x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

সুস্মিতা আচার্য

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ |

সুস্মিতা আচার্য

মা যতক্ষণ মামাবাড়িতে থাকত বুনো ফুলের  হাসির মত আলো  ছেয়ে থাকত মায়ের মুখটিতে ।  তখন  বাস থেকে নেমে অনেকটা  পথ হেঁটে আসতে হত মামাবাড়ি ।  আলপথ ছেড়ে দুপুরের নিদ্রামগ্ন পাড়া পেরিয়ে আর এক মাঠের রাস্তা ধরতাম  । শিরশিরে হাওয়ায় ধান গাছ গুলো নুয়ে নুয়ে পড়ছে । দুএকটা বড় গাছের পাতাগুলো শিম শিম বাতাসে কাঁপছে । খাঁ খাঁ দুপুর ।  রোদের তাপে মুখ লাল আমাদের । কাঁচা রাস্তার পাশে  দীঘির  শান্ত জলে মেঘের ছায়া । এই রাস্তা দিয়ে গেলেই পাকা  সুপুরির মত হলুদ রঙ ধরত আমার মনে ।  

মামাবাড়ির বাগানটা ছিল এক মুক্ত দুনিয়া ।ফুলকপি,পালংশাক ,বেগুন ,আলুর চাষ হত এক দিকে । অনাথমামা তাদের যতন করত খুব  । বাগানের অন্য দিক  খোলা । চরাচরের সাথে নিজের সীমানা বিছিয়ে দিয়েছিল । এদিকটা আমার বেশি ভাল লাগত । অনাদরে বেড়ে ওঠা  বেশ কিছু গাছ । আগাছা । ছোট একটা জলার মত পুকুর ,যার বেশির ভাগ পানাতে ঢাকা, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শুয়ে থাকত আকাশের নিচে  । অনেক গাছের ভিড়ে সেই কলকে ফুলের গাছটা ছিল । কাজল মাইমা বলেছিল , “কলকে ফলে বিষ  থাকে । খেলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু ।”

বিষ কেন খায় লোকে ?  

পেখম বলেছিল, “দুঃখে !” 

পেখম ছিল আমার উড়ু উড়ু বন্ধু । লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা ওর কটা চুল । চোখও কটা ।  চুল আর চোখের অমন রঙের জন্য সাধারণের থেকে আলাদা লাগত ওকে । যেন অনেক দূরের । ডোবার পারে ব্যাঁকা তালগাছে বসে কাঁচা কুল খেতে খেতে পেখমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম , “দুঃখ  আছে তোর ?”

পেখমের গলার নিচে  কালশিটে । সৎ মায়ের মারের দাগ। তবু পেখম ঠোঁট উল্টে বলেছিল , “দূর ,দুঃখ কোথায় ?” 

আমি বললাম , “তোর সৎ মা যে মারে তোকে ! সেটা বুঝি দুঃখ নয় !”

পেখম বলল , “কিন্তু মরে যাবার মত দুঃখ  তো নয় !” 

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম , “সেটা ঠিক ,সৎ মায়ের মারের জন্য মরবিই বা কেন !”

ইঁটের পাঁচিল থেকে লাফিয়ে নামি দুজনে ।  

---“চল খুঁজি ভাল দুঃখ ।”

পাঁচিলের গোঁড়াতে সাদা ঝুমঝুমি ফুলের ভেতরটা ম্যাজেন্টা ---“সেটা কি ফুলের দুঃখ ?”

একটা লাউ গোল না হয়ে কেমন ঢোলের মত লম্বাটে । অনাথমামার বাগানে বেগুন ,ঝিঙে, আলুও কেমন তেবড়ে রয়েছে দুঃখে । চুক চুক করতে করতে মুখ ব্যাথা হয়ে গেল আমাদের । সারা বাগানের দুঃখ দেখে সবে দুটো পেয়ারা নিয়ে বসেছি দেখলাম পুকুর ঘাটের বউদের মত গাছেরা হাওয়াতে দুলে দুলে পড়ছে এ ওর গায়ে । পেখম  হেসে বলল, “এদের দুঃখ নেই রে ! এরা বেশ সুখেই আছে ।”

সন্ধ্যে হয়ে আসছিল । আমি বললাম , “কাল দুঃখ খুঁজে আনবো রে পেখম । তুইও খুঁজিস । ভাল দুঃখ পেলেই খাব কলকে ফল ।”    

কলকে  ফলের গায়ে হাত বুলিয়ে ঘরে ফিরলাম দুজনে । পরেরদিন সকাল থেকে  ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি  । একটা মাত্র জানলা মামাবাড়ির দোতালার কোঠা ঘরে । নিচে নামতে গেলেই শুনতে  হচ্ছে, “সর্দি লাগিয়েছিস তো দেখাব মজা!”  

অগত্যা সারাদিন সেই এক রত্তি জানালার সামনে বসে  কাটানো । পুতুলগুলোও নেই যে  খেলব । জানলা দিয়ে সারাদিন দেখছি ।  বৃষ্টিতে ভিজছে  উঠোনে মেলা চন্দনামাসির  সবুজ শাড়ি । দুটো কাক চুপচুপে ভিজে গা ঝাড়ছে নিম গাছের ডালে । বাগানের সব গাছ বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে । একটু  দূরে ক্ষেতে জল জমেছে । সাদা বৃষ্টি গেরুয়া রঙের  জল হয়ে যাচ্ছে ক্ষেতে পড়েই । অনাথমামা ভিজে ভিজে গরুগুলো কে গোয়ালে ঢোকাচ্ছে । মা আর ফুলিমাসি বৃষ্টির ছাটে ভিজে রান্নাঘর থেকে দালানে  আঁচল ঢাকা দিয়ে কাঁসার থালায় ঠাকুরের ভোগ নিয়ে আসছে ।  ভোরে থেমে গেছে বৃষ্টি ।  ঘুমন্ত মাসিকে ডিঙিয়ে বাইরে আসি । পেখম ছিল বাগানেই । পেখমের ঘরে কোন দোতালা নেই । কোঠা ঘর নেই । পেখম শুধু উঠোনে বৃষ্টি দেখেছে । মারও খেয়েছে । চোখের নিচ ফুলে নীল হয়ে আছে । তবু কলকে ফল হাতে নিয়ে পেখম বলল , “তোর কোঠা ঘরের উপর থেকে বৃষ্টির গল্প শুনে মনে আর দুঃখ নাই রে সাগর  । তাছাড়া বাপ কাল বিকেলে এক  জোড়া গোলাপি হাওয়াই চটি এনে দিয়েছে !” 

গোলাপি হাওয়াই চটির আনন্দ চেপে রাখতে পারছে না  পেখম । ফিকফিকে হাসি তার রোগা মুখে । আমি রাগে অন্য দিকে মুখ ফেরালাম । পেখম হাত চেপে বলল , “তুই রাগ করিস না । পরের বার ঠিক দুঃখ পেয়ে যাব ।”

 পরের বার যখন মামা বাড়ি গেলাম পেখমের চেহারা দেখে  আমি অবাক  । তার  রুক্ষ কিশোরী চুলের সিঁথিতে এক মাথা মেটে সিঁদুর !  

--- “তোর বিয়ে হয়ে গেছে পেখম ?”

ঝলমল করে হেসে উঠল পেখম , “হ্যাঁ । নতুন শাড়ি পেয়েছি আমি । ”

আমি ম্লান হেসে বললাম , “তবে তো ভাল ,তোকে আর ইস্কুল যেতে হয় না ।”

 পেখম বলল , “না ,আমি আর ইস্কুল যাই না ।” 

আমি ফিসফিসে গলায় জিজ্ঞাসা করলাম , “বর তোকে ভালবাসে পেখম ?”

পেখম ঘাড় বেঁকিয়ে বলল , “না । মারে ।”

আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম , “মারে ! তোর বর তোকে মারে পেখম ?”

--- “হু – ” 

---“কেন রে ?কেন মারে তোকে ?” 

--- “সন্দেহ করে । ” 

--- “ছি ছি । কি বাজে লোক ।”   

--- “খুব খারাপ লোক । অনেক বড় আমার থেকে ।”

---“আয় পেখম আয় ,কলকে গাছের ফল খাবি আয় ।”

দুজনে মিলে আলপথ দিয়ে ছুটতে থাকি  । লাল ধুলো ওড়ে । পেখমের ডুরে শাড়ির আঁচল ওড়ে । পাশের ধান ক্ষেতের সরু সবুজ পাতা ঝাঁপটা মারে আমাদের মুখে চোখে । কলকে ফল খাবার জন্য  যেন তর সইছে না । কিন্তু  বাগানের পাঁচিলের তলায় এসে দেখি কে যেন কেটে দিয়েছে  কলকে ফুলের গাছটা । পেখম হাসল । 

---“আমি মরলে সে বড় কাঁদবে রে সাগর ।”

---“সে কে ?” 

---“যার সাথে বর সন্ধ করে সে । দীনবন্ধু দাদা । ভৈরবের থানে খঞ্জানি বাজিয়ে গান গায় । একটা পা খোঁড়া । ছোট বেলায় পোলিও হয়েছিল কি না  ।” 

---“তুই কি তার কাছে রোজ যাস ?”

---“রোজ কোথায় ! মাসে  দুদিন যাই । যেদিন বৃষ্টি পড়ে, আর যেদিন বৃষ্টি পড়ে না ।” পেখমের মুখে দুষ্টুমির হাসি । 

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসতে হাসতে শুয়ে পড়লাম । পেখমও শুয়ে পড়েছে আমার পাশে । চোখের সামনে নীল আকাশ । সাদা ফিনফিনে মেঘ ভাসছে তার উপর । দুএকটা চিল  উড়ছে অনেক উপরে । এক ঝাঁক লক্কা পায়রা উড়ে গেল রূপের গুমোর ছেটাতে ছেটাতে । আমরা দুজন শুয়ে আছি মাঠের শেষ প্রান্তে । পিঠের নিচে শুকনো খড় ,নরম ঘাস । 

পেখম ডাকল ,“সাগর ?”

---“বল !”

পেখম বলল, “চল বাড়ি যাই । আরও কিছুদিন দুঃখে থাকি । দেখি যদি পুষতে পারি ।” 

 ---“তোর রকম সকম আমার  ভাল লাগছে না পেখম ।”

---“কেন রে সাগর ,তুই কি রাগ করলি ?”

আমি উঠে বসলাম । পাশে পড়ে আছে  মেলা থেকে কেনা আমাদের  মাটির  খেলনা বাটি । পেখমের আর ওসবে মন নেই । পেখম উঠে বসে হাঁটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বলে ,“চোখ বন্ধ করলেই দীনবন্ধু দাদার মুখ ! কি সুখ !” 

---“কেন সে মুখে এমন কি আছে ?” আমি ঝাঁজিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম । পেখম উত্তর না দিয়ে আগাছার মাঝে  ফুটা চন্দ্রমল্লিকা ফুলের দিকে তাকিয়ে রইল ।  

#

পরের বার মামাবাড়ি গিয়ে পেখমকে আর পেলাম না । দীনবন্ধুদাদাকে নিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে সে । সারা গ্রামে সে নিয়ে চর্চা চলছে । সব থেকে রেগে গেছে পেখমের সৎমা । দুলালমামা নাকি দেখেছে পেখম আর দীনুমামাকে । হেতমপুরে রক্ষাকালী মন্দিরের পাশেই  ওদের ছোট্ট টালির ঘর ।  দুলালমামা মাকে  বলেছিল পেখম খুব ভাল আছে । পেখম হারিয়ে যাবার পর খুব অভিমান হয়েছিল  । কথা ছিল এক সাথে কলকে  ফল খাব । অথচ পেখম একটাও দুঃখ পুষতে শিখল না । “সারা জীবন পাখা মেলে উড়ে উড়ে বেড়ালি  পেখম ! সব সময় তোর খিলখিলিয়ে হাসি বন্ধ কর  । এত রকমের দুঃখ আছে জগতে ,তুই একটাও আপন করতে পারলি না । অথচ আমি দ্যাখ, কত দুঃখ পুষতে শিখেছি ।” 

 প্রাচীন ইঁটের ভাঙা  শিবমন্দিরে বসে আমি একা একা মনে মনে ঝগড়া করি পেখমের সাথে । 


 

1 টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.