x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত

নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

আজ কয়েকদিন যাবতই ঘটছে ব্যাপারটা । আমি যখনই পড়ার ঘর থেকে বেডরুমের দিকে হেঁটে আসি তখন মনে হয় কেউ যেন আমায় লক্ষ্য করছে ।কিন্তু কোথায় কে ?

 এ বাড়িতে শুধু আমি আর আমার বর অভিরূপ থাকি । একমাত্র মেয়ে টুকি হস্টেলে ।সকালে অভিরূপ অফিসে  বেরিয়ে যাওয়ার পরে বিনি আসে ঘর দুয়োর পরিষ্কার করতে । তারপর আসে নমিতাদি।  নমিতাদি এ বাড়ির রাঁধুনি ।যদিও মাত্র দুটো লোকের রান্না তবুও রান্নার লোক রেখেছি আমি । কারণ আমি মনে করি যে আমার অমূল্য সময় শুধু রেঁধে বেড়ে আর ঘর গুছালি কাজ করে ফুরিয়ে ফেলব না আমি । স্কুল কলেজে পড়বার সময় লেখা পড়ায় দারুণ ভাল ছিলাম আমি ।  কলকাতার একটি নামী স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিলাম । প্রতি বছর রেজালটও করতাম দেখার মত । স্কুলে দিদিমণিরা আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন । কলেজে  গিয়ে নানান ইয়ারের নানান স্টুডেন্ট হরেক কাণ্ড আর ছাত্র রাজনীতির জেরে সেইভাবে নজর কাড়তে না পারলেও ঠাসা ক্লাসরুমে প্রফেসরদের সমস্ত নজর কেড়ে নেওয়ার মতন ঝলক আমার ছিল । কলেজের চত্বর দিয়ে হাঁটার সময় কোন প্রফেসরের সঙ্গে  চোখাচোখি হয়ে গেলে কোন কোন সার বা ম্যাডাম বেশ সপ্রশংস দৃষ্টিতে চাইতেন । আমার ফার্স্ট গার্লের ইমেজটা উল্লসিত হত এতে ।মনের মধ্যে ফুরফুর করে সুবাতাস বয়ে যেত । তবে আমি বেশ কায়দা করে এড়িয়ে চলতাম অকালপক্ক ছাত্র নেতাদের ।ধুর যত সব সময় নষ্ট ! এম এ করার পর বাড়িসুদ্ধু সবাই চেয়েছিল যে আমি নেট ক্লিয়ার করে কলেজে চাকরি করি । বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ার জন্য চেষ্টা করি ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু সে গুড়ে বালি । বাবা মা আত্মীয় স্বজন সকলের সব আশায় জল ঢেলে দিয়ে আমি আরও বেশি করে পড়াশুনাতেই নিমজ্জিত হয়ে গেলাম । পি এইচ ডি করব এবার । চাকরি ফাক্রির কথা তেমন করে ভেবেই দেখলাম না আমি। আসলে  আমার বাবা মা ভাল উপার্জন করতেন ।দুজনেই  পেশায় অধ্যাপক আর আমি তাঁদের একমাত্র সন্তান । অতএব আমার উপার্জন না করলেও চলে যাবে ।বরং অধ্যয়নং তপ মানসিকতা নিয়ে বসে থাকলে আরও অনেকদিন আমাদের  পরিচিত অপরিচিত জ্ঞানী গুণী মহলে নজর কাড়া সমাদর পাব ।এম এ তেও দারুণ একটা রেজালট করেছিলাম আমি । ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ।

 না , এততেও অবিশ্যি সবাই পছন্দ করে না আমাকে ।গুণগ্রাহীর দলটা ভারি হলেও নিন্দে মন্দ করার দলটাও নেহাত ছোট নয় । তবে সে যাক গে । মনীষীদের নামেও লোকে কুচ্ছ করে ।আসলে যারাই কোন না কোন দিকে একটু এগিয়ে গেছে তাদেরকেই টেনে নামাবার চেষ্টা করে লোকে । আমি জানি যে আমার কথা বার্তার মধ্যে ‘ এই আমাকে দ্যাখ আমাকে দ্যাখ’ একটা ধরণ আছে আর এই ধরণটা অনেকেই সহ্য করতে পারে না কিন্তু আমার বিদ্যের আর জ্ঞানের বহর দেখে অনেক রথী মহারথীই লেজ গুটিয়ে পালায় ।যা হোক চাকরি তো তখন করলাম না কিন্তু বিয়েটা করে ফেলেছিলাম ।  আমার পি এইচ ডি র গাইড  ছিলেন প্রথিতযশা অধ্যাপক ডঃ পীযূষ বসু । তাঁরি সুযোগ্য পুত্র অভিরূপের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছিল আমার । অনেকটা ওই আধা প্রেম আধা আলোচনার পরিবেশে টুক করে বিয়েটা হয়ে গেছিল । আর ডঃ বসু ও মিসেস বসু মানে আমার শ্বশুর মশাই ও শাশুড়ি মা সকলেই যেন একেবারে উদারতা ,ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য এসব কনসেপ্টের ছাঁচে ফেলে নিজেদেরকে গড়ে নিয়েছিলেন । বিয়ের পরেই আমার শাশুড়ি মা আমাদের আলাদা বাড়িতে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। নইলে সকলেরই প্রাইভেসিতে বিরাট সমস্যা ঘটে যাবে নাকি । আমার বাবা মা বিশেষ করে অভিরূপ একটু কিন্তু কিন্তু করলেও আমার ভালই লেগেছিল এ ব্যবস্থা । যা হক নিশ্চিন্তে পড়াশুনা করাটায় অন্তত ব্যাঘাত ঘটবে না আমার । তো সেই ব্যবস্থাই চালু রইল । আর বিয়ের পরে তো বটেই এমনকি পি এইচ ডি কমপ্লিট করার পরেও চাকরি বাকরি র দিকে ভিড়লাম না আমি ।

তবে বাঁধা সময়ের চাকরি করি না বলে অনেক সময় পাই নানান বই পড়ার । ফ্রি লান্স সাংবাদিকতা করা বিভিন্ন সেমিনারে জ্ঞানগর্ভ লেকচার দেওয়া মাঝে মাঝে কোন চ্যানেলে মুখ দেখিয়ে দুটো বাণী বিতরণ করা আর বই লেখা সব মিলিয়ে দারুন একটা জগতে বসবাস করি আমি । দায়বদ্ধতাবিহীন মুক্ত নির্ভার একটি পুস্তক পরিপূর্ণ পৃথিবী ।

আমার বর অভিরূপ ব্যাঙ্কে বড় চাকরি করে কিন্তু একটু গোলা লোক ।অফিসের খাতাপত্র আর খবরের কাগজ ভিন্ন বই দুনিয়ার সঙ্গে সংস্রব রাখতে চায় না । একেবারে প্রফেসর বসু মানে আমার শ্বশুরের বিপরীত চরিত্র কিন্তু তাতে আমার কোন অসুবিধে নেই । অভিরূপ তার বই পাগল বউ মানে এই আমাকে নিয়ে বেশ গর্ব করে । বন্ধু বান্ধব মহলে তার বই পাগল বৌটিকে দেখিয়ে সে বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করে । 

আমরা দুজন যে যার জগতে থাকি বলে মেয়েটাকে সময় দিতে পারতাম না । তাই আমার মেয়ে টুকিও তার নিজের জগতখানা আলাদা করে নিয়েছে অনেক দিনই । মাধ্যমিক পাশ করার পরে নিজেই বায়না করে হস্টেলে চলে গেছিল । তারপর থেকে হস্টেলে থেকেই পড়াশুনা করে আসছে সে।টুকি পড়াশুনায় আমার মতন অত ভাল না হলেও ভারি স্মার্ট । এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ।

 মোটমাট আমি বরাবরই নিজেকে নিয়ে খুব সুখি ।সংসারের ছোট বড় সমস্যা নিয়ে কখনও তেমন ভাবি না আমি । নাহ স্বামী স্ত্রীর মান অভিমান সং ক্রান্ত ব্যাপারেও না । আমার জীবনে আমিই সব। স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিলাম আমি । বরাবর সেই ইমেজটাই সকলের কাছে বজায় রাখতে চাই ।আজও আমার পড়ুয়া ইমেজ নিয়ে আমার নিজস্ব ভুবনে আমি ফার্স্ট গার্ল। চেনা পরিচিত জগতে আমার তুল্য আর একজনও নেই ।আমার মতন নিবিষ্ট পাঠক আমার চারপাশের জগতে দ্বিতীয় দেখি না ।

প্রতিদিন পড়ার ঘরে  নিয়ম করে সাত আট ঘণ্টা কাটাই আমি । তারপর  দৈনিক পড়াশুনোর কোটা কমপ্লিট করে বেডরুমের দিকে যাই । কোথাও বেরোবার না থাকলে এ সময় নিয়ম করে ঘণ্টা দুয়েক রেস্ট নিই আমি। ঘুম এল তো ভাল নতুবা চোখদুটোকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্যও এই বিশ্রামটুকু দরকার আমার ।কিন্তু কদিন যাবত আমার পড়ার ঘর থেকে বেডরুমের দিকে যেতে যে ছোট্ট প্যাসেজটা পড়ে সেখানটা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অদ্ভুত ভাবে মনে হচ্ছে যে কেঊ যেন আমার বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । এ সময় বাড়িতে আমি একাই থাকি । নমিতা দি কাজ সেরে বেরিয়ে যায় সকাল দশটার মধ্যে । তারপর অভিরূপ বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত আমি একাই থাকি । কোন কোন দিন টুকি ফোন করে আধঘণ্টা কথা বলে । কোন কোন দিন আমার ছোট বোনও ফোন করে আমেরিকা থেকে । নইলে সকাল দশটা থেকে সন্ধে আটটা নটা পর্যন্ত এ বাড়িতে অখণ্ড নীরবতার রাজত্ব । আমি খেয়াল করে দেখেছি যে যখন বাড়িতে অন্য কেউ উপস্থিত থাকে তখন এই অদ্ভুত অনুভূতি হয় না আমার কিন্তু আমি একা থাকলেই এই অনুভূতিটা আমাকে চেপে ধরে । আমি যেখানেই যাই না কেন কেউ যেন তার সহস্র চক্ষু মেলে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে । আমি বুঝতে পারি কেঊ অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।যেন সামনে গেলেই ঐ অদৃশ্যকে আমি স্পর্শ করতে পারব  বা কেউ এসে হাত রাখবে আমারই ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাতদুটিতে ।প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিতে খুব চেষ্টা করেছিলাম । নিজেকে   আপ্রাণ বোঝাতে চেয়েছিলাম যে সবটাই আমার মনের ভুল । কিন্তু ব্যাপারটা যে আমার মনের ভুল ছিল না সেটা প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ।এখন নমিতাদি কাজ সেরে চলে গেলে যেই না কোন একটি বই নিয়ে বসি অমনি কে যেন দরজার সামনে বা অদূরে নয় একেবারে মনের ওপরেই চেপে বসে । অধিকার বিস্তার করে আমার চেতনার ওপর । আমার বইয়ের পাতায় মন বসে না । আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাথরের মত বসে থাকি ।লাইব্রেরিতে যাই না । কোন অনুষ্ঠানে বা সেমিনারে যাই না । কেউ কোথাও যেতে বললে শত হস্ত দূরে সরে যাই । কারো সঙ্গে কথা বলতেও ভাল লাগে না ।

 দিন পনেরো পরে আমার এই আচমকা গুম হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা চোখে পড়ে গেল সকলেরই । সবাই আমাকে কারণটা জিজ্ঞেস করতে লাগল ।  আমি কারুকে কিছু  না বললেও একদিন কাঁদতে কাঁদতে  মেয়েকে সবটা খুলে বললাম । মেয়ে বলল ----এ বাবা ! তোমার সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম হচ্ছে গো মা । ঐ জন্য বলি এত পড়াশুনা করো না । শুনবে না কারো কথা । পড়ার নেশায় পড়েই যাবে পড়েই যাবে । তুমি আমার সঙ্গে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে যাবে । আমি খোঁজ খবর করে ভালো একজন ডাক্তারের এপয়েণ্টমেণ্ট নিচ্ছি ।

 আমি কেঁদে বললাম ---এ কী হল রে আমার টুকি ? এমন কেন হল ?

---ও মা ডোণ্ট ওরি ।তুমি নাকি এত পণ্ডিত মহিলা । এদিকে মেয়ের কাছে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছ । চুপ কর । আর শোন দুপুরবেলাগুলো বই না পড়ে একটু শপিং বা কোন বন্ধুর বাড়ি  ঘুরে আসা এসব করো । সিনেমাও দেখতে পার । আমার এখন পরীক্ষা চলছে নইলে আমি তোমায় একমপানি করতাম । আরে , বাবা যেমন অত্যাশ্চর্য তুমিও তাই । একেবারে রাজযোটক । দুজন মিলে একটু বেড়াও একটু ঝগড়া কর লাইফ এণজয় কর তা নয় একজন ব্যাঙ্ক নিয়ে মেতে আছে  আর অন্যজন বই নিয়ে । তুমি ভূত দেখবে না তো কি আমি দেখব ?

টুকি ভীষণ বকে আমাকে । ফোন ছেড়ে দেয় । আমি ঠিক করি নাহ কাল থেকেই খুব বেড়াব কদিন তাহলে এসব মনের ভুল কাটবে । সেদিন ফোন করে রান্নার দিদি নমিতা কে আসতে বারণ করে দিলাম । অভিরূপ যা যা ভালবাসে সেই সব পদ নিজে হাতে রাঁধলাম । বেশ তৃপ্তি হল । আহা কতদিন পর আমি নিজে হাতে রান্না করছি ।রাত্রিবেলা খেতে বসে আমি রেঁধেছি শুনলে অভিরূপ চমকে যাবে । স্নান করলাম ভাল করে তারপর ভাত বেড়ে খাবার টেবিলে বসতেই ভয়ানক ঘুম এল । আহ এত ক্লান্তি কেন ? এত ঘুমই বা পাচ্ছে কেন ? দু গাল খাবারও কী মুখে তূলতে পারব না ? শেষটায়  ঘুমিয়েই পড়লাম । খাবার টেবিলে মাথা রেখে জমপেশ একটি ঘুম।----------------------------------------------

ক্লাস নাইন এ । হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার অঙ্ক খাতাগুলো নিয়ে এসেছেন সুরেখাদি । এক একজনের নাম ডেকে খাতা হাতে দিচ্ছেন । কাঊকে একটু বকছেন কাঊকে আবার বেশ প্রশংসাও করছেন । ফার্স্ট গার্লের খাতা একেবারে শেষে দেওয়া হবে তাই আমি বেশ একটু নিশ্চিন্ত হয়েই বসে ছিলাম ।

 সকলকে খাতা দিতে দিতে একেবারে শেষের দিকে এসেও গেছে সময়টা ।ক্লাসের সবচে ভাল মেয়েদের খাতা এবার দেওয়া শুরু হবে । সুরেখাদি ডাকলেন --- শিবানী সূত্রধর , খাতা নিয়ে যাও । 

একটি ঘোর কালো দীর্ঘ গড়নের মেয়ে ঊঠে দাঁড়ালো । মাথায় এক বোঝা কোঁকড়া চুল । বোধহয় নিজে ভাল করে বাঁধতে পারেনি তাই চুলগুলো একটু অবিন্যস্ত হয়ে আছে । ঘন কালো জোড়া ভ্রূর মাঝ মধ্যখানে একটি আঁচিল টিপের কাজ করছে । স্কুল ইউনিফর্মে ইস্ত্রির ছাপ নেই ।শার্টটা পরিষ্কার হলেও পুরনো হওয়ার দরুন ময়লাটে হলুদ । সুরেখাদি এমনিতেই একটু টিপটপ থাকতে ভালবাসেন ,ছাত্রীদের ইউনিফর্ম নোংরা বা ইস্ত্রিবিহীন থাকলে উনিই সবচেয়ে বেশি বকাবকি করেন ।আজ শিবানী  নির্ঘাত দিদিমনির কাছে মস্ত বকুনি খাবে । সব মেয়েরা তটস্থ হয়ে উঠল ।কিন্তু সবার আশঙ্কা মিথ্যে করে সুরেখাদি আজ শিবানীকে কিছু বললেন না। শুধু বললেন ----শিবানী সূত্রধর অঙ্কে হায়েশট পেয়েছে । একশোয় একশো ।

ঘণ্টা পড়ে গেল । আমার খাতাটা দেওয়া তখনও বাকি । সুরেখাদি ডাকলেন ---রোল নম্বর ওয়ান শুচিস্মিতা বসু ।নব্বই পেয়েছ । এই নাও পেপার ।

এর পরের পিরিয়ডটা ফিজিক্যাল এডুকেশন । অতএব হিসেব মত আজকের জন্য লেখাপড়ায় ইতি ।পিটি পিরিয়ড শেষ হতেই আমি আর শিবানী হাত ধরাধরি করে বাড়ির পথে রওনা হলাম । আমাদের দুজনেরই বাড়ি কাছে । একই দিকে হাঁটাপথ দুজনেরই । আজ হাটতে হাঁটতে শিবানী হঠাৎ বলল – স্মিতা আজ আমাদের বাড়িতে একবার যাবি ? মা বলছিল তোর কথা ।

---আমার কথা ? কী বলছিলেন রে ?

----বলছিলেন যে শুচিস্মিতা কত ভাল মেয়ে! প্রতিবার ফার্স্ট হয় । এইসব কথা ।

-----বলছিলেন কাকিমা এইসব ?

---হ্যাঁ রে  মা তো তোর সঙ্গে দেখা করবার জন্য ব্যস্ত ।খুব ভালবাসে তোকে । তুই ফার্স্ট হস তো তাই ।

শিবানী একটু বোকা বোকা হাসে ।ওর কালো রঙের গালগুলো চকচক করে ওঠে ।

---যাবি তো ? এই দশ মিনিট বসে চলে আসবি ।

আমি সোল্লাসে ঘাড় কাত করি ---হ্যাঁ রে যাব ।তবে তাড়াতাড়ি চলে আসব কিন্তু ।

শিবানী সামনের একটা জরাজীর্ণ বাড়ির মধ্যে আমায় নিয়ে ঢোকে । নিচের তলাটার একপাশে বিশাল কলতলা । দুজন বয়স্ক পুরুষমানুষ একটা করে নেংটি পরে স্নান করছে । মাঝে মাঝে সরে যাচ্ছে নেঙটির আড়ালটুকুও । সরু ধারায় কর্পোরেশনের কলের জল পড়ছে ।পুরুষগুলির ওপাশে দাঁড়িয়ে এক শীর্ণ মহিলা বালতিতে জল ভরছে ।শিবানী ডেকে উঠল ----মা আমাদের ফার্স্ট গার্ল এসেছে । এই দ্যাখ ।

মহিলা ঝটিতি মুখ ফেরাল ---অমা কি সুন্দর মেয়ে ! যেমন রেজালট তেমনি সুন্দর দেখতে । তোর মত কালপ্যাঁচা নয় ।এস মা আমাদের ঘরে বসবে চল ।

দিনের বেলাও আধো অন্ধকার মাখা বারান্দা পেরিয়ে একেবারে শেষ মাথায় শিবানীদের ঘর ।কিন্তু ঘর কোথায় ? ঘরের মাপ আটফুট বাই দশ ফুটও হবে কি ? একখানা চৌকির ওপরে ও নিচে সাজানো রয়েছে হরেক বাক্স পেঁটরায় গাঁথা শিবানীদের পরিপাটি সংসার । শিবানী হাসিমুখে বলল ---ভাই স্কুলে গেছে । নাহলে ওর সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দিতাম । আমাদের ঘরটা খুব ছোট । পড়াশুনার জায়গা নেই তাই এ বাড়ির অন্য ভাড়াটেদের ঘরে বসে পড়ি আমরা আর বই রাখি ওই দিকে।

শিবানী ঐদিকে কোন একটা ঘুপচি আঁধার নির্দেশ করল । সেখানেই সে তার জ্ঞানভাণ্ডারটি সযত্নে রাখে। আমি ছটফট করে বলি ---এবার যাব আমি। নইলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে ।

---হ্যাঁ মা নিশ্চয়ই যাবে । আহা বাড়ি গিয়েই হয়তো পড়তে বসবে । আহা ফার্স্ট গার্ল বলে কথা ।প্রথমদিন এলে কিছু মুখে দিয়ে যাও মা।

একখানি প্লেটে দুটি ডালের বড়া আর দুটি বাতাসা এগিয়ে দিলেন কাকিমা ।আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে বেরিয়ে আসি। কাকিমা বারান্দার পথটা এগিয়ে দেন ----এত কষ্ট করে পড়াশুনা করে আমার কালপ্যাঁচাগুলো যে ওদের কাছে কিছু চাইতে পারি না । অবস্থা একটু ভাল হলে শিবানীকে বলতাম তোকেও শুচিস্মিতার মত ফার্স্ট হয়ে দেখাতে হবে । আহা ফার্স্ট গার্ল হওয়া কি যে সে কথা ? কত সম্মান !!

গর্বে ফুলে ওঠা কিশোরী বুকখানার টলমলে অহংকার সামলে পথে বেরিয়ে এলাম । আবছা ভেসে এল কাকিমার গলার স্বর  -----ফার্স্ট গার্লের হাত ধরেই তো আমাদের মত ঘরের কালপ্যাঁচাগুলো বাঁচতে শিখবে মা । ওকে একটু দেখো । ওর বন্ধু হয়ে থেকো মা ।

শিবানী  রাস্তায় বেরিয়ে বলল ----আমার বাবার অনেকদিন চাকরি নেই। যেটুকু পয়সাকড়ি এখনো আছে তা দিয়ে কোনমতে চলে যায় ।তুই বোধহয় আর কোনদিন আমাদের বাড়িতে আসবি না , না ?

আমি উত্তর দিতে পারি না । কালো মুখখানিকে আরও কালো দেখায় । ক্রমশ সে মুখ নিষ্প্রভ হয় ---–ঝাপসা হয় ---তারপর মিলিয়ে যায়---------------

আমি ধড়ফড় করে উঠে বসি । আহ সেই কবেকার কথা ! শিবানী সূত্রধর ! স্কুল ছাড়ার পর ওর কোন খবরই পাই নি আমি । খবর নিইও নি অবশ্য ।কিন্তু শিবানীকে এতদিন পর স্বপ্ন দেখলাম কেন কে জানে ! বিকেল চারটে বাজে । দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি । খাওয়ার ইচ্ছেটাও মরে গেছে ।হঠাৎ সেই ভয়টা ফিরে এল !আজ কি তবে সে আসেনি ? অদৃশ্য দুই চক্ষু মেলে সেকি আজ আমাকে অনুসরণ করছে না ? তাহলে সে এতদিন আমাকে ওভাবে অনুসরণ কেন করছিল ?নাকি সবটাই আমার মনের ভুল ? এই দিবা স্বপ্ন দেখা ভুতের ভয় পাওয়া সবই কি কোন মানসিক অসুখের পূর্ব লক্ষণ ?খুব ভয় লাগে । গা শিরশির করে আমার ।

অভিরূপ আজ আবার খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল । অন্যদিন বেশ দেরি হয় ওর । দুজনে একসঙ্গে বসে চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করি ---আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে ?

----আর বোল না ।আমাদের অফিসে এক নতুন গ্রুপ ডি দিদি বদলি হয়ে এসেছিলেন।এই মাস খানেক হবে । খুব ভাল মানুষ । বিয়ে থা করেন নি।মা অনেকদিন মারা গেছেন । বাবা সেরিব্রাল স্ট্রোকে অথর্ব । ভাইটাকে পড়ানো তাকে জীবনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া সব শিবানীদি একা করেছেন ।সংসারের জন্য রোজগার করতে গিয়ে মাধ্যমিকের পর আর পড়তে পারেন নি দিদি ।আজ অফিসের মধ্যেই হুট করে সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন । আমার কাছেই কাজ করতেন দিদি । মনটা তাই খারাপ লাগল খুব । চলে এলাম বাড়ি।

আমি চমকে জিজ্ঞেস করি ---কি নাম বললে ?

---শিবানী সূত্রধর । আগে বউবাজারের ওখানে একটা ভাড়া বাড়িতে কষ্ট করে থাকত । তারপর কিছুদিন হয় সরশুনার ভেতর দিকে ফ্ল্যাট কিনেছেন ভাই বোন মিলে ।তুমি চিনতে নাকি ? বউবাজারে তোমরাও তো আগে থাকতে ।

আমি নিঃশব্দে উঠে আসি ।পড়ার ঘর থেকে বেডরুমে যাওয়ার সেই প্যাসেজটাতে এসে দাঁড়াই ।হয়ত মানুষজন জানতে পারলে আমায় নিয়ে হাসবে বা উন্মাদ বলে দুয়ো দেবে কিন্তু অদৃশ্য সেই আগন্তুককে আমি আজ মনের ভিতর নয় স্মৃতির ভিতর অনুভব করতে পারছি। শিবানীর  জীবনের আসন্ন বিপদের কথা কাকিমা আমাকে বলতে এসেছিলেন ।তাঁর পরম সমীহের মানুষ মেয়ের স্কুলের ফার্স্ট গার্ল কে হয়ত বলতে চেয়েছিলেন --- যদি পার মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রেখ মা ।তোমাদের হাত ধরেই তো ওরা বাঁচবে ।

বুকের মধ্যে কেউ ফিসফিস করে কথা বলে । সামনের দরজাটা ধরে দীর্ঘদেহী কে যেন দাঁড়ায়। অপর একটি শীর্ণ খর্বকায় মূর্তি জমাট বাঁধা বাতাসে ভেসে ওঠে আমারই চোখের সামনে। আমি আর একটুও ভয় পাই না। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃষ্টি প্রসারিত করে নিজের মনের ভেতরটা ভাল করে দেখে নিই। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দীর্ঘ অবয়ব । মুচকি হেসে বলছে ---চলিরে ফার্স্ট গার্ল । তুই ফার্স্ট হস তো তাই আমরা তোকে বড্ড ভালবাসি । দেখা করে গেলাম বন্ধু ।

পিছন থেকে অভিরূপ বার বার ডাকে ---স্মিতা কি হল ? অমন করে কাঁদছ কেন তুমি ?

আমি উত্তর দিতে পারি না । অশ্রুধারায় গলে যাচ্ছে আমার ফার্স্ট গার্লের কাঠামোটা ।

 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.