x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

ড. পূজা মৈত্র

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ |

সাজঘর

(৬)

ড্যাডির কথায় চমকে গিয়েছিল রণিত, একইসাথে ভারী মজাও পেয়েছিল। ড্যাডি বলেছে কাল স্কুলে বাসে ট্যাক্সিতে না- ড্যাডির বাইকে করে যাওয়া হবে, ফেরাও। বাইক রাইডের জন্য মনটা উসখুশ করছিল রণিতের। না চাইতেই ড্যাডি বুঝে গেছে। কাল স্কুলে বিগ সেলিব্রেশন। অডিটোরিয়ামে হবে। রণিতকেও স্টেজে উঠতে হবে। আগে কখনো স্টেজে ওঠেনি রণিত, কোন কিছুতেই মেডেল পায়নি যে। পড়াশোনায় অ্যাভারেজ আর কোনো এক্সট্রা কারিকুলার- ও শেখেনি। এই প্রথম স্টেজে উঠবে। সবাই ওকে দেখবে, হাততালি দেবে, ফাদাররা, স্যাররা প্রেইজ করবেন- ইস্! মাম্মা স্কুলে যেতে পারলে ভালো হত। যদি এসব দেখত, খুব খুশি হত। ড্যাডিকে মাম্মা বারবার বলে দিয়েছে মোবাইলে ছবি তুলতে। ড্যাডির অত কাজের মধ্যে মনে থাকবে কিনা কে জানে! ড্যাডিকে অনেকে ফোন করছে এখন। কনগ্রাচুলেট করছে, কোচবিহার ট্রফি নাকি নেক্সট মান্থেই। মুম্বাইয়ে হবে। ড্যাডিকে এর মধ্যে টিম সিলেক্ট করে রেডি করতে হবে। ড্যাডি ওকে নেবে তো? নাকি ছোট বলে নিতে পারবে না। ছোট কোথায় রণিত? এখন তো ইলেভেন প্লাস, ক্লাস সেভেনে উঠে গেছে। দাড়ি, গোঁফ না থাকলে নাকি বড়​ হয় না। ড্যাডির রেজারটা নিয়ে একদিন সেভ করতে ট্রাই নেবে রণিত। অনুব্রত বলেছে এমন করলে নাকি তাড়াতাড়ি দাড়ি, গোঁফ গজায়। ও ওর বাপির রেজারটা নিয়ে করে। ওর মনে হয় একটু একটু গোঁফ হচ্ছে। গোঁফ হলেই ওকে কেউ ছোট বলতে পারবে না। নিতেই হবে টিমে। বাট্ ও যে এসব করবে- মাম্মা জেনে গেলে? ভেবেই আইডিয়াটা ছেড়ে দিল রণিত। ছড়িটা দিয়ে পেটাবে। ড্যাডিও ঠেকাতে পারবে না। ড্যাডি আর সিলেক্টররা ওকে মনে হয় এমনিতেই নেবে। ও ভালো খেলেছে তো। শুয়ে শুয়ে এইসব কিছু ভাবছিল, ড্যাডি এল। "বাবু, ঘুমোসনি?" "তুমি না এলে ঘুমাই?" ড্যাডি হেসে ফেলল, "তাই তো, ভেরি সরি। তোর মাম্মাকে কিচেন ক্লিনিং এ একটু হেল্প করছিলাম, বাবা।" রণিত ড্যাডির কোল ঘেঁষে এল। "কাল ভালো খেলেছি তো, ড্যাডি?" তুষার ছেলের মাথায় হাত রাখল। "নট ব্যাড।" "ভালো না?" "উঁহু। আরো ভালো হতে হবে। স্পিনার খেলার সময় অত ছটফট করলে হবে না।" "আচ্ছা।" রণিত চুপ করে গেল। ভালো হয়নি তাহলে। ড্যাডি ওকে টিমেও নেবে না। "কাল নেটে পিয়ালকে খেলবি। শুধু ডিফেন্সিভ কাটস্।" "ওকে।" "গুড বয়, এবার ঘুমাও।" রণিত ড্যাডিকে জড়িয়ে ধরল। কোয়েল এল তখনি। "ঘুমাল?" আস্তে করে বলল ও। "না। চোখ বুজেছে।" কোয়েল ছেলের পাশে শুয়ে পড়ল। "মুম্বাই কবে যাওয়া হবে গো?" রণিত মাম্মার কথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। "মুম্বাই যাওয়া হবে মাম্মা? বেড়াতে? কবে?" তুষার মুচকি হাসল। "দিলে তো সারপ্রাইজটা মাটি করে?" কোয়েল জিভ কাটল। এমা! একটু আগে সিসোদিয়া স্যার তুষারকে ফোন করেছিলেন। মুম্বাইগামী কোচবিহার ট্রফির বেঙ্গল টিম লিস্টে সবার প্রথমেই উনি রণিতকে চান। তুষার সেই শুনে ঠিক করেছে কোয়েলকেও নিয়ে যাবে সঙ্গে করে। ছেলেটা অতদিন মা'কে ছেড়ে থাকতে পারবে না। তাছাড়া ওদের তিনজনের একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়াও হয়নি। খেলার সুবাদে হবে। "তোর এত নাচার কি আছে?" কোয়েল মেকআপ করল, "আমি অফিসের কাজে যাব।" "ইস! তাহলে ড্যাডিকে আস্ক করলে কেন? ড্যাডিও যাবে?" "হুম। যাবেই তো। ড্যাডি আর আমি। তুই দিদান বাড়ি থাকবি। রণিতের মুখের রঙ বদলে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। অভিমানে ফুলে গেল মুখটা। চোখগুলো জলে ছলছল করতে শুরু করল। "ওহ। আচ্ছা। যাও। ঘুরে এস।" রণিত জানে এটাকে হানিমুন বলে। বিয়ের পর সব্বাই যায়। মাম্মা আর ড্যাডি যায়নি তো- যাবে এবার। রণিতকে কেন নিয়ে যাবে ওখানে? রণিত যাবেও না। মাম্মা আর ড্যাডি ঘুরে আসুক। খুশি হবে ওরা। তুষার বুঝল ইয়ার্কিটা একটু বেশিমাত্রায় হয়ে গেছে। "কোয়েল, তুমিও না। কাঁদালে ছেলেটাকে। এই বোকা, তোকে ফেলে কোথায় যাব আমরা?" কোয়েলও রণিতের মান ভাঙাতে চাইল, "তোকে নিয়েই যাবো, যেখানেই যাই।" রণিত শুয়ে পড়ল, গোমড়া মুখ করে। "আমি যাব না।" তুষার ঝুঁকে পড়ে ছেলেকে আদর করল, "যেতে তো হবেই।" "আমি দিদান বাড়ি-ই থাকব। তোমরা যাও। তোমরা গেলেই হবে।" কোয়েল ছেলের কপালে হাত রাখল, "তোর কত বেড়াতে যাওয়ার শখ, আমরা জানি না? তোর জন্যই তো যাচ্ছি আমরা।" "থাক্, তোমরা যাও।" তুষার অবাক হল, এত করে তো বোঝাতে হয় না। "আমরা কেন যাচ্ছি বল্ তো?" "জানি তো। হানিমুন। সবাই যায়। অনুব্রত বলেছে, বিয়ে হলে সবাই যায়। তোমরাও যাবে।" কোয়েলের মাথায় চড়াৎ করে রাগ চড়ে গেল। এত এঁচোরে পেকেছে ছেলেটা! থাপ্পড় কষাতে যাবে তুষার হাতটা ধরল। "পিয়া, না, ও তো ছোটো। যা শোনে তাই শেখে। ওকে মেরো না। বোঝাও।" রণিত মাম্মার চোখে ভীষণ রাগ দেখল। "বাবু, বিয়ের পরে একে অপরকে বুঝতে হানিমুন যায়-​ এটা ঠিক। কিন্তু সেটা এক একজন এক এক ভাবে যায়। কেউ কেউ কেবল কাপলে যায়- আবার কেউ ফ্যামিলি নিয়ে যায়। আর তোর মাম্মা আর আমার বিয়েটাই শুধু নতুন। আর কিছুই তো নতুন না। আমরা সেই কবে থেকেই চিনি দু'জনে দু'জনকে। তাই নতুন করে চিনতে বেড়াতে যেতে হবে, তা নয়। আর আমাদের দু'জনের মাঝে আমাদের ছেলেও এসে গেছে সেই কবেই। তাই অনুব্রতকে বলিস- আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে সেটা ফ্যামিলি ট্রিপ হবে। তুই, আমি, মাম্মা, দাদুভাই, দিদান- সব্বাই..." "তাহলে বললে যে আমাকে রেখে যাবে দিদান বাড়ি?" "তোর মাম্মা মজা করছিল। আর এবার তো আমরা বেড়াতে যাচ্ছি না, বাবা।" "তাহলে?" "পিয়া, তুমিই বলো।" কোয়েল রাগটাকে দমিয়েছিল। "না, তুমি বলো।" "তুমি ওর মা পিয়া- ওর জীবনের প্রথম বড় ধাপটা তোমার হাত দিয়েই হোক।" "আর তুমি? তুমি তো ওর ড্যাডি, কোচ, আইডল- তোমার ভূমিকা আমার থেকে অনেক বেশি। আর ও বোঝে আমাদের একটুও?" "এই দ্যাখো! এবার তোমার অভিমান হল। এই মা- ছেলেকে নিয়ে কি করি.. এর অভিমান কমে তো এর বাড়ে। পিয়া, ছেলেকে বলবে না ও কি অ্যাচিভ করেছে?" রণিত মাম্মার হাত ধরল, "মাম্মা- অ্যাম সরি। তুমি আমাকে ফেলে যাবে বললে তো- আর তাই আমি ভাবলাম..." "ফেলে গেছি কোথাও? কোনদিন? একটা মুহূর্তও?" "যাওনি তো।" "তাহলে? ভাবলি কি করে? তোর মাম্মা, তোর ড্যাডি তোকে ফেলে যায়?" "সরি বললাম তো।" কোয়েল হাসল, "তোর জন্য বরং আমি বারো বছর পর কোথাও বেড়াতে যাবো পাগল। মাঝের বারোটা বছর কিভাবে কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি। কি করে একা একা এই গোটা পৃথিবীতে বাঁচব, তোকে বাঁচাব- এই ভাবতে ভাবতেই তো কেটে​ গেল দিনগুলো- লড়তে লড়তে কেটে গেল। আমিও যে এনজয় করতে পারি, বেড়াতে যেতে পারি, হাসতে পারি, ঘুরতে পারি- সব তো ভুলেই গেছিলাম। তুই এই যে তোর ড্যাডিকে নিয়ে এলি, আমার সব চাপ অর্ধেক হয়ে গেল। এখন আমি না থাকলে তোর কি হবে, এটা ভেবে অন্তত ভয় পাই না। আর সোনায় সোহাগার মত তোর ভালো খেলা। চারিদিকে তোর​ নাম, তোর প্রশংসা.. মনে হয় আবার বাঁচছি। গর্বিত মা হওয়ার সম্মান আমিও পেতে পারি- এটা জেনে কত ভালো লাগছে জানিস?"​ "পিয়া, না- চোখ মোছ। বাবু, আমরা মুম্বাই ঘুরতে যাচ্ছি না, বাবা।"​ রণিত​ অবাক হল, "তাহলে?"​ কোয়েল ছেলেকে চুমু খেল। "তুই কোচবিহার ট্রফির টিমে সিলেক্টেড হয়েছিস সোনা। এইমাত্র ফোন এল।"​ "সত্যি মাম্মা?" "সত্যি।"​ "আমি ভালো খেলছি তাহলে?"​ "সিলেক্টররা তেমনি ভেবেছেন তো।"​ "ড্যাডি, সত্যি? ছোট বলে বাদ দেয়নি?"​ তুষার হাসল, "না। ছোট বলে বাদ দেয়নি।"​ "তাহলে তোমার কোচিং- এ আমি খেলতে যাব মুম্বাই?"​ "একদম। আর মাম্মা একা এখানে বসে কেন কষ্ট পাবে? তাই মাম্মাকেও নিচ্ছি সাথে।"​ "রণিত ড্যাডিকে চুমু খেল, তারপর মাম্মাকেও। "কি মজা!"​ "খুব মজা। কিন্তু কাউকে বলবে না এসব, কেমন? অফিসিয়াল সিলেকশন কাল হবে।"​ "ওকে, ড্যাডি। আমরা শুধু খেলব, ড্যাডি? ঘুরব না?"​ "ট্রফি জেতাতে পারলে ঘোরাব।"​ "আচ্ছা, ড্যাডি, মাম্মা.."​ "হ্যাঁ, সোনা।"​ "তুমিও কিন্তু খেলার মাঠেই থাকবে, সবসময়।" কোয়েল হাসল। "একা একা বেড়াব কোথায়?"​ "সেজন্য না, তুমি মাঠে এলেই সেঞ্চুরি হয়, তাই।" "লাকি চার্ম তাহলে তোর মাম্মা।"​ "হ্যাঁ তো।" কোয়েলের মুখটা খুশিতে ভরে গেল। সত্যিই আজ নিজেকে লাকি মনে হচ্ছে ওর।

বিকালে ড্যাডির বাইকে চাপতেই ড্যাডি বলল, "হল, সেলিব্রেশন?"​ অডিটোরিয়ামে ফেলিসিটেশনের পর পুরো টিম খুব খুশি ছিল। সারা স্কুল আজ ওদের জন্য ক্ল্যাপ করেছে, প্রাউড ফিল করেছে। ফাদার নিজেও বারবার করে বলেছেন ওদের সবার কথা। রণিতকে ওর পারফরম্যান্সের জন্য আলাদা করে মেনশন করেছেন বারবার। ঋক আঙ্কেল লাঞ্চে ওকে টিচার্স রুমে নিয়ে গিয়েছিল। সব টিচাররা ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সুজনদা ড্যাডির​ ভালো মুড দেখে আব্দার করেই বসল আজ প্র্যাক্টিস ছুটি দিতে হবে। পুরো টিম একসাথে সেলিব্রেট করবে সেই সময়। ড্যাডিও রাজি হয়ে গেল। এতক্ষণ রণিত টিমের সঙ্গেই ছিল। কেক আনিয়েছিল সুজনদা। কেক কেটে সেলিব্রেশন হচ্ছিল। রণিতকে কেক মাখিয়ে দিতে যাচ্ছিল যুধাজিৎদা। সুজনদা মানা করল, ওর কপালের ব্যথা- যদি লেগে যায়? দাদারা নিজেদের মধ্যে কেক টেক মাখল, বেলুন ফাটাল- রণিতকে প্যাম্পার করার জন্য কাঁধে তুলে ঘুরল কিছুক্ষণ। আরো মজা হত- ড্যাডি ডেকে নিল। যেতে হবে কোথায় একটা। সবে তিনটে বাজে। পাঁচটা অবধি থাকবে দাদারা। রণিতও থাকত। বাট ড্যাডি​ ​ অ্যালাউ করল না। কিটব্যাগ, স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এল রণিত।

স্কুলব্যাগটা বাইকের টুলবক্সে ভরে কিটব্যাগ কাঁধে বাইকে চেপে বসতেই​ ড্যাডি প্রশ্নটা করল। "ইয়েস ড্যাডি।" "এটা স্কুল, রণিত।" রণিত ভুলটা শুধরে নিল। "ইয়েস, স্যার।" "দ্যাটস বেটার। যেখানে যাচ্ছি, সেখানেও নো ড্যাডি, ওনলি স্যার। ওকে?" বাইক স্টার্ট দিল তুষার। রণিত চুপ করে বসে থাকল। বাইকে উঠলেই যেমন ড্যাডিকে আঁকড়ে ধরে তেমন করে ধরল না। "কি হল? জড়িয়ে ধর, পড়ে যাবি তো।" "স্যার যে?" তুষার হেসে ফেলল এবার, "তোকে কথায় হারানো যাবে না। বাইকে মানে রাস্তায় স্যার না, ড্যাডি। জড়িয়ে ধর। "রণিত ড্যাডিকে আঁকড়ে ধরল। তুষারের খুব ভালো লাগে ছেলের এইভাবে বসাটা। এখন ইডেনে যাচ্ছে ওরা। সঞ্জয়দা ডেকেছে। রণিতকে নেটে দেখবে নাকি। সঞ্জয়দা কিছুটা খেয়ালি, নিজে বল করবে হয়তো। নাহলে কোনো ভালো স্পিনার​ ডেকে রেখেছে। একদিক থেকে ভালোই। বাবুর নেট হত না এবেলা, হয়ে যাবে। মাঝখান থেকে সিসোদিয়া স্যার ভেবেই ওনাদের থাকতে বলেছেন। তুষার আর সঞ্জয়দা আর অন্য সিলেক্টররা মিলে সিলেকশন মিটিংটাও সেরে নেবে। পেন্ডিং রেখে লাভ নেই। হাতে মাসখানেক সময়। কোচবিহারটা বেঙ্গল জিতলে অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। না জেতার কথা ভাবছেও না তুষার- জিততে ওদের হবেই।

(৭)

রণিত জানত না ওরা কোথায় যাচ্ছে, ইডেন দেখে হাঁ হয়ে গেল। আজ ইডেনে কেন? আজ তো খেলা নেই। ড্যাডি বাইক রেখে বলল, "চল্"। "কি হবে এখানে? রণিত কৌতূহল চাপতে না পেরে বলেই ফেলল, "এখানে খেলা আছে?" "হুম, নেট আছে। তুই নেট করবি।" ড্যাডি গম্ভীর গলায় বলল। আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস হল না রণিতের। ও তাহলে স্কুলে নেট হবে না বলে ড্যাডি ওকে এখানে নিয়ে এল? সবার ছুটি হলেও ওর ছুটি নেই। ঢোকার মুখেই একটা লোকের সঙ্গে দেখা হল। রণিতকে দেখে এগিয়ে এল, "আ গয়া বেটা? আব ক্যায়সা হ্যায়? তুষার রণিতকে ইশারায় নমস্কার করতে বলল ওনাকে। রণিত করতে যাবে, থামিয়ে দিল লোকটা, "আরে রহেনে দে। তুষার, তু সিসোদিয়া স্যারকে কেবিন মে যা। ম্যায় বাবু কো নেট লে কর যা রাহা হুঁ।" রণিত ভারী অবাক হল। নেটে ড্যাডি থাকবে না? "সঞ্জয়দা, একটু দেখে। খুব লাজুক কিন্তু। মুখ ফুটে কিছু বলবে না। কিন্তু আমি না থাকলে অস্বস্তি হবে ওর।" "তু টেনশন মত লে। শের হ্যায় তেরা বেটা। অউর আঙ্কল সে শরম ক্যায়সি? চল্, বাবু।" তুষার চোখের ইশারায় যেতে বলল।​ সঞ্জয়দা ভালো মানুষ। ওনাকে ভরসা করে ও। বাবুকে সঞ্জয়দার সঙ্গে ছাড়া যায়। কিন্তু নেটে বাবুটা যে কি করবে, এই নিয়েই চিন্তিত তুষার। ড্যাডি কোথায় ভাবতে​ ভাবতেই ভুল যেন না করে।

সিসোদিয়া স্যারের কেবিনে যাওয়ার মুখে সৌমেনের সঙ্গে দেখা হল তুষারের। "তুষার, কনগ্রাটস্। খুব ভালো কোচিং করেছিস লরেন্সকে। বেঙ্গল আন্ডার সেভেন্টিনও যেন লরেন্সের মত এক্সেল করে, এই আশা রাখি। তুষারের চোয়াল শক্ত হল। "সৌমেনদা, একটু কথা ছিল।" "অফকোর্স। আয়। কেবিনে আয়। কেবিনের দরজা খুলে​ তুষারকে নিয়ে গেলেন সৌমেন। "বস্। বাপিন মানে আমার ছেলে - তোর সবচেয়ে বড় ফ্যান। ওর স্যারের কথা শুরু হলে আর থামতেই পারে না। থ্যাঙ্কস রে। ওর স্টান্সটা তুই বদলে না দিলে- ও এত ভালো খেলতে পারত না।" "সুজন খুব ভালো ছেলে। খুব হার্ড ওয়ার্কিং। ক্যাপ্টেন্সি মেটেরিয়াল। ও যেন খারাপ পরিবেশে নষ্ট না হয়ে যায়।" সৌমেন ইঙ্গিতটা বুঝলেন, "তুই সৃঞ্জয়ের কথা বলছিস্ তো? আসলে ও দিনে দিনে আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে পড়ছে।" "দোষটা তোমার সৌমেনদা। তুমিই শুরু থেকে অন্ধ প্রশ্রয় দিয়েছ। এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তাই। কন্ট্রোল কিভাবে করবে, সেটা তুমিই ভাবো।" সৌমেন ঘাড় নাড়লেন, "আমি দেখছি।" "দেখ, না দেখলে আমাকে দেখতে হবে। পরশু খেলায় দীপমাল্যর হাত থেকে বলটা ফস্কায়নি- এটা হয়তো তুমিও বুঝেছ।" সৌমেন চুপ করে থাকলেন। উনি জানেন ব্যাপারটা- আন্দাজ তো করেইছেন। "রণিতের কিছু হয়ে গেলে- শুধু আমার ক্ষতি হত কি?" "একদম না। রণিত আমাদের সবার ভবিষ্যৎ। কি খেলে ছেলেটা। আগে বাপিনের মুখে শুনতাম। এই টুর্নামেন্টে নিজের চোখে দেখলাম। আই স্ট্রংলি বিলিভ ইন হিজ পোটেন্সিয়াল।" "সৌমেনদা, তোমার, আমার, সৃঞ্জয়ের মধ্যে যা কিছু ছিল তা এখন পাস্ট। তার জন্য আমি তো আমার কেরিয়ারটা দিয়ে সাফার করেছি। চাইলে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতেই পারি। কিন্তু আমি তা চাই না। বাট- রণিতের সাথে এমন হতে​ থাকলে- ইউ নো।" "আমি বুড়োকে বোঝাব।" "বুঝিয়ে দেখ। পরশু ম্যাচের আগে টানেলের মধ্যে ধরে ছেলেটাকে মেন্টাল টর্চার করেছে। আমার পাস্ট তুলে ওকে খোঁচা দিয়েছে। ওর খেলা থেকে ফোকাসটা নড়ে যায়নি- এই ভাগ্য ভালো।" "তাই নাকি? ছি! ছি! এরকম করল? আমি ওকে বলব, অবশ্যই।" সৌমেন লজ্জিত হলেন। "দ্যাটস্ বেটার। সৌমেনদা আমি এখন উঠি- স্যারের কেবিনে যেতে হবে।" হ্যাঁ। আমিও যাব। সিলেকশন মিটিং আছে। তুষার- একটা কথা বলি, যদিও ডিসিশনটা তোর- বাপিনের কি চান্স আছে?" তুষার মৃদু হাসল, "সুজন তো ভালো খেলেছে সৌমেনদা, এত কিন্তু কিন্তু করছ কেন?" "ওহ। আর একটা রিকোয়েস্ট করব?" "কর।" "বাপিনের খুব ইচ্ছা, ওর ভাইকে একদিন বাড়িতে ডাকে। খুব ভালোবাসে তোর ছেলেটাকে। যদি তোরা আই মিন তুই, রণিত আর বউমা যদি একদিন আমাদের বাড়ি ডিনারে আসিস..." তুষার বুঝল সৌমেনদা তিক্ত সব পুরোন স্মৃতি মেটাতে চাইছে। "বেশ। তুমি জানিয়ে দিও, আমরা যাব। সৃঞ্জয়টাকে সামলে রেখো সেদিন ... তাহলেই হবে।" "ও তো রঞ্জি খেলতে বেরিয়ে গেছে কাল-ই। আসাম গেছে। কাল থেকে খেলা। তোরা কাল-ই আয়।" তুষার সম্মতির মাথা নাড়ল। রণিতের জন্য ওকে এখন খুব কৌশলী হয়ে চলতে হবে। সব শত্রুতা এড়িয়ে চলতে হবে। তার জন্য যদি কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতে হয়, করবে তুষার।​

​ ​ ​ "আগের ইয়ারে আমরা মিজারেবল পারফরম্যান্স করেছিলাম কোচবিহার ট্রফিতে।" সিসোদিয়া কেটে কেটে বললেন।" এবার সেটা হোক, আমি চাই না। তাই তুষারকে দায়িত্ব দিয়েছি।" সিলেকশন কমিটির সবাইকে চেনে তুষার। সৌমেনদাও আছে। সঞ্জয়দাও কমিটিতে আছে,​ রতনলাল দত্ত আর নীতিশ বসুর সাথে। কিন্তু তার তো কোন পাত্তা নেই। সেই যে রণিতকে নেটে নিয়ে গেছে, এখনো এল না। " সঞ্জয়দা আসুক, তারপর স্টার্ট করি?" তুষার বলল। "সে আর এসেছে ! ঢোকার পথে দেখলাম উঁকি মেরে, নেটে মশগুল। গতবারের আন্ডার সেভেনটিনের ভাল পারফর্মার কয়েকজনকে ডেকে নিয়েছে মনে হল। নিজেই বল করছে তাদের।" রতনলাল বললেন "একসময় বেঙ্গল খেলেছেন। মিডিয়াম পেশার ছিলেন।" " বল করছেন বোলো না, মার খাচ্ছে বলো। একটা পুঁচকে ছেলে ব্যাট করছে দেখলাম। সঞ্জয়কে বলে বলে ওড়াচ্ছে।" সিসোদিয়া হাসিতে ফেটে পড়লেন।" নীতিশবাবু, ও রণিত হ্যায়। কাল পেপার মে ফোটো আয়া থা জিসকা।লরেন্স কো জিতায়া উসি লড়কে নে।" "ইজ ইট?" নীতিশ অবাক হলেন। "বাচ্চা ছেলে তো। ছবিতে দেখলাম গোঁফও ওঠেনি। এত ভাল খেলে?" সৌমেন যোগ করলেন "খেলবে না? আমাদের তুষারের ছেলে বলে কথা !"

'আমাদের তুষার' শব্দটা কানে লাগলে একটা মৃদু হাসি ছাড়া তুষারের কিছু আর দেবার ছিল না। "ওহ, হ্যাঁ, তাই তো। সঞ্জয় বলছিল কাল। তুষার, দেখে শুনে রাখিস। মাথা ঘুরে না গেলে অনেক দূরে যাবে।"​ নীতিশ যোগ করলেন। নীতিশ বসু তুষারকে খুব একটা পছন্দ কোনদিন করেন না। তুষার কথা​ বাড়াল না। "গতবারের কাদের আমরা রিটেন করছি তাহলে?" "প্রোবাবলি পাঁচটা ছেলে। ক'জনকে তুই চিনিস।" রতনলাল বললেন, "জেভিয়ার্সের ওপেনার বিশাল কাসরা, ফার্স্ট বোলার দীপমাল্য, এই দুজন আন্ডার নাইনটিন-ও খেলে। লেফ্ট আর্ম স্পিনার প্রসেনজিৎ নিয়োগী। এছাড়া মালদার একটা ছেলে আছে। উইকেট কিপার, ভবানীপুরে খেলে- প্লাবন ব্যানার্জী, আর একটা স্পিনার কাম ব্যাট, বারুইপুর বাড়ি, মিজানুর রহমান।"

"আগেরবারের ক্যাপ্টেনকে ড্রপ করছি নাকি?" নীতিশ অবাক হলেন, "ভালো খেলে তো ছেলেটা। লরেন্সের এগেইন্সটেও ফাইনালে ভালো খেলেছে- অনিকেতের ছেলে-কি নাম যেন..." "মনোসিজ চ্যাটার্জী।" তুষার বলল। "হ্যাঁ, মনোসিজ। ওকে ড্রপ করব?" "ওর প্রচুর ইগো নীতিশদা। টিমে গ্ৰুপিজম চলে আসে। এইজন্যই আগের বার হেরেছি আমরা।" রতনলাল জোর দিলেন। দরজায় টোকা পড়ল তখন। সঞ্জয় শর্মা ঢুকলেন। ঘেমে নেয়ে একসা। "টিম সিলেকশন ডান?" "চলছে। ভালো সময়ই এসেছিস। মনোসিজ চ্যাটার্জীকে ড্রপ করবি তোরা?" সঞ্জয় রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন। "সেই রকমই ভাবছি। তুষার কি বলিস?" তুষার ভেবে নিয়েছিল কি বলবে, "ড্রপ না করে, ক্যাপ্টেন না রাখলেই তো হয়।" সিসোদিয়া ভুরু কোঁচকালেন, "ভেতরে পলিটিক্স করলে?" "পারবে না। সেটার দায়িত্ব আমি নিলাম।" "বেশ, থাক তাহলে।" সিসোদিয়া বললেন। "ভালো খেলে, সেদিনও দেখলাম।" "তাহলে ছ'টা জায়গা হল। আর দু'টো ওপেনার..." "একটা তো কনফার্ম। তুষার, ভাই- ইয়ে লেড়কা দিখনে মে ইতনা সা হ্যায়- পর ক্যায়া পাওয়ার হ্যায় ইয়ার। ক্যায়া খিলাতা হ্যায় ঘর মে?" তুষার মৃদু হাসল, "সেটা ওর মা'কে জিজ্ঞাসা করো... ও ভাল বলতে পারবে।" "রণিত তো খেলবেই.. রতনবাবু, নোট কিজিয়ে..." সিসোদিয়া বললেন। "রণিত সান্যাল- অটোমেটিক চয়েস..এক লেফট হ্যান্ডার ওপেনার ভি চাহিয়ে না? সৌমেন কে লেড়কে কো ডাল দো। আগেরবার চান্স পেয়েও বেঞ্চে বসেছিল। এবার খেলুক।" সুজনের সিলেকশনটাও অনায়াসে হয়ে গেল। লরেন্স থেকে রোহন, যুধাজিৎ, পিয়াল আর​ অরিত্ররও। পনেরো জন হবার পর এবার ক্যাপ্টেন। "তুষার বলুক এটা। ও যাকে বলবে সেই হবে।" রতনলাল মত দিলেন। তুষার সিসোদিয়া স্যারের দিকে তাকাল, "স্যার ভাল জানেন আমার মত।" "হ্যাঁ, পরশু আমিও দেখলাম ছেলেটার ক্যাপ্টেন্সি। বেশ ভালো।" "সুজন ব্যানার্জী ইজ মাই চয়েস অ্যাজ ক্যাপ্টেন।"​ তুষার খোলাখুলি বলল। সৌমেন চমকে উঠলেন। টিমে চান্সের ব্যাপারে রেকমেন্ডেশন আশা করেছিলেন সৌমেন, বাপিনকে তুষার আন্ডার সেভেনটিন ক্যাপ্টেন বানিয়ে দেবে- ভাবেননি। "বেশ। ডেপুটি তাহলে রোহন?" সঞ্জয় বললেন। "তাই হোক। একদম লরেন্সের উইনিং ফর্মুলা।" রতনলাল খুশি হলেন। তুষার সঞ্জয়দাকে আস্তে করে বলল "বাবু কি নেটে, সঞ্জয় দা?" "হ্যাঁ, তুই বলেছিলি ওকে স্পিনের এগেইনস্টে ডিফেন্সিভ শট প্র্যাকটিস করতে - সেটা আজ স্কুলের নেটে হয়নি। তাই আমায় কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, স্যার, কাল তো স্পিন ঠিক করে খেলিনি, আজ প্র্যাকটিস হল না- ড্যাডি রাগ করবে...আমি তখন প্রসেনজিৎকে বলে এলাম ওকে বল করতে।" তুষার খুশি হল, "আচ্ছা।" "ছেলেটা খুব সিনসিয়ার আর ডিসিপ্লিন্ড, তুষার। আমরা হলে ভাবতাম -যাক্ আজকের দিনটা ছুটি গেল। ওর বয়সের যে কোন বাচ্চাই তাই ভাববে। এভাবে নিজে থেকে নেট চাইতে আমি কাউকে দেখিনি।" তুষার জানে সেটা। তাও বলল, " ছোট তো, তাই বাধ্য আছে। ওই যে নীতিশদা বলল বড় হলে যাতে মাথা না ঘুরে যায় - ওটা হলেই বিপদ।" সৌমেন সব শুনেছিলেন, "মাথা ঘোরার ছেলে রণিত না। তবে ওর ড্যাডি একটু বেশিই স্ট্রিক্ট। ছেলেকে নিউজ পেপারে ওর ছবি উঠেছে- সেটাও দেখায়নি। বাপিন গিয়ে কাল দেখিয়েছে রণিতকে।" তুষার মনে মনে হাসল। নিজের ছবি পেপারে দেখে সে কি অবাক পাগলটা। আর তেমনি খুশি।ছেলেমানুষটা আরো কিছুদিন থাকুক। এটাই চায় তুষার। ভালো খেলতে গেলে ভালো মনটা জরুরী।

সরাসরি নীচে নেটে গেল তুষার। রণিত এখনো ব্যাট করছে। ওকে বল করছে যে ছেলেটা, তাকে চেনে তুষার। জেভিয়ার্সের প্রসেনজিৎ নিয়োগী ভাল লেফ্ট আর্ম স্পিনার, লম্বা বলে ফ্লাইট দিতে পিছপা হয় না। লুপও আছে একটা। ন্যাচারাল ডেলিভারিটা বেশ ভালো। ডান হাতি ব্যাটসম্যানের থেকে দূরে চলে যায়। জোরের সঙ্গে একটা আর্ম বল করার চেষ্টা করছে। সেটা পড়ে ফেলা যাচ্ছে সহজেই। হাতের স্পিডের তারতম্য হয়ে যাচ্ছে বলে। রণিত কেবল ডিফেন্স করে যাচ্ছে। যেমন ওর ড্যাডি বলেছিল। তুষারকে দেখে থামল রণিত। বাকি ছেলেরাও দেখছিল ওকে। বোলার তো ওকে চেনেই। লরেন্সের কোচ হিসাবে দেখেছে। সন্ত্রস্তভাবে দাঁড়াল ওরা। ওদের মধ্যে বিশালও আছে। সঞ্জয়দা ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিলেন, "ছেলেরা, ইনি তোমাদের নতুন কোচ- তুষার সান্যাল। বেঙ্গলকে কোচবিহার ট্রফিতে উনিই কোচ করবেন। সিলেকশন লিস্ট কাল টাঙ্গিয়ে দেওয়া হবে। সিলেক্টেড ছেলেরা তোমাদের কোচের সঙ্গে ট্রেনিং নিয়ে কথা বলে নেবে।" "ওকে স্যার।" ছেলেরা একসঙ্গে বলল। পরশু সকাল থেকেই ট্রেনিং শুরু। যারা সিলেক্টেড, তারা শার্প সিক্স এএম চলে আসবে,এখানে। স্পেশাল পারমিশন করানো আছে, ইন্ডোর, আউটডোর, জিম, নেট- সব পাবে।" তুষার জানাল। "সবাই সবার কিট ব্যাগ নিয়ে চলে আসবে।" "ওকে স্যার।' "রণিত চলে এসো।" তুষার ডেকে নিল ছেলেকে। "চেঞ্জ করে নাও, চলো।" রণিত ড্যাডির মুখে একটু হাসি দেখল যেন। প্যাড, গ্লাভস খুলতে খুলতে দেখল সুজনদার বাবা জেঠু আসছে। ড্যাডি তখন সঞ্জয় স্যারের সঙ্গে কথা বলছিল। "রণিত, চল্ তো বাবা।" "কোথায়, জেঠু?" সৌমেন খুব খুশি হলেন। ছেলেটার ডাক ভীষণ মিষ্টি। "তোকে সবচেয়ে বড় একটা জেঠু ডাকছেন।" "সবচেয়ে বড় জেঠু? কিন্তু ড্যাডি?" "ড্যাডিকেও ডেকে নিচ্ছি- তুষার একটু সিসোদিয়া স্যারের কাছে রণিতকে নিয়ে গেলাম। স্যার ডাকছেন।" তুষার ছেলেকে ইশারায় যেতে বলল। ছেলের খুলে যাওয়া প্যাড, গ্লাভস, রেখে যাওয়া হেলমেট, ব্যাট- কিটব্যাগে ভরতে শুরু করল। তারপর কিটব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়েছে। সঞ্জয় বললেন, "আব ইয়ে হুয়ি না বাপ কা ডিউটি, করলে বেটা। করকে দেখ।" "ভালোই লাগে সঞ্জয়দা। ইউজুয়ালি নিজে গোছাই না কখনো। ওকে ওর কিটব্যাগ নিজেকেই গোছাতে দিই। কিন্তু আজ হঠাৎ করে সৌমেনদা নিয়ে গেল। গোছাবার সময়টুকুও পেল না ছেলেটা- আমি না গোছালে হয়, তাই না?" "আরে, আচ্ছা কিয়া। বাপ হ্যায় উসকা। কিন্তু ভাই, তোর ছেলে আজ বহুত মেরেছে আমায়। আর্ম বল এক নিমেষেই পড়ে ফেলে। ফ্লাইটটাও মিস করে না কখনো। বহুত আচ্ছা।" তুষার খুশি হল। বাবু নেটে এসেও ওর সম্মানটা রেখেছে।

"তুষার, তেরে লড়কে কো চকোলেট দিয়া- মানা কর দিয়া। বোলা- না জেঠু, ড্যাডি

​ অ্যালাউ করবে না।" সিসোদিয়া স্যার হাসছিলেন আর বলছিলেন। রণিত ড্যাডির গম্ভীর মুখটা দেখে ভয়ে কাঁটা হয়ে গেল। ও কিছু ভুল করল নাকি? "আসলে ওকে এসব খেতে দিই না খুব একটা।" "ভালো করিস। অর আচ্ছি সহবত শিখায়ি হ্যায়। বাবার কথার বাইরে কিছু করতে নেই- এটা ও মানে। সে যেই দিক না কেন, ড্যাডির না মানে না। এহি বাত তেরি লেড়কে কো আগে লে জায়েগি।" সিসোদিয়া রণিতের পিঠ চাপড়ে দিলেন। তুষারও একটু হাসল। রণিত​ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ড্যাডি খুব বকত না হলে জেঠুটাকে না করার জন্য। "ওকে ডেকেছিলাম। মাথার চোটটা কেমন দেখব বলে। কমেছে অনেক।" "হ্যাঁ, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাইয়েছি।" "গুড। রণিত, তুমি তো টিমে এসে গেছ।" সিসোদিয়া রণিতের দু কাঁধে হাত রাখলেন। "এবার আমাকে কথা দাও-​ বেঙ্গলকে ট্রফি জিতিয়ে তবে আসবে।" সিসোদিয়া রণিতের মনের মধ্যেকার শিশুটাকে পড়তে পেরেছিলেন। পরখ করছিলেন তাই। তুষার দেখল ছেলে ওর দিকে তাকাচ্ছে। "ড্যাডি কি বলবে, বলবে তো তুমি।" ঘরে উপস্থিত সৌমেন, চিন্ময় হেসে ফেললেন। আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট- এসব গোছানো কথাবার্তা রণিত শেখেনি এখনো। ও নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, "ড্যাডিকে​ কখনো হারতে দেব না তো।" ঘরের সবাই উত্তরটাতে যেমন​ চমকালেন, তেমন খুশিও হলেন। তুষার শেখাল এবার, "বল আই উইল ট্রাই মাই লেভেল বেস্ট, স্যার। চিন্ময় থামিয়ে দিলেন, "এসব কেতাবি কথাবার্তা শেখাস না তুষার, ও ওর মনের কথাই তো বলেছে- আর তোর ছেলের মনটা খুব স্বচ্ছ।" "ড্যাডি কা সপুত।" সিসোদিয়া হাসলেন, "ড্যাডি কো তু হি জিতায়েগা, দেখ লেনা। আর এসব স্যার- ট্যার একদম না। সব জেঠু। মনে থাকবে তো?" রণিত বড় করে ঘাড় নাড়ল। ওর মনে থাকবে।

মনোসিজের টিমে রয়ে যাওয়ার খবরটা পেয়ে অস্বস্তি হচ্ছিল সুজনের। স্যার ওকে নিলেন? সুজন মানছে ও ভালো খেলে কিন্তু মহা অহঙ্কারী। গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। আগেরবার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সুজনকে দিয়ে জল বইয়েছে। একটা ম্যাচও খেলায়নি। এবার টিমে থাকবে, সাথে জেভিয়ার্সের বিশাল, প্রসেনজিৎ, দীপমাল্য- ভিতরে ভিতরে পলিটিক্স করার চেষ্টা করবে পুরোদমে। এদের ভালো করে চেনে সুজন। স্যার সুজনকে ক্যাপ্টেন তো করে দিলেন- কিন্তু সুজনের মাথাব্যথার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এরা। বাবাকে এটা বলতেই বলেছে স্যার সব সামলে নেবেন। তবুও সুজনের মন মানছে না। স্যারের সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনা করতেই হবে। কাল যখন স্যাররা ডিনারে আসবেন, স্যারকে বলবে এটা সুজন। মনোসিজরা কেউ ভাইকেও পছন্দ করে না। দীপমাল্য তো মারার চেষ্টাই করেছিল। এক ময়ানে দুই ধরনের তরোয়াল থাকতে পারে না। সুজনের মন বলছে সমস্যা হবে।

(৮)

"কনগ্রাচুলেশন্," কোয়েল রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেবের গলাটা পেয়ে চমকে তাকাল। স্যার ওর কেবিনে? কোন দরকার হলে নিজের কেবিনে ডেকে নেন- আজ এখানে। কোয়েল উঠে দাঁড়াল, "আসুন স্যার। বসুন।" "আরে বসতেই তো এসেছি। কোয়েল, তোমার কাছে আমাদের ব্যাঙ্কের রিজিওনাল অফিসের সবার কিন্তু একটা ছবি আছে।" "ছবি, মানে?" "মানে ছেলে এত ভালো খেলল, পেপারে ছবি এল- আর আমরা মিষ্টিমুখ অবধি করতে পারলাম না?" কোয়েল বুঝল এটা রুশার কাজ। ও-ই অফিসে ঢোকামাত্রই কোয়েলকে চেঁচিয়ে "কনগ্রাটস্ ম্যাম" বলে টলে সবাইকে জানিয়েছিল। আবার ম্যানেজার সাহেবকেও জানিয়েছে। "অফকোর্স স্যার, কেন নয়? আমি এখনই আনাচ্ছি।" কোয়েল লজ্জিত হল। "না, না- থাক। ওটা কথার কথা- আমি তো জাস্ট কনগ্রাচুলেট করতে এলাম। আমি তোমার স্ট্রাগলের কিছুটা হলেও সাক্ষী- তাই আজ আমাদের অফিসের একটা আনন্দের দিন বলতে পারো। তোমার সন্তান ভালো করেছে, এই গর্বটা আমাদেরও।" কোয়েল মৃদু হাসল। "এরপর আন্ডার সেভেনটিনে খেলবে শুনছি- ভালো। ওকে আমার নাম করে বলো যে এখানেই শেষ নয়, ওকে আরো অনেক দূর যেতে হবে। যাতে কয়েক বছরের মধ্যে আমরা বলতে পারি চোখের সামনে একজন স্টার ক্রিকেটারের মা'কে দেখেছি।" কোয়েলের চোখে জল চলে এল। এই ক'মাসে ওর জীবনটা সত্যিই ভীষণ বদলে গেছে। আগে একজন সফল প্রফেশনাল ছিল- তার জন্য সম্মান পেয়েছে। কিন্তু আজ যে সম্মান পেল, তার সঙ্গে কোনোকিছুরই তুলনা হয় না। একজন সফল মা হতে চলেছে কোয়েল- আর তা সম্ভব হয়েছে তুষারের জন্যই। ও না এলে বাবুর ট্যালেন্টটা কখনোই এভাবে প্রকাশ পেত না। কোয়েলের মন ভালোবাসায় পূর্ণ হল।​

আজ মাম্মা খুব খুশি। বাড়িতে ফিরেই রণিতকে আদর করে দিয়েছে। ওর স্কুল থেকে পাওয়া মেডেলটাকে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল বারবার। একবার তো রণিতের গলাতেও পরিয়ে দিল। ড্যাডি সব দেখে মুচকি মুচকি হাসছিল। মাম্মা আজ যেন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। খালি ড্যাডিকে বলছে, "তুমি দেখতে পেলে, তুষার- আমি তো পেলাম না।" ড্যাডি মোবাইলের ছবিগুলো বার করল। "ছবি তুলে এনেছি তোমার জন্য পিয়া, ডোন্ট ওরি।" "ফাদার বাবুকে নিয়ে কিছু বলেছেন?" "হ্যাঁ। প্রেইজ করেছেন আলাদা করে।" "সত্যি?° "সত্যি। আর সমস্ত টিচাররাও, সবাই খুব খুশি। যারা গাদা গাদা কমপ্লেন করত এতদিন- সবাই তোমার ছেলেকে খুব ভালো বলেছে। এবার খুশি তো?" রণিত মাম্মার চোখে জল দেখল। এত আনন্দের মধ্যেও মাম্মা কাঁদছে? "পিয়া, আমি জানি তো সব। তোমার একা একা এতটা পথ (৮)

"কনগ্রাচুলেশন্," কোয়েল রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেবের গলাটা পেয়ে চমকে তাকাল। স্যার ওর কেবিনে? কোন দরকার হলে নিজের কেবিনে ডেকে নেন- আজ এখানে। কোয়েল উঠে দাঁড়াল, "আসুন স্যার। বসুন।" "আরে বসতেই তো এসেছি। কোয়েল, তোমার কাছে আমাদের ব্যাঙ্কের রিজিওনাল অফিসের সবার কিন্তু একটা ছবি আছে।" "ছবি, মানে?" "মানে ছেলে এত ভালো খেলল, পেপারে ছবি এল- আর আমরা মিষ্টিমুখ অবধি করতে পারলাম না?" কোয়েল বুঝল এটা রুশার কাজ। ও-ই অফিসে ঢোকামাত্রই কোয়েলকে চেঁচিয়ে "কনগ্রাটস্ ম্যাম" বলে টলে সবাইকে জানিয়েছিল। আবার ম্যানেজার সাহেবকেও জানিয়েছে। "অফকোর্স স্যার, কেন নয়? আমি এখনই আনাচ্ছি।" কোয়েল লজ্জিত হল। "না, না- থাক। ওটা কথার কথা- আমি তো জাস্ট কনগ্রাচুলেট করতে এলাম। আমি তোমার স্ট্রাগলের কিছুটা হলেও সাক্ষী- তাই আজ আমাদের অফিসের একটা আনন্দের দিন বলতে পারো। তোমার সন্তান ভালো করেছে, এই গর্বটা আমাদেরও।" কোয়েল মৃদু হাসল। "এরপর আন্ডার সেভেনটিনে খেলবে শুনছি- ভালো। ওকে আমার নাম করে বলো যে এখানেই শেষ নয়, ওকে আরো অনেক দূর যেতে হবে। যাতে কয়েক বছরের মধ্যে আমরা বলতে পারি চোখের সামনে একজন স্টার ক্রিকেটারের মা'কে দেখেছি।" কোয়েলের চোখে জল চলে এল। এই ক'মাসে ওর জীবনটা সত্যিই ভীষণ বদলে গেছে। আগে একজন সফল প্রফেশনাল ছিল- তার জন্য সম্মান পেয়েছে। কিন্তু আজ যে সম্মান পেল, তার সঙ্গে কোনোকিছুরই তুলনা হয় না। একজন সফল মা হতে চলেছে কোয়েল- আর তা সম্ভব হয়েছে তুষারের জন্যই। ও না এলে বাবুর ট্যালেন্টটা কখনোই এভাবে প্রকাশ পেত না। কোয়েলের মন ভালোবাসায় পূর্ণ হল।​

আজ মাম্মা খুব খুশি। বাড়িতে ফিরেই রণিতকে আদর করে দিয়েছে। ওর স্কুল থেকে পাওয়া মেডেলটাকে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল বারবার। একবার তো রণিতের গলাতেও পরিয়ে দিল। ড্যাডি সব দেখে মুচকি মুচকি হাসছিল। মাম্মা আজ যেন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। খালি ড্যাডিকে বলছে, "তুমি দেখতে পেলে, তুষার- আমি তো পেলাম না।" ড্যাডি মোবাইলের ছবিগুলো বার করল। "ছবি তুলে এনেছি তোমার জন্য পিয়া, ডোন্ট ওরি।" "ফাদার বাবুকে নিয়ে কিছু বলেছেন?" "হ্যাঁ। প্রেইজ করেছেন আলাদা করে।" "সত্যি?° "সত্যি। আর সমস্ত টিচাররাও, সবাই খুব খুশি। যারা গাদা গাদা কমপ্লেন করত এতদিন- সবাই তোমার ছেলেকে খুব ভালো বলেছে। এবার খুশি তো?" রণিত মাম্মার চোখে জল দেখল। এত আনন্দের মধ্যেও মাম্মা কাঁদছে? "পিয়া, আমি জানি তো সব। তোমার একা একা এতটা পথ হাঁটার যে অসামান্য সাধনা, যে লড়াই- তারই তো ফল পেয়েছ আজ। জিতে গেছ এখানেই।" কোয়েল রণিতকে কাছে টেনে নিল। কোলে বসাল। জড়িয়ে ধরল। "জানো তুষার, কত রাত ঘুমাইনি আমি। ওভারটাইম করেছি। আর একটু স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ছেলেটাকে পড়াবার সময়টুকুর বাইরে একটুও সময় দিতে পারিনি। অর্থের চিন্তা ঘিরে রাখত। ঘোরা, ফেরা, বেড়ানো, সিনেমা, আনন্দ- কিচ্ছু হয়নি আমাদের।" "এবার থেকে হবে। হচ্ছে তো এখন, নাকি? ওসব পুরনো কথা ভুলে যাও। তোমার সব ক'টা কষ্ট, সব ক'টা আক্ষেপ আমি বুঝি। প্রতিবার খারাপ রেজাল্ট হলে তুমি ভাবতে অফিস থেকে কিছুটা সময় কেটে বাবুকে দেবে, কিন্তু কাটতে পারতে না- তাতে অর্থে টান পড়ত। প্রতিবার গার্জেন কল হলে বাড়ি ফিরে ছেলেকে বকতে, সাথে সাথে নিজেকেও। ভাবতে অন্যদের ছেলেমেয়ের মত বাবুও যদি একটা স্টেবল, নর্মাল ফ্যামিলি লাইফ পেত তাহলে তোমাকে, স্কুলের টিচারদের কাছ থেকে এত কথা শুনতে হত না। কিন্তু আজ সেই টিচাররাই তো​ তোমার ছেলেকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। পড়াশোনাতেও এখন গার্জেন কল হয় না। সব কিছু ঠিক দিকে যাচ্ছে। তাই নো মোর টিয়ার্স। তোমার বাবু তোমাকে আরো প্রাউড করবে।" তুষার কোয়েলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল। "সিলেক্টেড হয়েছে তো?" কোয়েল চোখ মুছে বলল। "হ্যাঁ, নেট করেছে মন দিয়ে। আর জানো সব্বাইকে জেঠু বানিয়ে নিয়েছে। সিসোদিয়া স্যারকেও।" কোয়েল অবাক হল, "তাই?" "জিজ্ঞাসা করে দেখ। ওর জেঠুদের তো খুব পছন্দ ডাকটা। সিসোদিয়া স্যার তো বলেই দিলেন, নো স্যার, অনলি জেঠু।" তুষার গর্বের হাসি হাসল, "ডাকগুলোও খুব মিষ্টি তো...আর মিষ্টি করে ডাকেও।" কোয়েল ছেলেকে আরো আদর করে দিল, "আমার পাগলটা।" "আমারও।" তুষার যোগ করল। রণিতের খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করছিল। আজ কেউ বকাঝকা তো করছেই না। দু'জনেই খুব খুশি। এমন খুশিই মাম্মাকে আর ড্যাডিকে দেখতে চায় রণিত, সবসময়।​
অনিকেত চ্যাটার্জী সিলেক্টেড​ ক্যান্ডিডেটের লিস্টটা দেখে খুশি হলেন। তুষার তাহলে কথা রেখেছে। নাহলে সঞ্জয়, রতনলাল- এই দু'জন কখনোই​ মনোসিজকে টিমে রাখত না। মনোসিজের স্টাডিরুমের ডেস্কটপেই লিস্টটা দেখা হল। অনিকেত ছেলের পিঠে হাত রাখলেন, "বাহ্। সিলেক্টেড হয়েছিস। এবার মন দিয়ে খেলবি।" মনোসিজ একদৃষ্টে লিস্টটা দেখছিল। যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, ও যা দেখছে। "কি হল, কি এত ভাবছিস?" "এর থেকে ড্রপড হওয়াটা সম্মানের ছিল।" আস্তে করে দৃঢ় গলায় বলল মনোসিজ। অনিকেত বুঝলেন ক্যাপ্টেন্সি যাওয়াটা মনোসিজ মানতে পারছে না। "লরেন্স জিতেছে না? তাই ওদের ক্যাপ্টেনকেই .." "ওই সুজন ব্যানার্জী, আগের সিজনটা বেঞ্চে বসেই কাটল যে- তাকে একেবারে ক্যাপ্টেন করে দেওয়া হল? গ্রেট।" "কামডাউন। এমনটা হতেই পারে..." অনিকেত সান্ত্বনা দিলেন। "না বাবা, হতে পারে না। আমি মনোসিজ চ্যাটার্জী- এই সিজনেও জেভিয়ার্সের হয়ে, ভবানীপুরের হয়ে, কাঁড়ি কাঁড়ি রান করেছি। টিমকে ফাইনালে তুলেছি- এভাবে আমার থেকে ক্যাপ্টেন্সি কেড়ে নিতে পারে না।" "আচ্ছা, এই সিজনটা অ্যাজ আ প্লেয়ার খেল। মে বি নেক্সট ইয়ার তুই আবার ক্যাপ্টেন হলি।" অনিকেত ছেলেকে চেনেন। এমনিতে খুব চুপচাপ ছেলে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তেমনি একগুঁয়ে আর জেদি। রেগে গেলে মাথা আর ঠিক থাকে না। বিহেভিয়ার ট্যান্ট্র্যামস আছে। যা ভাববে, তাই করবে। মা মরা ছেলে- অনিকেত বেশি বকাঝকাও করতে পারে না। "আমাকে ড্রপ করে দিত ওরা, না?"​ অনিকেত ছেলের চোখে রাগ দেখলেন। ভীষণ রাগ। "না, ড্রপ কেন? দু'জন সিলেক্টর করতে চেয়েছিল, কিন্তু কোচই তো তোকে চেয়েছেন।" "তুষার​ স্যানাল? সে তো সুজনের গডফাদার। আমাকে চাইবে কেন?" "এভাবে বলছিস কেন? তুষার আমার খুব কাছের। ভাইয়ের মত। ওকে আমি কেরিয়ারের শুরুতে হেল্প করেছিলাম। খুব সম্মান আর শ্রদ্ধা করে আমায়।" "ওহ। তার মানে তুমি বলেছ ওনাকে আর হি পেইড ব্যাক। হোয়াই বাবা? কারোর দয়ায় কেন সিলেক্টেড হব আমি? এটা কতটা লজ্জার তুমি বোঝ? ওই ছেলেটার আন্ডারে খেলার চেয়ে ড্রপড হয়ে যাওয়া ভালো, অনেক ভালো।" অনিকেত এবার রেগে গেলেন, "তোমার ভালোর জন্যই এটা করা হয়েছে।" "ভালো, মাই ফুট। এখন প্লিজ যাও তো এখান থেকে। আমাকে একা থাকতে দাও।" অনিকেত আর ঘাঁটালেন না। উঠে পড়লেন। ছেলেকে খুব ভালো করেই চেনেন অনিকেত। ও এখানেই থেমে থাকবে না। ঝামেলা পাকাবে। তুষারকে রিকোয়েস্ট করে টিমে নিইয়েছেন অনিকেত। মনোসিজের জন্য কোন ঝামেলা হলে তুষারকে মুখ দেখাবেন কি করে? নিজে যে মুম্বাই যাবেন, তার জো কোথায়? বাড়িতে মেয়েটা একা থাকবে। ছোট্ট মেয়ে অনিকেতের। পিউ ওর নাম। বছর এগারো বয়স। একেবারে মায়ের মত হয়েছে মেয়েটা। অনিকেতের ওকে দেখলেই ওর মায়ের কথা মনে পড়ে। পিউ তাই অনিকেতের প্রাণ। মনোসিজ বড় হয়েছে। বাবা বোনকে বেশি ভালবাসে সেটাও বোঝে। কিন্তু মানতে পারে না। ঐটুকু বোনকেও হিংসা সবসময়। ছুতোয় নাতায় দোষ ধরা, বকাঝকা- এবার ক্লাস ইলেভেন মনোসিজের। ষোলো প্লাস। কলেজে উঠলে ওকে বাইরে পড়তে পাঠাবেন অনিকেত। বাড়িতে ওকে নিয়ে ওর ঠাম্মা, দাদু, পিসি, পিসেমশাই- সবাই জেরবার। যদিও বাড়ির একটামাত্র ছেলে। প্রথম সন্তান বলে শুরু থেকে ওনারাই প্রশয় দিয়েছেন বলে আজ এই অবস্থা। মোহর মানে মনোসিজের মা যতদিন ছিল- ততদিন তাও বশে ছিল। এখন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দিনে দিনে। সব মিলিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন অনিকেত।

সুজনদাদের বাড়িতে গিয়ে খুব মজা হয়েছিল। ড্যাডি মাম্মাকে বলবেই। মাম্মা যাবে বলে দিয়েছিল। এখন মাম্মা সোশ্যালাইজড, পার্টি, সেরিমনি অ্যাটেন্ড করে। আগের মত অ্যাভয়েড করে না। সবাই ভালো ওখানে। জেঠু, জেঠিমা, ঠাম্মা, দাদু- সবাই খুব খুশি হয়েছিল রণিতকে দেখে। সবচেয়ে খুশি হয়েছিল সুজনদা। রণিতকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। আলাদা ঘর সুজনদার। সারা দেওয়ালে ক্রিকেটারদের পোস্টারে ভর্তি, স্টাডি টেবিল, পাশে কম্পিউটার টেবিল, ওয়ার্ডরোব- আর খেলার সরঞ্জাম ঠাসা। রণিতকে একটা গিফ্ট দিয়েছে সুজনদা। একটা ফটো ফ্রেম, তাতে 'টু ওয়ার্ল্ডস বেস্ট ব্রাদার' লেখা। আর্চিস থেকে কিনেছে বলল। জেঠিমা গিফ্টটা দেখে মাম্মাকে বলল, "জানো কোয়েল, বাপিনের খুব ভাইবোনের শখ ছিল, এবার মিটল তাহলে।" সুজনদা শুনে খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল, " ভাইকে আমি শুধু ভাই-ই বলি।" বাট ভাই আমাকে সুজনদার বাইরে বলল কোথায়?" সুজনদার মনে হয় শুধু 'দাদা' শোনার ইচ্ছা। কিন্তু ওখানে তো সবাই থাকে। রোহনদা, যুধাজিৎদা- সুজনদাকে দাদা বললে রাগ করবে ওরা। কিন্তু না বললে সুজনদাও কষ্ট পাবে। মাঝামাঝি রাস্তা দেখতে হবে একটা। রণিত দেখবে সেটা। মাম্মা সুজনদাকে বলেছে, "ভাইকে বলে দেখো, ঠিক বলবে।" তার মানে মাম্মাও চায়। ড্যাডিকে সৌমেন জেঠু কিসব বলছিল নীচের ড্রয়িং রুমে বসে। ড্যাডি মন দিয়ে শুনছিল। সুজনদা ওকে নিয়ে গেল ওখানে। "স্যার, একটা কথা বলব?" সুজনদা ড্যাডিকে বলল। "হ্যাঁ, বলো।" "মনোসিজ চ্যাটার্জীকে না রাখলে হত না?" জেঠু সুজনদার দিকে কড়া চোখে তাকালেন। "বাপিন, এটা আবার কেমন প্রশ্ন? সিলেক্টররা যা ভালো বুঝেছেন, করেছেন।" "সৌমেনদা, সুজনকে বলতে দাও। ও ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন শুড বি ক্লিয়ার ইন হিজ মাইন্ড​
অ্যাবাউট দ্যা টিম সিলেকশন। ও কমফর্টেবল না হলে খেলাবে কি করে? সুজন, মনোসিজ ভালো খেলে, এটাই ওর সিলেকশানের কারণ। আমি শুনেছি ওর কিছু বিহেভিয়ার প্রবলেম আছে। ওটা তুমি তোমার স্যারের ওপর ছেড়ে দাও। আমি সেসব রোগের চিকিৎসা ভালোমতই জানি।" "বাট স্যার, মনোসিজ ভয়ানক ইগোইস্ট। জেভিয়ার্সের ছেলেরা ওর কথাই শুনবে। টিমে গ্রুপিজম থেকে পলিটিক্স- সবই চলে আসবে, যেটা টিমের জন্য আনহেলদি।" "ওরা সবাই টিমে নিজের জায়গাটাকে মনসিজের থেকে বেশি ভালোবাসে নিশ্চয়। দেখাই যাক না- কি হয়। তুমি তোমার ক্যাপ্টেন হবার ধর্ম পালন করবে- ব্যাস।" সুজনদা ড্যাডির কথা শুনে চুপ করে গেল, কিন্তু খুশি হল না।

কোয়েল তুষারকে চুপচাপ দেখে একটু থমকাল। কি এত ভাবছে ও? ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে, কোয়েল দেখে এসেছে। নিজেও তো শুয়ে পড়ে। বদলে সোফায় বসে বসে কিছু ভাবছে। কোয়েল বসার ঘরে এসে ডাকল তুষারকে, "কি গো, শোবে না?" তুষারের চটক ভাঙ্গল যেন। "হুঁ, শোব। চলো।" কোয়েল তুষারের পাশে বসল, "কি এত ভাবছ, বলো তো?" "তেমন কিছু না।" "লুকাবে?" তুষার হাসল, "তোমাকে কিছু লুকাই? জানো কোয়েল, লাইফ ইজ ভেরি ড্রামাটিক। এর কোন বাঁকে যে কোন গল্পটা লুকিয়ে লুকিয়ে আছে, তুমি আগে থেকে বুঝতেই পারবে না।" "হঠাৎ এটা মনে হল?" "হঠাৎ না। ক'দিন ধরেই মনে হচ্ছে। আজ সৌমেনদার বাড়িতে গিয়ে আরো বেশি করে মনে হল।" "তোমাকে ফলস্ অ্যালিগেশনে জড়াবার পিছনে ওনার হাতও তো ছিল, নাকি?" "প্রমাণ তো হয়নি। তবে আন্দাজ করা যায়। সৃঞ্জয়ের হাত তো ডেফিনিটলি ছিল। সৌমেনদাও সৃঞ্জয়কে বেঙ্গল ক্যাপ্টেন দেখতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তখন সিএবিতে পয়সাকড়ির অন্যায্য লেনদেনের একটা পাপচক্র চলছিল। সৌমেনদা সেটাতেও যুক্ত ছিলেন। এমন-ই সবাই বলে।" "তাহলে, ওনার সাথে এতটা ঘনিষ্ঠতা কি উচিৎ হচ্ছে?" কোয়েলের গলায় চিন্তা ধরা পড়ে। "না করে উপায়ও নেই। এই ঘনিষ্ঠতার মূল কারণ দুটো। একটা তো সুজন। ওকে আমি স্নেহ করি। আর বাবুকে ও কতটা ভালো বাসে দেখেইছ। আর একটা কারণ হল বাবুর ফিউচার। আমি কারোর সাথে পুরনো তিক্ততা, অসন্তোষ জিইয়ে রাখতে চাই না। এর সরাসরি প্রভাব রণিতের কেরিয়ারে পড়বে তাহলে।" "তাও ঘনিষ্ঠতা একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় বজায় রাখতে হবে। চোখ কানও খোলা রাখতে হবে।" তুষার হাসল, "হ্যাঁ সেটা নিয়েই ভাবছি। জীবনের ওঠা, নামা দুটোই দেখেছি আমি। জীবনটা আসলে একটা পূর্ণবৃত্ত। সৌমেনদার শত্রুতাও পেয়েছি, আবার এখন সৌমেনদার কাছ থেকে উষ্ণতাও পাচ্ছি। তবে উষ্ণতাও সতর্কভাৱে গ্রহণ করতে হবে। আমার চিন্তা আসলে সৌমেনদাকে নিয়ে না, পিয়া- মনোসিজের টিমে ইনক্লুশনটা সুজন মেনে নিতে পারছে না। এর জন্য টিমের পারফরম্যান্সে যেন কোন প্রভাব না পড়ে।" "মনোসিজের বাবা অনিকেতদা তোমার তো খুব ক্লোজ ছিলেন একসময়।" তুষার হাসল, "ঠিক বলেছ। অনিকেতদা পথপ্রদর্শক ছিলেন আমার। অনিকেতদা, মোহর বৌদি- কলেজে পড়ার সময় তুমিও চিনতে ওদের। কিন্তু মনোসিজ সেজন্য চান্স পায়নি। পেয়েছে নিজের যোগ্যতায়। অথচ আমি জানি, অনেকের থেকে শুনেওছি, ছেলেটি আদপে ভালো নয়। অন্যদিকে দেখ, সুজন। ওর বাবার সাথে একসময় তিক্ততা থাকলেও ছেলেটি তো চমৎকার, তাই না?" কোয়েল ঘাড় নাড়ল, "হ্যাঁ। খুব সোবার। বাবুকে নিজের ভাইয়ের মতই দেখে।" "লিডারশিপ মেটেরিয়াল।" "তুষার, ওকে তো তুমিই পথে এনেছ, ওর অ্যাটিচিউড প্রবলেমগুলো শুধরেছ, তাই না? তাহলে মনোসিজের বেলায় এত ভাবছ কেন?" তুষার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল, "সেটাও ঠিক। হয়তো ওকেও শুধরাতে সময় লাগবে না আমার। আসলে এই টুর্নামেন্টটা আমাদের কাছে খুব ভাইটাল। বেঙ্গল জিতলে বাবুর কেরিয়ারের জন্য খুব ভালো হবে, আর তুমি তো জানোই বাবুর ব্যাপারে আমি কোন চান্স নিতে চাই না- ক্রিকেট তো টিম গেম, তাই ভয় হয় টিমের ইনার কনফ্লিক্টের জন্য বাবুর খেলার উপর প্রভাব না পড়ে।" "এত না ভেবে, দেখোই না কি হয়। এবার শোবে চলো- সকালে প্র্যাকটিসে যাবে তো?" তুষার কোয়েলের সঙ্গে সম্মত হল, ভেবে উপকার হবে না। কাল প্র্যাকটিসে গিয়েই একটা আঁচ পাওয়া যাবে, কি হতে চলেছে।

তুষার প্র্যাকটিসে নেটে ব্যাটিং অর্ডার ঠিক করতে গিয়েই মনোসিজের উষ্মা টের পেল। বিশালকে সুজন আর রণিতের পরে তিনে দেওয়া ওর পছন্দ নয়। হাবেভাবে প্রকাশ করল সেটাই। তুষার দেখেও দেখল না। কিন্তু রোহনকে চার নম্বরে প্রেফারেন্স দিতেই মনোসিজের চোখ মুখ বদলে গেল। রাগ হচ্ছিল ওর। ভীষণ রাগ। আর রাগের মাথায় নেট করতে নেমে অরিত্রর বলে বার দুয়েক খোঁচা দিয়ে বসল। "মনোসিজ! কনসেনট্রেট।" নেটের পাশে দাঁড়িয়ে বলল তুষার। মনোসিজ হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাজ করল। ব্যাটটা আছড়ে নিজে নেট থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যোগী হল। তুষার বুঝল জল মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। "মনোসিজ! স্টপ। ডোন্ট ইভেন ডেয়ার টু লিভ দ্যা নেট।" তুষারের গলার স্বরে কেঁপে উঠল সবাই। মনোসিজও থমকে গেল। পাশের নেটে যুধাজিৎ ব্যাট করছিল। ও হাতের ইশারায় প্রসেনজিৎকে দাঁড়াতে বলল। পজ মোডে চলে গেল সবাই। "গো ব্যাক টু ইওর স্টান্স।" মনোসিজের কান লাল হয়ে উঠেছিল, "স্যার, আই ওয়ান্ট টু লিভ।" "ডু অ্যাজ ইউ আর ডাইরেক্টেড। ব্যাটটা তোলো, নেটটা কমপ্লিট করো।" তুষারের গলায় এমন কিছু ছিল যা মনোসিজকে বাধ্য করল ব্যাটটা তুলে স্টান্স নিতে। "বেটার। সবাই থমকে গেলে কেন? কন্টিনিউ।" তুষার আড়চোখে দেখল সুজন রণিতদের ক্যাচিং প্র্যাকটিস দেওয়া থামিয়ে বিরক্ত চোখে ব্যাপারটা দেখছে। "সুজন- কন্টিনিউ।" সুজন স্যারের কথায় লজ্জিত হল। আবার ক্যাচিং প্র্যাকটিস দেওয়া শুরু করল ও। মনোসিজের নেট শেষ হলেই তুষার বলল, "মনোসিজ- এদিকে এস।" মনোসিজের ততক্ষণে রাগ কমেছে। তার বদলে ভয় হচ্ছে। এই লোকটা খুবই স্ট্রিক্ট মনে হচ্ছে ওর। ব্যাটটা ছুঁড়ে ঠিক করেনি। মনোজ স্যার হলে ওকে নেট থেকে বেরোতে আটকাতে পারত না। তুষার সান্যালের গলায় এমন কিছু আছে যে বাধ্য না হয়ে উপায় নেই। "ডিসিপ্লিনের পাঠটা এবার শিখতে হবে তোমাকে। আমার নেটে কোনরকম ইনডিসিপ্লিন আমি বরদাস্ত করি না। তোমার টিমের অনেকেই সেটা জানে। আজ যেটা করেছ, করেছ। রিপিট করার সাহস যেন না হয়।" সুজন ইশারায় রণিতকে দেখাল মনোসিজ বকুনি খাচ্ছে। চাপা গলায় বলল, "ভাই, দশপাক না কুড়িপাক, বল্ তো?" "ড্যাডি খুব রেগে গেছে মনে হচ্ছে। কুড়ি-ই।" রোহন সুজনের কাছাকাছি চলে এসেছিল। ও বলে উঠল, "স্যারকে তো চেনে না বাছাধন। এবার মজা বোঝ।" মনোসিজ তুষারের চোখে চোখ রাখতে পারছিল না। কতই বা বয়স লোকটার। বাবার থেকে অনেক কম। অথচ কি পার্সোনালিটি। 'সরি'- বলতে চেয়েও ইগোতে বাঁধছে মনোসিজের। ও কি রোহনের চেয়ে খারাপ। তাহলে​ রোহনের পরে কেন নেট করবে? "মাঠটা কুড়ি পাক দাও। এখনি।" তুষার অর্ডার করল। মনোসিজ থমকে গেল। পানিশমেন্ট? লোকটা ওকে পানিশ করছে! "আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই। যত দেরি করবে- তোমারই ক্ষতি।" মনোসিজের রাগটা আবার বেড়ে গেল। ওকে কেউ কোনোদিন পানিশ করেনি। মা চলে যাবার পর তো বকেই না কেউ। আজ হঠাৎ এভাবে সবার সামনে... "আই কান্ট। ড্রপ মি। বাবাকে বলে দেব যে খেলব না আমি।" তুষার হাসল, "তোমার বাবাকে বলা আছে আমার। তোমাকে ডিসিপ্লিন করার দায়িত্বটা আমাকেই দিয়েছেন। সো ডোন্ট ওয়েস্ট ইওর টাইম।" মনোসিজ বুঝল আর কিছু করার নেই। প্র্যাকটিস ছেড়ে বেরিয়ে গেলে - বাবা ভীষণ রাগ করবে। নিমতেতো মুখ করে মাঠটা পাক দিতে শুরু করল ও। চোখ ফেটে জল আসছিল। তাও পাক দিতে থাকল। এর বদলা ও নেবে- নেবেই।

তুষার অনিকেতদার ফোন একসপেক্ট করেছিল। মনোসিজ শাস্তি পেয়ে বাড়ি গিয়ে অনিকেতদাকে সব বলবে, আর অনিকেতদা ফোন করবে, এটা জানাই ছিল। কিন্তু ভীষণ অবাক হল অনিকতদাকে ফ্ল্যাটের দরজায় দেখে। নেট থেকে ফিরে রণিতকে স্কুলের জন্য রেডি করিয়ে স্কুলে নিয়ে গিয়ে স্কুলের প্র্যাকটিস সেশন শেষ করে সবে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি​ ফিরেছিল তুষার। ওর মাম্মা ওদের নেট থেকে ফেরার আগেই অফিসে চলে গেছে, ফিরতে এখনো ঘন্টাখানেক লাগবে। ছেলের সবটুকু একা হাতেই করতে হয় তুষারকে, আর ওর সেটা ভালোও লাগে। বিকালের টিফিনটা করে রেখেছিল শম্পা- ছেলেকে খাইয়ে নিয়ে পড়তে বসাবে- এমন সময় কলিংবেল বাজতে দরজা খুলে দেখে অনিকেতদা। অবাক ভাবটা বুঝতে না দিয়ে হাসিমুখেই বলল, "এসো।" "সরি, তোকে না জানিয়ে এলাম..." "না, না, ভাইয়ের বাড়ি আসবে তাতে এত কিন্তু কিন্তু কেন? আরে, এনাকে তো আমি দেখিইনি অনিকেতদা, মেয়ে তোমার? ভারী মিষ্টি তো।" পিউ বাবার পিছনে দাঁড়িয়েছিল। অবাক হয়ে আঙ্কেলটাকে দেখছিল। তুষার আঙ্কেল। বাবা বলছিল, খুব বড় ক্রিকেটার। বাবার থেকেও ভালো। দাদাদের কোচ নাকি। এনার সাথেই মিসবিহেভ করেছে দাদা। তাই সরি বলতে হবে ওনাকে। দাদা নেট থেকে এসেই রেগে আগুন হয়ে আছে। ঘর থেকে বেরোচ্ছেই না। ভাঙচুর করেছে কত কিছু। ঠাম্মা, দাদান, পিসি- কেউ থামাতে পারেনি। দাদাকে নাকি পানিশ করেছে এই আঙ্কলটা। দাদাকে কেউ পানিশ করতে পারে না। বাবাও না। মা থাকলে নাকি মা করত। দাদাকে প্যাম্পারিং এদিকে পিউকে সবাই বকে। দাদা তো সবসময় বকে। বাবা কেবল একটুও বকে না কখনো। কেউ বকলে তাকে বকে দেয়। দাদাকেও বকে। কিন্তু দাদা শোনে না। দাদা বোঝেই না। মা না থাকার জন্যই বাবা কত কষ্ট পায়। বাবার সাথে রুড বিহেভ করেই যায়। বাবা পিউকে বলে মা থাকলে এসব নাকি কিচ্ছু হত না। পিউ বোঝে না মা থাকলে কি হত? কিন্তু মা থাকলে বাবা এত কষ্ট পেত না। বাবা শুধু বলে পিউ নাকি মায়ের মত। পিউকে দেখলেই বাবার মায়ের কথা মনে পড়ে। তাই তো বাবা পিউকে সবার থেকে বেশি ভালোবাসে। "তুই তো কিছুই জানিস না তুষার। মাঝের ক'টা বছর যে কেন আসতে পারিনি.." ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন অনিকেত। তুষার পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করল, "ওসব কথা বাদ দাও। কে-ই বা বিতর্কে জড়াতে চায়? এসো ড্রয়িংরুমে এসো। বাবু, পুরো খাবারটা কমপ্লিট করে উঠবি।" রণিত ডাইনিং টেবিলে বসেছিল। ভারী অবাক হচ্ছিল ও। এরা কারা?​ ড্যাডির চেনা আঙ্কেলটা? সঙ্গের মেয়েটা রণিতকে দেখছিল। ওরই বয়সী হবে। ভারী সুন্দর দেখতে। সুন্দর ফ্রক পরেছে একটা। গোলাপী রং-এর। রণিতকে আড়চোখে দেখছে। বারবার। "বাদ না রে তুষার।" অনিকেত দাঁড়িয়ে গেলেন। "তুই আমাকে ভুল বুঝিস, জানি। কিন্তু তোকে নিয়ে যখন ওই ডামাডোলটা হচ্ছে- তখনই মোহর, মানে তোর বৌদিকে নিয়ে আমার পাগল পাগল অবস্থা- লিভার সিরোসিসটা ধরা পড়ল তখনই, মেয়েটা বছর তিনেকের.." তুষার ভীষণ অবাক হল, "সিরোসিস! তারপর? এখন কেমন আছে বৌদি? ট্রান্সপ্লান্ট করাতে হয়েছে নাকি, লিভার?" অনিকেত আড়চোখে পিউয়ের দিকে তাকালেন। মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গেছে। "নাহ, মারা গেছে। সাড়ে আট বছর হয়ে গেছে। ছয় মাস বেঁচে ছিল" "কি বলছ! বৌদি.. বৌদি আর নেই? আমি ভাবতেই পারছি না অনিকেতদা। বৌদির মত মানুষকে এত তাড়াতাড়ি.." "ভালোরাই তো চলে যায়, তুষার। তোর মনে আছে, তোকে কত স্নেহ করত, কত খোঁজ খবর করত তোর.." "থাকবে না! লাঞ্চ প্যাক করে দিত কতদিন- আমার মায়ের বয়স হয়েছে ভেবে .. তুমি ঐজন্যই অনিকেতদা.."​ অনিকেত হাসলেন, "হ্যাঁ রে ভাই, ঐজন্যই, তুই আমাকে ভুল বুঝেছিস, জানি। সেদিন ফোনেও বললি। তাও ভুলটা ভাঙ্গাইনি। আজ ভাঙ্গালাম তোর কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে চাই না আর।" তুষার ভীষণ অপরাধবোধের মধ্যে পড়ল। না জেনেশুনেই অনিকেতদাকে ঐ কথাটা বলে দিয়েছে সেদিন। মোহর বৌদি নেই এটা কেউ ওকে বলেওনি? স্ট্রেঞ্জড! " অ্যাম সরি দাদা। অ্যাম রিয়েলি সরি।" অনিকেত হাসলেন, "ছাড় না ভাই, সত্যিটা তো জানলিই আজ। সব কিছু ভুলে যা প্লিজ। আমারও উচিৎ ছিল তোর পাশে থাকা। কিন্তু ব্যক্তিগত সমস্যায় এত ডুবে গিয়েছিলাম... বাদ দে। তুই তো আমার পিউ মা'কে দেখিসইনি, না? তুষার পিউকে ভালো করে দেখল। দেখলেই বৌদির কথা মনে পড়ে। বৌদির মুখ বসানো।"না তো। এই দেখলাম মামণিকে। বৌদির মত হয়েছে একদম।" অনিকেতের চোখে আলো জ্বলে উঠল, "তুইও বলছিস? আমারও তাই মনে হয়। পিউ মা'কে আমার মনের মত করে বড় করতে পারছি রে তুষার। মোহর যেমন চাইত তেমন করে ভদ্র, নম্র, সভ্য, পড়াশুনায় টপার- ছেলেটাকে তো পারলাম না। ওর মা চলে যেতেই বখে গেল। "তুষার বুঝল অনিকেতদা আজ সকালের প্রসঙ্গ আনতে চাইছে। বাচ্চাদের সামনে এই কথা না হওয়াই শ্রেয়। "বাবু। .." রণিত খেয়ে উঠে হাত ধুচ্ছিল বেসিনে। "ইয়েস, ড্যাডি।" "এদিকে আয়।" রণিত এল। "ইনি অনিকেত আঙ্কেল, গল্প বলেছিলাম, না?" "তোমার মেন্টর তো জেঠুটা। তাই না ড্যাডি?" অনিকেত অবাক হলেন, "ড্যাডি এটা বলেছে তোমাকে, রণিত?" "তুমি আমার নাম জানলে কি করে জেঠু?" অনিকেত হেসে ফেললেন এবার, "তোমাকে তো সবাই চেনে এখন। পেপারে দেখেছি তোমার ছবি। আর ফাইনাল দেখতেও গিয়েছিলাম তো।" "ওহ। তুমি ড্যাডিকে বকেছিলে তো। রিভার্স সুইপ করার জন্য?" অনিকেত ঘাড় নাড়লেন, "খুব বকেছিলাম। রঞ্জিতে নাইন্টি নাইনে কেউ রিভার্স সুইপ করে? হান্ড্রেডটা ফেলে এসেছিল মাঠে।" "বাট ইনস্টিংকটটা ফলো করতে হয় তো জেঠু- ড্যাডি তো ওভাবেই খেলত..." অনিকেত রণিতের মাথায় হাত রাখলেন, "একদম। ঐজন্যই তো ও তুষার সান্যাল। রিস্ক নিতে পারত যে। রণিতও একদম ড্যাডির মত খেলে, দেখেছি তো আমি।" "বাবু, জেঠুকে নমো করেছ?" রণিতের প্রশ্নের তোড় সামলাতে বলল তুষার। রণিত তৎক্ষণাৎ নমস্কার করল, "থাক্, থাক্।" "থাকবে কেন? তোমাকে কি বলে ডাকব, মেন্টর জেঠু না মনোসিজদার বাবা জেঠু?" এবার তুষার হেসে ফেলল, "আসলে অনিকেতদা, পুরো সিএবি ওর জেঠুতে ভর্তি। সৌমেনদা, সঞ্জয়দা, সিসোদিয়া স্যার.." "বুঝেছি। ঐজন্যই আলাদা নামকরণ দরকার। তোর যা খুশি ডাকিস। পিউ মা, চিনতে পারছ তো? তুষার, রণিতের কোন ক্লাস রে?" "সেভেনে উঠল।" "পিউ-ও। তাহলে তো বন্ধুই দু'জনে। পিউ রণিতের খেলা দেখে স্পেলবাউন্ড হয়ে গিয়েছিল সেদিন। ক্রিকেটটা ও বেশ বোঝে। তোদের বাড়ি আসব শুনে চলে এল তাই। তুষার আঙ্কলকে দেখবে বলে, আর তার থেকেও বেশি ওই ছেলেটাকে দেখবে বলে যে কিনা ওর ফেভারিট এবিডির মতো খেলে।" "হা হা হা! এবিডি! অনেক বড় কমপ্লিমেন্ট তো পিউ মামণি।" তুষার হেসে ফেলল। "মিঃ থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি।" পিউ বলল, "হি অলসো প্লেইড থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি, আঙ্কেল।" রণিতকে দেখিয়ে বলল পিউ। রণিতের লজ্জা লজ্জা করছিল। ওকে তো কতজনই প্রেইজ করে। লজ্জা করে না। এখন করছে কেন? "তাহলে ভালো করে আলাপ করে নে, বাবু- তোর স্টাডিতে নিয়ে যা মামণিকে। কথা বল দু'জনে। আমরা এ ঘরে কথা বলি।" পিউ খুব খুশি হল। ফাইনালটা দেখার পর থেকেই​ ওর সারাক্ষণই মনে হচ্ছিল, কি করে রণিতকে একবার মিট করা যায়। বাবা যখন এখানে আসবে শুনল, তখন আসার আবদার করেছিল তাই। বাবা তো ওর কোন আবদার ফেলে না, নিয়ে এসেছে তাই। যে ছেলেটা এবিডির মতো খেলে তাকে তো মিট করতেই হবে। ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সঞ্জনাকে কথাটা বলতেই ও ভারী অবাক হয়েছিল। এবিডির মতো কেউ হয় নাকি? কিন্তু পিউ জানে, হয়। ও দেখেছে। হেলমেটে ঐরকম লেগে যখন পড়ে গেল- তখন পিউ খুব করে চেয়েছিল যেন উঠে পড়ে। দাদারা হেরে যাবে, জেনেও চেয়েছিল। না উঠলে খুব কষ্ট পেত পিউ। এবিডি এমন করে হারতে পারে না। আজ এখানে এসে ভেবেছিল দেখা হবে। বাট আঙ্কল যে এভাবে একা কথা বলতে দেবে- ভাবতেও পারেনি পিউ। কো-এড স্কুল ওদের। ও ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। দেখতেও ভারী সুন্দর। অনেক ছেলের প্রোপোজাল পেয়েছে এর মধ্যেই। কাউকেই ওর পছন্দ হয়নি। কিন্তু কারোর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন নার্ভাস মনে হয়নি। এই এবিডি ছেলেটার সঙ্গে একা কথা বলতে হবে ভেবে নার্ভাস মনে হচ্ছে কেন? ছেলেটাকে মাঠে দেখে মনে হয় খুব সিরিয়াস। একটুও কথা বলে না। অথচ এখানে এসে মনে হচ্ছে- একদম অন্যরকম। কত্ত ভালো কথা বলে। পিউ তো খুব কম কথা বলে। এবিডি-র ওকে ভালো লাগবে তো? বন্ধু হবে তো ওর? ওরকম গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? আঙ্কল তো যেতে বলল। আনস্মার্ট নাকি? কিন্তু এবিডি কি করে আনস্মার্ট হয়? "চলো.." না থাকতে পেরে বলল পিউ। রণিতের কেমন কেমন লাগছিল। মেয়েদের সঙ্গে এভাবে একা কোনদিন কথা বলেনি ও। স্কুলেও কোন মেয়ে নেই। ছোটবেলা থেকে বাড়িতেই থাকত। পাড়ায় খেলেনি। মেয়েটা তো এত সুন্দর। ক্লাসে টপ করে। ওর সঙ্গে কথা বললেই তো বুঝে যাবে ও পড়াশোনায় ভালো না। বোকা ভাববে তখন। এবিডি ভাববে না আর। বাট ও তো সেহবাগ। না, না- তুষার সান্যাল। না ভাবুক এবিডি। তাতে কি যায় আসে? "চলো।" আস্তে করে মেয়েটাকে বলল রণিত।

"মনোসিজের ব্যবহারের জন্য আমি সরি বলতে এসেছি, তুষার।" অনিকেত মাথা নীচু করে বললেন, "আমার ছেলে হয়ে কি করে ও নেটে ব্যাট ছুঁড়ে টুড়ে.. ছি!.. আমি ভাবতেও পারছি না।" তুষার অনিকেতদার নুয়ে পড়া মাথাটা দেখল। সন্তান বিপথে গেলে বাবার মাথা মনে হয় এভাবেই হেঁট হয়ে যায়। "তুমি সরি বলছ কেন? দোষটা ও করেছে, পানিশমেন্টও পেয়েছে।" "বেশ করেছিস শাসন করেছিস।" অনিকেত তুষারের হাত চেপে ধরলেন। "আমার ছেলেটাকে একটু শুধরে দিবি ভাই? আমি চাইলেও শাসন করতে পারি না যে। মা- মরা ছেলে। মায়া হয় বড্ড। মোহর থাকলে ওকে এভাবে নষ্ট হয়ে যেতে দিত না। কড়া শাসন ছিল ওর। এদিকে বাড়িতে আমার মা, বাবা, দিদি, জামাইবাবু সবার কাছেই মনোসিজ হল বংশের বাতি। অবাধ প্রশ্রয় পায় তাই।​ মোহর ব্যালেন্স করতে পারত ব্যাপারটা। আমি পারি না।" বড় অসহায় লাগল অনিকেতের গলা। "এত ভেবো না। ওর কিছু বিহেভিয়ার্স প্রবলেম আছে, শুধরে যাবে।" "শুধরাচ্ছে কই? আজ শাস্তি পেয়ে বাড়ি ফিরেও সেই ভাঙচুর, রাগ দেখানো- আর পারছি না রে। সত্যি রেগে গেলে হুঁশ থাকে না ওর।" "এভাবে হাল ছাড়লে হবে অনিকেতদা? মনোসিজ ভালো খেলে। ওর খেলাটা যাতে নষ্ট না হয়, সেটা আমাদের দেখতে হবে।" "তুই দায়িত্ব নিবি তাহলে?" তুষার ঘাড় নাড়ল, "নেব। কোচের কাজই তো এটা। ও যেন কালকে নেটে আসে।" "সেটা পাঠাবই। এমন বোকামো করে​ নাকি কেউ? ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যাবে তো।" "তুমি ওর বন্ধু হয়ে দেখবে অনিকেতদা?" তুষার হঠাৎ করেই বলল। "বন্ধু?" "হ্যাঁ। আমিও তো বাবুর বেস্ট ফ্রেন্ড। সব মনের কথা ও আমাকেই বলে। আমার মনে হয় মনোসিজের মনেও অনেক কথা জমা আছে। যেটা ও কাউকে বলতে পারে না। আর না পেরেই রাগ দেখায়, রুড হয়। ওর সাথে দূরত্ব রেখো না। সময় দাও। গল্প করো, দেখবে ও অনেক ভালো থাকবে।" অনিকেত চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন, "বলছিস?" "করেই দেখো। ফল পাবে," অনিকেত রাজি হলেন। মনোসিজকে পথে আনতে গেলে যা যা করতে হয়, উনি করবেন।

"তোমার ব্যথা কমেছে?" রণিত পিউয়ের কথাটা শুনে বুঝল সেদিনের বল লাগার ব্যথার কথা বলছে মেয়েটা। "হ্যাঁ।" "খুব লেগেছিল, না?" "হ্যাঁ। বাট ড্যাডি আদর করতে​ কমে গেছে।" পিউ হেসে ফেলল। "তুমি বাচ্চা ছেলে নাকি যে ড্যাডি আদর করে?" "কেন তোমার ড্যাডি করে না?" "করে, বাট আমি তো মেয়ে। ছেলেদের করে নাকি?" "কেন করবে না?" রণিত ভারী অবাক হল, "মাম্মা, ড্যাডি দুজনেই আদর করে আমায়।"​ পিউ চুপ করে গেল। এই প্রসঙ্গটা ও চায় না। সবার মা সবাইকে কত ভালবাসে। কিন্তু ওর মা-ই চলে গেছে সেই কোথায়। "তুমি তোমার মাম্মার কথা ভাবছ?" পিউ চমকে ওঠে। ও ভাবছিল। কিন্তু ছেলেটা জানল কি করে? "মন খারাপ করো না। মাম্মা তো দেখছে তোমাকে। স্টার হয়ে গিয়েও দেখছে তো। ঠাম্মাও যেমন ড্যাডিকে দেখে সবসময়।"

"তোমার মাম্মা খুব ভালো?" পিউ জানতে চায়। "বেস্ট। অফিস গেছে। এক্ষুণি আসবে।" "খুব আদর করে? দাদা বলে মা থাকতে মা নাকি আমাকে খুব আদর করত।" "আদর করে। বাট মাম্মা তো- স্ট্রিক্ট খুব।" "একদম আমার মায়ের মত। দাদা বলে মা নাকি খুব রাগী ছিল। একটুও দুষ্টুমি স্পেয়ার করত না। বাবা তো আমাকে বকেই না। যা চাই, তাই দেয়। আঙ্কলও তেমন?" রণিত মাথা নাড়ে,​ "না, না। দুজনেই স্ট্রিক্ট। মাম্মা পড়াশোনার দিক থেকে, ড্যাডি খেলার দিক থেকে। ভুল হলেই বকে। বাট ড্যাডি মারে না। মাম্মা তো..." পিউ মজা পায়, "দাদাও নাকি প্রচুর মার খেয়েছে মায়ের কাছে। মায়েরা এমন-ই হয়, না?"​ রণিত ঘাড় নাড়ে, "মারবে, আবার নিজেই কষ্ট পাবে। আসুক মাম্মা, দেখো - তোমার নিশ্চয় ভালো লাগবে।" "এটা তোমার ঘর?" "আমার? না,না। আমি তো এঘরেই মাম্মা আর ড্যাডির সাথে শুই।" পিউর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ছেলেটা কত লাকি। আর ও ছোট থেকেই নিজের ঘর, নিজের বেড - সব আলাদা। "তুমি আমাকে এবিভি বললে কেন?" রণিত প্রসঙ্গটা ঘোরায়। মেয়েটার মা'কে নিয়ে খুব কষ্ট। মা বাবার মধ্যে কেউ একজন না থাকলে কেমন লাগে,রণিত বোঝে। পিউ হাসে, "কজ্ ইউ প্লে লাইক হিম।" "তাই?আমার তো মনে হয় আমি প্লে লাইক ড্যাডি।" "হ্যাঁ। সেটাও। আমি ভিডিও ফুটেজ দেখেছি আঙ্কলের খেলার। বাবা দেখিয়েছে।"​ "তুমি এত ক্রিকেট দেখো?" "সারাদিন।" "গ্রেট। খেলো না কেন? এখন তো মেয়েরা খেলছে...."। "বলেছিলাম। অ্যালাউ করবে না। ঠাম্মা,দাদান, পিসি, পিসো - কেউ না।" "এমা! কেন? তোমার বাবাকে বলেছ?" সেই ভয়ে খেলবে না?" "বাবাও বলে থাক, লেগে যাবে।" "সেই ভয়ে খেলবে না?" "আমি স্পেকটেটারই​ ভালো। তুমি ফাইন লেগের ওপর দিয়ে একটা স্কুপ​ করেছিলে না.." "ওটা এবিভির মতো,তাই তো?" পিউ ঘাড় নাড়ল, "একদম। তুমি ফ্লাইং শটটা পারো? আর যেটা পা মুড়ে বসে মারে?"​ রণিতের বেশ মজা লাগছিল, একটা মেয়ের সাথে কি কথা বলবে ভেবে কুল পাচ্ছিল না। এখন দেখছে মেয়েটা ক্রিকেট বেশ ভালো বোঝে। "পারি তো।" "তাহলে ম্যাচে খেললে না কেন?" রণিত হেসে ফেলল, "তেমন বল পাইনি। নেক্সট ম্যাচে খেলে দেখাব, হবে?" "প্রমিস?" "বল পেলে, প্রমিস।" "ইয়েস। সঞ্জনাকে বলব কাল কথাটা।" "সঞ্জনা, কে?" "আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ও বিশ্বাসই করতে চায় না এবিডির মতো কেউ হয়।" "আর তুমি বলবে আমি এবিডি, তাই তো?" "একদম। তোমার সাথে দেখা করতেই তো..." বলেই থমকাল পিউ। রণিত ভারী অবাক হল। এমন স্মার্ট, ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে ওর সঙ্গে দেখা করবে বলে এসেছে? কাকে বলবে কথাটা? ড্যাডি? মাম্মা? নাহ, সুজনদাকে বলতে হবে। "তুমি আমাকে সাপোর্ট করছিলে ওদিন? আমি তো তোমার দাদার এগেইনস্টে ছিলাম।" "তাতে কি? আর দাদার বড়, অ্যাটিচিউড। অতটাও ভালো খেলে না।" "ড্যাডি আজ পানিশ করেছে মনোসিজ দা'কে, জানো?" পিউ হাসল, "ভালো করেছে আঙ্কল। বাবা তো এইজন্যই সরি বলতে এসেছে। দাদার একটু শিক্ষা হওয়া উচিৎ।" "ড্যাডি আছে তো, শিক্ষা দিয়ে দেবে। আচ্ছা, তোমার ভালো নামও কি পিউ?" "হ্যাঁ তো। পিউ চ্যাটার্জী, আর তোমার এবিডি।" "ইস। রণিত।" "ওটা বাজে। এবিডি-টা ভালো। বড় করে একটা পোস্টার লাগাবে এবিডির। দেখবে কত্ত ভালো খেলবে আরো।" "তোমার ঘরে আছে নাকি?" "ভর্তি সারা দেওয়াল এবিডির পোস্টার।" "এত বড় ফ্যান?" "এসি, এবিডিকে একবার দেখতে পেলে..." রণিত মজা করল, "দেখলে তো!" পিউ ঘাড় নাড়ল "পরের ম্যাচে ওই দুটো কাট মারলে, তবেই।" "বল পেলে, বললাম তো।" কলিং বেল বেজে উঠল তখনি। রণিত চমকে উঠল। "মাম্মা! ইস! ম্যাথ হোমওয়ার্ক হয়নি।" "করে নাও।" "এখন?" "হ্যাঁ। এবিডি কিন্তু পড়াশোনাতেও ভালো।" "এত তাড়াতাড়ি হয়?" অবাক হল রণিত। "ম্যাথ তো। আমি হেল্প করছি.." বলেই পিউ ভাবল এত কথা একটানা একটা ছেলের সাথে তো বলেনি কোনদিন। "ওকে,ওকে। প্লিজ হেল্প করে দাও একটু.." রণিত হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। পিউ খুশি হল। ছেলেটা খুব ভালো। এবিডির মতোই।

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ পিউ অবাক হয়ে রণিতের মাম্মাকে দেখছিল। ভেরি প্রিটি। আর খুব গ্রেসফুল। আন্টি ওয়ার্কিং, মা-ও ওয়ার্কিং ছিল। অফিস থেকে ফিরতে মায়েরও তাহলে এত দেরিই হত। ফিরে এসেই নাকি পিউর ঘরে যেত। পিসি, ঠাম্মা এরা পিউয়ের ঠিকমত যত্ন করেছে কিনা নিজে চোখে দেখে তবে শান্তি পেত। তারপর দাদাকে নিয়ে পড়ত। দাদার পড়াশোনা- সবটা-ই মা দেখত। দাদা ক্লাসে প্রতিবার টপ করত তখন। কিন্তু মা চলে গিয়ে থেকে দাদার আর পড়াশুনাতে সেই মন নেই। ক্লাসে টপও করে। কিন্তু পড়তে বসলেই এখনো মায়ের কথা মনে পড়ে ওর। এসব গল্প দাদার থেকেই শোনা। দাদার মুড ভালো থাকলে পিউকে এসব গল্প বলে। তখন দাদাকে আর রাগী মনে হয় না। জেদি মনে হয় না। অহঙ্কারী মনে হয় না। খুব কষ্ট হয় দাদার জন্য। দাদার চোখে জল এলেও দাদা লুকিয়ে ফেলে। ছোট বোনের সামনে কাঁদতে নেই। সব সময় কেবল ভারিক্কি ভাব আর বকাঝকা। ঠাম্মা, পিসি, পিসেরাও দাদার দলে। বকাটা সবচেয়ে বেশি হয় বাবা যেদিন পিউকে স্পেশাল কিছু দেয়, কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায়, সেদিন। বাবা যে পিউকে এত ভালোবাসে, দাদার হিংসা হয়। কিন্তু বাবা তো দাদাকেও খুব ভালোবাসে। দাদার রাগ কমলে দাদা ঠিক পিউর ঘরে আসে, পিউর রাগ ভাঙ্গাতে চায়। তখন ইনিয়ে বিনিয়ে পুরনো কথা বলে। পিউ মায়ের গল্প শুনতে ভালোবাসে। দাদা তখন মায়ের গল্প বলে। আর তখন দাদাকে অতটা খারাপ মনে হয়না পিউর, বরং ভালো লাগে। দাদা অনেক সময় রাতে এসে পিউর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে যায় লুকিয়ে, পিউ ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে ভালোবেসে যায়। দাদাকে দুই রকম মনে হয় পিউর। একটা যেটা সবাই চেনে। একটা যেটা পিউ চেনে। বাবাও হয়ত অতটা চেনে না। দাদা আজ পানিশমেন্ট পেয়েছে - কষ্ট হয়েছে পিউর। কিন্তু ওর শিক্ষা হলেই ভালো। বাবার খুব চিন্তা দাদাকে নিয়ে। দাদা ভালো হয়ে গেলে বাবা ভালো থাকবে। পিউ এইজন্যই চায় দাদা ভালো হোক। আঙ্কল যদি সেটা পারে, তো খুব ভালো। আন্টি অফিস থেকে ফিরেই আগে রণিতের ঘরে এসেছে। রণিত অঙ্ক করছে দেখে খুশি হয়েছে, তারপর পিউকে মিষ্টি করে জিজ্ঞাসা করেছে ও কোন স্কুলে পড়ে, কোন ক্লাস। বাবাকে মনে হয় আগে থেকেই চেনে আন্টি। পিউর তো তেমনি মনে হল। তাহলে মা'কেও চিনত? হবে হয়ত। আঙ্কল তো চিনতই। বৌদি বলে ডাকত তো। রণিতকে অঙ্ক দেখিয়ে দিচ্ছে পিউ- দেখে আন্টি খুশি হয়েছিল খুব। স্কুলে টপ করে শুনে তো আরো খুশি হয়েছিল। রণিত বলছিল ওর মাম্মাও নাকি টপার ছিল। পড়াশোনা যে করে,তাকে খুব ভালোবাসে তাই। এসব ভাবতে ভাবতেই আন্টি টিফিন নিয়ে চলে এল। চাউমিন করেছে। এই তো এল। একটুও রেস্ট না নিয়ে টিফিন করেও ফেলল? ঠাম্মাকে, পিসিকে বললে বলে, "একটু দাঁড়া দেখি। হাতে অনেক কাজ। এই তো স্কুল থেকে এসে বিস্কিট খেলি। আবার খাই খাই?" অথচ তখন ওরা টিভিতে সিরিয়াল দেখে। দাদাকে অমন বলতে পারে না। দাদার এখুনি চাই, মানে এখুনি। পিউ তো জেদ করতে পারে না, খিদে নিয়ে স্টাডিতে চলে যায়। ভুলেই যায় খাবার কথা। পড়তে পড়তে যখন আবার খিদে পায়, তখন ডিনার করার টাইম হয়ে যায়। মা থাকলে এমন হত না নিশ্চয়। কেমন হত, পিউ বুঝতে পারছে আন্টিকে দেখে। আন্টি দু'জনের খাবার এনে ওদের দিয়ে চেয়ার টেনে বসল ওদের পাশে। "পিউ, খেয়ে দেখো তো মা, ভালো হয়েছে কিনা। তাড়াহুড়োতে করলাম তো, দেরি হয়ে গেছিল ফিরতে। বাবুর খিদে পেয়ে যাবার কথা।" পিউ খেয়ে বলল, "খুব ভালো হয়েছে আন্টি। তুমি একটু রেস্ট নিয়ে করলেই পারতে। এতটা জার্নি করে এলে।" কোয়েলের ভারী ভালো লাগল কথাটা। অনিকেতদাকে বহুদিন থেকে চেনে। কলেজে পড়ার সময় তুষারের সঙ্গে দেখেছে। মোহর বৌদিকেও চিনত। দু'জনেই খুব ভালো মানুষ। বৌদির চলে যাওয়ার খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল কোয়েলের। বড় মায়া করেছিল মা- হারা মেয়েটার উপর। ওর কথা শুনে মাত্রাটা আরো বাড়ল যেন। কোয়েলের এই ক্লান্তি কিন্তু মেয়ে বলেই বুঝল পিউ। মেয়েরা অনেক কিছু বোঝে। অল্প বয়সেই বেশি পরিণত হয়ে যায়। "আমার কষ্ট হয়নি তো। রোজই তো করি। আর আজকে একজন স্মার্ট ইয়াং লেডি এসেছে আমাদের বাড়িতে, যে কিনা এত বিউটিফুল- তার জন্য তো করতেই হয়। আন্টির প্রেইজ শুনে খুব ভালো লাগল পিউর। আন্টি খুব ভালো। "থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি।" "ওয়েলকাম। রণিতের সাথে বেশ ভাব হয়েছে দেখছি।" "মাম্মা, পিউ তো আমাকে মিট করতেই এসেছে।" কোয়েল ভারী অবাক হল, "কেন? তোকে চিনল কি করে?" পিউ কভার আপ করল ব্যপারটা, "আন্টি, স্কুল টুর্নামেন্টের ফাইনালে রণিতের খেলা দেখেছিলাম তো, সেই জন্যই..."​ "জানো মাম্মা, পিউ এবিডি-র বড় ফ্যান, না,না- এসি। পিউ বলছে আমি নাকি এবিডির মত খেলি। আমাকে এবিডি বলছে তাই।" কোয়েল হেসে ফেলল এবার। "বাপরে! তাহলে পিউ তো দেখছি বাবুর খেলার ফ্যান।" "একদম, আন্টি। সেইজন্যই তো মিট করতে এলাম। ওকে বলেছি ফ্লাইং শটটা আর পা মুড়ে বসে শটটা খেলে দেখাতে। তবেই মানব পুরোপুরি এবিডি।" "মেয়েটা তো ক্রিকেট দারুণ ফলো করে !" কোয়েল হেসে বলল।​ "দিন রাত।" "পড়িস কখন?"​ আপন হতে চাইল কোয়েল। "পড়ে নিই।" "ওইটুকু পড়ে নিয়েই টপার?" রণিত অবাক হল। "মন দিয়ে পড়ি তো। তুমিও পড়, তুমিও পারবে।" "তাহলেই হয়েছে। পিউ, এই ছেলেটার পড়ায় তেমন মন নেই।" "না, না, পড়তে হবে তো আন্টি। এবিডি-ও পড়ায় ভালো। এই তো সব ক'টা অঙ্ক করে নিয়েছি আমরা, দেখো।" কোয়েল মুচকি হাসল। পিউর মন বসেছে রণিতে। সদ্য কৈশোরের অনুরাগ। প্রিয় নায়কের ছবি দেখার জন্য এই ক্রাশটা তৈরী হয়েছে। কোয়েল এতে দোষের কিছু দেখে না। "তাই তো? ভেরি গুড। আজ তাহলে পড়ায় মন বসেছে তোর জন্য। তুই তো আর রোজ আসবি না। ও নিজের ভালো নিজে না বুঝলে হবে?" "পড়ি তো মাম্মা।" অনুযোগের স্বরে বলল রণিত। "আরো ভালো করে পড়তে হবে, তাই না আন্টি? আর আমি এখন থেকে চলে আসব, প্রায়ই। হবে না?" রণিত এরকম প্রস্তাব আশা করেনি। ও কিছু বলার আগে কোয়েল বলল, "চলে আসিস। যখন মন করবে, তখন-ই চলে আসবি। রণিতেরও পড়ার একটা সঙ্গী হবে, আর আমারও ভালো লাগবে, একটা বার্বি ডলকে আমার বাড়িতে পেয়ে।" মাম্মাকে দেখে খুব খুশি মনে হচ্ছে রণিতের। পিউ মেয়েটা ভালো। খুব ইন্টেলিজেন্ট। খুব ভালো অঙ্ক করে। ও প্রায় এলে ভালোই হয়। রণিতের পড়ার হেল্প হবে। মাম্মা এতে এত সহজে রাজি হয়ে যাবে ভাবেনি। মাম্মারও তাহলে পিউকে পছন্দ হয়েছে। ওর তো মা নেই। তাই মনে হয় মাম্মা ওকে ভালোবাসছে, বাসুক। এই কষ্টটা খুব ভালো করে বোঝে রণিত। পিউর কষ্টটা এখানে এসে কমলে ওর ভালোই লাগবে।​

"তোমার ছেলের ফ্যান ফলোয়িং কেমন বাড়ছে টের পাচ্ছ, তুষার?" কোয়েল রাতে শুতে এসেই প্রথমে এই কথাটাই বলল। রণিত ঘুমিয়েছে সবে। তুষার বুঝল ইঙ্গিতটা কোনদিকে, "দেখলাম তো। এমনটা তো এক্সপেক্টেড। ছেলে ক্রিকেট খেলবে আর তার মেয়ে ফ্যান হবে না, তা হয়?" "হবেই তো।যেমন বাপ, তেমন ছেলে। তোমারও তো একগাদা ফ্যান ছিল কলেজে, মনে নেই ভেবেছ?" তুষার কোয়েলের রাগটাকে উস্কে দিল, "ছিলই তো। কতরকমের প্রোপোজাল আসত, জানো? কলেজের পরেও, এই যখন আই পি এল খেলছি- তখন তো গন্ডায় গন্ডায় ফোন আর এস এম এস..."​ " বাঃ! বাঃ! সব মডেল, চিয়ার লিডার..."​ "একদম। দলের মালকিনেরও..." চোখ মারল তুষার। "আফটার ম্যাচ পার্টিস, ইউ নো?" "তাই? তুমি যেতে ওখানে?" "যেতে তো হতই। সবাই যেত। ঘরে একা বসে থেকে কি করব?" তুষার ইচ্ছা করেই বলল। আদৌ যেত না ও ওসবে, যতটা সম্ভব এড়াত। "ওহ, ভালো তো। তা অত সব সুন্দরী মেয়েদের কাউকে মনে ধরল না? নাকি ধরেছিল, লুকিয়ে যাও।"​ কোয়েলের মুখে অভিমান জমে উঠল। "মনে ধরবে কি করে? মন তো একটা দিকেই আটকে গিয়েছিল।" "মিথ্যা কথা!" তুষার ঘাড় নাড়ল, "একশো ভাগ সত্যি। তুমি তো জানোই পিয়া, তোমার বাইরে ভাবিনি কখনো। এখন তোমার সুপুত্রটি কতটা ওয়ান উওম্যান ম্যান হবেন - জানি না। সব দিক থেকেই তো বাপ কা বেটা। এদিক থেকে হলেও ভালো।" "পিউ মেয়েটা খুব মায়াকাড়া। মিষ্টি খুব।" "বৌদির মতো হয়েছে। ও মনে হয় এখানে আসতে পারলে খুশি হবে। বাড়িতে সঙ্গী পায় না, মা নেই.. " "আসুক না। ভালো লাগবে আমারও। আমাকে বলেছে যে আসবে।" "ওর দাদার সাথে ওর, ওর ওর বাবার একটা বড় সড় গ্যাপ আছে- এই জন্যই মনোসিজের এত বিহেভিয়ার প্রবলেম হচ্ছে, অনিকেতদাকে তো বন্ধুত্ব করতে বললাম ছেলের সাথে, দেখা যাক, কি হয়।" "সব ঠিক- ই হবে। তুমিও খুব স্ট্রিক্ট হয়ো না নেটে। আজকালকার ছেলে তো, মানসম্মান খুব বেশি হয় এদের, কি করতে কি করে বসবে..." "আমিও তাই ভাবছি, একটু সহজ হব। সুজনের মতো মনোসিজকেও কাছ থেকে চিনতে চাইব, দেখি কি হয়।" কোয়েল মাথা নাড়ল। এভাবেই এগোনো শ্রেয় এখন।

■ লেখক পরিচিতি      ■ পূর্বের পর্ব

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.