x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২০

শনির বচন

5 | অক্টোবর ১০, ২০২০ | |

আসুন মৃতদেহ নিয়ে ভোট কুড়াতে যাই। আমাদের রাজ্যে এই কৌশলটি বহু ব্যবহারেও আজও ভোঁতা হয়ে যায় নি। বরং দিনে দিনে ধারে ও ভারে এর ওজন ও কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছে বই কি।

আসুন মৃতদেহ নিয়ে ভোট কুড়াতে যাই। আমাদের রাজ্যে এই কৌশলটি বহু ব্যবহারেও আজও ভোঁতা হয়ে যায় নি। বরং দিনে দিনে ধারে ও ভারে এর ওজন ও কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছে বই কি। যে কোন খুন ধর্ষণ হোক না কেন। একবার একটা ডেডবডি বাগিয়ে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। তারপরে ডেডবডি যদি কোন রাজনৈতিক দলের দলীয় সম্পত্তি হয় তো কথাই নাই। ডেডবডির মালিক জীবদ্দশায় কতজনের ডেডবডি ফেলে দিয়েছিলেন কি দেন নি। সেটা কোন বড়ো কথা নয়। বড় কথা রাজনৈতিক পথ অবরোধে নিজ দলের ডেডবডি’র মতোন অস্ত্র ভারতীয় গণতন্ত্রে খুব কমই আছে। এমনকি ডেডবডি যদি নিজ দলের দলীয় সম্পত্তি নাও হয়। তাহলেও অসুবিধা নাই। শুধু যে কোন একটা ডেডবডি হাইজ্যাক করতে পারলেই হয়। তাহলেই রেলের চাকা বাসের চাকা থামিয়ে দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। রাজনৈতিক শক্তির কার্যকারিতা। মানুষের মনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সব কিছু ওলোট পালোট করে দেওয়ার ক্ষমতার বিষয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণার সঞ্চার হবে। ভয়ে ভীতে সমীহ আদায়ের যে ফর্মুলায় ভারতীয় উপমহাদেশের গণতন্ত্র টিকে থাকে। সেটিও দৃঢ় হবে। পরবর্তী বা আসন্ন নির্বাচনে অধিকতর ভোট নিশ্চিত করতে এই ডেডবডি নিয়ে রাজনীতি অধিকাংশ সময়েই সফল হয়ে ওঠে। শুধু ডেডবডি পাওয়াটাই আসল কথা। 

বিয়াল্লিশ জন ‌জওয়ানের ডেডবডি কেমন নিরঙ্কুশ জয় এনে দিল একটি নির্দিষ্ট রজনৈতিক শক্তিকে। সেটা দেখে ভারতবাসী মাত্রেই ভারতীয় গণতন্ত্রে ডেডবডির বিপুল কার্যকারিতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ফলে পথেঘাটে যখন তখন রাজনৈতিক দলের পতাকায় আবৃত ডেডবডি নিয়ে পথ অবরোধ, মিছিল মিটিং, ডেববডি বগলদাবা করে ইটবৃষ্টি, টায়ারে অগ্নিসংযোগ, পার্শ্ববর্তী দোকানপাট ভাঙচুর ইত্যাদি প্রতক্ষ্য করতে হয়, হবে আমাদের। তাতে মৃতপ্রায় রোগী অবরুদ্ধ এম্বুলেন্সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লেও বুঝতে হবে। মানতে হবে রাজনীতির রঙিন পতাকায় আবৃত ডেডবডির মূল্য জীবিত কিংবা অসুস্থ মানুষের জীবনের থেকেও অনেক বেশি দামী ও মূল্যবান। ভারতীয় এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে ডেডবডির এ হেন কার্যকারিতা দিনে দিনে অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে। 

ফলে আমাদের দেশের রাজনীতিতে খুন ধর্ষণ যাই হোক না কেন এক বা একাধিক ডেডবডির জন্য অনেকেই হয়তো চাতক পাখির মতো বসে থাকে। রাজনৈতিক আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তুলে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে। শুধু হারানো জমি পুনরুদ্ধারই নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিসর ও শক্তি বাড়িয়ে নিতেও ডেডবডির মূল্য অপরিসীম। অপরিসীম মূল্য সংসদীয় নির্বাচনে জয় হাসিল করতেও। আগেকার দিনে সমাজে প্রতাপশালী নৃপতি নরবলি দিয়ে যেমন তাঁর ক্ষমতার মদমত্ততা রক্ষা ও বিস্তার করতে যাগযজ্ঞ পুজাআচ্চার আয়োজন করতেন। বিষয়টি অনেকটাই সেইরকমই। সেদিনের সেই যাগযজ্ঞ আজ আর নাই। কিন্তু নির্বাচনী যজ্ঞ রয়েছে। সেদিনের নরবলি প্রথা আজ আর নাই। কিন্তু দলীয় পতকায় আবৃত ডেডবডি আজও রয়েছে। ফলে ভারতবর্ষ রয়েছে ভারতেই। শুধু সময় সুযোগ মতো এক বা একাধিক ডেডবডি জোগার করে ফেলতে পারলেই হলো। প্রয়োজনে ডেডবডি হাইজ্যাক করতে হলেও পিছুপা হলে চলবে না। রাজ্যরাজনীতিতেও এই ডেডবডি হাইজ্যাকের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এবং অনেক সময়েই একই ডেডবডি দিয়ে যুযুধান দুই রাজনৈতিক পক্ষের ভিতর লড়াই কাজিয়াও লেগে যায়। এ বলে আমার দলের ডেডবডি। ও বলে ওর দলের ডেডবডি। জীবিত মানুষের মূল্যের থেকেও তখন ডেডবডির মূল্য নিলামে চড়ে বাড়তে থাকে। এটাই তো গণতন্ত্রের মহিমা। 

আসলে মুশকিলটা হয়েছে গোড়াতেই। ইউরোপে গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল সমাজদেহের অভ্যন্তর থেকেই। বাইরে থেকে রাষ্ট্রূীয় ক্ষমতায় তাকে সমাজের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। সমাজ উপলব্ধি করেছিল ক্ষমতাশালী নানান গোষ্ঠীর পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের যাঁতাকল থেকে জনগণের মুক্তির একটিই পথ। সেটি গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। ফলে সেখানে গণতন্ত্র আর নির্বাচন। রাজনীতি আর ভোট সমার্থক নয়। গণতন্ত্র সেখানে জীবনযাপনের একটি সামাজিক পদ্ধতি। রাষ্ট্র সেই পদ্ধতির রক্ষক মাত্র। তাই সেই সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ভালোমন্দ সুরক্ষা নিরাপত্তা সমৃদ্ধি ও বিকাশের বিষয়গুলি দেখাশোনা করার দায়িত্ব ও কর্তব্যই রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। এই কারণেই ইউরোপ আমেরিকায় গণতন্ত্র মানুষের বিকাশ ও সমৃদ্ধির রাজপথ। 

কিন্তু গোড়ায় গণ্ডগোল। আমাদের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তর থেকে গণতন্ত্রের জন্ম হয় নি। সাগর পারের কমিউনিজমের মতোই ডেমোক্রেসিও সাগর পারেরই। একদমই ভারতী সংস্কৃতিজাত নয়। সেই সাগর পারের ডেমোক্রেসি জোর করে বলপূর্বক আমাদের সমাজের উপরে চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশ। ফলে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে দেশের সমান্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে সামিল হয়েছে। আর পাইক বরকন্দাজের বদলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতা দখলের এক মাত্র পথ ঐ বাহুবলে বুদ্ধিবলে প্রচার অপপ্রচারের শক্তিতে ভোট ক্যাপচারের মাধ্যমেই। রাজনৈতিক নীতি নৈতিকতার বদলে ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতিই যখন মূল চালিকা শক্তি। এবং রজকোষের উপরে প্রভুত্ব করাই যখন মূল উদ্দেশ্য। তখন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ডেডবডির মতো বন্ধু আর কে আছে। তাই একটা পুলওয়ামা একটা গোটা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত করে দিতে পারে। এই কারণেই আসন্ন রাজ্য নির্বাচনের আগে যে দল যতগুলি ডেডবডি হাইজ্যাক করতে পারবে, সেই দলই নির্বাচনী লড়াইয়ে ভোটের ময়দানে এডভান্টেজ পাবে তত বেশি। 

যত বেশি ডেডবডি। তত বেশি গণ্ডগোল পাকানোর সুবিধা। তত বেশি ভাঙচুর অবরোধ ইটপাটকেল বৃষ্টি অগ্নি সংযোগের সুযোগ। তত বেশ‌ি বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের বিরুদ্ধে প্রচার অপপ্রচারের দামামা বাজানোর পথ খুলে যাওয়া। তত বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ তুলে জনগণের সমবেদনা জোগারের অজুহাত। এই যে একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির জন্মের আসল কারণটাই হলো, যে গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে এই সংস্কৃতির জন্ম। সেই গণতন্ত্রের জন্ম আমাদের সমাজ জাত নয়। এবং আমরা সেচ্ছায় এই গণতন্ত্রকে দত্তকও নিই নি। আমাদের উপর জোর করে এই তন্ত্রটিকে চাপিয়ে দেওয়ায়, আমাদের দেশের ক্ষমতালোভী সামন্ততান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলির পোয়াবারো হয়েছে। ব্রিটেশের ছেড়ে যাওয়া গদিতে এরা পালা করে বসে গোটা দেশ জুড়ে শোষণ কার্য চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সেই প্রাক ব্রিটিশ যুগের সামন্ততন্ত্রের মতোই। সামন্ত রাজাদের জায়গা নিয়েছে আজকের সাংসদ বিধায়করা। তাদের পিছনে দলীয় নেতাকর্মী। আর তাদের ডান হাত শিল্পপতিরা। বাম হাত ধর্মগুরু সহ ধর্মের ঠিকাদাররা। এটাই ভারতীয় ইউনিক গণতন্ত্র। 

আমার আপনার ডেডবডির কোন মূল্য থাকুক আর নাই থাকুক। রাজনৈতিক শিবিরের হাইজ্যাক করা ডেডবডির মূল্য এক বা একাধিক লোকসভা কিংবা বিধানসভার আসন জয়ের সমতুল্য। না ইউরোপ আমেরিকা সহ প্রথম বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্রের চেহারা এমন বীভৎস নয়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের যে দেশেই গণতন্ত্র। সেই দেশেরই এটাই আসল চেহারা। এই নগ্ন বীভৎস গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতেই আমরা বাধ্য। বাধ্য আমাদের সাংবিধানিক অধিকার বলে প্রাপ্ত দায়িত্বেই। এবং আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই বীভৎস ও বেআব্রু চেহারার কারণেই দেশের উজ্জ্বল মেধাবী তরুণ তরুণীরা প্রজন্মের প্রজন্মে ধরে রাজনীতির আঙিনা থেকে নিজেদেরকে শতহস্ত দূরে রেখেছে। আর সেই ফাঁক পুরণ করতেই অশিক্ষিত মূর্খ কিন্তু ধুর্ত ও চালাক অসাধু ও অসৎ মাস্তান ও দুর্বিত্তরা বেশি করে রাজনীতির আশ্রয়ে থেকে নিজেদের সকল দুর্নীতিকে সুরক্ষিত রাখার রাজনীতি করে চলেছে। দেশের সংবিধানকেই হাতিয়ার করে। এটি আরও চমকপ্রদ বিষয়। আর আমাদেরকে সেই সংবিধান দেখিয়েই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে তাদেরকেই নির্বাচিত করে রাজকোষ লুঠ করার অধিকার অর্জনের জন্য নির্বাচিত করতে বাধ্য করা হচ্ছে দিনের পর দিন। দশকের পর দশক। আমরা ভোটের আগে ডেডবডি নিয়ে রাজনৈতিক নৃত্যকলা দেখতে থাকবো। আর যত বেশি ডেডবডি তত বেশি উজার করে ভোট দিয়ে কালসর্প ঢুকিয়ে নিয়ে আসব ক্ষমতার অলিন্দে। এই পথেই এগিয়ে চলেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্য। 

১০ই অক্টোবর’ ২০২০


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.