x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

চিত্রাভানু সেনগুপ্ত

sobdermichil | অক্টোবর ২১, ২০২০ | | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

চিত্রাভানু সেনগুপ্ত

দক্ষিণের অনন্ত দিগন্ত জুড়ে অকস্মাৎ একরাশ​ ​ পুরু মেঘের সারি থরে থরে​ জমাট বেঁধে গুরু গুরু গর্জনে মৃদুমুখর হল। বেলা যত গড়িয়ে চলল, মনের কিনারে নিরন্তর উঁকি দিয়ে চলেছে কত পুরানো স্মৃতি। এই মন্দিরের সামনে সরোজুর​ হাতটা ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিলো গোবিন্দ....."ওই চন্দ্র সূর্য যতদিন থাকবে ততদিন অক্ষয় থাকবে আমাদের এই সম্পর্ক।"

এই বুধখালি গাঁয়েরই ছেলে গোবিন্দ। একসময় লেখাপড়ায় মন্দ ছিল না, শোনা যায় গোবিন্দ যখন বছর দশেকের বালক, একদিন কাজে বেড়িয়ে তার বাবা নিখোঁজ হল। কেউ বলে মরে গেছে, কেউ কেউ আবার অন্য কথাও বলে অবশ্য। গোবিন্দর মা তাদের পাশের ঘরটা ভাড়া দিয়ে, বিড়ি বেঁধে, শোলার মালা বানিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাতো ,​ ছোট বোনটা তখন কোলের শিশু । সেই থেকেই গোবিন্দ কলকাতায় মামাবাড়িতে থেকে পড়াশুনা চালিয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডী যখন পেরোলো মায়ের হঠাৎ অসুস্থতায় গোবিন্দর আর কলকাতায় ফিরে যাওয়া হলনা। কাছেপিঠে কটা টিউশনি আর স্থানীয় প্রাথমিক ইস্কুলটায় অস্থায়ী একটা মাস্টারি পদ পেয়েছিলো। গোবিন্দর বড় ইচ্ছে পড়াশুনাটা শেষ করে, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো আর হয়না! চাকরি রক্ষা করে, টিউশনি করে আবার রাতে কলেজ। সবদিক সামলে পড়াশুনায় গাফিলতি হয়ে যায়, শরীর ও সঙ্গ দেয়না সবয়সময়। একসময় শরীরের প্রতি চরম অবহেলায় বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো গোবিন্দ। সেই সূত্রেই কয়েকবার কানাই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সূচনা। লেখাপড়া কানাই-এর চিরকালই বড় পছন্দের। চিকিৎসা ছাড়াও রামকানাই তাকে ঘরে ডেকে আদর আপ্যায়ন করেছিলেন ঢের। সেই থেকে গল্পের ছলে​ রামকানাই-এর ঘরে আসা যাওয়া হয়েছিলো কয়েকবার। ডাক্তারবাবুটি তাকে ভালো চোখেই দেখতেন। সু-নজরে দেখতেন ঘরের আর সকলেও। এই সকলের সু-নজর এড়িয়ে সরোজিনী আর গোবিন্দর মধ্যে কখন যে নজরের বিনিময় হয়ে গেল , কখন সে নজর​ প্রণয় রসে আবিষ্ট হয়ে দুটি নিস্তরঙ্গ হৃদয়ে তুমুল উথাল পাথাল তরঙ্গ জাগিয়ে দিলো, তা স্বয়ং বিধাতাই জানতে পারেন। তখন সরোজ সবে নবম শ্রেণীতে। ইস্কুল যাবার পথে কখনো কখনো সামনে সাইকেল নিয়ে হাজির হতো গোবিন্দ। প্রতিদিন একই সময় স্কুলের পথেই তার কাজ পড়ে যেত বার বার। সরোজ সেসব ভালোই বুঝতো। মুখ টিপে হাসতো, তারপর একসময় নিজেদের মধ্যে এই আড়ালের প্রয়োজনীয়তা আর অনুভব করেনি কেউই। সরোজ জানতো, এই সামনের মাটির বাঁধটুকু পেরিয়ে গেলেই গোবিন্দ দাঁড়িয়ে থাকবে, তারপর বাকি পথটা পায়ে হেঁটে স্কুলের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবে।

অনুরাগের প্রগাঢ়তা যত শিকড় বিছালো, এক গভীর অনুভূতি জাল বিস্তার করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল দুটি প্রাণ। প্রতিদিনের বরাদ্দ হাতে গোনা কিছু প্রহর ক্রমশ ক্ষুদ্র মনে হতে লাগলো। ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সোজা পথটি মাঝেমধ্যেই দিক পরিবর্তীত হয়ে নদীর ধারের রাস্তায় গিয়ে উঠতো। লোকচক্ষুর অন্তরালে দুজনার কত অবসর যাপন ছিল সেই ভাঙা মন্দিরে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ চারটি বছর, এর মধ্যে সামান্য কিছু ঘটনাও গাঁয়ের মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়নি, নিন্দুকের মুখে মুখোরোচক​ কত রটনা ঘুরে বেড়িয়েছে, চাটুকারি মন্তব্যে স্ফীত হয়েছে, ক্রমশ খবরটা এক বিরাটাকার ধারন করেছে। রামকানাই-এর কানে যে সেসব কথা পৌঁছয়নি এমনটা নয়, তবে তিনি সেকথার আমল দেননি কখনো। কিন্তু এই কথা যেদিন পবিত্রর কানে পৌঁছল, সেদিন বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেল। রামকানাই সেদিন সদরে গিয়েছিলেন ওষুধ আনার কাজে। গ্রামের ছেলে মতি গোবিন্দর অন্তরঙ্গ বন্ধু, সাইকেল নিয়ে বহু খুঁজে গোবিন্দকে পেলো হেড়োভাঙা বাজারের কাছে। হন্তদন্ত হয়ে খবর দিলো মোতি...."তুই এখানে? রেণু এসেছিলো তোর খোঁজে।"

__"হঠাৎ? কেন?"

__" সরোজুকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছে ওর দাদা, শুনলাম প্রচন্ড মেরেছে।"

__" গায়ে হত তুলেছে? কেন? কি করেছে ও?"(চিৎকার করে উঠলো গোবিন্দ)।

__"জানিনা, বোধহয় তোদের কথা শুনেছে কোথাও।"

দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য ভাবে ছুটে গিয়েছিল গোবিন্দ সরোজিনীর বাড়ির সামনে, সরোজের ঘরের জানলাটা কাটে-কপাটে আঁটা, চারিদিক নিস্তব্ধ। জানতে পারেনি কিছু। রেণুই পরে সবটা খবর দেয়।​ সরোজের ঘরে তালা দিয়ে রেখেছিলো পবিত্র। ডাক্তার বাবু বাড়ি ফিরে চাবি খুলে দিয়েছেন। ছেলে আর তার মাকে খুব বকাবকিও করেছেন।​ তবে সরোজিনীর অবস্থা এখন কেমন,সঠিক জানতে পারেনি রেণুও। এমতাবস্থায় ঘরে ঢোকা সমীচিন বোধ করেনি। পরবর্তী দিনের আগে তার পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব নয়। এই রেণুই হল সরোজের একমাত্র অন্তরঙ্গ সই যে তার মনের সকল কোনার খবর রাখে। ডাক্তারবাবু ফিরে এসেছেন শুনে গোবিন্দ খানিক নিশ্চিন্ত বোধ করলো কিন্তু সরোজের কোন খোঁজই ঠিকমত না পেয়ে বড় অস্থির হয়ে পড়েছিলো গোবিন্দ।​

​একদিন দুইদিন করে দেখতে দেখতে কেটে গেল সাতটা দিন। সরোজিনী এই কদিনে ঘর থেকে বের হতে পারেনি একবারও, গায়ের ব্যথায় বেশ কিছুদিন জ্বরে ভুগেছে , এখনো শরীরটা তেমন জুতসই নয়, দেহের স্থানে স্থানে কালসিটে দাগগুলো এখনো স্পষ্ট। ঘরের পেছনের​ রাস্তাটার একপাশে ডাঙ্গুলী হাতে খেলে বেড়াচ্ছে কালি। ঈষৎ খোলা কপাটের ওপাশ থেকে​ নিচুস্বরে সরোজু ডেকে উঠলো.…...."কালি! শোন...."​ ​

একটা ছোট্ট চিরকুট কালির হাতে গুঁজে দিয়ে বলল....

__"এটা গোবিন্দ দাদাকে দিবি, বলবি ডাক্তার দাদু ওষুধ লিখে দিয়েছে , কেমন? অন্য কাউকে দেখাবি না। শুধু গোবিন্দ দাদার হাতেই দিবি। আর শোন, ওষুধ ঠিকমত খাচ্ছে কিনা, দুকলম লিখে দিতে বলবি।"

কালি ঘাড় নেড়ে ছোট প্যান্টুলানের পকেটে চিরকুটটা গুঁজে রাখলো। গোবিন্দর হাতে চিরকুটটা দিয়ে কালি বলল...

__"এই নাও উষুদ, সরোজু​ দিদি ঠিক করে খেতে বলল। তুমি উষুদ খেয়ে লিখে দাও.....উষুদ খাইছিই।"

তাড়াতাড়ি চিরকুটটা খুলে চোখ বোলালো গোবিন্দ, সরোজিনীর লিখেছে........"আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল। অপেক্ষায় রইলাম।"​

​খানিক চিন্তা করে গোবিন্দ তলায় লিখে দিল.... "কয়েকটা দিন যেতে দাও, পরিস্থিতি একটু শান্ত হোক, দেখছি।"

এই অবধি সব ঠিকই ছিল। কিন্তু বিপদ তো বলে কয়ে আসেনা কখনো, আর অঘটন যদি ঘটার থাকে, সেই লিখন সময়ের আগে খন্ডাতে কবে কে পেরেছে?কোন্ গাঢ় ক্ষতের ওষুধ কার হাতে দিলে কাজ হবে বেশি, কার হাতে একেবারেই দেওয়া চলে না, সেকথা বোঝার বোধ কালির মত অবোধ শিশুদের ভারি থাকে! অতি সন্তর্পণে​ চিরকুটটা সামলিয়ে বুকপকেটে রেখে সরোজুর ঘরের দিকে রওনা দিলো কালি। খানিক এগিয়েই পথের মাঝে দেখা পবিত্রর সাথে।​ চিরকুটটা পবিত্রর হাতে দিয়ে বলল......

___"দাদা, এটা সরোজু দিদিকে দিয়ে দেবে? উষুদ..... গোবিন্দ দাদা দিলো । দাদা কেমন করে উষুদ খায় লিকে দিয়েছে।"

​ চিরকুটটা খুলে ভালো করে চোখ বুলিয়ে​ নিলো পবিত্র। এতোক্ষণে তার যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছে।​ এত্তোটুকু একটা চিরকুট বারুদের স্তুপে হঠাৎ ঠিকড়ে পড়া এক কনা স্ফুলিঙ্গের মত কাজ করে গেল।​ প্রতিহিংসায় আস্ফালন করতে করতে পবিত্র দিগ্বিদিক ভুলে জঙ্গলের বন্য হিংস্র জন্তুর মত​ ​ ছুটে গেল গোবিন্দর ঘরের দিকে।​ চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করলো....

__"গোবিন্দ.... বের হয়ে আয়, কথা আছে।"

গোবিন্দ​ ঘর থেকে বেরিয়ে বেশ একটু হতবাকই হয়ে গেল।

__"কি ব্যপার গোবিন্দ! সরোজ আর তোর সম্পর্ক নিয়ে আমাদের পরিবারের যে বিশেষ আপত্তি, সেকথা তুই বুঝতে পারিসনি বুঝি ? খবর পাচ্ছি নানা ভাবে তুই তাকে বিরক্ত করছিস, তাকে খেপিয়ে তুলছিস। এসব কি ঠিক হচ্ছে? সরোজ তোকে ভুলতে চাইছে, ও বুঝতে পেরেছে একটা ছেলেমানুষি করে ফেলেছে, "

__"তাই কি?"

আরো কঠোর স্বরে বলে উঠলো পবিত্র​

__" হ্যাঁ হ্যাঁ তাই। খবরদার ওকে আর বিরক্ত করিস না। এর ফল ভালো হবে না।"

__"তুমি ধমকি দিচ্ছো বুঝি?"

__" না, ধমকি দিচ্ছি না। তোকে বোঝাচ্ছি। এই ধর​

তোর ঘরে একটা বোন আছে তো? রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা ও করে, এই হেরোডাঙায় কত মানুষের কুনজর আছে তোর বোনের দিকে​ ....."

__" পবিত্রওও...."

__" ওও! রাগ হচ্ছে বুঝি? অসুবিধা হচ্ছে?"

__" তুমি যদি সরোজুর দাদা না হতে, তাহলে আমি বুঝিয়ে দিতাম কটা ধানে কটা চাল।"

পবিত্রর চোখদুটোর মধ্যে​ এমন এক বিদ্বেষ মিশ্রিত জঘন্য অনিষ্টকারী চাহনি ঠিকরে বেরোচ্ছে, দেখে মনে হয় যেন কোন এক উগ্র শয়তান আজ ভর করেছে তার উপর। ঘৃণ্য স্বরে হেসে বলল....

__"তোরা বোধহয় ভুলে গেছিস আমরা ডাক্তারের বংশ। জানি বহু কষ্ট করে মানুষ হয়েছিস তোরা। তোদের বাবাতো কোথায় গেল, সে খবরও জানি। তোর মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। পেটের দায়ে মানুষ কি না করে, ছোট হলেও আমাদের চোখে তো...."

থাকতে না পেরে গোবিন্দ ছুটে এসে কলার টেনে ধরলো পবিত্রর। আশেপাশের মানুষজনও বের হয়েছে ততক্ষণে। পবিত্র বোধকরি একটু ভয়ও পেয়েছে। কলারটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার সময় বলে গেল.....

__

"আচ্ছা! দেখবো ক্ষণ, তোকে হাতে না পাই সরোজু কে তো পাবো। টুকরো করে দেবো, দেখি কেমন করে আটকাস।"

গোবিন্দ বেশ দমে গিয়েছে। পবিত্রকে সে বিলক্ষণ চেনে। স্থানীয় সমাজবিরোধীদের সঙ্গে একটু সখ্যতা আছে। রামকানাইয়ের পরিবারে কোথা থেকে এক কুলাঙ্গারের জন্ম হয়েছে,​ চাইলে পারেনা এমন কিছুই নেই। পবিত্র একে একে কু-ঈঙ্গিত দিয়েছে তার বোনের প্রতি, মায়ের প্রতি। আর সরোজু? একবার সুযোগ পেয়ে এমন মেরেছে, এখনো​ সুস্থ হয়নি। আবার যদি?? না না! ভয়ে কেঁপে উঠলো গোবিন্দ। চাকরির জায়গাটাও এখন ঠিক হয়নি। টিউশনির কটা টাকা, সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লো গোবিন্দ।

​আজ রাতভর দুটিচোখে ঘুমের এলোনা কিছুতেই। এমন এক​ বীনিদ্র রাতে বারংবার অজানা​ আশঙ্কাগুলি ডালপালা বিছিয়ে উত্তাল হয়ে উঠলো গোবিন্দর মনে। আসন্ন দিনগুলিতে প্রতিকূলতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই বৈপরীত্য থেকে নিস্তারের উপায় যে কি..…সে বিষয়ে চিন্তার কোন নাগাল পাওয়া গেল না। পবিত্রর কথাটা একবার কোন ভাবে কানাই ডাক্তারের কানে​ তুলে দিতে পারলে সরোজুকে নিয়ে গোবিন্দর দুশ্চিন্তা অনেকটা কমে যায় হয়তো , কিন্তু গোবিন্দর বোন? কে রক্ষা করবে তাকে এই দুর্বিনীত জানোয়ার গুলোর হাত থেকে ? কিছুদিনের জন্য তাকে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা না করতে পারলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। ভেবে চিন্তে কোন একটা পন্থা তাকে নিতেই হবে, কিন্তু সেটা যে কি, সে বিষয়ে ভেবে কূলকিনারা করতে পারেনি গোবিন্দ।

সরোজিনী জানতে পারেনি কিছুই। অপেক্ষায় প্রহর গুনেছে, একটা উত্তরের অপেক্ষা, একটা ডাকের অপেক্ষা,​ একটা খবরের অপেক্ষা। রাগে অভিমানে চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে প্রতিপল , পরক্ষণে অগাধ বিশ্বাসে​ বুক বেঁধেছে। এমন করেই দিন গড়িয়েছে আরও একটা দিনে, দিন সাতেক পরে রেণু সংবাদ আনলো.....

__"গোবিন্দদের বাড়িতে তালা দেওয়া, ওরা কাকদ্বীপে কাকার বাড়িতে রয়েছে। গোবিন্দর বাড়িতে দুইদিন রাতভর কারা যেন​ উপদ্রব চালিয়েছে খুব, প্রতিদিন রাতভর ইট পড়তো চালে। ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিল ওর মা আর বোন।"

খুব শীঘ্রই​ সে​ ফিরবে,​ যাহোক একটা উপায় ঠিক বের হবেই, পরমাত্মা একদিন তো সদয় হবেন ই । রাশিকৃত নতুন উৎকন্ঠা নিয়ে সরোজিনী পথ চেয়ে থেকেছে, কিন্তু হায়রে অদৃষ্ট!!....এ কেমন ফেরা? এমন দিনের জন্যই কি এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ? এ কোন অশুভ ক্ষণ? এতোদিনের পুঞ্জিভূত সাধের শৈলটি​ , কেমন সমূলে ভেঙেচুরে মুখ থুবড়ে পড়লো । ঈশ্বরের অমন ন্যায় বিরুদ্ধ আচরনে অভিমানী চোখদুটি ভিজে উঠছে বারবার ......

__"এমনটা তুমি করতে পারলে ঠাকুর? আজ তোমার এই ঘোর অবিচারের বিরুদ্ধে বিচার চাইতে এসেছি তোমাকেই কাছে।"

এক​ রূঢ়পলক দৃষ্টি​ অসির ফলা হয়ে এমন বর্ষিত হল,স্বয়ং বিধি আজ চোখ লুকিয়েছেন সে দৃষ্টির অগোচরে। পশ্চিম দিগন্তে​ সূর্যের রক্তিম ছটা ঢাকা পড়েছে ঘন মেঘের আড়ালে।​ আজ যেন সময়ের আগেই আঁধার হয়ে এলো চতুর্দিক। জমাটি মেঘ দেখলে মনে হচ্ছে, যে কোন সময় আরম্ভ হবে প্রবল বর্ষণ। কানাই ডাক্তার ঘরে আর উঠানে পায়চারি করতে করতে কন্যার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠলেন,​ চিন্তান্বীত ভাবে গায়ে পাঞ্জাবি গলিয়ে রুষ্ঠস্বরে বলে উঠলেন...

__"এতোগুলো মানুষ কেউ জানো না সরোজ কোথায়? বলিই.....ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে সেই কোন বেলায়, কাআরো চিন্তা হয়নি?"

ঘরের একপাশে উদ্বিগ্ন মুখে রেণু​ দাঁড়িয়ে আছে অধীর অপেক্ষায় ,​ ডাক পড়েছে কালিরও । খাটের এক কোনায় বসে এক নাগাড়ে কেঁদে চলেছেন​ সরোজের মা কুমুদিনী।​ পবিত্র খোঁজ করতে বের হয়েছিল একবার, সারা দুপুর​ আশেপাশে ঘুরে এসে জানিয়েছে , এই এলাকায় কোথাও​ সরোজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি । রামকানাই আর অপেক্ষা না করে লম্বা ছাতাখানা হাতে নিয়ে দ্বিতীয় দফা খোঁজের জন্য বের হতে উদ্যত। বললেন....

___"আমি একটিবার এগিয়ে দেখি, যদি খুঁজে না পাই তবে একেবারে থানায় যেতে হবে।"

কুমুদিনী অসহায়ের মত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন । পাঞ্জাবির পকেটে হাত গলিয়ে রুমালটা বের করে কানাইও একবার চোখটা মুছে নিলেন। ওদিকে ক্ষীণ নুপূরের রিনিরিনি ধ্বনি কানে এসে বাজলো।​ সচকিত ভাবে সকলে চেয়ে দেখলেন ফটোকের ওপাশে মন্থর চালে সরোজ এসে দাঁড়িয়েছে..... ধীর ,​ কুন্ঠিতা, অবসন্ন।

​ এরপর..... ৩য় পর্ব

■ প্রথম পর্ব পড়ুন ■ পরিচিতি

Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.