Header Ads

Breaking News
recent

ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায় | এক টুকরো জীবন

মিছিল

এই অঞ্চলটাতে শহরের পুরনো সব দোকান-পাট। দু-পাশে ছোট ছোট দোকান, তেমন কিছু বড়, চোখে পড়ার মতো আহামরি গোছের নয়। একদিকে চলে গেছে সবজি-বাজারের রাস্তা, আরো একটা পথ গেছে শহরেরই অন্যদিকে। বড় বড় দোকান-বাজার এসব পড়ে আরো খানিকটা এগিয়ে। সেসব হল চোখ ধাঁধানো বড় বড় শাড়ি-গয়না, জুতো, ফার্ণিচার, হাল-ফ্যাশনের জামাকাপড়ের দোকান। তার বড় বড় ঘর, চকচকে মেঝে, দেয়ালে সব কাঁচ লাগানো। মুখ সেখানে পড়লে ঝকঝক করে ওঠে। আলো পড়লে ঠিকরে ওঠে চারদিকে। ওদিকটায় গেলে মন খারাপ হয়ে যায় মন্মথর। কতদিন ধরে তার সাধ অমনি একটা দোকান দেবার...কিন্তু ঐ সাধটুকুই, সাধ্য কই!

ঘন মেঘ করেছে, কালো হয়ে এসেছে চারিদিক। দু-এক ফোঁটা যেন গালেও পড়ল মনে হল। ছাতাটা খুলবে নাকি!—ভাবতে ভাবতেই মন্মথ এসে পড়ল মণিরামের দোকানে। মণিরাম তার মহাজন, আজ ক’দিন ধরেই তাগাদা মারছে তাকে। তা তাগাদা সে মারতেই পারে। পুজোর আগে টাকাপয়সা এমনিতেই পাওনা মণিরামের। মন্মথর সামান্য টুকিটাকি জিনিসের ব্যবসা, মণিরামই তার যোগানদার। কিন্তু মন্মথ আর টানতে পারছে না। কোথা থেকে কি হবে, ভেবে কুল-কিনারা পায় না মন্মথ। মণিরামের কাছে কি একটু ছাড়ান চাইবে, ভাবনাটা মাথায় নিয়েই মণিরামের দোকানের ভিতর ঢুকল সে।

কাজ মিটিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই দেরি হয়ে গেল। আকাশ আরো কালো হয়ে এসেছে, ওপরের দিকে চোখ তুলে চেয়ে দেখল মন্মথ। আরো দেরি করলে বাস পেতে অসুবিধেই হবে। মনটা এমনিতেই ভারি হয়ে আছে। আজ সুযোগ বুঝে মণিরাম খুব লেকচার দিল তাকে। ‘ তুমি বুড়ো লেকচার দিচ্ছ আমাকে,পয়সার বেলা কিছু ছাড়ান কি দিলে? শা...’ মনে মনে একটা খারাপ গালাগাল দিল মন্মথ মণিরামকে। মণিরাম কি জানে, তার কি করে চলছে? মণিরাম কি জানে, তাকে কিভাবে দুবেলা অন্ন জোগাতে হয় নিজের? মণিরাম কি জানে, বাড়িতে তার কোনো স্থান নেই? মণিরাম কি জানে রমলার কথা... রমলার জন্য...’ আজ মণিরামের কথা তার বড় লেগেছে। থাকলে সে কি দিত না, কিছু টাকা মণিরামকে? এ টাকা মণিরামের হকের টাকা, সে তো দেবে না বলেনি...দুটো দিন সময় চেয়েছিল। কিন্তু মণিরাম...একেবারে সুদখোর... কষ্টটা যেন বুকে খামচে ধরল। কত কিছুই সে পারেনি, পারে না শুধু...’ ভাবতে ভাবতে দু-একটা দোকান পেরোতে না পেরোতেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি এসে পড়ল হুড়মুড় করে। ব্যাগ, ধুতি-জামা সামলে ছাতা খোলার আগেই খানিকটা ভিজল মন্মথ। এদিক ওদিক তাকিয়ে ছোট একচিলতে একটা দোকানে ঢুকে পড়ল মন্মথ নিজেকে বাঁচাতে। ছোট দোকান, একের বেশি দুজন পাশাপাশি ভালো করে দাঁড়ানো যায় না, কিন্তু বেশ সাজানো দোকান। পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘাড়-মুখ মুছতে মুছতে দোকানটা দেখতে লাগলো মন্মথ। সাদা আর কমলা রঙের চৌখুপী করা দেয়াল, গাঢ কমলা রঙের সানমাইকা দেওয়া কাউন্টার। নিচের দিকটায় নীল আর সাদা রঙের সানমাইকা দেওয়া। একটি অল্পবয়সী বছর বারো-তেরোর ছেলে লাল ডটপেন দিয়ে হিজিবিজ কাটছে একটি কাগজের উপরে আর মাঝে মাঝে হাতে ধরা একটি রোদ-চশমার কাঁচে লাল ডটপেনটা দিয়ে দাগ দিচ্ছে। দেখতে দেখতে আর একটু ভিতরের দিকে এসে মুখ মুছল মন্মথ। ছেলেটি চোখ তুলে বলল—কি নেবেন , কাকু?’

--দেখি কি আছে তোমার দোকানে...’ এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে বলল মন্মথ। বেশ লাগছে দোকানটা দেখতে। বড় ঝলমলে না হোক, এমনিও যদি একটা দোকান তার থাকত!

--সায়া-ব্লাউজ, বাচ্চাদের জামা, রুমাল, শাড়ির ফলস...আরো কত কি, আপনার কি চাই, কি নেবেন আপনি’ কাউন্টারের উপর ডটপেনটা ঠুকতে ঠুকতে বলল ছেলেটি।

--আচ্ছা দেখি, রুমাল আছে তোমার কাছে?’ নিজের নোংরা রুমালটা পকেটে পুরে বলল মন্মথ।

--দাঁড়ান, গোডাউন থেকে নিয়ে আসি’ বলেই কাউন্টার ডিঙ্গিয়ে লাফ দিল ছেলেটি।

--সে আবার কতদূর...,কত দেরি হবে?’ বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল মন্মথ। ততক্ষণে ছেলেটি দোকানের বাইরে চলে গেছে। এবার দোকানের ভিতরটা ভালো করে দেখতে লাগল মন্মথ। দেয়ালের গায়ে কাঁচ-আঁটা শো-কেস। তার ভিতরে বাচ্চাদের কতরকমের জামাকাপড়। একদিকে মেয়েদের সাধারণ ব্লাউজ রাখা আছে থাক করে, আর একদিকে হাল-ফ্যাশনের জরি দেওয়া ব্লাউজ আঁটা আছে শো-কেসের গায়ে। পাশের ছোট ছোট তাকে আরো নানানরকমের টুকিটাকি। হঠাৎ চোখ পড়ে ক্যাশবাক্সের দিকে। খোলা, না বন্ধ! আচ্ছা ছেলে তো, তাকে একা বসিয়ে রেখে চলে গেল বাইরে! মন্মথ অস্বস্তি বোধ করছিল। আবার এক লাফে ছেলেটি এসে লাফ দিয়ে কাউন্টারের ওদিকে চলে গেল, হাতে দুটো রুমালের প্যাকেট।

--এই নিন ,কাকু’ বলে হাতে রাখা প্যাকেটের গিঁট খুলতে লাগল।

--এত দেরি করলে, কোথায় তোমাদের গো_ডাউন?’ রুমালগুলো দেখতে দেখতে বলল মন্মথ।

--কাছেই...নিচের দিকে ছিল, খুঁজে পেতে দেরি হল...’ মুখ নিচু করে রুমালের প্যাকেটের গিঁট খুলতে খুলতে উত্তর দিল ছেলেটি।

--দেখে নিন, কাকু...অন্য দোকান থেকে এখানে সস্তায় পাবেন মাল...’ মন্মথ বাইরের বৃষ্টি দেখছিল। এখনও অঝোরে ঝরছে।

--এই তুই বাইরের লোককে অমন দোকানে বসিয়ে রেখে চলে যাস কেন? কেউ যদি কিছু নিয়ে চলে যায়...?’ ভিতরের অস্বস্তি থেকে বলল মন্মথ। নিজের অজ্ঞাতসারেই ছেলেটিকে সে তুই বলে কথা বলল।

--কি হবে, সামনে তো কত লোক আছে...তুমি চুরি করবে নাকি!’ হাসল ছেলেটি। সেও ঘনিষ্ঠ সুর আনল কথায়।

--কি করে জানলি...আর ক্যাশবাক্স খুলে রাখিস কেন?’

হাসছিল ছেলেটি। খিলখিল করে হাসছিল। মন্মথ তাকিয়ে দেখছিল।

--ওটা তো তালা দেওয়া...হেসে বল ছেলেটি।

--কিন্তু চাবিটা ঝুলিয়ে রেখেছিস কেন? এর মানে কি হল, নিজেই ভেবে বল’ হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল মন্মথ।

--ধ্যাত, ওটা তো অন্য চাবি ঝুলিয়ে রেখেছি...’ হাসতে হাসতে বলল ছেলেটি। মনে মনে তার বুদ্ধির তারিফ করল মন্মথ।

--কি নাম তোর’ একটা রুমাল দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল মন্মথ।

--বাবলু...না, সুমথ

--সুমথ কি, তোদের পদবী কি?’ জিজ্ঞেস করল মন্মথ।

--ঘর...’বলল ছেলেটি। মন্মথ বিস্মিত হল। এই নামে কোন পদবী আছে, তার জানা ছিল না।

--কি করিস তুই? কোন ক্লাসে পড়িস?’

--পড়িই না...’হেসে বলল ছেলেটি।

বিস্মিত মন্মথ। ...পড়িস না কিরে? বাড়ীতে কিছু বলে না? এইটুকু ছেলে...’

--এইটুকু কি? আমার বয়স কত বলো তো?’

--কত আর...বারো/তেরো হবে’

--না, আমার বয়স ষোল। আমার যে পড়তে ভালোই লাগে না। স্কুলে নাইন পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দিয়েছি। আমার স্কুলে বসে থাকতে ভালোলাগত না। তার চেয়ে বাইরে খোলা মাঠ আমার ভালোলাগে...তাই আর...’ কাউন্টারে ঝুঁকে পড়ে বলল ছেলেটি।

--পড়তে ভালো লাগত না? তাহলে কি করতে ভালো লাগত তোর?—অবাক হয়ে বলল মন্মথ।

--দোকান করতে। কতলোক, রোজ রোজ নতুন নতুন লোক , কত রকমের...’ কিছু মনে করে হাসল ছেলেটি। আবার বলল – আমার না এই দোকানের জিনিস আনতে, বিক্রি করতে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে...খুব ভালো লাগে।‘

--তুই একা একা দোকানে থাকিস? আর কেউ নেই, তোর বাবা...দাদা...’ সব জেনে নিতে চায় মন্মথ। তার ভারি ভালো লাগছে ছেলেটির সঙ্গে কথা বলতে।

--না আর কেউ না, এটা আমার দোকান, আমি একা চালাই’ বেশ গর্বভরে জানাল সুমথ, সুমথ ঘর। তার চোখে-মুখে কি প্রত্যয়!

--তোর বাবা- দাদা কেউ নেই?’

--থাকবে না কেন? ওরা অন্য একটা দোকান চালায়। সেটা স্টেশনারী দোকান, এটা আমার...’ আবার বলল।

--তোর পড়তে পড়তে ভালো লাগে না, ভালো লাগত না...এইটুকু একটা ছেলে...কী কঠিন লাগত তোর? অঙ্ক, না ইংরাজী?” মন্মথ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না একটা ছোট ছেলে শুধু পড়তে ভালো লাগে না বলে দোকান করছে।

--ধ্যাত! আমার স্কুলে বসে থাকতেই ভালো লাগত না। বাইরের কিচ্ছু দেখা যায় না...বদ্ধ লাগে...কই, তুমি নেবে না রুমাল? কোনটা নেবে?’ অস্থির হয়ে বলে উঠল ছেলেটি।

--দে, ওই সাদাটাই দে’ হাত বাড়িয়ে রুমাল দেখল মন্মথ।

--দাও, এগারো টাকা। বাইরে এগুলো একুশ টাকা, কাকু।।‘

-- ভাগ! আমাকে কি বোকা পেয়েছিস নাকি! এই রুমালের দাম এগারো টাকা হয়?” বলল মন্মথ।

--বাইরে গিয়ে দেখে নাও...; হাতে রুমাল নিয়ে বলল ছেলেটি--নেবে কিনা বলো, নইলে তুলে রাখি...’

--দে। আচ্ছা,ঐ বাচ্চাদের জামাগুলো তোরা কত করে বিক্রি করিস রে?” সামনের একটা হলুদের ওপর নীলের ডোরাকাটা জামা দেখিয়ে বলল মন্মথ।

--‘ বলব কেন?’ হাসল ছেলেটি। আমরা যে দামে কিনি, সেই দামে বিক্রি করি নাকি! দাম চড়িয়ে রাখি অনেক, তারপর লোককে একটু ছাড় দিই, সেও খুশি হয়,আমাদেরও হাতে টাকা থাকে... আর কিছু বলব না’ হেসে বলল ছেলেটি।

--আচ্ছা, তোর ভয় করে না, এই যে এত ছোট থেকে দোকান করছিস......’

--ভয় করবে কেন? আমার তো ভালো লাগে...! আমার দোকানে আমি কত খাটি জানো? সব নিজে করি। একটা ছেলে আছে, এখন খেতে গেছে...সে না এলে সব আমি নিজে করি...এইগুলোও মুছি’ হাত দিয়ে কাউন্টার, শো-কেস দেখায় ছেলেটি। ভালো লাগে মন্মথর। তার যদি এইরকম সাহস, প্রত্যয়, কাজের উৎসাহ থাকত! শুধু সাহসের অভাবেই কিছু করে উঠতে পারল না সে। বিষণ্ণ হল মন্মথ। এইটুকু একটা ছেলে পারলে, সে কেন পারল না? দেখবে আর একবার চেষ্টা করে? সাহস থাকলে আরো কতকিছুই তো সে পারত...এই ছেলেটি কি করে জানবে তার সেসব কথা! টাকা...রমলা...বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া...এর কি সেসব ঘটনা জীবনে এসেছে? কিন্তু এই বয়সে তারও তো আসেনি। সেও তো বেশি পড়াশোনা করেনি...তাহলে পারল না কেন? কিসের বাধা ছিল? বিষণ্ণ মুখে বাইরের দিকে তাকাল মন্মথ।

--দাও, টাকা দাও’। মন্মথ টাকা দিল।

হাত পেতে নিল ছেলেটি। তারপর একটি ছোট্ট গণেশের মূর্তির তলা থেকে চাবি বের করে ক্যাশবাক্স খুলল। হালকা হবার জন্য বলল মন্মথ---আমি কিন্তু দেখে নিলাম তোর চাবি রাখার জায়গা...’

--নাও না নাও, আজ মোটে বিক্রিই হয়নি। এই দ্যাখো...’ বলে ক্যাশবাক্স থকে তিনশ টাকা বার করে দেখালে ছেলেটি...নেবে?’ হা হা করে হেসে উঠল। গুমোট টা কেটে গেল।

ধরে এসেছে বৃষ্টিটা। হালকা রোদের আভাসও দেখা যাচ্ছে, যদিও এখন আর তত রোদের বেলা নেই। --চলি রে, পরে আবার এসে একদিন তোর সঙ্গে গল্প করে যাবো...’বলে ব্যাগ-ছাতা সামলে বৃষ্টিস্নাত চকচকে কালো রাস্তায় পা বাড়াল মন্মথ। একবার মুখ ফিরিয়ে হাসিমুখ করে দোকানের দিকে চেয়ে দেখল ছেলেটি তখনও তার দিকে তাকিয়ে। মিষ্টি মুখখানিতে একমুখ হাসি নিয়ে হাত নাড়ল বাবলু, না সুমথ...সুমথ ঘর। মণিরামের দোকানের সেই ভারি বুকটা হালকা হয়ে এসেছে। বেঁচে থাকো বাবা, আমি পারিনি, তুমি যেন পারো...’ মনে মনে সুমথর কথা, সুমথর দোকানের কথা ভাবতে ভাবতে জনারণ্যে নিজেকে সঁপে দিল মন্মথ।

আকাশ তখন অনেকটাই আলোকময়।



কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.