x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

রিঙ্কি বোস সেন

sobdermichil | অক্টোবর ২১, ২০২০ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

রিঙ্কি বোস সেন

ছোট্ট পা-দুটোয় টকটকে লাল আলতা বুলিয়ে দিচ্ছে রমা। কাজল টানা বড় বড় চোখে পিউ সেদিকেই তাকিয়ে। বুকটা হাল্কা ঢিপঢিপ করছে। কী জানি কী হবে ওখানে?  মা যদিও বলেছে কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু চুপচাপ বসে থাকলেই হবে! তবুও পিউয়ের শান্তি নেই।বার কয়েক মা'কে বলেছে। কিন্তু মা যে শুনছে না, বলছে এইসবে নাকি না করতে নেই, ঠাকুর পাপ দেয়। একদিকে মা'য়ের কথা অন্যদিকে নিজের অনিচ্ছে - এই দুয়ের মাঝে পড়ে পিউয়ের দুচোখ জলে ভিজে উঠলো, কিন্তু মা বলেছে একদম কাঁদা যাবে না, কাজল লেপ্টে যাবে। হ্যাঁ, মা অনেক যত্ন দিয়ে, অনেক সময় ধরে পিউকে লাল জরি বসানো সিল্কের শাড়ি, মাথায় লাল চেলী, মুখজুড়ে চন্দনের কারুকার্য, কাজল, কুমকুম আরও কতকিছু দিয়ে সাজিয়েছে।আসলে এমন সৌভাগ্য কজনের ঘরে আসে! 

__'বাবা কখন আসবে মা?' 

স্পষ্ট বোঝা গেল গলায় কান্না জমে আছে পিউয়ের।মনে সামান্য একটু আশা রয়েছে, ঐ বাবা'কে নিয়েই। বাবা যদি একটু বোঝে! বাবাই পারবে মা'কে থামাতে। 

কলিং বেল বেজে উঠলো। নমিতা গেল দরজা খুলতে। 

___' ঐ যে বাবা এসেছে! অনেক দিন আয়ূ গো তোমার, পিউ এক্ষুনি তোমার নামই করছিল, যাও ফ্রেশ হয়ে নাও...নমিতা গিজারটা অন করে রেখেছিলিস?'__

রমা আলতার বাটি হাতে নিয়ে আরও একবার নমিতাকে হাঁক দিতে দিতে ভিতরের ঘরে ঢুকে গেল। তপন লাগেজ দুটো ড্রয়িং রুমের সামনেটায় নামিয়ে পিউয়ের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পিউও ছলছল চোখে তার বাবার দিকে চেয়ে। কোনো রকমে হাতের রূমালটা দিয়ে চোখের দু-কোণ থেকে জলের বিন্দুগুলো তুলে নিল পিউ। তানাহলে মেক-আপ নষ্ট হয়ে যাবে। তপন দেখলো এইটুকু বয়সেই কী অদ্ভুতভাবে পিউ চোখের জলকে লুকিয়ে বাগে আনতে শিখে গেছে।মেয়েদেরকে বোধহয় এইভাবেই ছোট্ট বেলা থেকে শিখিয়ে দেওয়া হয় কান্না চেপে রাখতে, লুকিয়ে রাখতে।

রমা একটা সরু কাচের গ্লাসে ঠান্ডা জল আর কয়েকটা নারকেল নাড়ু এনে তপনের সামনে সেন্টার টেবিলটায় নামিয়ে রাখলো, 

__'যাও হাত'টা ধুয়ে এটা খেয়ে নাও, জল গরম হচ্ছে, স্নান সেরে ড্রেস করে নিয়ে চল।খাটের উপর ব্লু পাঞ্জাবি আর পাজামা রেখেছি, ঐ সেই নতুনটা...পড়ে নিও।'

__' কোথায় যাবো? পিউয়ের কোনো নাচের ফাংশন?'

দাবা গলায় তপনের প্রশ্ন। রমা একগাল হেসে তপনকে টেনে সোফায় বসালো তারপর পিউকে সযত্নে ধরে তপনের সামনে দাঁড় করিয়ে,

__' আজ্ঞে না, কোনো নাচের ফাংশন নয়। আজ যে জন্য সাজিয়েছি শুনলে অবাক হয়ে যাবে! আমাদের খুব সৌভাগ্য যে...'

রমা কথা অসম্পূর্ণ রেখেই পিউয়ের মাথার চেলীতে ঢেকে যাওয়া টিকলিটা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

__' কীসের সৌভাগ্য? '

চোখেমুখে গর্বের প্রলেপ লাগিয়ে রমা এবার বলল,

__' কুমারী পুজো, আমাদের পিউয়ের...রাধারাণী স্মৃতি ক্লাবের সভাপতি বাড়িতে এসে বলে গেছেন, মানে আর কী অনুরোধ করেছেন...তোমাকে আর ফোনে বলিনি, ভাবলাম তুমি তো অষ্টমীর সকালে আসছই, তখনই না হয় জানবে,  সারপ্রাইজ! '__

পিউয়ের দুচোখে আবার কিছু জল এসে জড়ো হয়েছে।আবার রুমালের কোণ দিয়ে পিউ সেইসব জলের ফোঁটা গুলোকে নিখুঁত ভাবে শুষে নিল, ঠিক যেভাবে পিউয়ের শিশুসুলভ হাসিটা কেউ যেন শুষে নিয়েছে।আর না জানি কতশত পিউয়ের শৈশবকেও এইভাবে কারা যেন শুষে নেয়, শুষে নিচ্ছে।

___' পিউকে জিজ্ঞেস করেছ ওর ইচ্ছে আছে নাকি'?

পাথর কঠিন গলায় তপন জানতে চাইলে রমা অবাক হয়ে বলল,

__' এতে ওকে জিজ্ঞেস করার কী আছে? এ তো খুব পুণ্যের ব্যাপার! আর তাছাড়া সব ব্যাপারে কি ওকে জিজ্ঞেস করা হয়? এরপর কি ওকে জিজ্ঞেস করবে যে ও স্কুল যেতে চায় না বাড়িতে থাকতে চায়?'

__' রমা দুটো আলাদা জিনিসকে একসাথে গুলিয়ে ফেলো না, স্কুল যেতে না চালিয়েও যেতে হবে কারণ এতে ওর উপকার হবে, ওর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। কিন্তু তোমার এই কুমারী পুজোয় ওর কী উপকার হবে বলতে পারো? এটা একটা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস!'__

রমা দুচোখ বড় বড় করে,

__' যখন জানোই এটা ধর্মীয় বিশ্বাস তাহলে সেটাকেই বা অবজ্ঞা করছ কেন? ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করাটা যে ঠিক নয় সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে শেখানোর প্রয়োজন নেই!'__

__' আমি তোমার বা কারোরই কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করছি না। সেরকম কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই কিন্তু নিজের নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস কায়েম করতে অবুঝ শিশুকে কেন ব্যবহার করা? কেন তুমি নিজের পুণ্যের কথা ভেবে পিউকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছ?'__

এইবার কাজলটানা চোখদুটো থেকে ঝরঝর করে জলের স্রোত নেমে এলো। রুমাল দিয়েও আর কিছু করা গেল না।উল্টে চোখে, গালে, রুমালে কাজল লেপ্টে একেবারে বিচ্ছিরি অবস্থা। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল পিউ। মায়ের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।এইবার মা বোধহয়...। 

__' পিউয়ের মুখটা পরিস্কার করে দাও, আর এইসব খুলে ওকে একটা নতুন ফ্রক পড়িয়ে দাও।আমি ক্লাবে গিয়ে কথা বলে আসবো, তোমার চিন্তা নেই...যাও পিউ, মায়ের সাথে গিয়ে মুখচোখ ধুয়ে এসো'।__

রমার কান মাথা সব আগুন। যেকোনো সময় বিস্ফোরণের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ও জানে কোনো লাভ নেই। তপন একবার যেটা সিদ্ধান্ত নেবে সেটার এতটুকু নড়চড় হয় না, বিশেষ করে মেয়ের ব্যাপারে তো এক্কেবারেই না। কপাল ভালো ক্লাবকে গিয়ে বলে আসার দায়িত্ব সে নিজেই নিয়েছে তানাহলে রমার লজ্জার শেষ থাকতো না।এমনিতেই বেলাদি টিপ্পনী করতে ছাড়বে না। ওর মেয়েকেও নাকি এবার ভাবা হয়েছিল, কিন্তু শেষমেশ বেলাদি'র মেয়ের রং ময়লা তাই পিউকেই সিলেক্ট করা হয়।

প্রবল অনিচ্ছাসহ পিউকে নিয়ে বেডরুম লাগোয়া বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো রমা। কিন্তু যাবার আগে শেষবারের মত একটা হুল ফুটোতে ছাড়লো না সে।

__' আসলে যতই বল, এই সমাজে তোমাদের মত কিছু পুরুষ আছে যাদের ইগোতে লাগে মেয়েদের দেবী বলে সম্মান দিতে...মেয়েরা তাদের চোখে শুধুই মেয়েছেলে, আর কিছুই না'। 

কথা শেষ করে রমা চলে গেল।তপন গ্লাসের জল'টা শেষ করে ধীরেধীরে লাগেজ গুলো নিয়ে বেডরুমে নামিয়ে রাখলো।তারপর বাথরুমে দরজাটায় দাঁড়িয়ে, 

__' দ্যাখ পিউ, তোর জন্য কী এনেছি!'

__' এত্তগুলো!'

পিউ অবাক হয়ে বড় বড় চোখে দেখতে লাগলো বাবার হাতে ধরে রাখা গল্পের বইগুলো। বাবাকে গল্পের বইয়ের আব্দার সে করেছিল, কিন্তু বাবা এতগুলো আনবে সে ভাবেনি। 

__' রোজ রাতে একটা করে গল্প পড়ব আমরা, ঠিক আছে?'

পিউ একগাল হেসে সম্মতি জানালো।তারপর মুখটা টাওয়েলে কোনোরকমে মুছে, বইগুলো নিয়ে এক ছুটে বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল।

তপন দরজায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে।তারপর দাবা গলায় রমাকে তার পাওনা উত্তরটা দিল__

___' তুমি সমাজের কথা বললে, সমাজের ইগোইস্টিক পুরুষদের কথা বললে.... কিন্তু একবারও তো তাদের কথা বললে না যারা তোমাদের মেয়েদেরকে শুধু মেয়েছেলে হিসেবেই নয় বরং একটা মাংসপিণ্ড হিসেবে ভাবে। তাই বলি,  আগে এই সমাজ তোমাদেরকে মানুষ ভাবতে শিখুক, তারপর না হয় দেবী ভাববে। আজ কুমারী মেয়েকে দেবী বলে পুজো করবে আর দুদিন বাদ সেই কুমারীকেই ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে! এই তো তোমার আমার সমাজ! কিন্তু আমি এমন সমাজে বিশ্বাস রাখি না।আমার কাছে আমার মেয়ে শুধুই মেয়ে, কোনো দেবী নয়...বরং একটা আস্ত মানুষ যার একটা রক্তমাংসের সত্ত্বা আছে। আমি সেই সত্ত্বাটিকে স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতে চাই, সারাটা জীবন তাই করে যাবো। আমার কাছে আমার মেয়ের প্রতি স্বাভাবিক স্নেহ-ভালোবাসাই আমার পুজো...আমার ধর্ম।'

কথা শেষ করে তপন বেরিয়ে গেল।রমা বাথরুমে আয়নার সামনে স্থির দাঁড়িয়ে।বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা তোলপাড় শুরু হয়েছে।খুব জোর কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কীভাবে?  আস্তে আস্তে বাথরুমের দরজাটা লাগিয়ে দিল রমা।তারপর বেসিনের কল'টা খুলে দিল।


■ পরিচিতি

Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.