x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২০

রিঙ্কি বোস সেন

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০২০ | | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

অফার

(১)

স্টিলের ছোটো হাঁড়িটা টেবিলে নামিয়ে সজোরে চেয়ার টেনে বসল রুমেলা। চোখদুটো দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে, নাকের ছিদ্রদুটো দিয়ে গরম হাওয়া। সাত্যকি নজর করছে সব।কৌতূহল হচ্ছে কিন্তু ভয়ও হচ্ছে। তাই চুপচাপ খাওয়াতে মন দিল। রুমেলার এতে মেজাজ আরও গরম হয়ে উঠলো। নুন-দানীটা নিয়ে জোরে জোরে টেবিলে ঠুকতে লাগলো।

__'আহ! কী হলটা কী?'

রুমেলা ঠিক এই মুহুর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সাত্যকির প্রশ্নটা যদিও নুন-দানী নিয়ে ছিল কিন্তু রুমেলা উত্তর দিল__

__' কী আবার হবে? বিরক্ত লাগছে আমার, একটু রিলিফ নেই, শুধুই কাজ আর কাজ। মরে যাচ্ছি আমি, হাঁফ ফেলার ফুরসত পাচ্ছি না, এর উপর আগামীকাল জবা মহারাণী আসবেন না!'

সাত্যকি এবার বুঝে গেল কেসটা ঠিক কী, কেন রুমেলার মুখটা টেবিলে রাখা ভাতের হাঁড়ির মত হয়ে আছে। ঝি ছুটি নিলেই রুমেলার মেজাজ বেতাল হয়ে যায়। একা হাতে সব পেরে ওঠে না বেচারি। তার উপর আশুর দুরন্তপনা!

__' কারণ কিছু বলেছে, কেন আসবে না?'

__' ইন্ডিপিন্ডি ডে, গোটা দেশে ছুটি!​ তাই মহারাণীরও নাকি ছুটি...হকের ছুটি, বাপের হক্ তো!'__

রুমেলার কথায় সাত্যকির বিষম খাওয়ার উপক্রম। ছ'বছরের আশুও অবাক, ঘরের মেঝে জুড়ে রেলগাড়ি চালাতে চালাতেই মা'য়ের কথা শুনে কয়েক মুহুর্ত হাঁ করে চেয়ে রইল।

__' আরে কী সব বলছ? আশুও শুনছে'।

ফিসফিস করে সাত্যকি বলল।রুমেলা শুনলো কী না সন্দেহ, উল্টে বলে চলল_

__'ইন্ডিপিন্ডি ডে! হুঁ! নিকুচি করেছে ইন্ডিপিন্ডি ডে'র! ইন্ডিপিন্ডি ডে বলে কেউ যেন কাজে যাবে না? দুনিয়ার সব ডাক্তার, নার্স, মন্ত্রী, রিপোর্টাররা কাজে যাবেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর অত কাজ আর ইনি কোথাকার রাজিয়া সুলতানা! কাজে আসবেন না!'__

সাত্যকি জানে রুমেলাকে ঠান্ডা কীভাবে করতে হয়। তাই ওর ডান কাঁধে নরম করে হাত রেখে খুব ধীর স্বরে__

__' আরে একটু ভেবে দ্যাখো রুমি, জবা কি খুব অন্যায় কিছু আবদার করেছে? সারা দেশের সরকারি, বেসরকারি সব কর্মীদের যেখানে ছুটি সেখানে ওদেরও তো ছুটি পাওনা থাকে, আফটার অল ওরাও তো লেবার!'

__' আর আমি কী?​ দাসী?​ সমাজকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসা দাসী, তাই না? আমার তো কোনো স্বাধীনতা নেই, স্বাধীনতা দিবসও নেই, আমার কোনো ছুটি নেই, ছুটি চাইবার হকও নেই...উল্টে তোমার মত সমাজ দরদী চাকুরিজীবী ছুটি পেয়ে ঘরে বসে থাকলে তার সেবা করতে হবে, কাজের এক্সট্রা বহর, উইদাউট এনি এক্সট্রা সম্মান'!

কথা আর খাওয়া দুটোই শেষ করে বাসনপত্র নিয়ে রুমেলা কিচেনে ঢুকে গেল। সাত্যকি চেয়ারে বসে, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। মেঝেতে বসে রেলগাড়ি নিয়ে কু-ঝিকঝিক করতে থাকা ছেলেও চুপ।স্থির চোখে বাবার দিকেই তাকিয়ে।

__' বাবা, ইন্ডিপিন্ডি মানে কী? ঐ মা যেটা বলছিল?'

সাত্যকি চেয়ার ছেড়ে উঠে হাত ধুয়ে এসে আশুকে কাছে ডেকে নিল__

__' কাল হল গিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে, অনেক অনেক বছর আগে এই দিনে, ফিফটিন্থ অগাস্টে আমাদের দেশ ফ্রি হয়েছিল। সেই যে বলেছিলাম না ব্রিটিশরা কীভাবে আমাদের টর্চার করত আর কীভাবে আমাদের স্লেইভ বানিয়ে রেখেছিল, মনে পড়ছে?'__

আশুর দুচোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। বাবার কাছে কতদিন শুনেছে এইসব ফেয়ারিটেল...প্রিন্স সুভাষ আর তার সাথে ব্রিটিশ নামের ডেভিলের ফাইট।

__' সো এই দিনটা আমাদের সব ইন্ডিয়ান্সদের হলিডে, এইদিন স্কুল অফিস সব ছুটি থাকে, সবার ছুটি, জবা মাসিও ছুটি চেয়েছে, আসবে না। তাই মা একটু আপসেট, সব কাজ একা করতে হবে তো! আশু লেটস মেক আ প্রমিস টু মা, কাল আমরা মায়ের কাজে হেল্প করব! ওকে?'__

আশু চটজলদি ঘাড় নেড়ে দিল।তারপর বাপ-ব্যাটায় কিচেনে গিয়ে হাজির। রুমেলা তখন সিঙ্কে বাসন ধুতে ব্যস্ত। দুমদাম শব্দ হচ্ছে গোটা রান্নাঘর জুড়ে। রুমেলার ভিতরের আগ্নেয়গিরির আঁচ পাওয়া যাচ্ছে ভালোই।সাত্যকি বার কয়েক ঢোক গিলে আশুকে ইশারা করে এগিয়ে দিল।আশু সিগ্ন্যাল পাওয়া মাত্রই মা'কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। নিমেষে যেন রুমেলা শান্ত হল।আদর মাখানো গলায় বলল,

__' আশু তুমি সেই কখন ডিনার করেছ, এখনো কিন্তু ব্রাশ করনি, যাও করে নাও। তারপর খেলনাপাতি গুছিয়ে সোজ্জা বিছানায় যাও, ওক্কে?'__

সাত্যকির ধড়ে প্রাণ এলো। আশু বাবার দিকে তাকাতেই ওকে ইশারা করে বলে দিল, 'বল, কী বলতে এসেছিলিস'। আশু এক সেকেন্ড সময় নিল না,

__' মা, কাল ইণ্ডিপেন্ডেন্স ডে, সবার ছুটি, নো কাজ, সো নো স্টাডি। কাল সবার যখন ছুটি তখন আমারও ছুটি, আমিও কাল কোনো পড়াশোনা করব না।'__

রুমেলা এক ঝটকায় পিছন ঘুরে দাঁড়ালো। দুচোখ দিয়ে আবার সেই আগুন, নাকের দুই ছিদ্র দিয়ে আবার সেই গরম হাওয়া। আশু পরিস্থিতি বেসামাল দেখে কাঁচুমাচু মুখ করে বলে ফেললো,

__' বাবাই তো বলল, কাল সবার ছুটি।'

সাত্যকির হাঁটুর নিচ থেকে শরীরটা অবশ হয়ে গেল। কোনোরকমে ঢোক গিলে,

__' এ্যাঁ..হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছি, বলেছি...কাল সবার ছুটি। তোমারও।কাল কিচেন টোটাল বন্ধ, লাঞ্চ বাইরে করব।আর ডিনার ঘরে বানাবো আমি।'__

কথাগুলো বলেই সোজা ঘরে চলে এলো সাত্যকি।মনে মনে ভাবলো গিয়েছিল প্রমিস করতে আর ফিরে এলো পেনাল্টি দিয়ে, সব ব্যাটা ওই আশুটার জন্য।

(২)

গাড়ি সিগন্যালে এসে দাঁড়ালো। ছুটির দিন, আর তাই তো রাস্তায় জনারণ্য। কলকাতার মত শহরগুলো এইরকম সব সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকে। জীবন এখানে রোলারকোস্টারে চলে।সবাই ছোটে, কোথায় পৌঁছতে চায় কে জানে! যাইহোক ছুটোছুটির মধ্যে একটা 'হলিডে' মানে সাক্ষাৎ সঞ্জীবনী। আর এই সঞ্জীবনী পেলে রাস্তজুড়ে গাড়ির মেলা আর হর্ণের কলতান খুব স্বাভাবিক দৃশ্য।

স্টিয়ারিং হাতে সাত্যকি। পাশে রুমেলা। পিছনে আশু তার প্লাস্টিকের ডোরেম্যান নিয়ে। রেডিও মির্চিতে হাল্কা মিউজিক চলছে। রুমেলা মাঝেমাঝেই মোবাইল স্ক্রিনে নিজেকে একটু দেখে নিচ্ছে। অনেকদিন বাদ ডার্ক শেডের লিপস্টিক লাগিয়েছে, সাত্যকি বলল ভালোই লাগছে। সাত্যকি নিজেও আজ সকালে হেয়ার কালার করে নিল। আশু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, দেখে রুমেলাই বলল, ' দেখছো তো কতটা ডিফরেন্স আসে যে আশুও হাঁ করে দেখছে, আর ভাবছে এটা আমারিই বাবা তো?'

কাচের জানলায় হাল্কা টোকা। আশু ঘুরে তাকাতেই দ্যাখে বাঁদিকের জানলার বাইরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা রোগা-সোগা, গা'য়ে খয়েরী রঙের একটা গেঞ্জি, পকেটটা ছেঁড়া, সেটা সেফটিপিন দিয়ে জামার সাথে জুড়ে রাখা আছে।ছেলেটার মুখচোখ রুগ্ন হলেও, চোখদুটোয় বেশ একটা আত্মবিশ্বাস আছে, বয়স কত আর হবে? দশে-এগারোর বেশি নয়। জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা কীসব জিনিস বারবার দ্যাখাচ্ছে আর ইশারা করে কিছু বলছে। এসি চালু আছে।জানলা সব বন্ধ। আশু অবাক চোখে ছেলেটার ইশারা দেখছে, বুঝতে পারছে না কিছুই। ছেলেটার ইশারাগুলো বাবার ইশারাগুলোর মত নয়, বেশ শক্ত।

__'এ্যাই দ্যাখো ঝিনুক দিয়ে তৈরি, দেখবো একবার?'

রুমেলা বাচ্চা মেয়ের মত উচ্ছ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করল।সারাদিন ঘরই যার পৃথিবী তার ঘর সাজানোর একটা আলাদাই তাগিদ থাকে।সাত্যকি জানে। তাই বাধা দেওয়া দূরে থাক পারলে প্রশ্রয় দেয় পুরোদমে। আজও তাই কোনরকম আপত্তি না করেই,

__'ইচ্ছে হলে দ্যাখো, এ যা জ্যাম লেগেছে! সময় লাগবে, দেখে নাও'।

জানলার কাচ অল্প নামিয়ে ছেলেটার হাত থেকে ঝিনুকের তৈরি পাখি দুটো হাতে নিয়ে __

__'কোথাকার রে?'

__' দীঘা থেইকে এইসচি, নাও না'

__' কত করে দিচ্ছিস একেক'টা?'

__' পঁইচিশ করে, জোড়া নিলে পঁইতাল্লিশ।

__' ধুর, বলে দিলেই হল, জোড়াই নেবো তিরিশ দেবো, বুঝলি?'

ছেলেটার মুখটা একটু শুকনো হয়ে গেল। রুমেলার হাতে ধরে রাখা পাখি দুটোর দিকে চেয়ে থেকে __

__' অত কমে পাইরবো না গো, তুমি চইল্লিশ দিও'।

রুমেলা সাত্যকির সাথে দু-একটা ছোট্ট ছোট্ট ইংরাজি শব্দে আলোচনা সেরে নিয়ে পার্সে হাত দিল। আশুর ততক্ষণে বেশ ভালো লেগে গেছে ছেলেটাকে। ছেলেটা কী সাহসী, একা একা রাস্তায় হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে, ওর মা-বাবা ওকে বারণ করে না! সে নিজেও যে কবে এমন মনের আনন্দে, স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে পারবে!

__' তোমার আজকে স্কুল ছুটি, না?'

আশু প্রশ্ন করল ছেলেটাকে। ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে __

__' আমি স্কুল যাই না, কাজ করি'।

__' কী কাজ কর?'

__' পুতুল বিচি, বেইবসা করি'।

__ ' কে বলে করতে? তোমার বস?'

ছেলেটা এবার একটু হাসলো,

__' হ্যাঁ, মালিক'।

এইবার আশু গড়গড় করে বলে গেল,

__' আজকে তোমার মালিক তোমাকে ছুটি দেয়নি? আজ তো সবার ছুটি, আমার ছুটি, বাবার ছুটি, আমাদের বাড়ির জবা মাসিরও ছুটি, আজ ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে, জানো না?'__

ছেলেটার কপাল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা উস্কোখুস্কো ময়লা চুলের ফাঁক দিয়ে এক জোড়া মায়াবী চোখ হঠাৎ করে চিকচিক করে উঠলো যেন, ছুটি শব্দটা শুনে,

__' কী দে?'

__' ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে, আমাদের দেশ এইদিন ফ্রি হয়েছিল'।__

রুমেলা একশ টাকার একটা নোট​ জানলার ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে,

__' আজ স্বাধীনতা দিবস বুঝেছিস? শুনেছিস স্বাধীনতা দিবসের কথা? স্কুল গিয়েছিলিস তো? কোন ক্লাস অব্দি পড়েছিস?'__

ছেলেটা টাকার নোট'টা হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়ে থেমে গেল। কী একটা চট্ করে ভেবে নিয়ে,

__' বলতি ভুলে গেইচিলাম, আজ ইন্ডিপিন্ডের দিন তাই ভালো অফার আছে, এক জোড়া নিলে পঁইতাল্লিশ আর দুই জোড়া নিলে আশি,পাক্কা দশ টাইকার লাভ, নাও না দুইজোড়া! আজ তো ইন্ডিপিন্ডের দিন, আনোন্দের দিন!'__

রুমেলা কিছু বলবে ঠিক তখনি চারিদিক থেকে হর্ণ বেজে উঠলো, সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেছে। সাত্যকি স্টিয়ারিংটায় হাত রাখলো। আর এদিকে রেডিও মির্চিতে তখন দেশাত্মবোধক গান।

©রিঙ্কি বোস সেন

Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.