Header Ads

Breaking News
recent

সীমন্তিনী সাহা | জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

শব্দের মিছিল

“আনন্দের ভোজে বাইরের চেয়ে অন্তরের অনুষ্ঠানটাই গুরুতর”— আনন্দের ভোজ উৎসব, উপলক্ষ্যকে ঘিরে আয়োজিত কোনো বিশেষ সমাবেশ বা জমায়েত বা একান্ত যাপন; যাইই হোক না কেন বর্তমানে সেখানে জমি দখল করে নিয়েছে বহির্দেশিক বা বহির্সাংস্কৃতিক বিষয়। নিজস্ব সংস্কৃতিক প্রচলিত উৎসবের সংখ্যা কমে এলেও একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়নি অবশ্যই। তবে ক্রমাগত আড়ম্বরপূর্ণতার অাধিক্যে নিজস্বতা গেছে হারিয়ে। জীবনে উৎসবের প্রয়োজনীয়তা যেমন স্বাভাবিক তেমনই একথাও সঙ্গত যে মাত্রাহীন উৎসবাড়ম্বরের বেড়া যখন উৎসব আত্মস্থতার ঘরকে ডিঙিয়ে নদীতে নেমে পরে তখন ডুবে যাওয়ার বিপত্তি ঘটতে বাধ্য। ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ বাইরের ঘটনাধারার প্রবাহে ও প্রভাবে মনের ভিতর যে ছবি আঁকা চলেছে তার মধ্যেকার সংযোগ ও সূক্ষ অসংযোগের ধারণা দিয়েছেন; উৎসব পালন ও যাপনের মধ্যে তেমনই যোগের উপস্থিতি। কিন্তু এই ‘পালন’ ও ‘যাপন’ এর ভিতরে যে যোগসূত্রের রেখা তা যখন বাহ্যিক আড়ম্বরের বাহুল্যে ঢাকা পরে যায় তখন হারিয়ে যায় অনুভবগম্যতা। সাহিত্য দাবি করে যাপনের ইতিবৃত্ত, পালন সেখানে সেই যাপনের চিহ্ন মাত্র। তাই সাহিত্য প্রতিনিয়ত নতুন হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের সাহিত্যকে যেভাবে দেখেছেন তা পরিচয় করানোর নিমিত্তে তিনি বলেন— ব্যক্তিক স্মৃতি যখন কথার মধ্যে দিয়ে ফুটে উ’ঠে অন্যের মনে নাড়া দেয় তখন তা’ই সাহিত্য হয়ে ওঠে। যা অনুভব করা যায় তাকে অনুভবগম্য করে তুলতে পারলেই মানুষ তার আদর করে। এই অনুভবী মনের জন্যই তো পালনের আগে যাপনের প্রয়োজন৷ যাপনের জন্য মনস্থ উপকরণের দ্বারা যে ‘আনন্দের ভোজ’ সম্পূর্ণ হতে পারে, পালনের জন্য সেই বহিঃস্থ উপকরণের অতিরিক্ততায় ‘মনটা কুঁড়ে হয়ে পড়ে’। কারণ খরচের খাতাও তখন ব্যালেন্স ক’রে মনের অপচয় রোধ করে দেয়৷ এই শিক্ষাই মানুষের প্রাথমিক শিক্ষা বলে তিনি বিশ্বাস করতেন৷ আর তারই আভাস পাওয়া, আভাস পেয়েও নাগাল না পাওয়া সব বিষয়ের মধুর নির্যাস অনুভবে এক বৃহৎ বিচরণ ক্ষেত্র রেখে গেছেন পরবর্তী পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের হাতে।

তাঁর সাহিত্যেজগতের অনিন্দ্য সৌন্দর্যে বিচরণের কথা থাক, তিনি ‘জীবনস্মৃতি’র ছত্রে ছত্রে তাঁর বৃহৎ জীবনারণ্যে হেঁটে চলা যে পথ সৃষ্টি করে গেছেন সে পথমধ্যে প্রবেশের অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি পায়ে নিত্য নতুন মেকি প্রডোক্টিভ চপ্পল জুড়ে দিয়ে। কবি ছেলেবেলায় মধ্যাহ্ন দুপুরে শ্যাম নামক চাকরের কেটে দেওয়া খড়ির সীমাকে লক্ষ্মণ গন্ডীর মহিমায় উত্তীর্ণ করে চুপটি করে বসে গোগ্রাসে গিলেছেন সেই পুকুরের কলতান, স্নানরত অগনিতের বিভিন্ন কলাকৌশল, বটের অপলাপ। রবীন্দ্রসৃজনের শুরুর ধাপে দৃষ্টির আগল খুলে গেছে তাঁর এই অখন্ড অবসর যাপনের মধ্যে দিয়েই। বাবার হাত ধরে ‘হিমালয় যাত্রা’য় বেরিয়ে বোলপুর, সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানাপুর হয়ে অমৃতসর পৌঁছোলেন অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে৷ বোলপুরে আবিষ্কার করলেন খোয়াইয়ের নুড়ির আশ্চর্য চমৎকারিত্ব। বক্রেটার বাসায় থাকবার সময় একা একা অধিতক্যার বিস্তীর্ণ কেলুবনের ভিতর নিজেকে খোঁজার অবসর পেয়েছেন সদ্য কৈশোরে রবি৷ হিমালয় ভ্রমনের সময়ই একান্ত নিবিড় ভাবে পিতার সান্নিধ্য লাভে নিজের সাথে তাঁর ব্যবহারে অনুভব করেন “যেখানে তিনি ছুটি দিতেন সেখানে তিনি কোনো কারণে কোনো বাধাই দিতেন না, যেখানে তিনি নিয়মে বাঁধিতেন সেখানে তিনি লেশমাত্র ছিদ্র রাখিতেন না৷” এ নীতি শুধু সামান্য কাজের ক্ষেত্রে মান্যতা পেত তা তো নয়ই বরং দায়িত্ব শেখাবার সময়ও একই ভাবে সম্পূর্ণই ছেড়ে দিতে পারতেন কোনো লোকসানের ভয় না করে। সেজন্যই নিজের সোনার দামি ঘড়ি দম দেবার ভার রবির জিম্মায় দেবার সময় সেটার ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাবেননি এমনকি সত্যি সত্যি সেই ঘড়ি সারতে দিতে হলেও লেশমাত্র আপশোষ করেননি দেবেন্দ্রনাথ। আলো আঁধারের মধ্যে যে ফাঁক, ছুটি ও নিয়মমাফিক কাজের যে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক আছে সে তত্ত্ব তাদের কাছে ততটাই পরিস্কৃত ছিল যে কোথাও কোনোটা গা ঠোকাঠুকি করে মরেনি। গতির সুবিধে এই যে তাতে গা ঠোকাঠুকি লেগে একটু চামড়া টামড়া খসে বটে তবে তাতে অপচয়ের হিসেবের তুলনায় কাজের ও সময়ের হিসেব এমনিভাবে কষা হয় যাতে ‘অ’ উপসর্গের অস্তিত্ব এক্কেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ গতির ফলে আমরা ক্রমশ পাবার আনন্দের শীর্ষে উঠছি তো উঠছিই ;এমনকি যে শিশুমনে ‘প্রাপ্তি’ নামক শব্দটার গতিভঙ্গি একেবারেই বিপরীত অভিমুখে চলে তাকেও ঠোনা মেরে গুঁতো দিয়ে প্রকৃত প্রাপ্তির পাঠশিক্ষা দিচ্ছি। আর তাই নিয়মমাফিকতার বাইরে অজ্ঞাতে যে শিক্ষা হতে পারে তার ওপরও দুজোড়া চোখের কঠিন দৃষ্টি রেখে চলেছি। ব্যাপারটা এমন যে স্কুলের ব্যাগের চেয়েও ভারী ক্লাসের পড়ার বিদ্যা বহন করে ফেরবার পথে শিশুটির হঠাৎ আবিষ্কার গাছের আড়ালে থাকা হলদে পাখিটার বৈজ্ঞানিক নাম টাম তৎক্ষনাৎ নেট সার্চ করে মুখস্থ করাচ্ছি। পাখির যে স্বাভাবিক সৌন্দর্যটুকু নিজ আবিষ্কারের আনন্দে নিজের স্মৃতিপটে সে ধরে রাখতে পারতো খটমট নামের চাপে তা ফুড়ুৎ করে উড়েই গেল। রবীন্দ্রনাথের সময়ে তাঁদেরকে ঠেকে শিখতে হয়েছে ‘জগৎ একটা কড়া নিয়মের উপসর্গ।’ এ ঠোক্কর থেকে সোনার চামচ মুখে জন্মানো ছেলেরাও বাদ যায়নি। তবে কিনা ঠেকে শিখতে গিয়ে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তার বর্ণনা থাকা উচিৎ ছিল! তবু নেই যখন তখন আর কিছু না হোক ঠেকে শেখার কষ্ট থেকে আত্মজকে বাঁচাতে ঐ হলুদ পাখির ঠিকুজিকুষ্ঠী পটাপট মগজস্ত্র কারাবার কাজটা এমনিভাবে জারি রইলো যে মনস্থ চিত্রটুকুর আর কোনো চিহ্নই রইলো না। কে বলতে পারে যে স্কুল ফেরৎ বাচ্চা শুধুমাত্র চোখের জোরে একটা পাখি আবিষ্কার করে ফেলতে পারে, সে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বড়ো-সড়ো কোনো পক্ষীবিশারদটদ হয়ে যেতে পারে। তবে আর দেরি কেন, কোমর বেঁধে শুরু হোক প্রস্তুতি। আর তাই শাসনে- প্রহসনে জীবনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি ঘটাবার প্রয়োজন হয়ে পরে। কিন্তু এই ‘শাসন’ নামক পেয়াদা বড়োই বেয়ারা যখন সে বাইরের দিক থেকে এসে কানের পোকা খেয়ে মগজের শিরায় শিরায় প্রতিধ্বনিত হয় তখন সে কৃত্রিমতার বাকল পরে থাকে; আর যখন সে নিজের অন্তঃস্থল থেকে কথা বলে ওঠে তখন তার কৃত্রিমতার সব বাকল খসে গিয়ে একেবারে জীবনসত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়৷ এখন প্রশ্ন হল এ সত্য কোন সত্য! সে তো নিজেই আপেক্ষিকতার প্যাকেট মোড়া, একথার জবাব একটাই— যে সত্য ভালোবেসে গৃহিত হয় সে‘ই শেষ পর্যন্ত চরিত্রধর্ম বজায় রাখতে পারে৷ রবীন্দ্রনাথ বলেন “সত্য থেকে দূরে গেলে একদিন সত্যে ফেরা সম্ভব কিন্তু কৃত্রিম শাসনে বা অন্ধভাবে সত্যকে মেনে নিলে সত্যের মধ্যে ফেরবার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।” এই সত্যোপোলব্ধি স্বাতন্ত্র্যতার সিঁড়িতে পদার্পণ করায়,এ স্বাতন্ত্রতা এক একটি মানুষ হবার স্বাতন্ত্র্যতা। যার লালনে ঠাকুর বাড়ির অন্দরে একগুচ্ছ প্রতিভা মাথা তুলেছে। তবে একথা সত্য রবীন্দ্রনাথ নিয়ম-কলের শিক্ষা-জলের ছিটেফোঁটাও যে চেখে দেখবার সুযোগ পাননি তা নয়৷ নর্মাল স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে রবি সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তাঁদের ক্লাসের শিক্ষক হরনাথ পন্ডিত অভিযোগ করেন পরীক্ষক পক্ষপাতিত্ব করে রবিকে বেশি নম্বর দিয়েছেন। তাতেই তাঁকে দ্বিতীয় বার পরীক্ষা দিতে হয়, ফল একই হয়৷ হরনাথবাবু ক্লাসে এমন কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করতেন যে তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধাবশত তাঁর কোনো প্রশ্নেরই উত্তর করতো না রবি; হয়তো সেখান থেকেই ঐ শিক্ষককের এমন ধারনা জন্মেছে। সে যাইহোক এইসব অভিজ্ঞতারই ফল হয়তো শান্তিনিকেতনের শিক্ষাপদ্ধতির অভিনবত্ব। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন শিক্ষার কল একটা মস্ত কল; তা থেকে তিনি ছাত্রদের নব মুকুলিত হৃদয়কে বের করে এনে খোলা হাওয়ায় নি:শ্বাস নেবার জন্যই বিশ্বভারতীর স্থাপনা করেন৷ তবে বর্তমানে এই কলই প্রথাগত শিক্ষার বাইরেও চব্বিশ ঘণ্টা শিশুর গলার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আর কলের তেলে মাছ ভাজতে নিদ্রাভঙ্গের প্রচেষ্টায় চপেটাঘাতের সাথে দিবানিদ্রা আনয়নের চপেটাঘাত ফ্রি’তে মিলছে শিশু থেকে কিশোর সকেলেরই, একম অদ্বিতীয়ম উদ্দেশ্য মধ্যাহ্ন পরবর্তী সময়ের এতটুকু নষ্ট হতে দেবার অপরাধ যাতে না ঘটে যায়৷ এই কড় গুনে হিসেব কষা বহুমূল্যতাবোধ এরকম কষে বেঁধে দেওয়া ছিলনা রবিদের জীবনে; বরং ছিল অভ্যাসগত নিয়মতান্ত্রিকতা-পরাধীনতার আলে ঘেরা বিস্তীর্ণ ভূমি, যাকে প্রতিমূহূর্তে চষে চষে ফসল উৎপাদনের ঠেলায় তার উর্বরতা নষ্ট করে দেওয়া হয়নি, যথেষ্ট অবসর দেওয়া হয়েছে উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির করে ফসল ফলাবার জন্য।

২।
জীবন যাপনের কলাকৌশলের ক্ষেত্রেই শুধু নয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার কার্পণ্যে কিম্বা অতি সহজ পন্থায় বর্তমানের অভিভাবকহীন সেইসব দুর্ভাগাদের স্মরণে আসে যাঁরা স্বঅভিভাবক। ঠাকুর পরিবারের মতো বনেদি ঐতিহ্যশালী জমিদার বাড়ির ছেলেদের পায়ে জুতো মোজা ওঠে প্রথম দশ বছর বয়সে, শীতকালে একটা জামার ওপর আর একটা জামাই যথেষ্ট ছিল। রবিকে হিমালয়-বাসের সময় স্নান করতে হতো সকাল দশটায় বরফ গলা ঠান্ডা জলে, এক ঘটি গরম জল মেশাবারও হুকুম ছিলনা। এসব ঘটনা তাদের ছেলেবেলাটা আদরের উপদ্রবে একেবারে ভিতর থেকে যন্ত্রজ হয়ে পরেনি, প্রকৃতির মধ্যে প্রকৃতি প্রদেয় সহজ কষ্টের উপদ্রবের তাড়নায় অস্থিরতা অসহ্যতা মন্দলাগার সাথে ধৈর্য্য পরীক্ষার খাতায় পূর্ণফল প্রাপ্তি ঘটেছে তাঁদের। তাই বলেছেন রবির উপলব্ধি “অনাদর একটা মস্ত স্বাধীনতা” -শিশুর কাছে এ এক চিরন্তন সত্য। এর মধ্যে তাঁরা যে মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন তা ‘নিজেদের বরাদ্দ খাবার চাকর মহলে চালান হচ্ছে‘ বলে একেবারে আধপেটা খেয়ে দিন কাটানো থেকে শুরু করে ‘পৃষ্ঠাঘাতের অনিবার্য ঘটনায় কাঁদবার’ মৌলিক অধিকার টুকুও না পাবার মধ্যে লুকিয়ে আছে। চাকরদের মহলে তাদের দাক্ষিণ্যে ঔদাসীন্যে, গুরুজনের চোখের আড়ালে মানুষ হবার বাড়তি সুবিধে এইখানেই।


শিশু চিরন্তন আর শিশু মনস্তত্ত্বটিও ততধিক পুরনো। বাহ্যিক ছাপ যেমন ভাবে তাদের ওপর পরে সেই অনুযায়ীই তাদের মানসিক ও মানবিক গঠন পরিবর্তিত ও পরিণতির দিকে যায়। ‘ঘরের পড়া’ অংশে রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন “সংসার টা ছেলেদের ওপর ঠিক তেমনি করে কাজ করে ইহার যতটুকু তারা বোঝে ততটুকু তাহারা পায়, আর যা বোঝে না তাহাও তাহাদিগকে সামনের দিকে ঠেলে।” বলাবাহুল্য যে বই পড়ার ক্ষেত্রেই তা সীমাবদ্ধ নয় জীবনের প্রতিপদেই এ সত্য। বোঝার সাথে না বোঝার শক্তিটুকু পেলে তবেই জীবনটা চলমান থাকে স্থবির হয়ে পরেনা। না বোঝার যে শূণ্যতা তৈরি হয় তার জন্যই তাকে প্রাণের দায়ে আঁচল পেতে বসতে হয় বোঝার পূর্ণতার কাছে। এতো বৈজ্ঞানিক সত্য। ‘জামাই বারিক’ বইটা চুরি করে পড়তে হয় রবিকে। এতো স্বাভাবিক। বই নামক বস্তুটির সাথে পরিচয় যার ঘটে গেছে তার পক্ষে এ বোঝা কষ্টকর যে কোনটি তার বয়সোপোযোগী কোনটি নয়৷ নতুন বই মানেই নতুন ধারণার উৎস এটুকুই সে জানে, তার উপর যদি আবার বিশেষ নিষেধাজ্ঞা থাকে তবে তো কৌতূহল বৃদ্ধি পাবে বৈকি! যেখানে নিষেধাজ্ঞার বোধগম্য যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া দায় সেখানে শুধু বয়েসে ছোটো হবার অপরাধে সে বঞ্চিত হতে নারাজ। শিবপ্রসাদ পরিচালিত ‘হামি‘ সিনেমায় দেখেছি হামি শব্দের তাৎপর্য ছোটোদের কাছে যতটা স্বাভাবিক হয়েছে বড়োরা কিংবা অতিবড়োরা হামির সাথে চুমোর মিল ঘটিয়ে কী ঘটনাই না ঘটাতে বসেছিল। নখদন্তী সেই বড়োদের গালে চড় কষিয়ে ছোটরা যখন শিখিয়ে দেয় শব্দভেদে অর্থভেদে স্হানভেদে সবেরই তাৎপর্য বদলায় তখন একথা বলতেই হয় মনের স্তরটাকে পদ-পেশা-অর্থের মাপকাঠিতে রেখে শিশুর কাছে নিজেকে আড়াল করার পদ্ধতির মধ্যে আর যাইহোক সুশিক্ষার উপায় থাকে না৷ যেমন উৎসাহিত করবার ঠেলায় শিশুর কাজের দড়িতে পুরস্কারের ভার চাপিয়ে দিয়ে তার দৃষ্টি নিজের ভেতর আবদ্ধ করে বাহিরে বেরোবার পথ রুদ্ধ করা হয়, যা তাদের পক্ষে অস্বাস্থ্যকর৷ ‘ভালো করে তোলার উপদ্রব’ এর এই প্রচেষ্টার চেয়ে রবীন্দ্রনাথ মন্দকেও কম ভয় পেতেন; আর আমরা সেই মন্দের প্রতিযোগিতায় জিততে গিয়ে ‘ভালো করার’, ‘ভালো হওয়ার’ প্রচেষ্টাকে কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারছি না৷ এ শিক্ষা বোধহয় সময়যাপনের ভিতর দিয়েই উঠে এসেছে, সভ্যতার যত বয়স বেড়েছে আমরা তত বুড়িয়েছি, রোগলক্ষণ যত প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে তত বেশি করে ওষুধের পাচন গিলে সুস্থ হবার চেষ্টায় আত্মশক্তির গলা টিপে ধরেছি। শক্তি যত কমেছে তত বেশি হাত পা ছোটাবার চেষ্টায় আরও আরও বেশি অসাড় হয়ে পড়েছি।

৩। 
লন্ডনে একলা বাসের সময় রবিকে ল্যাটিন শেখাতে আসতেন এক শিক্ষক। সে তাঁর জীবনের প্রায় সবটুকুই খরচ করে ফেলেছে যে তত্ত্বের প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় তা হল— পৃথিবীতে এক একটা যুগে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানবসমাজে একই ভাবের আবর্তন হয়, যদিও সভ্যতার তারতম্য অনুসারে সেই ভাবের রূপান্তর ঘটে কিন্তু হাওয়াটা একই। পারস্পারিক মেলামেশা বা দেখাদেখিতে একই ভাব ছড়িয়ে পড়ে তা নয়, যেখানে দেখা হওয়ার সুযোগ পর্যন্ত নেই সেখানেও এই ঘটনা ঘটে। রবীন্দ্রনাথের এই আকিঞ্চন শিক্ষকের কাছে ফলপ্রাপ্তির বিশেষ আশা যে ছিল তা একেবারেই নয়, যা ছিল তা হল বিশ্বাস— “সমস্ত মানুষের মনের সঙ্গে মনের একটি অখন্ড গভীর যোগ আছে, তাহার এক জায়গায় যে শক্তির ক্রিয়া ঘটে অন্যত্র গূঢ়ভাবে তা সংক্রামিত হইয়া থাকে৷” মানুষে মনের সাথে মনের সংযোগের যে শক্তি তা যেমন হঠাৎ ধ্বসে পরে না তেমনি সে শক্তি সংক্রমনের জন্য প্রয়োজন সংক্রামিত হবার যথোপযোগী উপকরণ। এই উপকরণ বাইরে থেকে সস্তা দামে কিনে প্রতিস্হাপন করে কাজ চালনা সম্ভব নয়, সুস্থ জল হাওয়ায় বাড়িয়ে তুলে তাকে সংযোগাভিমুখী করে তোলা প্রয়োজন যেখানে অখন্ডতার ক্ষেত্র আপনিই তৈরি হয়ে যায়৷ আমরা সেই নির্লিপ্ত অখন্ডতার ওপর পারে এসে দাঁড়িয়েছি। যেখানে নিজেকে প্রকাশের মধ্যে ঘুণপোকার মতো ক্ষয় কাজ করে৷ মুখে সংযোগের তুবড়ি ছোটাচ্ছি আর ঘরের দরজা এঁটে এমন করে আসন পাতছি যে নিজের হাত দুটোকেও যেন তার ভিতরে না ধরে, পাছে তারা বিদ্রোহ করে বসে৷ এই বিশ্বাসহীনতার প্রকোপ ক্রমশ সংক্রামিত হচ্ছে। ‘জীবনস্মৃতি’র স্মৃতি থেকে সেই স্নেহপ্রবন ইঙ্গভারতীয় বিধবাটির কথা মনে পরছে যার ‘গান গাওয়ার নিমন্ত্রণ’ রক্ষা করতে লন্ডন থেকে দীর্ঘক্ষণ ট্রেনে চেপে তার বাড়িতে পৌঁছোন রবি। তারই বাদান্যতায় সারারাত অভুক্ত অবস্থায় সরাইখানার ঠান্ডা মেঝেয় রাত কাটিয়ে অনিদ্রার পুরস্কার লাভ করে গান শুনিয়ে লন্ডন ফিরে দু-তিনদিন বিছানায় থেকে নিমন্ত্রিতের মাশুল গোনেন রবীন্দ্রনাথ। রবির আশ্রয়দাত্রী ডাক্তারের মেয়েরা অবশ্য বলেছিল এ আতিথেয়তা ‘ভারতবর্ষের নিমকের গুন’। সে যে দেশের নুন খাবার ফলই হোক না কেন ঐ বিধবার বংশবিস্তার ঘটে গেছে। এই তো সেদিন এক চলমান দেবতা, তারই পূজোর জন্য অলিখিত নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে ডেকে নিয়ে গেলেন। ফুল বেলপাতার খরচেও তিনি জুগিয়ে দেবেন এমনই ভান করে নিমন্ত্রিতের পকেট কাটলেন এবং যাত্রাপথে নিমন্ত্রিতের চামড়া কেটে রক্তই বের হোক বা কিম্বা অস্থিমজ্জা ভেঙে গুঁড়ো হোক তাতে তার বিশেষ হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। অতএব তিনি সেদিকে দৃষ্টি দিতেও নারাজ। এ পূজোর উদ্দেশ্য বিশেষ কিছুই নয় রবীন্দ্রনাথের পাশে তাঁরও যে একটা সামান্য স্থান হতে পারে সেটা বোকা সরল সাধারণের মনে দেগে দেওয়া। আসলে শুরুর দিন থেকে তিনি রবিঠাকুরের নামে প্রচুর পত্র-পুষ্পের লেখ্য রূপের ভূজ্যি চড়িয়েছেন তবে সবটাই উবু হয়ে বসে, কখনো দু হাঁটু মুড়ে বসা হয়নি তাঁর। এই সামান্য ভুলের মাশুল দিতে তাঁকে লাভের পুজোর জোগাড় করে করে মরতে হচ্ছে। তবু আশা ছাড়তে তিনি নারাজ আর কিছু না হোক তিনি নিজে পূজারী হয়ে তার নিজের পুজো করবার জন্য আর পাঁচটা পূজারী তৈরি করে যাবেন না তা কি হতে পারে! তাই চেয়ারে বসে তার হাতের সামনে আসা যাকিছুকে তিনি এমনি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছেন যে সবেরই অপমৃত্যু ঘটলো বলে।
আজ রবিঠাকুরের জন্মদিন। বাঙালির সমগ্র জাতিসত্ত্বার উৎসবময় আনন্দের দিন পঁচিশে বৈশাখ। শ্রদ্ধায় - স্মরনে- বন্দনায় আকস্মিক সচলতায় বছর ভোর ঘুমিয়ে থাকা (জীবন ভাবনায় ও জীবন যাপনায়) একটা মানুষ তাঁর কণ্ঠস্বরে-লেখনীতে- চর্চায় বলিষ্ঠতায় যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেলে আবার তিনি ঢুকে পরেন সিলেবাসের সূচিতে, ফেসবুক বা ওয়াটস অ্যাপের স্টেটাস সেগমেন্ট। হোক না একদিন তবুতো ক্লান্তির মাঝে, অসুস্থ আনন্দহীন সময়ের মাঝে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ হয়ে আন্তর্জাতিক সহাবস্থান ও মননশীল প্রয়োপোবেশনের পথ প্রশস্থ হবে, যা হয়তো পরবর্তী সময়ের লড়াইয়ের(মনোগত সুস্থতা) অস্ত্রে শান দেবে। হয়তো এই একদিনের পালনই মনে আনবে প্রতিদিনের যাপনের সাহস। ঘরবন্দী শিশু মনে, বদ্ধতায় গুমরে যাওয়া মনে নতুন করে শ্বাস জোগাবে আগামীর আহ্বানে। নতুন সকালে হবে নতুন সৌধের (মন ও শরীরের সবলতা) পুননির্মাণ।

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.