x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

কৃষ্ণা কর্মকার

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ | |

শিক্ষক

সন্ধের মুখে মুখে ফোনটা এলো, আননোন নাম্বার, রিসিভ করতেই একটা কাঁচুমাচু কিশোরী গলা,​

----- ম্যাম, আমি ক্লাস টেন - এর ছাত্রী মৌবনি বলছি।​

​চড়াৎ করে মেজাজটা চড়কগাছে উঠলো সুচেতার। তিনমাস ধরে চলতে থাকা অনলাইন ক্লাসে মেয়েটা একটা দিনও যোগ দেয় নি। বারবার ফোন করে পাওয়া যায় নি। কোনোভাবে একটা কনট্যাক্ট পর্যন্ত করে নি! এরকম কয়েকটা বেয়াড়া ছাত্রীর জন্য এইচ এম - এর কাছে তাকে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে লাগাতার। তাই নামটা শুনেই সুচেতা তার কোনো কথা গ্রাহ্য না করে ধমক দিয়ে ফোনটা কেটে দিলো। পাশ থেকে ঋজু টিপ্পনী কাটলো,

----- দিন দিন ঘরটা ইস্কুলঘর হয়ে যাচ্ছে দেখছি।​

#

সুচেতার অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে না স্কুল-কা, না ঘর-কা। একদিকে পাড়া পড়শি থেকে সহযাত্রী,বন্ধুর দল কানে সিসে ঢালছে,

------ "সবেতন ছুটি তো দেখছি লম্বা হয়েই যাচ্ছে গো! তা অর্ধেক মাইনে করোনায় দান করছো তো ভাই, কী দয়াটাই না সে করছে তোমাদের!"​

​আর অন্যদিকে ঘরের মানুষগুলো নির্বিকার মুখে টিপ্পনী টুকছে,​

------ "কী এতো দিনরাত ইস্কুলের কাজ, বুঝি না বাপু। সারাদিন মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে আছো। ঘরটাও একটু দেখো। তোমাদের তো দেখছি করোনাটা আশীর্বাদ হয়ে উঠলো!"

​ ​সঙ্গে অধ্যাপক স্বামী ঋজুর বিদ্রূপাত্মক সংযোজন, "অনলাইনে ইস্কুল নিয়ে এই মাতামাতিতে তোমার কিন্তু প্রচার হচ্ছে ভালো। শিক্ষারত্নের জন্য অ্যাপ্লাই করে দেখতে পারো।"

​এরকম শাঁখের  পড়ে কার আর মন মেজাজ ফ্রেস থাকে! এমনিতেই ঋজুর সঙ্গে রিলেশনটা আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে, কী ফিজিক্যালি কী মেন্টালি। পাঁচটা বছরের দাম্পত্যের রাস্তায় ফুলের বদলে কবে থেকে যে কাঁটা বেছানো শুরু করেছে জীবন, সেটা এই কোভিদ ঊনিশ এসে দুজনকেই ঘরে ঢুকিয়ে না দিলে বোঝা যেতো না। ঋজু শুধু ডমিনেটিং কিংবা অন্য নারীতে আসক্ত হলেও, এখনো কনসিভ করতে না পারা সুচেতা, ভারতীয় পুরুষের সোস্যাল সেট-আপ, মেণ্টাল -সেট আপ এটসেট্রা ভেবে হয়তো রাগ অভিমান করে ঋজুর সঙ্গে ভালোমন্দ যাই হোক একটা বোঝাপড়ায় আসতো। কিন্তু না, সেসব নয়। সুচেতা বুঝে গেছে লোকটার মনটা আসলে একটা পচা ডোবার মতো। যা কিছু তার ধারেকাছে আসে সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের করতে ওর জুড়ি নেই। দুজনের চাকরি দুজায়গায় বলে আগে সপ্তাহান্তে দেখা হতো, তাই ব্যাপারটা এতখানি চোখে পড়তো না --- পড়লেও, দু একদিনের সহবাসে এবং পরিবার পরিজনের দিকে নজর দিতে গিয়ে মনের মধ্যে তার ছাপ পড়তো না। কিন্তু এখন একটানা ছ' ছ'টা মাস পাশাপাশি থাকতে থাকতে বেশ বুঝতে পারছে সুচেতা, ঋজুর কাছে অধ্যাপনাটা স্রেফ একটা জীবিকা মাত্র। আহার - মৈথুন- নিদ্রা, সাংসারিক কিংবা রাজনৈতিক কূটকচালি আর লোকজনকে কারণে অকারণে টীজ করা ছাড়া দিনরাতে কোনো কাজ নেই। নিজেকে আপগ্রেড করার এতটুকু ইচ্ছে নেই। শিক্ষকের পেশায় থেকে যে মানুষ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না, তাকে পাতি শিক্ষাজীবী ছাড়া আর কীই বা ভাবা যায়! এই যে এতদিন বাড়িতে বসে আছে, না ছাত্র ছাত্রীদের অনলাইনে পড়াচ্ছে না নিজে পড়ছে। বললেই বলছে,​

------ "গ্রামগঞ্জের সব মাটো ছেলেমেয়ে, অনলাইনে ওরা করবে পড়াশোনা! তার চেয়ে মাঠেঘাটে গুলতানি মেরেই ওরা ফূর্তিতে থাকবে। ওসব হলো তোমাদের শহুরে আদিখ্যেতা।"

------ "তাই বলে হাল ছেড়ে দেবে? মাসে মাসে কত স্যালারি ড্র করো বলো তো?"

------ "দেখো, আমার স্যালারি, আমার কাজকর্ম নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে।"​

------ "ঋজু, আমি তোমার স্ত্রী"।​

------ "তো! স্ত্রীর কোন দায়কর্তব্যটা তুমি করছো শুনি?​ না রান্নাবান্না করছো, না স্বামীশ্বশুরের সেবা করছো। শাশুড়ি ননদ আর কাজের লোকের হাতে নিজের ঘর ছেড়ে দিয়ে পরের ছেলেমেয়ে সামলাচ্ছো! হুঁঃ!​ তুমি আর কথা বোলো না। চাকরি করে আমাদের মাথা কিনেছো এবং আমরা তোমার কাছে মাথা বিকিয়ে দিয়েছি। দ্যাটস এনাফ। আর কথা বোলো না।"

​না,​ কথা আর বলে নি সুচেতা। মানে তার রুচিতে বেধেছে কথা বলতে।​ সে যে সাংসারিক কাজে সময় খুব বেশি দেয় না এটা ঠিক, কারণ রান্নাঘরটা শাশুড়ির নিজস্ব জায়গা, মাঝেসাঝে সেখানে গেস্ট হওয়া যায়, পার্মানেন্ট মেম্বার হওয়া যায় না। বাড়ির বাঁধা কাজের লোক তিনজন, শাশুড়িমা করোনা - টরোনার বাহানা অগ্রাহ্য করেই তাদের কাজে আটকে রেখে মাইনে উসুল করেন। বাজার হাট করার এক্তিয়ার একমাত্র শ্বশুরমশায়েরই আছে। অতএব বাকিদের তেমন কোনো কাজ থাকে না। কিন্তু বাড়ির বউ কাম রোজগেরে সদস্য হিসেবে সংসারের বেশ কয়েকটা দায় দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছে সুচেতা। ঋজু অবশ্য সেই দায়িত্বের নাম দিয়েছে "দেখনদারি"।

​সংসারের খুঁটিনাটিতে কিংবা নুনতেলের হিসেবে ঢুকতে তার কখনোই ভালো লাগে না। এখন তো আরো অসহ্য লাগছে। বাড়িতে বসে বসে মনে হচ্ছে, একজন শিক্ষক হিসেবে সে তার নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। ছাত্রীদের মুখোমুখি হয়ে তাদের মন বুঝে পড়ানো আর অনলাইনে সিলেবাস শেষ করার মধ্যে আসমান জমিন তফাত। একে তো বাচ্চাদের মধ্যে আজকাল প্রায়শই সাইকলজিক্যাল প্রবলেম গ্রো করছে নানা কারণে, তার ওপর এই ঘরবন্দী হয়ে পড়া। ওদের মানসিক অবস্থাটা ভাবতে গেলেই শিউরে ওঠে সুচেতা। ভাবে ঘরে বসেই ওদেরকে কীভাবে কতটা মেণ্টাল সাপোর্ট দেওয়া যায়।​

​আজও সেই ভেবেই একটা লেসন প্ল্যান নিয়ে সন্ধের মুখে মুখে বসেছিল। তার মধ্যেই এই ফোন। তাল কেটে গিয়ে মেজাজটাই তেতো হয়ে গেল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে গেল ছাদে। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতেই একঝলক মিষ্টি হাওয়া এসে মনটাকে খানিকটা হালকা করে দিল। নারকেল গাছের পাতার ফাঁকে ঢাউসমার্কা পূর্ণিমার চাঁদটা উঁকি দিচ্ছে। ওর মনে পড়লো ইস্কুলে পড়ার সময় ওর বন্ধু চন্দা আর ও প্রায়ই চাঁদনি রাতে বড়োপুকুরের পাড়ে গিয়ে জলে পড়া চাঁদের ছায়ায় ঢিল ছুঁড়তো আর চাঁদটা যেন কাঁপতে কাঁপতে ভেঙ্গে যেতো, তারপর ছড়িয়ে পড়তো। ওরা বলতো চাঁদভাঙা খেলা। ওর মনে হলো, এই করোনা ভাইরাসটাও যেন সেইরকম একটা ছকভাঙা খেলায় মেতেছে। মানুষের জীবনের হিসেবনিকেশগুলো ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেঙে ফেলছে। তার একত্রিশ বছরের জীবনে, 'মহামারী' শব্দটা পেয়েছে বইয়ের পাতায়, তথ্য হিসেবে জেনেছে ক্ষয়ক্ষতির একটা তালিকা আর তার সুফল-কুফল। কিন্তু নিজের চোখে দেখা এই মহামারীর ভয়ঙ্কর হাঁ - মুখটা তাকে ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত করছে। শিক্ষক হিসেবে বেশ বুঝতে পারছে, ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার চেহারাটা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। শিক্ষক - শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়ে শিক্ষকতার জায়গা নেবে স্রেফ "গাইড"। শারিরীক দূরত্ব থেকে সামাজিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব থেকে মানসিক দূরত্ব, আর মানসিক দূরত্ব থেকে চরম একাকিত্ব, মানুষের পৃথিবীটাকে ঝাঁঝরা করে দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে বেশ আনমনা হয়ে পড়েছিল সুচেতা, এমন সময় ফোনটা আবার গেয়ে উঠলো, "বক্ষে আমার তৃষ্ণা.... " । স্ক্রিনে ভাসছে সেই "আননোন নম্বর" । তিরিক্ষে মেজাজটা কখন যেন বিদায় নিয়েছে। ফোনটা ধরে সুচেতা এবার বললো,​

----- বলো মৌবনি, কী বলতে চাইছিলে তখন?​

----- দিদিমণি, আমি আর পড়তে পারবো না ....

----- পড়তে পারবে না? মানে? তুমি হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে জয়েন করো নি কেন, জানার জন্য কতবার কতভাবে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছি জানো! এতদিন পরে তোমার টনক নড়েছে।​

----- দিদিমণি, বাবা আর মা দুজনেই মারা গেল যে...​

----- হোয়াট.... কী করে?​

----- করোনায়।​

----- মানে?​

----- হ্যাঁ দিদিমণি, খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তো। কোনো ডাক্তার দেখে নি। পাড়ার একটা কাকু পুলিশকে ফোন করে দিল। দিয়ে পুলিশ এসে বাবাকে করোনার হাসপাতালে নিয়ে চলে গেলো। আমাদের ঘরের চারপাশ বাঁশ বেঁধে ঘিরে দিল। আট দিন পরে পুলিশ ফোন করে বললো, বাবা মরে গেছে। তারপরেই মায়ের জ্বর হলো, পুলিশ তুলে নিয়ে গেল। তার বাইশ দিনের দিন মা-ও মরে গেল। আমি আর ভাই সেদিন থেকে একাই আছি। একটা পুলিশকাকু ছাড়া কেউ আসে না আমাদের বাড়ি। জানলা দরজা খুলতে গেলে পাশের বাড়ির লোকেরা সবাই বকছে। কিন্তু আমাদের জ্বর হয় নি, শ্বাসকষ্টও হয় নি। ভাই তো ছোটো, ও খালি মা বাবাকে খুঁজছে। ফোনে টাকাও ছিল না, কাল পুলিশকাকুটা ভরে দিয়েছে।​

​সুচেতার পা দুটো পাথর হয়ে গেছে। ও শুনছে কী নিস্পৃহ কণ্ঠে মেয়েটা বর্ণনা দিচ্ছে তার ধ্বস্ত দিনগুলোর। ওর কচি মুখটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সুচেতার চেতনায়। ওর অনুপস্থিতির জন্য খোঁজ করেছে দু একবার ঠিকই, কিন্তু সেভাবে কারণ খোঁজার কথা ভাবে নি। কোথা থেকে একটা বিশ্রী অপরাধবোধ পাক খেয়ে উপরে উঠে আসতে চাইছে। এরকম কঠিন সময়ে ক্লাসটিচার হিসেবে ওর আরো ইনিসিয়েটিভ নিতে হতো ..... প্রবলেমগুলো খুঁজতে হতো। শুধু ও একা নয়। এরকম আর কতোজন আছে কে জানে! কার ঘরে কী সমস্যা আছে, কখনো তো জানতে চায় নি হৃদয় দিয়ে! অথচ শিক্ষক হিসেবে এটা করা উচিত ছিল। নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে সুচেতার। একটা আফশোস দলা বাঁধছে মনে। কোনোরকমে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে জানতে চাইলো,​

------ "তোমার বাবা কী করতেন মৌবনি"?​

------ "বাড়ি বাড়ি গিয়ে পেশেণ্টদের পরীক্ষার জন্য ব্লাড, ইউরিন, স্টুল নিয়ে আসতো"।​

------ "আর মা"?​

------ "মা আই সি ডি এস করতো"।​

------ "ভাই কত বড়ো"?​

----- "পাঁচ বছরের"।​

----- "তোমাদের কাছে কে আছে এখন"?​

----- "কেউ নেই দিদিমণি"।​ ​

----- "আত্মীয়স্বজন এখানে কেউ আছে"?​

----- "মামাবাড়িতে মামা মামী দাদা আছে । কিন্তু কেউ আসবে না এখন। আমাদেরকেও যেতে বারণ করেছে। জানেন দিদিমণি, পাড়াতেও এখনো কেউ আমাদের ট্যাপকল থেকে জল নিতে দিচ্ছে না। দরজার বাইরে বালতি বের করে রেখে দিলে কেউ কেউ তাতে আলগোছে জল ঢেলে দেয়"।​

----- "এখনো কি বাঁশ দিয়ে ঘেরা আছে বাড়ি"?​

-----" না দিদিমণি। আমার আর ভাইয়ের নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না"।​

----- "কী করে চলছে তোমাদের? খাচ্ছো কী"?​

---- "পুলিশকাকুরা যে চালডাল মশলাপাতি দিয়েছিল সেগুলো আরেকটু খানি করে আছে । আজকে পুলিশকাকু বললো, এরপর থেকে আর দেবে না"।​

----- "কী করবে তাহলে এবার"?​

----- "জানি না দিদিমণি। মামাকে ফোন করেছি। বললো, মাসখানেক চলার মতো টাকা দেবে, তারপর আমাকে কিছু কাজ করতে হবে। কিন্তু কেউ তো আমাদের সঙ্গে কথা বলতেই চাইছে না।"

​সুচেতার মাথাটা ভোঁভোঁ করছে। ওর মানুষ হিসেবে এখুনি কিছু করা উচিত। কিন্তু কী করবে? যাই হোক, আগে তো ওর কাছে একবার যেতে হবে।​

​ ​রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরে ঢুকলো সুচেতা। ঋজু ইজিচেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে ফোনের ওপারে কোনো নিরীহ বন্ধুর কানের ওপর কেন্দ্র সরকারকে তুলোধোনা করছে, রাজ্য সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করছে। সুচেতার মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠলো। একটা দুর্দম রাগ ভেতর থেকে আছড়ে পড়তে চাইছে সুনামির মতো। অকাজ ছাড়া লোকটা কিছুই করে না। আদ্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক মেটেরিয়েলিস্টিক লোক একটা। একটু দেখে নিয়ে সুচেতা বললো,​

----- "আমি কাল সকালে বেরোবো।​

​ ​ ​ ​ ঋজু, কথার ঝোঁকে ছিল। চোখ নাচিয়ে জানতে চাইলো কিছু।​

------ "দরকার আছে। তোমার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়, তাই আজই বলে রাখলাম।"

​ ​ ​ ​ এবার থমকালো ঋজু। কথা শেষ না করেই "রাখছি রে" বলে কেটে দিল ফোনটা। তারপর দুচোখে বিস্ময় মেখে জানতে চাইলো,​

------"মানে? এইসময়! কোথায়? "

----- "এক ছাত্রী খুব প্রবলেম এ পড়েছে, করোনায় বাবা মা দুজনেই মারা গেছে। আমি আগে জানতাম না। আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি সবাই একঘরে করে দিয়েছে।"

----- "তো! তুমি কি সব ছাত্রীর ঠেকা নিয়েছো?​ নাকি এইচ এম হওয়ার দৌড়ে নেমেছো? তোমার এতো কীসের আঠা?"

-----"ভদ্রতা হারিও না ঋজু।"

----- "তুমি​ নিজে ভদ্রলোকের কাজ করছো কিনা ভাবো। "

----- "ভেবেছি। তাই যাবো।"

----- "পাঁচজনের ঝামেলা ঘরে ঢোকাতে চাইলে ঘরের দরজাটা শেষ পর্যন্ত তোমার জন্যও বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু "।

----- "ঠিক আছে। এমনিতেও তোমার মতো মেটিরিয়েলিস্টিক মানুষের সঙ্গে থেকে আমি হাঁফিয়ে উঠেছি।"

​মধ্যরাত পর্যন্ত তুমুল বাকবিতণ্ডাতেও সুচেতার ঘাড় কাত করতে না পেরে ঋজু প্রায় মারমুখী হয়ে উঠলো। তাতেও বাগ মানাতে না পেরে কাঁদতে বসলো। বিশ্রীরকম সিনক্রিয়েট করেও যখন সুচেতাকে নোয়ানো গেল না, তখন ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়লো। সুচেতাও বুঝলো, এভাবে থাকলে একদিন তার গা থেকেও শিক্ষার আচ্ছাদন খসে গিয়ে নোংরা কাদাজল উঠে আসবে। সেটা সে কিছুতেই হতে দেবে না। হয় ঋজুকে পাল্টাতে হবে নইলে তাকেই সরে যেতে হবে।​

#

​ভোরের শুনশান রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সুচেতার মনের ভার কখন নেমে গেছে নিজেও বোঝে নি। অনেক কাজ সামনে। ভাইরাসটার সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য এড়িয়ে গিয়ে নয়। এতদিন সে কিছুই করতে পারে নি। স্বার্থপরের মতো শুধুই নিজেকে আগলেছে। মৌবনির ঘটনাটা তাকে নাড়িয়েই দেয় নি, জীবনের উদ্দেশ্যটাও ঠিক করে দিয়েছে। এই দুঃসময়ে তার মতো মানুষগুলো শক্ত হাতে হাল না ধরলে, কীসের শিক্ষা!​

এমনিতেই শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে মানুষ ডুবে আছে কুসংস্কারে ---- অন্ধধ্যানধারণায়। দিন দিন যুক্তিবুদ্ধিহীন হয়ে যাচ্ছে সব। তার ওপর কাতারে কাতারে কাজ হারানো মানুষের এই অস্তিত্বসংকটের দিনগুলোতেও যদি এমন হিংসাদ্বেষ আর অন্ধত্বই বড়ো হয়ে ওঠে তবে সান্ত্বনা কোথায়?​ ​

​ ​একবার যখন রাস্তায় পা রেখেছে সে, তখন আর পিছন ফিরে তাকানোর প্রশ্ন নেই। সে এমনিতে খুব আশাবাদী। সে জানে, স্কুলের কলিগদের মধ্যে কয়েকজন অন্তত তার পাশে আছে। হোয়াটস্অ্যাপে তাদের দুজনের সাথে কথাও হয়েছে। একেবারে সামনে এসে না দাঁড়ালেও মৌবনির মতো ছাত্রীদের জন্য তাদের সাহায্যের হাতটা থাকবে। এইচ এম নিজেও সব শুনে সুচেতার সাহসকে স্বীকৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, তিনিও আজ মৌবনির কাছে আসবেন। শুধু তাই নয়, স্কুলের কোনো ছাত্রী যাতে ড্রপ -আউট না হয়, তার উপায় খুঁজবেন। দরকারে সেই অঞ্চলের শিক্ষিত মানুষের সাহায্য চাওয়া হবে। পাড়ার ক্লাব কিংবা কোনো সংগঠনকে অনুরোধ করা হবে তাদের বড়ো জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসিয়ে পড়ার সুযোগ করে দেন। আঃ! একটা আশ্চর্য ভালোলাগায় সুচেতা ডুবে যাচ্ছে।​

#

​মৌবনিদের ঘর থেকে সুচেতা বেরিয়ে এলো। আজ নিয়ে টানা পনেরোদিনের চেষ্টায় পাড়ার লোকদের বোঝানো গেছে, রোগীকে একঘরে করে দিলেই এই ভাইরাস ছেড়ে যাবে না। এর জন্য দরকার সাবধানতা। তাঁরা এখন নিজেরাই মৌবনিদের দেখাশোনা করছে। রাস্তা ক্রমশ খুলে যাচ্ছে সামনে। সত্যিই এখনো বেশির ভাগ মানুষই ভালো। শুধু একটু বোঝানো, একটু মনের জোর বাড়ানো, এই তো ব্যাপার। গলির মুখ থেকে রাস্তায় এসে পড়তেই সুচেতার চোখে পড়লো, ঋজুর গাড়ি,​

------ বাড়ি চলো সূচি! এভাবে মেসে কতদিন থাকবে?​

------ আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।​

----- আমার হচ্ছে। তোমাকে বাদ দিয়ে আমার কী হবে?​

----- মানে! তোমার অর্থ আছে, গাড়িবাড়ি আছে।​

----- কিন্তু সেই মানুষটা নেই, যে আমাকে সমস্ত স্বার্থপরতা থেকে টেনে বের করে আনবে। মেটিরিয়েলিস্টিক সত্তাটাকে কুচি কুচি করে কেটে আত্মিক প্রায়শ্চিত্ত করাবে।​

------ ঋজু!​

------ শিক্ষক হতে চাই। বিশ্বাস করো, মনে প্রাণে শিক্ষক হয়ে উঠতে চাই আমি, তোমার মতো।​

​সুচেতার চোখ চিকচিক করে উঠলো।​


​ ​ ​ ​ ​ ​◆ লেখক পরিচিতি


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.