x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

■ সুমনা সাহা | অমৃতসদনে চল যাই

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | | |

অমৃতসদনে চল যাই

■ পর্ব- ১

উৎসবের শহরে

ছোট শহরখানা উপচে পড়ছে ভীড়ে। নানা দিক থেকে কাতারে কাতারে মানুষ এসেছে উৎসবে মেতে উঠতে। ‘পাসওভার’ আনন্দের উৎসব। বসন্ত উদযাপনের উৎসব। ইহুদীদের ‘সাবাথ’ উৎসবের সমাপ্তিসূচক অঙ্গ এ উৎসব। হাসি-গান-মিলন-ভোজ সব মিলিয়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে জেরুজালেম। আনন্দ এবারে যেন দ্বিগুন আরও একটি কারণে। সে কারণ শহরে বিশেষ একটি মানুষের আগমন। সুদর্শন সেই যুবাপুরুষকে দেখতেই শহরে শতেক লোকের ভীড়। ভীড়ের মাঝে দূর থেকে দীর্ঘদেহী ঐ যুবক—যার পোশাকের প্রান্ত সেলাইবিহীন—অবিন্যস্ত কেশভার, মায়াময় চোখদুটিতে কোন সুদূরের ছায়া, হাতে দীর্ঘ যষ্টি—ওর নাম যীশু, ওকেই এক পলক দেখার তরে উতলা মানুষ। লোকে বলাবলি করছে, ও ডাকলে নাকি মরা মানুষ উঠে ওর পিছু পিছু চলতে শুরু করে, অন্ধ ফিরে পায় দৃষ্টি! এই তো কয়েকদিন আগেই একটা নুলো মানুষকে ও নাকি বলেছিল, “তুমি সকলের সামনে এসে দাঁড়াও, এই বাড়িয়ে দিলাম আমার হাত, তোমার হাত বাড়াও, ধরো আমার হাত!” আশ্চর্য হয়ে সবাই দেখেছে, প্রকাশ্য দিনের আলোয়, সহস্র মানুষের সামনে ঐ নুলো লোকটির অসম্পূর্ণ হাতটি সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে গেল। এহেন মানুষটিকে দেখার কৌতূহল তো স্বাভাবিক। এমন সব অলৌকিক কাণ্ডকারখানা তুড়ি মেরে অবলীলাক্রমে ঘটিয়ে ফেললেও মানুষটি ভারি সহজ, সরল, অমায়িক। একখানা ছোটখাট গাধার পিঠে চড়ে নেহাত সাদামাটা পোশাকে সে এসেছে। তার ভক্তরা ‘হোশান্না’ ‘হোশান্না’ বলে চিৎকার করে উঠছে থেকে থেকে, তার মানে ‘স্বর্গ থেকে স্বয়ং ঈশ্বরপুত্র এসেছেন! প্রভুর নামে যিনি এসেছেন, তিনি ধন্য!’ এই বলে উন্মত্তের মতো মানুষগুলো পাতাশুদ্ধ গাছের ডাল, গায়ের জামা খুলে পথের উপর বিছিয়ে দিচ্ছে যাতে এই ঈশ্বরতুল্য মানুষটি তার উপর পা ফেলে হেঁটে আসেন। সল সব দেখে ভীড়ের থেকে একটু আলগোছ হয়ে। ভাবে, মানুষগুলোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তাঁর তরুণ যুক্তিবাদী মন একথা মানতে চায় না। তবুও, গালিলি থেকে আগত এই নাজারেথের যীশু মন্দিরে কি বক্তৃতা দেবে, তা শুনতে সাধ হয়। 

সলের বোনের বিয়ে হয়েছে জেরুজালেমে। তরুণ সল টারসাস থেকে জেরুজালেমে এসেছে  উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। স্বনামধন্য রাব্বি গামালিয়েল-এর তত্ত্ববধানে চলছে তাঁর পড়াশোনা। যদিও রাব্বি হওয়ার কোনও বাসনাই তার নেই। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও বাবা যত্ন করে তাকে চামড়া দিয়ে তাঁবু বানাবার কৌশল শিখিয়েছেন। কোন্ বিদ্যা কখন কাজে লাগে সে তো বলা যায় না। তাদের পূর্বপুরুষরা ছিল বাইজানটাইন উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষ। ঐ একই বংশোদ্ভূত ইস্রায়েলের প্রথম রাজা সল। তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়েই বাবা ছেলের নাম সল রেখেছেন। ঠাকুর-দেবতায় সলের বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে মন্দিরের ধর্মাচরণে তার এতটুকুও আগ্রহ নেই। পুরোহিতরা মন্দিরে বসে কেবল মানুষের পাপের গুণতি করছে, কার পাপ কত বড় তার উপর হিসেব কষে তার প্রায়শ্চিত্তের ব্যয়ভার স্থির করছে, বলির জন্য ভেড়া আর ষাঁড় বিক্রি করছে, কিম্বা গরীব লোকের পাপস্খালনের বিধান হিসেবে খাঁচা খুলে পায়রা উড়িয়ে দেওয়ার জন্য পায়রার খাঁচা নিয়ে বসে আছে। এসব দেখেশুনে সলের ঘেন্না ধরে গেছে। 

কিন্তু এখন সলের নজর শহরে আসা ঐ নতুন মানুষটার দিকে। বিশেষ কাজে তাকে দামাস্কাস যেতে হবে। কিন্তু সে যাওয়াটা পিছিয়ে দেবে ভাবে। মানুষটার মধ্যে একটা যাদু আছে, সলকে প্রবল ভাবে আকৃষ্ট করছে ওর চলাফেরা, ওর ব্যক্তিত্ব, ওর কথা বলার ভঙ্গি আর ওর ঐ তেজী ভাব! লোকটা তো সোজা মন্দিরের দিকেই চলেছে! ভীড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে কিছুটা দূর থেকে সল অনুসরণ করতে থাকে যীশু ও তাঁর অনুগামীদের। 

রাজা হেরোদ মন্দির নির্মাণ আরম্ভ করেছিলেন আজ থেকে ৪৬ বছর আগে। সলের তখন জন্মও হয়নি। সেই নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ হয়নি আজও। মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো এই মন্দির জেরুজালেমের গর্ব। মন্দিরের ভিতরের প্রাঙ্গন প্রায় ১৭০ হাজার বর্গফুট এলাকা নিয়ে, সেখানে অনায়াসে ধরে যাবে ১২ খানা সসার খেলার মাঠ! মন্দিরের ভিতরে রোদ-বৃষ্টি না আসে, তার জন্য বাইরের দেওয়ালে ছাদওয়ালা দীর্ঘ পোর্টিকো, ওখানেই টেবিল পেতে বসে থাকে সারি সারি ব্যাবসায়ীর দল। হ্যাঁ, ঐ পুরোহিতদের সল ব্যবসায়ীই মনে করে। ওদের নৈতিক মান অত্যন্ত নিম্ন। মন্দিরের মধ্যে অবসর সময়ে ওরা জুয়া পর্যন্ত খেলে। 

নাজারেথের যীশু মন্দিরে ঢুকে সোজা চলে গেল যেখানে ভেড়া আর ষাঁড় আর পায়রার বেচাকেনা চলছিল। সটান উলটে দিল তাদের টেবিলগুলো। টাকা খুচরো করে দেওয়ার জন্য যারা ডালা সাজিয়ে বসেছিল, তাদের ডালা উলটে দিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিল। ওরা রেগে গিয়ে বলল, “তুমি কে? এসব কেন করছ?” যীশু, সেই তরুণ, বছর ত্রিশ-বত্রিশ বয়স হবে তার, দৃপ্ত স্বরে বলল, “শাস্ত্রে লেখা আছে, ঈশ্বরের গৃহ হবে প্রার্থনার স্থান। তোমরা তার কী হাল করেছ, বল? দস্যুদের আস্তানা করে তুলেছ পবিত্র মন্দিরকে?” 

মন্দির চত্বরের মধ্যে অনেক অন্ধ ও খোঁড়া লোক তখন যীশুর কাছে ভীড় করে এল, তিনি স্পর্শ করে তাদের সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিলেন। ছোট পুরোহিতরা ছুটে গিয়ে প্রধান যাজককে ডেকে আনলেন। তাঁরা সকলে দেখতে লাগলেন, যীশুর অলৌকিক কাণ্ডকারখানা। মন্দিরের মধ্যে ছোট ছেলেমেয়ের দল চিৎকার করে ছোটাছুটি করতে লাগল, “দায়ুদের ছেলের জয় হোক! জয় হোক!” 

যাজকরা ভীষণ রেগে উঠলেন। তাঁরা যীশুকে বললেন, “ওরা যা বলছে, শুনতে পাচ্ছ সেসব?”

যীশু শান্ত। জবাব দিলেন, “হ্যাঁ পাচ্ছি। শাস্ত্রে পড়োনি কি ছোট ছেলেমেয়েরা ও শিশুরা অকপটে মানুষের প্রশংসা করতে জানে!”

যাজকরা গুম হয়ে রইলো। যীশু মন্দির ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন। 

বুড়ো পল এসব ভাবছিল বসে। তাঁর ছোটখাট শরীরটা কুঁকড়ে বয়সের তুলনায় আরও বৃদ্ধ দেখাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরটায় নিজের হাতের চেটো ভাল করে দেখা যায় না। এক কোণে উটের চর্বির তেলের প্রদীপ জ্বলছে। তারই কম্পমান শিখার ম্লান আলোকে পাথরের স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালে পলের ৬০ বছরের পোড় খাওয়া শরীরের ছায়া পড়েছে। এখানে বাইরের পৃথিবীর কোনও শব্দও পৌঁছায় না। দিন রাত্রির তফাৎ বোঝা যায় না। কেবল হিমশীতল এক প্রতীক্ষা ছাড়া নির্বান্ধব পলের একমাত্র আনন্দ স্মৃতির আলোয় অতীতের দিনগুলিকে দেখা। একটা অবরুদ্ধ শ্বাস মুক্তি পেয়ে বদ্ধ ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। 

হঠাৎ লোহার গেট খোলার একটা শব্দ হয়। কে আসতে পারে এসময়, এমন ভাবনায় পলের মনোজগৎ আলোড়িত হয়ে ওঠে। সারাদিনে একবার ঐ লোহার দরজা খোলে, এক টুকরো রুটি আর জল দিয়ে যায় প্রহরী। আজ সে পর্ব সমাপ্ত হয়েছে অনেকক্ষণ। তবে কি কোন পুরনো বন্ধু এসেছে? আসে কেউ কেউ দেখাসাক্ষাৎ করতে। এটুকু ছাড় দেওয়া হয়েছে। কেউ চাইলে দেখা করতে আসতে পারে, কিম্বা তাঁর পরিচর্যায় কিছু দিয়ে যেতে পারে। তবে কি তেমনই কিছু? তবে পল ইদানীং আর কারো সঙ্গে দেখা করতে চায় না। কারো সমস্যার সমাধান বাৎলাতেও তাঁর আর উৎসাহ নেই। কি হবে ওসবে? তাঁর কাজ শেষ হয়েছে, এ অনুভব তাঁর হয়েছে। যতদূর সম্ভব প্রভুর প্রিয় কাজ করার চেষ্টা করেছেন, সৎ ও নৈতিক জীবনযাপনে কোনও ফাঁক রাখেননি। তাঁর কোনও আশা নেই, কারো প্রতি ক্ষোভ নেই, কোনও অপূর্ণ ইচ্ছা নেই। তিনি প্রস্তুত। চরমতম দণ্ড নিতেও প্রস্তুত। কেবল একটাই কথা থেকে থেকে মনে ওঠে আজকাল। এই বিরাট জীবনে দেখলেন, ঘুরলেন তো কম নয়। বিচিত্র অভিজ্ঞতার ও স্মৃতির ডালি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এগুলো রেখে যেতে পারলে হয়তো প্রভুর কাজে লাগত। কিন্তু সেও প্রভুর ইচ্ছা। 

দু’জোড়া পায়ের শব্দ ক্রমেই নিকটবর্তী হচ্ছে। একটি তাঁর চেনা, প্রধান কারারক্ষী মরিশাস গ্যালাস। আর দ্বিতীয়টি? সে যে আরও বেশী চেনা! প্রদীপের আবছা আলোয় আগন্তুকের অস্পষ্ট চেহারাও স্পষ্ট চিনে নিতে ভুল হয় না পলের, হাতে পায়ে শৃঙ্খল নিয়ে আবেগে উঠে দাঁড়ায় পল, “লুক? তুমি? অবশেষে এলে বন্ধু? আমি জানতাম, কেউ না থাকলেও তুমি পাশে থাকবেই!” ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে পলের খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফে ভরা লালচে গাল বেয়ে। 

(ক্রমশ)   

[স্বীকারোক্তি—আমি ইতিহাস-গবেষক নই। যীশুর ক্রুসিফিকেশন ও তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদদের যন্ত্রণাময় জীবন মনকে দারুণ আলোড়িত করে। তাই এ লেখা তথ্য নির্ভর হলেও সাল-তারিখ ও ঐতিহাসিক খুঁটিনাটির নির্ভুল বিবরণের থেকেও মহৎ উদ্দেশ্যে বিরাট ত্যাগ-তিতিক্ষার কথাই গুরুত্ব পেয়েছে। তথ্যসূত্র অন্তিম পর্বে থাকবে]  


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.