রিঙ্কি বোস সেন | ঋণমুক্ত

রিঙ্কি বোস সেন | ঋণমুক্ত

দু'হাত তুলে বুড়ো আঙুল দুটো কপালে ঠেকিয়ে জনতাকে সম্বোধন করে বক্তব্য শুরু করল বিশ্বম্ভর মণ্ডল। সঙ্গে সঙ্গে মাঝ বৈশাখের আগুন-রোদে বসে থাকা বেলাতলা গ্রামের উল্লসিত মহিলা মণ্ডলী, 'বিশ্বম্ভর বাবু জিন্দাবাদ- বিশ্বম্ভরবাবু যুগ যুগ জিও' বলে চেঁচিয়ে উঠলো। গোটা আকাশ-বাতাস, মাঠ-ক্ষেত জুড়ে সেই উল্লাস প্রতিধ্বনিত হল। এদিকে সেই সোরগোলের সুযোগ নিয়ে বিশ্বম্ভর ঘাড় ঘুরিয়ে নরেশের কানের কাছে দাঁতে দাঁত চিপে বলল,

__"ওই হারামজাদা ছাতা'টা সোজা করে ধরতে পারিস না? চারবেলা চব্য চোষ্য গিলছিস আর ধম্মের ষাঁড় হচ্ছিস। আমি গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি! ঠিক করে ধর ছাতাটা।"

নরেশ বিনা উত্তরে ছাতা'টা সোজা করে বিশ্বম্ভরের মাথায় ধরলো। বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, কে জানে! হয়তো চারবেলা চব্য চোষ্য গেলার ঢেকুর কিনা।

এই বিশ্বম্ভর মণ্ডল হল স্থানীয় এম এল এ। বয়স বাষট্টি। বিয়ে-শাদি করেনি। সারাদিন মিটিংমিছিল নিয়ে ব্যাস্ত থাকে আর সন্ধ্যে হলে পানীয়তে ডুব দেয়। নরেশ হল তার চব্বিশ ঘন্টার সেবক। বিশ্বম্ভরের খানাপিনার দেখাশোনা থেকে শুরু করে, ধোপার বাড়ি থেকে তার কাচা পাজামা-পাঞ্জাবির ব্যবস্থা করা, রাতের পানীয়ের সাথে চাটের আয়োজন, সময়ে সময়ে ওষুধপত্র হাতের কাছে জুগিয়ে দেওয়া প্রায় সবকিছুই নরেশের তত্ত্বাবধানে চলে। আর রোদ-জলে বিশ্বম্ভরের মাথার উপর শক্ত করে ছাতা ধরার কাজটি তো আছেই। এই কাজটা নরেশ কারোকে দেয় না, কারণ বিশ্বম্ভর যেভাবে নরেশের মাথার উপর ছাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাতে নরেশ এইটুকু করতেই পারে, তাতে বিশাল ঋণের কিছুটা অংশও যদি মেটানো যায়।

নরেশকে বিশ্বম্ভর আবিষ্কার করে এই ব্লকেরই চণ্ডীধাম গ্রাম থেকে, প্রায় বিশ বছর আগে। চণ্ডীধামে তখন ভীষণ বন্যা। বিশ্বম্ভর গিয়েছিল ত্রাণ বিতরণে। সেখানেই খুঁজে পায় আট-ন বছরের, কঙ্কালসার, চালচুলোহীন একটি অভুক্ত, অনাথ ছেলেকে, নাম নরেশ। দেখা মাত্রই দয়া হয় বিশ্বম্ভরের, অভিভাবকত্ব নিয়ে নেয় ছেলেটার। সেই থেকে সেবা আর ফাইফরমাইশ খাটার পরিবর্তে নিশ্চিত হয়ে যায় নরেশের চারবেলা ফ্রি খাওয়া-পরা আর সাথে ঝুড়ি ঝুড়ি গালিগালাজ, যেমন 'হারামজাদা'।নরেশের একেক সময় মনে হয় ও বোধহয় সত্যিই হারামজাদা। জন্মে থেকে বাপকে তো কোনোদিন দেখেনি। মা'ও পালিয়ে যায় অন্য লোকের সাথে। বুড়ো দিদা-দাদু আর তারপর মামা-মামীর দয়া দাক্ষিণ্যে চলত ওর। বন্যার পর সেইটুকুও চলে যায়। তারপর থেকে এই বিশ্বম্ভরের কৃপায় বেঁচে থাকা। এই কৃপাই হল ওর জীবনের যাবতীয় উপার্জন। আর এই উপার্জন ওকে এতটাই বেঁধে ফেলেছে যে মালিক বাপ-মা তুলে গালিগালাজ দিলেও কেমন জানি অবশ হয়ে থাকে নরেশ।


__"আমার মা-বোনেদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি ধন্য! এই সনোস্থাটির পেলান হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। টাকার জন্যি আটকে ছিল। যাগগে, শেষ পয্যন্ত হল। আমার মা-বোনেরা এবার সাবোলম্বি হবে।"

বিশ্বম্ভর একটু থামলো, কাশি হচ্ছে বেশ। বাঁ'পাশে ঘুরে নরেশের দিকে তাকালো। নরেশও তাকিয়ে বিশ্বম্ভরের দিকে।

__"সূঁয়োরের বাচ্চা, তাকিয়ে দেখছিস কী? জলের বোতলটা দে!"

কড়া চাউনি আর হিসহিসে গলায় বিশ্বম্ভর বলল। নরেশ বিদ্যুতের গতিতে জলের বোতল এগিয়ে দিল। কয়েক ঢোক জল খেয়ে বিশ্বম্ভর আবার শুরু করল,

__"আমার মা-বোনেরা নিজ পা'য়ে দাঁড়াক। কেন তারা অন্যের দিকে চেয়ে থাকবে, গঞ্জনা শুনবে...তাই না?"

নিমেষে মহিলাদের উল্লাস ধ্বনি ছাদ-খোলা মঞ্চে এসে আছড়ে পড়লো।

__"ছাতা'টা ঠিক করে ধর রে শালা, মাথায় উপর যে আগুন জ্বলছে তার উপর এত চিলচিৎকার!"

নরেশ ছাতা'টা সোজা করে ধরল। সাথে নিজের মেরুদণ্ডটাতেও একটু কেমন জানি টান অনুভব করলো। সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মাথাটা উঁচু করল একটু। দুচোখ সামনের দিকে, দৃষ্টি অনেক দূরে...যেখানে শুধু ও নিজে আছে আর আছে ওর কিছু স্বপ্ন। অনেকদিন ধরে লালিত এবং একইসাথে অবহেলিত কিছু স্বপ্ন।

__"যেখানে পশুপাখিরা, জন্তুরা সব সাবোলম্বী, নিজের অন্ন নিজে জোটায় সেখানে আমার মা-বোনেরা সাবোলম্বী হবে না? এ কেমন কথা? সংসারের দুই চাকার এক চাকা হল মেয়েছেলে, এখন এই মেয়েছেলেরাই যদি কমজোর হয় তাহলে জগৎ সংসার চলবে কী করে? এই কথা চিন্তা করেই তো আমাদের এই উদ্দোগ। এখন থেকে এই বেলতলা গ্রামের মা-বোনেদের স্বামীর বা শ্বশুরের অত্যাচার, মারধোর, গাল সহ্য করে বেঁচে থাকার দিন শেষ...এখন থেকে এখানকার মা-বোনেরা মাথা উঁচু করে বাঁচবে, নিজের পেট আর পরিবারের পেট চালাবে...কী তাই তো? কী বলছে আমার বেলতলা গ্রামের মা-বোনেরা?"

আবার একবার আকাশ কাঁপিয়ে হাততালির রোল উঠলো। মঞ্চে আছড়ে পড়লো সেই উল্লাস ধ্বনি। 'বিশ্বম্ভর মন্ডল জিন্দাবাদ, বিশ্বম্ভর মন্ডল যুগ যুগ জিও' বলে গোটা বেলতলা গ্রাম আনন্দে মেতে উঠলো। বিশ্বম্ভর এবার আরও একবার দু'হাত তুলে দুই বুড়ো আঙুল কপালে ঠেকিয়ে,একগাল হেসে, নমস্কার করে মঞ্চ থেকে নেমে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ঘুরে দাঁড়িয়েই মুখের সব হাসি সরিয়ে দিয়ে নরেশের দিকে তাকিয়ে, দাঁত খিঁচিয়ে বলল,

__' ওই হারামজাদা, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিস কী? চল এবার, গাড়ির দরজা খুলবি চল। গা'টা খুব ম্যাজম্যাজ করছে, মালিশ লাগবে বুঝলি...ওই শালা তোর হলটা কী? নড়ছিস না যে!'


নরেশ ছাতা'টা ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলল।তারপর বিশ্বম্ভরের চোখে চোখ রেখে,

__" বাবু,আপনি আমার বহু উপকার করেছেন, বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়া দিয়ে গেছেন, এতগুলো বছর। আমিও চেষ্টা করেছি আপনার সেবা করে আর ফাই-ফরমাইশ খেটে সেই উপকারের ঋণ শোধ করার। জানি আপনি যা করেছেন তার মূল্য শোধ করা সম্ভব নয়। তবুও চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু আজ যে উপকারটা করলেন তার শোধ কোনোদিনই সম্ভব নয়। আজ আপনি আমার চোখ খুলে দিলেন।পশুপাখি যা পারে তা আমি মানুষ হয়ে এতদিন পারিনি। কিন্তু আর দেরি করা যাবে না বাবু...!'


নরেশ থামলো। বিশ্বম্ভর বাকরুদ্ধ। এতগুলো বছর ধরে 'জি হুজুর' করে যাওয়া, পরান্নভোজী ছেলেটার মুখে হঠাৎ এইসব কথা!

__" এ্যাই, তোর ব্যাপার কী বল তো! গাঁজা টেনেছিস নাকি? শালা কী আলফাল বলে চলেছিস...ছাতা'টা ঠিক করে ধর দেখি, মাথা'টা পুড়ে যাচ্ছে আর এ উজবুক বাতেলা মারছে"।

নরেশ এবার ছাতা'টা বিশ্বম্ভরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, __"বাবু এই রইল আপনার ছাতা, নিজে ধরুন... গোটা দুনিয়াকে স্বাবলম্বী হওয়ার পাঠ দিচ্ছেন, তাহলে শুরুটা নিজেকে দিয়েই করুন বরং!...আপনার আমাকে না হলেও চলবে আর আমারও আপনাকে...।"

এইটুকু বলেই নরেশ মঞ্চ থেকে নেমে গিয়ে চোখের পলকে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।​ ​

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন