ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় | সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল...

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় | সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল...

কি হলে কি হত বা হতে পারত আজ প্রায় বাহাত্তর বছর পরে সে কথা বলা অবান্তর, মানছি । তবু বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাঙালির উন্মাদনার ভরা বাজারে একটা আক্ষেপ ফুটবল প্রিয় আমাদের থাকে বৈকি! ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ হলেও একটা সুযোগ তো এসেছিল তখন সদ্য স্বাধীন ভারতের ফুটবল দলের কাছে বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে সামিল হওয়ার। তখন যদি সরকার ও দেশের খেলাধুলার নিয়ামকরা অদূরদর্শিতার পরিচয় না দিতেন, বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বুঝতেন, তাহলে হয়তো সুইডেন, ইতালী, প্যারাগুয়ের মত দলের সঙ্গে খেলা ও বিশ্ব আসরে সামিল হওয়ার অভিজ্ঞতা দেশে ফুটবল খেলায় নতুন জোয়ার আনতে পারতো আর দেশ পেয়ে যেত শৈলেন মান্না, মহাবীর প্রসাদ, মেওয়ালাল, অনিল নন্দী আহমেদ খান, সন্তোষ নন্দী্র মত এগারো জন ‘বিশ্বকাপার’ ।

১৯৫০ চতুর্থ বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসবে ব্রাজিল’এ । যুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬এর বিশ্বকাপ হয়নি । ১৬টা দেশ নিয়ে খেলা হবার কথা ছিল । এশিয়ান গ্রুপে ভারতের সঙ্গে ছিল মায়নামার, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া । কিন্তু মায়নামার, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গ্রুপ লিগে খেলে মূল প্রতিযোগিতায় যেতে রাজি হয়নি, তারা নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ভারতের সামনে সুযোগ চলে আসে । মূল প্রতিযোগিতায় ৩ নম্বর গ্রুপে ভারতের সঙ্গে ছিল ইতালী, সুইডেন ও প্যারাগুয়ে । কিন্তু সদ্য স্বাধীন সরকার ও তার ক্রীড়া নিয়ামকদের অদূরদর্শিতায় ভারতের ফুটবল দল সে সুযোগ হারায়, ভারত বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় । তারা সেদিন বোঝেনি বা বুঝতে চাননি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা, ফল যত খারাপই হোক, তা ভারতের খেলাধুলার ক্ষেত্রে কি সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পারত । ভারত কেন নাম তুলে নিয়েছিল সে এক রহস্য আজও। শোনা যায়, ১৯৪৮এর অলিম্পিকের পর ফিফা ভারতকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল যে খালি পায়ে আর খেলা যাবে না (১৯৪৮এর লন্ডন অলিম্পিকে ভারত খালি পায়ে খেলেছিল)। ১৮ জোড়া বুট সংগ্রহ করাই নাকি অসাধ্য হয়েছিল । আরো শোনা যায় তখন ব্রাজিল যাওয়াও সহজ ছিল না, জাহাজে করে অত দূর পাড়ি দিতে হত, কারণ সদ্যস্বাধীন ভারতে তখনও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরু হয়নি । জাহাজে করে অতদূর যাওয়া–সম্মত হয়নি ভারত । ফিফার রেকর্ডে অবশ্য লিপিবদ্ধ আছে যে আর্থিক সমস্যার জন্য ভারত নাম তুলে নিয়েছে।

ক্রুদ্ধ ফিফা পরের বিশ্বকাপের গ্রপ পর্যায়ে ভারতকে নাম দিতে দেয়নি । অথচ তখনকার ভারতীয় ফুটবল দলের খেলা হেলাফেলা বা অবজ্ঞা করার মত ছিল না, এশিয়ান গ্রুপ পর্যায়ে বিজয়ী হয়ে মূল পর্বে যাওয়া খুবই সম্ভব ছিল । 

দু বছর আগে ১৯৪৮এর লন্ডন অলিম্পিকে (সেটাই ভারতের প্রথম অলিম্পিক অংশগ্রহণ) খালি পায়ে খেলে শক্তিশালি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হেরে বিদায় নিয়েছিল বটে, কিন্তু ফ্রান্সের গোলে একবার বল ঢোকাতে পেরেছিল এবং খেলার ৭০ মিনিট পর্যন্ত ১-১ গোলে আটকে রাখতে পেরেছিল। দু দুটি পেনাল্টিও পেয়েছিল ভারত, তার একটা থেকেও গোল করতে পারেন নি শৈলেন মান্না, মহাবীর প্রসাদ । পারলে হয়তো খেলাটা অন্তত অমিমাংশিত রাখতে পারতো, কিংবা জিতেও যেতে পারতো । পরের বছর ১৯৫১র প্রথম এশিয়ান গেমসএ ফুটবলে স্বর্ণ পদক পেয়েছিল ভারত । সেই সময় অর্থাৎ চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশক ও ষাটের দশকের শুরু পর্যন্ত ভারতের ফুটবল দল নানান আন্তর্জাতিক আসরে সমীহ করার মত সাফল্য পেয়েছিল ।১৯৫০ ও ১৯৬২তে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়াও ১৯৫৬ অলিম্পিকসে ফুটবলে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে চতুর্থ হয়েছিল । কিন্তু সূযোগ পেয়েও ভারতের বিশ্বকাপ খেলা হয়নি সরকারী অদূরদর্শিতায় । ১৯৮২ পর্যন্ত ভারত আর বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে খেলার জন্য নাম দেয়নি বা দিতে সাহস করেনি । ১৯৮২তে তখনকার এ আই এফ এফ সচীব অশোক ঘোষের উদ্যোগে বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে অংশ নিতে থাকে ১৯৮৬ থেকে । কিন্তু ১৯৫০ থেকে ৮৬ এই সময়ের মধ্যে এশিয়ার দেশগুলি ভারতের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে । কয়েক বছর আগে দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল প্রতিভা, তখনকার ভারতীয় দলের অধিনায়ক প্রয়াত শৈলেন মান্না এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন “ আমাদের বিশ্বকাপ নিয়ে কোনও ধারণা ছিল না । যদি থাকতো তাহলে আমরা নিজেরাই উদ্যোগ নিতাম যাওয়ার জন্য। সে সময় আমাদের জন্য অলিম্পিকই ছিল সবকিছু। কোনো কিছুই অলিম্পিক থেকে বড় ছিল না ।”

‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’এর কথা বলতে গিয়ে, স্বাধীনতার সাত দশকে তার পাওয়া-না পাওয়ার বৃত্তান্ত জানার আগে বাহাত্তর বছর আগেকার ভারতের ফুটবল ইতিহাসের দু একটা পৃষ্ঠা ছুঁয়ে নিলাম, কেননা তখন ফুটবল মানেই বাংলা। অলিম্পিক বা আন্তর্জাতিক আসরে ভারতীয় দলে ৯/১০জন খেলোয়াড় থাকতো বাংলা থেকে । ১৯৪৮এর লন্ডন অলিম্পকে ছিল ১০ জন বাংলার খেলোয়াড় ।

বাংলায় ফুটবল খেলার প্রসার হয়েছিল, জোয়ার এসেছিলও বলা যায়, স্বাধীনতার অনেক আগেই। স্বাধীনতা উত্তর পর্বে অন্তত সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলার ফুটবল গর্ব করার মত যায়গায় পৌছে গিয়েছিল এই সত্য অস্বীকার করার কোন যায়গা নেই । এখনও কলকাতা ভারতীয় ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র । যদিও এখন বাঙালির ‘ফুটবল গর্ব’ তলানিতে ।

ঔপনিবেশিক ইংরাজের হাত ধরে এদেশে ফুটবল খেলার পত্তন হয় উনিশ শতকে । কলকাতা তখন ইংরাজ শাসিত ভারতের রাজধানী । অতয়েব কলকাতাতেই এদেশের ফুটবল খেলার পত্তন হয়েছিল। ১৮৩৫এ প্রথম ফুটবল ম্যাচের সংবাদ জানা যায় (সূত্র ‘ হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান ফুটবল’/নির্মল নাথ) । ১৮৭৭ সাল থেকে ইংরেজ সেনারা ময়দানে নিয়মিত ফুটবল খেলা শুরু করে । তারা প্রতিষ্ঠা করলো কলকাতার প্রথম ক্লাব ‘ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব’১৮৭২এ । বাঙালিই বা পিছিয়ে থাকবে কি করে ! হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্র, নাম তাঁর নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী, ক্লাসে বন্ধুদের কাছ থেকে ত্রিশ টাকা চাঁদা তুলে ইংরাজদের দোকান থেকে একটা ফুটবল কিনে বন্ধুরা মিলে খেলতে শুরু করলো। খেলা মানে বলে এলোপাথাড়ি লাথি মারা । দু দলের ভাগ নেই, গোলপোষ্ট নেই, নিয়ম-কানুন জানা নেই । প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক বি ভি স্ট্যাক ফুটবল নিয়ে নগেন্দ্রপ্রসাদদের উৎসাহ দেখে এগিয়ে এলেন তাদের দুটো দলে ভাগ করে খেলার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিলেন । সেই থেকে শুরু হল বাংলার ফুটবল আর ভারতীয় ফুটবলের জনকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হলেন স্যার নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী । ১৮৮৪তে নগেন্দ্রপ্রসাদ প্রতিষ্ঠা করলেন ওয়েলিংটন ক্লার যার নাম পরে হয়েছিল টাউন ক্লাব । সে এক সন্ধীক্ষণ, জাতীয়তাবাদের জাগরণ হয়েছে, ১৮৮৫তে প্রতিষ্ঠা হয়েছে জাতীয় কংগ্রেস । ঠিক সে বছরেই নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হল শোভাবাজার ক্লাব । সমকালেই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৯তে ‘মোহনবাগান’ও ‘এরিয়ান’ ১৮৯১তে মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব । ১৮৯৩তে গঠিত হয় ‘ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন’ বা আই এফ এ, আর ঐ বছরই শুরু হয় আই এফ এ শীল্ড । ১৮৯৮ থেকে শুরু হয় এশিয়ার প্রাচীনতম কলকাতা ফুটবল লিগ।কলকাতা লিগ ফুটবল প্রতিযোগফিতা শুরু হবার ২২ বছর পরে প্রতিষ্ঠা হয় ইস্টবেঙ্গাল ক্লাবের । লীগের আগে সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতার আসর ছিল ট্রেডস কাপ (১৮৭৯) । ১৮৯২তে শোভাবাজার ক্লাব ইংরেজ সেনা দল সারে রেজিমেন্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় ফুটবল দল হিসাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জয়লাভের কৃতিত্ব অর্জন করে । তারপর ১৯১১তে বৃটিশ সেনা দলকে হারিয়ে মোহনাগানের ঐতিহাসিক শীল্ড জয়ের জাতীয় গৌরব বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে নতুন মাত্রা এনেছিল । ১৯১১ বছরটি তাৎপর্যময় । এই বছরেই প্রবল আন্দোলনের চাপে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব প্রত্যাহিত হয় আর কলকাতা বৃটিশ ভারতের রাজধানীর মর্যাদা হারায় ।

প্রায় একই সময়ে পূর্ব বাংলাতেও ফুটবল খেলার প্রসার ঘটতে থাকে । ১৯১১র আই এফ এ শীল্ড জয়ী মোহনবাগানের শিবদাস ভাদুড়ী ও বিজয়দাস ভাদুড়ী ছিলেন জন্মসূত্রে পূর্ববাংলার লোক তাদেরই পরিবারের তারাদাস ভাদুড়ী ওয়েলিংটন ক্লাবের প্রতিষ্ঠা করেন । পরে ১৮৯৪এ নাম পরিবর্তন করে এই ক্লাবেরই নাম রাখা হয় উয়াড়ি ক্লাব ।এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে আরো কয়েকটি ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠা হয় ।

তখন, সেই আদিপর্বে ভারতের ফুটবল মানেই বাংলার ফুটবল । বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত আই এফ এই ছিল দেশের ফুটবল খেলার নিয়ন্তা । সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের পত্তন হল অনেক পরে ১৯৩৭এ, ততদিনে বাংলার ফুটবল পেরিয়ে এসেছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি । সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের উদ্যোগে অতঃপর অন্যান্য রাজ্যেও ফুটবল খেলার প্রসার শুরু হয়, ১৯৪১এ শুরু হয় ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতার আসর ‘সন্তোষ ট্রফি’ । এ পর্যন্ত ৭৬ বছরের সন্তোষ ট্রফির ইতিহাসে বাংলা বিজয়ী হয়েছে ৩২ বার, রানার্স হয়েছে ১২বার । এই তথ্য বলে দেয় কেন সর্বভাতীয় ক্ষেত্রে বাংলাই ফুটবলের সেরা ।

না, এমন কথা এখন আর জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না । বলা যায় বাংলার ফুটবল-গৌরব তলানিতে । শুধু তলানিতে নয়, বিভিন্ন বয়সভিত্তিক ভারতীয় দলে বাংলার প্রতিনিধিত্ব এখন প্রায় বিলুপ্ত । সিনিয়র দলে ডাক পাওয়া ৪৩ জনের মধ্যে মাত্র ৪জন । জুনিয়ার বা সাব-জুনিয়ার দলে অবস্থাটা আরও খারাপ । আসলে বাংলার ফুটবলে কোন সাপ্লাই নেই । পাড়া ফুটবল প্রায় উঠে গেছে । সরকারের দু লক্ষ টাকার অনুদানের খতিয়ান থেকে জানতে পারি অজস্র ক্লাবের অস্তিত্বের কথা । তাদের বেশিরভাগই কালীপূজা করে কেউবা বছরে একবার রক্তদান শিবির বা ছোটদের বসে আঁকার আসর করে ব্যস । ফুটবল খেলার প্রসারে তাদের কোন অবদান আছে বলে মনে হয় না। পাড়া ফুটবল নেই, জেলা ফুটবল ধুঁকছে, ফুটবলার আসবে কোথা থেকে ! জেলায় যেটুকু খেলা হয় সেখান থেকে সেখান থেকে জহুরীর চোখ নিয়ে ফুটবলার তুলে আনার মত লোকও আর নেই । এখন আর বাংলায় দুখীরাম মজুমদার, বলাইদাস চ্যাটার্জীরা জন্মান না যারা ময়দান, খেলার মাঠ ঘুরে ঘুরে ফুটবলার তুলে আনবেন ।

বাংলার মত ফুটবল আবেগ আর কোন রাজ্যে নেই, বাঙালির রক্তে মিশে আছে ফুটবল, একথায় কোন খাদ নেই তা ভুভারতে সকলেই স্বীকার করবেন ।

স্বাধীন ভারতে প্রথম থেকেই ঘরোয়া ফুটবল বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল৷ এমনকি অঞ্চলভিত্তিক প্রতিযোগিতা সন্তোষ ট্রফিও স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল৷ ভারত বিশ্ব ফুটোবল থেকে ক্রমশ হারিয়ে গেলেও বাঙ্গালির ফুটবল প্রেমে বিশেষ ভাটা পড়েনি ।তবে বিগত চার দশকে বাঙালি অনেক ওঠা-নামা, ভাঙ্গা-গড়ার সাক্ষি থেকেছে ।ফুটোবল মাঠে ঘটি-বাঙ্গালের লড়াইএর ময়দানী উত্তেজনার এক কুৎসিত পরিণতি দেখা গেল ১৯৮০র ১৬ই অগস্ট ইডেন উদ্যানে আয়োজিত বড় ম্যাচে পদপিষ্ট হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু বাঙ্গালির ফুটবল প্রেমে এক কালো দাগ ।১৯৭৫ সালের শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানকে ৫-০ গোলে হারায়। সেই পরাজয় সহ্য করতে না পেরে পঁচিশ বছরের যুবক উমাকান্ত পালধি আত্মহত্যা করে। সুইসাইড নোটে সে যা লিখে যায়, তাও খুবই বিস্ময়কর— “সামনের জন্মে মোহনবাগানের ভালো ফুটবলার হয়ে এই পরাজয়ের শোধ নিতে চাই”।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ভোগবাদ আর পণ্যায়নের বিস্তারের ফলে ফুটবলের জনপ্রয়তার আঘাত আসে। এই সময়ে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ।বাঙালির ফুটবল আবেগের ভর কেন্দ্র ছিল কলকাতা লিগ ফুটল ও আই এফ এ শীল্ড ।১৯৯৬এ ন্যাশনাল লিগ ও পরে আই লিগ প্রবর্তনের ফলে কলকাতা লিগ ও শীল্ড প্রতিযোগিতার গুরুত্ব কমে যায়। পরে আই এস এল বা হিরো ইন্ডিয়ান সুপার লিগের প্রবর্তনের ফলে ফুটবলের বানিজ্যিকীকরণ হয় বটে কিন্তু কলকাতার লিগ ও শীল্ড এবং জেলা ফুটবলের গুরুত্বহীনতার জন্য বাংলা থেকে আর ফুটবলার তৈরি হওয়া বন্ধই হয়ে গেল বাবা মা তাদের সন্তানকে ব্যাট হাতে ক্রিকেটার বানাতে চাইলেন ।অন্যদিকে ফুটবলার তৈরির যে সাপ্লাই লাইন কলকাতার ছোট পুঁজির ক্লাব গুলো বন্ধ হবার জোগাড় ।এরিয়ান, খিদিরপুর, বালিপ্রতিভা,টালিগঞ্জ, উয়াড়িরমত ক্লাব থেকে এক সময় ভারতখ্যাত ফুটবলার উঠে আসতো তারা অর্থের অভাবে উঠে যাবার দিন গুনছে,ফুটবলারদের অনুশীলনে টিফিনের খচটুকু জোগাড় করতে হিমসিম অবস্থা । ফুটবলে বিনিয়োগ আসার ফলে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ফুলে ফেঁপে উঠছে সত্য কিন্তু তারা বাংলার ফুটবলে কিছু কেতাবী অবদান রাখছে মাত্র । বাংলার মাটি থেকে ফুটবলার তুলে আনার কোন প্রয়াস তারা করছে কিনা জানা নেই ।

বাঙালির ফুটবল সংস্কৃতি মানে শুধু মোহন-ইস্ট বা ঘটি-বাঙ্গালের লড়াই নয়,বাঙালির ফুটবল চর্চা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা টিকিটের জন্য লাইন দিয়ে রাত জাগা,মাউন্ট পুলিশের ঘোড়ার লাথি খাওয়া, রেডিওতে প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া বেরি সর্বাধিকারী, পিয়ার্সন সুরিটা নরোত্তম পুরির ইংরাজি ও অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার, কমল ভট্টাচার্যদের বাংলায় ধারাবিবরণীতে ফুটবলকে বাঙালির হেঁসেলে ঢুকে পড়ো,খেলার পত্রিকা ক্রীড়া সাংবাদিকতা এই সব কিছুই । মতি নন্দীর উপন্যাস স্ট্রাইকার, ধন্যি মেয়ে, মোহনবাগানের মেয়ের মত চলচ্চিত্র আর নান্দিকারে্র নাটক ফুটবল বাঙালির ফুটবল চর্চা ও সংস্কৃতির অনন্যতা প্রকাশ করে।

এতৎসত্বেও বাঙালির ফুটবল আবেগ অর্থবহ হয়ে উঠবে যদি আমাদের খেলাধুলার নিয়ামকরা আমাদের ফুটবল খেলাকে আগেকার মর্যাদায় পুণপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন, বাংলার মাঠ থেকে ফুটবলার তুলে আনতে পারেন ।এরজন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ।বাংলার ফুটবল নিয়ামক আই এফ এ তেমন কোন পরিকল্পনা নিয়েছে কি না জানা নেই ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন