x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

◆ শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় / বিদ্যাসাগর: দ্বিশতবর্ষের আলোকে

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | | মিছিলে স্বাগত
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় /  বিদ্যাসাগর: দ্বিশতবর্ষের আলোকে

২০২০-র ২৬শে সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর মশাইয়ের দ্বিশত জন্মবর্ষ পুর্তি। তাঁর জন্মানোর দিনটা ধরলে ২০১-তম জন্মদিন। সর্বভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতির মানচিত্রে এই মণীষীর নামটাই অণুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়, স্মরণ করা তো দূর। প্রতি বছর ১২ই আশ্বিন বা ২৬ শে সেপ্টেম্বর আসে যায়, কিন্তু তাঁর জন্মদিন পালনটা আমাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আবশ্যিক অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে না, এমনকি শিক্ষা প্রতষ্ঠানগুলোতেও নয়। এই বছর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী সমাজ কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। সেটাও অনেকাংশে রাজনৈতিক তাগিদে। এই বছরই দাবি উঠেছে ৫ই সেপ্টেম্বর জনৈক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির জন্মদিনটিকে ভারতের ‘শিক্ষক দিবস’ হিসাবে পালন করার পরিবর্তে প্রকৃতই যিনি এই পোড়া দেশে শিক্ষা ও জ্ঞানের নবজারগরণ ঘটিয়েছিলেন কিন্তু জাতীয় স্তরে ততটা আলোচিত নন, সেই বিদ্যাসাগরের জন্মতিথিটিকেই ‘শিক্ষক দিবস’ রূপে পালন করা হোক।​

ভারতে ‘শিক্ষক দিবস’ পালিত হয় ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনে ১৯৬২ সাল থেকে যে বছর তিনি ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হন। রাধাকৃষ্ণনের কিছু ছাত্র তাঁর রাষ্ট্রপতি স্থালাভিষেকের পর তাঁর জন্মদিনটি উদযাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি মহত্ব দেখিয়ে বলেন, "Instead of celebrating my birthday, it would be my proud privilege if September 5th is observed as Teachers' Day." ‘শিক্ষক দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করিয়ে নিজেই নিজের জন্মদিনটিকে তদবধি অমর করে দেন রাধাকৃষ্ণন; যেখানে পরম্পরাগতভাবে আমাদের দেশে গুরুপ্রণামের জন্য নির্ধারিত ছিল ‘গুরুপূর্ণিমা’র দিন যার উদযাপন হয়ে থাকে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন সব ভারতীয় শাখাতেই। সেই দিনটি এখন ক্যালেন্ডারের পাতা ছাড়া বিস্মৃতির আড়ালে। যাইহোক, ভারতের আধুনিক শিক্ষক দিবসের রূপকার বা পুরোধা ব্যক্তি রাধাকৃষ্ণনের বিরুদ্ধে তাঁর 'ইন্ডিয়ান ফিলোজফি' গ্রন্থটি রচনায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ এনেছিলেন তাঁরই ছাত্র যদুনাথ সিংহ ১৯২৮ সালে। গবেষক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় "এমনি বহে ধারা একটি কলঙ্কিত পরম্পরা" শীর্ষক গবেষণাপত্রে সে বিষয়ে আলোকপাত করে সবাইকে অবগত করেছেন। সম্ভবত বছর খানেক হল এটি সামাজিক মাধ্যমে ঘোরাফেরা করে নেপথ্যকাহিনী জানান দিচ্ছে। যদিও এই দাবির যথার্থতা মিলিয়ে দেখা হয়নি, তবু এই রচনা থেকে জানতে পারছি: আদালতে যদুনাথের অভিযোগ যখন প্রমাণ হওয়ার পথে তখন যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ দ্বারা তাঁকে মামলায় পরাস্ত না করা যাবে না বুুুুঝতে পেরে ন্যায়ালয়ের বাইরে রফার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেই চাপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রাধাকৃষ্ণন ঘনিষ্ঠ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও, যিনি পশ্চিমবঙ্গের জনক হিসাবে পূজিত। সম্ভবত এটাই রাধাকৃষ্ণনের কলঙ্ক নিয়ে সক্রিয়তার নেপথ্য অনুপ্রেরণা। যেহেতু যাচাই করে দেখিনি, তাই এই অভিযোগ সমর্থন বা অস্বীকার কোনওটাই করছি না। বস্তুত কোনও মানুষই সম্পূর্ণ প্রশ্নাতীত হতে পারে না, আর একটি ভুলের জন্য কারও অনেকগুলো ঠিক ভুল প্রতিপন্নও হয়ে যায় না। সেই কাহিনীতে না গিয়েও কিন্তু আধুনিক ভারতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ হিসাবে একজন সিংহপ্রতাপ কিন্তু কুসুমহৃদয় বঙ্গসন্তানকে স্মরণ করাই যায়।​ ​

মানুষটা সারা জীবনটা কঠোর শ্রমে অর্থ নিষ্ঠা ব্যক্তিগত সময় সর্বস্ব ব্যয় করে গেছেন ভারতীয় সমাজটাকে শিক্ষিত ও সভ্য করে তুলতে। সাহিত্য রচনার চেয়ে পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন তাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর কাছে। অবশ্য শিক্ষা বিভাগের উচ্চপদে আসীন থাকার সুবাদে রায়্যালটি মিলিয়ে যা আয় করতেন তাতে ভদ্রলোককে যথেষ্ট ধনীই বলা যেত। কিন্তু সেই ধন তিনি নিজের বা নিজের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যয় করেছেন, এমন কথা মহা নিন্দুকেও বলতে পারবে না। বিশ্বাস, কথা ও কাজের এমন আপোশহীন সমন্বয় সাধন করতে অনেক মণীষীই পারেননি। স্বয়ং রামমোহন রায় যিনি কোটি কোটি হিন্দু মেয়ের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার প্রথা রদ করিয়েছিলেন ইংরেজ শাসন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে, অনেক গবেষকের মতে নিজের পত্নীর প্রতি নাকি তেমন প্রীতি প্রদর্শন করতে পারেননি। আসলে মেয়েরা সচরাচর নিজেরাই নিজেদের মুক্তি ও ভালো থাকার বিরোধী হয় বলে ধৈর্যচ্যুতি স্বাভাবিক। তাছাড়া পণ্ডিত, প্রগতিশীল এবং উপনিষধের বাণীকে ধর্মাচারণের পাথেয় করা এই মানুষটি নিজে কিছু পুরুষালি রজো গুণের অধিকারীও ছিলেন। বহির্ভারতে তাকালে দেখা যায় পৃথিবীর বহু বিখ্যাত পুরুষই ব্যক্তিগত জীবনে রীতিমতো ব্যভিচারী। কিন্তু বিদ্যাসগরের নিজের চরিত্রটি শুধু নিষ্কলুষই ছিল না, ছিল রীতিমতো সংযমী।​

সেকালে বর্ণহিন্দু বিধবাদের জন্য শুদ্ধাচারের কড়কড়ি থাকলেও অল্পবয়সী বিধবারা প্রায়ই পুরুষদের লালসার শিকার হয়ে কেউ গোপনে গর্ভপাত করাতে বাধ্য হত, তা করতে গিয়ে মারাও যেত, এমনকি কেউ কেউ পাচার হয়ে যেত পতিতাপল্লীতে। বয়স্ক বিধবার স্থান যেখানে কাশী বিশ্বনাথের চরণ, সেখানে অল্পবয়সী ব্রাহ্মণ বাড়ির বিধবার ঠাঁই হয়তো হত কোনও চোরাগলিতে। এই কথা শোনামাত্র রেরে করে হিন্দুত্ববাদ জাহির করার কিছু নেই। সবার ক্ষেত্রে অবশ্যই ঘটত না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ঘটলেও তা অবশ্যই প্রতিহত করার যোগ্য সমস্যা ছিল। কয়েকজন বিখ্যাত মণীষীর বিধবা জননীর অস্তিত্ব দ্বারা সতীদাহ বা বিধবা নারীর সম্ভ্রমহানির তথ্য অস্বীকার করা যায় না। এই অনাচারের বিরুদ্ধেও বাংলায় লড়েছিলেন বিদ্যাসাগর আর মহারষ্ট্রে লড়েছিলেন ফুলে দম্পতি -- জোতিবা ফুলে ও সাবিত্রী ফুলে। অন্ধ স্বার্থপর কুচক্রী সমাজপতিদের বিরুদ্ধে গিয়ে কী যে কঠিন ছিল সেই লড়াই, আজকের কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়াতেও খানিক আঁচ পাওয়া যায়।​

হিন্দু সমাজের তোষামদী ও ভণ্ডামিকে কটাক্ষ করে লেখেন *ব্রজবিলাস* নামের একটি নাটক, যেখান থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না। ব্রজবিলাসের পঞ্চম উল্লাসে আছে, “এক বড় মানুষের কতগুলি উমেদার ছিলেন। আহার প্রস্তুত হইলে, পার্শ্ববর্তী গৃহে গিয়া, আহার করিতে বসিলেন; উমেদারেরাও, সঙ্গে সঙ্গে তথায় গিয়া, বাবুর আহার দেখিতে লাগিলেন। নতুন পটোল উঠিয়াছে; পটোল দিয়ে মাছের ঝোল করিয়াছে। বাবু দুই চারিখান পটল খাইয়া বলিলেন, পটল অতি জঘন্য তরকারি; ঝোলে দিয়া ঝোল টাই খারাপ করিয়াছে; ইহা শুনিয়া উমেদারেরা বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন, কি অন্যায়। আপনকার ঝোলে পটোল! পটোল তো ভদ্রলোকের খাদ্য নয়; কিন্তু ঝোলে যতগুলি পটল ছিল, বাবু ক্রমে ক্রমে সকল গুলিই খাইলেন, এবং বলিলেন দেখ, পটোলটা তরকারি বড় মন্দ নয়। তখন উমেদারেরা কহিলেন, পটোল তরকারির রাজা; পোড়ান, ভাজূন, সুক্তাই দেন, ডালনায় দেন, চড়চড়িতে দেন, ঝোলে দেন, ছোকায় দেন, দম করুন, কালিয়া করুন, সকলেই উপাদেয় হয়; বলিতে কি এমন উৎকৃষ্ট তরকারি আর নাই। বাবু কহিলেন, তোমরা তো বেশ লোক; যেই আমি বলিলাম, পটোল ভালো তরকারি নয়, অমনি তোমরা পটোল কে নরকে দিলে; যেই আমি বলিলাম পটোল বড় মন্দ তরকারি নয়, অমনি তোমরা পটোলকে স্বর্গে তুলিলে। উমেদারেরা কহিলেন, মহাশয়, আপনি অন্যায় আজ্ঞা করিতেছেন; আমরা ঝোলেরও উমেদার নয়, পটোলেরও উমেদার নয়; উমেদার আপনার; আপনি যাহাতে খুশী থাকেন, তাহাই আমাদের সর্ব প্রযত্নে কর্তব্য। এই উত্তর শুনিয়া, বাবু নিরুত্তর হইলেন।” অনুরূপ গল্প অবশ্য আমরা পরে মোল্লা নারিরুদ্দিনের রসবোধ ও চাতুর্যের পরিচয় হিসাবে পড়েছি। কিন্তু সমাজের প্রকৃত শিক্ষক অনেক আগেই উমেদারির স্বরূপটা বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। আর নিজে তাই ছিলেন ভণ্ডামিরোহিত এক স্বচ্ছ চরিত্র।

বিধবা বিবাহ হোক বা স্ত্রীশিক্ষার প্রসার কোনওটাই তাঁর লোক দেখানো প্রগতিশীলতা ছিল না। নিজের স্ত্রীকেও শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছিলেন, যা মা ভগবতীদেবীর বাধায় সম্পূর্ণ হয়নি। বিধবা বিবাহ অনাচার নয়, শাস্ত্রসম্মত এই বিশ্বাস যে কতখানি খাঁটি তা তাঁর পুত্রের সঙ্গে বিধবা কন্যার বিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন। নারায়ণ চন্দ্র বিধবা ষোড়ষী ভবসুন্দরীর প্রতি আকৃষ্ট হলেও ভবগবতী দেবী থেকে নিজের স্ত্রী জ্ঞাতি –প্রায় সকলের অমত ছিল। তা সত্ত্বেও সবার বিরুদ্ধে গিয়ে কলকাতায় পাত্র পাত্রীকে নিয়ে এসে বিয়ে দেন। বাড়ির কেউ বধূবরণে সম্মত না হওয়ায় বন্ধু তারানাথ তর্কবাচস্পতির স্ত্রীর শরণাপন্ন হন এই শুভ কাজ সম্পন্ন করার জন্য।

অথচ বছর দুয়েকের মধ্যে পুত্রের চরিত্র স্খলন লক্ষ্য করে তার সাথে সংস্রব ত্যাগ করেন। নারায়ণের স্ত্রী ভবশঙ্করীর স্বামীর প্রতি অভিযোগ ছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু শ্বশুরের নীতিবোধ মায়ার বশবর্তী হয়ে পুত্রবধূকে বাড়িতে আশ্রয় দিলেও পুত্রকে ত্যাজ্য করতে বাধে না। নারায়ণচন্দ্রের ঠিক কী ধরণের স্খলন হয়েছিল, জীবনীকারদের রচনা থেকে ঠিক স্পষ্ট নয়, তবে তাঁর অপরাধ যে পিতার চোখে অমার্জনীয় ছিল তা পরিস্কার। নারায়ণ ও তাঁর স্ত্রীর সঞ্চয়ে বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর তাঁর কন্যাদের বঞ্চিত করে যাবতীয় সম্পত্তি হস্তগত করার অনেক কেলেঙ্কারি আছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ভবসুন্দরীর ভূমিকায় কখনই মনে হয়নি তিনি তাঁর সংসারলাভের জন্য শ্বশুরের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন, বরং বরের কুকর্মে অংশীদারিত্বই লক্ষ্য করা গেছে। সেটা বাধ্য হয়ে কিনা জানি না।

তবে নারায়ণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর বিদ্যাসাগরের পুত্র স্নেহ গিয়ে পড়ল মেজ জামাতা সূর্যকুমার অধিকারীর ওপর যাঁকে তিনি ১৮৭৬ সালে তরুণ বয়সেই মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন ও কলেজের সেক্রেটারি করে আনেন। অথচ এই সূর্যকুমারও নানাভাবে অন্য শিক্ষক ও কর্মীদের ঈর্ষার শিকার হওয়ার জন্য শ্বশুরমশাইয়ের জনসমক্ষে স্নেহ প্রদর্শনকেই দুষেছেন। দৌহিত্রী সরযূবালাদেবীর ডায়রি এর প্রমাণ।​

পরোপকার যাঁর ধর্ম তিনি প্রতিদানের আশা রাখেন না। কিন্তু এই মানুষটাকে তাঁর আত্মীয় ও সমাজ একটু বেশিই শাস্তি দিয়েছিল। যে মাকে বিশ্বেশ্বরী জ্ঞানে তিনি কাশী গিয়েও বিশ্বনাথ দর্শন করতে অসম্মত হয়ে পাণ্ডাদের ক্ষুব্ধ করেন, কোনও অজানা পারিবারিক মান অভিমানের জেরে সেই মায়ের সঙ্গেও দীর্ঘ বাইশ বছর অদর্শনে কেটেছে। যে মায়ের জন্য যিনি বীরসিংহ থেকে সালকিয়ার ৫২ কিমি পথ একাধিকবার হেঁটে অতিক্রম করেছেন, বর্ষার রাক্ষুসে দামোদর সাঁতরে পেরোতে যিনি দ্বিধা করেননি, কী এমন ঘটেছিল যার কারণে সেই মায়ের সাথে দেখা করতেও অতদিন গ্রামে ফেরেননি? উত্তরটা গবেষকদের অনুমান সাপেক্ষ ও পরস্পর বিরোধী। তবে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য জীবনীকার পিতা ঠাকুরদাস ও মা ভগবতীদেবীকে লেখা কতগুলো পত্র উদ্ধৃত করেছেন যাতে, পুত্র হিসাবে, স্বামী হিসাবে পরিবার পরিজনের আশা পূরণ করতে না পারার অক্ষমতা জানিয়ে যেভাবে ক্ষমা চেয়েছেন, তাতে আপনজনেদের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অভিমান স্পষ্ট। ওদিকে মায়ের মৃত্যুতে বালকের মতো কাঁদেন, শাস্ত্র মেনে এক বছর কঠোরভাবে দিনে একাহারী থেকে প্রবল শীতেও মেঝেয় কম্বল বিছিয়ে অশৌচ পালন করেন। পিতার বেলাতেও তাই। কার্মাটারের আদিবাসীরা ছাড়া ভালোবাসার বিনিময়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসা তিনি সমাজের মূলস্রোতের মানুষের কাছ থেকে পাননি যাদের জন্য জীবনপাত করেছেন।​

রামমোহন রায় একার চেষ্টায় সতীদাহ বন্ধ করেছিলেন বলা যায় না, আন্দোলনটা খ্রীস্টান মিশনারীরাও করছিল। উইলিয়াম বেন্টিংক এই নারকীয় প্রথা বেআইনি ঘোষণা করে দিলে সতী পোড়ানোর হার ধীরে ধীরে কমে আসে। জীবন্ত মানুষকে দগ্ধ করাটা যে পৈশাচিকতা এই বোধ কিছু কিছু হিন্দু সমাজভুক্তদেরও ছিল। রামমোহন হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারের নিন্দা করে উপনিষধ অবলম্বনে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তন করেন যা ক্রমে মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ও বিত্তবান হিন্দুর শ্লাঘার চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বিধবা বিবাহ? এত ব্যভিচারের নামান্তর! এমন দুরূহ কাজটির সমর্থন​ ঈশ্বরচন্দ্র বার করেছিলেন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ঘেঁটেই।​

দুই মণিষীই উপলব্ধি করেছিলেন, ৮০০ বছরের বর্বর বৈদেশিক শাসনে অবক্ষয়বিধ্বস্ত হিন্দু সমাজের জন্য "ইংরেজ এই দেশের আশীর্বাদ"। রামমোহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছাড়াও এটা বুঝেছিলেন রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর, দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুররাও। বুঝেছিলেন তৎকালীন বাংলার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও ভারতীয় রেনেসাঁসের অগ্রদূত বঙ্গীয় হিন্দু সম্প্রদায় এবং কিছুটা নিজেদের নিজেদের স্বার্থে হলেও তৎকালীন​ কলকাতার জমিদার সম্প্রদায়। তাই বিদ্যাসাগর ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে সমর্থন করার বদলে ইংরেজ শাসনকে কাজে লাগিয়ে সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, যার উত্তরাধিকার আজও আমরা ভোগ করছি। অথচ অবাঙালী হিন্দুত্বাদীদের মধ্যে বিবেকানন্দকে যদিও বা মান্যতা দেওয়া হয়, বিদ্যাসাগরের প্রতি কিন্তু থাকে নির্ভেজাল উপেক্ষা।​

সেই সময় বাংলা তথা ভারতের আর এক কৃতী সন্তান বিশ্ববাসীর চোখে হিন্দু ধর্মকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠা করতে সর্বধর্ম সমন্বয়ের নির্যাস যে হিন্দু বৈদান্তিক দর্শনে তথা গীতায় নিহিত এই কথাটা শিক্ষিত বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। অনেকে এই দুই মনীষীর মানসিকতায় বিরোধ দেখতে পান কারণ বিদ্যাসাগর শাস্ত্রশিক্ষার চেয়ে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে বেশি জোর দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ যখন নরেন্দ্রনাথ দত্ত হিসাবে চাকরিপ্রার্থী, তখন বিদ্যাসাগরের সহযোগিতা পাননি। কিন্তু তলিয়ে দেখলে এই আপাত বিরোধের মধ্যেও একটা মিল আবিষ্কার করা যায়। দুজনের কেউই নিজের ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করে নতুন ধর্ম বা দর্শনের আমদানি করেননি। বরং সনাতন ধর্ম যে অন্ধ বিশ্বাস বা কুপ্রথা রোধে, শিক্ষার প্রসারে, মানবতার বিস্তারের পরিপন্থী নয় – এটা দুজন দুজনের মতো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আপাদমস্তক নাস্তিক হয়েও বিদ্যাসাগর ছিলেন হিন্দু আইনের অন্যতম বিশেষজ্ঞ এবং নিষ্ঠাবান হিন্দুই।

তাঁকে ভুলে হয়তো যাই নি আমরা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো বাংলা শিল্প সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গও করে তুলতে পারিনি। তিনি তো সুখপাঠ্য কবিতা বা গান রচনা করেননি যা দিয়ে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করা যাবে। কিন্তু সাহিত্যের গুণগত ও নান্দনিক আবেদনে তাঁর নাটকগুলিও আধুনিক দর্শককে আকর্ষণ করবে কিনা সেই পরীক্ষা তেমন হয়নি। তাছাড়া তিনি সুপুরুষ ছিলেন না, যাঁর প্রেমে পড়ে কোনও বিদুষী নারী বিখ্যাত হয়ে যাবেন। বরং গায়ত্রী চৌধুরী স্পিভ্যাকের মতো কিছু বিদগ্ধ গবেষকের মতে নারী প্রগতির ক্ষেত্রটা নাকি ছিল বৃটিশ ও ভারতীয় শিক্ষিত সমাজের কাজে প্রগতিশীলতা জাহির করার একটা প্রতিযোগিতার ময়দান। কী পরিহাস! নারীকে বিদুষী করার পথ তৈরিতে জীবনপাত করার বিনিময়ে এই মূল্যায়নই বোধহয় প্রাপ্য ছিল মানুষটার। এখানেই শেষ নয়, জনৈক জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যিকের উপন্যাসে পরোপকারী মানুষটাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমকামী প্রণয়ী হিসাবে! স্বার্থহীন ভালোবাসা শুভকামনা পরের জন্য কষ্টস্বীকার – এসব কোনও ইন্দ্রিয়পরায়ণ কবি তথা গদ্যকারের পক্ষে অবিশ্বাস্য লাগতেই পারে, কিন্তু যাঁর কাছে বাংলা তথা ভারতীয় সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা এতটা এতটা ঋণী, তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস দুটি কি আর একটু গুরুত্ব পেতে পারে না?​

আমার তো মনে হয় ভারতের প্রতিটি বিদ্যালয়েই ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসগরের ছবি হোক বা মূর্তি – কোনও না কোনও প্রতিকৃতি থাকা উচিত। তাতে করে চিরপ্রয়ানে চলে যাওয়া মানুষটার কাছে আমাদের নিবেদন পৌঁছবে না ঠিকই, কিন্তু এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দ্বারা আমাদের নিজেদেরই আত্মশুদ্ধি হবে।

■ লেখক পরিচিতি

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.