x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

পাঠ প্রতিক্রিয়া- জয়া চৌধুরী

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ | |

■ বুখারি/ শ্যামল ভট্টাচার্য

■ বুখারি/ শ্যামল ভট্টাচার্য
পাঠ প্রতিক্রিয়া- জয়া চৌধুরী

তুষার শব্দটি কীসের অনুরণন জাগায় আমাদের মনে? মূলতঃ রোমান্টিকতা। ছোটবেলায় তুষার বলতেই হিমালয় বুঝতাম। সেই মদ মহেশ্বর কেদারনাথ চটিতে রাত যাপনের উমাপ্রসাদের পথযাত্রা। তীর্থধর্ম পেরিয়ে তুষার এখন উপভোগের স্থান নিয়েছে বহুদিন। যে কারণে এখন বাঙালি ফাঁক পেলেই উড়ে যেতে চায় সিমলা কুলু মানালি লেহ্‌ ... এমনকী মধুচন্দ্রিমাতেও। শ্যামল ভট্টাচার্য রচিত উপন্যাস বুখারি পড়ে উঠে দেখছি তুষার হয়ে উঠেছে দুঃখী, গোপন রক্তপাতে বিবর্ণ শুভ্র। আদ্যন্ত যুদ্ধ বিরোধী এই মহৎ উপন্যাসটি পাঠকের কাছে একটি নির্মম আবিষ্কার যার ধাক্কায় চোখের পর্দা সরে যায় চিরকালের মত।

যারা জানেন তারা জানেন, আর আমার মত যারা নীরেট তাদের বলি বুখারি হল হিমবাহে উষ্ণ থাকার জন্য আগুনের উৎস। ব্যাপারটা লঘু করে বোঝাতে বলি কলকাতার শীতে পথে এক জায়গায় খড়কুটো জ্বালিয়ে আঁচ পোয়াতে দেখা যায় শীতে জড়সড় পথ মানুষদের, বুখারি হল সেইরকম এক ধরনের অস্থায়ী ফায়ারপ্লেস। 

আজকাল ভারতের মানুষ সরাসরি দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে যুযুধান থাকে সব সময়। খবরের কাগজে, ফেসবুকে গালি পাল্টা গালির শব্দ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলতে থাকে নিরন্তর, যেভাবে যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চলে সে সিরিয়া হোক কিংবা সিয়াচিন শিশুরা খেলাধুলো করে কার্তুজ, বন্দুক, শত্রুপক্ষ ইত্যাদি শব্দের সমাহারে। সাধারণ নাগরিকেরা এখন সৈনিকদের বন্দনায় নিরত। সিনেমা তৈরী হয় বীরত্বের ঢক্কানিনাদে, টিভির পর্দায় নেতা ভাষণ দেন সীমান্তে সেনা লড়ছে ... ইত্যাদি। পাড়ার নিতাইয়ের চায়ের দোকানে নরক গুলজার হয়ে ওঠে গরম দুধ-চায়ের গ্লাস নিয়ে সেখানে পাকিস্তান বোফর্স চীন রাফায়েল নানান রকম শব্দ বারুদের মতই ছিটকে ছিটকে উঠতে থাকে। পুরো যুদ্ধ না হলেও নকল যুদ্ধে কোন পক্ষ কত ক্ষতিগ্রস্থ হল সে পরিসংখ্যান দেখিয়ে নির্বাচন করা হয়। যুদ্ধের সপক্ষে যারা সেখানেও জয়লাভ করে সেই রাজনীতি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দেখছি চা সিগারেট খেতে খেতে তর্ক নয় উদ্দাম উল্লাস করছে যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে খতম করার রিপোর্ট শুনিয়ে। বেশ একটা দেশপ্রেমের বাতাস বয়ে যাচ্ছে চারদিকে। 

পৃথিবীর উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেন সীমান্তে লড়াই করা এক সৈনিকের উপন্যাস- বুখারির ছত্রে ছত্রে বিধৃত ‘সৈনিক’ শব্দটির প্রকৃত ব্যঞ্জনা কী। যা আমাদের সিভিল সোসাইটি ভাসা ভাসা আন্দাজ করে, সাধারণ নাগরিক দেবত্বে তুলে নিয়ে পূজা করে, নেতারা হাত পা ছুঁড়ে বক্তৃতায় উদ্ধৃত করে ভোট বাক্স গুছায় অথচ এক বর্ণও হৃদয়ঙ্গম করে না। 

একজন নিচুতলার সৈনিকের গল্প আসলে চন্ডাল জীবনের গল্প যা নিয়ে কোন বলিউডি ‘উরি’ বা ‘লক্ষ্য’ বা ‘বর্ডার’ তৈরী হয় না। সুঠাম যুবক সৈনিক যেখানে প্রকৃতির বিরূপতার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে বুড়িয়ে যায় কয়েক মাসেই। যে জীবন আসলেই শুধু ত্যাগ, ধৈর্য, হতাশা আর ক্লিন্ন জীবনের রোজনামচা।

ভারতের উত্তরের সিয়াচেন অঞ্চলটি মরুভূমি, বরফের মরুভূমি। এই যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে লেখক আশ্চর্য হন পদে পদে। গাঢ় বন্ধুরতা সেখানে কাক দেখেও পরম উল্লসিত হয় কেননা আর কোন পাখিকেই যে দেখা যায় না। এক টুকরো সবুজ নেই অথচ কাক থাকে কিভাবে! আর সে কাকের ঠোঁট হলুদ। কালো কাকের হলদে ঠোঁট এক অবাক আবিষ্কার বাঙালি সৈনিকের। লেহ অঞ্চলের যুবতী নারী দেখে জয়সলমীরের তরুণীকে মনে করেন। মরু ও মেরু একসঙ্গে মিলিয়ে দেয় ভাবনা। সে অঞ্চলের সৈনিক সিয়াচেনে বদলির অর্ডার এলে বলে সফেদ পানি-মে পোস্টিং। আন্দামানে পোস্টিং এলে যেমন কালাপানি বলে ঠিক সেরকম। সিয়াচেনে নুব্রা ও শীয়োক নদীর পাড়ে সে কঠোর হিমের হিংস্রতা কল্পনাও করা যায় না। যেখানে বছরের দুই তৃতীয়াংশ সময় তাপমান মাইনাস ৪০-৪৫ ডিগ্রি থাকে অথচ সেখানেই পাথরের খাঁজে তাপমান মাইনাস ২০০ ডিগ্রি থাকে। নীল রঙের সে ধোঁয়া ফাটল থেকে উঠতে দেখলে আতঙ্কে বুক হিম হয়ে যায় পোড় খাওয়া সৈনিক অলোক মিত্রর।  ফাটলের দেয়ালে পেরেক পুঁতে এক পা এক পা করে এগিয়ে মৃত সৈনিক বা পড়ে খাঁজে আটকে যাওয়া সহযোদ্ধা আর এক সৈনিককে তুলে আনার জন্য নিদারুণ শক্তি উজাড় করে মরে যে সৈনিক তাকেই টিভির পর্দায় নেতারা ভাষণ দিয়ে বলে – দেশ কে লিয়ে শহীদ হুয়া।  

সাধারণ সৈনিক ধর্মের জন্য কৃচ্ছ্রসাধন ভাবে না, কর্তৃপক্ষের আদেশই তাঁর কাছে ধর্ম পালন। এ কোন লিঙ্গের মাথায় দুধ ঢালার জন্য এক তীর্থযাত্রা নয়, এ স্রেফ আদেশ পালন। তিক্ত সৈনিক ভাবে এ শুধু কিছু লোককে আনন্দ দেবার জন্য। যখন পৃথিবীর রাজনীতির মাথারা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ঠিক করে দেয় কোথায় যুদ্ধ চলবে, কতদিন চলবে এবং সেখান থেকে কোথায় সরানো হবে যুদ্ধটা। শুধু যুদ্ধ জিনিষটা চলবেই। সৈনিককে তখন ভাবতে হয় ভোরে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারবে কিভাবে! কারণ নিঃশ্বাস যেখানে মুহূর্তে জমাট বেঁধে যায় পাহাড়ে গায়ে পায়খানা করার সামান্য সময়টুকুতে অসাড় হয়ে যায় নিতম্ব। দিনের পর দিন মলত্যাগ অসম্পূর্ণ থাকে, অম্বল হয়। যেখানে কঠোর শীতে রক্ত জমাট বাঁধে  কথায় কথায়। একটা হাঁচি দিলে মুহূর্তে ধমনী বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং যায়ও। তখন গলায় গরম জল ঢেলে বুকে ম্যাসাজ করে চেতনা আনতে হয়। যত সৈনিক শত্রুর গোলায় মারা যায় তাঁর চেয়ে কম মরে না হাই অল্টিচ্যুড পালমোনারি এডেমা বা হ্যাপো রোগে। 

উপন্যাসটির পরতে পরতে মিশে আছে জীবনের বর্ণনা। প্রকৃতি এখানে একটি চরিত্র হিসাবে কাজ করে। কেন পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলির প্ররোচনায় জঙ্গল সাফ করে ইউক্যালিপটাসের ঝাড় বসানো হয়, যাতে কোন সরকার বিরোধী শক্তি গাছের ফাঁকে লুকিয়ে লড়াই করতে না পারে। কোন সরকারই তার চালিয়ে যাওয়া স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পছন্দ করে না, সে জায়গায় সুপার পাওয়ার বা নিজের দেশের পাওয়ার সকলের দৃষ্টিভঙ্গি এক। আবার এখানে বাস করতে গেলে কারাকোরামের গা থেকে আসা নুব্রা বা শিয়োক নদীর জমাট বাঁধা বরফ না গলিয়ে সৈনিকের পানীয় জল পাওয়াও সম্ভব নয় সে বর্ণনা পড়ি। কাঁচা বরফ ও পাকা বরফের কার্যকারিতা বুঝে বুঝে সৈনিক এস্কিমো হয়ে যেতে থাকে। শুধু থাকবার জন্য ইগলুর পরিবর্তে বিলেট বানায় প্যারাশুটের কাপড় বা আর কিছু দিয়ে।    

সৈনিকের জীবন যা সিনেমায় বা সরকারী প্রচারে দেখা যায় তা নয় বরং তার চেয়ে ঢের বেশি কঠোর, নির্জন এবং আসলে লক্ষ্যহীন। সৈনিক যখন রাষ্ট্রের কাজে সীমান্তে লড়াই করে তখন হয়ত স্থানীয় রাজনীতির প্রকোপে নিজের জমিটি বেদখল হয়ে যায়। ছুটি মেলে না বলে নিজের জিনিষই বাঁচাতে পারে না। এ নিদারুণ একঘেয়েমিতে কত সৈনিক পাগল হয়ে যায় তার হিসেব সিনেমাওয়ালা বা নেতা কেউই রাখে না। 

যুদ্ধ আসলেই কোন রূপকথা নয়। সেখানে প্রেমও হারিয়ে যায় কখনও। বাড়িতে অপেক্ষমান স্ত্রী ঠকাতে পারে বা একটু সুযোগ পেলে নারীদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কোন সৈনিক...  আবার ভয়ংকর শীতে জমে যাওয়া থেকে বাঁচার তাগিদে সমকামে ব্যস্ত হতে হয় কখনও।  হিম শীতল পরিবেশে থাকতে থাকতে ধ্বজভঙ্গের শিকার না হয়ে গেলে, স্বপ্নদোষ বা স্বমৈথুনের আঠালো পোশাকে থেকে যেতে হয় সৈনিককে সে ভয়াবহ ঠাণ্ডায়। স্নান করা দূরস্ত। গায়ে গন্ধ হতে হতে মনে হয় কাঁচা নর্দমায় গা ঘুলিয়ে ওঠা গন্ধ হার মানবে। স্বজনহীন, এমনকী চিঠিও নিয়মিত আসা সম্ভব নয় স্থানিক দুর্গমতার জন্যই। এক একটা দিন এক এক সপ্তাহের মত নির্জন ও দীর্ঘ। আমরা যারা টিভি সিরিয়াল, মিছিল, শ্লোগানের ভেতরে জীবনের তাপ সেঁকে নিতে নিতে বাঁচি তাদের পক্ষে ন্যুনতম ধারণা করা সম্ভব নয় অত কঠোর বরফ, নির্জনতা, রক্ত, বোমা-বারুদের ভেতরে সৈনিকের মন ও মনুষ্যত্ব এবং পৌরুষ জাগিয়ে রাখা কতটা কঠিন।

লেখকের সংবেদনশীল মন সে বরফের মন্দিরেও শ্রেণীভেদ দেখে তিক্ত হয়। দেবস্থানেও মানুষ বিভেদ তৈরী করে রাখে কার স্বার্থে? দেবতার স্বার্থে নিশ্চয়ই নয়। তাঁবুর ভেতরে দু কেজি আড়াই কেজির ইঁদুরের উদ্দাম দৌড়াদৌড়ি স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকে ঘুমিয়েও সৈনিককে অস্থির করে রাখে। এর ভেতরেই ইঁদুর বেড়ালের লড়াই দেখিয়ে হাসির ছোঁয়া লাগান লেখক। যা পড়ে অজান্তে ভারী হয় বুকের শ্বাস। যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ সৈনিকের জীবন এতটাই কঠোরতা, নোংরা, ক্লেদে ভরা থাকে আমরা তার সমাধির ওপরে রোম্যান্স গড়ি। আর তখন বেদী থেকে ভেসে আসে নির্বিকার নেতার কন্ঠ- 

সীমান্ত মে হমারা জওয়ান লড় রহে হ্যাঁয়...   



Comments
1 Comments

1 টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.