x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

■ শ্রীশুভ্র / উৎসবের উদযাপন না রোগের লক্ষ্মণ

sobdermichil | অক্টোবর ২১, ২০২০ | | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
শ্রীশুভ্র / উৎসবের উদযাপন না রোগের লক্ষ্মণ

ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল। ছিল বারোয়ারি পুজো হয়ে গেছে রাজনৈতিক নেতানেত্রীর পুজো। একসময় শোনা গিয়েছিল বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। আমাদের বঙ্গে দুর্গোৎসবও এখন ক্ষমতার উৎস। সেই দিন আর নাই। পাড়ার সকলে মিলে চাঁদা তুলে বারোয়ারি দুর্গা পুজো করার চল। পাড়াই এখন বেহাৎ হয়ে গিয়েছে। পুজোকমিটি এখন রাজনীতির কাছে বাঁধা পড়িয়াছে। এক একটি পুজো এক একজন হেভিওয়েট মন্ত্রী কিংবা বিধায়ক কি সাংসদ, নিদেন পক্ষে রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীর পুজো। এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলির মরশুমী লগ্নী। রাজনীতি আর ব্যাবসা। বৃহৎ পুঁজি আর বিজ্ঞাপন। এই চক্রব্যূহে কোথায় মা দুর্গা? আর কোথায় তার পুজারী? এবং কোথায় মানুষের উৎসব। মানুষের উৎসব টিম টিম করে কিছুটা ধরে রাখছে বহুতল আবাসনগুলির দুর্গাপুজোই। তার বাইরে মানুষ শুধুই এখন ভিড়। মানুষ এখন সংখ্যা। কোন পুজোমণ্ডপে ঘন্টায় ঘন্টায় সেই সংখ্যা বেড়ে চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সেটাই এখন দুর্গাপুজোর টিআরপি। সেই সংখ্যার আনুপাতেই পরের বছরে বৃহৎ পুঁজির লগ্নী বাড়বে বা কমবে। সেখানেও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার ভিতরে। লগ্নী আর প্রচার থেকে ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষার ব্যলেন্সশীট। আর অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতানেত্রীর ক্ষমতার জৌলুস প্রদর্শন। ভোটের বাজারে ভোটারের পালকে নিজের দিকে ধরে রাখার বাৎসরিক আয়োজন। মাঝখানে মাদুর্গা স্বয়ং অসুরসহ এখন একটি মরশুমী প্রোডাক্ট মাত্র। তার বাইরে তাঁর মহিমা অস্তমিত আজ।

মহিমা এখন যা কিছু। যত কিছু। সবই রাজনীতি আর বাণিজ্যের। কলকাতার বারোয়ারি দুর্গাপুজোর এই যে পরিবর্তন, মানুষের উৎসব থেকে রাজনীতি আর বাণিজ্যের বিপনন। এর ভিতর উৎসব মুখর বাঙালির স্থান কতটুকু। সেটি হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ মানুষ রাজনীতি আর বাণিজ্যের যাঁতাকলে এমন ভাবেই আটকিয়ে পড়েছে যে। সে আর ভালো করে স্পষ্ট করে কিছু বুঝতে পারার অবস্থায় নাই। তাকে যা দেখানো হচ্ছে। যেভাবে দেখানো হচ্ছে। যে ভাবে দেখতে বলা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ঠিক সেই ভাবেই সেটাই দেখছে। এবং দেখতে চাইছেও। সে’ও মাদুর্গার থেকে পুজোর উদ্বোধনে আসা হেভিওয়েট নেতানেত্রী মন্ত্রী বিধায়ক সাংসদ নিয়ে মশগুল বেশি। মাদুর্গা নেহাতই উপলক্ষ্য মাত্র। মানুষের মনোযোগ উদ্বোধকের ক্ষমতার জৌলুসের দিকেই। এই যে একটি পরিবর্তন। এটি কিন্তু একদিনে ঘটেনি। সমাজের উপর পার্টি রাজনীতির সর্বাত্মক প্রভাবের হাত ধরেই দিনে দিনে এটি ঘটা শুরু করেছে।

রাজনৈতিক পালাবদলের হাত ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক শিবির ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। আরও এক ভিন্নতর এবং বহিরাগত রাজনৈতিক শিবির ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। কিন্তু সমাজের উপরে রাজনৈতিক শিবিরগুলির, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের সর্বাত্মক প্রভাবের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরঞ্চ তা আরও সম্প্রসারিত হয়ে হাইজ্যাক করে নিয়েছে মানুষের শিল্পসংস্কৃতি, ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব। ফলে মানুষের উৎসব আজ আর মানুষের নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎসবে পরিণত হয়ে গিয়েছে। এবং রাজনীতির হাত ধরে সেই উৎসবে এসে মিলেছে বাণিজ্যের স্বার্থ নিয়ে আসা বৃহৎ পুঁজি। তাহলে মানুষ কি করছে? কেন মানুষ দলে দলে প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ভিড় বাড়াতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। লাইনের পর লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে দুর্গোৎসব পালন করছে। আর সহাস্য মুখে সেল্ফি ছড়াচ্ছে। যত সেল্ফি তত উৎসব। দুই মিনিটের মণ্ডপ দর্শনের জন্য দুই ঘন্টার লাইন। না মানুষের আজ তাতেই আনন্দ। শুধুই মাথার সংখ্যা। মেধা নাই। গতি আছে। চিন্তা নাই। কোলাহল আছে আলোচনা নাই।

আলোচনা থাকলে। চিন্তা থাকতো। চিন্তা থাকলে মেধা থাকতো। মেধা থাকলে প্রশ্ন থাকত। প্রশ্ন থাকলে মানুষ দেখতে পেত। গণ্ডগোলটা ঘটে গেল কোথায়। কেন। কিভাবে। সামাজিক উৎসব হয়ে গেল বাণিজ্যিক উৎসব। বারোয়ারি পুজো হয়ে গেল নেতানেত্রীর পুজো। মানুষ পরিণত হয়ে গেল ভিড়ে। যত ভিড় তত টিআরপি। যত টিআরপি তত বাণিজ্য। যত বাণিজ্য তত রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি। যত রাজনৈতিক শক্তির বৃদ্ধি তত কোনঠাসা মানুষ আর মানুষের স্বাধীনতা। মানুষ এখন আর ভোট দেয় না। মানুষকে দিয়ে ভোট দেওয়ানো হয়। বৃহৎ পুঁজি যখন যেভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। মানুষ বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষায় তখন সেইভাবেই ভোটের বাক্সে নির্দিষ্ট বোতাম টিপবে। আর সেই পথেই গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে পুঁজিতন্ত্র মানুষকে বেঁধে ফেলেছে। আমাদের দুর্গাপুজো, কলকাতার দুর্গাপুজো, শহরতলীর দুর্গাপুজোও সেই ফাঁদে ধরা পড়ে গিয়েছে কয়েক দশক হলো।

তত্বকথা থাক। ঘরের কথায় আসি বরং। দুর্গোপুজোয় আমাদের কর্তব্য কি? জামাকাপড় কেনাকেটা করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা। আমরা সেটাই রাখি। শুধু তো আর জামা কাপড় কেনাকেটা করা আর আত্মীয়স্বজনদের দেওয়া থোয়াই নয়। ঘরবাড়ি রঙচঙ করা। নতুন আসবাব পত্তর। নতুন নতুন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ইত্যাদি। খরচের বহর নেহাৎ কম নয়। কিন্তু পুজোয় সবকিছুই নতুন হলে মনটা ভরে ওঠে খুশিতে। এমনকি দাম্পত্যের বাইরে নতুন সম্পর্ক ঘটে গেলে তো কথাই নাই। পুজো মানেই নতুন জুতো। নতুন সাজ। নতুন সামগ্রী। সাথে নতুন মুখ হলে তো সোনায় সোহাগা। তারপর লাইনে দাঁড়ানো। সেল্ফি তোলা। দুই মিনিটের মণ্ডপদর্শন। না চোখ দিয়ে দেখার সময় নাই। সিকিউইটির ঠেলা আর জনস্রোতের ঢেউ। তাই দুই মিনিটই ক্যামেরার লেন্সেই মণ্ডপ ও প্রতিমা দর্শন। আজকাল কেউ আর খালি চোখে থাকে না। চোখ থাকে মোবাইলের স্ক্রীনে। সেখানেই যাকিছু দেখতে দেখতে ছবি তুলে নেওয়া। তারপর ওয়াল পোস্টিং লাইক কমেন্ট। আর বাড়ি ফেরার আগে পেটভোজন। পকেট হালকা হলেও ক্ষতি নাই। যত হালকা হবে তত আনন্দ। পুজোর কয়টি দিন এটাই বাঙালির রেসিপি।

এই যে আনন্দ। সেই আনন্দের যে ভিড়। তাতেই মানুষের ঢল। কিন্তু উৎসব মানে তো মিলনের আনন্দ। মানুষের সাথে মানুষের মিলন। ভাবের আদান প্রদান। আনন্দের দেওয়া নেওয়া। দুঃখ শোকে সমব্যাথী হয়ে সমবেদনায় পাশে থেকে অন্যের ক্লেশ হালকা করার প্রয়াস। অন্যের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে সমগ্রকে অনুভবের লগ্নই তো উৎসব। আজ কোলকাতা ও শহরতলীর দুর্গোপুজোয় সেই উৎসবের ছোঁয়া কোথায়? কতটুকু? এবং সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন। কজন উৎসাহী সেই উৎসবের ছোঁয়া পেতে? এই যে এত মানুষের ঢল প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে। এই যে এমন জনস্রোত। এই জনস্রোতে মানুষের সাথে মানুষের আনন্দের সংযোগ কোথায়? সকলেই সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন। সকলেই সকলের দূরবর্তী। গায়ে গা ঠেকে যাওয়া মানুষটির সাথেও সংযোগের কোন সূত্র তৈরী হওয়ার উপায় নাই। কোন ভিড়েই তা থাকে না। থাকার কথাও নয়। আর সেই কারণেই আমাদের উপলব্ধি করার কথা ছিল। ভিড় মানেই সংযোগ নয়। আর সংযোগহীনতায় আর যাই হোক উৎসবের আগমন ঘটে না।

ফলে কার্যত এই এতবড়ো এক সমাজিক উৎসব বাঙালির। সে শুধু নামেই উৎসব। কাজে নয়। ভিড়ের উদযাপন মাত্র। রাজনীতি ও বাণিজ্যের স্বার্থরক্ষা। উৎসবের নয়। মানুষের সাথে মানুষের সংযোগের যে রাজপথ সামাজিক উৎসব। বাঙালির জনজীবনে, সেই রাজপথ বহুদিন হলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজনীতি আর বাণিজ্যের কাছে মাথা মুড়িয়ে। মানুষ আজ সকলেই একলা। পারিবারিক ভাবে একলা। পাশের বাড়ির সাথে পাশের ফ্ল্যাটের পরিবারের সাথে প্রাণের সংযোগ নাই। উৎসবের সংযোগ হবে কি করে? সারা বছর যেভাবে যায় আমাদের সেখানে মানুষের সাথে মানুষের আনন্দের যোগ কতটুকু? ফলে একটা পুজো মরশুম আসলেই যে চিত্রটা পাল্টিয়ে যাবে। বিষয়টা তেমন নয় মোটে। ফলে আজকের দুর্গোপুজায় আমরা সকলের মাঝেই থাকি। কিন্তু সকলে আলাদা হয়ে। আর আমাদের চারপাশে রাজনীতি ও কর্পোরেট বাণিজ্যের দেওয়াল ঘিরে থাকে শুধু। যার বাইরে কোন মুক্তাঞ্চল আর অবশিষ্ট নাই এই বাংলায়। আমাদের বাঙালির। মানুষের উৎসবে মানুষ আজ সংখ্যা শুধু। শুধু ভিড়। শুধু টিআরপি। তাই উৎসব আজ বৃহৎপুঁজি আর রাজনীতির। মানুষের নয়। মানুষই সেই কথা বুঝতে পারার মতোন অবস্থায় নাই। ভয়ের কথা সেটাই। দুর্গাপুজো তাই আর উৎসবের উদযাপন নয়। এক ভয়াবহ রোগের লক্ষ্মণ মাত্র।


১৬ই অক্টোবর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.