x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, নভেম্বর ৩০, ২০২০

■ স্বপন পাল | অ্যাপোক্যালিপস ও মানবিক মুখ

sobdermichil | নভেম্বর ৩০, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত
■ স্বপন পাল | অ্যাপোক্যালিপস ও মানবিক মুখ

অনেককে বলতে শুনেছি, শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর। মজা করেই বলেন হয়তো গাম্ভীর্যটুকু উপেক্ষা করে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবতে ও নির্ণয় করতে বসে থাকেননি। কি ভাবে, পৃথিবী নামের যে গ্রহটাকে আমরা চিনি, তার উদ্ভব হলো, কি ভাবে ঘটলো সেখানে প্রাণের সঞ্চার আর ক্রমান্বয়ে সেই প্রাণের বাহক জীবের দেহে ঘটতে থাকলো বিবর্তন যেখান থেকে যোগ্যতমের উদ্বর্তন ও শেষ অবধি
মানব প্রজাতির আবির্ভাব, এ পর্যন্ত প্রায় সব ধাপগুলিই সাফল্যের সাথে যুক্তি ও তথ্য প্রমাণাদির সাহায্যে খাপে খাপে মিলিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন শাখার গবেষক ও বিজ্ঞানীরা। এখনও কত অজানা তথ্য প্রমাণের অপেক্ষায় যুক্তির দরজায় মাথা ঠুকে যাচ্ছে। কোনদিন পেয়ে যাব আমরা তাদের চলাচলের ম্যাপ, অন্ধকারে প্রতীক্ষায় থাকা জড়তা চঞ্চল হয়ে উঠবে আলোয়, নবতর তথ্যের সংযুতি পেয়ে। তাই বুঝি পৃথিবীটা মানুষের কাছে কোনদিনই পুরোন হয়না, একঘেয়ে মনে হয়না। আর মানুষের কাছে পৃথিবী যদি চিরনূতন থাকে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা ও আবিষ্কারের কারণে, তাহলে পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, জলের সুবিশাল জৈব-জীবন ও অসংখ্য প্রজাতি সমৃদ্ধ সুবিশাল উদ্ভিদকুল সকলের কাছেই এই পৃথিবী তার চমকহারায়না সেই মানুষের কারণেই। তা সে ভালো দিকে হোক বা খারাপ দিকে।

​বিগ-ব্যাং তত্ত্ব মান্যতা পেয়েছে বহুদিন। মহাকাশীয় বস্তুসমূহ পরস্পরের দিকে আকর্ষিত হয়ে এক কেন্দ্রীন বস্তুপুঞ্জ গড়তে থাকে। যত কাছে আসছে তারা তত বেশি আকর্ষণ বাড়ছে (নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব), এইভাবে এক
বিশাল বস্তুময় গোলক তৈরি হলো। তবু থামবার নাম নেই, আরো কাছাকাছি ঠাসাঠাসি, বিপুল ভর সেই মহাগোলকের। আরো ঘন হচ্ছে বস্তুপুঞ্জ। প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে তার কেন্দ্রে। একসময় সীমাপার ঘটতেই মহাবিস্ফোরণ। যাকে বিজ্ঞানীরা বিগ-ব্যাং বলে চিহ্নিত করেছেন। সেই বিস্ফোরণ মূহুর্ত থেকে সমস্ত বস্তুপুঞ্জ যে পথে ধেয়ে কাছে আসছিল, তারা উল্টোপথ ধরলো। ছিটকে বেরিয়ে পড়লো মহাগোলক চূর্ণ করে। ধেয়ে চললো আর এক সীমার দিকে। মহাজাগতিক ধুলোর মেঘ তৈরি হলো প্রচুর, অসম্ভব তাপমাত্রা। বিশাল অগ্নিময় গোলক যেন এক মহাযুদ্ধক্ষেত্র থেকে ধেয়ে চলেছে অনন্তপথ ধরে মহাকালের পথে। অগ্নিময় কারণ, ওই মহা বিস্ফোরণের তাপে কোন বস্তু কঠিন বা তরল থাকতে পারে না। সব বস্তু তাদের গলনাঙ্ক স্ফুটনাঙ্ক পেরিয়ে গ্যাসীয় অবস্থায় চলে গেছে, আগুনের বিশাল গ্যাসীয় বলয় চতুর্দিকে ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে অনন্তকাল দূরবর্তী আর এক সীমানার দিকে। যেতে যেতেই গ্যাসীয় বলয়ের তাপমাত্রা কমবে, মহাকর্ষীয় কারণে গ্যাসীয় বলয় ভিতরে ভিতরে ছিঁড়ে গর্ত হবে। ছেঁড়া টুকরোগুলি থেকে নানা অবস্থার প্রেক্ষিতে ও নানা রসায়নে ছায়াপথ, নক্ষত্র ও গ্রহ-উপগ্রহ তৈরি হবে। নিজস্ব বা স্বতোৎসারিত জ্বালানীর অভাবে কিছু বস্তুপুঞ্জ গ্যাসীয় অবস্থা থেকে জুড়োতে জুড়োতে উত্তপ্ত তরল ও আরো জুড়িয়ে কঠিন আকার পেলে গ্রহের বর্তমান চেহারা পেয়ে যাবে। সেরকম গ্রহ একখানা আমাদের এই পৃথিবী।

বলছি বটে সেরকম, তবে ওরকম অগুন্তি গ্রহ রয়েছে মহাকাশে। আমাদের পৃথিবীর কথাই ধরিনা কেন, সেটি সৌর মণ্ডলের অংশ। যেখানে নবগ্রহ বা নয়টি গ্রহের
সূর্যকে ঘিরে পরিভ্রমণ। এবার এই সৌর মণ্ডলে আরো তো সদস্য আছে। অনেক গ্রহেরই আছে চাঁদ সদৃশ উপগ্রহ, কারো বা একাধিক। এছাড়া ধূলিকণা, গ্যাস ও
ছোটবড় টুকরো টাকরায় নির্মিত শনি ও ইউরেনাস গ্রহের বলয়। কিছু উল্কা আছে যারা তাদের বিচিত্র গতিপথে মাঝে মধ্যে দেখা দিয়ে যায়। সে না হয় গেল সৌর পরিবারের কথা। এই সৌর পরিবার যার মধ্যমণি সূর্য নামের একটি নক্ষত্র।

কিন্তু সূর্য এবং তার পরিবারের সদস্যরা যে ছায়াপথের সদস্য সে হলো মিল্কিওয়ে। মিল্কিওয়ে ছায়াপথটিকে দেখলে তার মধ্যে সৌরমণ্ডল দেখাবে একটি বিন্দুর মতো। আবার মহাকাশে মিল্কিওয়ের মতো বহু ছায়াপথ বর্তমান। এরা সবাই এখনও সেই লক্ষকোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া বিগ-ব্যাং-এর অভিঘাতে ছুটে চলেছে, পরস্পর থেকে দূরে যাওয়ার সংকল্পে ছুটে চলেছে, চলেছে আর একটি সীমার দিকে, যেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে মহাকাশীয় বস্তুদের ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি শেষ হয়ে শূন্যে পৌঁছবে। আর ঠিক তখন থেকে কাউন্ট ডাউন, শুরু হবে আবার উল্টোরথের যাত্রা। অতিদীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর আবার মহাভর নিয়ে গঠিত মহাগোলকের বিস্ফোরণ বা বিগ-ব্যাং। গুনতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো এক মহাসময় মহাকাশীয় বস্তুসমূহ নিয়ে আন্দোলনের খেলা খেলে চলেছে। যেন এক মহাঘড়ির সুবিশাল পেন্ডুলাম। এরই এক অতিক্ষুদ্র খণ্ডিত সময়ে পৃথিবীতে জীবজগতের আবির্ভাব। মানুষের এসে পড়া সে দৈবাৎ হোক বা গ্রহান্তর ঘটিত অন্য প্রাণীর প্রভাব হোক, সে যে এই মহাপেন্ডুলামের যাতায়াত পথের এক অতি নগন্য অংশে অবস্থান করে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রসারণকালে মহাকাশীয় বস্তুর
তাপ হারিয়ে ঘনীভবন হয়ে গ্রহের তো সৃষ্টি হয় কিন্তু সেই গ্রহে প্রাণের উন্মেষের সম্ভাব্যতা প্রোবাবিলিটি বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারেন। আবার এটাও অনুসন্ধানে বোঝা গেছে যে সঙ্কোচনকালে মহাবিশ্বের কোন গ্রহেই প্রাণের অনুকুল অবস্থা তৈরি হবেনা।

​তাহলে কি দেখা গেল, যে সময়টুকু নিয়ে এই সুন্দর পৃথিবীতে নানা জীবনের বিকাশ তা মহাবিশ্বের ঘড়িতে কয়েকটি সেকেন্ড মাত্র। এই সময়টুকু পার করে সময় এগিয়ে যাবে, তাকে নিরূপণ করার কেউ থাকবে না। অথবা মহাবিশ্ব স্ব-প্রতিভায় নিরূপিত হতে থাকবে, তবে তা মানব চিন্তায় প্রকাশের অবকাশ থাকবে না। কারণ মানুষ মায় সমগ্র জীব জগতের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। মহাজগতে সেটা হবে একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ডকুমেন্টারি ফিল্মের মতো বিষয়। আলোর গতি অতিক্রম করে ভিন্ন ছায়াপথের অন্য কোন সম্ভাব্য গ্রহবাসীর গবেষণা, সায়ান্স-ফিকশনের গল্পের মতো কৌতুহল উৎপাদন ছাড়া বিশেষ কিছু নয়। সম্ভাবনা যার বিশাল সাহারায় এককণা বিশেষ বালিটির সন্ধান।

​আজ থেকে আমাদের জানা সময় ধরে যদি পিছোতে থাকি তবে ১৩.৭ বিলিয়ন বৎসর পিছোলে আমরা পাবো বিগ-ব্যাং ঘটবার দিন। এক বিলিয়ন অর্থ ১০০ কোটি। এক এর পিঠে নয়টি শূন্য। তাকে ১৩.৭ দিয়ে গুণ করলে ওই সময়ের হিসাবটা পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে মিলিয়নের হিসেবটা দিই। মিলিয়ন হলো দশলক্ষ, এক এর পিঠে ছয়টি শূন্য। তাহলে অর্থ দাঁড়ালো হাজার মিলিয়ন সমান এক বিলিয়ন। এবার আসি পৃথিবীর বয়স ও জীবের আবির্ভাব কাল। পৃথিবীর বয়স মোটামুটি ৪.৫৪৩ বিলিয়ন বৎসর বা চারহাজার পাঁচশো তেতাল্লিশ মিলিয়ন বৎসর, বা শুধু অঙ্কে ৪,৫৪৩,০০০,০০০ বৎসর। আদিতে পৃথিবীতে প্রাণের অনুকুল পরিবেশ না থাকায়
জীবের আবির্ভাব ঘটেনি। তখন পার্থিব বাতাবরণ জলীয় বাষ্পে ভরা কিন্তু অক্সিজেন নেই কোথাও। এমন অবস্থা জৈবিক জীবনের অনুকুল নয়। তাই প্রাণের উদ্ভব ঘটতে তখনও সময়ের অপেক্ষা ছাড়া উপায় ছিলনা। আমরা জানি সমগ্র পৃথিবীর উপরিতল অসংখ্য পাথর জাতীয় টুকরো দিয়ে গঠিত। যাদের বিজ্ঞানের পরিভাষায় টেকটনিক প্লেট বলে। যার মধ্যে ৯ টি মেজর, ১৫ টি মাইনর। এছাড়া বহু মাইক্রো অংশ রয়েছে। মহাদেশ, মহাসাগর, মেরুপ্রদেশ সব এই প্লেটগুলির উপর অবস্থিত।

প্লেটগুলি কমবেশি একশো কিলোমিটার পুরু এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরের গলন্ত লাভার উপর ভাসছে। বহুবছর ধরে ওই প্লেটগুলি অল্প অল্প করে সরতে থাকে।

অনেকেই জানেন হিমালয় নামের ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণী ওই সরণের কারণে সৃষ্ট। এখনও ওরা নড়ে চড়ে বেরায়, তার প্রমাণ আফ্রিকার একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বর্তমানে ফাটল তৈরি হয়েছে। এখন সমুদ্রের নীচে এই প্রকার দু’টি টেকটনিক প্লেটের মধ্যবর্তী জোড়ে কিছু ফাঁক থেকে যায় যেখান দিয়ে সমুদ্রজল ঢুকে পৃথিবীর গর্ভস্থ উত্তপ্ত লাভার সংস্পর্শে চলে যায়। স্বাভাবিক ভাবে জল উত্তাপ পেয়ে প্রসারিত হয়ে প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসে। একে বলা হয়
হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট। এছাড়াও আরো নানা ভাবে এই ভেন্ট তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীদের আধুনিক গবেষণা বলছে এক অতি জটিল পদ্ধিততে অতি ধীর গতিতে প্রোটিনঅনুর সংশ্লেষ ও কিছু এনজাইমের গঠনের পর রিবোনিউক্লিক অ্যসিডের অতি
সরল চেহারার আবির্ভাব ঘটে। অ্যালকালাইন বা ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের মধ্যে তৈরি হওয়া বুদ্বুদ প্রথম আদি কোষের কোষপর্দা বা সেল-মেমব্রেন তৈরি করে, যেগুলি ছিল অনুকৃতি তৈরির কোড সমৃদ্ধ। অর্থাৎ রেপ্লিকা তৈরি করার সংকেতযুক্ত। এভাবেই ওই সেল-মেমব্রেনে আটকে থাকা সাইটোপ্লাজম থেকে আদিকোষের উদ্ভবের পর তার অনুকৃতি ঘটতে থাকে। তবে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা ব্লু-গ্রীন অ্যালগির আবির্ভাব আরো পরে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে। এই সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের আমদানী ঘটায় ব্যাপক ভাবে, ও অন্যান্য জীবকুলের আগমনকে ও ইভোলুশনকে সফল করতে সাহায্য করে। প্রায় ১৫০০ মিলিয়ন বা দেড় বিলিয়ন বছর
আগে পৃথিবীর চারপাশে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল তৈরি হলো। ধীরে ধীরে ওজোন স্তর গঠিত হলো। অবশ্য এই প্রক্রিয়াটি বিপুল ভাবে শুরু হয় স্থলভাগে উদ্ভিদ আবির্ভাবের পর। ওজোন গ্যাসের স্তর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে পৌঁছে জীব ও জীবনের পক্ষে ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে পৃথিবীকে আড়াল করলো, তৈরি হলো এক উপযুক্ত পরিবেশ যেখানে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নানা শাখা-প্রশাখায় জীবজগতের বিকাশ সম্ভব হলো। আনুবীক্ষিক জীব ইতিমধ্যে জলের জগতে নানা ধারায় বিকশিত হয়েছে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীরও বিকাশ ঘটেছে। ৫৩০ মিলিয়ন বছর আগে জলের
মেরুদণ্ডী প্রাণী মাছের আবির্ভাব হলো। স্থলভাগে উদ্ভিদ আসে ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে। এরপর আসে জলে ও ডাঙ্গায় দুই যায়গায় বাস করা উভচর প্রাণীরা।

তারপর ২২৫ মিলিয়ন বছর আগে আসে ডাইনোসর প্রজাতির বিশালাকায় প্রাণীকুল। ওরা বিবর্তনের ধারায় গিরগিটি জাতীয় প্রাণী থেকে উদ্ভুত। আবার ডাইনোসর আজ থেকে ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে গেল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এর কারণ সূর্যের আলোহীন এক লম্বা হিমযুগ। সে সময় এক বা একাধিক বিশাল আকৃতির উল্কা বা মহাকাশীয় বস্তুর পৃথিবীর উপর পতনের কারণে যে বিপুল পরিমান ধুলো উড়েছিল, তার সাথে সেই অভিঘাতে বহু বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠায় যে পরিমান ছাই উড়েছিল তা বহু বছর ধরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকার কারণে পৃথিবীর উদ্ভিদ-জগৎ আলোর মুখ দেখতে পায়নি। সালোকসংশ্লেষের অভাবে উদ্ভিদ-জগৎ বিনষ্ট হয়, খাদ্য-শৃংখল নষ্ট হওয়ার কারণে ধ্বংস হয় প্রাণীকুল।

​এভাবেই নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে এগোতে থাকে পার্থিব জীবজগত।
দেখা গেছে যে, হিমযুগ পৃথিবীতে কয়েকবারই এসেছে। বর্তমান মানুষ যাদের বিজ্ঞানীরা হোমো স্যাপিয়েন্স নামে অভিহিত করেছেন তাদের আবির্ভাব আজ থেকে মাত্র এক লক্ষ তিরিশ হাজার বছর আগে, আফ্রিকা নামে যে মহাদেশটি আমরা চিনি সেখানে। আর ৩৫ হাজার বছর আগে তারা ধীরে ধীরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তৈরী হয় নানা জাতি, গোষ্ঠি। গোষ্ঠির মধ্যে এলো অজানা শক্তিধর ঈশ্বরের ধারণা। তার সঙ্গে নিজেদের আচার আচরণ, পছন্দ অপছন্দ মিলিয়ে গড়ে উঠলো ধর্মভাবনা। এক এক গোষ্ঠি যেমন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পশু-পাখির টোটেম ব্যবহার করতো, তেমনই ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সমাজ তাদের নানাভাবে নিজ নিজ গোষ্ঠির ধর্মচিহ্ন খুঁজে নিয়ে স্বস্তি পেলো, তৃপ্তি পেলো। আর ধর্মাচরণের স্থান হিসেবে গড়ে তুললো গির্জা, মসজিদ, মন্দির জাতীয় আশ্রয়স্থল। তারপর সময় গড়াতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে, বানিজ্যের জন্য দেশে দেশে ভ্রমণ এনে দিলো নানা জ্ঞান। লোভও সঙ্গী হলো তার সাথে। কোন দেশের মানুষ ভাল আছে, খাদ্যের অভাব নেই, প্রাকৃতিক সম্পদ যথেষ্ট, তাদের দেশটা দখল নিতে হবে। কোন দেশের মানুষ সামর্থে দুর্বল তাদের দাস করে খাটানো যাবে, এই জাতীয় কু-চিন্তার উদয় হলো মানুষের মনে। নিজে না খেটে অন্যকে ভয় দেখিয়ে যদি খাওয়া-পরা ও আয়েস করা যায় তবে তা কুচিন্তার আশ্রয়ে যাওয়া বুদ্ধিধারী মানুষ ছাড়ে কি করে ? তাই অস্ত্র তৈরি করতে উঠে পড়ে লাগলো একদল। সমরবিদ্যার উদ্ভব হলো। তৈরী হতে লাগলো কূটনীতি। সাম্রাজ্যসীমা, সৈন্য-সামন্ত, দেশভক্তি এসবই তার পরবর্তী ফসলমাত্র।

এখন একটি খোলা প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো যাক। সেটি হলো আমাদের এই মানবজীবন মায় পৃথিবীর সম্পূর্ণ জীবজগত কতটা সুরক্ষিত ? মানুষ প্রধানত ঘরে থাকতে অভ্যস্ত। তাই খোলা আকাশটার কথা হয়তো ভাবতে ভুলে গেছে। ঘরে ছাদ থাকলেও আসলে কিন্তু পৃথিবীর মাথায় কোন ছাদ নেই, আর আমরা সবাই আছি পৃথিবীর উপরিতলে, যেখানে মাথার উপর মহাকাশ। এই সারসত্যটি বেশি রকম ভাবলে ঘরের ভিতরে থেকেও ঘুম উড়ে যাবার কথা। অবশ্য ভাবনায় আসতেই পারে, চৌদ্দপুরুষ তো দিব্বি কাটিয়ে দিলো এভাবেই, আমি কেন নিজের ঘুম নষ্ট করি। তা বেশ।

প্রাকৃতিক নানা কারণ যা জীবজগত ধ্বংস করতে পারে তার মধ্যে একটি হলো বিশাকায় বস্তু বা বস্তুপুঞ্জ, সে উল্কাখণ্ড হোক বা কোন নক্ষত্রের বিস্ফোরণের ফলশ্রুতিতে ধেয়ে আসা বস্তুপুঞ্জ বা রশ্মি যাই হোকনা কেন, সমগ্র পৃথিবী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার আমাদের জীবনের মূল উৎস সূর্য নক্ষত্র হিসেবে তার সমগ্র জীবনের একটা ভাল অংশ পার করে ফেলেছে। নক্ষত্রের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তবে সূর্যের মৃত্যু দেখতে কোন প্রাণী বা উদ্ভিদ পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে না। আবার বিগ-ব্যাংয়ের পর মহাকাশীয় বস্তুসকল যে একটা নির্দিষ্ট পথে অঙ্কের নিয়মে প্রসারিত হতে ছুটে চলেছে, সেই পথের অর্ধেক পার হয়েছে সবাই। বিগ-ক্রিস্প অর্থাৎ এই ছুটে চলা বেগ হারিয়ে যেখানে থামবে ও উল্টো পথে সঙ্কোচনের দিকে চলতে শুরু করবে সেই সন্ধিক্ষণ। বিগ-ক্রিস্পে পৌঁছানোর বহুবিলিয়ন বছর আগেই সৌরমণ্ডল বিনষ্ট হবে, উবে যাবে পৃথিবীর মতো সব গ্রহ। হয়তো পৃথিবী তার জীবনের এক তৃতীয়াংশ অতিক্রম করেছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাকী দুই তৃতীয়াংশ সময় ধরে মানুষ চালিয়ে যাবে তার স্বেচ্ছাচার। কারণ মানুষের মতো অল্পেই বিপদাপন্ন প্রাণী দু’টি নেই। এতো গেল এক রকম অবধারিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যা স্বাভাবিক মহাকাশীয় মহাশক্তির কারণে হবে। এছাড়া হতে পারে, সুনামি, প্রলয়ঙ্কর ঝড়, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠা, মেরুবরফ গলে গিয়ে সমুদ্রতলের উত্থান ও স্থলভাগ ডুবে যাওয়া, টেকটনিক শিফ্ট, অনিয়ন্ত্রিত দাবানল, প্রাণঘাতী অতিমারী ঘটানো ভাইরাস ইত্যাদি। এছাড়াও মানুষের হাতেই রয়েছে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দেবার পারমানবিক অস্ত্রভাণ্ডার। প্রকৃতি হয়তো বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে যা লোপ করবে, মানুষের তৈরি মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন সেই সব অস্ত্র মূহুর্তেই নাশ করে দিতে পারে এক একটি দেশ। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিনষ্ট করবে শুধু মানবজাতি নয়, ভারসাম্য হারানো আমাদের এই সুন্দর সবুজ প্রাণোচ্ছল
পৃথিবীকে। এখন একটা বিষয় পরিষ্কার যে আমরা ছাদের নীচে নিরাপদ নই। জানিনা কি ধেয়ে আসছে। তবু দেখি অর্বাচীন মানুষ প্রকৃতির শুশ্রূষা না করে তাকে ধ্বংস করছে নিজে ধনী হবার জন্য। নষ্ট করছে প্রাণের আঁতুরঘর সমুদ্রকে।

বিষিয়ে তুলছে জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সব। কি হয় ধন সম্পদে ? যে ধন অন্যের ঈর্ষার কারণ হয়, অন্যকে বন্ধুমনের থাকতে দেয়না, কি হবে তা দিয়ে। কেউ কোনদিন তাজমহল গড়েছিলেন, কেউ পেয়েছেন নোবেল পুরষ্কার, কিন্তু দিনের শেষে পৃথিবীটাই থাকবে না। তখন অতো বিলাসে, এত দম্ভে কাজ কি ? একটা কথা আছে,
প্রকৃতিতে মানুষ ছাড়া কেউ তো রোজগার করতে ছোটেনা, কিন্তু কেউ কি না খেয়ে থাকে ? মানুষকে রোজগার করতে হয় একমাত্র কারণ তার রুচি আছে, আছে পছন্দ অপছন্দ। হ্যাঁ, তাই বলে কি সভ্যতার অগ্রগতি রুখে দিতে হবে ? না তা কখনই কাম্য নয়। সভ্যতা যথার্থ সভ্য হয়ে উঠুক এটাই কাম্য। আরো বেশী হৃদয়বান হয়ে উঠুক। লাভ আর লভ্যাংশের হিসেব না কষে, ধর্ম আর জাতি-বর্ণভেদের অন্ধকার পথে না হেঁটে মানুষ অবশ্যই পারে যথার্থ মানবিক হয়ে উঠতে, প্রকৃতিকে বুঝতে। আর প্রকৃতি কিছুই নেয়না, তাকে যা দেওয়া হবে, যেমন দেওয়া হবে সে তেমনই ফিরিয়ে দেবে। ক্ষুদ্র এই সাজানো পৃথিবীর সংসার ও ততোধিক ক্ষুদ্র এই মানব জীবনে আমরা আর একটু মহৎ হয়ে কি বাঁচতে পারিনা ? যখন আমাদের আছে উন্নত মস্তিষ্ক সমন্বিত হৃদয় ?

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.