x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

মাধবীলতা

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

তবুও_বসন্ত  #মাধবীলতা

ঘরে ঘরে শঙ্খধ্বনিতে সন্ধ্যা সূচিত হওয়ার সাথে সাথেই ভিড় ঠাসাঠাসি শুরু হয় গয়নার হাটে। বর্ধমান জেলার অন্তর্বর্তী ছোট্ট এক গ্রামাঞ্চল— কুন্দপুকুর। আজ শনিবার। সপ্তাহের এই দিনটা কেবল গয়নার হাটের দিন। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই যে যার পণ্যসামগ্রী সাজিয়ে বসে পড়ে পুষ্প, টগর, মঞ্জুরা।

সেই কোন্ ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে কড়ি, পুঁতি, ঝুটো পাথরের গয়না গড়তে শিখেছে পুষ্প। নিকটবর্তী আলোকোজ্জ্বল সম্বৃদ্ধ এলাকাগুলিতে থেকে বাবু-বিবিরা আসেন গয়না কিনতে। পুষ্পর রুচিশীল ও সুনিপুণ কাজের গুণে ওর চারপাশ সবসময় পরিপূর্ণ থাকে খরিদ্দারের ভিড়ে।

সন্ধ্যার এই হাটের সময়টুকু কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটে পুষ্পর। নিজের সৃষ্টি অন্যের হাতে তুলে দিয়ে, কড়ায় গন্ডায় হিসাবটুকু বুঝে নিয়ে প্রাপ্ত মূল্য পাশে রাখা কাপড়ের ছোট্ট থলিতে রেখে দেয় পুষ্প। তা না করে কী আর উপায় আছে?একেই পেটের দায়, তার ওপর আবার কুসুমকে ভালোভাবে বড় করবার মস্ত স্বপ্ন।

শীত চলেই গেছে বলতে গেলে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে পুষ্পর তামাটে বর্ণের মসৃণ কপালে। আজ বেশ দেরী হয়ে গেলো। খরিদ্দার এক-দুজন হয়তো এখনও আসবে বসে থাকলে। আর ইচ্ছে করছেনা। কয়েকটা মোটে হার আর দুল পড়ে আছে। এবার পাততাড়ি গোটানো যাক।

"কী গো? চিনতে পারছো আমাকে?"

- অচেনা কন্ঠস্বর শুনে ঘাড় উঁচু করে তাকালো পুষ্প। আরে? এ যে সেই দিদিমণি! আগের বছর শহরে শিল্পমেলায় দেখা হয়েছিলো। এ মুখ খুব ভালোভাবে মনে আছে পুষ্পর। অবর্ণনীয় রূপ—যেন সুদক্ষ কোনও চিত্রকরের যাদুতুলি দিয়ে অঙ্কিত মুখাবয়ব, অদ্ভুত এক মায়াময় ঔজ্জ্বল্য। প্রথমবার দেখার পর পুষ্প শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলো কয়েক মুহূর্ত। এমন রূপ তো মন্দিরের দেবীমূর্তির হয়।

সব মনে পড়লো পুষ্পর। সবুজ শাড়িতে সেদিন যেন আরও বেশী মনোমুগ্ধকর দেখাচ্ছিলো সেই দীপ্তকান্তিময়ী তরুণীকে। তবে সেদিন সে একা ছিলোনা। সাথে এক সুদর্শন যুবকও তো ছিলো। আহা! বড় মানানসই যুগলবন্দী!! পুষ্পর থেকে কড়ির গয়না কিনে নিজে হাতে তরুণীর গলায় পরিয়ে দিচ্ছিলো যুবক।

গয়না কিনে চলে যাওয়ার আগে পুষ্পর নাম ধাম সব জিজ্ঞাসা করেছিলো এই দীপ্তকান্তিময়ী। বেশ কয়েক মুহূর্ত চলেছিলো পরিশীলিত শহুরে আর রুক্ষ গ্রাম্য ভাষার বাক্যবিনিময়। পুষ্প যদিও তরুণীর নাম জানতে চায়না। ও তো দেবী!! দেবীরাই তো এমন হয়।

দুজনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেদিন মনটা কেমন উতলা হয়ে উঠেছিলো পুষ্পর। ঐ চরম ব্যস্ততার মধ্যেও বার বার দূরে বসে থাকা লখাইয়ের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিলো তার। লখাইও তখন মহা ব্যস্ত— সুতলি দড়ির পাপোশ আর ব্যাগের বিক্রি বাটা নিয়ে।

চরম শীত পড়েছিলো তখন। ঐ দুজনকে দেখার পর থেকে কাজে মন বসাতেই পারছিলো না পুষ্প। শীত বড় নিষ্ঠুর... মনকে বড্ড আদর-কাঙাল করে তোলে যেন! উন্মত্তের মত সেদিন লখাইয়ের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করছিলো পুষ্পর।

"কী গো? কী এত ভাবছ?"

...তরুণীর ডাকে সম্বিত ফিরলো পুষ্পর।

-"কিস্সু না গো দিদিমুনি,, তুমি আমারে মনে রাইখস?"

- "মনে রাখবো না কেন? এবারের শিল্পমেলায় তো দেখলাম না তোমাকে?"

- "এবারে যাই নাই গো... তা তুমি এখেনে?"

- "এখানে আমার দিদার বাড়ি। আজ গয়নার হাট বসে শুনে এলাম।"

- "দাদাবাবু কুথায়? আসেন নাই?"

প্রশ্ন শুনে ম্লান হয়ে গেল দেবীর মুখ।

- "আমি একলাই গো পুষ্প!! আমার কোনও দোসর নেই আর। ঐ লাল রঙের মালাটার দাম কত? দাও তো দেখি?"

তরুণীকে মালা এগিয়ে দিয়ে অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো পুষ্প।

- "আমরা সবাই একলা গো দিদিমুনি!"

স্বয়ংক্রিয় ভাবেই যেন তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল কথাগুলো।

হাটশেষে আজ আর টগরদের সঙ্গে ভ্যানে না ফিরে হাঁটতে শুরু করলো পুষ্প। এখন একটু নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করছে। খুব মনে পড়ছে আগের বছরের শিল্পমেলার কথা।

শহরের মেলায় বসবার জায়গার ব্যবস্থা লখাই করেছিলো। দশদিন ওর সাথে একসঙ্গে থাকা— ভাবতেই কেমন গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো!

পুষ্প অনুমতি চাইবার পর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠান্ডা গলায় বলেছিলো যমুনা...

-"লখাইরে কইবি, আশপাশের মন্দিরে গিয়া তুর কপালে যেন সিন্দুর লেইপ্যা দেয়।"

তার মা যমুনা বরাবরই এমন... আবেগের বহিপ্রকাশ কম। মা কে কোনওদিন রাগ, উচ্ছ্বাস, আনন্দ প্রকাশ করতে দেখেনি পুষ্প। কথাও বলে মেপে, নির্লিপ্ত স্বরে। কিন্তু দূরদর্শিতার অভাব নেই যমুনার মধ্যে। নিজের বাপকে কোনওদিন চোখে দেখেনি পুষ্প। তার অভিভাবক বলতে যমুনাই।

পুষ্পর মায়ের এই প্রস্তাব শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিলো লখাই।

"বিয়ার দিন কি পলায়ে যাইব? অহন ইদিকে কারবারে মন দে।"

প্রতিদিন মেলাশেষে লখাইয়ের কোনও এক বন্ধুর ফাঁকা ডেরায় গিয়ে উঠত ওরা দুজন।দশদিনের অস্থায়ী সংসার সাজিয়ে তুলেছিলো পুষ্প। তার আর লখাইয়ের সংসার।​

স্নান করে শরীর থেকে সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে স্টোভ জ্বালিয়ে ভাত বসাতো পুষ্প। গরম ভাতের গন্ধে খিদে আরও চনমন করে উঠত দুজনের। খাওয়া শেষে হ্যারিকেন নিভিয়ে শীতরাতে আদরজড়ানো উষ্ণতা খুঁজে নিত ওরা-- পরস্পরের শরীরে শরীর মিশিয়ে। লখাই সারাদিনের পরিশ্রম আর শহুরে ধুলোমেশানো বিরক্তিটুকু পুষ্পর নরম শরীরের মধ্যে উজাড় করে দিয়ে তবে শান্ত হত। আর লখাইয়ের ওই উগ্র অশিষ্ট আদরকে সোহাগরূপে বরণ করে নিত পুষ্প। দূর থেকে ভেসে আসা ব্যস্ত শহরের ট্রাফিকের আওয়াজ আস্তে আস্তে স্তব্ধ হয়ে মিলিয়ে যেত রাতের গভীরতার অন্ধকারে। পুষ্প লখাই পরম তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করতো।

শিল্পমেলায় বিক্রি বাটা মন্দ হয়নি ওদের। যমুনার জন্যে চুড়িদারের পিস আর কাঁচের চুড়ি কিনে নিয়ে গেছিলো পুষ্প। অতদিন পর মেয়েকে দেখে যমুনা কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেছিলো। তারপর তার হাতটা ধরে টানতে টানতে ঠাকুরের ছোট্ট কুলুঙ্গি থেকে সিঁদুর নিয়ে পুষ্পর মাথায় লাগিয়ে বলেছিলো....

-"কেউ জিগাইলে কইবি, শহরে গিয়া তুদের বিয়া হইসে।"

দু-তিনদিন পরেই লখাই গ্রামছাড়া হয়। পুষ্পকে জানায়, কলকাতা শহরে দোকান খুলবে নাকি সে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার করেছে। সব পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে গেলে পুষ্পকে এসে নিয়ে যাবে... চিরতরে জীবনসঙ্গিনী করে।

যাবার দিন কপালে চুমু এঁকে যায় লখাই। ওর চলে যাওয়ার রাস্তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পুষ্প। বিকেল গড়িয়ে রাতের আঁধার নেমে আসে পুষ্পর চোখে।

তারপর আর কথা হয়নি লখাইয়ের সাথে। লখাইয়ের মোবাইল নম্বরটারও আর অস্তিত্ব নেই। কয়েকদিনের মধ্যে শীত পেরিয়ে বসন্ত আসে। গোটা গ্রামজুড়ে কৃষ্ণচূড়া ও পলাশের লাল আভার ছড়াছড়ি। সবার অলক্ষ্যে ডুকরে কেঁদে ওঠে কপোতবিহীন কপোতী। দুরু দুরু বুকে যমুনাকে এসে একদিন জানায় পুষ্প...

- "মা গো! হয় নাই, এমাসে হয় নাই গো!"

যমুনা একঝলক তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মায়ের দুচোখের কোণে সেদিন সে দুফোঁটা জল দেখতে পেয়েছিলো যেন!!

গ্রামের অনেকের কলকাতায় যাতায়াত আছে। লখাইয়ের সাথে তাদের মাঝেমধ্যেই সাক্ষাৎ ঘটে। পুষ্প খবর পায়- বেশ ভালোই আছে লখাই। বছর ঘুরে আবার শীত আসে, শীত পেরিয়ে বসন্ত— আবার।

আজ ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে ফের সেই দীপ্তকান্তিময়ীকে দেখতে পেল পুষ্প। পরনে ​ তার পলাশরঙা শাড়ি। হাতে, গলায় পলাশফুলের মালা। আহা! কী অপূর্ব দেখাচ্ছে। পুষ্পর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলো সেই দেবী। পুষ্প এগিয়ে চললো তার হাতটা ধরে। আজ সে নিজেও পলাশের গয়নায় সুসজ্জিতা। লম্বা, ফাঁকা রাস্তা। হেঁটে চলেছে তারা দুজন। চারিদিকে আর কেউ কোথাও নেই।

চকিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ভোরের নরম আলো এসে পড়ছে চোখে মুখে। পাশে শুয়ে হাত পা ছুঁড়ে খেলা করছে চার মাসের কুসুম। ওকে কোলে তুলে নিয়ে তাদের মাটির ঘরের সামনের জলাশয়টার কাছে এসে দাঁড়ালো পুষ্প। কসুমকে আঁকড়ে ধরে গালে গাল ঘষলো সে। ছোট্ট তুলতুলে শরীরের ওমটুকু নিজের মধ্যে মিশিয়ে নিলো। অগণিত শালুকফুলে ভরে ওঠা জলাশয়ের কিনারে খেলে বেড়াচ্ছে এক সাদা ধবধবে বক ও তার ছোট্ট ছানা। খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো কুসুম। নৈসর্গিক প্রকৃতি প্রতিবারই জানান দেয় পৃথকভাবে, পৃথকরূপে— বসন্ত এসে গেছে।

■ লেখক পরিচিতি

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.