছ থেকে শিখেছি বহু বিষয়। আগাবাসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সেই সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। আমরা তখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ, ‘খ্রিস্টান’ নামে পরিচিতির সূত্রপাতও অ্যান্টিওক-এ। আমরা ঠিক করেছিলাম, জুডিয়ায় আমাদের ভাইদের সাধ্যমত সাহায্য করব। লোকের দেওয়া ত্রাণ সামগ্রী বার্নাবাস আর আমি দুজনে মিলে পৌঁছে দিতাম দুর্ভিক্ষপীড়িতদের কাছে। যেখানেই পৌঁছতাম, মানুষ আমাকে দেখে ভয় পেত, অবিশ্বাস করত, ভাবত, “এ এখানে কেন? এ আবার কী নতুন নাটক?” বার্নাবাস তাদের বোঝাতেন, প্রভু আমাকে তাঁর নিজের সন্তান করে নিয়েছেন। বার্নাবাস জনপ্রিয় ছিলেন, মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করত, তাঁর সহকারী হয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে আরম্ভ করলাম ধীরে ধীরে। ওদিকে অত্যাচারী রাজা হেরোদ খ্রিস্টানদের উপর প্রবল অত্যাচার আরম্ভ করেছিলেন। তিনি জনের দাদা জেমস-এর মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। জন জেরুজালেমে চলে এলেন। আমরাও ত্রাণকাজের শেষে গির্জার আদেশে জেরুজালেমে এসে জনকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে অ্যান্টিওক-এ ফিরলাম। অ্যান্টিওক-এর গির্জায় এখন বার্নাবাস, সিরিন থেকে লুসিয়াস, সিমিয়ন, মানেন আর আমাকে ও জনকে নিয়ে বেশ বড় একটা খ্রিস্টান দল তৈরি হল। জনের নাম পালটে মার্ক রাখা হল। ঠিক হল, একসঙ্গে প্রচারে বের হবো। কিন্তু তার আগে প্রভুর পরবর্তী ইচ্ছা জানার জন্য ও তাঁর আদেশের অপেক্ষায় আমরা সমবেত ভাবে প্রার্থনা ও উপবাসের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। অবশেষে আদেশ এল। প্রভুর বাণী বয়ে আমাকে যেতে হবে মানুষের কাছে। বার্নাবাস আমার মেন্টর, সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবেন তিনিই, অতএব তিনিও যাবেন আমার সঙ্গে, এবং সহকারী হয়ে সঙ্গে এলেন জন, যিনি এখন মার্ক। আমাদের যাত্রা নির্বিঘ্ন ও সফল হওয়ার জন্য বাকিরা আশীর্বাদী হাত রাখলেন আমাদের মাথায়, আমরা বেরিয়ে পড়লাম প্রভুর নাম নিয়ে। এই আমার প্রথম খ্রিস্টীয় মিশনের সূচনা, সেলুসিয়া হয়ে জাহাজে রওনা হলাম সাইপ্রাস। এতসব কিভাবে সম্ভব হচ্ছিল? অলক্ষ্যে প্রভুই সমস্ত ব্যবস্থা করছিলেন।


একটানা কথা বলে পল ক্লান্ত। রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। রাতচরা পাখির বাসায় ফেরার ডানার শব্দ অস্পষ্ট ভাবে ভেসে আসছে। দূরে বোধহয় সিনাগগ-এর ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠল। ভোর হচ্ছে। রোম নগরীর বুকে ফুটে উঠছে নতুন একটি দিনের কুঁড়ি। নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করল চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি কালো ছেলে। মলিন তার বসন। নীরবে এসে সে বসল পল-এর পায়ের কাছে। তাঁর শিকল বাঁধা হাত চুম্বন করে গভীর মমতায় মুছিয়ে দিল গা-হাত-পা। তারপর বাটিতে করে গরম সুরুয়া নিয়ে এসে রাখল পল ও লুক দুজনের জন্য। লুক-এর দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চেয়ে পিছন না ফিরে এক পা এক পা করে সে বন্দীশালার বাইরে চলে গেল।

লুক ও পল কারোরই খেয়াল ছিল না কথায় কথায় সমস্ত রাত কখন শেষ হয়েছে। প্রভুর কথা, মেরী-মাতার কথা স্মরণ করতে ক্লান্তিবোধ আসেও না।

লুক জিজ্ঞেস করে, “কে এই ছেলেটি? তোমাকে দেবতার মত শ্রদ্ধা করে দেখছি!”

পল: ওর নাম ওনেসিমাস। হতভাগা ছেলেটি পালিয়ে এসেছে ওর মনিবের কাছ থেকে। আর কে ওর মনিব, জানো? ফিলেমন, আমার বন্ধু, শিক্ষক, আশ্রয়দাতা। তাঁর কাছে আমার হৃদয় বন্ধক দেওয়া আছে। তিনিই প্রথম আমার খ্রিস্ট বিশ্বাসের বুনিয়াদ গড়ে তুলেছেন। দামাস্কাসের পথে আমার ঐ অলৌকিক দর্শনের পরে আমি গির্জায় যেতে আরম্ভ করি। সেসময় তাঁর বাড়ির অতিথি-কক্ষে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন তিনি। নিজের বাড়িতেই একটি ছোট গির্জা করেছিলেন ফিলেমন। বাড়ির সকলেই খ্রিস্ট-বিশ্বাসী, ভক্ত মানুষ। অতি সজ্জন সকলেই। সম্ভ্রান্ত পরিবারে দাস রাখা আশ্চর্যের কিছু নয়। ওনেসিমাস ফিলেমনের ক্রীতদাস ছিল বলেই জানতাম। ‘ফিলেমন’ মানে গ্রীক ভাষায় ‘দয়ালু’ আর ‘ওনেসিমাস’ বলতে ‘দরকারে কাজে আসে’ এমন লোক বুঝায়। অথচ আমি বুঝতে পারছি না, ফিলেমনের সঙ্গে ওনেসিমাসের কী এমন ঘটল যে, সে তার কোন কাজে এল না! যাই হোক, সে রোমে এসেছিল বড় শহরের ভীড়ে হারিয়ে যেতে, যাতে তাকে আর কেউ খুঁজে না পায়। আহা! স্বাধীনতা যে সকলেরই প্রিয়! বন্দী-জীবন যে কী কষ্টের তা আমার থেকে ভাল কে বুঝেছে! কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। বেচারা আমার বড়ই অনুগত হয়ে পড়েছে। জানি না সে আমার মধ্যে কী দেখেছে? দিনরাত ছায়ার মত আমার কাছেপিঠে ঘুরঘুর করে, মুখ ফুটে কিছু চাইবার আগে যা চাই সব হাতের কাছে এনে দেয়। আমার জন্য সে সত্যিই বড় দরকারি কাজের মানুষ হয়েছে প্রভুর ইচ্ছায়। তাকে আমি প্রভুর নামে দীক্ষিত করেছি। এখন সে আমাদের মতই প্রভুর সন্তান, অর্থাৎ আমাদের ভাই। কিন্তু আমার কাছে সে আমার সন্তান। আমার বন্দীদশায় তাকে পেয়েছি, আর সে বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেতে পালিয়েছে। তার আর আমার এক সত্তা।

লুক: তাহলে তুমি তাকে নিজের কাছে রেখে দাও।

পল: তা হয় না। সেটা হলে আমি সত্যি সুখী হতাম। কিন্তু তা আইনবিরুদ্ধ। ‘পলাতক-দাস-আইন’ (Fugitive Slave Act: 1793, 1850) অনুসারে আমাকে তার মনিবের কাছে ফেরত পাঠাতেই হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এমন দিন থাকবে না। খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ মানুষকে পশুর মত যথেচ্ছা ক্রয় করতে পারবে না। এই পৃথিবীতে মানুষ শান্তিতে বাস করবে, পেট ভরে দুমুঠো অন্ন খেয়ে নিজের পরিবারের ভালবাসার মানুষগুলোর সঙ্গে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার শেষ হবে। আমি ওনেসিমাসকে ফেরত পাঠাবো। টিকিকাস এখানে আছে, আমার সঙ্গে, ওকে তো তুমি চেনোই, ওকে কলোসি পাঠাবো, যাতে করে ওখানকার গির্জার দায়িত্ব থেকে টিটাসকে সাময়িক মুক্ত করতে পারে। আমি টিটাসের সঙ্গে দেখা করতে চাই। ওকে বলার আছে অনেক কিছুই। তা, টিকিকাসের সঙ্গে ওনেসিমাসকে পাঠিয়ে দেব, ও ফিলেমনের হাতে সঁপে দেবে তাকে। কিন্তু আমি চাই না, ওনেসিমাসের উপর কোনও ভাবে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার হোক। সে এখন প্রভুর সন্তান। তাকে ক্ষমা করতেই হবে। ক্ষমাই যে আমাদের, প্রভুর সন্তানদের ভূষণ। আমি ফিলেমনের জন্য একটা চিঠি লেখে পাঠাবো টিকিকাসের হাতে। তুমি কি সেই চিঠিটা লিখে দিতে পারবে?

লুক: সানন্দে পল! তোমার প্রতিটি অনুরোধ আমার কাছে আদেশ। তোমার সঙ্গে থাকার এর চেয়ে বড় পুরস্কার আমার কাছে আর কিছুই হতে পারে না। এস, আমরা আপাতত কিছু খেয়ে নিই। তোমার তো যে কোন মুহূর্তে ডাক আসতে পারে রাজপ্রাসাদে। রাজ-পুরোহিতরাও তোমার সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। প্রভু নিজেকে রাজা বলতেন। তারা তাঁকে বিদ্রূপ করে কাঁটার মুকুট পরিয়েছিল। অথচ দেখছি, বন্দী পল, প্রভুর সন্তান, কারাবাসেও রাজপুত্রের মতই সম্মানিত।


কথায় কথায় তাঁরা দুজনেই ওনেসিমাসের রেখে যাওয়া খাবারের কথা ভুলে গিয়েছেন। ঘরের এক প্রান্তে দুটি থালায় রাখা মোটা মোটা জোয়ারের রুটি, মাছের ঝোল ও কিছু শুকনো খেজুর। ঝোলের বাটি থেকে এখনও উঠছে সামান্য ধোঁয়া। সেদিকে চেয়ে দুজনেরই জৈবিক ক্ষুধাবোধ জাগ্রত হল।

লুক: এসব খাবার কি ওরা তোমার জন্য ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন?

পল: ওরা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি নিইনি। আমার বন্ধুরা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করছেন এখনও, তাতেই আমার চলে যায়। এমনকি আমাকে দেখতে যারা আসেন, তাদের খাওয়া খরচাও আমিই বহন করতে সক্ষম। ওনেসিমাসের সব খরচ আপাতত আমারই। তারা আমাকে এতদূর অনুগ্রহ করেছেন যে রোমের বন্দীশালায় মাটির নিচের কারাগারে নয়, আমি আমার নিজের ভাড়া করা গৃহে বন্দী থেকে বিচারের রায় শোনবার জন্য অপেক্ষা করবার অনুমতি পেয়েছি। আমি প্রয়োজনে একজন ব্যক্তিগত দাস নিযুক্ত করতে পারি, আমার কাছে আমার বন্ধু ও অতিথিরা আসতে পারেন, এসে থাকতেও পারেন, আমি প্রহরীর প্রহরাধীন থেকে শহরের মধ্যে বেড়াতেও পারি, প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র লিখতে পারি। অনেকখানি স্বাধীনতা, অনেকখানি পাওয়া। তাই এটুকুকে কাজে লাগাতে চাই।

লুক: আর আমি তোমার প্রত্যেক কাজে লাগতে চাই।

পল: তবে দিনের আলোয় চিঠি কয়েকখানা লিখে ফেলা যাক। আমি বলি, তুমি লেখ। রাত্রে আলোর অভাব। অতএব লেখার সুবিধা কম। তখন তুমি আমাকে তোমার অসমাপ্ত কাহিনীগুলো শোনাবে।

লুক: কোন কাহিনী?

পল: যে কথা বলছিলে, মেরী-মাতাকে দর্শন করেছ তুমি, যা জেনেছ তাঁর কাছ থেকে, সেসব শুনতে আমি ব্যাকুল!

লুক: বেশ। তাই হবে। আমি প্যাপিরাসের ছাল কতকাল ধরে চাপা দিয়ে রেখে শুকিয়েছি, তারপর মাপ মত কেটে লেখবার জন্য তৈরি করেছি। সেসব তো এই কাজে লাগবে বলেই! আমি আমার প্যাপিরাসের ছালের লেখবার পাতা, শুকনো পাম্পাস ঘাসের কাঠি মাপসই কেটে তৈরি করা মজবুত কলম আর জলপাই তেলের প্রদীপের ঘন কালির গুঁড়ো জল ও আঠা দিয়ে গুলে তৈরি করা কালি—সব প্রস্তুত রেখেছি। এখন কেবল লেখার অপেক্ষা।

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন