x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০১, ২০২০

চিত্রাভানু সেনগুপ্ত

sobdermichil | অক্টোবর ০১, ২০২০ | | মাত্র সময় দিন,পড়ে নিন,শুনে নিন।

বসন্ত আমার নয়

।।পর্ব_১।।  মাতলা নদীর কোলে সবুজে ঘেরা ছোট্ট একফালি গ্রাম বুধখালি। এই গাঁয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রামকানাই মল্লিককে একডাকে চেনেনা এমন মানুষ মেলা ভার।​ বিদ্যায়-বুদ্ধিতে রামকানাইয়ের জোর কতটা সেকথা সঠিকভাবে সকলের জানা না থাকলেও আপদে বিপদে মানুষ এককথায় রামকানাই ডাক্তারের টোটকা পুরিয়া দিয়ে দিব্যি কাজ চালিয়ে নেয়। ছোটখাটো জ্বরজারি, পেটের ব্যামো, ব্যথা-বেদনা এসব রোগে গাঁয়ের মানুষ চোখ বুজে রামকানাইকেই ভরসা করে। গায়ের একটু দূরে একটা ছোট্ট ডাক্তারখানা আছে অবশ্যি, সেখানে এক নামকরা এলোপ্যাথি​ ডাক্তার বসেন, তবে তাঁর দক্ষিণাও বেশ অনেক.... পঞ্চাশ টাকা। সেখানে কানাই ডাক্তারকে দশ-বিশ যে যা ঠেকায় তাই দিয়েই হোমিওপ্যাথিক পুরিয়া দিয়ে দেয়। গায়ের সক্কলে জানে কানাই ডাক্তারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। বাপ ঠাকুরদার অর্জিত পৈত্রিক সম্পত্তি নিতান্তই কম নয়।​ কত গরীব দুঃখী মানুষকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ওষুধ দেবার সময় হাতে আবার কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন...." শুধু ওষুধ খেলে কাজ হয় কখনো? সাথে খাবার খাতি হবে।"​ গায়ের মানুষ সম্ভ্রমে মাথা নোয়ায় রামকানাইয়ের সামনে।​

​ডাক্তারের দুইটি সন্তান, পবিত্র আর সরোজিনী।​ পবিত্র অনেক চেষ্টা করেও মাধ্যমিকে দুইবার অকৃতকার্য হয়ে এখন পৈত্রিক জমিতে টুকটাক চাষাবাদ আর একটা ছোট্ট মুদির দোকান খুলেছে। ধারদেনা করে একটা ছোটখাটো ভটভটিও কিনে ফেলেছে। সপ্তাহে একদিন চাষের সবজি নিয়ে কলকাতায় যায়। বাপের হোমিওপ্যাথি পুরিয়াতে তার মন বসেনা। সরোজিনী পবিত্রর থেকে বছর চারেকের ছোট, তাতে আবার পাশ দিয়েছে বড় ভাইয়ের থেকে একটা বেশি। মাধ্যমিক টপকেছে, উচ্চমাধ্যমিক অবধি গিয়ে ইংরাজিটা সামাল দিতে পারেনি। বাবা বলেছেন...."ঠিইক পারবি। সামনের বছর মন লাগিয়ে চেষ্টা কর, আর খালি ঘরে বসে কি করবি? আমার সাথে কাজ কর, কম্পাউন্ডারিটা শিখে নে। তোর দাদা তো আর আমার ধারা রাখলো না। তুই অন্ততঃ রাখ। আমারও তো বয়স হয়েছে। সরোজ এখন দিন-রাত রোগীর ওষুধ দেওয়া, প্রেসার মাপা, ইঞ্জেকশন দেওয়া শিখছে। সকালে সদর থেকে আসা নতুন ওষুধের বান্ডিলের সাথে তালিকা মিলিয়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখছে কাঠের আলমারিতে। ঘরের পেছনের বাগান পেরিয়ে ছুটে এসে জানালার শিক ধরে জোরে ডেকে উঠলো ছোট্ট দশ বছরের বালক কালি......

__সরোজু দিদিই...সরোজু দিদি আছো?"

__"ওওমা! কালি , এতো হাঁপাচ্ছিস কেন?"

__"তাড়াতাড়ি চলো গো সরোজু দিদি, রেণু দিদি ডাকছে।"

__"কেন রে?"

__"সে তো বে' করে বৌ নে আসচে গো দিদি।"

সরোজ হেসে বললো....."কে রে? কে আবার বে' করলো?"

__"গোবিন্দ দাদা গো!"

হাত কেঁপে উঠলো সরোজের।​ অবিশ্বাসের সুরে, কাঁপা গলায়​ জিজ্ঞাসা করল...."ক্কে? ক্কার কথা বললি? কোন গোবিন্দ?"

__"আমাদের গোবিন্দ দাদা গো। লাল টুকটুকে শাড়ি পরা ডাগর বৌ নে' এসে নেমেছে ফেরি ঘাটে। সবাই দেখতে গেছে গো। তুমি যাবেনা?"

হাতের শিশি দুটো ফেলে দিয়ে​ বাড়ির পেছনের কলা বাগানটা পেরিয়ে , সরু মেঠো রাস্তা ফেলে বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে সিধে দৌড়ে খানিক এগিয়েই দেখতে পেল, ওওই দূরে ইট বাঁধানো পথের উপর দিয়ে একখানা পেল্লায় টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে এগিয়ে চলেছে গোবিন্দ। তার সাথে পা মিলিয়ে লাজুক চালে হেঁটে চলেছে এক নববিবাহিতা বধূ। লাল চেলিতে​ ঢাকা​ মুখের আড়ালে লুকানো চোখদুটো দিয়ে পথ চলতে পিছিয়ে পড়ছে কখনো। গোবিন্দ মাঝে মধ্যে থামছে , বধূটি কাছে এলেই আবার চলার গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলছে গন্তব্যে। সারা গায়ের বৌ-ঝিয়েরা জড়ো হয়ে এগোচ্ছে পিছু পিছু। ওরা বৌ দেখতে এসেছি নাকি তামাশা বোঝা ভার।

​রূপার নুপূর যেন বেড়ি হয়ে আঁকড়ে ধরলো সরোজুর আড়ষ্ট পদযুগল। শরীরটা অকস্মাৎ বেশ অবশ হয়ে চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সব। হৃদয়ের অন্তঃকোনে অতর্কিতে কোথা থেকে এক তুফান আছড়ে পড়ে তোলপাড় করে দিচ্ছে, এক মুহুর্তে ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত করে তুলছে জীবনের সকল স্বপ্ন, দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে সব ভাবনাচিন্তা আর চাহিদাগুলো। হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো,​ মাটিতে বসে পড়লো সরোজু। ছোট্ট কালি ভিড় লক্ষ্য করে খানিক এগিয়ে গিয়ে আবার পেছনে ফিরলো।

__"ও দি, কি হল ? যাবেনা বউ দেখতে?​

__"না,"

__"তবে আমি যাই?"

__"হু" (মাথা নাড়লো সরজু) ।

সরোজুর মুখের সামনে উবু হয়ে বসলো কালি।​

__" কি হয়েছে দি? শরীর খারাপ?"

বাঁশের ঝাড়ে ভর দিয়ে কোনমতে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালো সরোজু। পেছন ফিরে বাঁশবন পেরিয়ে​ হেঁটে চলল গায়ের পেছনে ভাঙাচোরা মন্দিরের দিকে।

​ ​ওদিকটা বেশ বুনো ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা।​ খুব একটা জন মানবের আনাগোনা থাকেনা সেদিকে। মন্দরটি বহু সেকেলে আর জরাজীর্ণ, আজ কোন বিগ্রহের অস্তিত্বও নেই সেখানে। বহুদিন পরিত্যাক্ত হওয়ায় আজ সে স্থান ক্রমে ডেঁয়ো ইঁদুর আর বিষধর সাপ খোপের ডেরায় পরিনত হয়েছে। কালি চেঁচিয়ে​ ​ বলল.....

__"কোতায় যাও দি? মন্দিরে? ওখেনে সাপ আচে.....এই এত্তো বড়!! হাঁ করে মানুষ গিলে খায়!! মা ওকানে যেতে না করেছে।"

সরোজ হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে মাটির থেকে একটা ঢিল তুলে ছুঁড়ে মারলো কালির দিকে।

__ " যাহঃ, যা বলছি! খবরদার বেশি জ্যেঠামো করবি না। তুই বৌ দেখ গে যা!"

কালি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো সরোজের দিকে। এমন নিরিহ ভালো মানুষ দিদির হঠাৎ এমন উগ্র আচরণ, কই আগে তো কখনো তার চোখে পড়েনি? চুপ করে চেয়ে রইল সরোজুর যাত্রা পথের দিকে। সম্বিত ফিরে পেলো সরোজিনী,​ শান্ত গলায় ডেকে বলল.....

__" কালি, শোন!......আমি যে মন্দিরে যাচ্ছি কাউকে জানাস না, কেমন! "

__" কাউকে না? রেণু দিদিকেও না?"

__"কাউকে না বুঝলি?"

কালি নত শির নেড়ে বলল..."আচ্ছা।"

শিথিল পায়ে ধীরে ধীরে মন্দির প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালো সরোজ। মন্দির না বলে তাকে ভগ্নস্তুপই বলা ভালো।​ লোনা ধরা দেওয়ালে শিকড় বিছিয়ে আশ্রয় করেছে অশ্বত্থ এবং আরো নানান নাম না জানা জংলা উদ্ভিদ। দেওয়ালে ধরেছে বড় বড় ফাটল, কোথাও আবার দেওয়ালটা কেবল সীমানাটুকু ঘিরে তার অস্তিত্ব রক্ষা করে আছে ।

মাথার উপর এক বিরাট পাকুড় গাছের শত সহস্র ঝুড়ির বেষ্টনীতে শিকলের মত বাঁধা পড়েছে পুরাতন দেবলয়খানি। ছাদের একদিকের চির এমন বিপদজনক হয়ে আছে, যে কোন সময় ভেঙে পড়তে পারে। এই মন্দিরের প্রতিটি আধাখন্ড সোপান, প্রতিটি ইটের সঙ্গে সরোজুর​ পরিচিতি বড় গভীর। সেই বিজন আলয়টিতে দেবতার বাস কেবল সরোজুর বিশ্বাসে।​ মন্দিরের মূল ঘরটির পেছনে লাগোয়া একচিলতে ছোট্ট কুঠুরী। একসময় কত নিরালা স্বাচ্ছন্দ প্রহর কেটে গেছে সে ঘরে। কত রঙিন আর স্বপ্নালু ছিল সব দিন। আজো দেওয়ালের উপর জ্বলজ্বল করছে পাশাপাশি দুটি নাম..... সরোজু আর গোবিন্দ।

সিঁড়ির একপাশে বসে মনে মনে বলে উঠলো সরোজু....

__"একি করলে ঠাকুর? কার অপরাধের দায়ে কাকে সাজা শোনালে? তোমার কি চোখে নেই? তুমি পাথর?​ তুমি অন্ধ? এমন করে বিনা দোষে নিজের সন্তানকে দন্ড দিলে?​ এ তোমার কেমন বিচার প্রভু? আজ দেখতে চাই তোমার​ ক্ষমতা। মিথ্যে করে দাও, এসব এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন করে দাও। নাহঃ, আজ আর চোখ খুলবো না আমি, কিছুতেই না।"

সিঁড়ি উপর মাথা ঠুকে বদ্ধ নয়না এক পাষাণ মূর্তির ন্যায় পড়ে রইলো সরোজিনী।

​ ​.......চলবে

■ লেখক পরিচিতি

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.