x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শনিবার, আগস্ট ০৮, ২০২০

শনিরবচন

sobdermichil | আগস্ট ০৮, ২০২০ |
রাম নাম সত্য হ্যায় / শনিরবচন

অনেকের পরিবরেই কালাশৌচ চলছে। সদ্য প্রিয়জন বিয়োগব্যথায় পরিবারসুদ্ধ সকলেই শোকে মুহ্যমান। না তাদের কাছে এটা উৎসবের সময় নয়। এমন আকস্মিক মৃত্যু তো কারুরই অভিপ্রেত নয়। কেউই প্রস্তুত ছিলো না এই করোনাকালের জন্য। কেউই প্রস্তুত ছিল না এই মহামারীর জন্য। সেই শোকের সময়ে, পারিবারিক কালাশৌচ চলার ভিতর কোন পরিবারই কোন উৎসবের আয়োজন করে না। এটাই আবহমান ভারতীয় রীতি। এই কারণেই দেখা যায়, কালাশৌচ চলাকালীন পারিবারিক ভাবে সামাজিক কোন উৎসব অনুষ্ঠানেও যোগ দেওয়ার রীতি নাই। এমন কি ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠান থেকেও কালাশৌচ চলাকালীন নিজেদের সরিয়ে রাখাই ভারতীয় সংস্কৃতি। কিন্তু সম্প্রতি সেই ভারতীয় সংস্কৃতির রীতি রেওয়াজ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের বিশাল উৎসব আয়োজিত হয়ে গেল সেই অযোধ্যায়। ঠিক যখন আবিশ্ব করোনা সংক্রমণের তালিকায় ২০ লক্ষ ২৭ হাজার ৭৪ জন ভারতীয় নিয়ে ভারতবর্ষ তৃতীয় স্থানে অবস্থানরত। এবং অতি দ্রুত ব্রাজিলকে টপকিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের দৌড়ে এগিয়ে চলেছে অপ্রতিহত গতিতে। আর আবিশ্ব মৃত্যুর তালিকায় ৪১ হাজার ৬৩৮ জনের ভবলীলা সাঙ্গ করে ভারতবর্ষ পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। যে কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দেশেই এটা রাষ্ট্রীয় শোকের সময়। ধর্মীয় উৎসবের সময় নয়। রাজনৈতিক সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠান আয়োজনের সময়ও নয়। সাম্প্রদায়িক অস্মিতা প্রদর্শনেরও সময়ও নয়। আহ্লাদে পেশীশক্তির প্রদর্শনে নৃত্য করারও সময় নয়। ৬ লক্ষ ৭ হাজার ৩৩১ জন এই মুহুর্তে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে যে দেশে, সেই দেশের শারীরীক ভাবে সুস্থ জনগণের একটা বড়ো অংশই তখন অযোধ্যায় মন্দির শিলান্যাসের আনন্দে উৎসবের উন্মদনায় উন্মত্ত! এই যে মানসিক অসুস্থতা, আবিশ্ব করোনাকালে এই অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশে ভারতবর্ষের এই বিশ্বরেকর্ডও লিপিবদ্ধ হয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়।

ইতিহাসের পাতায় একজন বেহালাবাদক নীরোর কথাই লিপিবদ্ধ ছিল এতদিন। অগ্নিদগ্ধ রোম নগরীর মৃত্যুর আর্তনাদের সুরকে ছাপিয়ে বেহালার ছরে সুর চড়িয়ে ছিলেন বেহায়া নীরো। যে ইতিহাসের কোন ভাগীদার ছিল না এতদিন। কিন্তু না। এখন আর নীরোকে একমেবাদ্বিতীয়ম বলা যাবে না। ভাগীদার কোন একজন বিশেষ ব্যক্তিও নয়। একটা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। একটি জনসম্প্রদায়ের এক বিশেষ অংশ। প্রায় অর্ধ লক্ষ স্বদেশবাসীর মৃত্যুর প্রহরে এত বিশাল আয়োজনে উৎসব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে আমরা দেখিয়ে দিলাম আমরাও পারি। বেহালা বাজাতে। 

সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় রাজনীতির প্রভাবে সামাজিক পরিসরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যাগযজ্ঞ ইত্যাদির ঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। অনেকেই নতুন করে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। যতটা না ধর্মীয় কারণে, তার থেকে অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রসূত হয়ে বিশেষ রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখানোর কারণে। সেই রাজনৈতিক আস্ফালনে আমরা ভুলে গেলাম, এটা রাষ্ট্রীয় শোকের সময়। এটা হিন্দুধর্মের রীতি রেওয়াজ অনুসারেই কালাশৌচের কাল। এক শ্রেণীর উগ্র হিন্দুয়ানী ধ্বজাধারীদের হাতে সেই হিন্দু সংস্কৃতির আবাহমান কালের এই রীতির রাম নাম সত্য হ্যায় হয়ে গেল অযোধ্যায়। 

না তাতে আমাদের কি? কিই বা এসে গেল? যাদের ঘরে আজ প্রিয়জন বিয়োগে রান্না চড়ে নি। যাদের ঘরে আজ একমাত্র উপার্জনশীল মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে কোভিড-১৯, তারাই জানে কালাশৌচের মূল্য। তারাই উপলব্ধি করছে প্রিয়জন হারানোর জ্বালা। তারাই বোঝে শোকতাপের নিদারুণ কষ্টের যাতনা। হাজার হাজার ঘরে যখন এই কাহিনী। তখন রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে মহাকাব্যের কিংবদন্তী নায়কের নামে মন্দির শিলান্যাসের যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানের উন্মত্ত উৎসব। এ শুধু ভারতবর্ষেই সম্ভব। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি। এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে যখন লক্ষ লক্ষ পরিবারে সংক্রমিত অসুস্থ প্রিয়জনের জীবন নিয়ে টানাটানি চলছে। রাষ্ট্র তখন চল্লিশ কেজি ওজনের রূপোর ইট নিয়ে টানাটানি করছে। মহাকাব্যের নায়কের নামে। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন তার নাগরিকের জন্য অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ থেকে শুরু করে হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি করে করোনার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, আমরা তখন থালা বাজাই। আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালি। কোটি কোটি টাকার পুষ্পবৃষ্টি করি। অতিরিক্ত মূল্যে যুদ্ধ বিমান কিনে আমাদের সামরিক শক্তির বিজ্ঞাপন দিই। কালাশৌচের কালেই নির্মাণ উৎসবের উন্মত্ত আনন্দে মাতি। হাসপাতালের বদলে মন্দির নির্মাণ করি। হিন্দু ধর্মের রীতি রেওয়াজেরই রাম নাম সত্য হ্যায় করে ছাড়ি। না তাতে আমরা ধর্মচ্যুত হই না। বরং আরও বেশি করে ধর্মীয় পেশীশক্তির আস্ফালনে উন্মত্ত হয়ে উঠি। এটাই কি নতুন ভারতীয় সংস্কৃতি তবে? এটাই কি একবিংশ শতকে পৌঁছিয়ে ভারতীয়ত্বের পাসপোর্ট? 

এই নতুন ভারতীয় সংস্কৃতিকে মাথায় তুলে নৃত্যরত না হলেই তুমি আর ভারতীয় নও। দেশদ্রোহী। এই যে অশনি সংকেত আজ চারিদিকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচারিত হচ্ছে, এরও নিশ্চয় একটি সুনির্দিষ্ট পরিণাম অপেক্ষা করছে সমগ্র ভারতবাসীর কপালেই। সেই পরিণতি থেকে কেউ কি আলাদা করে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হবে? হবে কি হবে না। পারবে কি পারবে না। সেকথা জানা যাবে আজ নয়। আগামীতে। কিন্তু আজ যদি আমরা গান্ধারীর মতো চোখে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ফেটি বেঁধে মহাকাব্যের নায়কের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে, সেই জয়ধ্বনিকেই ভারতীয়ত্বের পাসপোর্ট বলে স্বীকার করে নিই। তবে সেটি নিজের পায়েই কুড়ুলের কোপ মারার মতোন বিষয় হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা এক উন্মত্ত দিশাহীন নির্মম নৃশংস সমাজ উপহার দিয়ে যাবো। আগামী প্রজন্ম কেন ইতিহাসও সেদিন আমাদের ক্ষমা করবে কি? না কি আজকের এই সম্মিলিত পাপের বোঝা থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে শুরু হবে অভুতপূর্ব এক মুক্তিযুদ্ধ? জানি না আমরা। কিন্তু সম্ভাবনা থেকেই যায়। অনন্ত ইতিহাস আমাদের সেই ইঙ্গিতই দেয় বারবার। ইতিহাসই প্রমাণ করেছে এক যুগের পাপ ধুতে আর এক যুগের মহাসংগ্রামের জন্ম হয়। 

ভারতবর্ষ আজ প্রমাণ করেছে, ভারতীয়দের শোক দুঃখের সাথে ভারতবর্ষের আর কোন সংযোগ সূত্র নাই। দেশের লোক রোগে ভুগে মরুক। না খেতে পেয়ে মরুক। বাস ট্রেনের অভাবে কোটি কোটি ভারতবাসী হাজার হাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মরুক। ঝড়ে বন্যায় মহামারীতে মরতে থাকুক। তাতে ভারতবর্ষের কি? ভারতবর্ষের তাতে কি এসে যায়? কারণ ভারতবর্ষ জানে একশ ত্রিশ কোটি মানুষের ভিতর সুইস ব্যাঙ্কে জমানো কালো টাকার কারবারীদের, দেশের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে চলে যাওয়া বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীদের, দেশের জনগণকে শোষণ করে ফুলে ফেঁপে ওঠা হাতে গোনা শিল্পগোষ্ঠীদের, এবং বিশেষ কয়েকজন ব্যাংক লুঠেরাদের সুরক্ষা দিয়ে সুরক্ষিত রাখতে পারলেই ভারতবর্ষ টিকে যাবে। তাতে একশ ত্রিশ কোটি ভারতবাসীর কত লক্ষ মানুষ মরলো কি বাঁচলো তাতে ভারতবর্ষের কিছু এসে যায় না। যে ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে এই এতকিছু সেই ধর্মের রীতিরেওয়াজের রাম নাম সত্য হ্যায় করে দিলেও কিছু এসে যায় না। শুধু দেশ জুড়ে আরও আরও মন্দির প্রতিষ্ঠা করে যেতে হবে। না হলে জনগণ বলে পদার্থটাকে ধর্মের আফিমে বশীভুত করে রাখা সম্ভব হবে না। ভারতবর্ষই জানে, ধর্ম নয়। ধর্মের কোন অস্তিত্বের আর প্রয়োজন নাই। ধর্মের আফিমটুকুর চাষ করে গেলেই হবে শুধু। সারা দেশ জুড়ে ধর্মের সেই আফিমের চাষ শুরু হয়ে গিয়েছে। একেবারে উন্নত প্রকৌশলে। এই বিষয়ে ভারতবর্ষ গোটা বিশ্বে একমেবাদ্বিতীয়ম। সেই প্রথম স্থান ধরে রাখতেই আজ ধর্মের রাম নাম সত্য হ্যায়ের এত বড়ো আয়োজন। এশুধু পঞ্চবার্ষিকী প্রকল্পই নয়। আরও বৃহৎ এর পরিকল্পনা। আরও গভীর। আরও সর্বাত্মক। 


৮ই আগস্ট’ ২০২০ /কপিরাইট লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.