x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

নীলাঞ্জনা মল্লিক

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ |

শব্দের মিছিল

গোলাপকে ইস্কুল ছাড়িয়ে দেওয়ার খবর শুনেই কিছুটা আঁচ করেছিল আমিনা। পড়াশোনায় তো মন্দ নয়। টুক টুক করে পাশ ঠিক করে যায় ফি বছর। তেরো বছরের হল মেয়েটা। সেই জন্ম থেকে আমিনার কোলে পিঠে বড় হয়ে আসছে। ‘গোলাপ’ নাম তো তারই দেওয়া।

মা না ডাইনি? এই স্বভাবের জন্যেই ফুলিটাকে দুচক্ষে দেখতে পারা যায়না। কোন্ পিশাচের হাতে সঁপে দিচ্ছিল ফুলের মতন মেয়েটাকে! লোকটা ভালো টাকা দেবে। ফুলির ঘর মেরামত হবে। রোজকার এক থালা করে ভাত বাঁচবে।

ভাগ্যিস! সময় থাকতে থাকতে গিয়ে গোলাপকে নিয়ে এসেছে আমিনা। মেয়ে বেচবে ফুলি। ফর্সা টুকটুকে লাল ঠোঁট লম্বা চুল মেয়ে। বাজারে অনেক দাম। এমনিতে দেবে কেন?

হারামজাদি! নিজে শালী খানকি বলে মেয়েটাকেও.....

শখ করে গড়ানো কানের পাশাদুটোর বিনিময়ে নিয়ে এলো গোলাপকে। ফুলি আর বচসা বাড়ায়নি। ঐ ভয়ঙ্করীর সাথে বড় একটা মুখ লাগাতে যায়না কেউ। বাপরে! কী রণচন্ডী হাবভাব!

আগে অবশ্য এমনটা ছিলো না। কতই বা বয়স হবে তখন? নাবালিকা শব্দের অর্থ বুঝত না আমিনার আব্বু। দিয়েছিল শাহজাদার গলায় ঝুলিয়ে। শাহজাদা কি শুধু নামেই? যে কোনও মেয়ের কাছেই তার স্বামী হল রাজপুত্তুর, রক্ষাকর্তা। সে মাতাল হয়ে মারুক, কাটুক, রাতের বিছানায় বিকৃত যৌন নিপাড়ন করে আনন্দ নিক... চুপচাপ মুখ টিপে সয়ে নিতে পারলেই মাথার ওপর নিরাপত্তার ছাদ, ভরপেট খাবার।

তবে সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলে কিন্তু তুমি সংসার বহির্ভূত। সেরকমই কিছু ঘটেছিল সেই রাতে। মদ্যপ রাজপুত্রের অত্যাচার সেদিন মাত্রাতিরিক্ত। রোজকার নিয়মমাফিক মারধরের সঙ্গে জলন্ত সিগারেটের ছেঁকা আমিনার গলায়, বুকে, পেটে, নিতম্বে...

তীব্র আর্তনাদের সঙ্গে তখন বেরিয়ে আসছিল অশ্রাব্য গালিগালাজ। দাঁ নিয়ে তেড়ে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছিল সেদিন শান্ত মেয়েটা।

সেই রাগ আজও জ্বলছে। বহু ঝড়ঝাপটা, লড়াইয়ের পরেও জ্বলছে। আমিনা এখন একা থাকে। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দশ বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। বছর ঘুরলেই দু’তিনশ করে মাইনে বাড়ায়। কোনও বাড়িতে রাজি না হলে কাজ ছাড়বার হুমকি দেয়। তাকে সব্বাইকার দরকার, সবাই নরম সুরে কথা বলে। মাছ কেটে মুড়ো দেয়, ফল সবজির কাটা অংশ দিয়ে খুশি রাখে।

উপচে পড়া যৌবন প্রকট হয়ে ধরা দেয় মধ্য ত্রিশের কৃষ্ণাঙ্গী শরীরে। কেয়া দিদিমণির বর লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে দ্যাখে গাঢ় রঙের সুতির শাড়ি ঝোলানো সরু কোমরের দিকে। কাছে আসার ইঙ্গিত দিতে গিয়েও পারেনা। ওর কটমট দৃষ্টিতে যেন ছুরির ধার।

শুধু দিদিমণির কারণেই ওই বাড়ির কাজ ছাড়েনা আমিনা। দিদিমণি মুখোশধারী নন... কেমন মায়াজড়ানো দুটো চোখ! কত সহজেই আপন করে নেন। তাঁর কাছ থেকেই তো আজ চেয়ে আনলো কিছু বই খাতা। গোলাপকে আবার ইস্কুলে পাঠাতে হবে। কালো মায়ের আলো মেয়ে। নিজেকে​ ​ ভেঙ্গে ভেঙ্গে আমিনা গড়ে তুলবে ওকে।

এদ্দিনে এই ভাড়া করা টিনের ডেরাটাকে একটা পরিপূর্ণ ঘর বলে মনে হচ্ছে যেন! আজ টিমটিমে বাল্বের আলোয় ঠিকরে বেরচ্ছে খুশি। সামনের দাওয়ায় এসে স্টোভে ভাত বসালো আমিনা। পাশে ফুলির ঘর থেকে রোজকার মত খাটের মচর মচর আওয়াজ। নষ্ট মেয়েছেলে কোথাকার! আজ মেয়ে ঘরে নেই তো একের পর এক খদ্দের... মরণও হয়না! ভাবতে ভাবতেই ফুলির আর্ত চীৎকার, সাথে গোঙানি। হল টা কী? এ মরদ একটু বেশিই সোহাগ করছে বুঝি?

মাথার ওপর ঝলমলে চাঁদটা খুব বড় দ্যাখাচ্ছে। পূর্ণিমা নাকি আজ? হবে হয়ত। আমিনা ওসবের খবর রাখেনা। ভাত হয়ে এসেছে। গোলাপটার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। সরু সরু করে লাউ কাটা। বড়ি দিয়ে রান্না করবে। মেয়েটা বড়ি খেতে ভালোবাসে।

হঠাৎ শ্লথ পায়ে আলুথালু ফুলিকে এদিকে আসতে দেখে বুকটা ধড়াস করে উঠল। মাগী এখানে কেন আসছে? মেয়েটাকে নিয়ে আবার টানাটানি করবে নাকি? ফুলির উদ্ভ্রান্ত চেহারা, বুক থেকে আঁচল খসে পড়েছে, উস্কোখুস্কো চুল। চোখের জল​ ​ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কাছে এসে আমিনার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলো কানের পাশাদুটো।

"আমার মেয়েকে নিয়েছিস। এটা তুইই রাখ। পারলে গোলাপকেই দিস।"...

আমিনা কিছু বলতে চাইছিল হয়ত। দুলদুটো হাতে নিয়ে হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ । এতদিন মাঝে মাঝেই ওগুলো কানে পরে ছোট্ট আয়নাটার সামনে দাঁড়াত সে। বড় কষ্ট করে টাকা জমিয়ে গড়ানো। গোলাপকে দারুণ মানাবে।

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে ফিরে যাচ্ছে ফুলি। একটিবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না তো?

"মেয়েটাকে একবারও দেখতে চাইবিনা ফুলি? কী মা রে তুই ??"

আমিনার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুকের গভীর থেকে।

দায়িত্ব বাড়লে বিপদের ভয় আরও বাড়ে। অভাবের ভয়, দুর্যোগের ভয়, হিংস্র জন্তু জানোয়ার, তার থেকেও হিংস্র মানুষজন... যাক গে! থাকুক সেসব। লড়াই করে বাঁচার নামই তো জীবন। তা সত্ত্বেও আজ মায়াময় জ্যোৎস্না, তা সত্ত্বেও আজ গোলাপের মিঠে গলার আবদার, গুনগুন সুরে গান, খাতার পাতায় ডটপেনে কষা সহজ কঠিন অঙ্ক.... পৃথিবীটা কত সুন্দর!! চাঁদের স্নিগ্ধ আলো পড়ে চকচক করছে সোনার কানের ফুলদুটো।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.