x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

রবিবার, মে ০৯, ২০২১

■ আকাশ নীল বিশ্বাস | মানবমননে ‘আইডেন্টিটি’ - চর্চা, চর্যা ও লালন - মানবসভ্যতা ও মানবেতিহাসে তার পরিসর ও গুরুত্ব

sobdermichil | মে ০৯, ২০২১ | | | মিছিলে স্বাগত
শব্দের মিছিল

"...every human being is a specific element within the whole of the manifest divine Being." ('Strong Roots' - 1st chapter of APJ Abdul Kalam's best-selling Autobiography "Wings of Fire") - “প্রত্যেকটি মানুষই হলো স্বর্গীয় অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বহিঃপ্রকাশের একটি সুনির্দিষ্ট উপাদান মাত্র” - আব্দুল কালামের আত্মজীবনীস্থিত অমর এই উক্তিটি করেছিলেন তাঁর পিতা জয়নুল-আবেদিন। নিজের সন্তানকে সৃষ্টিতত্ত্বের অপার রহস্য ও বিশ্ব-সংসারে মানুষের যথার্থ স্থান বোঝাতে কৃত এহেন পিতৃবাক্যগুলিই পরবর্তীতে কালামের জীবনদর্শন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বাস্তবেও দেখা যায়, যে বিশ্বপ্রকৃতিতে মানবজাতির বিবর্তন, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত সংগ্রাম ও সম্পৃক্ততার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির অজানা রহস্যসমূহের উন্মোচন, উদ্ভাবনী শক্তি ও বিচারবোধ অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে অপরাপর জীবগোষ্ঠীগুলির তুলনায় নিজেদের উন্নতিবিধান এবং প্রকৃতিতে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যূথবদ্ধভাবে জীবনযাপন, নিজেদের জন্য পৃথক সমাজব্যবস্থার প্রণয়ন ও অন্যান্য সকল প্রাণীজগৎকে পিছনে ফেলে কালক্রমে নিজস্ব সভ্যতার নির্মাণ - এই সুবিশাল ও সুদীর্ঘ কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নিয়ে পণ্ডিতপ্রবরদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্কের অন্ত নেই। এবিষয়ে প্রতিনিয়তই চর্চা, অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে ঘটে চলেছে নিত্যনতুন ব্যাখ্যা ও তত্ত্বের আবির্ভাব। তবে মননশীল ও জিজ্ঞাসু মনে প্রশ্ন জাগে - মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও বিবর্তনের ঠিক কোন্ স্তরে মানুষ জগৎ-সংসারে তার উপযুক্ত অবস্থান ও গুরুত্ব অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিল? উপলব্ধি করতে পেরেছিল এই সুবিশাল পৃথিবীতে তার সঠিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতাকে? মানবজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ক্রমাগত নিজেকে আবিষ্কারের এই প্রবণতা, নিজেকে জানবার-বোঝবার নিরন্তর প্রক্রিয়া এবং সৃজনশীলতার মধ্যে দিয়ে জীবনলব্ধ জ্ঞান, অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতাকে একটি স্থায়ী ও চিরন্তন রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ও কর্মোদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। জ্ঞান স্বভাবতই বিশ্বজনীন, কিন্তু নিজেকে না জানলে জ্ঞানের সঠিক মূল্যায়ন হয় কি? উত্তর একটাই - না। জ্ঞানার্জনের প্রাথমিকতম ধাপটিই হল নিজেকে জানা; নিজের শক্তি-সামর্থ্য-দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যকভাবে জানবার এই নিরবিচ্ছিন্ন ও সর্বকালীন প্রয়াসের কথা স্মরণ করেই জম্বুদ্বীপের ঋষিগণ পরম আন্তরিকতায়, গভীর আগ্রহভরে সৃষ্টি করে গেছেন অভাবনীয় এক রত্নভান্ডার, অভূতপূর্ব এক আলোকমালা; রচিত হয়েছে বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-উপনিষদ-সাংখ্য প্রভৃতি। উচ্চারিত হয়েছে উপনিষদের সেই অমূল্য বাণী “আত্মানং বিদ্ধি” - অর্থাৎ ‘নিজেকে জানো’; নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অবগত হও, কর্মের মধ্যে দিয়ে সর্বদা প্রতিষ্ঠা করো সত্যকে - কারণ প্রকৃত জ্ঞানার্জন সম্ভব কেবলমাত্র সত্যনিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই (“জ্ঞানার্জনের মূলতঃ তিনটি পন্থা : অধ্যয়ন - যেটি পবিত্রতম, অনুকরণ - যেটি সহজতম এবং অভিজ্ঞতা - যেটি তিক্ততম” - কনফুসিয়াস)। ‘অমৃতের পুত্র মানুষ’ এভাবেই সক্ষম হয়েছে নিজের স্বরূপ উপলব্ধি, পরিচয় উন্মোচন ও 'আইডেন্টিটি' নির্মাণে। হ্যাঁ ঠিকই শুনলেন, ‘আইডেন্টিটি’ (Identity) - মহাবিশ্বে অবস্থান ও পৃথিবীতে পদার্পণের তাৎপর্য অনুধাবনে উক্ত শব্দটির গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের নাম-পদবী-উপাধি-বংশ-কুল-গোত্র-রাশি প্রভৃতি সবকিছুরই ধারক ও বাহক হল আমাদের এই ‘আইডেন্টিটি’, যা একদিক থেকে মানব সম্প্রদায়কে যেমন বিভিন্ন গোষ্ঠীতে আবদ্ধও করেছে, তেমনি একাধিক গোষ্ঠীতে পৃথকীকৃতও করেছে, দিয়েছে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে : "...the qualities of a person or group that make them different from others." (According to Cambridge Dictionary) - অর্থাৎ “সেই সকল বিশেষ গুণাবলী যেগুলি কোনো মানুষ বা মানবগোষ্ঠীকে বাকিদের থেকে পৃথক করে।” সহজ ভাষায় বললে যেসকল গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বাকিদের থেকে আলাদাভাবে শনাক্তকরণে সহায়তার মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয়গত স্বতন্ত্রতা সাধন করে, একত্রিতভাবে সেই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যাবলী বা লক্ষণগুলিই হল সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ‘আইডেন্টিটি’।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আইডেন্টিটি বিষয়টি কিন্তু কখনোই একমাত্রিক নয়, মানুষের পরিচিতি সর্বদাই বিভিন্নতাসম্পন্ন এবং বহুমুখী। জন্মলগ্ন থেকেই আপনার পরিচয় সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয় আপনার জন্মদাতা পিতা-মাতা অথবা অন্য কারো প্রদেয় নামানুসারে। আবার নামের শেষে থাকে ‘পদবী’ নামক আরেকটি বস্তু, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেটি আপনার পিতৃকুলের (সমাজ মাতৃতান্ত্রিক হলে মাতৃকুলের) বংশপরিচয় নির্ধারণ করে। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে থাকে গোত্র-রাশি-কুষ্ঠির মতো বিষয়সমূহ, যেগুলি সাধারণত অপরের কাছে গুরুত্বহীন হলেও আপনার কুলপরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বন্ধু কি বুঝলেন? আজকের আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ যেগুলিকে (গোত্র-রাশি-কুষ্ঠি প্রভৃতি) তাৎপর্যবিহীন বলে প্রমাণিত করতে সদা তৎপর, সেগুলি আসলে কিছুই না, আপনার পূর্বপুরুষের দেওয়া সেই পরিচিতি যেগুলি আপনাকে এই পৃথিবীস্থিত অন্যান্য মানুষের মাঝে পৃথক একটি পরিচয় দেয়, আর সকলের থেকে আপনার স্বতন্ত্রতা সাধন করে। মানবসভ্যতা যতই বিবর্তিত এবং অগ্রগামী হয়েছে মানুষের এই আইডেন্টিটি তথা পরিচিতির বিষয়টিও দিনে দিনে তত জটিল হয়েছে। আদিম সমাজের সূচনালগ্নে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপনের থেকেই দল বা গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যের স্বাতন্ত্র বিধানের জন্য একটি পৃথক পরিচিতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাই নামকরণের সূচনা সম্ভবত মানুষের দলবদ্ধ জীবনযাপনের সময় থেকেই উদ্ভূত হয়। পরবর্তীকালে সমাজ বিবর্তনের একটি বিশেষ স্তরে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটলে সেই রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের (মূলতঃ অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের বাসিন্দাদের​ থেকে নিজেদের​ পার্থক্য নিরূপণ করতে) সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বাসিন্দা হিসেবে একটি পৃথক পরিচিতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে সভ্যতা ও সমাজ ব্যবস্থা আরো জটিলতা প্রাপ্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের পরিচিতি বা আইডেন্টিটির বিষয়টিও ক্রমশ অধিকতর জটিল, বৈচিত্রপূর্ণ ও বহুমুখী হয়ে পড়ে। কালক্রমে পরিচিতির প্রামাণ্যতা বা যথার্থতা বিধানের জন্য আবির্ভাব ঘটে বিভিন্নপ্রকারের উপযুক্ত ‘প্রমাণপত্র’ বা 'Identity Proof'-এর; আজকের আধুনিক সমাজে যেগুলির গুরুত্ব কার্যত অপরিসীম। একবার ভেবে দেখুন তো, অধুনা সমাজ ব্যবস্থায় এই 'Identity Proof'-এর গুরুত্ব কতখানি? জন্মলগ্ন থেকেই এই আইডেন্টিটি বা পরিচিতির বিষয়টি আপনার সঙ্গে কেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়ে? পরবর্তী জীবনে আপনার বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন, বিভিন্নপ্রকারের ডিগ্রী অর্জন, শিক্ষান্তে কর্মক্ষেত্রে যাত্রা প্রভৃতি বহুবিধ কাজেই আপনার পরিচিতি বা আইডেন্টিটির বিষয়টি কতখানি অপরিহার্য! শুধু কি তাই? আপনার মৃত্যুর পরেও এই পরিচিতি বা আইডেন্টিটির বিষয়টি আপনার পিছু ছাড়বে কি? আজ্ঞে না মশাই, আপনার মৃত্যুর প্রমাণপত্র লিখনেও এটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। আপনার সন্তান-সন্ততিরাও নিজেদের পরিচিতির প্রামাণ্যতা ও যথার্থতা বিধানে আপনার পরিচিতি ব্যবহার করবে। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? আপনি জীবিত হন কি মৃত, ধনী কি দরিদ্র, নিরক্ষর, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত কিংবা উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদে আসীন কিংবা নিম্নপদে কর্মরত, ধার্মিক হোন কি অধার্মিক - ধরাধামে ভূমিষ্ঠ হবার সময় থেকে আপনার মৃত্যুর পরেও এই আইডেন্টিটির বিষয়টি আপনার পিছু ছাড়বে না। আপনার সঙ্গে এটি কেবল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েই থাকবে না বরং ক্রমাগত নিজের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়িয়ে যাবে।

কিন্তু সামগ্রিক বিষয়টি যদি কেবলমাত্র এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে যুগ যুগ ধরে মানবসমাজ ও সেখানে বসবাসরত ব্যক্তিমানুষের পৃথক ও স্বতন্ত্র পরিচিতি নির্মাণ ও তার বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রটিকে সমৃদ্ধিশালী করা ছাড়া আইডেন্টিটি চর্চার অন্য কোনো বিশেষ গুরুত্ব থাকতো কি? কিন্তু না বন্ধু না, বিষয়টির উৎসমূল কিন্তু আরো গভীরে। ভেবে দেখুন তো, মানবজীবন যাপনের প্রাথমিকতম তিনটি প্রয়োজন কি কি? আপনি হয়তো ভাবছেন, খুব সহজ, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান - এতো সকলেরই জানা, তাইনা? কিন্তু না মশাই, বিষয়টি যদি শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমিত থাকতো তাহলেও কিন্তু কোনো সমস্যা ছিলোনা। সমস্যার সূত্রপাত তো তখনই হয় যখন এই তিনটি বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে অভুক্ত, অভাবী ও আশ্রয়হীন মানবগোষ্ঠীকে তাদের যথার্থ আইডেন্টিটি ভুলিয়ে দেওয়ার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চালানো হয় কিংবা এই তিনটি বস্তু বলপূর্বক ছিনিয়ে নেবার ও প্রয়োজন পড়লে সেইসাথে মানুষের অমূল্য সম্পদ তার প্রাণটিকে কেড়ে নেবার ভয় দেখিয়ে তার আইডেন্টিটি বিলুপ্ত করে দেবার ভয়াবহ কুকর্মলীলা চলে। চমকে যাচ্ছেন তো? তবে বিস্মিত হলেও একথাই সত্যি যে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান - জীবনধারণের এই তিনটি প্রধানতম এবং প্রাথমিকতম উপাদানের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে তার আইডেন্টিটি ভুলিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র কিংবা এই তিনটি উপাদানসহ প্রাণহরণের আশঙ্কা প্রদর্শন করে সুনির্দিষ্ট মানবসমাজের আইডেন্টিটি গ্রাস করে নেওয়ার আগ্রাসী কর্মপ্রচেষ্টার ইতিহাস কিন্তু বহু প্রাচীন; যা আজকের পৃথিবীতেও সমানভাবে (বা বলা ভালো আরো সুতীব্র অথচ নিপুণভাবে) ক্রিয়াশীল। মানুষের সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপনের সূচনালগ্ন থেকেই বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর বিজয়প্রাপ্ত মানুষেরা তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনা, ধর্মীয় বিশ্বাস, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সামাজিক রীতিনীতি কখনো বলপূর্বক, কখনো বা আবার কৌশলে চাপিয়ে দিয়েছে। এভাবেই পরাজিত গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের নিজস্ব আইডেন্টিটির ওপর বিজয়ী সম্প্রদায়ের মানুষগণ প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আইডেন্টিটি। কারণ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিনষ্টী কিংবা নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞ নয়, কোনো জনগোষ্ঠীকে দুর্বল করার সবথেকে শক্তিশালী ও কার্যকরী পন্থাটি হলো তার নিজস্ব ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও রীতিনীতিকে (অর্থাৎ এককথায় বলতে গেলে তার ‘আইডেন্টিটি’কে) ধ্বংস করা। কারণ কোনো মহীরুহকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূলকরণের জন্য যেমন সর্বাগ্রে তার মূল বা শিকড়টিকেই বিনষ্ট করা প্রয়োজন, তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর ওপর সুদীর্ঘকালব্যাপী সময় ধরে আধিপত্য বজায় রাখবার জন্য প্রয়োজন শিকড়স্বরূপ এই আইডেন্টিটির ধ্বংসপ্রাপ্তী এবং সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর বিজয়ী জাতির আইডেন্টিটির জোরপূর্বক সংস্থাপন। অবশ্য বিজিত জনজাতির আইডেন্টিটি বিলোপের কাজটি সবসময় যে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই করা হয় তা নয়, এক্ষেত্রে অনেকসময়েই কৌশল ও ষড়যন্ত্রের অবতারণাও করা হয়। কখনো বিজিত জনজাতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির অন্বেষণ এবং সেগুলিকে চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে সেইস্থানে আঘাত হানা হয়। কখনো বা বিজিত জনগোষ্ঠীর অভাবি ও দারিদ্র্যপীড়িত অংশটিকে সেই খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের চিরাচরিত প্রলোভন দেখিয়ে নিজস্ব আইডেন্টিটির ছত্রছায়ায় নিয়ে আসা হয়। কখনো আবার পরাজিত জনজাতির উচ্চশ্রেণীর অভিজাতগোষ্ঠী এবং সুযোগসন্ধানী ও মেধাবী, নিপীড়িত অথচ যোগ্যতাসম্পন্ন সম্প্রদায়টিকে বিজয়ী শ্রেণীর শাসককুলের অন্তর্ভুক্তিকরণের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে তাদেরকে নিজ দলভুক্ত করার সুচতুর প্রয়াস চালানো হয়। আজ্ঞে হ্যাঁ বন্ধু, পৃথিবীর দুইটি আব্রাহামিক ধর্ম ইসলাম ও ক্রিশ্চিয়ানিটি উপরিউক্ত পন্থাগুলিকে অবলম্বন করেই সমগ্র বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে; সমর্থ হয়েছে পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার মানুষকে নিজস্ব আইডেন্টিটির সুবিশাল ছত্রতলে নিয়ে আসতে।

এক্ষেত্রে আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো বহু ঈশ্বরের আরাধনাকারী সম্প্রদায়গুলির তুলনায় একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির (যেমন ইসলাম বা ক্রিশ্চিয়ানিটি) অধিকতর শক্তিশালী ‘আইডেন্টিটিগত একতা’ (United Identity)। বহু দেবদেবী, বহুমুখী চিন্তাচেতনা ও ভাবধারায় বিশ্বাস যেমন মানুষের উদারতা, মননশীলতা, জ্ঞানপিপাসা ও যুক্তিবাদের অর্গলটিকে উন্মুক্ত করে, জীবনধারণের​ সুনির্দিষ্ট যাপনপ্রণালীর অনুপস্থিতি এবং শাস্ত্রনির্ধারিত ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক বিধিবিধানের অভাব তেমনভাবেই সেই ধর্মবিশ্বাসী মানবগোষ্ঠীকে বিভিন্ন উপসম্প্রদায়ে বিভক্ত করে ফেলে। স্পষ্টতই, মুক্ত আইডেন্টিটি'র ধারক ও বাহক সেই জনসম্প্রদায়ের চিন্তাধারা-মন-মানসিকতাও উদার-উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। বহুত্ববাদী মতাদর্শ ও বহু দেবদেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাসী (মূলত পৌত্তলিকতার অনুসারী) পেগানিজমে জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্য-দর্শন প্রভৃতি চর্চার (যা সমস্ত পেগান সংস্কৃতিরই অঙ্গ) অবকাশ থাকলেও সেখানে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা, মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিমানুষ এক-একটি দ্বীপ হয়ে ওঠেন। সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতিনীতির অভাবের কারণেই পেগান সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটালেও শেষাবধি তা একপ্রকার তরল আইডেন্টিটির জন্ম দেয়। বিপরীতে আব্রাহামিক ধর্মগুলিই প্রথম একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুকঠিন আইডেন্টিটির সৃষ্টি করে। প্রত্যেকটি আব্রাহামিক ধর্মেই শাস্ত্রবর্ণিত জীবনাদর্শ, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পূর্বনির্দিষ্ট অনুশাসন, রাষ্ট্র-সমাজ-পারিবার পরিচালনের সুনির্ধারিত রীতিনীতি, আইনকানুন ও প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য কঠোর অথচ অভিন্ন নিয়মবিধির অস্তিত্ব থাকায় সেখানে ধনী-দরিদ্র-উচ্চ-নিচ নির্বিশেষে সকল মানুষই পরস্পরের ‘কার্বন কপি’ (Carbon Copy) হয়ে ওঠে। তাদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক চিন্তাভাবনা থাকে একই সূত্রে গ্রোথিত - যা একপ্রকার অবিচল, ইস্পাতকঠিন ও বজ্রদৃঢ় আইডেন্টিটির জন্মদান করে। সহজ কথায়, পেশাদার সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে শারীরিক বা দৈহিক শক্তিসামর্থ্যের দিকে থেকে না হোক, মানসিক প্রস্তুতি বা মনোবলের দিক থেকে কোনো ফারাক থাকেনা - মানসিকভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষই সেখানে যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। তবে যেকোনো কারণেই হোক, প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম বলেই হয়তো জুদাইজমে সেভাবে ধর্মান্তরিতকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়নি; সুসংবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে জন্মলাভ করলেও আত্মপ্রকাশকালে কিংবা পরবর্তী সময়পর্বে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত না হতে পারার দরুণ ইহুদীরা খ্রিস্টান বা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ন্যায় সাম্রাজ্য বিস্তার, নতুন ভূখণ্ড দখল, ধর্মান্তরকরণ, পরধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মীয় আইডেন্টিটি ধ্বংসকরণের মতো সারা বিশ্বব্যাপী সুবিশাল ও দীর্ঘমেয়াদী এক ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হননি। বর্তমান বিশ্বে অবশ্য ক্রিশ্চিয়ানিটি নয়, প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ইসলামই অগ্রণী শক্তির ভূমিকা নিয়েছে। সংখ্যাগত বিচারে দ্বিতীয় (খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগত বিচারে এখনো প্রথমে থাকলেও ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যাবৃদ্ধিতে বর্তমানে ইসলামের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে) হলেও 'বিস্তারকারী সম্প্রদায়' বা 'Spreading Community' হিসেবে মুসলিম জনগোষ্ঠীই সাম্প্রতিক বিশ্বে সর্বাপেক্ষা অগ্রগণ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে। সুপ্রাচীন হিন্দু বা বৌদ্ধধর্ম কিংবা আব্রাহামিক জুদাইজম বা ক্রিশ্চিয়ানিটির অনেক পরে উদ্ভূত হয়েও ইসলামের এরূপ বিপুল সাফল্যের ঘটনাটি সত্যিই চমকপ্রদ! এককালীন প্রবল প্রতিপক্ষ ক্রিশ্চিয়ানিটিকে পিছনে ফেলে অদূর ভবিষ্যতে ইসলাম ধর্মই আজ ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে চালকের আসনে বসার পথে ('Pew Research Centre'-এর একটি সমীক্ষামতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাপেক্ষে ইসলাম ধর্মটিই বর্তমান পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা অগ্রগণ্য)! বহুবিধ কারণবশতঃ ইসলাম আজকের পৃথিবীতে "The Fastest Growing Religion" (সর্বাধিক দ্রুতগতিতে প্রসারণশীল ধর্ম)-এর তকমাপ্রাপ্ত - আইডেন্টিটি রক্ষা এবং তার ক্রমসম্প্রসারণের প্রতি এমন নিষ্ঠা অন্য আর কোনো ধর্মেই দেখা যায়না! অধুনা বিশ্বে ইসলামের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ, ইসলামের ইতিবাচক-নেতিবাচক, ভালো-মন্দ সবকটি দিক নিয়ে হিন্দুদের যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর একাধিক নিবন্ধে অত্যন্ত তথ্যনির্ভর, যুক্তিনিষ্ঠ ও ইতিহাসাশ্রয়ী বিশ্লেষণ রেখেছেন। শুধু কি তাই? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মনীষাও ইসলাম সম্বন্ধে একাধিক লেখনীতে অত্যন্ত নির্মোহ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন, পড়লে সমৃদ্ধ হবেন।

আচ্ছা মশাই, এবার যদি আমি আপনাকে প্রশ্ন করি যে উপরিউক্ত দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের আব্রাহামিক আইডেন্টিটি রক্ষার্থে গোটা বিশ্বব্যাপী তাদের সুবিশাল ‘কর্মযজ্ঞ’ (থুড়ি ‘ধ্বংসযজ্ঞ’) চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমান পৃথিবীর সর্বাধুনিক বস্তুবাদী আইডেন্টিটি মার্কসবাদ তার প্রসার ও প্রচারকার্যে প্রাথমিক সাফল্য সত্ত্বেও শেষাবধি এরূপ ব্যর্থতার সম্মুখীন হলো কেন? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে সংঘটিত ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এই দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন মুসলিম জনমানসে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। অর্থাৎ বস্তুবাদী মার্কসীয় দর্শন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে প্রথম থেকেই ব্রাত্য! রাজনৈতিক আধিপত্য তো দূরের কথা, মার্ক্সবাদের যতটুকু গ্রহণযোগ্যতা সেটিও কিন্তু ইসলামিক বিশ্বের বাইরেই - ক্ষমতাদখল তো দূরস্থান, পৃথিবীর কোনো শরীয়তি রাষ্ট্রেই মার্কসবাদী মতাদর্শ কোনোপ্রকার প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি! বাস্তবিকপক্ষে মার্কসবাদও তো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মতাদর্শকেন্দ্রীক আইডেন্টিটি, যা মূলত অর্থনৈতিক উপরিকাঠামোভিত্তিক বিচার-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্তরভিত্তিক সমাজ বিবর্তনের একটি বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক চিত্র উপস্থাপন করে। সমস্ত প্রকারের ভাববাদ ও আধ্যাত্মিকতা ব্যতিরেকে শাসিত ও শোষিত শ্রেণীর একে অপরের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে সংঘটিত দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে সমাজকাঠামোর প্রকৃতিগত পরিবর্তনের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক বস্তুবাদী ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিকচিহ্ন প্রদর্শন করে। কিন্তু প্রাথমিক পর্বের অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন-পরবর্তী সময়কাল থেকেই একের পর এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৃত্যুঘন্টা বাজতে থাকে। স্বভাবতই মননশীল জিজ্ঞাসু মানবমনে প্রশ্ন জাগে যে ১৪০০ বছরের ইসলামিক আইডেন্টিটি (বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক দ্রুতগতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ধর্মীয় মতবাদ) কিংবা ২০০০ বছরের খ্রিস্টান আইডেন্টিটি (এখনো পর্যন্ত বিশ্বের ধর্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ) নিজেদের অস্তিত্ব বহাল তবিয়তে রক্ষা করতে পারলেও জন্মলগ্নের ২০০ বছর পূর্তির আগেই এই বস্তুবাদী মতাদর্শভিত্তিক আইডেন্টিটির এরূপ ভরাডুবি ঘটলো কেন? প্রশ্ন একটাই, উত্তর কিন্তু অনেক। না না একেবারেই অবাক হবেন না বন্ধু, এহেন সরল প্রশ্নের উত্তরটি কিন্তু মোটেই বৈচিত্রহীন একরৈখিক নয়, বরং অত্যন্ত জটিলতাসম্পন্ন ও বহুমাত্রিক। একবার ভেবে দেখুন তো ইসলাম ও ক্রিশ্চিয়ানিটির সঙ্গে বস্তুবাদী মার্কসবাদের মূলগত তফাৎটি কোথায়? উত্তরটি কিন্তু খুবই সহজ - আধ্যাত্বিক উপাদানের অভাব। অবশ্য আধ্যাত্মিকতা মানেই যে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধর্মবোধ হতে হবে এমন কোনো অর্থ নেই কিন্তু; বহুত্ববাদী হিন্দুধর্মই বলুন কিংবা আব্রাহামিক রিলিজিয়ন সবকটির ক্ষেত্রেই দেবত্বচিন্তা বা অধ্যাত্মবাদ হলো কিন্তু একটি অভিন্ন বিষয়বস্তু। এই দেবত্ববাদ কিংবা অধ্যাত্মচেতনা অর্থে কিন্তু বহু দেবদেবীর উপাসনা কিংবা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস নয়, বরঞ্চ ‘অসীমের অনুভব’কেই বোঝানো হচ্ছে - যা মানুষকে ইতর প্রাণী থেকে পৃথক করে গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান - নিছক চিন্তার শক্তি নয়, শক্তির চিন্তা, নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা নয়, কল্পনা করার শক্তি যা তথাকথিত জ্ঞানের চাইতেও মূল্যবান। স্বয়ং মহাজ্ঞানী আইনস্টাইন পর্যন্ত একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন - "Imagination is more important than knowledge. For knowledge is limited to all we know and understand, while imagination embraces the entire world and all there ever will be to know and understand" - হয়তো সেই কারণেই এই বিশ্বাস বা কল্পনাকে কেন্দ্র করেই মানুষের প্রথম আইডেন্টিটির জন্ম হয়েছে। মানুষের ‘আমিত্বের বোধ’ই তাকে কালক্রমে ‘আত্মা’ নামক অসীম ও অবিনশ্বর এক বিমূর্ত সত্তার জন্ম দিতে অনুপ্রাণিত করেছে। মূলধারার বিজ্ঞান (Mainstream Science) এই আত্মার অস্তিত্বকে কোনোদিন স্বীকৃতি না দিলেও বিভিন্ন ধর্মমত ও ধর্মীয় আদর্শে আত্মা একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসের বিষয়। আত্মা ততক্ষণ পর্যন্তই জীবদেহে অবস্থান করে যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত জীব জীবিতাবস্থায় থাকে অর্থাৎ তার দেহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকে। অন্যভাবে বললে আত্মা হলো সেই শক্তি যা জীবদেহের প্রাণপ্রবাহকে অব্যাহত রাখে। প্রত্যেক জীবেরই মৃত্যুর পর তার নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করে সেই আত্মা পাড়ি দেয় অতীন্দ্রিয়লোকে। ভগবৎ গীতাতে বলা হয়েছে, “জীবদেহ একটি বস্ত্রের মতো যা কালস্রোতে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়লে ব্যবহারকারী তাকে প্রত্যাখ্যান করে,” এই ব্যবহারকারীই হলো ‘আত্মা’ - চেতনারূপ সেই অবিনশ্বর সত্তা যা বারংবার নশ্বর, ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু জীবদেহে আশ্রয় নেয়। লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো, এক্ষেত্রে শরীর বা 'দেহ' বলতে কিন্তু 'জীবদেহ'কেই বোঝানো হয়েছে, 'মানবদেহ'কে নয়।

সংস্কৃত ‘আত্মা’ (ATMAN) শব্দটি ‘আত’ (AT) এবং ‘আন’ (AN) এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে; এক্ষেত্রে ‘আত’ শব্দটির অর্থ হলো ‘ভ্রমণ’, ‘বিচরণ’ বা ‘ঘুরে বেড়ানো’ (to wander) এবং ‘আন’ শব্দটির অর্থ হলো ‘শ্বাস’ (Breath) অর্থাৎ সামগ্রিক বিচারে ‘আত্মা’ বলতে “জীবের সেই অংশকে বোঝায় যা এক দেহ থেকে অন্য দেহে ঘুরে বেড়ায় এবং যা শ্বাস বা প্রাণের সাথে সম্পর্কিত।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আব্রাহামিক ধর্মমতে (ইহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম) কিন্তু কেবলমাত্র মনুষ্যপ্রজাতিই এই চেতনরূপ বিমূর্ত সত্তার অধিকারী, মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো জীবগোষ্ঠী নয় - যা সনাতন ধর্মীয় চিন্তনের সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কারণ মানুষ ছাড়াও যেকোনো প্রকার জীবন্ত অস্তিত্বই (তা সে প্রাণী-উদ্ভিদ-জীবাণু যাই হোক না কেন) শ্বাস নিতে সক্ষম। হিন্দু দর্শনে ‘আত্মা’ হলো এমন একটি ‘সত্তারূপী চেতনা’ বা ‘চেতনারূপী সত্তা’ যা সরাসরি সম্পর্কিত প্রাণের সাথে, যে প্রাণ আত্মাকে দেহের সাথে যুক্ত করে। অতএব সনাতন দর্শনতত্ত্ব অনুযায়ী মনুষ্যপ্রজাতিসহ মহাবিশ্বের সমস্ত জীবের মধ্যেই আত্মা আছে। সকল সংবেদনশীল ও স্বাতন্ত্রতার চেতনাসম্পন্ন (Identity Conscious) জীবের মধ্যেই তাই আত্মা অস্তিত্বশীল। এই ধারণানুসারে এই মুহূর্তে আমার মধ্যে বিচরণশীল যে অবিনশ্বর সত্তাটি সংশ্লিষ্ট রচনাকার্যে নিবেদিতপ্রাণ, আমার মৃত্যুর পর আমার নশ্বর দেহটির বিনাশ ঘটলেও তার বিনাশসাধন অসম্ভব; আমার দেহ পরিত্যাগ করে সেই আত্মা তখন অন্য কোনো দেহকে আশ্রয় করে তার সৃজনশীল ক্রিয়াকর্মকে অব্যাহত রাখবে। মৃত্যু এখানে আত্মার দেহ পরিবর্তনের একটি কারণ মাত্র, মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র আমাদের নশ্বর দেহেরই অবলুপ্তি ঘটে, কিন্তু মানবাত্মা ও মানবহৃদয় যে সৃজনশীল সত্তার ধারক ও বাহক তার বিনষ্টীকরণ ঘটানো মৃত্যুর পক্ষে কখনোই সম্ভবপর হয়না। সহজ কথায়, মানুষ মরণশীল কিন্তু তার অন্তরে সদা ক্রিয়ারত সৃষ্টিশীল সত্তাটি কালজয়ী এবং এই শাশ্বত সত্তার স্বয়ংসম্পূর্ণতা অসীম শক্তিসম্পন্ন অথচ নশ্বর দেহধারী আত্মার ওপরেই নির্ভরশীল - এই কল্পনাকে কেন্দ্র করেই মানুষের প্রথম আইডেন্টিটি! নশ্বর এই দেহটিকে ঈশ্বরের সঙ্গে, অসীমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। এই কারণেই বিপ্লবী ভগৎ সিং তাঁর “কেন আমি নাস্তিক” (Why I Am an Atheist) গ্রন্থে সমস্তপ্রকারের আধ্যাত্মিকতা ও দেবত্ববাদী চিন্তাধারাকে খন্ডন করে নাস্তিকতার জয়ধ্বনি দিলেও একথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে নিয়েছেন - “বিশ্বাস কষ্টকে লঘু করে দেয়, এমনকি কখনো কখনো তাকে আনন্দদায়কও করে তুলতে পারে। ভগবানের মধ্যে মানুষ জোরালো সান্তনা ও সমর্থন পেতে পারে।” ভগবানই বলুন, কিংবা ‘অসীমের অনুভব’ - বেদ-গীতা-সাংখ্য একেই বহন করেছে, হিন্দু তাকে ধারণ করেছে, পেগানিজম বা বহুত্ববাদ তাকেই লালন করেছে - মানুষও নিজেকে এভাবেই ভাবতে চেয়েছে। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে সমাজবদ্ধ জীবনযাপন করেও তাই সে নিজের একটি স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি চেয়েছে, বহুত্বের মধ্যে থেকেও, বহুত্ববাদী চেতনাকে লালন করেও তার যাবতীয় সৃষ্টিকর্ম, দর্শনচিন্তা, প্রেম-ভালোবাসা, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব, শিল্প-সাহিত্য এমনকি বিজ্ঞানের মধ্যেও সে এই দেবত্বের, অসীমত্বের সন্ধান করে। কুকুর-বিড়ালের ন্যায় ইতর প্রাণীদের মতো নিছক জীবনধারণের জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থানসাধনে সক্ষমতাই যদি মানুষের সার্বিক সন্তুষ্টিবিধানে সমর্থ হতো, সেক্ষেত্রে মানবজাতির সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই থাকতো না। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের জৈবিক চাহিদা পূরণের পরেও এই সুদূর অসীমের আবাহন করেই মানবসভ্যতার জয়যাত্রা, এই বোধ বা প্রতীতিকে ধারণ, বহন ও লালন করেই কালক্রমে অন্যান্য সকল জীবকুলকে পশ্চাদগামী করে মানবজাতি এই বিশ্ব-প্রকৃতিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিবাদন করতে পেরেছে - অর্থ নয়, পরমার্থই এক্ষেত্রে মানুষের লাইট হাউস। বস্তুবাদের উপর ভিত্তি করে রচিত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদে দেবত্বের এই পরশটি নেই - যেখানে অসীম নেই, সেখানে আলোও নেই, তাই সেখানে মানুষও নেই।
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.