Header Ads

Breaking News
recent

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত | স্রষ্টাকথা

Michil মিছিল

৩১

আলো ফোটার আগেই পূষন মারা গেল। নদীর ধারে বালিতে খুব গভীর গর্ত করে দেহ পুঁতে দেওয়া হল। ওর দেহের ওপর ওর প্রিয় ফুলের গাছের চারা বসিয়ে দেওয়া হল। মা খুব কাঁদল। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিল। খুয়া খুব চেষ্টা করল স্বাভাবিক করার। প্রায় পাঁচদিন পর মা কে খাওয়ানো গেল। সবাই প্রচুর বিষবাণ তৈরি করতে লেগেছে। বারিক সারাদিন খাটছে। গুহার মাথায় সর্বক্ষণ কেউ না কেউ থাকে। চার পেয়ে জন্তু টা নিজে শিকার করতে শিখে গেছে। চেহারা বিরাট হতে শুরু করেছে। অদ্ভুত ভাবে চেনা কাউকে কিচ্ছু করে না। কিন্তু অচেনা জন্তু বা মানুষ দেখলেই প্রবল বিক্রমে গর্জন করে। আশেপাশের পাখীরা নিশ্চিন্তে ওর শিকারে মুখ দেয় কিন্তু অচেনা কিছু কে অসম্ভব অপছন্দ করে। খুয়ার কথা শোনে। বকুনি দিলে মাথা নিচু করে। শিশুরা তার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। বারিক খুয়া কে সাবধান হতে বলে। একা কোথাও যেতে বারণ করে। খুয়ার কেবল কিরির জন্যে মন খারাপ হয়। ওর অর্ধেক এঁকে যাওয়া শুকরের ছবি টা বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে। ​ ​

বেঁচে থাকলে খুব কষ্টে আছে কিরি। মনে মনে বুঝতে পারে খুয়া। পূষন সেই ছেলেটা কে বাঁচালো আর কিরি কে দেখল না। মন খারাপ হয় খুয়ার। মা আজকাল মাঝে মাঝে ককিয়ে ককিয়ে কাঁদে। মায়ের পিঠে হাত দেয়। মা রোগা হয়ে গিয়েছে। খুয়ার পায়ের ক্ষতে আর ব্যথা নেই। কিন্তু ক্ষতের একটা নকশা থেকে গেছে উরুতে। গভীর ভাবে গর্ত । আজ অনেকদিন পর সাদা ফুলের গন্ধে ম্ ম্ করছে চারপাশ। চাঁদ উঠবে নাকি। আগে চাঁদের দিনের খবর পূষন বলে দিত। সেই হিসেব মা কিছুটা জানে। খুয়া কে শিখে নিতে হবে। চাঁদ উঠলে সবাই মিলে নাচত। শেষ নাচের পর আদোয়ার লোকেরা আক্রমণ করেছিল।খুয়ার মাথা গরম হয়ে ওঠে। সে মুঠি শক্ত করে। মেরে ফেলবে ঐ ছেলেটা কে।কিন্তু অবাক হয়ে যায় খুয়া। কেন পূষন এমন করল। এঁকে বাঁচিয়ে কি লাভ হবে। পূষন কারো খারাপ চায় না। পূষন কত কি না জানত! খুব অবাক লাগে। চাঁদের রাতে হাতের জোর কেমন করে বাড়ানো যায় তাই নিয়ে ভাবতে থাকে খুয়া। আগে সে যত বড় পাথর ছুঁড়তে পারত এখন তার চেয়ে বেশী ভারী পাথর ছুঁড়তে পারে। কিন্তু ের বেশী কিছুতেই পারছে না। গুলতি আর বিষবাণে সে দক্ষ। কিন্তু খুব কাছে কেউ চলে এলে কি ভাবে মারবে। পূষন যে ভাবে বড় গোসাপ একবার মেরেছিল সেই রকম কিছু ভাবতে হবে। তবে এই চারপেয়ে কাছে থাকলে খুয়া কে কেউ কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

∆৩২

জাকুর খুব জ্বর এসেছে। লুলু পাশে বসে আছে। জ্বর যে শারীরিক নয় সেটা বুঝতে পেরছে লুলু। নিজের ছোট ছেলে জাকুজাকু কে সে ভালোবাসে কিন্তু জাকু যে তার চেয়ে বেশী উপযুক্ত সেটা সকলেই জানে।লুলু দুশ্চিন্তায় পড়ল।জাকুর মন যদি ভাইয়ের জন্যে ভেঙ্গে যায় তাহলে লুলুর খুব কষ্ট হবে ।তার দুই ছেলেকে নিয়ে বড় বেশী মায়া। শেষ বয়সে ছেলেদের মধ্যে বিরোধ দেখতে ভালো লাগবে না। খুব মন খারাপ হল লুলুর। আজকাল তার একটা মাত্র চোখেও সে ভালো দেখে না। কান্নার জল কিন্তু দুটো চোখ দিয়েই পড়তে লাগলো।জাকু অস্ফুটে আওয়াজ করে। চোখ মুছে লুলু তার দিকে ঝুঁকে পরে জিজ্ঞাসা করে , “কি হল, জল খাবে বাপধন” ।জাকু স্মিত হাসি আনে শুকনো মুখে , বাবা কে দুশ্চিন্তা করতে দেখে ভালো লাগে না।সে উঠে বসে। “তুমি ভয় পেও না বাবা, আমি ভালো আছি। আমি একবার সাবুকের সাথে দেখা করে আসি। এর পরের আক্রমণ কবে করা যাবে? আলোচনা দরকার।” যত সহজে জাকু বলল ,ভেতরে সে তত টা শান্ত নয়। সাবুক আর প্রচেষ্টা কে সন্দেহ করছে। নিজের যোগ্যতা প্রতিস্থাপন করা বেশ কঠিন। আর যদি সুযোগ না দেয় তাহলে খুব মুস্কিল হবে। তাছাড়া দলের সকলে মারা গিয়েছে। সেটার দায়িত্ব আছে। একা তার বেঁচে থাকা নিয়ে সকলে সন্দেহ করতে পারে। খুব মুষড়ে পড়ল জাকু।

সাবুকের ডেরায় একজন কে বেঁধে ফেলে রাখা আছে। চেহারা টা চেনে না জাকু। জাকুর শ্লথ গতি দেখে পরিচিত রা এগিয়ে আসে কুশল বিনিময় হয়। তার অদ্ভুত ভাবে ফিরে আসা নিয়ে কারোর মনে কোন সন্দেহ সে ভাবে বুঝল না জাকু। আচমকা পেছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরল। তার সাথে যাওয়া দুজন সৈনিক এর একজন। সে যে বেঁচে আছে জেনে খুব আনন্দ পেল জাকু। তিনজন মিলে অনেক ক্ষন কেবল হাসল। এরা দুজন বিশেষ পারিতোষিক পেয়েছে। একজন কে ধরে আনতে পেরেছে। তাকে এবারের রাজকীয় খেলার জন্যে বাচ্চাদের কারাগারে দিয়েও এসেছে। জাকু অবাক হল। তাহলে সব কিছু এখনো শেষ হয়ে যায় নি।

সাবুক জাকুকে তার নিজের কক্ষে আসতে বলল। কক্ষ বললে ভুল হবে একটা মাটির তলার ঘর। অস্ত্রে ভর্তি।​

“রাজা​ তোমার ওপর সন্তুষ্ট নয় জাকু।আসলে ঐ লম্বা গুহা মানব কে আমাদের লাগতো। তার মত ওষধির জ্ঞান কারো নেই। রাজা ইদানিং আকাশের ‘গুমগুম’ করে ডাকা দেবতার ওপর আর ভরসা করতে পারেন না। তাঁর খুব দরকার ছিল এই মানুষ টিকে” সাবুক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা জাকুকে বলে। জাকু কিছু বলতে পারে না। বেশ কিছু ক্ষন চুপ করে থাকল দুজন। “যাকে তোমার স্যাঙ্গাৎ রা ধরে এনেছে সে নেহাৎ শিশু।তার আদৌ কোন জ্ঞান আছে কিনা কে জানে। ” সাবুক বলে চলে। “বাচ্চা টাকে একবার দেখা যাবে?” নিরুপায় গলায় জাকু বলে। “যেও একবার দেখতে, পাহাড়ে বৃষ্টি নামবে আর কিছুদিনের মধ্যে। বৃষ্টি থামলে আমরা আবার অভিযান করবো। এবার ধরে আনতে হবে সব গুলোকে। তুমি সুস্থ হয়ে নাও” সাবুক জাকুর দিকে তাকিয়ে বলে। বুক থেকে পাথর নামে জাকুর।জাকু এক মুখ হেসে বলে , “ আমি এবার সফল হবই। আমি চিনে এসেছি ওদের আসল যোদ্ধা কে।” সাবুক হেসে বলে,“ঠিক আছে ,এবার ঘরে যাও”। সাবুকের বড় ইচ্ছা এই ছেলেটিকে তার কন্যার সঙ্গী করার। কন্যার পছন্দ হবে কিনা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। জাকু বীর কিন্তু কপট নয়। কিন্তু কপটতা ছাড়া সফল হওয়া যায়?

∆৩৩

কিরির পিঠের ব্যাথাটা কিছুতেই কমছে না। জিবে এত গভীর ক্ষত তার খাবার গিলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এতো গুলো তার বয়সী ছেলে সে আগে কোনদিন দেখেনি। ভাষা বুঝতে না পারলেও এরা যে ওর কোন ক্ষতি করবে না সেটা কিরি বুঝতে পারে। অতি কষ্টে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে পারেনি। একটি ছেলে সব সময় তার ওপর নজর রাখছে। তাঁকে খুব ভালো লাগছে কিরির।খুয়ার মতন। যে লোকটা ​ বিন্নো বলে ছেলেটা কে সেদিন ধমক দিচ্ছিল সে আবার এলো। সাথে অনেকজন। চমকে উঠল কিরি সেই বকের পালক মাথায় গোঁজা ছেলেটা । কি সাংঘাতিক । তাকে তো বিষবাণ দিয়ে আহত করে দিয়েছিল। কিরির খুব কাছে এল ছেলেটা। কিরি ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। পাশে বসে থাকা মুগার হাত চেপে ধরে থাকল। জাকু ভালো করে কিরি কে দেখে। মুখে হাসি ফোটে তার। ডিগাকে বলে, “ এই পুঁচকে সাংঘাতিক । মুখে ফুঁ দিয়ে অদ্ভুত ভাবে সরু সরু বাণ ছুঁড়ে মারে।বাণে বিষ থাকে। মহা বিচ্ছু।” বিন্নো এগিয়ে আসে । দৃঢ় স্বরে সে বলে,

“ সাংঘাতিক আহত। ওর চিকিৎসার প্রয়োজন। দাঁড়াতে পারছে না। জিবে ঘা।” ডিগা এগিয়ে এসে আগের দিনের মত আবার আঘাত করতে উদ্যত হয়। মুগা আর অন্য ছেলেরা বিন্নোর সামনে এসে দাঁড়ায়। চাবুক হাতে অন্য রক্ষী এগিয়ে এসে প্রহার শুরু করে। ছেলেরা ভয় না পেয়ে চাবুক চেপে ধরে। জাকু সবাই কে থামায়। ছেলেরা রাগে হিস হিস আওয়াজ করতে থাকে। তাদের অনেকের গায়ে রক্তের ধারা। কিরি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে পরে।ডিগা খুব কুৎসিত ভাবে চিৎকার করে। জাকু বিন্নো কে জানায় খুব শিগ্রি বাচ্চাটির চিকিৎসা হবে। সবাই বুঝতে পারে ডিগার চেয়ে এই মানুষটি বেশী শক্তিশালী।

মুগা আর বিণ্ণো বেশ আনন্দ পায় দুপুরের ঘটনায়। ভয় না পেয়ে যদি ওরা একসাথে যে আক্রমণ রুখতে পেরেছে সেটা খুব সাফল্যের। তবে অনেকেই খুব আহত। তবে কেউ সেই আঘাত নিয়ে বিন্দু মাত্র চিন্তিত নয়। সকলে ফুর্তিতে আছে।কিরি কে ওরা যা ভাবছিল টা কিরি নয়। কিরি যুদ্ধ করতে জানে এটাও বেশ আনন্দের। এখন যত বেশী জন যুদ্ধ টা বুঝবে ওদের তত ভালো। এরপরের খেলা কেমন ধরণের হতে পারে তাই নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। বাঘের মুখে ছেড়ে দেবে, নাকি আগুনের দেওয়াল। এক রক্ষী মাঝে মাঝে এসে ছেলেদের সাথে গল্প করে যায়। আগের বার, তার আগের বার কি কি হয়েছিল। একটা কি জন্তু আনা হয়েছিল তার পায়ের তলায় পিষে মারা গিয়েছিল অনেকজন। বিন্নো আর মুগা শলা পরামর্শ করে। সেই রক্ষীই জানিয়েছে, সব শেষে সব চেয়ে দুজন বীরের যুদ্ধ হয়। একজন কে মরে যেতে হয়। যে বাঁচে সে খুব আরামে রাজার সাথে সারা জীবন থাকতে পায়,সুন্দরী মেয়ে পায়,সবচেয়ে ভালো খেতে পায়। শেষ যুদ্ধের আগে কি হয় সেটা দেখার।

কিরির জন্যে এক ওঝা এসেছিল। সে পিঠে কি সব লাগিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করে কি সব পাখীর পালক বুলিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ জাকু সেখানে উপস্থিত হয়। ওঝাকে সরিয়ে দেয়। সাথে একজন লোক। রক্ষীরা ফিস ফিস করে বলল , “রাজার বৈদ্য”। সাথে একটি সাদা পোশাকের ছেলে। মুগা এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে-লিয়ামের হাঁদা ছেলে । লিয়ামের হাঁদা ছেলে চিকিৎসার পর কিরির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কিরি ঘুমিয়ে পরে। জাকুর কাছে হাঁটু গেড়ে সে প্রাথনা করে যদি তাকে কিছুক্ষন মুগার সাথে থাকতে দেওয়া হয়। জাকু হাসি মুখে তাকে অনুমতি দেয়।মুগা আর লিয়ামের ছেলে অনেকক্ষণ গলা জড়িয়ে কাঁদে। তারপর গল্প করে। কেমন করে ফিরে যেতে পারে তার কথা। বিন্নো আর অন্য ছেলেরাও এসে গল্পে যোগ দেয়। কখন যে সময় কেটে যায়।লিয়ামের হাঁদা ছেলে নিয়ে চলে যায় রক্ষীরা। সে চলে যাবার পর মুগার মনে হয়, আরে আজো তার নাম টা জানা হয়নি। ​

∆৩৪

খেলা শুরু হতে আর কয়েক ঘণ্টা বাকী। সাবুকের এই খেলা নিয়ে কোন আকর্ষণ নেই। সে মন দিয়ে হিসেব দেখছিল। এবার ভেড়ার সংখ্যা কিছু বেড়েছে। ঘরে বাইরে বেশ কিছু মানুষের পদচারণার আওয়াজ। সে একটু অবাক হল। কিছুক্ষনের মধ্যে তার মাটির তলার ঘরে এসে হাজির হল ডিগা। গোটা গা ঘামে ভেজা। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। একটু চমকে সাবুক। আচমকা তার পেছনে ওঝা দাঁড়িয়ে। দুজনেই একটা হিংস্র হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে।সাবুকের হৃদপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে। সে দেখতে পায় পেছনে আরও যোদ্ধা। আর অবাক হয়ে দেখে এক যোদ্ধার হাতে রাজার কাটা মুণ্ডু। বীভৎস মৃত্যু সে অনেক দেখেছে। কিন্তু সাবুক বুঝতে পারে তার সময় শেষ হয়েছে। সাবুকের পেছনে অস্ত্র নিয়ে চলে আসে একদল যোদ্ধা। তার হাত দুটো পেছনে বাঁধে। হ্যাচরাতে হ্যাচরাতে নিয়ে চলে সাবুক কে।সাবুক প্রাণপণে তাঁদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু এতজনের সাথে সে অপারক। তার কন্যা সন্তানটির কি হবে এই ভেবে বুক কেঁপে উঠল।আজ গোটা মহল্লা গেছে সেই বিখ্যাত খেলা দেখতে। সাধারণ মানুষ খুব একটা এখানে নেই। সাবুক ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়ে। সাবুকের পিঠে বেশ কয়েকটা অস্ত্রের আঘাত হয়। গলগল করে রক্তপাত হয়। সাবুক কে ওরা রাস্তা দিয়ে খেলা হচ্ছে সেই দিকেই নিয়ে চলে। রাস্তাতে সাধারণ লোকজন এই দৃশ্য দেখে হতবাক। সাবুক তাদের চোখে সহানুভূতি দেখতে পাচ্ছে। তারা ভয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। সাবুকের সাথে ডিগা আর ওঝাও আছে। ওঝার খুব উত্তেজনা। সে লাফাতে লাফাতে চলেছে। রাজার মুণ্ডুটা আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। বড় বাড়ি গুলোর ছাদে মেয়েরা ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছে।সেনা বাহিনী কি পুরোটায় ওদের দখলে!কেউ কি নেই এদের থামানর।এতবড় ষড়যন্ত্র কোন ভাবেই জানতো না সাবুক। ডিগার এক অনুচর খারাপ কাজ করায় তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন রাজা। কিন্তু এতো রাগ কিংবা পরিকল্পনা কিছুতেই কেন জানতে পারেন নি সাবুক। ডিগাকে তার পছন্দ নয় কোন কালে। কিন্তু ডিগা এতো ভয়ানক?দেহের কষ্টের চেয়েও মনের কষ্ট তার বেশী হচ্ছে। যে মাঠে খেলা হবে তার খুব কাছেই রাজবৈদ্যের বাসস্থান। সাবুককে এবড়ো খেবড়ো একটা জায়গায় মাটিতে ফেলে রেখে তার ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একদল সৈন্য। অন্যরা রাজবৈদ্যের বাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাবুক চিৎকার করে অভিশাপ দেয়। তার মাথায় বেশ জোরে আঘাত করা হয়। মাটিতে রক্তেভেসে যাওয়া মুখ নামিয়ে রাখতে রাখতে দেখতে পায় রাজবৈদ্য কে টেনে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের কন্যাটির কি হবে এই ভেবে চমকে ওঠে সাবুক। আকাশে এক এক গুম গুম করে ডাকা দেবতা থাকে, ‘সে এই মানুষগুলোর মাথার ওপর বজ্রপাত করুক’, সে চোখ বন্ধ করে এই প্রাথনা করতে থাকে।

∆৩৫

আজকের খেলা নিয়ে সকলেই খুব উত্তেজিত। কিরির ভালো লাগছে না। তার জিবের ক্ষত সেরে গিয়েছে। কথা বলতে পারছে। কিন্তু পিঠের ব্যাথা কমছে না।

তবু তাকে খেলার দলে নিয়ে এসেছে বিন্নো। আসলে যে খেলেতে পারে না তাকে ওরা মেরে ফেলে। বিন্নোও আজ খুব ভয় পাচ্ছে। সে গম্ভীর হয়ে আছে। মুগা চুপ করে আছে। আজ যে কোন বন্ধুকে হারাতে হতে পারে। কিংবা সেও মরে যেতে পারে। খেলা শুরু হবে কখন তারা জানে না। তাদের যে খাঁচায় ঢুকিয়ে রাখা আছে সেটা বড্ড ছোট। ওদের সকলের খুব অসুবিধা হচ্ছে।মুগা আজকাল কেবল চারিদিকে চোখ রাখে কেমন করে পালিয়ে যাওয়া যায়। খাঁচা থেকে বার হওয়া যেতে পারে কিন্তু তারপর । সেটাই ভেবে চুপ করে থেকে যায়। আচমকা একটা হই হই আওয়াজে সকলেই একটু চনমনে হয়। মুগা অবাক হয়ে দেখে তারা যেখানে খেলা হবে বলে আন্দাজ করছিল, সেই ফাঁকা অংশ টাতে একদল যোদ্ধা দুটো লোক কে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। পেছনে ডিগা বলে লোকটা। আশেপাশে যত মানুষ খেলা দেখতে এসেছিল তারা ভয়ে চিৎকার করছে। মুগা অবাক হয়ে দেখল তাঁর চেনা মানুষ দুজন। সাবুক আর কিরি কে সুস্থ করতে এসেছিল সেই রাজবৈদ্য। কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। কিরির বুকের মধ্যে একটা অন্য আশংকা দেখা দেয়। তার বিপদটা কি আরও ভয়ানক। বিন্নো মুগার কানের কাছে মুখ এনে বলে, “এবার যদি পালিয়ে যাওয়া যায়... ওরা নিজেরা যদি মারামারি করে তাহলে আমরা ঠিক পালিয়ে যেতে পারবো।” মুগা একটু অবাক হয়। কিন্তু যুক্তি টা যে ভুল নয় সেটা বুঝতে পারে। আরও অনেক পুরুষ আর মহিলা কে ঐ এক ভাবে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে। অনেক গুলো ছোট ছেলে মেয়ে কেউ নিয়ে এসেছে। তারা সকলে কাঁদছে। ডিগা বলে লোকটা একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়ায়। সকলকে চমকে দিয়ে দেখায় হাতে একটা কাটা নরমুণ্ড। এতো রাজা। মুগা পাশ ফিরে দেখে কিরি বমি করছে। বিন্নো মুগাকে ইশারা করে কিরি কে সাহায্য করার জন্যে। একদল যোদ্ধা ওদের খাঁচার দিকে এগিয়ে আসে। বিন্নো চোয়াল শক্ত হয়। অন্য বন্ধুদের বলে ভয় না পেয়ে শান্ত থাকতে। মুগা কিরি র জন্যে কয়েক ফোঁটা জলের ব্যবস্থা করেছে। তাতে কিছুই হল না। ঐ অবস্থাতেই সে নেতিয়ে বসে রইল।বড় মায়া হয় কিরির জন্যে। মুগা চারিদিকে চোখ চালায়। লিয়ামের হাঁদা ছেলে কোথায়? সেতো রাজার সাথে সারাক্ষন থাকত।


∆৩৬

এক চোখ লুলু আর জাকু কে বেঁধে রেখেছে জাকুজাকু। লুলু তার ছোট ছেলের এই আচরণে খুব অবাক। জাকু অত্যন্ত রেগে খুব বকাবকি করছে। কিন্তু জাকুজাকু কিছুতেই খুলছে না।“ তুই ভুল করছিস খুলে দে ভাই। রাজা আমাদের জন্যে দশটার বেশী ভেড়া দিয়েছিল। সাবুক তোকে আর আমাকে কত ভালোবাসে তাদের সাথে আমরা​ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি?এমন কাজ কি কেউ করে? ”

“ তুমি জান না। ডিগা নতুন রাজা। সে আমাকে সাবুকের ​ জায়গাটা দেবে। আমাকে সাবুকের মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে। আমাকে রাজার বাড়ির পাশে একটা সিঁড়ি দেওয়া বাড়ি করে দেবে। ঘোড়া দেবে। তুই যদি রাজাকে বাঁচাতে যাস আমি এসব পাবো না।”জাকুজাকু এক নিঃশ্বাসে বলে চলে। হাতে ছোট ধারাল অস্ত্র । লুলু ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে। লুলুর অনেকগুলো বউ তারাও কাঁদতে থাকে। কেবল গুম হয়ে মাটিতে বসে থাকে জাকুর মা। সে কি ভাবছে কেউ বুঝতে পারে না। জাকু খুব চেষ্টা করে বাঁধন খোলার। কিন্তু জাকুজাকু ধারাল অস্ত্র দেখায় আর রাগ করে।জাকু বুঝতে পারে এভাবে হবে না। সে শান্ত হয়ে যায়। “বাবা তুমি চিন্তা কোর না। শান্ত হও। সব ঠিক হবে।” লুলু আরও জোরে জোরে কাঁদে। ​

জাকুর মা এগিয়ে এসে লুলুর কাছে দাঁড়ায়। খুব দৃঢ় স্বরে জাকুজাকু কে বলে লুলু আর জাকু কে বাঁধন খুলে দিতে। জাকুজাকু অত্যন্ত রুক্ষতার সাথে তাকে সরিয়ে দেয়। হাতের ধারাল অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখায়। লুলু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। জাকু শান্ত হয়। অন্য ভাবে নিস্তার পেতে হবে। ডিগা কে সে কখনো বিশ্বাস করে না। সাবুক যে কেন করত। জাকু জানে না রাজা মৃত, সাবুক কে ধরে নিয়ে গেছে ডিগার যোদ্ধারা। সে মনে মনে ভাবতে শুরু করে, কোট দ্রুত বাঁধন ছাড়িয়ে সাবুকের কাছে সব কিছু জানাবে। ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার আগেই জাকুজাকু তাকে আর বাবা একচোখ লুলু কে বেঁধে ফেলেছে। জাকুজাকু কিছুতেই কেন বুঝছে না। আজ বাড়িতে রান্না হয় নি। এতো বড় সংসারে সকলেই অভুক্ত হয়ে বসে আছে। অস্ত্র হাতে জাকুজাকু পাহারা দিচ্ছে। বাড়ির ছোট ছোট ভাই বোনেরা উবু হয়ে বসে আছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জাকুজাকু র দিকে। লুলু ঝিমোচ্ছে, জাকুজাকু একটা পাথরের বাসনের ওপর বসল উঁচু হয়ে। জাকু বুঝতে পারছে এবার তার ভাই শান্ত হয়েছে। খুব ধীর স্বরে সে বলে, “যদি ডিগা রাজা হয় ,সে কি আমাকে আর বাবাকে বাঁচিয়ে রাখবে?তোর কি মনে হয়।” জাকুজাকু যেন একটা ঝাঁকানি খেল।চুপ করে থেকে বলল, “ না না, কিছুতেই না, তা কেন করবে। আমি তো ওর পক্ষে কাজ করব”! জাকু সোজা তাকিয়ে বলল, “আমি তো ওর পক্ষে কোন কাজ করব না। ওর সাথে আমার মেলে না। বাবার ও না, তবে কি আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে? ভেবে দ্যাখ। যদি আমাদের মেরেও ফেলে। তোকে কি পুরোপুরি বিশ্বাস করবে ? তুই তো বাবার ছেলে তাই না। ভাববে ভয় পেয়ে তুই ওদের দলে গেছিস।” এই কথা বলে চুপ করে যায় জাকু। জাকুর মা কোন শব্দ না করে অশ্রুপাত করতে থাকে। বাড়ির শিশুরা মায়ের কাছে এসে ঘন হয়ে বসে। জাকুজাকু দাদার দিকে চোখের কোন দিয়ে তাকায়। সে একটু থমকে গেছে বোঝা যায়। লুলু কেঁদে কেঁদে কিছুক্ষন পর ঝিমোতে থাকে। জাকুজাকু এগিয়ে আসে জাকুর কাছে। সোজাসুজি তাকিয়ে বলে ওঠে ,“তোকে মারবে না,বাবাকে ও না ডিগা আমাকে কথা দিয়েছে। বলেছে আমাদের অনেক কিছু দেবে। ওরা রাজাকে মেরে ফেলেছে। এতক্ষন সাবুক আর অন্য বড় মাথাদেরও মেরে ফেলেছে হয়ত,তোর আর বাবার কোন ভয় নেই। আমি আছি আমাদের সাথে কোন খারাপ কিছু হবে না।”।জাকু গা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সাবুকের মৃত্যু হলে খুব বড় ক্ষতি হবে।জাকু চিৎকার করে ওঠে,“ তুই কি ভয়ানক কথা বলছিস।ডিগা খুব নিষ্ঠুর।” লুলু চমকে উঠে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। জাকুজাকু প্রথমে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করছিল।কিন্তু জাকুজাকুর আর্ত ভাবে বলে চলা কথায় সে মনে মনে কোথায় একটা হেরে গেল। মাটিতে অস্ত্র রেখে দিয়ে বসে থাকে সে। জাকুজাকু ভাই কে ধীর আর দৃঢ় স্বরে বলে, “আমাকে আর বাবাকে তুই খুলে দে। আমি বেঁচে থাকতে আমাদের কারো কিছু হবে না। ভাই আমার তোকে আমি নিজে হাতে অস্ত্র চালাতে শিখিয়েছি। সাঁতার কাটতে শিখিয়েছি। তুই ভুল করছিস। আমায় খুলে দে। বাবা কে নিয়ে ঘরে থাক আমি দেখি আমাদের যে দলটা সাবুক পাহাড়ে পাঠানোর জন্যে চেষ্টা করছিল ,তারা কোথায়। কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।”

জাকুজাকু ঝিম মেরে বসে থাকে। টপ টপ করে তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। বেশ কিছুক্ষন পর সে বলে, “তারা সবাই ডিগার দলে। যারা যেতে চায়নি তাদের মাথা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে।তুই কাউকে পাবি না। আমি তোকে ছেড়ে দিলে ডিগা আমায় শেষ করে দেবে। ”​

∆৩৭

চারপেয়ে জন্তুর পিঠে চেপে খুয়া নদীর ঐ পাড়ে গিয়েছিল। এখান থেকেই কিরি কে সে হারিয়ে ফেলে। এতো দীন হয়ে গেলেও কিরির জন্যে তার বড্ড মন​ কেমন হয়। আদোয়ার লোক গুলো তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে খুব কষ্ট দিচ্ছে। আদোয়া জায়গা টা কোথায় খুয়া জানে না। পূষন যদি সেদিন ঐ কাণ্ড না করত কিছুতেই কিরি কে হারিয়ে ফেলত না খুয়া। কি ভাবে জানা যাবে আদোয়া তে কি ভাবে যাওয়া যায়। কিরি কে ঠিক ফেরত নিয়ে আসবে খুয়া। ওদের কি অনেক লোক। সেই যোদ্ধাদের দেখে এটা বুঝেছে খুয়া লড়াই সহজ নয়। চারপেয়ে জন্তু টা তাকে নিয়ে খুব সহজে খাড়া টিলা তেও উঠে যায়। সকলেই খুব মন দিয়ে প্রচুর বিষবান তৈরি করে। আদোয়ার যোদ্ধারা খুব শক্তি শালী। ওদের পাতলা ঐ অস্ত্র টা বড্ড ধারাল। সেটা কি ভাবে বানানো যায়। পূষন কেন যে মরে গেল। ওদের হাত থেকে একটা ঐ পাতলা অস্ত্র নিয়ে আসা গিয়েছিল। ওদের দলের সবার হাতে যদি ঐ পাতলা অস্ত্র থাকত, তাহলে ওদের আর ভয় পেতে হত না। একটা সরু গাছের ডালের সাথে সরু পাথর বেঁধেছে খুয়া। কত টা দূরে ছুঁড়তে পারে তার জন্যে খুব চেষ্টা করে। ​ পায়ের ক্ষত সেরে গেলেও পায়ের ক্ষিপ্রতা এখনো ফিরে পায়নি খুয়া। সে আজ বারংবার মন হারিয়ে ফেলছে। পূষন তাঁকে কেন সেই বকের পালক গোঁজা ছেলেটির সাথে জীবন কাটাতে বলে গেল? এটা পূষনের ভুল। পূষন অসুস্থ হয়ে ভুল কথা বলে গিয়েছে। অবাক হয়ে জঙ্গলে তাকিয়ে দেখল খুয়া, একটা অন্যরকম গাছ, আর সে গাছে প্রচুর ফল। পাখী আর কাঠবিড়ালি মনের আনন্দে খাচ্ছে। এতো ফল হয়েছে। তাহলে তো সবাই কে জানাতে হবে। সে চারপেয়ে কে ইঙ্গিত করে গুহার দিকে যাবার জন্যে। ফলের গাছ টার কথা সবাই কে জানালে এখন কদিন শিকার না করলেও হয়। নদীতেও মাছ কমে আসছে। আবার বর্ষা হলে তখন নদী থেকে মাছ পাওয়া সহজ হবে। ​ ​

​ ∆৩৮

যে যোদ্ধারা কিরি আর মুগাদের দায়িত্বে ছিল তারা সকলে অস্ত্র হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। ডিগা উঁচু জায়গা থেকে কি যেন চিৎকার করে বলে। সাধারণ মানুষের কথা আর চিৎকার এর জন্যে তার কথা কেউ শুনতে পারছে না। বিন্নো এক মনে খাঁচার একদিকে বসে খুব মন দিয়ে শক্ত দড়িতে পাথর ঘসতে লেগেছে। পাশে মুগাও সেটা করছে। কিরি উঠতে পারছে না। তার খুব শরীর খারাপ লাগছে। ঝাপসা হয়ে আসছে সব কিছু। চোখ বন্ধ করেই সে শুনতে পেল ঝনঝন আওয়াজ।পাতলা পাতলা সেই অস্ত্র গুলো যোদ্ধা রা মাটিতে ফেলে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে।

ডিগা র আদেশে শিরচ্ছেদ করার। বিন্নো আর মুগা তাকিয়ে দেখবে না ভেবেছিল। কিন্তু বীভৎস ঘটনার আকর্ষণ আছে। তারা দেখল সেই

রাজবৈদ্য মাথা ভেঙ্গে দেওয়া আর পর মাথা কেটে ফেলা হল। সাবুক কে কিছু একটা চাওয়া হচ্ছে। সাবুক কোন কথা বলছে না। একটি সদ্য কিশোরীকে নিয়ে আসা হল তার সামনে। তার মাথার চুল ধরে প্রবল ঝাঁকানি দেওয়া হচ্ছে। সাবুক অস্থির হয়ে উঠে চিৎকার করলেও তাঁকে আবার ঠেসে ধরা হচ্ছে মাটির সাথে। বিন্নো কিন্তু আবার সজাগ হল। সে মন দিয়ে খাঁচার দড়ি কাটতে শুরু করল। মুগা ও তাই করল। অন্য ছেলেরা এখনো এই ব্যাপার টা দেখেনি। তাদের সামনে সাবুক কে নানা ভাবে অত্যাচার করা হতে লাগল। সেই সদ্য কিশোরী মেয়েটার কষ্ট দেখে অনেকেই কেঁদে ফেলল।

কিরি র খুব ধীরে চেতনা আসতে লাগল।খুব দীর্ঘক্ষণ সে অচেতন না থাকলেও, হাল্কা চেতনা আর তন্দ্রা সাথে সে দেখল সে গুহার ছাদে ছবি আঁকছে ।আগুনের পাসে বসা খুয়া । পূষনের বিরাট শরীর। পূষনের বিরাট​ চওড়া পিঠের আড়ালে লুকিয়ে খুয়া হাসছে। চমকে জ্ঞান ফিরল কিরির বাস্তবে এসে খুব মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। খুব কান্না পাচ্ছে। তাঁকে মায়ের কাছে ফিরে যেতে হবে। খুয়ার কাছে। ছবি বানাবে সে। মুগা কে দেখতে পেল। মুগা খুব মন দিয়ে পাথর দিয়ে দড়ি ঘষছে। খুব ধীরে উঠে দাঁড়াল কিরি। না সে এবার পারবে। মুগার পাশে বসে একটা সরু পাথর দিয়ে দড়ি ঘষতে শুরু করল। বিন্নো তাঁকে দেখে এক মুখ হাসি নিয়ে একটা বিশেষ জায়গা দেখিয়ে বলে দিল ঘষে দিতে। ডিগা আর চিৎকার করছে না। কিন্তু আরও অনেক মানুষ কে ওরা মেরে ফেলেছে।বেশ কিছুক্ষন পর মুগা লক্ষ্য করল তারা তিন জনে খুলে ফেলেছে একটা অংশ। একটা শক্ত কাঠের পাত সরিয়ে দিলেই তারা ​ খাঁচা থেকে বার হয়ে যেতে পারবে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। মুগা কিরির কাছে এলো। কিরি কে শুয়ে যেতে বলল। তাদের ফিরে যেতে হবে একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। প্রচুর মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে। তাঁর মধ্যেই এই তিন কিশোর নিজেদের মুক্তির কথা ভাবছে। বিন্নো দেখল তাদের পাহারার দায়িত্বে থাকা যোদ্ধাদের​ পাতলা অস্ত্রগুলো কে এক জায়গায় সাজিয়ে রাখা আছে।সুযোগ পেয়ে বার হলে এর একটা যদি পেয়ে যায় বিন্নো আর ভয় পায় না।সে ঠিক তাঁর ঘরে আবার ফিরে যাবে। কিরি এখন ভালো আছে। মুগা র মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে। যেমন করে হোক এই বিপদ সংকুল অবস্থা থেকে আবার আগের জিবনে ফিরে জেরে হবে। মুক্ত জীবন, নিজের প্রিয় মানুষের সাথে থাকা জীবন।​ ​ ​

​ সমস্ত যোদ্ধাদের লাইন দিয়ে কোথায় নিয়ে চলে যাচ্ছে ওরা। তারমানে আড়াল টা আর থাকবে না। নতুন যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা খুব নিষ্ঠুর। এবার কিছু একটা করতে হবে। বিন্নো মুগা আর কিরি কে সংকেত

দেয়। দুজনেই উপুড় হয়ে আলগা হয়ে যাওয়া খাড়া হয়ে থাকা কাঠ সরিয়ে বাইরে চলে গেল।​ওদের কেউ দেখতে পাচ্ছে না। একটা বড় সর পাথর আছে কাছেই খেলার শেষে বিজয়ী ওখানেই​ দাঁড়ায়। তার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে যায় তিনজনে। নিজেদের বুকের ধকধক শব্দ শুনতে পাচ্ছে ,তবু এঁকে ওপরের দিকে তাকিয়ে ম্লান ভাবে হাসে। সাবুক এখনো বেঁচে আছে। যে মেয়েটিকে চুল ধরে কষ্ট দেওয়া হচ্ছিল তাকে দেখতে পেল না ওরা। কেবল পায়ের পাতার তলা ভিজে গেল।

তাকিয়ে মুগার বুক ছ্যাঁত করে উঠল। রক্তের স্রোত। কিরির মাথা আবার ঘুরে গেল, গা গুলিয়ে উঠল। কেবল বিন্নো শান্ত ভাবে চারপাশ দেখতে লাগল। পালিয়ে যেতেই হবে। ​

∆৩৯

জাকুজাকু অস্ত্র ধরে বসে ছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু ঝিমুনি আসছে তার।কিন্তু জাকু হাতের দড়ি অনেকটাই ঘষে ঢিলে করে ফেলেছে। সে এবার মাথার মধ্যে শান্ত হতে শুরু করেছে। জাকুজাকু এমন ভাবে আঘাত করতে হবে যাতে সে কিছুটা সময় অজ্ঞান হয়ে থাকে। কিচ্ছুক্ষন সেটা ভাবার পর চিন্তা পরিবর্তন করল জাকু। না ওকে বেঁধে রাখতে হবে। যদি আঘাত বেশী জোরে লাগে তাহলে মৃত্যু হতে পারে। আচমকা বাইরে একটা হৈ হৈ আওয়াজ। ওদের ছোট উঠোনে ঘোড়ার পিঠে বেশ কয়েকজন যোদ্ধা। সকলেই চমকে উঠল। তাদের একজন দ্রুত নেমে আসতেই জাকু চিনতে পারল। সাবুকের একসময়ের অনুচর।জাকুজাকু তন্দ্রা ছেড়ে জেগে উঠেছে।এই অনুচর ঠিক কোন দলে জাকু বুঝতে পারছে না। লোকটি তার চেয়ে বয়সে বড়। জাকু কে বাঁধা অবস্থায় দেখে দৌড়ে এসে খুলে দিতে শুরু করল। জাকুজাকু বাধা দিতে গেলে অন্য একজন তার হাত পেছনে মুচড়ে ধরল। লোকটি সাশ্রু নয়নে জানাল সাবুক কে হয়ত ওরা মেরে ফেলেছে। রাজার মুণ্ডু নিয়ে খেলার মঞ্চে ওরা আনন্দ করছে। রাজবৈদ্য কে ওরা মেরে ফেলেছে। এবার যদি আবার পেটের রোগ হয় কে তাদের বাঁচাবে, এই জানিয়ে লোকটি দাঁড়াল। জাকু মাটির কলসি থেকে ঢকঢক করে জল খেল। জাকুজাকু র দিকে তাকাল। “ভাই, পেটের রোগ হলে এবার কে আমাদের বাঁচাবে। আকাশের গুমগুম দেবতা রাগ করলে কে আমাদের বাঁচাবে? তুই কি ভুল করলি!তুই আমাদের সাথে চলে আয়। প্রতিশোধ না নিলে আকাশের দেবতা খুব রাগ করবে।” জাকুজাকু কে বলে চলে জাকু। জাকুজাকুর হাত ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ধপ করে বসে পড়ে। বেশ কিছুক্ষন পর উঠে দাঁড়ায়। জাকুজাকু দাদাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। উঠোনে অনেক মানুষ​ এসে দাঁড়িয়েছে। এরা সবাই রাজার মৃত্যুর প্রতিশোধ চায়। জাকু কোমরে তার প্রিয় অস্ত্র তুলে নেয়। সকলে সংকল্প নেয়। এবার আঘাত হানতেই হবে।

ওদের কাছে খবর আছে ডিগা আর তার দলবল ,খেলার মঞ্চের দিকে গিয়েছে।

ওদের হাতে প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছে। রাজার সাথে যে বাহিনী সর্বক্ষণ থাকত তাদের অনেককেই মেরে ফেলেছে। অন্যরা মাথা নিচু করে বশ্য হয়েছে। সবচেয়ে সমস্যা হল কে যে ওদের দলে আর কে নয় সেটা বোঝা কষ্ট সাধ্য। তবে সাধারণ মানুষ রাজাকে আর রাজবৈদ্য কে পছন্দ করে। ডিগা কে তারা ভয়ে সম্মান দেখাচ্ছে।জাকু তার ভাই জাকুজাকু কে কাছে ডেকে নিল। জানতে চাইল, “কে কে তোকে লোভ দেখিয়েছিল।তাদের কিন্তু আগে মারতে হবে। কারণ তারা সবচেয়ে বড় বিপদ ঘটাতে পারে।” জাকু ডিগার আর তার অনুচরদের নাম বলল। আর জানাল ওঝা খুব ভয়ানক। সেই মুলত এই ষড়যন্ত্র ঘটিয়েছে। জাকু অন্যদের কে পিছনে যেতে বলল। তারপর সামনে সে আর ভাই জাকুজাকু একটি ঘোড়াতেই চাপল। খেলার মঞ্চ খুব দূরে নয়। অদ্ভুত আওয়াজ আসছে সেখান থেকে। তার কাছাকাছি যেতেই জাকু দেখতে পেল ডিগার দুই অনুচরের একজন। অনেকগুলো রক্ত মাখা দেহের পাশে সে দাঁড়িয়ে বীরত্ব ব্যঞ্জক ভাবে পাহারা দিচ্ছে। সে একটু অবাক হল ,সজাগ হল।কিন্তু জাকুজাকু একটি হাসি দিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেল। “আমরা তোমাদের সাথে যোগ দিতে এসেছি।”সে খুব সন্তুষ্ট হল না। জাকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ও কে বিশ্বাস করি না। সাবুকের চামচা!” জাকুজাকু আরও​ ​সহৃদয়তার সাথে বলল ,“ও আমার ভাই!তোমার কোন চিন্তা নেই। বল ডিগা কোথায়। আমরা মাথা নত করবো!”লোকটা দ্বিধায় পড়ে গেল। জাকুজাকু তার খুব কাছে চলে গিয়েছে। লোকটির পাশে বেশ অল্প বয়স্ক দুইজন আছে তাদের হাতে অস্ত্র। কিন্তু তারা আদৌ অভিজ্ঞ কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। তবু তাদের কে চিন্তার মধ্যে রাখল জাকুজাকু। তারপর হাসি হাসি মুখে মুহূর্তের মধ্যে লোকটিকে অস্ত্র বিদ্ধ করে ফেলল। জাকু দ্রুত অন্য দুজন কে অস্ত্রহীন করে তাদের খেলা মঞ্চে ঢোকার পথ করে নিল । ভেতরে আসলে কি অবস্থা সঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

খুব ধীর পায়ে দুই দিক দিয়ে তারা ঢুকল। যাতে একসাথে সবাই আহত না হয়ে যায়,বা ধরা পড়ে যায়।

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ভেতরে গিয়ে দেখে অত লোক সবাই খেলার মঞ্চের উঁচু জায়গায় তাকিয়ে আছে। সেখানে সাবুক কে বেঁধে রাখা আছে। অনেক মৃতদেহ। উঁচু বল্লমে রাজার মুণ্ড। জাকুর চোয়াল শক্ত হল। সে খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে আচমকা দূর থেকে ডিগার মাথা লক্ষ করে একটা পাতলা অস্ত্র নিক্ষেপ করল। সোজা গিয়ে তার মাথায় আঘাত করল। ডিগা আওয়াজ করে পাথরের মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে গেল। শক্ত জায়গায় পড়ে যাওয়ায় মাথার পেছন থেকে রক্তপাত শুরু হল। চারিদিকে একটা হৈহৈ শুরু হল।ডিগার অনুচর রা বুঝতে পারছে না কে এটা করেছে। জাকু অতি দ্রুত তার সহচর দের নিয়ে ডিগা যেখানে বসে ছিল তার পেছনে চলে গেল।ডিগার অনুচররা যে দিক থেকে আঘাত এসেছে সেদিকে দৌড়ে গেল । জাকুজাকু লুকিয়ে আছে একদল বুড়ো মানুষের মধ্যে। কিন্তু অন্যরা জাকুর নির্দেশ অনুযায়ী এক এক করে ডিগার সমস্ত অস্ত্রধারীদের আক্রমণ করতে শুরু করেছে।যদিও তিন জন খুব আহত হল। তবু ডিগার অনুচরদের বাগে নিয়ে আসা গেল। সাবুক কে দড়ি খুলে দিল জাকু। কিন্তু সে এতোই আহত । কোন রকমে চোখ খুলে জাকুর দিকে তাকাল। শুকনো জিবে ঠোঁট মুছে নিতে নিতে জাকু কে সাবুক বলল, ওর মেয়ে যদি বেঁচে থাকে তাঁকে যেন জাকু দেখে। সাবুক শেষ নিঃশ্বাস ফেলল।

অস্ত্রহীন সাধারণ মানুষ যারা ছিল। তারা জাকু কে চেনে । তারা জাকুর পাশে এল। তারা সাবুক কেও ভালোবাসে। কারণ সাবুক চিরকাল যাতে সবাই ভরপেট খেতে পায় তার খোঁজ রাখে। অনুচররা জাকু কে জানাল ডিগা​ মারা গেছে। তারা ওঝা কে খুঁজে পাচ্ছে না। ওঝা কে ঘোড়াতে চড়ে নদীর দিকে যেতে দেখা গেছে। জাকু তার ভাই জাকুজাকুর ​ দিকে তাকায়। জাকুজাকু অস্ত্র হাতে নেয়।একটা ঘোড়ার ওপর চেপে বসে জাকুজাকু। সে নিজে ভুল করেছে ।সেই ভুল তাকে শোধরাতে হবে।

কিছু ভেড়া চড়ানো কিশোর জাকুজাকু কে জানালো ওঝা কে তারা নদী যেদিকে বয়ে যায় তার উল্টো দিকের পাথুরে রাস্তায় দেখেছে। সাথে একটি মেয়ে। বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে জাকুজাকুর সাবুকের মেয়ে নয়ত। সে পা দিয়ে ঘোড়াকে আরও দ্রুত চলার জন্যে আঘাত করে। পথ পরিবর্তন করে জাকুজাকু। কারণ সে অনেক দেরীতে যাত্রা করেছে। ওঝা ‘অন্য পাহাড়ের’ দেশের লোক সেখানে যাচ্ছে। তাহলে নদীর ধারের সরু রাস্তায় গেলে অনেক রাস্তা কমে যাবে।সে ঘোড়া নিয়ে চলতে থাকে । দৃষ্টি রাখে উঁচু পাথরের রাস্তার দিকে। ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে গেছে জাকুজাকু কে থামতে হয়। নদীর জলে মুখ ডোবায় ঘোড়া । এতক্ষনেও ওঝার দেখা না পেয়ে হতাশ লাগে তার। দূরে নদীর ​ খাড়া পাথুরে পাড়​ দিকে তাকিয়ে থাকে জাকুজাকু। কিন্তু এবার তার অবাক হওয়ার পালা। আসলে সে এগিয়ে চলে এসেছে। ওঝা কে উঁচু জায়গায় দেখতে পায়। মুহূর্তে ঘোড়ার পিঠে বসে পাড়ের ঢালু বেয়ে ওপরে ওঠে। ওঝার কাছে নানান ওষুধ থাকে। কিন্তু অস্ত্র সে চালাতে পারে কিনা জাকুজাকু জানেনা। তবে খুব ধূর্ত। ওঝা তাকে দেখতে পায়। ওঝার সামনে পিচমোড়া করে বাঁধা আছে একটি মেয়ে। ওঝার ঘোড়ার সামনে গিয়ে পথ আটকালো জাকুজাকু। গতি ছিল বলে ভারসাম্য নষ্ট হল ওঝার। সে ঘোড়া থেকে নেমে কোমরের একটা থলি থেকে কিছু গুঁড়ো ছুঁড়ে দিল জাকুজাকুর দিকে।জাকুজাকু সচেতন ছিল তার ঘোড়া আর সে নিজে একটু পিছিয়ে গেল। কারণ চোখ খারাপ হয়ে যেতে পারে। তার বাবা এক চোখ লুলু এভাবেই একটি চোখ হারায়। সে দ্রুত ওঝার পায়ে আঘাত করে। ওঝা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জাকুজাকু আর দেরী না করে সোজা তার দেহ বিদ্ধ করে। দ্রুত মৃত্যু হয় তার। মেয়েটি অচৈতন্য। নদীর জল খানিক ছিটিয়ে দিতেই জ্ঞান ফেরে তার। সে ভয়ে জড়সড়। তাঁকে আশ্বাস দিয়ে সাথে নিয়ে চলে জাকুজাকু। কথা বলে বোঝে এই সাবুকের কন্যা।

∆৪০

খাঁচার বাইরে মুগা আর বিণ্ণো বেড়িয়ে আসে। কিরি র শরীরে জোর নেই কিন্তু খুব কষ্ট করে সে দাঁড়াল ভিড়ের মধ্যে। বার হয়ে যাবার রাস্তা কোথায়? একটা আন্দাজ করে বিন্নো । সেই দিকে যাবার নির্দেশ দেয়। আচমকা একটা অদ্ভুত আওয়াজ হয়। সকলে চিৎকার করে ওঠে তারা বুঝতে পারছে না এতো ভিড়ের মধ্যে ঠিক কি হল। অন্য একদল মানুষ ঢুকেছে। তারা আগের দলের সাথে জোর মারামারি করছে। কিরি অবাক হল। সেই বকের পালক মাথায় পরে থাকা ছেলেটি। সে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার খুয়ার জন্যে মন কেমন করতে লাগল। মুগা সাবুক কে চেনে। সে দেখল সাবুকের মৃত্যু হল। ডিগা বলে খারাপ লোকটাও মরে গেল। তার মানে এবার পালানো যাবে।সে কিরি কে হাত ধরে টানে। খুব দ্রুত তারা তিনজন মূল দরজার কাছে পৌঁছে যায়। অনেকেই দৌড়ে বার হয়ে যাচ্ছে। বিণ্ণো আর মুগা দৌড় লাগাল। কিন্তু কিরির ক্ষমতা নেই । সে যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটতে থাকে। মুগা দৌড়ে চলে গেলেও কিছুটা এগিয়ে দাঁড়ায়। কিরি কে দেখে তার কষ্ট হয়। সে একটা ঘোড়া দেখতে পায়। এই রকম ঘোড়া করেই তাকে নিয়ে আসে তার মায়ের কাছ থেকে। কিরি কে সে কোলে করে ।বিণ্ণো ফিরে আসে সেও কিরিকে ধরে । তিন জন কোন রকমে ঘোড়ায় উঠে বসে। মুগা দেখেছিল, পা দিয়ে একটা বিশেষ ভাবে লাথি মারলে ঘোড়া চলতে শুরু করে । সে তাই করে । সামনে মুগা, পেছনে বিন্নো , তার মধ্যে ধুঁকতে থাকা কিরি। ঘোড়া কে চালানো বেশ কঠিন। তবে নদীর দিকের রাস্তা আন্দাজ করে তারা যাত্রা শুরু করল। ঘোড়া যেতে চায় না। সে আদোয়া তে ফিরতে চায়।ঘোড়ার ওপর খুব জোর খাটিয়ে নদীর ধার অবধি এল ওরা। তিন জনেই খুব খুশি। অকারণে হোহো করে হাসছে। নদীর কাছে এসে কিরি বলে, “আমাকে জলের ধারার ঐ পাড়ে যেতে হবে। ঐ যে উঁচু উঁচু পাথর তার ওপর দিয়ে যে দিকে নদী যাচ্ছে তার উল্টো দিকে। আমার দিদি, মা , পূষন সবাই আমার জন্যে চিন্তা করছে। মুগা বুঝল, তাকেও নদী পার হতে হবে। কিন্তু বিন্নো জানাল সে নদী যেদিকে বয়ে চলেছে সেই দিকে সে যাবে। জল এখন নেই বললেই হয়। তবে জল এলে সে কিছু টা সাঁতরে যাবে। তিন জনেই মাটিতে নামল। তাদের আর দেখা হবে না। তবে বড় হয়ে তারা আবার দেখা করবে।আলিঙ্গন করে একে ওপরের।বিন্নো খুব দ্রুত ছুট লাগায়। ঘোড়ায় ওঠে কিরি আর মুগা। এখানে নদীতে খুব জল নেই। ঘোড়া নামলে ডুবে যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। মুগা ঘোড়া কে লাথি মারে। ঘোড়া কিন্তু সামনের দুই পা তুলে আপত্তি জানাচ্ছে। যায় হোক সে গতি নিল। কিরির মনে খুব আনন্দ। মুগা কেবল ভাবছে সে ফিরতে পারবে তো। সে যেমন করে হোক ফিরবে। একটা অস্ত্র থাকা খুব জরুরী ছিল।

কিরি আর মুগা জল ভেঙ্গে পার হতে থাকে। ঘোড়াটার পেট অদ্ধি জল ।পা ধুয়ে যাচ্ছে। দুজনের খুব আরাম লাগছে। খাঁচার মধ্যে জল খুব কম পাওয়া যেত। কিরির আর আগের মতো শরীর খারাপ লাগছে না। সে খুয়ার কাছে, মায়ের কাছে ফিরে যাবে এই আনন্দে মশগুল। নদী পার হয়ে মুগা ঘোড়া থেকে নামলো। নদীর পাশের ঝোপ থেকে সবুজ সবুজ ফল পাড়ল। নিজে খেল কিরি কে দিল। দূরে আদোয়া দেখা যাচ্ছে। রাজার বাড়ি দেখে ধক করে উঠল তার বুক। লিয়ামের হাঁদা ছেলে সেখানে আছে। রাজা কে তো মেরে ফেলেছে। তার কি অবস্থা। মুগার কান্না পেল। কিন্তু শক্ত হল। ফিরে গেলে আবার ধরা পড়ে যাবে। সে মায়ের কাছে ফিরে যাবে। কিরি আর তার পথ এবার আলাদা। কিরি অনেক টা রাস্তা দুজন যোদ্ধার পিঠে চেপে এসেছিল তার রাস্তা মনে আছে। মুগার মনে আছে পাথরের রং ,আর আকাশের তারা। দুজনে বিপরীত দিকে যাত্রা শুরু করল। কিরি ঘোড়ার পিঠে উঠল। মুগা তাকে বড় ভালোবাসে। সে এতো ধকল সইতে পারবে না। ​ তাই ঘোড়া তাকে দিল। কিরির চোখে জল এলো। বড় হয়ে তারা আবার একে অপরের সাথে দেখা করবে। সে তার পাথারের পাথরে ছবি এঁকে রাখবে। যদি কোথাও ছবি দেখে তাহলে যেন সেখানে মুগা খোঁজ নেয়। মুগা ছবি কি জানে না তাও হাসল। বিদায় জানাল।

∆৪১

জাকু সাবুকের উপযুক্ত সৎকারের ব্যবস্থা করল। ডিগা কে অনেকেই ভয় পেত। কারণ ওঝা খুব অভিশাপ দিত। আর সেই অভিশাপে অনেকের সন্তান মারা গেছে, ভেড়া হারিয়ে গেছে ,শস্য শুকিয়ে গিয়েছে। ডিগা সারাক্ষন ঐ ওঝা কে নিয়ে ঘুরত। ডিগার সৎকার হল। কিন্তু খুব কম লোক গেল। সব কাজ শেষ করে জাকু রাজার বাড়ি গেল। রাজার সর্বকনিষ্ঠ স্ত্রী জ্ঞান হারাচ্ছেন। বাকিরাও সুর করে কাঁদছে। জাকু কিছু বলার না পেয়ে বার হয়ে এল। আচমকা একটি আহত বালক কে দেখে অবাক হল। অন্য কোন উপজাতির হবে। খোঁজ নিয়ে জানল। নদীর ওপারের জেলেদের গ্রাম থেকে​ তার মানে একে জাকুজাকু নিয়ে এসেছিল। আহত ছেলেটির শুশ্রূষার জন্যে একটি মেয়ে কে বলা হল । কিন্তু রাজা কাকে করা হবে। সেনাপতি বা কে হবে। সবাই জাকুর কথা শুনছে এটা ঠিক। কিন্তু কাউকে তো রাজা করতে হবে। আকাশের গুমগুম করে আওয়াজ করা দেবতার সাথে যিনি কথা বলতে পারেন এমন কাউকে কোথায় পাবে জাকু। অবাক হয়ে দেখে চারিদিকের লোকজন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রাজার সব ছেলেই মারা গিয়েছে। এখন উপায়!

আচমকা জাকুর মনে এলো। গুহার সেই বিষবান ছুঁড়ে মারতে দক্ষ ​ ছোট ছেলেটির কথা। তাকে তো দেখেনি। সেই গায়ে আলো মাখা মেয়েটির মত যোদ্ধা মেয়েটির কথা মনে পড়ল। এই ছেলেটি তো তার পাশেই লড়ছিল। খোঁজ নিতে হবে। খাঁচার বাচ্চাদের দায়িত্বে যে লোকটি ছিল সে জানাল অনেক বাচ্চা ফাঁকতালে পালিয়ে গেছে। জাকু যাকে খুঁজছে তাকে সে চেনে না।সে সারা দিনের নানান ধকলে ক্লান্ত হয়ে ভুঁড়ি উঁচু করে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। জাকুর কেবল সেই মেয়েটির কথা মনে হয়।অমন সারা শরীর দিয়ে আলো বার হওয়া মেয়ে সে কখনো দেখেনি। ঐ ছেলেটির খোঁজে নিজে খাঁচার বাচ্চাদের কাছে গেল সে। পিঠে কালশিটে নিয়ে অত ছোট বালক কেউ নেই।তার মানে পালিয়েছে। কিন্তু কতদূর আর যেতে পারে। ওকে নিয়ে এসেছিল যে দুজন তারা বেঁচে আছে। তাদের সাথে কথা বলতে হবে। কোন রাস্তায় গুহা থেকে আদোয়া​ নিয়ে এসেছিল তারা। রাজার বাড়ির নীচের প্রাঙ্গনে প্রায় সব যোদ্ধা একসাথে হয়ে বিশ্রাম, গল্প, আড্ডা সব করছে। তবে কেউ বিশৃঙ্খল নয়। রাজার বাড়ির খাদ্য পানীয় নিয়ে কেউ মোচ্ছব লাগায়নি। ​ ​ ​

∆৪২

পথ আন্দাজ করতে পারে কিরি। কিন্তু এতো শরীর খারাপ লাগছে তার। জিব শুকিয়ে গেছে। ঘোড়া থাকাতে তাকে পায়ে হাঁটতে হচ্ছে না। কিন্তু সোজা হয়ে বসা খুব কঠিন। তবু সে প্রানপণে চেষ্টা করছে। ঘোড়া খুট খুট আওয়াজ করে এগিয়ে চলেছে। সামনে পাথুরে রাস্তা। প্রায় তিন দিন লেগেছিল আদোয়া আসতে। সন্ধ্যে হলে কোথাও অপেক্ষা করতে হবে। পূষন থাকলে খুব ভালো হত। পূষন তারা দের জানে। ঠিক পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত। পাথরের ঢাল এবার খাড়া হচ্ছে । কিভাবে সে এগোবে বুঝতে পারছে না ।কিরি একটা পরিস্কার জায়গা দেখে ঘোড়া থেকে নামল। এখানেই অপেক্ষা করবে সে। একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর হাঁটতে শুরু করবে।ঘোড়া আর ওপরে উঠতে পারবে না। তাকে একায় উঠতে হবে।উঠলে নদীর ধার থেকে বুঝতে পারা যাবে ন্যাড়া পাথরের পাহাড়। বড় হয়ে ওখানেই বিরাট ছবি আঁকবে কিরি। মুগা ঠিক তাকে খুঁজে চলে আসবে। মা, খুয়া ঠিক ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। পূষন কে কত কিছু বলার আছে। কিরি জোরে জোরে শ্বাস নেয়। ​

মুগা নদী ধরে এগিয়ে চলেছে। এখানে আর নদীর ধার ঘেঁসে যাওয়া যাবে না। তাকে জঙ্গলে ঢুকতে হবে। অন্ধকার হয়ে আসছে। এখন জঙ্গলে বেশী ভয়। কিন্তু সেই বুনো গাছের গন্ধ পেল। আর বেশী দূর নেই। আরও জোরে সে দৌরাচ্ছে। উত্তেজনায় দুবার ছিটকে গেল মাটির ওপর। ঐ তো শ্যাওলা ধরা জমি। ঐ তো ​ নদীর বাঁক। আর বেশী দেরী নেই । মা, বাবা, ভাই...


​ ​ ​ ​ ​ ​ ​

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.