x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | |


শব্দের মিছিল

ফাল্গুনের শেষ গোধূলি বেলা... মরা বসন্ত গায়ে তখনো চিলতে শীতের আমেজ মেখে গুটি গুটি সন্ধ্যের শ্লথ আয়োজনে। অমলতাসের শিথিল বোঁটারা ধরে রাখতে পারেনি আর শুকনো পাতার মৃতদেহের ভার। মরে যাওয়া হলদে পাতা আর গুমনামি কোনো পাখির খসে পড়া পালক জড়াজড়ি করে পড়ে আছে বাগানের এককোণে। মাঝেমাঝেই মাতাল উদাসী বসন্ত বাতাসে তারা জড়াজড়ি করেই থাকে, ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টায়। চৈত্র আসছে... বাগানে, পুকুর ঘাটে, দূরের ঐ মজা নদীর মরা সোঁতায়, সদ্য তরুণীর উড়ন্ত আঁচলে, প্রাণপণে সাইকেলের প্যাডেল ঠেলা নব্য যুবকের গোঁফের রেখায়... কে জানে কার সর্বনাশ ঘটাতে! বাগানের দূরতম কোণে অনাদরে পড়ে থাকা ওই পাতার আর পালকের সখ্যর মতই বিবর্ণ আজ গোধূলির আকাশ। মায়াময় আকাশে মেঘসঞ্চার, কালো চাপ চাপ জলদ মেঘের ভেলা পরিক্রমণ করছে সেই সদ্য তরুণীর ঠিক মাথার ওপরকার আকাশ-উঠোন। সেই নব্য যুবকের আকাশই বা কম কিসে? গতরাতের বৃষ্টিরা অদৃশ্য ছাটের ছায়া হয়ে মন বেয়ে ঢুকে পড়েছে তার মায়ামাখা চোখের ভিতরখানে। পড়ার টেবিলের উপর মাথা নামিয়ে রেখে সে যখন জাগরণের ও স্বপ্নের ঠিক মধ্যিখানে, তখন আর কেউ কোথাও থেকে নিজের তরঙ্গ পাঠাচ্ছিলো কি তাকে? তার চেতন ও অবচেতনের দিগন্তরেখায় যে তখনো ক্রমাগত আসা-যাওয়া করে চলেছে একটি মুখ... যার গালে ফুরিয়ে আসা বিকেলের লালিমা। কেমন মায়াবিনী, নাকি কুহকিনী, নাকি শুধুই সর্বনাশিনী এক মেয়েমানুষ। যুবক বড়ো ধন্ধে। তার ঘরের নোনাধরা দেওয়ালের ঘোলাটে ছবি, পাল্লাভাঙা আলমারির তাকে সার দেওয়া বইগুলির মতোই তার অনুভূতিগুলোও অতীতের ধূসরতা নিয়ে তাকিয়ে আছে শূন্যে... জীবন্ত ফসিলের মতো।​

চৈত্র আসছে, ঠিক সেই সেদিনের মতো, যেদিন তার সর্বনাশ এসেছিলো। সেই সন্ধ্যের ঘনানো অন্ধকার মনে করিয়েছিলো একটি শিহরণ। প্রথম সে স্পর্শের আলুথালু শিহরণ। তারপর ঠোঁটের ওপরে নেমে আসা জোড়া ঠোঁটে সিগারেটের মৃদু গন্ধ। তারপর আর কিছু মনে নেই। সাক্ষী হয়ে রইলো শুধুমাত্র লম্বা অমলতাস। সেদিনও তার পাতা ঝরে পড়েছিলো... টুপ... টুপ... টুপ। হলদে সে শুকনো পাতারা তাদের ছুঁয়ে দিয়ে প্রাণ পেতে চেয়েছিলো। খসখস সড়সড় শব্দে ফড়ফড় করে উড়ে গিয়েছিলো বাগানের ঐ কোণের দিকে, যেখানে গুমনামি পাখিদের পালক গড়াগড়ি যেতো। পাতাগুলো উড়ে উড়ে গিয়ে সেই পালকের সাথে ঠিক এরকমই জড়াজড়ি করতো, নির্লজ্জের মতো। ভাগ্যিস ওদের ঠোঁট নেই! থাকলে হয়তোবা তাতেও চ্যাটচেটে ভিজে আওয়াজ উঠতো। সদ্য তরুণীর ঘামে লেপটানো চুল তখন নব্য যুবক আঙুলের ডগা দিয়ে সরাতে ব্যস্ত। আর মাধবীলতার মতো মাথা ঝুঁকিয়ে তরুণীও তখন মুখ লুকোতে ব্যস্ত পুরুষালি ঘামের গন্ধে ভেজা যুবকের সবুজ খাদির পাঞ্জাবির বুকে।

এ দৃশ্য হয়তো এখনকার নয়, হলোই বা সুদূর অতীতের, তবু তো এই দৃশ্য একদা চলমান ঘটমান অস্তিত্বের বিলাস হয়েই ছিলো। চলে যাওয়া দিনে, শতাব্দী-প্রাচীন কোনো লোকালয়ের আড়ালে হয়তো এই দৃশ্যায়ন হয়েছিলো। আজও হয়তো হয় সেই দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ। হৃদয়ের মধ্যস্থলে ঘটা করা ঘটে যাওয়া এক সর্বনাশের দৃশ্য এটি। তারপর গল্প এগোয় নিজের গতিতে। গ্রাম থেকে শহরে ডাক্তারি পড়তে আসা সেই যুবক, তার প্রনয়িণীকে রেখে এসেছিলো গ্রামে। কলকাতায় ভাড়া নেওয়া ঘরে অপটু হাতে তার অগোছালো ঘরখানা গুছিয়ে দেবার জন্যে ডেকে এনেছিলো তার সহপাঠিনীকে। মেয়েটি যুবকের ঘরে এসেছিলো এক ফাল্গুনের শেষ গোধূলি বেলায়। তখন গ্রামে তার প্রনয়িণী একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলো অমলতাসের তলায় তলায়। দূর আকাশে তখন মেঘসঞ্চার হচ্ছিলো। কালো জলদ মেঘ। ঝড়ের পূর্বাভাস, শনশন বাতাসে উড়ছে অমলতাসের শুকনো পাতা, কেমন পাক খেয়ে খেয়ে। প্রনয়িণী ভাবে কখনো তো এমন হয়নি। ভাবতে না ভাবতেই ঝড় উঠলো, চড়বড় করে বৃষ্টি... তীরের ফলার মতো? নাকি শঙ্করমাছের লেজের চাবুকের মতো?

কলকাতা শহরে যুবকের ভাড়া নেওয়া ঘরে তখন দু'জোড়া ঠোঁট মিলেমিশে একাকার, ঘামে লেপটানো পোশাক তখন বাড়তি আড়ম্বর। ঝড় থামতেই কনে দেখা আলো। কী নিঃঝুম চারিধার, ঝড় থামলে যেমন হয় আর কি! গ্রামে আঠেরো পেরোনো তরুণীর সংখ্যা অমিল। যথাসময়ে গ্রাম্য তরুণী স্বামীর সঙ্গে এক মাস সংসার করে কলকাতা শহর থেকে গ্রামে ফিরছে। সিঁথিতে তার ডগডগে সিঁদুর। কনকচাঁপা হাতে রিনিঠিনি বেজে ওঠা শাঁখা চুড়ি আয়োস্তি... স্বামীর কল্যাণ কামনায়। মন কেমন করা ভোঁ বাজিয়ে ট্রেন চলেছে হেলেদুলে... ঘটাং-ঘট... ঘটাং-ঘট ছন্দে। বিকেল ঘন হয়ে সন্ধ্যে হবো হবো। ট্রেন এসে দাঁড়ালো গ্রামের স্টেশনে। গত সপ্তাহে সেই যুবকটি কলকাতা থেকে ফিরে তরুণীকে আর দেখতে পায়নি। বুকে চিনচিনে এক গোপন ব্যথা নিয়ে যুবক এসেছিলো, গ্রামে ফিরে তরুণীর খবর পেয়ে কেমন এক স্বস্তিও হয়েছিলো তার। এবারে আবার তার ফেরার পালা। শহরে ফিরবে। ফিরতেই হবে। যে মনখারাপ সে রেখে এসেছিলো গ্রামের অমলতাসের তলায়, তাই আবার হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে এলো তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। সেই তরুণী এখন সদ্যোবিবাহিতা রমণী। পরস্ত্রী। একনজর দেখা, অপাঙ্গে একটু চোখাচোখি। সর্বনাশ ফিরে আসছে... শহর পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, অমলতাসের বন পেরিয়ে, অদূর অতীত পেরিয়ে। যুবকটির চোখ জ্বলে এই চৈত্রবেলায়।

হঠাৎ বড়ো শীত করে উঠলো নব্য যুবকের। এদিকে

তার কলকাতামুখী ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। হেলেদুলে আপন গতিতে চলেছে। তারপর কলকাতায় পৌঁছতেই বৃষ্টি নেমেছে, বৃষ্টির ছাটে অন্ধকার হয়ে এসেছে স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো, ঝিমন্ত বাল্বের আলো গড়িয়ে পড়েছে বিছানায় টেবিলে সর্বত্র। চুঁইয়ে আসা স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোআঁধারিতে ছায়ার বাস্তবতার উপস্থিতি। রাস্তা থেকে ভেসে আসা পথচলতি মানুষের বিষন্ন অবসাদ ভরা পদধ্বনিতে আর কটকট করে ডেকে চলা টিকটিকির ডাকেই কেবলমাত্র যেন প্রাণের অস্তিত্ব। এলোমেলো ভাঁজে অযত্নে পড়ে থাকা পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া খবরের কাগজেরা ডাঁই হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে, তাতে লেগে আছে বাসি খবরের গিজগিজে কালো কালো দাগ। নব্য যুবক অলস দুপুরে একলা তার নিজের ঘরে। সহপাঠিনী আর প্রণয়িনী দুজনেই সরে গেছে তার জীবনবৃত্ত থেকে। রেডিও থেকে ভেসে আসা সংবাদ পাঠকের গুরুগম্ভীর গলা, আবার কখনোবা খেয়াল বা ঠুমরির ছেঁড়াখোঁড়া সুর প্রতিবেশী কোনো বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে... এটুকুই নব্য যুবকের একান্ত অবসরযাপন... বা একমাত্র বিনোদন। নোনাধরা ঘরের দেওয়াল জুড়ে জানালার জংপড়া লোহার শিকের দীর্ঘতম ছায়া রচনা করেছে এক কারাগার... এই কারাগারেই যেন আজীবন বন্দী আছে নব্য যুবক। হঠাৎ তার সেই বদ্ধ কারাগারে ঢুকে পড়েছে চৈত্র বাতাস হু-হু শব্দে, সর্বনাশিনী ঘাতিকার মতো। ঢেলে দিয়েছে গ্যালন গ্যালন মনখারাপি বৈরাগ্যের স্পর্শে মেদুর অমলতাসের তলার ভেজা নোনতা স্মৃতির রাশি।

******

অভিরূপের মন্দ্র গম্ভীর গলার গল্পপাঠ থামতেই পায়রার ডানা ঝাপটানোর মতো হাততালির রেশ। অভিরূপ... ডাক্তার অভিরূপ গাঙ্গুলি... নামকরা কার্ডিওলজিস্ট... অর্থাৎ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তবে তার পাঠকেরা অবশ্য তাকে হৃদয় বিশেষজ্ঞ বলেই সম্বোধন করে। ডাক্তারবাবুর সার্জিক্যাল ছুরি আর কলম দুইই চলে সমান নিপুণতায়। লেখক শিল্পী পাঠক শ্রোতা সংসদ আয়োজিত বসন্তোৎসবে ডাক্তার অভিরূপ গাঙ্গুলি গল্পপাঠের আসর থেকে বেরিয়ে স্ত্রী মেঘনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। নিজেই গাড়ী চালাচ্ছে। আজ তাদের দু'জনের মধ্যে এক যোজনব্যাপী শীতল নীরবতা বিরাজমান। অনেকটা পথ এমনভাবেই চললো। যেন কয়েক আলোকবর্ষ পার। অভিরূপের চোখ সোজা সামনে, অভ্যস্ত হাত স্টিয়ারিঙে। ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে বেরোতেই মেঘনা স্টিয়ারিঙে অভিরূপের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখলো আলতো করে। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললো, "আমারও একটা অমলতাসের তলা ছিলো...!" অভিরূপের বুক থেকে একটা পাথর সরে গেলো যেন। ততক্ষণে আবার পরের সিগন্যালে গাড়ী দাঁড়িয়েছে। অভিরূপ নিজের ডানহাতটা স্টিয়ারিং থেকে তুলে মেঘনার হাতের ওপরে রেখে মৃদু চাপ দিয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো মেঘনার মোমঢালা চিকন মুখের দিকে, এই প্রথম বার... দশবছরের দাম্পত্য জীবনে। ফিসফিসে গলায় অভিরূপ বললো, "আমাদের বাগানে আমরা দু'জনে মিলে একটা অমলতাসের চারা লাগাবো, একদিন অনেক লম্বা হবে সেই অমলতাসটা। আকাশ ছোঁবে।" বাইরে রাতের ব্যস্ত শহর, আর ভেতরে মেঘনার সিঁথি ছুঁয়েছে তখন অভিরূপের বাঁ গাল।
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.