x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

পূজা মৈত্র

sobdermichil | অক্টোবর ২১, ২০২০ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

পূজা মৈত্র

 (৯)

অনিকেত তুষারের কথার গুরুত্ব বুঝেছিলেন। মনোসিজকে কাছে টানার প্রয়োজন। পিউকে যতটা সময় দেন, তার একভাগও ছেলেটা পায় না। ওর অভিমান হতেই পারে। তাই বাড়ি ফিরেই ওর ঘরে গেলেন।​ পড়ছে। অনিকেতকে দেখে বইয়ে আরো মুখ গুঁজল। ভীষণ রেগে আছে তাহলে। অনিকেত পাশে বসলেন। মনোসিজকে অবাক করেই মাথায় হাত রাখলেন, "কি পড়ছিস বাবু?" মনোসিজ চমকে তাকাল, কিছুটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে। মা ওকে বাবু বলে ডাকত। মা থাকতে বাবা-ও। মা চলে যাওয়ার পর এই ডাকটাই চলে গিয়েছিল যেন। বাবার সময় কোথায় ওকে আদর করে ডাকবে? বোনকে নিয়েই এত ব্যস্ত যে..."এই তো, কেমিস্ট্রি।" মনোসিজ ভালো ছাত্র। সায়েন্স পড়ছে, টুয়েলভ হবে এবার। "বাহ্! টিউটরের কাছে এক্সাম আছে কাল?" মনোসিজ আবারো অবাক হল। ওর টিউটরের কাছে এক্সাম, বাবা জানল কি করে? বাবা তো কেবল পিউ-এর খোঁজ রাখে। বোনের সারাদিনের শিডিউল- বাবার মুখস্ত। ওর ব্যাপারে ব্ল্যাঙ্ক একদম। তাহলে জানল কি করে? "হ্যাঁ। তুমি জানলে কি করে?" "জানতে হয়। ল্যান্সডাউনের জানা স্যার তো?" মনোসিজ ঘাড় নাড়ল। বাবাকেই তো টিউটরদের পেমেন্ট করতে হয়। তাই নামগুলো জানে, মনে হয়। "বাহ্। পড়া শেষ সাতটায়?" মনোসিজ অবাক হলেও বুঝতে দিল না। অনিকেত হোমওয়ার্ক করে এসেছিলেন। পিউর কাছ থেকে ওর দাদার শিডিউলটা জেনে নিয়েছিলেন। "হ্যাঁ।" "বাহ্। তাহলে তোকে আমি পিক আপ করব কাল।" মনোসিজ সোজা হয়ে বসল, "কেন?" অনিকেত হাসলেন, "জানতেই হবে?" "আমার কিন্তু কাল কাজ আছে অনেক। বাড়ি ফিরেই পড়তে হবে- পরশু টিউটরের কাছে ম্যাথ এক্সাম.." "তা থাকুক না। বেশিক্ষণ লাগে নাকি। বাপ ছেলেতে যাবো- একটা ট্রিট দেব তোকে- চলে আসব..." "ট্রিট? ফর হোয়াট?" মনোসিজ ভীষণ অবাক হল। "এত ভালো খেললি ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে, ট্রিট তো পাওনা-ই।" মনোসিজের মনে পড়ল মায়ের কথা। মনোসিজ একটা কিছু ভালো করলেই মা একটা করে আবদার রাখত, কখনো গিফ্ট- কখনো ট্রিট- বাবাও যেত। কিন্তু মা যাবার পর বাবা কখনো এমন করেনি। "ট্রিট?" "ইয়েস।" "বাট- জিতিনি তো.." মনোসিজের গম্ভীর মুখোশটা একটু হলেও খুলল যেন। "তাতে কি? আমার কাছে তুই-ই বেস্ট।" মনোসিজ মনে মনে কুঁকড়ে গেল যেন। আজ ট্রেনিং-এ পানিশমেন্ট পেয়েছে- এটা জানার পর বাবা বোনকে নিয়ে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল। মনোসিজ ভেবেছিল ফিরে এসেও বাবা রেগে থাকবে, না বকলেও কথা বন্ধ করে দেবে।​ মনোসিজ বাবার রাগকে উপর উপর পাত্তা না দিলেও, কথা বন্ধ হয়ে গেলে অস্বস্তি বোধ করে। ট্রেনিং-এ মিসবিহেভ করাটা বাবার কাছে অত্যন্ত বড় অপরাধ। তার জন্য কতদিন কথা বন্ধ থাকত কে জানে? তার বদলে বাড়ি ফিরে নিজে থেকেই ট্রিট দিতে চাইছে, এটা যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। "তাহলে কাল সাতটায় পিক করব তোকে, কেমন? তারপর তুই যেখানে বলবি, সেখানে ট্রিট দেব।" "বোনের তো কাল বাড়িতে টিউটর আসবে। ওর তো হবে না.." অনিকেত মনোসিজের কাছ থেকে এই কথাটা আশা করেননি। বোনকে কেবল হিংসাই করে না তাহলে, ভালোও বাসে। "আবার বোন কেন? তুই আর আমি। বোন আজ ঘুরে এল তো।" অনিকেত গরম করতে চাইলেন। মনোসিজ ঘাড় নাড়ল, না বাচক, "নাহ। বোন না গেলে ওর কষ্ট হবে। ও সব জায়গায় তোমার সাথে যায় তো।" "সে তো ও ছোট- পড়ার চাপ বেশি নেই বলে যেতে পারে। বড় হলে পিউও পারবে না।" "তাও ও চলুক।" অনিকেত হাসলেন, "বেশ। বোনকে তুই-ই বলিস কথাটা, নাকি?" মনোসিজ ঘাড় নাড়ল, ও বলবে। "তুমি কি সকালের ব্যাপারটা নিয়ে..." জানতে চাইল মনোসিজ। "কাউকে কিছু বলিনি। কেবল তুষারের সাথে কথা বলেছি। ও বলেছে- মন দিয়ে খেলতে, এসব নিয়ে আর না ভাবতে।" "তুমি ওই লোকটাকে সরি বলেছ, না? কেন? তুমি জানো আমাকে কিভাবে ডি ভ্যালুড করেছে নেটে? কিভাবে ব্যাটিং অর্ডারে পিছিয়ে দিয়েছে? ওই রোহন ভালো খেলে আমার থেকে?.." "বাবাই!" অনিকেত ধমকালেন। "কোচ বা স্যার বলে বলবে। তুষার জানে তোমার মধ্যে খেলা আছে। আর ওটা ফিক্সড ব্যাটিং অর্ডার নয়। এত ইগো দেখাবার কিছু নেই এতে। টেম্পটেড না হয়ে নিজের কাজটা ঠিক করে করো, ফল পাবে। কাল থেকে যেন নেটে ভদ্র হয়ে থেকেছ- এমন রিপোর্ট আসে।" "যাবো না আর ট্রেনিং এ।" মনোসিজের ভয়ানক রাগ হচ্ছিল। অনিকেত রাশ ধরলেন। মোহর চলে যাবার পর প্রথমবার, "বেশ, যেও না। না গেলে কাল থেকে তোমার খেলা, পড়াশোনা, স্কুল সব বন্ধ।" চমকে উঠল মনোসিজ। বাবা এভাবে বলল? "বন্ধ মানে?" "বন্ধ মানে, বন্ধ। এ বাড়িতে থাকাটাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।" "ওহ। তাড়িয়ে দেবে? দাও। আমি তোমার কে? বোনই তো সব, ওকেই তো ভালোবাসো.." মনোসিজের রাগে ঠোঁট কাঁপছিল। চোখে জল চলে এসেছিল। অনিকেত নরম হলেন, "এটা সত্যিই মনে হয় তোর?" "হয়। নিশ্চয়ই হয়। আমাকে ভালোইবাসো না তুমি। বাসলে কেবল মার্কস আর স্কোরের খোঁজ রাখতে না। আমার সবকিছুর খোঁজ রাখতে, যেমন বোনের রাখো।" অনিকেত এত কিছুর মধ্যেও হেসে ফেললেন, "আমি তো ভাবি তুই বড় হয়েছিস- তাই আর নজর রাখি না। আচ্ছা, বেশ এবার থেকে নিশ্চয় রাখব।" "তাড়িয়েই তো দেবে.." অনিকেত ছেলের চোখ মোছালেন, "তাড়াব কেন? কথা শুনলে বকবও না।" "আমাকে আগে ব্যাট না দিলে..." "দেবে। রোটেট করে দেবে। তোর স্যার বলেছে আমায়। তুই শুধু এমন কিছু করিস না, যাতে আমার দিকে লোকে আঙ্গুল তুলতে পারে।" মনোসিজ শান্ত হল। "নে, এবার পড়। বোনের সাথে গল্প করাটাও বাকি আছে তো। আমি নিজের কাজ করি গে।" মনোসিজ ঘাড় নাড়ল। বোনকে গিয়ে এখনি বলতে হবে, কাল ওরা তিনজন একসঙ্গে ডিনারে যাচ্ছে। এত বাজে দিনের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভালো খবর মনে হল ওর।​

"পুঁচকি- এখনো পড়ছিস?" মনোসিজ বোনের ঘরে ঢুকে প্রথমেই প্রশ্নটা করল। পিউ অবাক হল। দাদার মুড বেশ ভালো মনে হচ্ছে। আজ পানিশমেন্ট পেয়েও ফুরফুরে মনের কারণটা পিউ বুঝতে পারল না। "কালকে ক্লাসটেস্ট আছে।" সংক্ষেপে সারল ও। "তুই-ও না- বুক ওয়ার্ম একদম। রাখ ওসব।" মনোসিজ বোনের হাতের বই বন্ধ করে দিল। "চল, শুবি চল- অনেক কথা আছে।" পিউ বুঝল দাদার মুড আজ অত্যধিক ভালো। এখন পিউকে প্যাম্পার করবে। ঘুম পাড়াবে, গল্প বলবে- আর সেই গল্পগুলো অবধারিত ভাবে মায়ের গল্প হবে। পিউর ভালো লাগে শুনতে। মনে হয় মা ওর কাছেই আছে। বেশি কথা খরচ না করে ও শুয়ে পড়ল গিয়ে। মনোসিজ বোনের মাথাটা কোলের উপর নিয়ে নিল। এভাবে মা ঘুম পাড়াত ওকে। বোনকে কোলে নিলে মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। "পুঁচকি- তোর টিউটর আছে কাল?" "আছে তো সন্ধ্যায়। জানিস না?" "বাদ দে কালকের পড়াটা বুঝলি?" পিউ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে, "দাদা, তোর কি হয়েছে? পড়া কামাই দিতে বলছিস কেন? এমনি সময় তো পড়া না করলে বকিস।" মনোসিজ হেসে ফেলে, "কাল আমরা ডিনারে যাচ্ছি, ডিয়ার সিস্টার।" "ডিনার? আমরা কারা?" "উফ! এত ডাব্লিউ এইচ এই মেয়েটার! আমি, তুই আর বাবা।" পিউ আকাশ থেকে পড়ল। হঠাৎ ডিনারে? কালকে তো কোনো অকেশন নেই, "কেন?" "এমনি।" "এমনি হয় নাকি?" "হয়তো, এই যে বাবা তোকে আজ এমনি এমনিই ঘুরতে নিয়ে গেল, তেমন।" মনোসিজ বোনের নাকটা টেনে দিল। "ওটা এমনি নাকি? আমি-ই তো বলেছিলাম- এবিডিকে দেখতে যাবো।" বলে ফেলেই ব্রেক কষল পিউ। এই রে! দাদাকে বলে ফেলল রণিতের কথা! বকা দেবে এক্ষুনি। "এবিডিকে দেখতে, মানে?" "পোস্টার- পোস্টার কিনতে রে বুদ্ধু!" "ঘর ভর্তি পোস্টারেও হচ্ছে না? শোন, এবিডি ম্যারিড। বেবি আছে ওর। তোকে থোড়ি পাত্তা দেবে।" "দাদা! তুই-ও না!" পিউ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। মনোসিজ হেসে ফেলে, "এত লজ্জা? বাপরে! পুঁচকি, এবিডি তোকে পাত্তা দিলেও আমি তোকে ছাড়ব নাকি? যাকে আমার পছন্দ তার সাথেই বিয়ে দেব তোকে।" দাদা আমি জাস্ট ফ্যান। ছোট্ট একটা ফ্যান- তার বেশি কিছু না..." "ওসব বাদ দে। এবিডি এমন কিছু খেলে না- ওর থেকে স্টিভ স্মিথ ভালো..." "আবার? তোকে বলেছি না- যা খুশি বল কিন্তু এবিডিকে নিয়ে কিছু বলবি না?" "আচ্ছা বেশ, বলব না। তাহলে কাল টিউটর বাদ দিচ্ছিস বল?" পিউ খুব খুশি হল, "সে তো দেবই। কতদিন পর আমরা একসাথে বেরোব বল তো?" "মা থাকলে দেখতিস- এমনটা প্রায়ই হত। আমি একটা কিছু ভালো করলেই ট্রিট দিত, জানিস? তুই তো প্রতিবার টপ করিস। সারা বছরে অনেক ট্রিট হয়ে যেত।" পিউ দাদার চোখে জল দেখল। দাদার কোলে শুয়ে পড়ল। "মা-এর গল্প শুনবি?" মনোসিজ জানে বোন মায়ের গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমাবে। বোন মা'কে তেমন পায়নি তো। ওর তাই খুব কষ্ট। বাবা বোনকে বেশি ভালবাসে বলে মনোসিজের হিংসা হয় কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- বোন তো বুঝলই না মা কাকে বলে। বেশি রাগ দেখাতে পারে না তখন, বকতে পারে না। মনোসিজ পিউকে মায়ের গল্প বলতে থাকে। একটা অলৌকিক সুন্দর স্বপ্নের মধ্যে ডুবে যেতে থাকে দু'জনে।

(১০)

"সুজনদা.." রণিতের ডাকে তাকাল সুজন। ওদের নেট শেষ। মনোসিজ আর রোহন নেটে নেমেছিল। "কি হয়েছে, ভাই?" "একটা কথা শোনো।" সুজন রণিতের কাছে গেল, "বল্। ভালো খেলেছিস তো আজ। একটা নিক- স্যার বকবেন যদিও.." "খেলার কথা না, অন্য।" সুজন বুঝল, "পড়া করিসনি? আন্টির পড়াটা আজো করিসনি, তাই তো? তুই না.. ফাঁকিবাজ একটা। স্কুলে চল। টিফিনে বসবি হোমটাস্ক নিয়ে।" "পড়াও না-" সুজন এবার অবাক হল। "তাহলে?" "কাউকে বলবে না তো?" সুজন ঘাড় নাড়ল, "একদম না, বল্।" "কোন মেয়ে যদি খেলা দেখে এতই ফ্যান, না, না- এসি হয়ে যায় যে বাড়িতে চলে আসে একটাবার দেখতে- তাহলে কি বুঝব?" "মেয়ে? কোন মেয়ে? কার বাড়িতে এসেছিল?" "আস্তে!" মুখে আঙ্গুল দেয় রণিত। সুজন বোঝে। গলা নামায়, "তোর বাড়িতে এসেছিল? মেয়ে? কতটুকু?" "আমার-ই এজের। খুব ভালো খেলা বোঝে। বলে আমি নাকি এবিডি। এবিডির মতো খেলি।" সুজন হেসে ফেলল, "তাই?" "বলল তো। মেয়েটা ক্লাস টপার। স্মার্ট, ইন্টেলিজেন্ট, বিউটিফুল.. তাও এমন বলল যে?" সুজন রণিতের কাঁধে হাত রাখল, "তুই ভালো খেলিস তো। তাই বলেছে।" "ওহ। শুধু খেলি, তাই?" সুজন মুচকি হাসল, "মে বি। এছাড়া তোকে ওর পছন্দও হতে পারে।" রণিতের উত্তরটা মনঃপুত হল এবারে, "আচ্ছা তোমায় কোনো মেয়ে বলেনি এমন?" সুজন মুখটা করুণ করল, "নাহ। আমি কি আর অত ভালো খেলি? আর তোর মত হিরো হিরো দেখতেও না.." "ইস্! তুমি তো কত স্মার্ট।" "হলেও, আমার এই সৌভাগ্য এখনো হয়নি ভাই। তোর তো মেয়েটা বেশ পছন্দ দেখছি, মেয়েটার পছন্দ হোক চাই না হোক।" রণিত ঘাড় নাড়ল, "না, না। পছন্দ না তো। এমনি আস্ক করলাম।" "তোর ড্যাডি জানে?" "মাম্মা জানে। ড্যাডিকে বলো না, বকবে।" "আন্টি বকেনি?" "না। মাম্মা তো পিউকে বাড়িতে আসতে বলে দিল, সময় পেলেই।" "এতদূর? তা মেয়েটার নাম পিউ বুঝি?" রণিত ঘাড় নাড়ল, "হ্যাঁ। ও বলেছে ফ্লাইং শটটা আর পা মুড়ে বসে শটটা ম্যাচে খেললেই ও মেনে নেবে যে আমি এবিডি।" "ওহ।ওই জন্যই নেটে ফ্লাইং শটটা মারা হল আজ? স্যার বলে কিছু বললেন না। অর্থোডক্স কোচ হলে নেট থেকে বার করে দিত। ম্যাচে কিন্তু বল না পেলে হিরোগিরি দেখাবি না। আমি বকব তাহলে।" "বল না পেলে খেলে কেউ?" "মনে থাকে যেন। তা মেয়েটা তোর বাড়ি পৌঁছাল কি করে?" "মনোসিজদার বাবা জেঠুর সাথে। পিউ মনোসিজদার বোন তো।" সুজনের হঠাৎ করে ভীষণ খারাপ লাগল। রাগও হল। মনোসিজ কি বোনকে দিয়ে ভাইটাকে হাত করতে চায়? নাকি বিগড়ে দিতে চায় ওর খেলাটা? "ওনারা গেছিলেন কেন?" "ড্যাডিকে সরি বলতে, মনোসিজদার বিহেভের জন্য।" "শোন ভাই, একদম বেশি মিশবি না ওদের সাথে। দেখছিস তো ওর দাদা কেমন?" "পিউ তো এমন নয় সুজনদা.." "না হোক। আমার ভাই তো তুই- ওদের কথায় নাচবি না একদম। ওরা তোকে নষ্ট করে দিতে চায়।" সুজন ভীষণ ভাবে চিন্তিত হয়ে উঠল। মনোসিজের বোনের সঙ্গে মানে মনোসিজের সঙ্গে ভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা। ওর ভাইকে ও বেহাত হতে দেবে না, কোনমতেই না।

ডিনারে একসঙ্গে তিনজনে কতদিন পর বেরোল- মনেই করতে পারছিল না পিউ। বাবা ড্রাইভ করছিল, পিউ এমনিতে বাবার পাশের সিটটায় বসে। আজ দাদা বসতে চাইলে ওর বেশ ভালো লেগেছিল। বাবার আর দাদার ঝগড়া, রাগ, অভিমানের থেকে এই ভালো। দুজনকেই হাসিখুশি লাগছিল খুব। রেস্টুরেন্টে ঢুকে সবে পছন্দসই চেয়ার নিয়ে বসেছে ওরা- হঠাৎ-ই ভীষণ অবাক হল পিউ। রণিত না? আঙ্কল, আন্টির সঙ্গে এসেছে- এখানেই ডিনার করবে মনে হয়। বাবাও আঙ্কলকে দেখে ফেলেছে ততক্ষণে, "তুষার!" "আরে অনিকেতদা!" আঙ্কল এগিয়ে এল। দাদাকে আড়চোখে দেখল পিউ। আঙ্কলকে দেখে চুপ হয়ে গেছে একদম, ভয় পাচ্ছে হয়তো। "বাচ্চাদের নিয়ে ডিনারে এলাম রে- বেরোনো হয় না বহুদিন- আয় না, তোরাও জয়েন কর। বৌমা এসো.. রণিত.. আয় বাবা।" ইয়েস! পিউ মনে মনে এটাই চাইছিল। আঙ্কল কিন্তু কিন্তু করছিল, আন্টি এসে গ্ল্যাডলি জয়েন করল। রণিতের সঙ্গে একবার চোখাচোখি হল পিউর। ভারী খুশি মনে হচ্ছে তাকেও। দাদারই কেবল মুখ চুন। অর্ডার দেওয়ার পর বাবা-ই বলল, "ছাত্র কেমন খেলল আজ?" তুষার মনোসিজের দিকে তাকাল একবার। মাথা নীচু করে বসে আছে। ওর সঙ্গে সহজ হতে হবে। "ভালো। মনোসিজ তো ভালোই খেলে।" মনোসিজ জটিতি মাথা তুলল। লোকটা ওর খেলা ভালো বলল? "ইনফ্যাক্ট, সারা ইন্টারস্কুল টুর্নামেন্ট খুব ভালো খেলেছে। গ্রেপফুলি ফর্মটা ক্যারি ফরওয়ার্ড করবে কোচবিহারেতে।" "ভালো খেলেছে বলেই তো আজকের ট্রিট। তাই তো, বাবু?" মনোসিজের কাঁধে হাত রেখে বললেন অনিকেত।" "আমাদেরও তাই। কোয়েল ছেলেকে একটা ট্রিট দেবে বলল.. তাই চলে আসা। এসে তোমাদের সাথে দেখা হয়ে, ভালো লাগছে বেশ।" কোয়েল​ কথায় যোগ দিল, "পিউ মামণিকে তো দেখেছি গতদিন। আপনার ছেলেকে বড় হবার পর এই দেখলাম, দাদা।" অনিকেত ঘাড় নাড়লেন, "হ্যাঁ, তোমরা যখন দেখেছ, তখন বাবু বেশ ছোট। মোহরের কোলে কোলেই ঘুরত তখন।" মনোসিজ ভারী অবাক হল। তুষার সান্যালের ওয়াইফ মা'কেও চেনেন? তাহলে বাবা আর লোকটা বেশ ক্লোজ ছিল একসময়। "তখন তোমরাই বা কতটুকু? কলেজে পড়ছ দু'জনেই।" "মনোসিজ ভারী অবাক হচ্ছে এসব শুনে মনে হয়।" কোয়েল​ মিষ্টি করে হাসল, "আসলে তোমার আঙ্কল, সরি স্যার আর আমি কলেজ মেটস ছিলাম। তখন দাদা রঞ্জি টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন, আর তোমার স্যার সদ্য টিমে ঢুকেছেন।" পিউ মনে মনে মজা পেল। আঙ্কল আর আন্টিও তাহলে ব্যাচমেটস। "আর এই ঢোকাটার পিছনে তোমার বাবার হাত কম ছিল না মনোসিজ।" তুষার সরাসরি কথা বলল, "উনিই স্পট করেছিলেন আমায়।" মনোসিজ আরো অবাক হল। লোকটা তো দিব্যি হাসে। ভালো করে কথা বলে। "ও।" "না, না। তেমন কিছু অবদান ছিল না। তুই এমনিতেও চান্স পেতিস। আর একটা তুষার সান্যাল আর পেয়েছে বাংলা?" "রণিত প্লেইজ লাইক​ ইউ।" মনোসিজ হঠাৎ করে কথাটা বলে ফেলল। রণিতের খেলার সাথে তুষার সান্যালের খেলার ভিডিওর অনেক মিল পেয়েছে ও। তুষার হাসে, "তাই? তবে এবিডির মত কে খেলে যেন?" কোয়েল মুচকি হেসে ফেলল। পিউর দিকে তাকাল রণিত। লজ্জা পেয়েছে। "মনোসিজ, তোমার বোন তো রণিতের​ খুব বড় ফ্যান- তার কথায় রণিতই নাকি এবিডি।" মনোসিজ, এবার বোঝে পিউ এবিডিকে​ দেখতে যাওয়া মানে রণিতদের বাড়ি যাওয়া বুঝিয়েছে। "আচ্ছা। রণিতের একটা পোস্টার বানাতে হবে তাহলে, বোনের ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে দেব।" মনোসিজের বলায় একটা সহজ ভাব ছিল যা সবাইকে হাসতে বাধ্য করল। পিউ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দাদা রাগ করেনি তাহলে। তাহলে দাদাও কি এবিডিকে পছন্দ করে? মানে রণিতকে আর কি। করলে খুব ভালো। পিউরই ভারী মজা হবে তাতে।​ রণিতকে সবাই ভালো বললে পিউ-রই ভালো লাগে।​

"বাবা, তুমি বোনের কাছে শোবে?" মনোসিজ বোনের ঘরে এসে অনিকেতকে দেখে কথাটা বলল। ও এসেছিল বোনের সঙ্গে ইয়ার্কি করার জন্য। রণিতকে নিয়ে লেগপুল করবে বলে। কিন্তু বাবা আছে.. "তুইও চলে আয় বাবাই- পড়া হয়ে গেছে তোর?" অনিকেত সময় পেলে মেয়ের কাছে এসে শোয়। আজ ব্যবসার কাজের চাপ অতটা ছিল না- মনটাও বেশ ভালো ছিল, তাই শুতে এসেছিলেন। মনোসিজ ওনাকে দেখে ফিরে যাবে, এটা ভালো কথা নয়। তাই ডেকে নিলেন ওকে। "হ্যাঁ দাদা, তুই ও আয়।" "আমি?" মনোসিজ থমকাল। বাবা আর বোনের মধ্যে নিজেকে ভাবেনি কোনোদিন। ওদের আলাদা জগৎ। মনোসিজের আলাদা। মা থাকতে এভাবে​ বাবা- মা আর মনোসিজ শুত, কিন্তু মা চলে যাবার পর বোনই বাবার সবটুকু আদর পেয়ে এসেছে। "হ্যাঁ, তুই।" অনিকেত ডাকলেন আবার। "দুটোকে দু'দিকে নিয়ে শুয়ে পড়ি, আয়।" মনোসিজ মানা করতে পারল না। ইতস্তত করেও বাবার পাশে শুয়ে পড়ল। পিউ ততক্ষণে বাবার গলা জড়িয়ে ধরেছে। একটু পরে বুকের উপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। অনিকেত মনোসিজের মাথায় হাত রাখলেন, "কি রে- বাবার পাশে এমন করে শুতিস বুঝি?" মনোসিজ বুঝল বাবা ছোটবেলার কথা বলছে। যখন বাবার গায়ের উপর পা তুলে শুয়ে থাকত ও। বুকের উপর ঘুমাত। মা টেনে নামিয়ে দিত বাবার লাগবে বলে- আবার যেই কে সেই। "সে তো ছোটবেলায়।" "এখন খুব বড় হয়ে গেছিস?" মনোসিজ বাবার কাছ ঘেঁষে এল একটু। বাবার ভালো লাগবে। "দাদা তুইও গলা জড়িয়ে ধর বাবার।" মনোসিজ বোনের কথায় হেসে ফেলল, "তুই ধর, তাহলেই হবে।" "কেন ছেলেরা ধরে না? রণিতও তো আঙ্কল আন্টির মাঝে শোয়। আঙ্কলের বুকের উপর শোয়..." বলেই পিউ থমকে গেল। অনিকেত অবাক হলেন, "এত গল্প হয়েছে রণিতের সাথে?" মনোসিজ বোনের মনটাকে পড়তে পারছিল। বাবা অতশত বোঝে না। মনোসিজ তাই বলল, "রণিতের এসি তো।" "তাই তো দেখছি। ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো খেলে।" মনোসিজ বোনের দিকে তাকাল। চোখ মারল একটু, "এবিডির মতো, তাই না?" পিউ ঘাড় নাড়ল। "পুরো এবিডি।" "তাহলে পোস্টার বানিয়ে দেব?" "তোকে দিতে হবে না। কদিন পরে পোস্টার এমনি-ই হবে। ইন্ডিয়া ক্যাপটা পেয়ে যাক।" "কচু পাবে।" "দাদা..ভালো হচ্ছে না কিন্তু.." "কি করবি তুই?" অনিকেত যুযুধান দুপক্ষকে থামালেন, "তোরাও না! সবসময় ঝগড়া। রণিত তো এক্সেপশনাল। ইন্ডিয়ান ক্যাপ তো ওই পাবে।" পিউ মুখ ভ্যাঙ্গাল, "দ্যাখ, বাবাও বলছে।" মনোসিজ বোনকে ভ্যাংচাল, "বাবাও বলছে! রণিত পেলে তোর কি?" "আমি ফ্যান তো।" "কখনো তো বলিস না- দাদা তুই পাবি?" "ঠিক। মামণি- দাদাও তো ভালো খেলে। দাদাও পাবে, তাই না?" মনোসিজ বাবার কথায় খুশি হল। বাবার স্বপ্ন ও ইন্ডিয়া খেলে। স্বপ্নটা ও পূরণ করবেই। "দাদা তো পারবেই। কিন্তু রণিতও খেলবে।" মনোসিজ এবার হেসে ফেলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে। এবার ঘুমিয়ে পড়। সকালে প্র্যাকটিসে যাব আমি।" পিউ বাধ্য মেয়ের মতো চোখ বুজল। দাদারও তাহলে রণিতের খেলা ভালো লাগে, এটা ভেবেই খুব ভালো লাগছিল পিউর। নাহলে দাদা খুব বকত এতক্ষণে। দাদা আর বাবার মধ্যে ভাব হয়ে গেছে- এটাও খুব ভালো। পিউর আর কিছু চাই না।

(১১)

ম্যাথ ক্লাস টেস্টের খাতাটা হাতে পেয়ে রণিতের মাথায় বাজ পড়ল। এবার সিক্স আউট অফ টেন পেয়েছে। ড্যাডিকে বলতে হবে, কিন্তু ড্যাডি তো একটু ইডেন গেল। আজ ওকে বাসে করে বাড়ি চলে যেতে বলেছে ড্যাডি। স্কুল বাসের ড্রাইভার কাকুকেও তেমনটাই বলে রেখেছে। কিন্তু বাড়ি গেলে যদি ড্যাডির আগে মাম্মা চলে আসে- তবে রণিত শেষ। খাতাটা তো আগেই দেখাতে হবে। না দেখালে আবার লুকিয়ে রাখার জন্য মার খাবে রণিত। কি যে করে ও। সুজনদাকে বলবে? সুজনদা-ই বা কি করবে? ইস্! যদি সুজনদাকে রাজি করিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে পারে, তাহলে ভালো হয়। "সুজনদা.." বাসে উঠে ডেকেই ফেলল রণিত। "কি রে ভাই?" "বলছি, তোমার আজ বিকালে টিউশন আছে?" সুজন অবাক হলেও অল্প হাসল, "হ্যাঁ। দুটো টিউশন। কেন বলতো?" "ওহ!" রণিতের মুখটা ছোট হয়ে গেল। সুজন রণিতের মাথায় হাত রাখল, "কেন?" "না মানে.. টিউশন না থাকলে একটু আমাদের বাড়ি যেতে।" সুজন খুশি হল খুব। "আচ্ছা, কাল যাব বাবু। তোর জন্য কি নিয়ে যাব বল?" "এমা। কিছু আনতে হবে না। এমনি আজ পড়া ছিল না বেশি, তুমি গেলে গল্প হতো, তাই বলছিলাম।" সুজন রণিতকে নিজের পাশে বসিয়ে নিল, "কাল অনেক গল্প করব। স্যারকে বলে কাল তোকে আমার বাড়ি নিয়ে আসব না হয়। দাদার কাছে থাকবি, তোর জেঠু, জেঠিমাও খুশি হবে।" মনোসিজের বোনের সাথে মিশেও ওর ভাই ওর-ই আছে- ভেবে বেশ খুশিই হল সুজন। কাল যেতেই হবে ভাইয়ের বাড়ি। নাহলে বোনের ছুতোয় মনোসিজ না ওর ভাই-এর বাড়ি চলে যায়। বড্ড অহঙ্কার ওই ছেলেটার। ওকে কিছুতেই ভাই-এর কাছাকাছি আসতে দেবে না সুজন।

মার্কসটা দেখে কোয়েলের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। আবার সিক্স আউট অফ টেন। আবার সিলি মিসটেক। "কি করেছিস এগুলো?" রণিত ভয়ে কাঁপছিল। ও বাড়ি ফেরার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মাম্মা চলে এসেছে। ড্যাডি আসতে ঢের দেরি এখনো। মাম্মা এসেই রণিতকে প্রথম যে প্রশ্ন করেছে তা হল, "আজ কোনো খাতা বেরিয়েছে?" মাম্মা যেন টেরই পেয়ে গেছিল যে খাতা বেরোবে আজ। রণিতকে খাতাটা দেখাতেই হল- আর মাম্মা রেগে আগুন। "রণিত মাম্মা কিছু জিজ্ঞাসা করছে।" "ভুল হয়ে গেছে।" কোয়েল রণিতের এই কথাতে আরো রেগে গেল, "ভুল হয়ে গেছে? এত বার করানো অঙ্ক- সব কমন- কষতে গিয়ে ভুল হয়ে গেছে?" রণিত জানে এখন কি হবে। পানিশ করবে মাম্মা। ড্যাডি থাকলে তাও ঠেকাত, এখন ড্যাডিও নেই, "আর করব না।" ক্ষীণ গলাতে বলল রণিত। "আর করাচ্ছি তোমাকে। কিছুতেই তো পড়াশোনাতে মন বসে না তোমার। তোমার ড্যাডিকে বলব আজ সব। আসুক তুষার।" রণিত অবাক হলেও খুশি হল মনে মনে। যাক বাবা। মাম্মা তবে মারবে নাকি​ পানিশ করবে না। ড্যাডিকে বলে দেবে। ড্যাডি তো আর বকবে না। ড্যাডি মনে হয় মাম্মাকে মানা করে দিয়েছে- রণিতকে মারতে। ড্যাডি এলে ড্যাডিকে জড়িয়ে ধরবে রণিত। কাছে না থেকেও মাম্মার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। "বলেই বা কি হবে! তার তো কোন শাসন নেই।" মনে মনে গজগজ করল কোয়েল। "এদিকে আমাকে সবসময় বলবে ছেলেকে মারবে না পিয়া, আমার কষ্ট হয়.. খেলায় যদি ছেলে এমন অমনোযোগী হত, তখন ভালো লাগত তো?" রণিত একটু মজা পেল। মাম্মা এখন সব রাগ ড্যাডির উপর দেখাচ্ছে। ড্যাডির জন্য রণিতকে পানিশ করতে পারছে না তাই রাগ ড্যাডির উপর। এসব ভাবতে গিয়ে রণিতের মুখটা একটু হাসি হাসি হয়ে গিয়েছিল, ব্যাস মাম্মার নজরে পড়েছে। "হাসি পাচ্ছে তোমার? এতগুলো সিলি মিসটেক করে হাসি পাচ্ছে? যাও ছড়িটা নিয়ে এসো।" রণিতের মুখের হাসি উবে গেল মুহূর্তেই। "বেয়াদব বাঁদর হয়েছ তো? কি করে তোমার বাঁদরামো কমাতে হয় মাম্মা জানে.." রণিত নিজের বোকামোতে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনল- ইস্! কেন যে হেসে ফেলল ও! "আর হবে না মাম্মা।" "ছড়িটা নিয়ে আয়। অনেকদিন পিঠে পড়েনি ওটা। তাই বাড় এত বেড়েছে।" "ও মাম্মা.. কান ধরছি তো.." পানিশ করো না মাম্মা, তাও ভালো। কিন্তু হাত দিয়ে মারা শুরু করলে মাম্মার​ জ্ঞান থাকে না। রণিতের পিঠের ছাল আজ একটুও থাকবে না। "তর্ক হচ্ছে? মাম্মা উঠে আনবে ছড়িটা?" রণিতের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। "মাম্মা আনলে ওই ছড়ি আজ তোমার পিঠে ভেঙে তবেই থামবে.." কোয়েলের কথায় রণিত কাঁচুমাচু মুখে ছড়িটা আনতে গেল। দরজার কোণে রাখা থাকে ওটা। কঞ্চির লাঠি। মাম্মা ওটা দিয়ে ওকে বছরে এক দুবারের বেশি মারে না কখনো। তবে যেদিন মারে পিঠের ছাল তুলে দেয়। ড্যাডি গো! চলে এসো না! রণিত মনে মনে বলে। ছড়িটা নিয়ে এসে মাম্মাকে দিতে যাবে, অমনি ডোর বেল বেজে ওঠে। রণিত মাম্মার দিকে কাঁচুমাচু মুখে তাকায়। "ব্যাস! ড্যাডি চলে এসেছে! এখানেই দাঁড়িয়ে থাক। ড্যাডিও দেখুক তুই কি কি করেছিস।" কোয়েল রাগের মাথায় দরজা খুলতে চলে গেল। "সুজন, তুমি?" কোয়েল বেশ অবাক হল দরজা খুলে। সুজন টিউশন যায়নি আজ। ভাইটা আব্দার করছিল বলে মন করেনি যেতে। তার উপর রণিত বাস থেকে নেমে যাবার পরই রণিতের বেস্ট ফ্রেন্ড অনুব্রতর কাছ থেকে জানতে পেরেছিল রণিত ম্যাথে সিক্স আউট অফ টেন পেয়েছে। দুইয়ে দুইয়ে চার করে নিয়েছিল সুজন। স্যার ইডেনে। রণিত ভয় পাচ্ছিল আন্টি এলে ওর হবে। তাই সুজনদাকে যেনতেন প্রকারেন সঙ্গে করে নিয়ে আসতে চাইছিল। অথচ এত মুখচোরা ওর ভাইটা যে দাদা যেই বলল টিউশন আছে- অমনি চুপ হয়ে গেল। দাদাকে বললেই তো হত যে একটু চলো, মাম্মার বকুনি থেকে বাঁচাবে।

"হ্যাঁ আন্টি, অ্যাকচুয়ালি স্যার আসতে বলেছিলেন। ভাই কই?" সুজন আন্টির চোখ মুখ দেখেই বুঝে গেছে যে খুব রেগে আছেন। কোয়েল দরজা​ থেকে সরে দাঁড়াল, "এসো, স্কুল থেকে সোজা এলে?" "ইয়েস আন্টি, স্যার জরুরি ডেকে পাঠালেন। উনিও আসছেন।" মিথ্যা বলে না সুজন। কিন্তু ভাই-এর জন্য বলতে হল। "এসো, বসো ড্রয়িংরুমে।" "আন্টি, ভাই কই?" কোয়েল জানে সুজন ভাইকে যতক্ষণ না দেখবে অস্থির হয়ে পড়বে। "তুমি বসো, আমি পাঠাচ্ছি রণিতকে।"

রণিত সুজনদার গলা পেয়ে ভীষণ অবাক হয়েছিল। এই যে বলল দুটো টিউশন আছে? আবার চলেও এল? ড্যাডি ডেকেছে বলল! কিন্তু কেন? মাম্মা ঘরে এল তখনি। রণিত ছড়িটা মাম্মাকে দিতে গেল। "থাক, বাবা আসুক তোমার। বাবাই শাসন করবে। দাদা এসেছে। চোখ মুছে যাও।" "আর করব না মাম্মা, দেখো।" "ঠিক আছে। ড্রেসটা চেঞ্জ করে নাও। এখনো স্কুলের জামা পরে রয়েছ।" কোয়েল রণিতের জামা প্যান্ট বার করে দিল। রণিত মাম্মার দিকে তাকাল। মাম্মা তো চেঞ্জ করিয়ে দেয়, যদি থাকে তো। কোয়েল ছেলের মনের কথা বুঝল। ছেলেটা খুব ভয় পেয়ে আছে। সুজন এসেছে, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। কোয়েল যা রেগে গিয়েছিল- আজ ছেলেটা ভালোমতই মার খেত। তুষার এসে সেটা দেখলে আবার কোয়েলের উপর রেগে যেত। ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল কোয়েল। নিজে হাতে চেঞ্জ করিয়ে দিল। চুলটাও আঁচড়ে দিল। চোখের জল মুছিয়ে দিল আঁচল দিয়ে। "যাও, আমি দাদার আর তোমার জন্য টিফিন করছি।" রণিত হঠাৎ করে মাম্মাকে জড়িয়ে ধরল। "কি হল?" "আমাকে মারো মাম্মা।" কোয়েলের বুকে​ মুখ গুঁজে দিয়েছিল রণিত। কোয়েল দু'হাতে ছেলের মুখটা তুলে ধরল, "মন দিয়ে অঙ্ক করবে এবার থেকে।" "আমি তো মন দিয়েই করি মাম্মা। শেষ লাইনে এসে মিলেও যায়। ভিতরে যে কি হয়ে যায়.." কোয়েল জানে এটা কেন হয়। প্রিয়মেরও এমনটাই হত। গল্প শুনেছে কোয়েল। অঙ্ক নাকি ওর মোস্ট ফিয়ারস সাবজেক্ট ছিল। রণিতও তেমন-ই.."কি ভাবছ মাম্মা?" "কিছু না। অঙ্কটা বারবার করে মেলাবি, আর এমন ভুল হবে না।" "আচ্ছা। এত করা অঙ্ক। মুখস্ত পুরো। তাও কেন যে.." কোয়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অঙ্ক বুঝে করতে কমই পারে রণিত। মুখস্ত করে বেশিরভাগটাই। এটাও প্রিয়মের মতোই। তুষারকে বলতে হবে ব্যাপারটা। প্রিয়মের কথা না তুলেই রণিতের সমস্যার কথাটা বলবে কোয়েল। ও অনেক ঠান্ডা মাথার। নিশ্চয় কোন সমাধান বার করতে পারবে।

সুজন ভাইয়ের কানে কানে বলল, "কেমন বাঁচালাম?" রণিত অবাক হয়ে তাকাল, "তুমি জানলে কি করে?" "অনুব্রত বলল তুই সিক্স আউট অফ টেন পেয়েছিস। আর বাসে তোর মুখ চোখের হাল আমি দেখেছিলাম। তখনই বোঝা উচিৎ ছিল যদিও, যে ভাই আমাকে এত করে কেন যেতে বলছে।" "ড্যাডি ডেকেছে বললে যে?" সুজন হাসল, "আন্টি যা রেগেছিলেন! আর কি বলব? স্যারকে টেক্সট করে দিয়েছি। উনি ম্যানেজ করে নেবেন। হ্যাঁ রে, দাদাকে ওরকম করে বলতে হয়, টিউশন আছে কিনা, তবে এসো... বলবি তো দাদা চলো- মাম্মার হাত থেকে বাঁচাতে হবে তো!" রণিত মাথা নীচু করল। "মুখচোরা, বুদ্ধু ভাই আমার। চল্ আজ আমার সাথে যাবি, আমাদের বাড়ি।" রণিত জানে মাম্মা ছাড়বে না। মাম্মা ছাড়লেও ড্যাডি ছাড়বেই না। "ড্যাডি আসুক। সুজনদা.." "নাম ধরে দাদা বললে আর কোনোদিন বাঁচাতে আসবো না কিন্তু!" সুজনের গলায় অধিকার বোধ ঝরে পড়ে। "আচ্ছা.. দাদা, ড্যাডি কখন আসবে গো?" সুজনের মুখটা খুশিতে ভরে গেল। ওর ভাই ওকে দাদা বলে ডেকেছে। "স্যার আসছেন বললেন তো, এক্ষুণি চলে আসবে দ্যাখ।" রণিতের চুলগুলো উলোটপালোট করে দিল সুজন।​

মনোসিজ একটু ইতস্তত করেই তুষার স্যারের সামনে গেল। স্যার ইডেন থেকে বেরোচ্ছেন, বাইকে উঠেই পড়েছেন প্রায়। এমন সময় মনোসিজ গিয়ে স্যারকে বলল, "স্যার.." তুষার একটু থমকে দাঁড়ালো, "হ্যাঁ, বলো।" "বাবা বললো আপনাকে বলতে পিউকে নিয়ে আপনাদের বাড়ি যাচ্ছে.. তাই আমিও যেন.." মনোসিজ বাক্যটা শেষ করতে পারছিলো না। লোকটাকে কিভাবে বলবে যে বাবা বলেছে ওদের বাড়ি যেতে। পিউ আর বাবাও আসছে। তুষার হাসল মনে মনে। অনিকেতদা ছেলেকে তুষারের​ সঙ্গে সহজ করাবার জন্য এইসব করছে। "বাইকে উঠে পড়ো, হেলমেটটা পরে নাও।" তুষারের কথায় হকচকিয়ে গেল মনোসিজ। ও বাইকে উঠে যাবে? গাড়ি আছে তো.. "কি হল? ওঠো। উই আর গেটিং লেট।" মনোসিজের ক্ষমতা ছিল না স্যারের এই কথাটার অমান্য করার। বাইকে উঠে হেলমেটটা পরে নিল ও। "বাইকে প্রথম চড়ছ, ধরে বসো।" মনোসিজ ধরে বসতে বসতে ভাবলো লোকটা কি করে জানলো ও প্রথমবার বাইকে চড়ছে? তাও লোকটাকে ধরেই চুপ করে বসে থাকল ও। বাইকে যেতে যেতে ওর মনে হচ্ছিল লোকটা ভীষণ চুপচাপ, রাগী। রণিতকে নির্ঘাৎ খুব শাসন করে, আন্টি খুব ভালো। মায়ের মত একদম। বিউটিফুল, এলিগ্যান্ট, ডিগনিফায়েড। লোকটার সঙ্গে মানায় না। আজ সকালেও বড্ড চেঁচিয়েছে। ফ্রন্টফুটে পুল করার জন্য। ব্যাক এন্ড অ্যাক্রস না গেলে পুল করা ঠিক হয় না। বডি ওয়েটটা ট্রান্সফার করতে হয়। দীপমাল্যকে দিয়ে টানা শর্ট বল করিয়ে গেছে মনোসিজকে। সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়াতেই লোকটার কথায় চমকে উঠল মনোসিজ, "ফুচকা খাবে?" "নো স্যার।" "খেলে খাও। জুলজুল করে তো দেখছ সবকটা ফুচকাওয়ালাকে।" গাড়িটা সাইড করল তুষার। লোকটা এটাও দেখে ফেলেছে? ফুচকা খেতে সত্যিই লোভ হচ্ছিল মনোসিজের। কিন্তু বাইরের খাবার খেতে বাবা মানা করেছে, স্পেশ্যালি স্ট্রিট ফুড। মা থাকতে এসব মানা টানা ছিল না। বোন ছোট থাকতেও​ মায়ের সঙ্গে ফুচকা খেয়েছে মনোসিজ। "বাবাকে বলব না। খেয়ে নাও। মোহর বৌদি খুব ভালোবাসতেন।" তুষার মনোসিজের হাতে ফুচকার শালপাতাটা ধরিয়ে বলল। "আপনি মা'কে.." মনোসিজের চোখে যেন জল দেখল তুষার।​ "খুব ভালো করে চিনতাম।" মনোসিজ মাথা নীচু করল। লোকটা ওর পিঠে আলতো হাত রাখল। "খেয়ে নাও। ভালো করে নেট করলে উই শ্যাল রিপিট।" মনোসিজের মনে হল, লোকটা অতটাও মনে হয় বাজে নয়।

অনিকেত আঙ্কলকে আসতে দেখে বেশ অবাক হয়েছিল সুজন। সঙ্গে আবার মনোসিজের বোনকেও এনেছে। পিউ মেয়েটা দেখতে ভারী মিষ্টি, কিন্তু আজ আসার কী ছিল। সুজন ভাবছিল ভাইয়ের সঙ্গে সময় কাটাবে, না না- ভাইয়ের এখন মন ওদিকে পড়ে থাকবে। এতটুকু পুঁচকে ছেলে, কী ভীষণ পেকেছে। সুজনের এখনো গার্লফ্রেন্ড জোটেনি আর ভাইয়ের এবিডিগিরি করে এমন বার্বি ডলের মত গার্লফ্রেন্ড জুটে গেছে। মুখে তো বলছে, "না দাদা- কী যে বল!" কিন্তু চোখ অন্য কথা বলছে। "পিউ, তুমি আমার দাদাকে চেনো?" সুজন রণিতের কথায় অবাক হল। পিউ-ও। "তোমার দাদা?" "বাহ্ রে! দাদা কি একা তোমার আছে? এই দেখো, আমার দাদা- সুজনদা।" "ওহ, দাদা তুমি লরেন্সের ক্যাপ্টেন না?" সুজন হাসল। মেয়েটা এত মিষ্টি যে মনোসিজের বোন হলেও রাগ দেখানো যায় না।" "তুই কি করে জানলি?" "আমি তোমাকে ইডেনে দেখেছি তো। ফাইনাল ম্যাচটা খুব ভালো খেলেছিলে।" "তাই?" তুই খেলা দেখিস?" "পিউ তো ক্রিকেটের পোকা একদম।" "ওহ, এই পুঁচকিটাই তোকে এবিডি বলছে ভাই?" সুজন ভাইকে চোখ মেরে বলল। রণিতের গাল লজ্জায় লাল হয়ে গেল। পিউ কটমট করে রণিতের দিকে তাকাল, "সবাইকে বলে দিয়েছ?" "সবাই কই? দাদা তো!" "দাদা, তুমি কি করে আমাকে পুঁচকি বলে ডাকলে, ওই নামে​ আমার দাদা ডাকে তো। দাদা বলেছে তোমাকে?" পিউর কথায় হেসে ফেলল সুজন, "দাদার কাছে বোনেরা পুঁচকিই হয়। ছোট্ট এতটুকু পরী একদম।" পিউ বলল, "ঠিক বলেছ। তাহলে আমার এখন দুটো দাদা, কী বলো?" সুজন ভীষণভাবে চমকে উঠল কথাটায়। পিউ তো মনোসিজের বোন। মনোসিজ ছেলেটা ভালো না। মনোসিজকে ও পছন্দ করে না। তার বোন অথচ কি অনায়াসে সুজনকে দাদা বলে দিল। আর এই ডাকটা ফেরাতেও ইচ্ছা করছে না সুজনের। যখন ছোট ছিল, মাকে কত করে বলত একটা ভাই আর একটা বোন এনে দিতে। ভাই তো কবেই পেয়ে গেছে। আজ থেকে যেন বোনও পেয়ে গেল। খুব খুশি লাগছিল নিজেকে সুজনের। খুব আনন্দ পাচ্ছিল ও।

"স্যার, আমি তবে আসছি।" স্যারের সঙ্গে মনোসিজকে আসতে দেখে সুজন উঠে দাঁড়াল। তুষার বুঝল সুজন রেগে গেছে। "বসো। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিই। কথা আছে।" সুজন চুপ করে বসে পড়ল। স্যার মনোসিজকে নিয়ে এলেন! বাইকে চাপিয়ে! কিছুতেই মানতে পারছে না সুজন। মনোসিজও অপ্রস্তুতে পড়েছিল। অনিকেত সব বুঝে বললেন, "সুজন, সৃঞ্জয় এখন আসামে, তাই না?" "ইয়েস আঙ্কল।" "সৌমেন বলছিল, তোমার খেলা সৃঞ্জয়ের থেকেও ভালো। আমারও তাই মনে হয় আর কি।" সুজন ভারী অবাক হল। বাবা ওর খেলার প্রশংসা করেছে। তাও কাকার থেকেও ভালো বলে। "বাংলা ক্রিকেটে এই সৃঞ্জয়দের জেনারেশনটার আর কিছু হবে না। এখন তোমরাই ভরসা। মনোসিজ ঠিকঠাক নেট করছে?" সুজন আর মনোসিজের চোখাচোখি হল। "তুমি ওর ক্যাপ্টেন, তাই জিজ্ঞাসা করছি। তুষার বলে তোমার মধ্যে ক্যাপ্টেন্সি মেটেরিয়াল আছে। তুষারের জাজমেন্ট কখনো ভুল হয় না।" "করছে আঙ্কল।" সুজন আস্তে করে বলল। অনিকেত মনোসিজের কাঁধে হাত রাখলেন, "ও আসলে ওপেনিং স্লটটা পছন্দ করে, তাই হয়তো​ নেটে.." মনোসিজ বাবার দিকে তাকাল। কি দরকার এই ছেলেটাকে এত পাত্তা দেবার! "আঙ্কল, ওটা তো স্যারের ডিসিশন।" অনিকেত ঘাড় নাড়লেন, "ঠিকই বলেছ।" সৌমেনের ছেলে সৌমেনের মতই মেপে কথা বলে। তুষার চলে এসেছিল ততক্ষণে। "মনোসিজের সবচেয়ে ভালো শটটা কী বলো তো সুজন?" স্যারের গলা পেয়ে তাকাল সুজন, মনোসিজও। সুজন বলল, "কভার ড্রাইভ।" "ইয়েস। একদম দ্রাবিড়ের মত খেলে। আর মনোসিজ, সুজনের কোন শটটা ভালো লাগে?" মনোসিজ একটু ভেবে বলল, "স্কোয়ার কাট।" "এক্সাক্টলি। তাহলে দেখো- দুজনেই দুজনের খেলা দেখো, ফলো করো- তবে মুখে কুলুপ কেন? একসাথে এক টিমে খেলে বাংলাকে জেতাবে- কিন্তু বন্ধুত্ব না হলে কি এটা আদৌ সম্ভব?" সুজন, মনোসিজ দুজনেই মাথা নীচু করল। "ভালো ক্রিকেটারের সাথে ভালো ক্রিকেটারের ইগো নয়, বন্ধুত্বের সম্পর্কই হওয়া উচিৎ।" অনিকেত যোগ করলেন। "রণিত আর পিউ কোয়েলের কাছে বলেই বলছি, রণিত না হয় এক্সেপশন্যাল। ওর কোন তুলনা হয় না। কিন্তু তোমরা দু'জনেও পিছিয়ে নেই। আন্ডার নাইন্টিন ইন্ডিয়া টিমে ঢোকার মত সব মশলা তোমাদের​ আছে। আর সেটা তখনই সম্ভব যখন বাংলা কোচবিহার ট্রফি জিতবে। তাই একে অন্যের পাশে দাঁড়াও, কাজে লাগবে।" অনিকেত বেশ জোরের সঙ্গেই​ কথাগুলো বললেন। সুজন আর মনোসিজ চুপ করে শুনল। কোন উত্তর দিল না।​

"সিক্স আউট অফ টেন!" তুষার ছেলের পরীক্ষার খাতা খুঁটিয়ে দেখছিল। "লাস্ট স্টেপে ক্যাজুয়াল মিসটেক সব, দেখেছো?" কোয়েল বলল। তুষার ঘাড় নাড়ল, "তাই তো দেখছি। অঙ্ক মুখস্ত করে মনে হয়।" "হ্যাঁ, অঙ্কে ওর খুব ভয়। মুখস্তই করে।" "আরো ভেঙে ভেঙে করতে হবে ওকে, প্রত্যেকটা।" কোয়েল ঘাড় নাড়ল। "হ্যাঁ, তবে বেসটা এভাবে উইক হয়ে গেলে.." "সেই তো। কোয়েল, মা'কে একটু বলো না- ম্যাথটা সপ্তাহে একদিন হলেও পড়াতে.. উনি খুব ভালো বোঝান, আমি দেখেছি।" কোয়েল মাথা নাড়ল, "বলবো,​ আসলে মা এত ব্যস্ত মানুষ.." "সে তো জানি। তবে বাবুর ব্যাপার তো, রাজি হয়ে যেতেও পারেন।" "হলেই ভালো। জানো, আজ সুজন না এসে পড়লে খুব মার খেতো তোমার ছেলে।" তুষার কোয়েলের কষ্টটা বুঝল। ওর হাতে চাপ দিল। "এত রাগ করতে নেই। ভুল শট খেললে আমারও রাগ হয়- কিন্তু আমি মারি কখনো? দেখেছো?" "জানি। তবে আজ এটা নিয়ে একটু শাসন করবে তুমি। আমি বলেছি, বাবা শাসন করবে।" তুষার বুঝল শাসনটা করা জরুরী। তার সঙ্গে বোঝানোও। "আচ্ছা আমি বোঝাবো ওকে। কিন্তু তুমি আর রাগ করে থেকো না। সবাই তো সবকিছুতে ভালো হয় না কোয়েল। বাবুরও কিছু লিমিটেশনস আছে। ওর পাশে থেকে আমাদের ওকে এই হার্ডলকে টপকাতে সাহায্য করতে হবে। বেশি বকাঝকা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।" কোয়েল তুষারের নাকে মৃদু টান দিল। ও বুঝেছে। ছেলেকে ম্যাথটা আরো স্পেশাল লেবার দিয়ে করাতে হবে ওকে। নাহলে রেজাল্ট ভালো হবে না।

(১২)

মোবাইলে নামের লিস্টটা দেখে থমকে গেল প্রিয়ম। বাংলার কোচবিহার ট্রফির নামের লিস্ট। ওর প্রথম সন্তান রণিতের নাম আছে তাতে। মজুমদার নয়- সান্যাল হিসাবে। রণিত তুষার সান্যাল। মনটা মোচড় দিয়ে উঠল যেন। কলকাতার বন্ধুদের থেকে বিগত মাস ছয়েকে নিজের ছেলের অনেক প্রশংসা শুনেছে প্রিয়ম। রণিতই যে কলকাতার ক্রিকেট জগতের ভাবী নক্ষত্র এ নিয়ে কারোর মনেই কোনো সন্দেহ নেই। আজ অনুর্ধ সতেরোর টিমে বছর এগারোর ছেলেটার নাম দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল প্রিয়মের, গর্বও। বিখ্যাত বাবার মান রক্ষা করে ছেলেটাও তবে বিখ্যাত হবার পথে হাঁটা শুরু করেছে। ইন্টারস্কুল ফাইনালের ইনিংসটার পর খবরের কাগজে ছেলের ছবি বেরিয়েছিল। কাগজ থেকে ছবিটা সযত্নে কেটে নিজের কাছে রেখেছে প্রিয়ম। বড় হয়ে গেছে বেশ। একদম কোয়েলের মতো দেখতে হয়েছে। গোঁফদাড়ি এখনো ওঠেনি। প্রিয়মের পল্লবীর সঙ্গে এখনো অবধি কোন সন্তানাদি নেই। ওদের সন্তান জোজোর ব্লাড ক্যান্সারে তিনমাস আগে মৃত্যুর পর পল্লবীই​ কনসিভ করতে চায় না। আবারো ব্যস্ত নায়িকা যেন। নতুনভাবে সন্তান প্রতিপালনের সময় নেই। এদিকে প্রিয়মও নিজের প্রথম​ সন্তানকে সেই কবেই ছেড়ে এসেছে। সন্তান থাকা সত্ত্বেও​ এক জীবন যাপন করতে হচ্ছে ওকে। তার উপর কোয়েলের দ্বিতীয় বিয়ের পর ছেলেটার পদবীই বদলে দিয়েছে কোয়েল। যাতে প্রিয়মের সঙ্গে রণিতের সংযোগের চিহ্নটুকুও অবশিষ্ট না থাকে। এভাবে কি সবকিছু মোছা যায়? প্রিয়ম নিজের দোষ মানতে নারাজ, তা নয়। রণিতকে সে জন্মের পরই ছেড়ে এসেছে। তা বলে সে যে রণিতের জন্মদাতা এই কথা তো কোনোভাবেই খন্ডন করা যায় না। মধ্য তিরিশে এসে সব পুরুষের মতো প্রিয়মেরও ভীষণ বাবা হতে ইচ্ছা করে। ছেলেটাকে দেখতে, তাকে কাছে পেতে, তার সঙ্গে সময় কাটাতে, গল্প করতে, ভালবাসতে খুব ইচ্ছা করে আজকাল। অথচ তার কাছে থাকার কোনো রাইট খুঁজে পায় না প্রিয়ম। এবার কোচবিহার ট্রফি মুম্বাইয়ে হবে। রণিত মুম্বাইয়ে খেলতে আসবে। সেই সময় প্রিয়ম একবার চেষ্টা করবে ওর সঙ্গে দেখা করার। একটাবার ওকে ছুঁয়ে দেখতে চায় প্রিয়ম, ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চায়, ওর ঘ্রাণ নিতে চায়, ওর মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে চায়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের ইচ্ছাটা পূরণ করবে প্রিয়ম।

"ড্যাডি.." ছেলের গলা শুনে তাকাল তুষার। ও ড্রয়িংরুমের​ সোফায় বসেছিল, "ডেকেছো?" তুষার ঘাড় নাড়ল। "আয়, বস্।" রণিতের ভীষণ ভয় করছিল। মাম্মা বলল ড্যাডি ডাকছে ম্যাথে কম পাওয়ার জন্য। মাম্মা ড্যাডিকে বলল কেন? এর থেকে নিজে মারতো.. ড্যাডি যদি বকে? যদি কথা বন্ধ করে দেয়? "না তুমি বলো।" "ভয় পাস না, বস্।" রণিত কাঁচুমাচু মুখ করে বসলো। "বলো.." "অঙ্ক বুঝতে পারিস না, তাই না বাবু?" "বুঝি তো ড্যাডি, আবার ভুলে যাই। মুখস্ত থাকে না যে।" "মুখস্ত করতে নেই যে অঙ্ক জিনিসটা সোনা।" তুষার হেসে বলে। "তবে?" "বুঝে করতে হয়। এবার থেকে মাম্মার সাথে সাথে ড্যাডিও অঙ্ক করাবে তোকে, বুঝিয়ে বুঝিয়ে, কেমন?" "আচ্ছা।" "দিদানকেও বলেছি সপ্তাহে অন্তত একদিন করে এসে ম্যাথটা করিয়ে দেবে।" "আচ্ছা ড্যাডি।" "যা- মায়ের কাছে পড়তে বস্।" "একটু গেম খেলবো- তোমার ফোনে?" তুষার হাসল। একটানা পড়ছে ছেলে, একটু ব্রেক দেওয়াই যায়। নিজের মোবাইলটা আনলক করে দিল। "নে.." হঠাৎই ফেসবুক খুলে গিয়ে নিউজ ফিডে প্রিয়মের ছবি ভেসে উঠল। কোন বই প্রকাশের খবর হবে.. রণিত কি করবে বুঝতে পারছিল না, তুষার ছেলের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে ফেসবুক এক্সিট করে গেমটা খুলে দিল, "নে, খেল।" "না থাক ড্যাডি- পড়তে যাই।" তুষার অবাক হল, "কেন রে?" "এমনি। মাম্মা ওয়েট করছে। লেট করে গেলে বকবে।" তুষার বুঝল প্রিয়মের ছবিটা দেখে রণিতের মুড অফ হয়ে গেছে। ছেলেকে কোলে ডেকে নিল। "চল্। আমিও যাই। আমার কোলে বসে মাম্মার কাছে পড়বি আজ।" ছেলেকে চুমু খেয়ে বলল তুষার। "সত্যি?" "তিন সত্যি। চলো।" "ড্যাডি, শোনো.." ছেলের কথায় তুষার ঝুঁকলো। রণিত বাবার গালে চুমু খেল। "আই লাভ ইউ ড্যাডি।" এই আদরের কারণটা তুষার বুঝলো। কিছু বললো না। "আই লাভ ইউ টু মাই সন।"

"সুজন, তোমার মোবাইল নাম্বারটা দেবে?" প্র্যাকটিস শেষে কিট ব্যাগ গোছাচ্ছিল সুজন। হঠাৎ মনোসিজের গলা পেয়ে ঘুরে তাকালো। "হ্যাঁ, কেন নয়? সেভ করে নাও।" মনোসিজ সেভ করে নিল। "থ্যাঙ্কস।" "ওয়েলকাম।"​ "ভাইকে তো দেখছি না.." সুজন বুঝল মনোসিজ রণিতের কথা বলছে। কিন্তু ভাই বলে বলবে কেন.. সুজনের চেহারার রঙ বদল মনোসিজ পড়তে পারল, "মানে তোমার ভাই, রণিত।" "টয়লেটে গেছে।" "আচ্ছা আজ স্যারদের বাড়ি যাবো বিকালে।" সুজন ভুরু কুঁচকাল, "কেন?" "আমার বোনকে নিয়ে। আসলে রণিতের ম্যাথে একটু সমস্যা হচ্ছে, আর পিউ তো ক্লাসের টপার। তার উপর আমারও সায়েন্সই আছে.. স্যার বাবাকে বলতে বাবা আমাকেই বলল দুজনকেই একসাথে নিয়ে বসতে।" সুজন অবাক হল, ভাই তো এসব কিছু বলল না, "ওহ।" "পিউ বলছিল তোমাকেও আসতে বলতে আজ স্যারের বাড়ি।" "আমাকে?" "বয়ফ্রেন্ডের দাদারও উঠতে বসতে প্রশংসা করে সবসময় আজকাল। দাদা তোর ক্যাপ্টেন বলে কখনো, কখনো বলে রণিতের দাদা, কখনো সুজনদা.." সুজন মনোসিজের কথা বলার সহজ ভাবে হেসে ফেলল। "পুঁচকে-পুঁচকি আবার বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড!" মনোসিজও হাসল, "সেই আমাদেরই জোটেনি, নাকি তুমি এনগেজড?" "না, না, একদম সিঙ্গেল। এটাই ভালো।" "যা বলেছ। তবে স্যার আর আন্টির মতো লাভ স্টোরি হলে, মন্দ হয় না।" সুজন বুঝল মনোসিজ ব্যাপারটা জানে, "একদম, মেড ফর ইচ আদার।" মনোসিজ ঘাড় নাড়ল, "ঠিক আর আন্টি খুব মাদারলি। পিউকে রোজ একবার না একবার ফোন করে খোঁজ নেন, যেই শুনেছেন ও ছোট থেকে মা'কে পায়নি।" সুজন চমকাল। "তোমার মা.. মানে.." "মারা গেছেন। সাড়ে আট বছর আগে।" "অ্যাম সরি।" "নাহ। এতে সরির কিছু নেই। জানো, তার আগে আমিও তোমার মত গুড বয় ইমেজ ক্যারি করতাম..মায়ের শাসন ছিল তো.. মা চলে গিয়েই.. " সুজন মনোসিজের গোপন কষ্টের জায়গাটা হঠাৎই চিনে ফেলল। "আমি কিন্তু স্যারের শাসনে শুধরেছি।" "এই স্যারের?" "একদম। তার আগে বাড়ির সবার অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে স্পয়েলড ব্র্যাট হয়ে গেছিলাম। স্যার শাসন করে বদলেছেন। হি ইজ লাইক আ ফাদার ফিগার টু মি। আবার খুব ভালো বন্ধুও।" "বন্ধু! দেখেই তো ভয় করে।" "ওটা উপরের আবরণ। ভেতরে ভেতরে তুষার সান্যাল একদম অন্যরকম। খুব নরম মনের মানুষ।" "রণিত আসছে।" মনোসিজ বলল। রণিত একছুট্টে দাদার কাছে এলো। "দাদা স্কুল আছে তো।" সুজন ভাইয়ের মাথায় হাত রাখল, "আছে তো ভাই।" "চলো তবে।" "চলো, তোর নতুন টিউটরকে বাই করে দে।" "ওহ তাই তো। মনোসিজদা তো আজ ম্যাথ করাতে আসবে, ড্যাডি বলছিল।" মনোসিজ বলল, "রণিত তোমার দাদাকেও বলেছি আসতে।"

"দাদা আসবে? কি মজা।" "আগে ভালো করে ম্যাথ করবি- তবেই আসব।" "এসে আজ থাকবে আমার কাছে।" রণিত দাদার কাছে আব্দার করে। "আরে আগে তো যাই- তারপর দেখা যাবে।" মনোসিজ দাদা আর ভাইয়ের খুনসুটি দেখে পিউর কথা মনে পড়ে। বোনটাকে আর বকবে না কখনো। কাছে নিয়ে ঘুম পাড়াবে। মায়ের গল্প এখন অতটা বলে না মনোসিজ। পিউ আর একজনের মধ্যে ভালো মা পেয়ে যাবে- ওর মন বলে।

"দাদা.." পিউর কথায় স্টাডি টেবল থেকে তাকায় মনোসিজ। "বল্।" "না থাক.." মনোসিজ বুঝল গুরুতর কোন কথা বোন বলতে চাইছে। "চল্, শুয়ে পড়ি.. শুয়ে শুয়ে গল্প হবে, নাকি?" পিউ না করল না। "বাবার আসতে লেট হবে, পুঁচকি?" "এট্টু।" "বাবা এলে আমি উঠে ডিনার দিয়ে দেব।" "পিসি.." "ঘুমোচ্ছে, ফালতু ডেকে কি হবে।" "সেই।" পিউ খাটে শুয়ে পড়ল। মনোসিজ খাটের বিপরীত দিকে শুলো। "কি হল? মন খারাপ কেন?" "জানিস দাদা- কোয়েল আন্টিকে দেখে খুব মায়ের কথা মনে পড়ে। আমাদের মা থাকলেও এমন হত, তাই না?" মনোসিজ বোনের মনটা পড়তে পারে, "ঠিক একইরকম। আর আন্টি তোকে খুব ভালোবাসেন। সবসময় মামণি বলতে অস্থির।" "রণিত বলে, আন্টি নাকি খুব স্ট্রিক্ট- কই আমার তো মনে হয় না।" "আমারও। তার থেকে স্যার তো অনেক স্ট্রিক্ট মনে হয়।" "আঙ্কল নাকি রণিতের বন্ধু।" "সুজনেরও। আজ সুজনের খুব মজা, স্যারের বাড়ি থাকবে।" "অনেক প্ল্যান করে ফেলেছে সুজনদা আর রণিত। গল্প করবে, ক্যারম খেলবে.." "সুজনকে স্যার খুব ভরসা করেন।" পিউ দাদার কাছে ঘেঁষে আসে, "তুই মন দিয়ে খেললে তোকেও করবে।" "খেলছি তো, আজ আগে ব্যাট-ও দিয়েছে।" "গ্রেট।" "তবে সুজন ইজ লাইক হিজ এল্ডার সন। ওই জায়গাটায় যাওয়া মুশকিল।" "তুই কারোর জায়গায় যাবি কেন বুদ্ধু দাদা। নিজের জায়গা তৈরি করবি।" "তাই বুঝি? পাকা বুড়ি একটা। যেমন তুই রণিতের মনে নিজের জায়গা করে নিয়েছিস তেমন?" "ধ্যাৎ, ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে দিলাম।" "এত লুকোবার কিছু নেই। আমার পছন্দ রণিতকে।" "ইস্!" "কি ইস্। ওকে তাই-ই মনে হয়। ভাই বলে ডাকলে তো সুজন রেগে যাবে। তোর বয়ফ্রেন্ড মানে একদিক থেকে ভাই-ই হল, নাকি?" "দাদা! তেমন কিছু না রে। আর ও এখন তোর স্টুডেন্ট। স্টুডেন্ট ভাই-ই হয়।" "তাও ঠিক।" "দাদা.." "বল্।" "রণিত অঙ্কটা কমই বোঝে, না?" মনোসিজ হাসল, "হ্যাঁ, একটু কাঁচা। আমি ধরে করালে ঠিক হয়ে যাবে।" "তোর মত পড়ায় খেলায় দুটোতেই ভালো কেউ হয় নাকি!" "থাক্, আর মাখন লাগাতে হবে না, ঘুমো।" পিউ চোখ বুজে নেয়।

তুষার জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছিল। অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। ঠান্ডা ভাব আছে। রণিত আজ দাদাকে নিয়ে অস্থির। খেয়ে দেয়ে ক্যারম খেলে গল্প করে দাদার কাছেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেকে ছেড়ে শোবার অভ্যাস নেই বলে তুষারের মনটাও খুঁতখুঁত করছে। হঠাৎ পিছন থেকে কোয়েলের জড়িয়ে ধরাতে ঘুরে তাকাল তুষার। "পিয়া.. রান্নাঘর গোছানো কমপ্লিট? আমাকে ডাকতে পারতে।" "থাক, আমি করে নিয়েছি।" "বেশ। চলো ঘুমিয়ে পড়ি, নাকি?" "হ্যাঁ কাল সকালে উঠে আবার প্র্যাক্টিস তোমাদের। জানো বাপ্পা, বাবু হবার সময় ভেবেছিলাম মেয়ে হলেই ভালো হয়। মা এখনো বলে, এর পরে একটা মেয়ে চাই মায়ের। পিউকে পেয়ে সেই শখটা মিটছে, কি বলো?"​ তুষার কোয়েলের মনের কথাটা বুঝল, "আমারও। তবে মামণি তো তোমারই বেশি ন্যাওটা।" "ওর মায়ের অভাবটা বোঝো তো.." "ভীষণ ভাবে বুঝি। তাই চাই, তুমি ওর দিকে যেমন নজর দিচ্ছ, সেভাবেই নজর দাও।" কোয়েল তুষারের বুকে মাথা রাখল, "চেষ্টা করছি। আজ বাবুর পড়া হলে ছেলেরা যখন গল্প করছিল, মেয়েটা আমার পায়ে পায়ে ঘুরছিল চারিদিকে। আমি দেখলাম চুলের যত্ন একটুও নেয় না। কেউ শেখায়নি হয়তো। মাথায় তেল দিয়ে ভালো করে বিনুনী বেঁধে দিলাম।" তুষার কোয়েলের কপালে চুমু খেল। "ভালো করেছ। তোমার মায়ের নাতনীর শখটাও নাতবৌ-এ মিটবে মনে হয়।" কোয়েল হেসে ফেলল, "মেয়ের খুব মন বাঁদরটার উপর।" "তোমার ছেলেরও কম নয়।" কোয়েল অবাক হল, "তাই নাকি?" "তোমাকে লুকায়। আমি বুঝতে পারি।" কোয়েল খুশি হল, "তা ভালো। ঠিকমতো পড়লে আর খেললেই হলো।" "বৌমা পছন্দ তবে?" "পছন্দ।" তুষার কোয়েলকে আরো একটু আদর করল, "জানো পিয়া, আমার মায়ের তোমাকে খুব পছন্দ ছিল। এই যেমন তুমি পিউকে ভালোবাসছ, মা-ও.." "সব মনে আছে আমার। আমি ভুলটা না করলে.." "ওভাবে বলো না। ওটা হবারই ছিলো। তবে মা এখন খুশি নিশ্চয়, তাই না? তোমাকে বৌমা করতে পেরেছে।" কোয়েলের চোখে জল চলে এল, "দেখতে পেলেন আর কোথায়?" "দেখছে তো। মা সবসময় আমাদেরকে দেখছেন। বাবুকেও দেখেন আর আশীর্বাদ করেন নিশ্চয়। মায়ের একটামাত্র নাতি বলে কথা।" "এখন তো নাতবৌ-ও আছে।" কোয়েলের কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে উঠল দু'জনেই। একসঙ্গে।​

ইমেলটা পেয়ে ভীষণ চমকে উঠল কোয়েল। প্রিয়মের ইমেল এত বছর পর। মেইল আইডি জোগাড় করল কোথা থেকে! ভেবেও কোয়েল বুঝল- ফেসবুক থেকে মেইল আইডি পাওয়া কঠিন নয়। ইমেলের বয়ান পড়ে আরো অবাক হল। প্রিয়ম একবার দেখা করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছে কোয়েলের সঙ্গে, বাবুর সঙ্গে। রণিতের সাফল্যের সমস্ত খবর পেয়েছে প্রিয়ম, এবং সেই সাফল্যে কতটা খুশি হয়েছে তা লিখতেও কসুর করেনি। ধন্যবাদ জানিয়েছে কোয়েলকে প্রিয়মের ছেলেকে এত ভালো করে মানুষ করেছে বলে- যোগ্য করে তুলেছে বলে। একটাবার রণিতকে দেখতে চায়, কথা বলতে চায়, ছুঁতে চায় এমন অভিপ্রায় প্রকাশ করেছে। মেইলটা পেয়ে কি প্রতিক্রিয়া দেবে ভেবে পেল না কোয়েল। যেটা কোনদিন ঘটবে বলে মনে ভাবা হয় না, তা চোখের সামনে ঘটে গেলে মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রিয়মকে যোগ্য জবাবটা মেইল করে দিতে ইচ্ছা হলেও কোথায় যেন বাঁধলো। কথায় কথা বাড়বে। তার থেকে ইগনোর করা ভালো। প্রিয়ম যেমন ইগনোর করে গেছে এতগুলো বছর। এখন বাবু যোগ্য হয়ে উঠছে বলে তার বাবা হিসাবে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াবার তাড়নাকে অবজ্ঞা করা উচিৎ- এটাই সঠিক বলে মনে হল কোয়েলের। এই কথাটা কাকে জানাবে? তুষারকে? যদি কষ্ট পায়? যদি ভুল বোঝে? মা'কে বলবে? মা যদি বলে যোগাযোগ করতে! নাহ। তার থেকে কথাটা নিজের মধ্যেই রেখে দেওয়া ভালো- মনে হল কোয়েলের। আর সাথে এটাও বুঝে গেল প্রিয়মের প্রতি ওর আর কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই। তীব্র রাগ বা ঘৃণার যে অনুভূতি ছিল সেটাও কেমন যেন অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। যে মানুষটাকে একসময় ভালোবাসতো, জীবনের থেকেও বেশি মনে করত, যাকে সামনে পেলে একান্তে পেলে কয়েকটা প্রশ্ন করবে ভেবেছিল সে নিজে থেকে​ দেখা করতে চাইলেও- কোয়েলের তার সঙ্গে দেখা করার, তার মুখোমুখি বসার বা তাকে প্রশ্ন করার কোন ইচ্ছাই আর অবশিষ্ট নেই। জীবনের বই থেকে প্রিয়ম নামের পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে কোয়েল। মনেও করতে চায় না তাকে আর, রণিতের ড্যাডির বাইরে আর কাউকেই মনে করতে চায় না কোয়েল। তুষার এতটাই পূর্ণ করেছে ওকে- এতটাই ভালোবাসায় ভরিয়েছে যে তুষারের আগে কখনো কাউকে ভালোবেসেছিল সেটাই যেন ভুলে গেছে কোয়েল।

■ পূর্বের সংখ্যাগুলো পড়ুন ■ পরিচিতি

Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.