Header Ads

Breaking News
recent

রিঙ্কি বোস সেন​ | অপরাজিতা

প্রেম ভালোবাসা মিছিল

দরাম করে দরজার পাল্লা দুটোকে দুদিকে ঠেলে ঘরের ভিতর ঢুকে মল্লিকা লাইট জ্বালালো।তারপর ছুটে গেল ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা খাট'টার দিকে।দু'হাতে চাদর,বালিশ, গদি,তোষক সব উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো, খুঁজতে লাগলো যদি কিছু পাওয়া যায়।মল্লিকা নিশ্চিত কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই, কিন্তু ঠিক কি ব্যাপার? গত দু-চার দিন ধরে মল্লিকার চোখের ঘুম,মনের শান্তি সব উড়ে গেছে প্রায়।অপু ঘরে না থাকলেই হল, সোজা ওর ঘরে ঢুকে গিয়ে যাবতীয় জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দিচ্ছে মল্লিকা।কিন্তু কি আশ্চর্য কিছুই হাত লাগছে না।তবে মল্লিকার বিশ্বাস যা আছে এই ঘরেই আছে।সেদিনও দেখেছিল, জানলার ফাঁক দিয়ে, অপু আপন মনে সেগুলো নাড়াচাড়া করছে আর নিজের মনেই মিটিমিটি হাসছে ।

বিছানা তোলপাড় করে দেখে নিয়ে বইখাতার তাকগুলো এলোপাথাড়ি করে খুঁজতে লাগলো মল্লিকা।কিচ্ছু পেলো না।খুব হতাশ লাগছে ওর।কিছু তো আছেই! কিন্তু কোথায়? যাইহোক শেষমেশ কিছুই না পেয়ে বাধ্য হয়ে সব আবার ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখলো।উপায় নেই! যদি এসে বুঝতে পারে যে তল্লাশি চলেছে তাহলে আবার নাওয়াখাওয়া ছেড়ে গোঁ ধরে বসে থাকবে হয়তো।বড্ড অভিমানী এই অপুটা।এতটাও ছিল না।ইদানীংকালে সামান্য কথাতেই হয় তেলেবেগুনে হয়ে উঠছে আর না হয় কাঁদোকাঁদো হয়ে যাচ্ছে।

আবীরের অবশ্য এই ব্যাপারটায় কোনই হেলদোল নেই।মল্লিকা কিছু বললে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে।মল্লিকা যতই আবীরকে ব্যাপারটা নিয়ে গম্ভীর হতে বলে আবীর ঠিক ততই মস্করা করে।এই তো সেদিনই মল্লিকা যখন অপুর ঘরে তল্লাশি চালিয়ে কিচ্ছু না পেয়ে বেজার মুখ করে এসে ঢুকলো তখন আবীর হাসতে হাসতে বলল__

___"আজকের টুইট আর ফেসবুকের যুগে যে ছেলে চিঠি দিয়ে প্রেম করে সেই ছেলে কোনমতেই খারাপ হতে পারে না।অপু আমাদের একদম খুঁজে খুঁজে হীরের টুকরোই জোগাড় করেছে মল্লিকা! তুমি অত ভেবো না....করুক করুক, চুটিয়ে প্রেম করুক মেয়েটা"।

মল্লিকা রে রে করে বলে উঠেছিল__

__"তুমি বাস্তবটা মানতে চাও না কেন বলতো? আমি কি মেয়েটার শত্রু? একবারও এটা ভাবছো না কেন যে মেয়েটাকে কেউ ব্যবহার করছে, লালসা মেটানোর উদ্দেশ্যে!.....যে মেয়ের মুখ ভর্তি শ্বেতী তাকে কে প্রেম দেবে একবার ভেবে দেখেছো?" 

অপরাজিতা, আবীর আর মল্লিকার একমাত্র সন্তান, শান্ত আর মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে।রূপলাবণ্যে একসময় ছিল বেশ নজরকাড়া। কিন্ত বয়স যখন আট তখন হঠাৎ করেই প্রথমে পায়ের পাতায়, তারপর কনুইয়ের কাছে আর তার কিছুদিনের মধ্যেই কপাল জুড়ে সাদা ছোপ দেখা দিল।শ্বেতী।অপরাজিতার গা-হাত-পা-মুখ জুড়ে শ্বেতী দেখা দিল।একটু একটু করে ওর চামড়া আর জীবন এই দুই থেকেই রঙ মুছে যেতে লাগলো.....সবকিছুকে একটা ফ্যাটফ্যাটে সাদাটে ভাব তিলেতিলে গ্রাস করে নিল। আর এর ঠিক উল্টো দিকে মল্লিকার চোখেমুখে একটা পরাজয়ের ছোপ পড়ে গেল,কালচে ছোপ।যে মেয়ের চাঁদপানা মুখ নিয়ে গর্ব আর ধরতো না মল্লিকার বুকে সেই মেয়েকে ঘরের গণ্ডিতে বেঁধে রেখে দিল সে।ধীরেধীরে ঘোর "বাস্তবটাকে" শুধু নিজেই নয় মেয়েকেও এক্কেবারে পাখীপড়ার মত বুঝিয়ে দিল।অপুর জগৎটা অপুর সাদা চামড়ার খোলসে আটকা পড়লো।ও জেনে গেল যে ও' আলাদা, ওর জন্য নিয়মকানুন গুলোও সব আলাদা।

কিন্তু যৌবন বলে একটা ফাঁড়া যে সবার জীবনেই আসে।প্রকৃতির কারসাজিতে অপুর জীবনেও এলো।মল্লিকার এখানেই ভয়।সে নিশ্চিত অপু প্রেমে পড়েছে।আর যতদূর মনে হচ্ছে খুব বাজে ছেলের প্রেমেই পড়েছে।কারণ একটাই, শ্বেতীভরা মুখ দেখেও যে ছেলে প্রেমপত্র দেয় তার উদ্দেশ্য কখনোই ভালো হতে পারে না।আবীর যদিও বেশ কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে মল্লিকাকে বোঝানোর চেষ্টা​ করেছে যে পুরুষ মাত্রই কামুক হয় না, প্রেমিকও হয়।এই সেইদিনই ইন্টারনেট থেকে এক এ্যাসিড ভিকটিমের গল্প পড়ে শোনালো যাকে এক সহৃদয় পুরুষ মাসখানেক আগে বিয়ে করেছে।

__"দাঁড়াও সবে তো মাস গেছে, এই বিয়ের বছর ঘোরে কিনা দ্যাখো! "

সব শুনে মল্লিকা উত্তর দিয়েছিল।আবীর বুঝে গিয়েছিল বোঝানো বেকার।

তোশকের তলায় হাতটা যতটা যায় ততটা ভরে দিয়ে চোখ বন্ধ করে চিঠিগুলো খুঁজতে থাকলো মল্লিকা।কোথায় যে রাখলো? মল্লিকা পরিস্কার দেখেছে অপু খাটের উপর বেশ কয়েকটা চিঠি মিলে রেখে একটা চিঠিকে নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকছে। শুধু তাই নয় অপুকে হাতে চিঠি ধরে সন্ধ্যেবেলা ছাদে গুনগুন করে গান গেয়ে ঘুরে বেড়াতেও দেখেছে।কে জানে সামনের বাড়ির ওই বখাটে'টার সাথেই জড়ালো কিনা? ওই ছেলেটা তো মারাত্মক মেয়ে ঘেঁষা।তাহলে কি অপু ওর চক্করেই পড়েছে? ভেবেই মল্লিকার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। অপুকে বাঁচাতেই হবে।ওকে বোঝাতেই হবে প্রেম ওর জন্য নয়।যত কষ্টই হোক অপুকে এটা বুঝতে হবে।সময় হলে ওর জন্যও কোন ঘর-বর না হয় খুঁজে পাওয়া যাবে.....কিন্তু এইভাবে প্রেম!! এটা অলীক স্বপ্ন, অবাস্তব!!

কিন্তু গোটা ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পাওয়া গেল না।শেষমেশ একপ্রকার পরাজিত সৈনিকের মত মুখ করে বেরিয়ে আসার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালো মল্লিকা।কিন্তু কি একটা মনে হতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা ঘরের বাঁদিকে বুকসেল্ফের দিকে আরেকবার গেল সে।বইয়ের তাকগুলোর ঠিক পাশের কোণটায় হাত গলিয়ে একটু হাতড়াতেই একটা পুঁটলি পেয়ে গেল।অপুরই একটা পুরোনো ছেঁড়া ওড়না দিয়ে তৈরি।হাত দিতেই মনে হল ভিতরে অনেক কাগজপত্র রাখা।মল্লিকা তাড়াতাড়ি পুঁটলিটা নিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো।শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ।কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে পুটলির গিঁট খুলতে লাগলো।মল্লিকার মন জুড়ে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা। স্বস্তি আর অস্বস্তির মিশ্র অনুভূতি বলা যায়।স্বস্তির কারণ হল- এবার সে আবীরকে বলতে পারবে যে তার সন্দেহটা ভুল নয়।অস্বস্তির কারণও ঠিক সেটাই, সন্দেহটা সত্যিই ভুল নয়।

একটা খুট করে শব্দ হল।মল্লিকার কানে এসেও ঠিক এলো না।সে তখন পাগলের মত একটার পর একটা ভাঁজ করা চিঠি খুলছে আর এক ঝলক দেখে নিয়ে নামিয়ে রেখে পরের চিঠির ভাঁজ খুলছে। তারপর সেটাও নামিয়ে রেখে পরেরটা ধরছে।প্রতিটি ভাঁজ করা চিঠির উপর লেখা 'প্রিয় অপু', তবে চিঠির ভিতরগুলো সব.....।শরীরটা থরথর করে কাঁপছে মল্লিকার, কপাল জুড়ে ঘামের মিছিল।

___"এইগুলো কি করছ তুমি?"

মল্লিকা চমকে উঠলো।বিদ্যুতের ঝটকা লাগলে যেমন হয় তেমনি করে কাগজের টুকরোগুলো থেকে কয়েক ইঞ্চি সরে গিয়ে বসলো।

__"এইসব কি?"

মল্লিকা এবার সম্বিৎ ফিরে পেলো।গলাটাকে যতটা পারা যায় স্বাভাবিক রেখে_

__"এই প্রশ্নটা তো আমারই করা উচিৎ অপু! এইসব কি?"

অপু ঘরে ঢুকে খাটে এসে বসলো। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রাখলো।তারপর আরও খানিকটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাতঘড়িটা খুলে বালিশের উপর রেখে শান্ত গলায়__

__"কেন? তুমি কি বুঝতে পারছো না?"

__"না বুঝতে পারছি না, আমি তোর ব্যাপার স্যাপার সত্যি বুঝতে পারছি না, প্রতিটি কাগজের উপর লেখা 'প্রিয় অপু'......আর ভিতরে....."।

মল্লিকার কথা শেষ হল না, গলাটা জড়িয়ে গেল।আর ঠিক তখনি অপুর মুখে কেমন একটা হাসি খেলে গেল,কিরকম যেন একটা নিষ্ঠুরতা আছে হাসিটায়।

__"চিঠি তো এরকমই হয়.....প্রেমের চিঠি....সেখানে তো এরকমই সব 'প্রিয়-প্রিয়' লেখা হয়,আমাকেও লিখেছে"।

__"কে? কে লিখেছে? অপু তুই নিজের জন্য কেন এমন সর্বনাশ ডেকে আনছিস? তুই কি জানিস না তোর........?"

কথাগুলো মল্লিকার গলা চিরে বেরিয়ে এলো কিন্তু অসমাপ্ত থেকে গেল।তারপর সুর নরম করে__

__"অপু তুই স্বাভাবিক হ'.... আবেগ দিয়ে নয় যুক্তি দিয়ে ভাব।তুই তো জানিস তোর গোটা গা'য়ে মুখে,শ্বেতীর দাগ.....আর ছেলেরা মেয়েদেরকে রঙরূপ ছাড়া বিচার করে না....এরপরেও যে ছেলে তোকে এইসব চিঠি দিচ্ছে সে তোকে ভালোবাসেনা, সে তোকে ব্যবহার করছে... কেন তুই বুঝছিস না?"__

অপু খাট থেকে নেমে এসে মেঝেতে মল্লিকার পাশটায় এসে বসলো।

__"আমি বুঝি, তোমরাই বরং বোঝ না,প্রেম তো যুক্তি দিয়ে নয়, আবেগ দিয়েই হয়।অবাক লাগছে এই সামান্য সত্যিটাও বোঝ না দেখে।আমার শ্বেতী আছে কিন্তু সে তো আমার মুখ জুড়ে, মনজুড়ে তো নেই, মনজুড়ে তো প্রেম আছে----শুধুই প্রেম।"

ঠাস করে একটা চড় পড়লো অপুর গালে।মল্লিকার ডানহাতটা লাল হয়ে গেল।চোখেমুখে আগুন।কিন্তু অপু বেশ নির্বিকার।সপাটে চড় ওর গালের ধবধবে সাদা চামড়ায় লাল আভা ছড়িয়ে দিল ঠিকই তবে তা রক্তকণিকার,​ লজ্জা বা ভয়ের নয়।

__"প্রেম! প্রেম! প্রেম! ....প্রেম তোকে শুধু উন্মাদই করেনি বেহায়াও করেছে। মায়ের সামনে এইসব কথা বলতে মুখে আটকাচ্ছে না তোর? একমুখ শ্বেতী নিয়ে প্রেম করতে চলেছিস? প্রেমপত্র দেওয়া-নেওয়া করছিস? আর কিসের প্রেমপত্র? দিস্তে দিস্তে সাদা কাগজ শুধু!"__

এক অদ্ভুত নৈশব্দ হুহু করে ঘরে ঢুকে গেল।মা আর মেয়ে দুজনেই স্থির, কয়েক মুহূর্তের জন্য।মল্লিকার তখন রাগে,দুঃখে,অভিমানে,আর আশঙ্কায় গোটা শরীরটা কাঁপছে।আর অপুর চোখদুটো কাঁপছে ফোঁটা ফোঁটা জলে।এদিকে মেঝেতে তখন দিস্তে দিস্তে সাদা কাগজ লুটোপুটি খাচ্ছে আর তাতে লেখা দুটি শব্দ "প্রিয় অপু" যেন চারপাশের নৈশব্দকে চোখ রাঙিয়ে চিৎকার করে বলছে - 'প্রেম কোন শর্ত মানে না, প্রেম কোন নির্দিষ্ট গতে চলে না।'

বেশ কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেল তারপর খুব শান্ত আর নিষ্কম্প গলায় অপু শুরু করলো__

__"তুমি কাগজগুলো সব সাদা দেখছো? কাগজে লেখা শব্দগুলো দেখতে পাচ্ছো না? আর শব্দের খাপে খাপে যে স্বপ্নগুলো আছে,সেগুলো? ইচ্ছে আর আবেগের জোয়ার আর জীবনের প্রতিশ্রুতিগুলো? কিছুই দেখতে পাচ্ছো না?.....আর প্রেম? প্রেম দেখতে পাচ্ছো না?"__

মল্লিকা কিছু একটা বলতে চাইছিল বোধহয়, কিন্তু অসহায়ের মত শব্দ হাতড়ে বেড়ানো ছাড়া আর কিছুই সম্ভব ছিল না ওর পক্ষে।ভীষণ এক খারাপ কিছুর আঁচ করতে পেরে নিথর হয়ে বসে থাকলো।

__"আসলে দোষটা তোমাদের নয়।তোমরা সব সাদাই দেখবে, যেমন করে আমার সাদা চামড়াটা দেখে এসেছো,চিরকাল।কিন্তু এই সাদা চামড়ার পরতে পরতে যে কতশত অনুভূতি আর আকুতিরা বাসা বেঁধে আছে তা কোনদিন দেখনি।তোমরা শুধু আমার গা'জুড়ে, মুখজুড়ে,জীবনজুড়ে শ্বেতীর দাপট দেখেছো।কিন্তু আমার মনজুড়ে যে প্রেমের আবেশ রয়েছে তা টের পাওনি।আর ধরেই নিলাম আমার জন্য প্রেম নিষিদ্ধ কিন্তু প্রেমের জন্য তো আমি নিষিদ্ধ নই"।

শেষ কয়েকটা কথায় অপুর গলা বুজে এলো।অপু থামলো।তারপর খুব যত্নে একটা একটা করে সাদা কাগজগুলো তুলে নিয়ে পুঁটলিটায় সাজাতে লাগলো।অপুর মুখটার দিকে চেয়ে মল্লিকা ডুকরে কেঁদে উঠে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।সে ভাবতেও পারেনি শ্বেতী অপুর চামড়া ভেদ করে এতটা গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে....এতটাই গভীরে যে অপুর মনের কুঠুরিতে জন্ম নেবে এক অলীক প্রেম, যে প্রেম 'এসেও আসেনি' আবার 'না এসেও এসেছে'।অপু বিলীন হয়েছে তার স্বপ্নের ঠিকানায় যেখানে কোন শ্বেতীর অভিশাপ নেই, আছে শুধু প্রেমের আশ্বাস.....প্রেম, এক অনন্য,অপার অনুভূতি।

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.