x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

■ শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় / পৃথিবী বন্ধ্যা হোক

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ | |

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রায় দিন পনেরো পরে মারা গেল ১৯ বছরের মেয়েটি। নাম মণীষা বাল্মিকী হোক বা অন্য কিছু, কোটি কোটি ভারতীয় মেয়ের এক প্রতিনিধি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হাত-পা এমনকি শিরডাঁড়া পর্যন্ত ভেঙে নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেওয়ার পর এমনিতেই বাঁচার আশা ছিল না। তার ওপর জিভটাও কেটে গিয়েছিল বাক্য বন্ধ করতে নাকি এমনিই পৈশাচিক উল্লাসে কে জানে? তাও ভাগ্য, লাশটা পাওয়া গেছে, পুড়িয়ে বা ডুবিয়ে দেওয়া হয়নি। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে প্রাথমিকভাবে কিছুদিন ভর্তি থাকার পর নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লীর সফদরজং হাসপাতালে। তবে বাঁচানোর আশায় যে নয়, বলাই যায়। টানা পনেরোদিন ধরে আক্ষরিক অর্থেই অবর্ণনীয়, মানে বর্ণনা করার অঙ্গটিই তো কর্তিত, অনির্বচনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে ২৯ সেপ্টেম্বর সে নিষ্কৃতি পেল। অবশ্য যখন খুনটা হয়েছিল তখন ‘এমনটা কতই হয়’ তত্ত্বানুসারে ততটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, যতটা দেখা গেল যন্ত্রণাকাতর দেহটা নিথর হয়ে যাওয়ার পর।

অপরাধের পরিসংখ্যান দেখলে তার একটা সম্প্রদায়িক অভিমুখ অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। এই সিদ্ধান্ত ইদানিং কেন মান্যতা পাচ্ছে, সে প্রসঙ্গে নতুন করে বলার কিছু নেই।​ কিন্তু এই নৃশংসতার সঙ্গে যারা জড়িত তারা যে সম্প্রদায়েরই হোক প্রায় ১০০% পুরুষ, সে ব্যাপারে মুখ খুললেই বিশ্রীভাবে আক্রান্ত হতে হচ্ছে।​ মেয়েরাও খুন করলে বধূহত্যা করে, sex racket​ চালালে নারী পাচারেই অংশগ্রহণ করে থাকে। এক আধটা বর হত্যা​ ঘটলেও তার পেছনে থাকে​ পুরুষ বন্ধুদেরই সাহায্য​ বা উস্কানি। আবার​ দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করতে করতে চরম পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন যতটা তৎপর, ততটাই চট করে সংবাদ শিরোনামেও চলে আসে। আর অমনি জিগির ওঠে মেয়েরাও কম নিষ্ঠুর কম কামুক নয়, বরং বেশি ইত্যাদি। এগুলো কতখানি অসার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।​ হিন্দুত্ববাদের নামেও একটা​ নারীবিদ্বেষী​ চরম পুরুষতান্ত্রিকতা তৈরি করা হচ্ছে। এরই একটি সন্ধিক্ষণে করোনার আবহকে উপলক্ষ করে একটি রাজ্যে একটি মহাকাব্যের চরিত্র (নাম লেখার সাহস নেই) নিয়ে লীলাকীর্তন অক্ষুন্ন থাকলেও তাঁরই আরাধ্যা দেবীর পুজোতে যে বিধিনিষেধ চাপানো হল, তার আপৎকালীন তাৎপর্য অনুধাবন করেও বলতে হয়, পুরুষ দেবতা এমনকি দেবতার অবতারের আরাধনার কাছে মাতৃপুজো​ ক্রমশ গৌন হয়ে যাচ্ছে বিশেষত বাংলার বাইরে। এর সঙ্গে কেউ যদি একের পর এক বর্ণবাদী ধর্ষণ হত্যালীলার একটা অন্তর্নিহিত সম্পর্ক খুঁজে পায়, সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রকৃতি পুরুষ মানুষকে যা সুবিধা দিয়েছে আর মেয়েদের শারীরিকভাবে হীনবল করার সঙ্গে এত রকম প্রাকৃতিক অসুবিধায় আপাদ মস্তক নিগড় পরিয়ে রেখেছে যে পুরোনো আপ্তবাক্য “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা” প্রতিবাদযোগ্য মনে হলেও অস্বীকার করার উপায় থাকে না। এর ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসংযম পুরুষের অভিধানে না থাকলেও চলে যেখানে এই গুণগুলো নারীর সামাজিক, পারিবারিক এমনকি প্রাকৃতিক ভূমিকা পালনেও আবশ্যিক হয়ে পড়ে। ভূমিকায় শরীরবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব ও সমাজ মনস্তত্ত্বের একাধিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ভিত্তিক সিদ্ধান্ত হল পুরু হরমোন টেস্টোস্টেরন ও অ্যান্ড্রোজেন লিবিডোর সাথে সাথে প্রতিযোগীসুলভ ও আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্ম দেয়। টেস্টোস্টেরোন নারী দেহেও কামোত্তেজনা সৃষ্টিতে সহায়ক। তাই অপরাধমূলক কাজে মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের অধিকতর অংশগ্রহণ মার্জনীয় ব্যাপার।

আমাদের দেশে তো বটেই পৃথিবীর সব দেশেই অপরাধমূলক কাজের জন্য ধৃত ব্যক্তির মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ হল পুরুষ। এমনকি যেসব দেশে ধর্মীয় অনুশাসনে নারী যৌন লাঞ্ছনার শিকার হলেও দেশের আইন তাকেই অপরাধী সাব্যস্ত করে, সেখানেও চুরি ডাকাতি খুনের মতো যাবতীয় সাধারণ অপরাধের খতিয়ান দেখলে পুরুষ অপরাধীদের তুলনায় নারী অপরাধীর সংখ্যা নগণ্য। আর মেয়েরা অপরাধ করলেও সাধারণত তার শিকার হিসাবে আর একটি মেয়েকেই বেছে নেয়। বধূ নির্যাতন ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ তথা ভরতবর্ষে অপরাধ জগতের নারী বলতে মূলত নারী পাচারের আড়কাঠি, যারা কাজটা করে পুরুষদের লালসা মেটাতেই। চুরি, জালিয়াতি করলেও নারী ডাকাত দল তেমন শোনা যায় না। ব্যতিক্রমী কিছু দস্যুরানী পুরুষ ডাকাত দলে পুরুষদের খুন ধর্ষণের ঢালাও অনুমতি দেওয়ার বিনিময়েই ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। অবশ্য ড্রাগ পাচার ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মেয়েরা হামেশাই ব্যবহৃত হয়।

প্রসঙ্গক্রমে জানাই আমাদের দেশে থানায় ডায়রি থেকে মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের রাজ্য ভিত্তিক পরিসংখ্যান উপলব্ধ হলেও নারী অপরাধীর অনুপাত কতটা তার তেমন কোনও রেকর্ড ধরে রাখা নেই। যা আছে তা হল বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মহিলার কীর্তি কলাপের বর্ণনা ও তাদের নিয়ে কাহিনী। অন্যদিকে আমেরিকান ও ইওরোপীয় দেশগুলোতে অপরাধের লিঙ্গ ভিত্তিক পরিসংখ্যান যথেষ্ট বিশদে রাখা হয়, যার থেকে অপরাধ জগতে নারীর ভূমিকা কতটা তার একটা ছবি পাওয়া যায়। যেমন ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারে নিক্ষিপ্ত আসামীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা (৫,০৩৭,০০০) মাহিলাদের (৫৮১,০০০) তুলনায় ৯ গুণেরও বেশি ছিল। ২০১৪ সালে অসামাজিক কাজের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের ৭৩% ছিল পুরুষ। এর মধ্যে হিংসাত্মক অপরাধের জন্য ধরা পড়া পুরুষের সংখ্যা ৮০.৪% এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ৬২.৯%।​ United States Department of Justice ​ ১৯৮০ থেকে ২০০৮-এর মধ্যে খুনের একটা পরিসংখ্যান একত্রিত করে দেখা যায় – মোট অপরাধের ৯০.৫% করেছে পুরুষ বা ছেলেরা। খুনের অপরাধে ধৃতদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ সংখ্যাগুরু। শিশু সন্তান হত্যায়​ জাগতিক মায়ের তুলনায় জাগতিক বাবাদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও ৫ বছরের কম বয়সী পরের শিশুকে হত্যা করার পরিসংখ্যানে পুরুষরা অনেক এগিয়ে, ৮০%। মেয়েরা যেখানে গার্হস্থ্য খুনের (৬৮%) ও যৌন নিগ্রহের পর খুন (৮৮%) হয় অনেক বেশি সেখানে ড্রাগ সেবনে মৃতের সংখ্যায় (৯০.৫%) এবং তাই নিয়ে গোষ্ঠী কোন্দলের ফলে বলি হওয়ায় (৯৪.৬%) পুরুষেরা সংখ্যাগুরু । ২০১১-র গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরুষ অপরাধীর সংখ্যা – বল পূর্বক ধর্ষণে (৯৮%) তো বটেই ডাকাতি, অপরাধের শিকারকে মেরে ফেলা, গুণ্ডামি, জখম, মোটরগাড়ি চুরি, সম্পত্তি চুরি নিজের পরিবার ও সন্তানের প্রতি অপরাধ, জালিয়াতি থেকে মামুলি চুরি সবেতেই পুরুষরা অনেক বেশি অগ্রসর।

২০০২ সালে কানাডায় বার্ষিক মোট অপরাধী চিহ্নিত মানুষের মধ্যে পরিণত পুরুষ ৩,২৬,৫৩৬ জন, পরিণত মহিলা ৭১,০৫৮ জন, অপরিণত ছেলে ৭৪,৫১৩ জন এবং অপরিণত মেয়ের সংখ্যা ২৪,৪৮৭ জন। দেখা যাচ্ছে ছেলেরা অপরিণত বয়সেও মেয়েদের তুলনায় এমনকি পরিণত নারীর তুলনাতেও অপরাধে চাম্পিয়ান। ২০১৩-১৪-তে বেআইনি কার্যকলাপে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ৮৫% ও ১৫% ।

মেয়েরা অপরাধ করলেও গুরুতর জখম, খুন ইত্যাদির সংখ্যা কম, বদলে শপ লিফ্টিং, চুরি, জালিয়াতি এই জাতীয় অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে। দলবদ্ধ ডাকাতি, অন্যকে হ্যানস্থা, র্যাগিং বা বুলিং এসবেও মেয়েরা অনেক পিছিয়ে। তাছাড়া এই অপরাধের নথিকরণে তৃতীয় লিঙ্গের সমকামী রূপান্তরকামী পুরুষেরা পুরুষ অপরাধী নয়,নারী অপরাধীর দল ভারি করেছে যা তথ্যের এক প্রকার বিকৃতি।একমাত্র দেহ ব্যবসা ছাড়া আর সব ধরণের অপরাধেই মেয়েরা সব দেশেই অনেক পিছিয়ে। আর দেহ ব্যবসায় অধিকাংশ মেয়ে নাবালিকা অবস্থাতেও বাধ্য হয়ে আসে। বাধ্য মানে অভাবের তাড়না নয়, তাদের হাত পা বেঁধে জোর করে যৌনদাসত্বে নারকীয় জীবন যাপনে বাধ্য করা হয়। যারা স্বেচ্ছায় উপার্জনের রাস্তা হিসাবে দেহ বিনিময় বেছে নেয়, সাধারণত প্রশাসনিক তৎপরতায় তাদেরকেই ধরা হয়। নাইট ক্লাব, পিপ শো এই জাতীয় প্রমোদ ভবন তো রীতিমতো সরকারকে খাজনা দিয়েই যৌন ব্যবসায় মেয়েদের ব্যবহার করে চলেছে।এমনকি পর্নোগ্রাফিক ফিল্ম দুনিয়া যেখানে অনেকে মেয়ে স্বেচ্ছায় এলেও বহু মেয়েকেই জোর করে নেশাগ্রস্ত করে ঘিনঘিনে কাজ করানো হয়,তা এখন মোটামুটি স্বীকৃত ইনডাস্ট্রি।

আর এক ধরণের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের কথা কোথাও বিশেষ আলোচিত হতে দেখিনি, সেটা হল নানা ধরণের নোংরামি। জোর করে নোংরা বা অপবিত্র জিনিসে মুখ দিতে বা খেতে বা পান করতে বাধ্য করা। কাগজে প্রায় দেখা যায়, দিনের পর দিন ঘরে হাত পা বেঁধে বৌকে আটকে রেখে খাদ্য পানীয়ের বদলে রেচনজাত তরল পান করিয়েছে স্বামী। পুলিসি হেফাজতে থার্ড ডিগ্রী কিংবা হোস্টেলের র্যাগিং-এর ঘটনাতেও এমনটা শোনা খুব শোনা যায়। পুরুষালি হিংস্রতার সঙ্গে এই ঘিনঘিনে নিপীড়নের প্রবণতার জন্যও পুরুষদের মধ্যে ধর্ষণসহ যৌনবিকার বেশি দেখা যায়। নিপীড়ক পুরুষটিও মানসিকভাবে অসুস্থ, কিন্তু সেই অসুস্থতার জেরে সে লাভ করছে বিকৃত সুখ আর তার শিকারকে করে তুলছে মানসিক রোগী।

এই সমাজ মনস্তত্ত্ব যেখানে সর্বব্যাপী, সেখানে আমাদের সমাজে আবার মানুষ শুধু শিবির বোঝে। কিছু আছে যারা শুধুই ব্রাহ্মণ্যবাদের ভূত দেখে ও রচনা করে। তাই মণীষা বাল্মিকীর মৃত্যকে তৎক্ষনাৎ উচ্চবর্ণের পুরুষ দ্বারা দলিত কন্যার হত্যা হিসাবে উপস্থাপনা শুরু হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, এই জাতীয় ঘটনায় বর্ণহিন্দু ও নিম্মবর্ণের পুরুষ মিলেমিশে কাজটা করেছে, যেমন ২০১৩ সালে এক দলিত ছাত্রীকে পাঁচ জন যুবক হরিয়ানায় দু-দু’বার গণধর্ষণ করে। প্রথমবার ভিমানিতে কাণ্ডটি ঘটানোর পর জামিনে মুক্ত হয়ে মেয়েটিকে শিক্ষা দিতে সেই একই দল পুনরায় নিষ্ঠুরভাবে গণধর্ষণ করে রাস্তার ধারে ঝোপের আড়ালে ফেলে যায় রোহতকের এমডি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনতি দূরে। ২১ বছর বয়সী ঐ তরুণী তখন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মাস্টার ডিগ্রী করছিল। পাঁচ অভিযুক্ত অনিল ওরফে বিট্টু, রাজু ওরফে জগমোহন, সন্দীপ সিং, মৌসম কুমার ও আকাশের মধ্যে তিনজন তথাকথিত উচ্চবর্ণের, দু’জন দলিত মানে মেয়েটির স্বজাতি। কিন্তু সংবাদ মিডিয়া শিরোনাম হয় উচ্চবর্ণ দ্বারা দলিত মেয়ের ধর্ষণ, দলিত অধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচীও আয়োজিত হয়। এই শিবির মাঝে কিছুদিন লাগাতার উচ্চবর্ণ থেকে দলিত হিন্দু মেয়ে ধর্ষণ খুন হয়ে গেলেও রাজনীতি করার মতো পছন্দসই লাশটি খুঁজে পাচ্ছিল না। এখন একটা পাওয়ামাত্র নীরবতা ভেঙে সোল্লাসে কিলবিলিয়ে উঠেছে।

তাই প্রশ্ন আপনি কি সত্যিই কষ্ট পেয়েছেন? নাকি একটি দলিত মেয়ের রক্তাক্ত দেহ আর তার ঘাতকদের নাম লবকুশ রামকুমার রবি সন্দীপ দেখে "এই লাশটা আমার" বলে পাশার ঘুঁটির মতো তুলে নিচ্ছেন? কারণ লক্ষ লক্ষ ঘটনা থেকে যখন বেছে বেছে কাঠুয়ার সাজানো ঘটনাটিরই তুলনা টেনে আনা হয়, তখন আপনাদের শকুনের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে হলে আমি নিরুপায়। যা হয়েছে, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, কঠোরতম শাস্তি চাই। আইন যেহেতু ফাঁসির বেশি কঠোরতা দেখাতে পারে না, একই এদের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করার দায়িত্বটা জনতাও নিতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ যারা লাফাচ্ছেন, তাদের একটা বড় সুশীল অংশ এই লকডাউনেই ঘটে যাওয়া একের পর এক প্রমীলা বর্মণদের একইরকম নৃশংস হত্যায় কিন্তু নীরবতা পালন করেছিলেন। আমি তাই আপনাদের কপচানো উচ্চবর্ণ-দলিত সমীকরণ মার্কা মানবতার বুলিতে বিশ্বাস করছি না।

আর এর বিপ্রতীপে অন্য পক্ষ শুধু জেহাদ আটকাতে কতটা মরিয়া জানি না, তবে জেহাদ দমনের নামে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদেরকেই বেঁধে ফেলা মেরে ফেলার পক্ষপাতী। এদের একটা অংশ এখন জাতপাত দূরীকরণের মহান ব্রতে নেমেছে ঠিকই, তবে অন্য সম্প্রদায়ে মেয়ে চলে যাওয়া আসলে সন্তান উৎপাদনের জমি হারানোর বেদনা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এরাও তথাকথিত দেশদ্রোহী হিন্দুবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলো কোনওরকম রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে, এমন খারাপ ঘটনাগুলো নিয়ে আওয়াজ তুলতে আগ্রহী নয়। বরং সেই প্রসঙ্গে বিরোধীদের কোনও যুক্তিপূর্ণ মন্তব্যকে সমর্থন জানালেও অযোধ্যার ভূমি পুজোয় বলি দিতে উদ্যত হবে।

তাদেরই কেউ কেউ সাফাই দিচ্ছে, ধর্ষণের প্রমাণই নাকি নেই। মেয়েটা নাকি সেই মর্মে জবানবন্দীও দিয়েছে। জিভ পুরো কেটে ফেললে তো সেটা সম্ভব হত না। গলায় ফাঁস লেগেই কামড়ে কেটে গেছে যা মিডিয়ার প্রচারে অন্য মাত্রা পেয়েছে। তাই তো, গলা টেপার জেরে নিজের জিভ কামড়ে কেটে ফেললে খুনীর কী দোষ? কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন, মেয়েদের লিঙ্গ সংযোজিত অত্যাচার এত বেশি এত ব্যাপক এত কদর্য ও নিষ্ঠুর উপায়ে করা হয়, যে ব্যক্তি, মিডিয়া, রাজনীতি সবাই এমন একেকটি ঘটনা নির্মাণের সুযোগ পায়। যদি না ঘটত, বিতর্কের অবকাশই থাকত না। অবশ্য বলতেই পারেন, পশ্চিমবঙ্গে যে ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়া হয় সম্প্রীতির স্বার্থে,​ উত্তরপ্রদেশে সেখানে গ্রেপ্তার তো করা হয়েছে। এইটুকুই যা সান্ত্বনা। কিন্তু মৃত্যু ঘোষিত হওয়া মাত্র যখন উপযুক্ত তদন্ত ছাড়া ধর্ষণের প্রমাণ নেই রিপোর্ট বানিয়ে ঝটিতি শব দাহ করে ফেলা হয় পরিবারের মতামত না নিয়ে, তখন সন্দেহ ঘনাবেই। এই লাশটা আমার বিপক্ষের সুবিধা করে দেবে বলে এত বড় অন্যায়টা লঘু করে দেখাব,​ এতটা রাজনৈতিক কোনও কালেই ছিলাম না,​ অনেক ধাক্কা খাওয়ার পরেও হতে পারিনি। সুতরাং আপনারা, যারা বলছেন ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি, তাদেরকেও ভালো করে চিনে রাখছি।

আর যারা নির্ভয়া (জ্যোতি) থেকে শিপ্রা প্রমীলা হয়ে আজকে মণীষার ঘটনায় একইভাবে উত্তেজিত হয়ে শাস্তি নয় বদলার আওয়াজ তুলছে, তাদের দাবি বেআইনি হলেও ন্যায়সঙ্গত। যদি মব লিঞ্চিংএর উস্কানি হয়ে থাকে তাহলেও মানবিক। তাদের সঙ্গে সংখ্যাটা হাতে গোনা হলেও আমি সেই বিরল মানুষগুলোর মিছিলেই একক পদযাত্রী। এদের ভরসাতেই জাত ধর্ম বর্ণের ওপরে উঠে লিঙ্গ অপরাধ দমন করার দিবাস্বপ্ন অন্তত দেখা যায়।

কিন্তু সবমিলিয়ে এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ চিন্তা ভাবনা নিশ্বাস প্রশ্বাসের উপায় থাকছে না। এত এত নারকীয় নৃশংসতার ধারাবাহিকতা দেখার পরেও দুটো ভুয়ো ৪৯৮-এ কেস, শ্বশুরবাড়িতে পৃথক হেঁসেল বা প্রেমিকের মনে দুঃখ দিয়ে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে করার মতো ঘটনা দেখিয়ে হাঁকডাক পড়ে যায়, মেয়েরাও কম নিষ্ঠুর নয়, মানে দশজনে মিলে মেরধরে ধর্ষণ করার পর শরীরে ধাতব রড প্রবেশ করিয়ে নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলা, কুলিয়ে জ্যান্ত পোড়ানো, দুই পা জরাসনম্ধের মতো করে চিরে দেওয়া, হাত পা পাঁজর ভেঙে জিভ কেটে দেওয়ার সমতুল্য নিষ্ঠুর!!! বহু পুরুষমানুষই ভারতে অত্যাচারিত বোধ করে কারণ, সংখ্যালঘুরা যতখানি নারী সম্ভোগ ও পীড়নের সুযোগ পায় তারা ততটা পাচ্ছে না, মেয়েরা নালিশ করে শাস্তির ব্যবস্থা করছে বলেও।

এই মনোভাব সংক্রমিত হয়েছে উত্তরপূর্বে মাতৃপ্রধান সমাজেও। সেখানকার পুরুষরা ব্লুফিল্ম দেখে, আর বৃহত্তর ভারতীয় পুরুষতন্ত্রে ধর্ষণ খুন মহাযজ্ঞ দেখে রীতিমতো হতাশাগ্রস্ত, যে তারা সে’সব কিছুই করার সুযোগ না পেয়ে স্ত্রীর বাড়িতে ভদ্রলোকের মতো খেটেখুটে খেয়েদেয়ে সংসার করতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও সামাজিক যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেয়, একাধিক নারী সংসর্গের ছাড়পত্রও পায়, তবু পুরুষাধিকার বলতে ভারতীয় পিতৃতন্ত্রের যে ছবিটা তারা দেখতে পাচ্ছে, তা ভোগ করতে না পারা নিয়ে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে। ঐসব অঞ্চলে নেশা করার চল তো ছিলই বরাবর। এখন এই অত্যাচার করতে না পারার ক্ষোভ ও হতাশা থেকেও তাদের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে কুঁড়েমি আরও বেড়ে গেছে, আর মেয়েদের ওপর বাড়ছে ঘরে বাইরে অত্যধিক দায়িত্ব ও পরিশ্রম করার চাপ।

তবে উত্তরপূর্বে জনজাতিগুলির পুরুষরা নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরুষালী যথেচ্ছাচারের তেমন সুযোগ না পেলেও ওইসব অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া পূর্ব বাংলা থেকে বিতাড়িত হিন্দু বাঙালী মেয়েদের ওপরে কিন্তু অবদমিত পুরুষত্ব উসুল করে নেয় সুযোগ পেলেই। ১৯৮০ সালে ত্রিপুরার ‘মাণ্ডাই ম্যাসাকার’-এর ইতিহাস যারা জানেন, তারা জানেন জনজাতির পুরুষরা যেভাবে একের পর এক হিন্দু বাঙালী রমনীর গোপনাঙ্গে ধারালো অস্ত্র প্রবেশ করিয়ে, গর্ভবতীদের পেট চিরে যে নৃশংস বীরত্ব দেখিয়েছিল, তা ১৯৭১-এ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে খান সেনাদের টক্কর দেয়। এখনও মেঘালয়ে বাঙালীদের অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে বলে হুমকি দেওয়াই আছে। রিয়া, কঙ্গনা, সুশান্ত, জয়া, উর্মিলা ইত্যাদি তারকায় আচ্ছাদিত মিডিয়া দিশা জানিয়ানের নিষ্ঠুর ধর্ষণ হত্যাকাণ্ড নিয়েই ভাবিত নয়, তো হতভাগা রিফিউজি বাঙালীর খবর আর কত রাখা যায়? কারণ জাতীয় নাগরিক পঞ্জী ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে এখন আর উচ্চবাচ্যই চলছে না। ​ ​

সাম্প্রায়িকতা ও পুরুষতান্ত্রিকতার এই জটিল আবর্তে শুধু একটা ব্যাপার সিদ্ধ: নারী জন্মের মতো এর বড় অপরাধ আর নেই। নারীর দেহের মতো এত ঘৃণ্য ও আক্রোশের বস্তুও আর নেই। তাই পুরুষদের পরামর্শ নিজেদের জন্মের জন্য তারা ডিম্বাণু ও গর্ভের বিকল্প খুঁজে নিক। যতদিন না এই একচেটিয়া লিঙ্গহিংসা বন্ধ হয়, ততদিন পৃথিবী বন্ধ্যাই হয়ে থাক।

প্রসঙ্গত পুরুষতান্ত্রিক জগৎকে Androgenic world বলা হয়। সুতরাং নামকরণেই অপরাধের লাইসেন্স আদায় করা আছে!

Image may contain: 1 person, text that says "মনীষার ধর্ষণকারী চার নর পশু সন্দীপ লবকুশ রামকুমার রবি HATHRAS GANGRAPE VICTIM DIES! ...WAS GANGRAPED ASSAUL TED TONGUE CUT HATHRAS, U.P. RMENGANEH SARAEPIKA JUSTICE! FOR MORE CARTOONS WWW.CARTOONISTSATISH.COM"​


তথ্যসূত্র:

1.​ ​ ​ ​Hathras gang-rape and murder: Victim's body taken to Uttar Pradesh​ from Delhi hospital

http://timesofindia.indiatimes.com/articleshow/78391187.cms?utm_source=contentofinterest&utm_medium=text&utm_campaign=cppst

2.​ ​ ​ ​​ Hatras rape case: Medical examination did not confirm rape.

https://m.timesofindia.com/videos/city/lucknow/hathras-rape-case-medical-examination-did-not-confirm-rape-says-aligarh-ig/amp_videoshow/78390357.cms

3.​ ​ ​ ​ https://en.wikipedia.org/wiki/Sex_difference_in_crime

4.​ ​ ​ ​Rowe, David; Vazsonyi, Alexander; Flannery, Daniel (1995).​ "Sex Differences in Crime: Do Means and Within-Sex Variation Have Similar Causes?"​ (PDF).​ Journal of Research in Crime and Delinquency​ 32: 84–100.

5.​ ​ ​ ​"Prevalence of Imprisonment in the U.S. Population". U.S. Department of Justice. August 2003. Archived from​ the original​ on 2009-09-01.

6.​ ​ ​ ​Federal Bureau of Investigation.​ "Ten-Year Arrest Trends, by Sex, 2003-2012".

7.​ ​ ​ ​Durose, Matthew R (2005).​ "Family Violence Statistics Including Statistics on Strangers and Acquaintances"​ (PDF).​ Bureau of Justice Statistics. US Department of Justice.

8.​ ​ ​ ​Truman, Jennifer L (2014).​ "Nonfatal Domestic Violence, 2003–2012"​ (PDF).​ Bureau of Justice Statistics. US Department of Justice.

9.​ ​ ​ ​Canada, Government of Canada, Statistics.​ "CANSIM - 109-5009 - Adults and youths charged, by sex and offence category, Canada, provinces and territories".www5.statcan.gc.ca. Retrieved​ 2016-02-11.

10.​ ​Canada, Government of Canada, Statistics.​ "Adult correctional statistics in Canada, 2013/2014".​ www.statcan.gc.ca. Retrieved​ 2015-12-15.

11.​ ​UNDOC Homicide Statistics 2013​ used tables:​ Homicide counts and rates​ &Percentage of male and female homicide victims​ Retrieved May-31-2014


■ লেখক পরিচিতি


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.