x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

শনির বচন | পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ |

শনির বচন | পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা

■ কথায় বলে পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। একটি স্বাধীন দেশের পক্ষে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে এর থেকে অধিকতর লজ্জা খুব কমই হতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের হওয়ার কথা সাধারণ নাগরিকের প্রথম ভরসাস্থল। মানুষের ব্যক্তি জীবনের নিরাপত্তা শান্তি ও ভরসা রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু পুলিশের। অথচ আমাদের দেশে ধনবান এবং বড়োলোক না হলে, সমাজে খ্যাতি প্রতিপত্তি না থাকলে সাধারণ মানুষ পুলিশের উপরে অধিকাংশ সময়েই কোন রকমের ভরসা রাখতে পারে না। যে কোন বিপদে প্রথমেই পুলিশের শরণাপন্ন হতে মানুষ দশবার ভাবে। উপায়ন্ত না থাকলে তবেই পুলিশের কাছে ছো‌টে। মনে মনে জানে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কারণ রাজনৈতিক মহলে কোন যোগাযোগ না থাকলে পুলিশের কাছ থেকে কোন উপকার পাওয়া দুরাশার বিষয়। মানুষ জানে আমাদের দেশে পুলিশ সংবিধান ও আইনের প্রতিনিধি নয়। পুলিশ জনগণের রক্ষক নয়। মানুষ জানে, পুলিশ শুধুমাত্র নির্বাচিত সরকারের হুকুমের দাস। গণতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের সবরকম স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ। সংবিধানকে বাইপাস করে আইনকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে নির্বাচিত সরকারের হয়ে সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দলের স্বার্থরক্ষাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। আজকে যে দল বিরোধী পক্ষ। কালকে সেই দল নির্বাচনে জিতে মসনদে বসলেই পুলিশের প্রভু বদলিয়ে যাবে। তখন নতুন সরকারের হুকুমের দাস হতে পুলিশের দুদণ্ড দেরি হবে না। স্বাধীনতা পরবর্তী বিগত আট দশকে এটাই ভারতীয় উপমহাদেশের তথাকথিত গণতন্ত্রের প্রধান স্বরূপ। 

তাই যে কোন সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর আসবে একটাই। পুলিশ মানুষের জন্য নয়। রাজনৈতিক দল ও তাদের মন্ত্রীসান্ত্রীদের স্বার্থ এবং সমাজের ধনবান ধনকুবেরদের ধনসম্পদ রক্ষার জন্যই পুলিশ। এবং সেই কাজে পুলিশ দিনকে রাত ও রাতকে দিন প্রতিপন্ন করতে পারে। পুলিশের অসাধ্য কিছুই নাই। এর মানে এই নয়, পুলিশ ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসাধ্য সাধনে ব্যাপৃত সবসময়। বরং ঠিক উল্টো। অন্যায়ের পক্ষে যেকোন ধরণের অনৈতিক কাজে পুলিশের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তাই জনগণ জানে, পুলিশের অসাধ্য কিছু নাই। প্রতিটি মানুষ জানে, আমাদের দেশে ন্যায় বিচার পেতে গেলে প্রচুর অর্থের মালিক হওয়া দরকার। পকেটে অর্থ না থাকলে আমাদের দেশে ন্যায় বিচার পাওয়া সুদূরপরাহত বিষয়। পুলিশের কাজ সাধারণ মানুষকে ন্যায় বিচার পেতে সাহায্য করা। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে সেই সাহায্য প্রাপ্তির বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভরসা থাকে না। এটাই আমাদের দেশের দুঃখজনক সমাজ বাস্তবতা। আবার সেই সাধারণ মানুষেরই যদি কোন না কোন ভাবে অসাধারণ ক্ষমতাধর কোন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে সেই সাধারণ মানুষের কপাল খুলে যেতে পারে। পেতে পারে পুলিশের সরাসরি সাহায্য। ন্যায় বিচার পেতে। ফলে বিপদে পড়লে সাধারণত সাধারণ মানুষ আগেই পুলিশের কাছে দৌড়ায় না। আগে দৌড়ায় এমন কারুর কাছে, পুলিশের উপরে যার কর্তৃত্ব রয়েছে। তিনি যদি অনুগ্রহ করে থানার বড়বাবুকে একবার বলে দেন। একমাত্র তাহলেই মানুষ কিছুটা ভরসা নিয়ে পৌঁছাতে পারে পুলিশের কাছে। 

এখন পুলিশের উপরে কাদের কর্তৃত্ব থাকে? সাধারণত যারা কোন না কোন ভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। ঠিক এই কারণেই যখন যে দল সরকারে থাকে, সাধারণ মানুষকে তখন সেই দলের কোন না কোন ছোট বড়ো আঞ্চলিক নেতা বা নেত্রীর চ্যালাচামুণ্ডাদের সাথে যোগযোগ রাখতে হয়। আপদে বিপদে তারাই তখন একমাত্র সহায়। এরাই রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের কাছে সাধারণ মানুষের সুপারিশ পৌঁছিয়ে দেওয়ার কাজ করে। যার সাথে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের চ্যালাচামুণ্ডার যোগায‌োগ যত বেশি, সমাজে সেই তত বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর যাদের সেই রকম কোন  য‌ো‌গাযোগ থাকে না। বিপদে পড়লে তাদেরই রাতের ঘুম ছুটে যায় সকলের আগে। ঠিক এই কারণেই দেশে পুলিশ থাকতেও সাধারণ মানুষ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের চ্যালাচামুণ্ডাদের তোয়াজ করে চলে। আপদে বিপদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কল্পনায়। এই যে পুলিশ আর সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলের ছোট বড়ো নেতা নেত্রী। আর তাদের চ্যালাচামুণ্ডার একটা মানব শৃঙ্খল। এটাই আমাদের দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ। অভিশাপ এই কারণেই যে, মানুষের নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুল হয়ে থাকে পুলিশ। জনগণ তাদেরকেই নির্বাচিত করে যারা পুলিশকে হাতের তালুতে নাচাতে পারে। ফলে আমাদের সমাজে জনগণের সাথে পুলিশের সরাসরি কোন সংযোগ থাকে না। আপদে বিপদে ভরসা সেই সব রাজনৈতিক দলের চ্যালাচামুণ্ডারাই যাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকে পুলিশ নিজেই। 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্টে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুল হয়ে থাকার কথা তো নয় পুলিশের। তাহলে আর কিসের গণতন্ত্র? এতো কাঁঠালের আমসত্ব। এমনটা হওয়ার তো কথা ছিল না। কিন্তু কেন হলো? রাজনীতির অঙ্গনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ভিতর থেকেও এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখা যায় না। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই দলগুলি জানে, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। একদিন না একদিন নির্বাচনে জিতে পালাবদল হবে। তারাও সরকারে আসবে। তখন তাদের রাজনৈতিক গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষায় এই পুলিশকেই তাদের দরকার হবে সকলের আগে। সকলের থেকে বেশি। তারাও ঠিক একই ভাবে পুলিশকে হাতের পুতুল করে বশীভুত করে রাখবে। ফলে সংবিধান ও আইনের যে সব ফাঁকফোঁকর দিয়ে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশকে রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুল করে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হয়েছে। সেই ব্যবস্থার ভিত নষ্ট করতে রাজি নয় কোন রাজনৈতিক দলই। এটাই ভারতীয় উপমহাদেশের গণতন্ত্রের মূল পরিকাঠামো। আর সাধারণ মানুষও জানে। যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। তাই সেই রাবণের গুষ্টির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই ব্যক্তিমানুষের প্রচেষ্টা সজীব থাকে। মানুষ জানে, কাকে কোথায় কিভাবে কতটা তেল মাখিয়ে রাখতে পারলে আখেরে লাভ হবে। কিন্তু এই তৈলমর্দনের কৌশল সকলেরই আয়ত্বাধীন থাকে না। মুশকিল হয় তাদেরই সবচাইতে বেশি। ফলে তারাই জানে পুলিশে ছুঁলে কেন আঠারো ঘা। না অপরাধীদের ততটা ভয় থাকে না পুলিশের সম্বন্ধে। যতটা ভয় থাকে এই সব সাধারণ মানুষজনদের। যারা ঠিকঠাক সময় মতো ঠিকঠাক জায়গায় ওজনমত তৈলমর্দনের বিদ্যা অর্জন করতে পারেনি। পারে না। 

ভারতীয় উপমহাদেশের গণতন্ত্রে পুলিশের ভুমিকাই প্রমাণ করে দেয়, এই গণতন্ত্র কতটা ঠুনকো। কতটা মেকী। এই গণতন্ত্র কাদের স্বার্থে কাজ করছে। আর কারা বলি হচ্ছে, হয় এই গণতন্ত্রের রথের চাকায়। মানুষ তার বিপদে আপদে প্রয়োজনে সরাসরি পুলিশের কাছে পৌঁছাবে। পুলিশ সংবিধানের আওতায় দেশের আইন অনুযায়ী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে ন্যায় বিচার পেতে সাহায্য করবে। পুলিশ থাকবে মানুষের পাশে। মানুষ হাত বাড়ালেই ধরতে পারবে পুলিশের নির্ভরতার বলিষ্ঠ হাত। মাঝখানে কেউ মিডলম্যান হয়ে দাঁড়ানোর জায়গা ও সুযোগ পাবে কেন? এই মিডলম্যানদের হাত থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে না পারলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় কোনভাবেই। আর পুলিশ যতদিন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করতে থাকবে। ততদিন রাজত্ব চালাবে এই মিডলম্যানরাই। পুলিশও সাধারণ জনগণের মতো এই মিডলম্যানদেরই অনুগ্রহের কৃপাপ্রার্থী হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। যে পুলিশের আঠারো ঘায়ের ভয়ে জনগণের হৃদকম্প হয়, সেই পুলিশ ও জনগণের ভিতর পার্থক্য শুধু একটা উর্দী ও ব্যটনের। 

অর্থাৎ একটা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির খোঁজ শুরু করতে হবে। যে সংস্কৃতি সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে। আইনের পথে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। ভোটে জিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গোষ্ঠী স্বার্থ সুরক্ষিত করতে সংবিধানকে বাইপাস করে আইনকে কাঁচকলা দেখাবে না। পুলিশকে দলদাসে পরিণত করে জনগণ ঠ্যাঙাবে না। পুলিশ থাকবে সংবিধান ও আইনের প্রতিনিধি হয়ে। সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি হয়ে নয়। 


২৫শে সেপটেম্বর’ ২০২০


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.