x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

শনিবার, নভেম্বর ২৮, ২০২০

শনির বচন | বর্গী এলো দেশে

sobdermichil | নভেম্বর ২৮, ২০২০ | | মিছিলে স্বাগত

শনির বচন | বর্গী এলো দেশে

ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিসমূহের সাথে বাঙালির একটি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। সেই স্বাতন্ত্র্য বাঙালির মাতৃভাষা। বাংলার ভৌগলিক বিস্তার। বাংলার প্রকৃতি। এবং বাঙালির সংস্কার ও বাংলার সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতিসত্তায় বিকশিত। তাকে অস্বীকার করতে গেলে যে ঐতিহাসিক ভুল হবে। তার মাশুল কিভাবে দিতে হতে পারে, তার জলন্ত ইতিহাস রচিত হয়ে রয়েছে পাকিস্তানের কবল থেকে পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময়, পাকিস্তানপন্থী বাঙালিরা বাংলার এই জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বিস্মৃত হয়ে নিজেদেরকে পাকিস্তানী বলে বিশ্বাস করতে ও করাতে উর্ধবাহু হয়ে নেচে উঠেছিল। তারা মনে করেছিল ভারতের সব মুসলিমই পাকিস্তানী। তাই বাঙালি মুসলিমও পাকিস্তানী। ঠিক যেমন  আজকে অনেক বাঙালি হিন্দুই মনে করে ভারতের সব হিন্দুই এক জাতি এক ধর্ম এক প্রাণ। সেদিনের পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিমরা ভারতের সব মুসলিমদের জন্য একটি ইসলামিক দেশ দাবী করেছিল। ঠিক যেমন আজকে অনেক বাঙালিই সকল হিন্দুদের জন্য একটি বিশুদ্ধ হিন্দুস্তানের স্বপ্নে বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছে। এই বিশুদ্ধ হিন্দুস্তানের স্বপ্নটিকে অত্যন্ত সুকৌশলে বহু বাঙালির মস্তিষ্কে সংক্রমিত করে দেওয়া হয়েছে। না বাংলার ভিতর থেকে এই সংক্রমণ ঘটানো হয়নি। সংক্রমণ ঘটানো হয়েছে বাংলার বাইরে থেকে। ১৯৪৭ এর সময়পর্বেও বাঙালি মুসলিমের চেতনায় ঠিক একই ধরণের বিশুদ্ধ পাকিস্তানের স্বপ্ন সংক্রমিত করে দেওয়া হয়েছিল সেই বাংলার বাইরে থেকেই। বাঙালিকে ভাগ করার, বাংলার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার বাঙালির বাঙালিত্বের উপরে আঘাত করবার সর্বপরি বাঙালির স্বাতন্ত্র্য জাতিসত্তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাগুলি চিরকালই বাংলার বাইরে থেকেই সংঘটিত হয়ে এসেছে। সংঘটিত হয়ে এসেছে বাঙালি বিদ্বেষী বিভিন্ন শক্তিগুলির স্বার্থেই। এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে সেই বাঙালি বিদ্বেষী শক্তিগুলি ক্রমাগত বাঙালির মস্তিষ্কে নানান ধরণের সংক্রমণ ঘটিয়ে চলেছে। 

বাংলায় নতুন করে হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের পক্ষে সমর্থন জোগার করার কৌশল সেইরকমই এক ভয়াবহ সংক্রমণ। না, হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের মধ্যে ‘হিন্দী’ কে সন্তর্পণে উহ্য রেখে বাংলায় আপাতত শুধুমাত্র হিন্দু ও হিন্দুস্তানের স্বপ্নকেই সংক্রমিত করা হচ্ছে। কারণ এই ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তাই ভাষার প্রশ্নটিকে সন্তর্পণে উহ্য রেখে বাঙালির মস্তিষ্কে হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাতে বাঙালি মাত্রেই হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্বীকার করে নিতে অভ্যস্থ হয়ে যায়। ঠিক সরাসরি জোর করে বাধ্য করার ঝুঁকি না নিয়ে, অভ্যস্ত করিয়ে নেওয়ার কৌশল যে অত্যন্ত বেশি কার্যকরি। সেকথা বিলক্ষণ জানেন হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের প্রবক্তারা। তাই বাঙালির মস্তিষ্কে হিন্দু ও হিন্দুস্তানের স্বপ্নকে একবার সংক্রমিত করে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। পরবর্তীতে তার সাথে ভাষার প্রশ্নটি জুড়ে দেওয়া মাখনের ভিতরে ছুরি চালানোর মতোন মসৃন হয়ে যাবে। তার একটি সহজ কারণ। অধিকাংশ বাঙালিই হিন্দী ভাষায় এমনিতেই অভ্যস্থ। তারা হিন্দীতে সচ্ছন্দে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে সক্ষম। অনেকেই হিন্দী পড়তে ও লিখতেও সক্ষম। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই বাকিরাও হিন্দীতে আরও বেশি অনুরক্ত হয়ে উঠে হিন্দী ভাষায় অভস্থ হয়ে যাবেন স্বেচ্ছায়। পাকিস্তানের মতো উর্দু ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের উপরে জোর করে চাপাতে যেতে হবে না। এমনিতেই কাজ অনেকদূর এগিয়ে রয়েছে। ফলে ভাষার প্রশ্নটি হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের কাছে কোন সমস্যার বিষয়ই নয়। তার জন্য পরবর্তী পরিকল্পনা পূর্ব হতেই প্রস্তুত করে রাখা রয়েছে। 

তাদের মাথাব্যাথার মূল বিষয় তাই হিন্দু ও হিন্দুস্তানের প্রশ্নটি। কারণ তারা বিলক্ষণ জানেন। বাঙালির একটি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। সেই স্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করতে না পারলে, বাংলায় হিন্দু ও হিন্দুস্তানের খুঁটিকে প‌োঁতা যাবে না। পশ্চিমবাংলার বাঙালি মাত্রেই রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে ভারতীয়। কিন্তু জাতিসত্তার পরিচয়ে হিন্দুস্তানী নয়। অনেকেই নিজেদেরকে হিন্দুস্তানী মনে করলেও অধিকাংশ বাঙালিই নিজেদেরকে হিন্দুস্তানী মনে করে না। নিজেদেরকে ভারতীয় বাঙালি বলেই জানে।  কিন্তু সকল বাঙালিকেই হিন্দুস্তানী করে তুলতে বদ্ধপরিকর, হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের মূল লক্ষ্য বাঙালির নিজ জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য পরিচয়কে ধ্বংস করে দিয়ে তাদেরকে হিন্দুস্তানী জাতিসত্তার পরিচয়ে বেঁধে ফেলার। এই লক্ষেই অত্যন্ত সুকৌশলে এগিয়ে চলেছেন তারা। আর বাঙালির মস্তিষ্কে হিন্দু ও হিন্দুস্তানের স্বপ্নকে সংক্রমিত করাই সেই লক্ষ্যপূরণের একমাত্র পথ। 

এখন সংক্রমণের এই ধারা শুরু হয়েছে দুই পথে। এক দিকে ভারতীয় বাঙালি মাত্রেই আদতে হিন্দুস্তানী। এই ধারণাটিকে বাঙালির মস্তিষ্কে সুকৌশলে গেঁথে দেওয়ার কাজ চলছে প্রতিদিন। দ্বিতীয় পথে আরও একটি বিষয় সুকৌশলে প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুদেরই জন্য। কারণ বাঙালি মুসলিমদের জন্যই তো ভুতপূর্ব পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল। অধুনা যা বাংলাদেশ। এবং অত্যন্ত ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে হিন্দু বাঙালিরা মাত্র তিন শতাংশ। আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিমরা এমন দ্রুত বংশ বিস্তার করছে এবং বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন এত বেশি সংখ্যায় মুসলিম বাঙালিরা অনুপ্রবেশ করছে যে, অচিরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরাই সংখ্যালঘু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলাদেশে পরিণত হয়ে যাবে। 

এই বিষাক্ত প্রচারকে এমন ভাবেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে করে বাঙালি হিন্দুর মনে মুসলিম ভীতি বদ্ধমূল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আর তাহলেই কেল্লাফতে। নবান্নের দখল নিয়ে নেওয়া তখন আর কোন সমস্যাই নয়। 

না শুধুমাত্র নবান্ন দখলই হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের মূল লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য আরও গভীর। পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসের প্রকৃত তথ্য ঠিকমত প্রকাশ হলেই দেখা যাবে বিগত সাত দশক সময়সীমায় কিভাবে অত্যন্ত দ্রুতহারে এই রাজ্যের জনবিন্যাসের ধরণ পাল্টিয়ে যাচ্ছে। এই তথ্য পাওয়া গেলে দেখা যাবে, বর্তমানে রাজ্যবাসীর এক তৃতীয়াংশের বেশি অধিবাসীই অবাঙালি। যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে না। বাংলার সংস্কৃতিকে কোনদিনই আপন করেও নেয় নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দশকের পর দশক বাংলায় বাস করেও তারা নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি, ধর্ম ও সংস্কার বজায় রেখে বাঙালির থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র্য জাতিসত্তায় বিরাজ করছে। এবং বাংলায় বসবাসকারী এই বৃহৎ অবাঙালি জনসাধারণের ভিতরে বংশ বিস্তারের হার সর্বোচ্চ। শুধু তাই নয়। মূলত গোবলয়ের অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বাংলার পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে অবাঙালি জনসাধারণ বাংলায় পাকাপাকি ভাবে বসবাসের জন্য অনুপ্রবেশ করে চলেছে। ফলে প্রতিবছরই রাজ্যে অবাঙালিদের সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি হচ্ছে। যাদের বেশির ভাগই কিন্তু ঐ হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের শরিক। যাদের অধিকাংশের ভাষাই হিন্দী। ধর্ম হিন্দু। এবং জাতিসত্তায় হিন্দুস্তানী। এবং এদের ধারাবাহিক এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যাধিক্যের কারণেই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি অবাঙালির আনুপাতিক পার্থক্য ক্রমেই হ্রাসমান। ফলে এমন একদিন খুব বেশি দূরে নয়। যেদিন এই অনুপাত সমান হয়ে যাবে। 

চোখ বুঁজেই বলে দেওয়া যায়। সেই অনুপাতে একদিন বাঙালিই তার নিজভুমে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। এবার আসুন নজর দেওয়া যাক বর্তমানে। রাজ্যের পুলিশ বিভাগ। সরকারী কার্যালয়। রেল ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে অবাঙালি আধিকারীকদেরই কিন্তু রমরমা। বাংলার অর্থনীতি বাণিজ্যে অবাঙালিরাই নেতৃত্বে। বাংলার শ্রমজীবী সম্প্রদায়েও তাদেরই সংখ্যাধিক্য। বাঙালি বেকার যুবকদের পাশে অবাঙালি বেকার যুবকের দেখা পাওয়া ভার। প্রতিবছর মেধাবী বাঙালি ছাত্রছাত্রী বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে চাকরির অভাবে। অথচ গোবলয়ের কম মেধার অবাঙালি যুবকেরা ভিড় বাড়াচ্ছে এই রাজ্যেই। এইরকম সার্বিক এক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চেয়েই বাংলায় হিন্দু ও হিন্দুস্তানের স্বপ্ন সংক্রমিত করে দেওয়া হচ্ছে। 

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে এই সংক্রমণকে আরও সুতীব্র করে তোলার পরিকল্পনাতেই অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার চলছে দিকে দিকে। উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুফল তুলে সকল হিন্দুদেরকে হিন্দু ও হিন্দুস্তানের স্বপ্নে বেঁধে ফেলে রাজনৈতিক ভাবে বাংলা দখল। 

ফলে হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের মূল লক্ষ্যই হলো। বাংলার বর্তমান জনবিন্যাসের ধারাবাহিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে একদিন পূর্ব বিহার ও পূর্ব ঝাড়খণ্ড পরিচয়ে গোবলয়ের সাথে  সংযুক্ত করে ফেলা। আর তাহলেই হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের গোবলয়ের স্বপ্ন সার্থক হয়ে উঠবে। ভারতের মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া যাবে পশ্চিমবঙ্গকে। আজকের বাঙালি সেদিন সত্যই হয়তো হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানী আত্মপরিচয়ে বাঙালির স্বতন্ত্র্য জাতিসত্তাকে বিস্মৃত হতে সমর্থ হবে। আর বিরোধীতা করতে গেলে থাকতে হতে পারে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। বাংলা দখলের এই নীল নকশাকেই সার্থক করার লক্ষ্যে এই বাংলায় বাঙালি হিন্দুর মস্তিষ্কে হিন্দু হিন্দুস্তানের স্বপ্নকে সংক্রমিত করার এহেন কার্যক্রম। 

২৮শে নভেম্বর’ ২০২০

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.