x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, নভেম্বর ৩০, ২০২০

■ ঝর্না চট্টোপাধ্যায় | পাহান শবর ও কিছু কথা

sobdermichil | নভেম্বর ৩০, ২০২০ | | | মিছিলে স্বাগত

■ ঝর্না চট্টোপাধ্যায় |  পাহান শবর ও কিছু কথা

বোকারো—পেটেরবার—রাজরাপ্পা-রামগড়—রাঁচী...আমরা তখন ওদিকেই থাকতাম। আমরা মানে বাবা তখন রাজরাপ্পাতে পোস্টেড ছিলেন। ওই অঞ্চলে বেশ কিছু আদিবাসী মানুষ দেখেছি বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করতে। আমাদের রাজরাপ্পার বাংলো  বাড়ীটা ছিল বিরাট বড়, বিঘেখানেকেরও অনেকটা বেশি জায়গা জুড়ে।  রান্নাঘরের পিছনদিকে আমাদের দরোয়ান আর মালি মিলে ধান, আখ চাষ করত কিছুটা জায়গায়।  সামনের দিকে ছিল সবুজ লন আর ফুলের বাগান। আমাদের মালির নাম ছিল পাহান। ভারি যত্ন করত বাগানের। দেখলে বুড়ো মনে হয়, কিন্তু বুড়ো ছিল না, ক্ষয়াটে চেয়ারা ছিল। এক পলকে দেখলেই বোঝা যেত আদিবাসী সমাজভুক্ত মানুষ, চেহারায় তার প্রমাণ ছিল। গায়ে অসম্ভব শক্তি ছিল। সকালে আমাদের বাড়ি কাজে আসত যখন, কাঁধে একটা কুড়ুল ঝোলানো থাকত। পাহান, আমাদের দরোয়ান আর  হোসেন ড্রাইভার এই তিনজন মিলে সকালে কাজে আসার পর একটা চায়ের আড্ডা হত  দরোয়ানজীর ঘরে।  ড্রাইভার আর দরোয়ান বসত চেয়ারে আর পাহান বসে থাকত মাটিতে। কোনদিন তাকে মাটিতে ছাড়া বসতে দেখিনি।  মনে হত বৃত্তিতে সে নিজেকে ছোট  মনে করত বলেই বুঝি মাটিতে বসত।  তখন আমাদের বাড়িতে কাজ করত মেদিনীপুরের একটি ছেলে অনুপ, অনুপ জেনা। তার  কাছ থেকে পরে জেনেছি, পাহান ছিল জাতিতে শবর, ওদের  কাছে অচ্ছ্যুত। ওরা নিচু জাতির লোক।

সেসময় শবরদের সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না।  পরবর্তীকালে  জানার আগ্রহ থেকে বইপত্র ঘেঁটে দেখেছি, আজকের দিনে শবরদের অবস্থা যাই হোক না কেন,শবরদের অতীত ছিল রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, হর্ষচরিত এবং চর্যাপদের পাতায়। ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও শবরদের  উল্লেখ আছে। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় জাতিটির প্রাচীনকালের অস্তিত্ব।  তথাকথিত ‘আর্য’দের আগমনের পূর্বে যে সব ‘অনার্য’  জাতিগুলি বসবাস করত এদেশে, শবর জাতিটি ছিল তাদের অন্যতম।

জাতিতত্ত্ববিদদের মতে, শবররা কোলরীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। হিমালয়ের উত্তরপূর্ব দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করেছিল এইরকম অনুমান করা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে মধ্যভারত, উড়িষ্যা ও উত্তর মাদ্রাজের দিকে তারা চলে যায়। প্রাচীন সব গ্রন্থে পুন্ড্র- শবর কথার উল্লেখ পাওয়া যায় কারণ অনেক আগে শবরদের পুন্ড্ররাজ্যে ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাস ছিল।  

সংষ্কৃত অভিধানে পাওয়া যায় যে শবররা পত্রপরিধান করত। পত্রপরিধানকারীদের  শবর এবং ময়ুরপুচ্ছ পরিধানকারীদের কিরাত বলে সম্বোধন করা হত।  কিছুদিন আগেও উড়িষ্যায় পত্রপরিধানকারী শবরদের দেখা মিলত।

প্রাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য ও প্রাচীনতম গ্রন্থ হল চর্যাগীতি বা চর্যাপদ। মনে করা হয় এগুলি পালরাজাদের সময়ে রচিত  অর্থাৎ  প্রায় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত এবং এই রচয়িতাগণ ছিলেন বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের কবি। চর্যাগীতিতে তৎকালীন অন্ত্যজ সমাজের প্রতিফলন দেখা যায়। লোকজীবনের বিশেষত নিম্নশ্রেণী ও অন্ত্যজশ্রেণীর জীবন গীতিগুলিতে সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। সেকালে যে আদিম কোলজাতির বসবাস ছিল যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল  শবর জাতি । এই নিম্নশ্রেণীর মানুষগুলির বসবাস ছিল তৎকালীন সভ্য,নাগরিক সমাজ থেকে দূরে বড় বড় পাহাড়ের শিখরদেশে। চর্যাগীতিতে শবরদের সম্বন্ধে  এমনই উল্লেখ পাওয়া যায়---    

‘ বরগিরিসহর উত্তুঙ্গমুনি সবরেঁ জহি কিঅ বাস ‘( কাহ্নপাদ-১৯)

চর্যাগীতিতে শবরপাদ নামে একজন কবির কথা জানা যায়, সম্ভবত তিনিও ছিলেন জাতিতে শবর।  চর্যাগীতিতে আরো পাওয়া যায়--- 

‘উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরো বালি।

মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিন সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী’ ইত্যাদি। 

অর্থাৎ জনবসতি থেকে দূরে পর্বতে বাস করে শবর-শবরী। শবরীর গলায় গুঞ্জার মালা এবং ময়ূরপুচ্ছ পরিধান করে আছে। এই প্রসঙ্গে মাত্র কিছুদিন আগেও উড়িষ্যার ঘনজঙ্গলে যেখানে শবররা বসবাস করে তাদের পরিধানে ময়ূরপুচ্ছ ও পত্রপরিধান দেখা গেছে।  আরো একটী   চর্যাগীতিতে শবরদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে—‘  টালত মোর ঘর নাহি পরিবেশি’ ( ঢেন্‌ঢেনপাদ ৩৩ নং) অর্থাৎ উঁচু টিলার উপরে ঘর, যেখানে কোন প্রতিবেশী নেই। 

এই প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত একটি ভাবনা মনে আসে, চর্যাগীতিতে যে শবর-শবরীদের কথা বলা হয়, চর্যাগীতিতে যে কবি শবরপাদকে শবর জাতি বলে মনে করা হয়, তবে কি রামায়ণে বর্ণিত শবরীও কি এই শবর জাতির অন্তর্গত? 

রামায়ণে শবরীর প্রতীক্ষার কাহিনি আমরা জানি। বহুযুগ আগে,সেই শবরীও কি শবরকন্যা ছিলেন?  জাতিতত্ত্ববিদ দের মতে যদি জনগোষ্ঠী সম্পপ্রদায়ের মানুষেরা উচ্চবর্ণো ও তথকথিত ‘আর্য’ দের তাড়োনার ফলে নানাদিকে গিয়েবং-জঙ্গলে, গুহা-গিরি-কন্দরে বসতি স্থাপন করে থাকে, সেখানে বয়াল হচ্ছে যে কিছু জন উত্তর মাদ্রাজের দিকে অর্থাৎ দক্ষীণের দিকেও চলে যান। শবরী উপাখ্যানে আমরা দেখি তাঁর অবস্থান ছিল পম্পা সরোবর এবং তৎ সংলগ্ন অরণ্যে। প্রাচীন পম্পা সরোবর হল বর্তমানের হাম্পি। হয়তো এ সত্য নয়, তবু এমন একটি অনুমান করতে ক্ষতি কি! 

আরও একটি কথা উল্লেখ করার মত, পুরীর জগন্নাথ দেবকে শবরদের দেবতা বলা হয়। উড়িষ্যায় যে অনেক শবরের বাস, সে আমরা সকলেই জানি।

বলতে গেলে ভারতে বৃটিশ শাসনের সময় থেকেই শবরদের অস্তিত্বের সংকট শুরু  হয়। বন কেটে বসত নির্মাণের  ফলে তাদের উৎখাত করা হয়। যে মানুষগুলি বন-জঙ্গলে লুকিয়ে একান্ত অরণ্যচারী জীবন যাপন করত, তারা প্রকাশ্যে এসে পড়ার   ফলে দিশেহারা, নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হল। কাজকর্মের কোন সংস্থান না থাকায় অভাব-অনটন,  তার ফলে যে কোন উপায়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে গিয়ে চুরি-চামারি এবং শেষ পর্যন্ত শবরদের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠল দস্যুবৃত্তি বা অপরাধপ্রবণ জাতি হিসাবে পরিচিতি লাভ।

কিন্তু শুধুমাত্র ইংরাজদের কাছেই নয়, দেশীয় উচ্চবর্ণ, ও বর্ণহিন্দুদের কাছেও তারা সমাজে অস্পৃশ্য, অচ্ছ্যুত হিসাবেই একঘরে হয়ে রইল। সুতরাং তাদের ছোঁয়াচ  বাঁচিয়ে চলাই সমাজের উদ্দেশ্য হল। যদিও তারা নিজেদের হিন্দু বলেই মনে করে থাকে এবং লক্ষ্মী, মঙ্গলচন্ডী তাদেরও দেবতা বলে জানা যায়। শব দাহ করার রীতি তাদের মধ্যেও আছে, তবে অশৌচ পালনের জন যে মাথা মুন্ডনের প্রথা আছে, সেটি তারা  নিজেরাই নিজেদের মাথা মুন্ডন করে থাকে।  

শবর কথাটি এসেছে ‘সগর’ শব্দ থেকে, যার অর্থ কুঠার বা যাকে আমরা বলি  কুড়ুল। শবরদের হাতে কুঠার দেখতে পাওয়া যায় এবং তারা সব সময় কুঠার নিয়ে ঘোরাফেরা করে, এটিই তাদের বৈশিষ্ট্য। আমার চোখে পাহান মালির চেহারাটি ভেসে উঠল। কারণ আমরা পাহানকে দেখেছি প্রতিদিন সে কাঁধে একটি কুড়ুল নিয়ে আমাদের বাগানে কাজ করতে আসত। বইপত্র ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম, বিহার-উড়িষ্যার রিসার্চ সোসাইটির পত্রিকার দ্বিতীয় খন্ডে ( ১৯১৫ সালে প্রকাশিত) শবরদের কুঠার প্রাপ্তি নিয়ে একটি কাহিনি আছে।

কাহিনিটি এইরকম---  মানভূমের কয়েকটি জায়গায় তামার ফলক লাগানো কিছু অস্ত্র পাওয়া যায়। সেখানকার পোখুরিয়া গ্রামের এক পাদ্রীও ঠিক একইরকমের কয়েকটি তামার অস্ত্র আশেপাশের অঞ্চল থেকে পান এবং সেগুলি নিজস্ব সংগ্রহে রেখে দেন।  পাদ্রির নাম ক্যাম্পবেল সাহেব। সেইসময় মানভূমের ডিস্ট্রিক্ট  ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন রায়বাহাদুর নন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়। তিনি এই অস্ত্রগুলিকে দেবী প্রতিমার বল্‌গা বলে চিহ্নিত করেন। পরে জানা যায় যে সেগুলি তাম্রযুগের অস্ত্রশস্ত্র এবং তা প্রকাশিত হয় সোসাইটির জার্নালে।

একটি মানুষের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেই মানুষটি সম্বন্ধে ও তাদের জাতির ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, এবং ভারতের ইতিহাসে সেই জাতির বৃত্তান্ত কিছু জানা গেল।

অতীতের ঐতিহ্য  তো এভাবেই খুঁজে চলা ! 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.