x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২০

মৌমিতা ঘোষ

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০২০ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।

হাওয়া মোরগ

যে সময়টা অনেক বছর পর লিখতে শুরু করলাম, তখন আমি কিচ্ছু জানি না যে এ জগৎটি কেমন।বড় আশা ছিল। বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল লেখক হওয়ার (সব শব্দের লিঙ্গ ভেদ পছন্দ নয়)। আমার কাছে তখন ও কবিরা অন্য দুনিয়ার মানুষ। তখন ও যাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি, তারা পাঠকের কাছে এত ইজিলি অ্যাকসেসিবল ছিলেন না। সবে ফেসবুক দুনিয়ায় আমি ও পা রেখেছি।

আমাদের বেড়ে ওঠা , বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাদের লেখা জড়িয়ে ছিল, যাদের সঙ্গীত জড়িয়ে ছিল, তাদেরকে কোনদিন চোখের দেখা দেখতে পাবো, এমন আশাই ছিল না।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে পরিচয় তার লেখায়, শীর্ষেন্দু র সঙ্গে ও।

এরকম বহু কবি-লেখককে কোনদিন দেখতে পাবো, এই আশাই ছিল না। তিনি যা লিখতেন, আমার বোধে যা কুলাতো তাই দিয়ে একটা নিজের অর্থ, নিজের ভাবনা, নিজের ব্যাখ্যা তৈরি করতাম। আমি কি রবীন্দ্রনাথ কে কোনদিন গিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, " এই গানটায় এই লাইনটা আপনি কী ভেবে লিখেছেন?" উপায় ও ছিল না। আমার জন্মের বহু আগে তিনি গত হয়েছেন। কিন্তু আমার সময়ে বেঁচে থাকলেও কখনো গিয়ে কি শীর্ষেন্দুকে জিজ্ঞেস করতে পেরেছিলাম কেন অমুক লাইনটা? মান্না দে কে; কেন এই লাইনটা এই অভিব্যক্তিতে গাইলেন?

আমার, আমাদের ভালো লাগা অথবা খারাপ লাগা থেকেছে কোন সৃষ্টির প্রতি।স্রষ্টা হাতের নাগালে ছিলেন না। তাই যখন লিখতে আসি, তখন ও বড় ভরসা ছিল, বড় পবিত্র লাগতো অক্ষর চর্চা।তারপর একদিন একটি সাধারণ কথায় দেখলাম কোথাকার জল কোথায় চলে গেল! "আমি সত্যিই বুঝিনি" বলতে এক বিখ্যাত কবি ও বন্ধু বলেছিলেন " ওটা বললে তো হবেনা, লিখতে এসেছ, নাম করতে চাও আর পলিটিক্স বুঝবে না, তা তো হবেনা।" সেদিন বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। দেখলাম 'লিখে' নাম করা বস্তুটি শুধু ই ' লিখে' হবেনা। তার অনেক শর্ত থাকে। এরপর ফেসবুক রমরম করে চলল। সব্বাই এক প্ল্যাটফর্মে। পাঠক-লেখকের দূরত্ব গেল ঘুচে, গায়ক-অডিয়েন্সের দূরত্ব গেল ঘুচে।ব্যস। যতক্ষণ দূরত্বে থাকে মানুষ ততক্ষণ সুন্দর লাগে তাকে, মোহময়। নায়িকারা যদি হাতের নাগালে এসে যায়, তাদের গালের ব্রণ, গালের গর্ত দেখা যায়। লেখক সামনে এসে পড়লে তার যাপন স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে। তখন নায়িকার অভিনয়ের​ চেয়ে পাবলিকের মনে জেগে থাকে তার ব্রণ, লেখকের সাহিত্যের চেয়ে তার মনে জেগে থাকে তার দৈনন্দিন জীবন। শাহরুখ খান ও পাতলা পায়খানা করে এটা ভাবতে ভালো লাগে , বলুন? কিম্বা ঐশ্বর্য? আপনি সেটা সামনে থেকে দেখলে ঐশ্বর্য কে যেমন স্বপ্নে ভাবতেন, তেমনটা আর ভাবতে পারবেন? এই হল হাটে বাজারে এসে পড়ার মুশকিল।সবেতেই পাঠক আপনার জীবনকে খুঁজবে। যে কোন লেখা, যে কোন চরিত্রেই। আপনি শোওয়ার দৃশ্য লিখেছেন মানে ওটা আপনারই গোপন অভিসার রুম, আপনি পরকীয়া লিখছেন মানে আপনিই কেষ্ট ঠাকুর।আগে পাঠক যেটা মাথা খাটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতো, এখন সেটা সরাসরি লেখককে জিজ্ঞেস করবে, আপনি এমনটা কেন লিখেছেন মশাই? লেখক নতজানু হয়ে, মেড ইজি হয়ে বোঝাবেন। পাঠক বলবেন, উঁহু, মোটেও আমার এক্সপেকটেশন এর সাথে মিলল না। সে আপনার এক্সপ্ল্যানেশনের স্ক্রিনশট নিয়ে জনমত নেবে, বাংলা বাজারে কালিঘাটের বাপি লাহিড়ীর মতো সোনার চেন ঝোলানো পান্ডাও এসে শিখিয়ে যাবে, আপনার এটি লেখা ঠিক হয়নি।আর লেখক, ফেসবুকের টি আর পি তে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে আরো আটভাট যুক্তি দেবেন ও ধীরে ধীরে তার সম্মানটি বাসি ফুলের মতো

তার এযাবৎকালের সাহিত্যকৃতির বৃন্ত থেকে টুপ করে ঝরে পড়বে। পাঠক খুশি উচিৎ শিক্ষা দিতে পেরে। মজা হচ্ছে, বাকি লেখকেরা ও খুশি, উপযুক্ত দাওয়াইটি আপনি পেয়েছেন বলে।সেই চিরকালীন ঘুঁটে পোড়ার গন্ধ।

এবার আসি পাঠক বা চিরকালীন জনতায়। জনতা হল বোধহীনতার একটি সমষ্টি রূপ, সে পুজো করতে ভালোবাসে।সে রামকেও পুজো করে, সলমনকেও। সে হয় মাথায় তুলে নাচা বোঝে, নয় পায়ের তলায় পেষা বোঝে। তার কাছে কবি, লেখক, অভিনেতা, গাইয়ে হয় গুরু, নয় শালা চুতিয়া।সে কথায় কথায় লোককে ভগবান বানায়, ততক্ষণ তার পুজো করে যতক্ষণ নতুন কেউ এসে তার ভগবান ইমেজ ভেঙে না দিয়ে যায়।​ এটা ওই অমিতাভ এসে রাজেশের মার্কেট নিয়ে নেওয়ার মতো সহজ। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রাক্তন ভগবানটির কুশপুতুল পোড়ানো অবশ্য কর্তব্য।আর কুশপুতুল খুব সহজে ফেসবুকে পোড়ানো যায়।খাপ বসানো যায় , হাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া যায় ফিসফাস।

মজার জায়গা এই স্যোশাল মিডিয়া। ধরুন আমি লিখলাম "এক মহিলা লেখক, তার​ চরিত্রের ঠিক নেই, তবু অনেক সুবিধা পাচ্ছেন, এদের মুখোশ খুলে দেওয়া উচিৎ।"

" ব্যস একশো জন, পাঁচশো জন( প্রোফাইলে বন্ধু সংখ্যার নিরিখে, এভাবেই সফ্ট ওয়ারটা বানানো) এসে বলে যাবে " সঙ্গে আছি, খুলে দেওয়াই উচিৎ।"

যে শালা আমার বাপ মারা গেলেও সঙ্গে থাকেনি, হাসপাতাল যাওয়া, আমার মনখারাপের বিকেলে কোনদিন সঙ্গে থাকেনি সে এ বিষয়ে 'সঙ্গে আছে। '

আর কবিও খুশি​ ব্রিগেড ভরিয়ে 'তুলে আনা' লোক দিয়ে।

এবারে আকাশে কিছু খিস্তি খাস্তা চলল। কেউ জানে না,কাকে খিস্তি দিচ্ছেন।

এবার দেখা গেল যাকে এতক্ষণ খিস্তি দিচ্ছিল সে বেশ প্রভাবশালী , বহু অনুষ্ঠানের গণ্যমান্য উদ্যোক্তা, ব্যস ওই লোকেরাই বলবে, " দাদা , আপনার সঙ্গে ছিলাম, সারাজীবন থাকবো। ও দুদিনের যোগী, আমাদের ভুল বুঝিয়েছে।"

ব্যস প্রাক্তন গুরুর গাছ লাগানোর ছবি সরে গেল রঙ্গমঞ্চ থেকে।চলে এলো নতুন লোকের পাঞ্জাবি। কিন্তু আর যাইই হোক, গাছ লাগানো নিয়ে কথা হবে, পাঞ্জাবি নিয়ে চর্চা হবে, কিন্তু লেখার তুল্যমূল্য হবেনা। এটাই কাছে চলে আসার মুশকিল। যে আপনাকে হিরো ভাবতো সেও জেনে যাচ্ছে একটি অসাবধানী আচরণে, আপনি পাবে গিয়ে কতটা ছড়ান, সামপ্লেস এলসে কে ছিল আপনার সাথে বিয়ার হাতে। ব্যস আপনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণ থেকে ডিরেক্ট লুচ্চা, মাওয়ালি, আপনার খাওয়া থেকে হাগা নিয়ে ট্রোল।​

জনতার নতুন নতুন টপিক চাই। তার ভাবার সময় দু মিনিট , সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আধ সেকেন্ড, সেটা নিয়ে ক্রমাগত হ্যাজ নামানোর সময়​ তিন দিন। তারপর তার আলুনি লাগে সব। তার নতুন নতুন টপিক চাই। তাই সে নতুন ড্রয়িঙরুমে তাক করে তার দূরবীন।এই বিশ্ব সংসারে তার সব কিছুর জবাব চাই , এদিকে নিজের ছেলেও কোনদিন কোন প্রশ্নের জবাব দেয়না, পাত্তাই দেয়না, তাই সে জবাব আদায় করতে মাঠে নামে, অন্যের স্বাক্ষর নেয় অক্ষরের অপমানের জন্য। এবারে এখানে একজন কবি নিজেও অন্যের ক্ষেত্রে নির্বোধ জনতা হয়ে যায়, আর এই ঘটনা আমাকে অবাক করে দেয়।সে অপছন্দের লোককে বাজার থেকে সরিয়ে বাজার দখল করতে চায়। গ্যাঙ ওয়ারের মতো এ ওকে সরিয়ে দিতে চায় , এখানে গোলা-বন্দুক সবই কুৎসা।আর তার ব্রহ্মাস্ত্র স্ক্রিনশট।

এর মধ্যেই নতুন লিখতে আসা ছেলেটি শেখে এমন কুৎসিতই এ জগৎটা। তার আমার মতো প্রচন্ড বমি পায়। সে ছেড়ে চলে যায়, বা ধান্দাবাজি শিখে যায়।তারপর আবার সেই ছেলেটি নেতা হয়। হ্যাঁ কবিরা এখন, গুরু, নেতা, রাজনীতিকের মতো ভাবতে ভালোবাসেন, চলতে ভালোবাসেন। অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে কত নাম সরিয়ে দেন সাহিত্যের অঙ্গন থেকে।কত কিছু তারা ভোগ করতে পারেন, এক্কেবারে সিনেমার রাজনৈতিক নেতাদের মতো।তারা চান লোকে কাঁধে তুলে নাচুক, তার একটি কথায় হাজার লাইকের ফোয়ারা ছুটুক, কোটি শেয়ার হোক। আমাদের ছোটবেলায় বাচ্চারা সামনের বন্ধুর শার্টে কালি ছিটিয়ে দিয়ে খুব আনন্দ পেতো। তারা তখন কলমের ব্যবহারটা বুঝতো না।এত বড় হয়েও ওনারা কলমের ব্যবহারটা ওই বাচ্চা ছেলেটির মতোই করেন।

আর কয়েকজন সব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, আকাশের দিকে তাকিয়ে আরেকবার উদারতা শিক্ষা করে, বাতাসের দিকে তাকিয়ে এক নিমেষে জড়িয়ে ফেলতে, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে শেখে নির্জনতাই​ একমাত্র সৌন্দর্যের প্রকাশ, আর শব্দ একটি পবিত্র জল, মাথায় ছিটিয়ে নিতে হয়, জিহ্বায় এঁটো করে দিতে নেই।

©মৌমিতা ঘোষ

Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.