x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

তনিমা হাজরা

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত

তনিমা হাজরা

রোজ রাতে মদ খেয়ে এসে বউ কে গালাগাল করা আর পেটানো ব্রজেশ্বর এর ডেলি রুটিন।ওর বউ শেফালিও বোধহয় এই স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই তেইশ বছরের জীবনে।

না না, ওরা এসব কথা আমাকে কেউ যেচে এসে বলেনি। আমি ই ওদের উত্তপ্ত কথোপকথন​ শুনে শুনে জেনে গেছি এসব।

আমাদের হাউসিং এর উঁচু পাঁচিলের ওপারে গোবিন্দপুর বস্তি। সেখানে ওদের ঘর। আমার গ্রাউন্ড ফ্লোর এর ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে ওদের কথা সব শোনা যায়। সন্ধ্যেটা একটু​ পরিণতবয়স্ক হয়ে রাতের দিকে এগোলে আমি রান্নাবান্না সেরে​ মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে বারান্দার দোলনায় বসে গান শুনি। তখনো অনিরুদ্ধর অফিস থেকে ফেরার দেরী থাকে,ছেলেমেয়েরা নিজেদের রুমে পড়ে,শ্বাশুড়ীমা নিজের ঘরে বসে টিভি দেখেন।

ব্রজেশ্বর আর শেফালির এই পর্বটা রোজ সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে ঘটে। আমাদের উঁচু সিকিউরড পাঁচিল ভেদ করে ওদের মুখ দেখা যায় না। তবে গলার শব্দে আমি ওদের চিনি। রাস্তায় কোন দিন ওদের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে ওদের আমি চিনতে পারব না। কিন্তু যদি একবার মুখ খোলে ঠিক আইডেন্টিফাই করে ফেলব।

ওদের কথোপকথন থুড়ি উত্তপ্ত চাপানউতোরেই জেনেছি যে শেফালির নাক বোঁচা আর সে কালো আর চিমসে। কিন্তু ব্রজেশ্বর বেশ ফর্সা আর নাদুসনুদুস।

রেফারেন্স নং ১ √ " ইস ভারি যে সাদা নং আর গতরের গব্ব তা সেটা কি করি টিঁকি আছ্যে শুনি। হালার পুতের নোজকার এত খাদ্দ্যির বাহার কে আঁধে কও তো,এই শুটকি, বুঁচি, কালি শ্যাফালিমাগী। ঝাও না ঘুরি দেকে এসো গেয়ি দুনিয়েটা একবার,​ ওজ ওজ মাতালের ঠ্যাঙানি খেয়ি,বমি সাফ করি কে আবার কাঁসি পেতি পঞ্চবেন্নন বেড়ি পিন্ডি গিলতি ডাকে সোআগ করি।"

ব্রজেশ্বরের এটা প্রথম পক্ষ কিন্তু শেফালির দ্বিতীয় বিয়ে।

রেফারেন্স​ নং ২ √ " ঝা শালি, তোর বোঁচা নাকে মুড়োঝাটা। আমায় দিব্যু বোকাসোকা পেয়ে হাত করেছিলি কাঁদুনি গেয়ে। না হলে আমার বাপের চারণে বিশবিঘে ধানী জমি, পুকুর সব ছেড়ে ত্যাজ্যপুত্র হলাম তোর জন্য। এট্টা ছেলেপিলে হলো নি মুয়ে আগুন দিতে। বাঁজা মাগী,

সোআগ কত, কে কয়েচে তোকে বাবুবাড়ি কাজ করে সংসার আগলাতে? ভাত বেড়ে ডাকতে? সারাদিন লোকাল টেরেনে​ হজমের আমলকী, নেবু নজেস এট্টাও ভালো বিককিরি হয় না কো। বাবুরা সব সেয়ানা হয়ে গেচে আজকাল।বড় দোকান থেকে বেশিদামে কিনি খাবে তবু আমার কাছে নেবে নি। আমাদের বংশে কেউ কুনোদিন বউ এর রোজগারে খায়নি কো, তুই শালি সোআগ দেকিয়ে আমার ধম্ম নিলি। এত লোকের গলায় দড়ি জোটে তোর জোটে না?"

অত: পর, " মর, মর ধ্বনি সহযোগে প্রহারের উদ্যোগ "। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্ত শরীর আর তার সাথে পেটে বাংলার জল নিয়ে তার আর বেশি পৌরুষ জাহির করা হয় না। উত্তেজনায় ওয়াক ওয়াক করে সবটুকু তুলে দিয়ে নেতিয়ে পড়ে।

কিছুক্ষন চুপচাপ। তারপর ঝাঁটার শব্দ আর বেঙ্গল ক্যামিক্যাল এর ফিনাইলের গন্ধ ভেসে আসে। বুঝলাম নাটকের এবার ইন্টারভ্যাল।

দ্বিতীয়ার্ধে মানভঞ্জন পালা আর ব্রজেশ্বর এর ক্ষমাপ্রার্থনান্তে দুজনের ভক্ষন। বোধ হয় ওরা মাঝখানের দেওয়াল টা ভেঙে ভাব করে নিলো এবার।​ তবে এসব ই আমার ক ল্পনা করে নেওয়া কারণ তারপর মৃদু শব্দেরা আর এপারে আসে না।​

তবে নিজের কল্পনায় যুক্তি পাই একটা কারণ পরদিন​ সকালে উঠে আমি যখন ছেলেমেয়েদের মরণিং স্কুলের জন্য রেডি করি তখন ব্রজেশ্বর এর ডাক শুনি খুব জোরে জোরে।

রেফারেন্স​ নং​ √ ৩ কই গো শ্যামসোহাগি চাঁদবদনী, বিছনা ছেড়ে উঠি পড় দিকি চা বানিয়েছি খাবে এসো সখী।​

রাত্রে নটা থেকে সাড়ে নটায় আমার সদরে বেল বাজে।​ আমার ব্রজেশ্বর মানে অনিরুদ্ধ​ ঘরে ফেরে। ব্যালকণি থেকে তাড়াতাড়ি বেডরুম, ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ছুটে আসি। ব্যালকনিতে থাকার জন্য একটু দেরী হয়ে যায় দরজা খুলতে, " ওয়ার্থলেস একেবারে, কি কর কি সারাদিন,এত দেরী কেন দরজা খুলতে? কোনো কাজ যদি ঠিকঠাক টাইমলি হয় তোমাকে দিয়ে"। ও আসলে ভীষণ পারফেকশানিষ্ট। খুব টাইম আর জব কনসাস। আমিই একটু ঢিলেঢালা, ভাবুক, ভুলোমন। ওর মতো নিঁখুত সব পারি না। এটাই শুনে আসছি আজ আঠেরো বছর ধরে। আগে প্রতিবাদ​ করতাম।​ আজকাল কেমন যেন নিজের অজান্তেই ভাবছি হতেও পারে। আমার নিজের ওপরেই আস্থাটা কমে যাচ্ছে আজকাল।

তাই নিজের সারাদিনের পর​ ফিরে এই মধুর সম্ভাষণ চুপচাপ​ শুনি। হাত থেকে এ্যাটাচিটা নিয়ে কাঁচের গ্লাসে জল এগিয়ে দিই। চেক করে নিই তাড়াতাড়ি বাথরুমে টাওয়েল, গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট​ ঠিকঠাক রেখেছি কিনা। সে একটু জিরিয়ে ফ্রেশ হতে গেলে​ টেবিল সাজাই।বাথরুম থেকে ফিরে সে আবার কিছু জরুরী অফিসিয়াল ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ছেলেমেয়ে, মাকে খেতে ডাকি। ওদের খেতে দিয়ে বিছানাগুলো রেডি করে ফেলি।

তারপর অপেক্ষা করি কখন ফোন কলগুলো শেষ হবে। অনিরুদ্ধর সব কিছুই গরম খাওয়ার বাতিক। তাই তার ফোন করা শেষ​ হলে সব কিছু আবার মাইক্রোওয়েভে দ্বিতীয়বার গরম করে টেবিলে রাখি। প্লেট সাজিয়ে চটপট তিনটে গরম রুটি বানিয়ে ফেলি। সে খেতে খেতে ট্যাবে ফেসবুক আর হোয়াটস এ্যাপের নোটিফিকেশন চেক করে বাঁ হাতে। সারাদিনের অফিসিয়াল কাজের এত চাপের পর তার ও তো বন্ধু বান্ধবদের সাথে ভারচুয়াল ওয়ার্ল্ডএ একটু রিলাক্স করা দরকার।​

আজ ম্যাজেন্টা রঙের বাঁধনি কুর্তিটা পরেছিলাম,একটু পারফিউম ও লাগিয়েছিলাম গা ধুয়ে। আজ একটা কবিতা লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম খেতেখেতে শোনাব ওকে। ওর খাওয়া হ য়ে যায়। আমি অত তাড়াতাড়ি খেতে পারি না।​

"কাল ট্যুর আছে। সকালে​ চা - ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ডেকো আমায়। সাড়ে ছটায় অফিসের গাড়ি আসবে"।​

আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে​ খেতে থাকি। ও শুতে চলে যায়। সব কাজ সেরে দরজার গ্রিলে তালা দিয়ে, সব আলো নিভিয়ে আমি যখন শুতে আসি তখন ও ঘুমিয়ে পড়েছে অঘোরে। আমি পাশে শুয়ে বেড সাইড আলোটা নিভিয়ে দিই।

আমাদের ও হয় কথা কাটাকাটি, চাপানউতোর। কিন্তু সেটা খুব পরিশীলিত শব্দে আর রুচিকর ভঙ্গিতে যার​ দাগ বেড রুমের বাইরে যায় না কোনদিন।অনিরুদ্ধ তো আর ব্রজেশ্বর এর মতো​ বাওয়ালি শেখেনি। ও কলকাতার নামী স্কুলে আর নামী কলেজ, ইউনিভারসিটি থেকে পাশ করা ভাল বাড়ির ছেলে।​ সে মদ খেলে অফিশিয়াল পার্টিতে খায় সামান্য, তবে মাতাল হয় না কখনোই। তাই তার ভেতরের দুর্গন্ধ পরিস্কার করতে আমার ফিনাইল ও লাগে না। সে​ পাড়া জানিয়ে আমার গায়ে হাত ও তোলে না,যতটুকু বলার তীব্র গুটিকয় বাছাই শব্দে বন্দুকে সাইলেন্সার লাগিয়ে নিশানায় তাক করে।​ তাই আমাদের ভেতরকার শীতল দেওয়াল টা অটুটই থেকে যায় ভেঙ্গে পড়েনা কোন দিন ব্রজেশ্বর আর শেফালির মতো।

আমার ব্রজেশ্বর ভারি বড় পদস্থ চাকুরে, সে তো আর স্ত্রীর পয়সায় খায় না, তাই কোনোদিন​ সকালে চা বানিয়ে ডাকেও না, "কই গো শ্যামসোআগি,চাঁদ বদনী......

​সবাই যার যার মতো বেরিয়ে গেলে​ শ্বাশুড়িমা ও স্নান পূজোর দিকে যান।আমি কাজকর্ম সেরে দ্বিতীয় রাউন্ডের চা টা নিয়ে আবার দোলনায় এসে বসি। নিজের অজান্তেই শেফালিকে কখন​ একটু হিংসে করে ফেলি।।।।।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.