Header Ads

Breaking News
recent

শনিরবচন | ট্রেণ্ডের সাতসতেরো

Michil মিছিল

মানুষ মাত্রেই না হলেও, সমাজের একটা বড়ো অংশের মানুষই এক এক সময়ে এক একটা ট্রেণ্ডের পিছনে ছুটতে থাকে। সেই ছোটার ভিতরে হুঁশ থাকে না একেবারেই। থাকলে ভিড় অনেকটাই পাতলা হতো। উল্টে ক্রমেই ভিড় বৃদ্ধি পেতে থাকে। যত বেশি ভিড় হতে শুরু করে। তত নতুন নতুন মানুষ ভিড়ের ভিতরে নিজেকে সামিল করতে ছোটে। মানুষের স্বভাবই এই রকম। সবসময়ে ভিড়ের মাঝে ভিড়ে যাওয়া। অর্থাৎ গড্ডালিকা প্রবাহে নোঙর ফেলা। গড্ডালিকা প্রবাহ নতুন কোথাও গিয়ে পৌঁছাতে পারে না। একটা আবর্তের ভিতরেই ঘুরপাক খেতে থাকে অনবরত। ফলে ভিড়ের মাঝে ভিড়ে যাওয়াই যাঁদের চারিত্রিক স্বভাব। মানসিক প্রবণতা। তাঁরা গড্ডালিকা প্রবাহেই নোঙর ফেলে দেন। আর ভিড় বাড়তে থাকে। একশ বছর আগে চরকা কাটা ট্রেণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মানুষের ভিড় ধরেই নিয়েছিল। এই পথেই স্বারাজ আসবে। খাদির বস্ত্র তৈরীতে চরকার সুতোর পাকে পাকে স্বাধীনতার লড়াই বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর ব্রিটিশ তার ফলেই দেশ ছেড়ে পালাবে। দেশ শুদ্ধ না হোক। দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষই সেদিন চরকা কাটার ট্রেণ্ডের ভিড়ে সামিল হয়েছিল এই বিশ্বাসে। অন্ধবিশ্বাস দানা বাঁধে জনপ্রিয় নেতা নেত্রী’র সম্বন্ধে। জনপ্রিয় নেতা যখন চরকা কাটতে বসিয়ে দিয়েছেন স্বাধীনতাকামী জনতার একটা বড়ো অংশকে। তখন অধিকাংশ ব্যক্তি-মানুষের ভিতরে জনপ্রিয় নেতার প্রতি অন্ধবিশ্বাসই শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। এই পথেই স্বাধীনতা আসবে। চরকা কাটার সেই ট্রেণ্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে কয় দশক পিছিয়ে দিয়েছিল। কিংবা প্রকৃত স্বাধীনতার বদলে সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারার হাত ধরে ক্ষমতার হস্তান্তর কিভাবে সম্ভব হয়ে উঠেছিল। সে সব ইতিহাসের বিষয় আজকে। ইতিহাসের বিষয় হলেও। চরকা কেটে স্বরাজ আসবে। এই যে এক অন্ধবিশ্বাসের ট্রেণ্ড। ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে কিভাবে এবং কি পরিমানে নিয়ন্ত্রীত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইতিহাস সচেতন ভারতীয় মাত্রেই সে কথা জানেন। জানার কথা।

ফলে সমাজ ও রাজনীতিতে এক এক সময়ে এক একটি ট্রেণ্ড ভয়ানক ভাবেই ইতিহাসের নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। চরকা কেটে স্বরাজ আনার ট্রেণ্ড ১৯৪৭ সালেই শেষ হয়েছে। তার ভ্যালিডিটি সেইদিনই ফুরিয়েছে। তারপরে বিগত সাত দশক পার করে বর্তমানে নতুন একটি ট্রেণ্ড ভারতবর্ষ কাঁপাচ্ছে। যে নেতা বা নেত্রী, তিনি যে দলেই থাকুন না কেন। এমনকি শাসক কিংবা বিরোধী দলে। যত বেশি পরিমানে মিথ্যা কথা বলতে পারবেন। যত বেশি পরিমানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন। যত রকমের উদ্ভট কথা বলতে পারবেন। যত কম যুক্তির পথে হাঁটবেন। এবং মুখে যত বেশি মুখ খারাপ করতে সক্ষম হবেন। তিনিই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে তত বেশিমাত্রায় জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন। সঙ্গে যত রকমের বিচিত্র বেশভুষায় নিজেকে জনসমক্ষে কিংবা ক্যামেরার ফ্ল্যাশের সামনে দাঁড় করাতে পারবেন। ততই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবেন। রাজনৈতিক ভাবে জনমানসে নিরন্তন প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকার একটা দায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের থাকেই। সেটা স্বাভাববিক। বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার আসনে গিয়ে পৌঁছানো ও সেই ক্ষমতা আঁকড়িয়ে ধরে রাখাই যাদের জীবন ও জীবিকা। এই দায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে থাকারই কথা। এখন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিভাবে নিজেকে নিরন্তর জনমানসে প্রাসঙ্গিক করে রাখবেন। সেটি নানান বিষয়ের উপরে নির্ভরশীল। শিক্ষা এবং দীক্ষা। রাজনৈতিক মতাদর্শ। আদৌ সেইরকম যদি কিছু থাকে। দেশপ্রেম বা দেশসেবার মতো বিলুপ্ত প্রায় রাজনৈতিক দর্শন। দেশের ভবিষ্যতের কোন দিশা। জনসাধারণের জীবনযাপনের সুরাহার দিকে অতন্দ্র নজর। ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা জনমানসে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু মুশকিল হয়ে পড়ে তখনই। যখন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে এই সকল বিভিন্ন বিষয়গুলির সুদূরতম কোন সংযোগ থাকে না। যখন তাদের শুধু একটি লক্ষ্যই থাকে। ক্ষমতার মসনদে বসা। আর দেশের শাসন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বসে থাকা। তখন জনমানসে নিরন্তর প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকার দরকারেই তাদের মিথ্যা কথা বলা, উদ্ভট কথা বলা, নিরন্তর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাওয়া, এবং যুক্তিহীন কথাবার্তা বলার পথকেই বেছে নিতে হয়। কারণ একটাই। এই পথেই সবচেয়ে সহজে জনমানসে নিরন্তর প্রাসঙ্গিক থাকা যায়।
যাঁরা দেশের জনমানস নিয়ে কাজ করে থাকেন। তাঁরা জনমানসের নাড়ির খবর রাখেন সবচেয়ে বেশি। তাঁরই জানেন সাধারণ জনগণের নত্ব এবং ষত্ব। জনতাকে কখন কিভাবে ম্যানেজ করতে হবে। কিভাবে ম্যানেজ করা সহজ। এই বিদ্যাই একজনকে রাজনৈতিক নেতা বানিয়ে তোলে। সাধারণ মানুষ দেশের ভালো নিয়ে মাথা ঘামায় না কোনদিন। সে নিজের প্রকৃত ভালো কিসে হতে পারে। সেই বিষয় নিয়েও বিশেষ মাথা ঘামাতে রাজি নয়। সে হরিরলুটের বাতাসা পেলেই সন্তুষ্ট। 
প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নেত্রীরা এই সত্যটুকু ধরে ফেলেছেন অনেকদিন আগেই। জনতার নজর থাকে, কোন দল ক্ষমতায় গেলে কত বেশি পরিমানে হরিরলুট দেবে। জনতা তাকেই মসনদে বসাবে। আর বাকি বিষয় নিয়ে জনতার কোন মাথাব্যথা নেই। বরং মুখরোচক আলোচনার কোন খোরাক পেলেই সে সামিয়ক ভাবে হলেও খিদেও ভুলে যেতে পারে। ফলে জনতাকে বশে রাখতে হলে নিরন্তর আলোচনার খোরাক জুগিয়ে যেতে হবে। এই বিষয়টুকু রাজনৈতিক নেতা এবং নেত্রীদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু হলেই তো আর হলো না। জনতার কাছে নিত্য নতুন আলোচনার খোরাক হয়ে উঠতে গেলে সবচেয়ে সহজ পথই হলো ভাঁড় হয়ে ওঠা। রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরা সকলেই যে এই ভাঁড় হয়ে ওঠার ইঁদুর দৌড়ে অংশ নেন। তাও নয়। কিন্তু যাঁরাই নেন। খবরের শিরোনামে তাঁরাই থাকেন সবচেয়ে বেশি। জনমানসে তাঁদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। ভোটারদের সবচেয়ে বড়ো অংশকে তাঁরাই নিয়ন্ত্রীত করতে পারেন। বাকিরা সেই প্রভাবের ফলটুকু চেটেপুটে খেয়ে স্ফীত হয়ে ওঠেন। আর সেটাই বর্তমান ট্রেণ্ড।

রাজনৈতিক নেতা নেত্রী যত বেশি পরিমানে মিথ্যা কথা বলতে পারবেন। তত বেশি পরিমানে জনতার আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন। যত বেশি উদ্ভট রকমের কথা বলতে পারবেন। তত বেশি পরিমানে জনমানসে গেড়ে বসবেন। যত বেশি পরিমানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে পারবেন। তত বেশি করে ভোট পাবেন। যত বেশি পরিমানে মুখ খারাপ করতে পারবেন। তত বেশি পরিমানে অন্ধভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। এটাই একুশ শতকের ভারতীয় রাজনীতির ট্রেণ্ড। এটা ঠিক, রাজনীতির কারবারিরাই এটি ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু সেটি সম্ভব করে তুলেছে দেশের জনসাধারণ। ফলে এই ট্রেণ্ডের সাফল্যের পিছনে দেশের জনমানসের স্বভাব প্রকৃতিই প্রধান কারণ। দেশের মানুষের স্বভাব প্রকৃতি অন্য ধরণের হলে এই ট্রেণ্ড গড়ে উঠতো না কখনোই। জনতা জানে, আকাশবাণী কলকাতায় সকাল সাড়ে পাঁচটায় কস্মিনকালেও রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো না। কিন্তু দেশপ্রধান যখন বলেন, ভোর সাড়ে পাঁচটায় কলকাতার রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে তাঁর দিন শুরু হতো। তখন জনতা সেই মিথ্যাচারের পিছনেই ভিড় করতে শুরু করে। জনতা মিথ্যাচার ধরে ফেলেছে বলেই ভিড় বাড়ায়। এই রকম নির্ভেজাল মিথ্যে বলার ভিতরেই একটাই বাহাদুরী অনুভব করে জনতা। ঠিক যতটা মিথ্যে সে নিজে বলতেও সাহস পায় না। জানে মানুষ তখন তাকে নিয়ে উপহাস করা শুরু করে দেবে। কিন্তু একজন দেশপ্রধান যখন সেই একই মিথ্যা বলতে শুরু করে। জনতা তখন তার ভিতরে সেই সাহসটুকুই প্রত্যক্ষ করে। যে সাহসটা তার নিজেরই নেই। সেই জনতাই যখন শোনে। সদ্য প্রয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মাঝে মধ্যেই টেলিফোন করে রাজ্যের প্রধানকে গান শোনাতে অনুরোধ করতেন। তখন সেই উদ্ভট তথ্য জনতার কানে নির্ভেজাল মিথ্যা বলে ধরা পড়লেও জনমানস তার ভিতরে একটা বাহাদুরী অনুভব করতে থাকে। যিনি কোনদিন কোন সঙ্গীতানুষ্ঠানে হল ভর্তি মানুষকে সঙ্গীত শোনাননি। যিনি সঙ্গীত শিল্পী বলেও পরিচিত নন। তাঁর কাছেই কি’না সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ফোন করে গান শোনানোর আব্দার করতেন। সঙ্গীত শিল্পীর সদ্য প্রয়াণ উপলক্ষে যদি এই একই কথা কোন রাম শ্যাম যদু মধু বলতো। তবে জনমানসে সেটা ভাঁড়ামো বলেই চিহ্নিত হতো। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর মুখে সেই একই কথা আরও বেশি মানুষের ভোট নিশ্চিত করার গ্যারান্টি হয়ে ওঠে। না হলে কোন সচেতন মানুষ পাব্লিক স্পেসে এমন কথা বলতেই বা যাবেন কেন?

যিনি বললেন গরুর দুধে সোনা রয়েছে। সেই তাঁর নেতৃত্বের উপরেই ভরসা করে রাজ্যের আটত্রিশ শতাংশের বেশি মানুষ গত বিধানসভা নির্বাচনে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে দিল। এই যে মানুষের স্বভাব প্রকৃতি। এইটি অনুধাবন করতে না পারলে কোন মানুষের পক্ষে এই একবিংশ শতকে এসে বলা সম্ভব ছিল কি? গরুর দুধে সোনা রয়েছে! কারণ তিনি বিলক্ষণ জানতেন। এই একটি উদ্ভুট কথাতেই তিনি কোটি কোটি মানুষের চেতনায় নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে নিতে পারবেন। ভোটের ফলাফলেই সে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। মানুষ বর্তমানে এমনই এক জায়গায় এসে পৌঁছিয়েছে। অনেকেই মানতে চাইবেন না যে, গরুর দুধে সোনা থাকার মতো উদ্ভট কথাতেই একটা বড়ো অংশের মানুষ তাঁর নেতৃত্বের উপরে ভরসা রেখেছিল। নিশ্চয় তা নয়। কিন্তু এই রকম উদ্ভট কথা যিনি অহরহ বলে থাকেন। সেই রকম একটি মানুষের নেতৃত্বের উপরে ভরসা করেই তো আটত্রিশ শতাংশের বেশি মানুষ তার দলকে ভোট দিয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এই হিসাবটি অগ্রাহ্য করার মতো বিযয়ও নয়। এই মানুষগুলি মনে করেছিল। এই ধরণের নেতৃত্বের হাতেই রাজ্যের ভালো হবে। তাদের ভাগ্য ফিরবে। এই যে বিশ্বাস এবং ভরসার ভিত্তি ভুমি। এটিকে অস্বীকার করার কোন উপায় নাই আর।

ফলে আজকে যে রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নেত্রীরা যত বেশি মিথ্যাচার করতে পারবেন। যত বেশি মিথ্যা কথা বলার হিম্মত রাখবেন। যত বেশি নানান রকমের উদ্ভট কথায় জন সাধারণের সমানে ভাঁড়ামো করতে পারবেন। যে যত বেশি পরিমানে মুখ খারাপ করতে পারবেন। আর যত মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে পারবেন। সেই সেই রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নেত্রী তত বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। দলের রাজনৈতিক স্বার্থে তত বেশি মানুষের ভোট দলের পক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হবেন। কারণ তাঁরাই সর্বক্ষণের জন্য জনমানসে নিরন্তর চর্চিত হয়ে থাকেন। একদিকে ভাঁড়ামো আর একদিকে মিথ্যাচার। এই দুইটির জন্যেই জনমানসে তাঁরাই বাহাদুর বলে প্রতিপন্ন হয়ে ওঠেন। ঠিক যে বাহাদুরী করার সাহস কোন ভোটারেরই থাকে না। যতক্ষণ সে সাধারণ জনতার অংশ। এই বাহাদুরীই একুশ শতকের ভারতীয় রাজনীতির প্রধান ট্রেণ্ড। জনসাধারণের স্বভাব ও প্রকৃতির ভিতের উপরেই যে বাহাদুরীর সাফল্য নির্ভরশীল।



১৯শে ফেব্রুয়ারী’ ২০২২
কপিরাইট সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.