x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

রবিবার, জুলাই ১২, ২০২০

পুরুষোত্তম সিংহ

sobdermichil | জুলাই ১২, ২০২০ |
কমলেশ গোস্বামীর গল্প

কমলেশ গোস্বামী (১৯৫০) ইতিহাস চর্চা, নাট্যচর্চার সমান্তরাল ধারায় গল্পচর্চাও করেছেন। তাঁর ‘প্রান্তিক’ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থে প্রান্তিক শিরোনামে কোন গল্প নেই। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের কথা আছে। এক প্রান্তিক পরিসর থেকে তিনি যখন গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করছেন তখন তার নাম যে ‘প্রান্তিক‘ ই হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ গ্রন্থে পনেরোটি গল্প স্থান পেয়েছে।তিনি রায়গঞ্জের মানুষ। ‘বন্যা’ গল্প বিষয়কেন্দ্রিক। বন্যায় নিম্নবিত্তের লড়াই সংগ্রাম, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে অন্যভূমিতে পাড়ি দেওয়া বড় নিপূণ করে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। কৈবত পাড়ায় বাস নীলুর। বন্যায় চারিদিক ভেসে গেছে। সমান্য আহার টুকুও সংগ্রহ করে উঠতে পারেনি। ধার তো করতেই হয়েছে, সঙ্গে জলও ঘরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু লেখক গল্প শেষে এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন। মেঝেতে জলের শব্দে নীলু ভাবে হয়ত বোয়াল মাছ, বর্শা ছুঁড়ে মাছ স্বীকার করতে চায়। আসলে তাঁদর সন্তান গোপাল জলে পড়ে গিয়েছিল। তবে লেখক শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর হননি। বর্শা আঘাত করেনি গোপালকে। তবে এই বর্শাই যেন নীলুর দৃষ্টি স্পষ্ট করে দেয়, অশনি সংকেতের বার্তা আরও স্পষ্ট করে দেয়। জীবনে বেঁচে থাকার সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যায়, যেখানে ডাঙা আছে, জীবনের সন্ধান আছে। নীলু জানে শুধু নিজে নয় স্ত্রী, পুত্র দুজনকেই বাঁচাতে হবে, ফলে এই বধ্যভূমিতে আর নয়, নতুন ভূমির সন্ধানে এগিয়ে যায়। গল্পকার সহজ সরল ভাষায় জীবনসত্য ফুটিয়ে তোলেন। নিজস্ব ভূগোলকে সামনে রেখেই তিনি আখ্যান পরিক্রমা সমাপ্ত করেন। অযথা কথা বা উপকাহিনি নয় তিনি সংক্ষেপে নিটোল গল্প গড়ে তোলেন, যা দ্রুত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

  ‘খোঁজ’ গল্পে বহুস্বরের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন। ছাই থেকে সোনা খুঁজে বার করা, জীবনের ভালোবাসার খোঁজ করা। ছাইয়ের তলায় যেমন সোনা খুঁজে বের করতে হয় তেমনি ভালোবাসাও খুঁজে পেতে হয়। ছাইয়ের তলা থেকে যেমন সোনা সবসময় পাওয়া যায় না , তেমনি সবসময় ভালোবাসাও নয়। গল্পের প্রেক্ষাপটে আছে কুলিক নদীতে ছাই ধোয়ার প্রসঙ্গ। সোনার দোকানের ছাই ধুয়ে সামান্য সোনা পাওয়া যায়। সে কাজই করত হাজিপুর থেকে আসা সত্যনারায়ণ ও তাঁর ছেলে রামঅবতার। সময়ের পরিবর্তনে সোনার দোকান সব হলমার্ক সোনার ব্যবসা শুরু করেছে। ফলে ছাই থেকে সোনা পাওয়া কমেছে। সত্যনারায়ণদের আয় নেই। পিতা পুত্র ভেবেছে দেশে ফিরে গিয়ে নতুন ব্যবসা করবে। ইতিমধ্যেই বিবাহ হয়েছে রামঅবতারের। স্ত্রী জাননী আছে দেশে। আজ সে কাজ করলেও মন পড়ে থাকে দেশে স্ত্রীর কাছে। নিজেকে শুধু অপরাধী মনে হয়না, জানকীকে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুখী মানুষ। আজ এক বিন্দুও সোনা, রুপা পায়নি। লেখক গল্পের শেষে জীবনসত্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন –‘’বারান্দা, উঠানের জমা করা ছাইগুলো যেন রামুকে বিদ্রুপ করে বলে,- রে ছাইওয়ালা , ঘরে সোনার জাননীকে রেখে, এই পোড়া কালো ছাইয়ের মধ্যে, তুই- কী খুঁজছিস রে ?’’ ( প্রান্তিক, সূচিপত্র, প্রথম প্রকাশ ২০০৮, পৃ. ২০ ) নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে ভালোবাসার কোন অবকাশ যে নেই তা লেখক দেখান। কিন্তু মন বাঁধবে কে ? মনের তো কোন উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত নেই। মন তো আপন তালেই ভালোবেসে চলে, হৃদয়ের গভীর তলদেশ থেকে ভালোবাসার যে শতধারা বয়ে চলে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই রামঅবতারের। শুধু রামঅবতার কেন কারোরই থাকে না, সেই জীবনসত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

     স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই তো মানুষের বেঁচে থাকা। অথচ আজ মানুষ সমস্ত ভুলে শুধু বর্তমান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইছে। কমলেশ গোস্বামী ‘মণিকোঠা’ গল্পে ফিরে গেছেন স্মৃতির জগতে। একটি বিবাহকে সামনে রেখে ভিন্ন বিবাহের রহস্য সন্ধান করেছেন, যেখানে রয়েছে অত্যাচার ও বিত্তশালীদের শোষণ। আজকের ভালোবাসা সঠিক হলেও সেদিন ছিল অন্যায়। আর সেখানে যদি শ্রেণির ব্যবধান থাকত তবে লাঞ্ছনা ছিল অনিবার্য। সেই লাঞ্ছনাই ভোগ করতে হয়েছিল হেমনলিনীর কাকাকে। রাজু ও নীলা প্রেম করে বিবাহ করে শ্বশুড় বাড়ি গেছে। সেখানে রাজু ঠাকুমা হেমনলিনীর কাছে পূর্বের প্রেম বৃত্তান্ত শুনতে চেয়েছে। হেমনলিনী শুনিয়েছে পূর্বের প্রেমের কথা। এখানে বিধবার প্রেমের কথা আছে কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজের চিত্র লেখক বড় করে দেখান। রায়কর্তার বিধবা মেয়ে সারদার সঙ্গে প্রেম করত হেমনলিনীর কাকা, পালিয়েও গিয়েছিল, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ধরা পড়ে লেঠেলদের প্রচন্ড প্রহারে পাগল হয়ে গিয়েছিল ছোটকাকা। শুধু একটিই বাক্য মুখ থেকে শোনা যেত –‘’দৌড়ো সারদা, দৌড়ো।‘’ একদিকে বিধবা নারীর প্রণয় ও রায়কর্তার শ্রেণি পরিচয় লেখক বড় করে তুলেছেন। বিধবা বিবাহ প্রচলিত হলেও সমাজ তা যে গ্রহণ করেনি তা যেমন দেখান তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য, বংশ মর্যদা, গোত্র আজও ভয়ানক সমস্যার সৃষ্টি করে। আমরা যতই আধুনিকতা দাবি করি না কেন মননে যে এখনও অন্ধকার বিরাজ করে চলেছে সেই সত্য লেখক প্রতিপন্ন করেন।

  কমলেশ গোস্বামীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘উইলিয়াম কেরী মদনাবতী ও আমি’। এ গল্প হারানো ইতিহাসের সন্ধান। জনপদ জীবনের কত ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে তা লেখক অদ্ভুত মায়াবি ভাবে পরিবেশন করেছেন। জাদুবাস্তবতা, ফ্যান্টাসির মধ্য দিয়ে তিনি ডুবে গেছেন ইতিহাসের সন্ধানে। একজন সাংবাদিক কবি লেখকদের সঙ্গে গিয়েছেন মদনাবতীতে খবর সংগ্রহে। সাংবাদিকের ছিল ভারতবর্ষের অকথিত ইতিহাস জানার আগ্রহ। সে সাংবাদিক যে লেখক নিজেই তা আর বলার অপেক্ষা থাকেনা। কমলেশ বাবু নিজেও ইতিহাস অনুসন্ধানকারী, উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর ইতিহাস গড়ে তুলেছেন। সাংবাদিক টাঙ্গন নদী দেখতে গেলে সবাই চলে যায়। সেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়, ফলে মদনাবতীতেই সেদিন থেকে যেতে হয়। রাতের স্বপ্ন হাজির হয় উইলিয়াম কেরীর নীল চাষ, সংবাদপত্র ছাপা ও মদনাবতী থেকে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ। বলা ভালো লেখক স্মৃতিলোকে পাঠককে নিয়ে যান উইলিয়াম কেরীর মদনাবতীতে অবস্থান কালীন সময়ে। জনপদ জীবনের এক বৃহত্তর ইতিহাস তিনি শুনিয়ে যান। কেরীর কুঠি স্থাপন, নীল চাষ, বিদেশ থেকে মুদ্রণযন্ত্র আনা, হরফশিল্পীর সাহায্যে হরফ তৈরি, পত্রিকা প্রকাশ, নীল চাষে ক্ষতি, মালিক উডনি সাহেবের নির্দেশে কুঠি উঠিয়ে দেওয়া, কেরীর চন্দননগরে চলে যাওয়া, মৃত সন্তানের জন্য বেদনা, গ্রামের মানুষের আক্ষেপ তিনি ছবির মতো ফুটিয়ে তোলেন। এতগুলি চিত্র ফুটিয়ে তুলতে লেখককে বারবার দৃশ্যান্তরে যেতে হয়। গল্পের পরিসরের জন্যই লেখক এই দৃশ্যান্তরে যেতে বাধ্য হন। স্বপ্ন তো ক্ষণিক, কিন্তু সেই ক্ষণিকের মধ্যেই অনেক ছবির দৃশ্য ফুটে ওঠে। লেখক মানবিক কেরীর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সন্তান হারিয়েও সে পত্রিকা প্রকাশের কাজ ও কুঠি চালিয়ে গেছেন। লেখকও গল্পকে বাস্তব থেকে নিয়ে গেছেন স্বপ্নালোকে । কেরীর ব্যক্তিজীবন, আত্মত্যাগ, প্রেম ভালোবাসা নিয়ে যে সম্পূর্ণ মানুষ সেদিকে নজর দেন –

‘’আপন মনে কথা বলছিলেন সাহেব, কবরস্থ সন্তানের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। এক নারীমূর্তি এগিয়ে আসছিল সেদিকে। উপবিষ্ট মানুষটির কাছে এসে উন্মাদিনীর মতো হাসতে থাকেন সেই নারী। উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলতে থাকেন –‘কেরী তুমি বলেছিলে ঈশ্বরের দরিদ্র সন্তানদের জন্য কাজ করলে আমরা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র হব। তাহলে শিশু পুত্র পিটারকে কেন ঈশ্বর কেড়ে নিলেন ? তুমি আমাকে বলো কেরী, কেন পিটার আমাদের ছেড়ে চলে গেল, বলো, তুমি বলো ?’ কান্নায় ভেঙে পড়েন নারী। উন্মাদিনী স্ত্রীকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কি যেন বলতে থাকেন পুরুষটি। পরম মমতায় তাঁকে বেষ্টন করে চলতে থাকেন কেরী।‘’ (তদেব, পৃ. ৩৭ )

মাত্র কয়েক ঘন্টার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে লেখক মদনাবতীর জনপদ জীবনের ইতিহাস পাঠককে শুনিয়ে দিয়েছেন। শক্ত করে গল্পের কাঠামোকে ধরে রেখেছেন। বিন্দুতে সিন্ধুর দর্শন দিয়েই দৃশ্যান্তরে চলে যেতে বাধ্য হন। প্রকৃত ইতিহাসের সন্ধান করা ঐতিহাসিকের কাজ, গল্পলেখকের কাজ ভিন্ন। তিনিও ইতিহাস বলেন তবে তাঁর ইতিহাস ভিন্নবোধ তৈরি করে। ফলে কেরী যখন চলে যাচ্ছেন সে নিজেও যেমন ব্যথিত তেমনি গ্রামের মানুষও ব্যথিত। লেখক সামান্য পরিসের এক বৃহৎ ক্যানভাস অঙ্কন করেন। আসলে এই জনপদ জীবন সহ, নিজের সমস্ত গল্পের ভূগোল তাঁর অতি পরিচিত। ফলে গল্প কখনই কৃত্তিম হয়ে ওঠেনা। এক সহজাত বোধ ও শৈল্পিক দক্ষতায় তিনি সেগুলি পরিবেশন করেন, ফলে আখ্যান ছবির মতো ফুটে ওঠে।

      ‘নোঙর’ গল্পে লেখক বড় করে তুলেছেন একজন পুরুষ কার কাছে নোঙর ফেরাবে – ভালোবাসা, অর্থ, সৌন্দর্য না সুখ। ভালোবাসার কাছেই শেষ পর্যন্ত নোঙর ফেরাতে হয়েছে। ভালোবাসা ছাড়া যেমন সুখ সম্ভব নয় তেমনি ভালোবাসাহীন মানুষের পক্ষে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। পুরুষের যে বহুমুখী রিপুময় প্রবৃত্তি লেখক ছদ্মবাস্তবতায় প্রকাশ করেন। জগন্নাথের রিপুময় প্রবৃত্তির জন্য তাঁকে সমগ্রভাবেই দায়ী করা যায় তা নয়। স্ত্রী ছিল পাগল। পাগল স্ত্রী নিয়ে সংসার চালিয়ে গেলেও সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। বিকল্প বাস্তব হিসেবে সে গোলাপীকে বিবাহ করে। এই বিবাহে সংসার যেমন ভেঙে যায় তেমনি লেখক গল্পের আখ্যানকেও ভেঙে দেন। এক পুরুষ, দুই নারী। স্বাভাবিক ভাবে নতুনের প্রতি মন ধাবিত হয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা হল লেখকের ট্রিটমেন্ট ও উপস্থাপন কৌশল। দুই নারীর ঈর্ষা তো আছেই, পাগলীর জন্য জগন্নাথের আত্মদংশনও ফুটে ওঠে।  তেমনি ভালোবাসা হারিয়ে পাগলীর কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ভালোবাসার অভাবে সে যেন বোবা হয়ে গেছে। বিকল্প বাস্তব হিসেবে জগন্নাথ যে গোলাপীকে গ্রহণ করেছিল সেখানেই প্রতারিত হয়েছে। গোলাপী, সুবলদের মধ্য দিয়ে আধুনিক সময়ের নশ্বর প্রজন্মের এক মূল্যবোধহীনতার যে চিত্র ফুটে ওঠে তা অত্যন্ত বাস্তব। তবে এই মূল্যবোধহীনতার জন্য গোলাপী, সুবলদের যে পুরোপুরি দায়ী করা যায় তা নয়, তাঁরা তো মিলতেই চেয়েছিল, কিন্তু সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ধর্ম পালন করতে না পেরে অবৈধ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন তা সম্ভব ছিল না বিকল্প বাস্তব হিসেবে গোলাপীর বিবাহ অবধারিত ছিল। আর সে বিবাহে ভেঙে গেল একটি সংসার। পরবর্তীতে জগন্নাথ ও স্ত্রীর পরিচয় আমরা জানিনা, ছোটোগল্প সে অবকাশ আমাদের দেয়না, কিন্তু যেটা সত্য তা হল একটি ব্যবধান তো সৃষ্টি হয়েছিলই, যা অস্বীকার করার কোন পথ নেই।

     ‘একটি নদী পুনর্ভবা’ গল্পে তিনি পুনর্ভবা নদীর উৎস খুঁজতে অগ্রসর হয়েছেন। সেখানে লুকিয়ে আছে পৌরাণিক প্রসঙ্গ। তাই তিনি হৃদয়গ্রাহী গদ্যে পরিবেশন করেছেন। মিশ্চিক মুনির ছিল সাতাশটি কন্যা। সবাই বড় হয়ে চন্দ্রদেবকে পতি হিসেবে পেতে চায়। কন্যাদের কথা শুনে মিশ্চিক মুনি চন্দ্রদেবের সঙ্গেই বিবাহ দেন সাতাশ কন্যার। কিন্তু চন্দ্রদেব আকৃষ্ট হয় রোহিণীর প্রতি। শুধু আকর্ষণ নয়, রোহিণী ছাড়া অন্য স্ত্রীদের সে ভালোবাসতেও পারেনা , এমনকি দৈহিক পিপাসাও মেটাতে চায়নি। সব স্ত্রীরা নীরব থাকলেও প্রতিবাদ জানিয়েছে পুনর্বসু। শেষ পর্যন্ত স্বামীর প্রতি অভিশাপ হানতেও পিছপা হয়নি, চন্দ্রদেবও অভিশাপ দেয়। সে অভিশাপে পুনর্ভবা মর্ত্যে নদী হয়ে প্রবাহিত হয়। লেখক এ গল্পে নারীর হৃদয়ার্তির আকুল বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সে নারী হয়েও নিজের দাবি জানিয়েছে। স্বামীর প্রতি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, ব্যর্থ হয়ে অভিশাপ দিয়েছে। চন্দ্রদেবের অভিশাপে পুনর্ভবা নদী হয়ে যায় , চন্দ্রদেব ক্ষয় রোগগ্রস্থ হয় । আজ পুনর্ভবা মর্ত্যে প্রবাহিত, কিন্তু হৃদয়ে বেদনা, শোনা যায় তার অন্তরার্তির কথা –

‘’আজও পুনর্বসু , পুনর্ভবা নাম নিয়ে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিতা। পূর্ণিমায় পূর্ণ চন্দ্রের ছায়া শরীরে ধারণ করে উচ্ছল হয়ে ওঠে অভিশাপ ভঙ্গের আশায়। মৃত্তিকা ও অন্বরের – দূরত্ব পেরিয়ে, চন্দ্রদেবের প্রতিবিম্বকে নিবিড় করে পেতে চায়, স্বামী সোহাগ বঞ্চিতা পুনর্ভবা। শরীরে শিহরণ জাগে। সৃষ্টি হয় রোমাঞ্চের ঢেউ। টুকরো টুকরো হয়ে যায় প্রতিবিম্ব। চির বিরহিণী পুনর্ভবার স্বপ্নভঙ্গের হতাশা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তরঙ্গমালা হয়ে ব্যথাতুর বয়ে যায়।

শুধু কান পাতলে আজও শোনা যায় তার ব্যথাতুর বিলাপ – সব ছল, ছল, ছলনা।‘’ ( তদেব, পৃ. ৬৬ )

‘খাঁচা’ গল্পটি অনবদ্য। সাধন চট্টোপাধ্যায় ‘আইন-বেআইন’ গল্পে প্রকৃতি সংরক্ষণের নামে অফিসাররা কীভাবে বেআইনী কর্যকলাপ চালায় তা দেখিয়েছিলেন। কমলেশ গোস্বামীর ‘খাঁজা’ গল্পেও বন ধ্বংসের চিত্র আছে, তবে তিনি ভিন্ন পরিসরে যাত্রা করেছেন। অরণ্য মানুষ বুধনের জীবনযন্ত্রণাকে লেখক বড় করে তুলেছেন। বুধনের মুখে যখন শুনতে পাই –‘’ইবা, পাখ-পাখালি জন্তু-জানোয়ারের জন্য ইত দরদ, ইত ট্যাকা ? আর হামরা, জঙ্গলের মানুষগুলান কিমনে বাঁচা কইরবো। ইখন জঙ্গল মহলের শিকার ধরা কড়া হইছে। ভর পেট খোরাক জুটে না।‘’ ( তদেব, পৃ. ৭১ ) –ভয়ংকর এক জীবনসত্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন লেখক। বিভূতিভূষণের অরণ্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সত্য কিন্তু অরণ্য বাঁচাতে সরকার চেষ্টাও তো কম করে চলছে না। কিন্তু অরণ্য মানুষের কথা তো তেমন ভাবে ভাবা হয়নি। অরণ্যে বনপ্রাণী ধ্বংস করা আইনত অপরাধ কিন্তু যে মানুষগুলি বনপ্রাণী শিকার করত তাদের ক্ষুধা নিবারণের কোন পন্থা সরকার করেনি। লেখক সেই বাস্তব সত্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন। আজ বনে এসেছে কিছু যুবক, বনের পশু, পাখি, বিশেষ জাতির কাঠঠোক্‌রা সংগ্রহে। বিলুপ্ত প্রজাতির এই পাখি সংগ্রহে সরকার বহু টাকা নিয়োগ করেছে। বনের পাশের গ্রামে থাকে বুধন। যুবকরা সঙ্গী হিসেবে নিয়েছে বুধনকে। রাতে খাবার পর বুধন স্বপ্ন দেখেছে বিভিন্ন বনপ্রাণীর মতো বন মানুষও একদিন না চিড়িয়াখানার খাঁচায় স্থান পায়। এক গভীর জীবনবোধ নিয়ে লেখক অরণ্যমানুষের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। একদিন হয়ত বুধনরা  বিলুপ্ত প্রজাতির পশুপাখির মতো হারিয়ে যাবে। কত মানুষই তো হারিয়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষের বুক থেকে সামান্য খাদ্যের অভাবে। আমাদের মানবিক বোধের কাছে লেখক যেন আরও একবার একটি সচেতনতার বার্তা দিয়ে যান।

  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের নায়ক নিতাই কবিয়ালের মনে আক্ষেপ ছিল জীবনের সীমিত পরিসর নিয়ে। জীবনানন্দের গলিত স্তবির ব্যাঙ আরও কিছুক্ষণ বাঁচতে চেয়েছিল। প্রতিটি মানুষই জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত জীবনের স্বাদ উপলব্ধি করতে চায়। মাঝে মাঝে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি মৃত্যুচেতনা ডেকে আনে, সেখান থেকেও বাঁচার রসদ খুঁজে পেতে চায়। তেমনই একটি গল্প কমলেশ গোস্বামীর ‘দিশা’। বন্যায় জয়ন্তর ফার্মের সব মাছ ভেসে গেছে। কিন্তু ইনসুরেন্স কোম্পানি জানিয়েছে কিছু মাছ আছে তাই ক্ষতিপূরণ পাবে না। এদিকে ব্যাঙ্কের লোনের জন্য আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিলেও সে ফিরে এসেছে। এ গল্প লেখক দ্বিবাচনিক স্বরে পাঠককে পৌঁছে দেন। জয়ন্তের পুকুরে বন্যায় ভেসে এসেছে অনেক নতুন ছোট ছোট মাছ। এই মাছগুলি যেন নতুন করে বাঁচার আশা পেয়েছে, দিশা পেয়েছে। তেমনি জয়ন্তদের বাড়িতে আসতো এক বুড়ি। যাঁকে স্ত্রী ও কন্যা সাহায্য করত। এই বুড়ি প্রবল বন্যায় সাতদিন গৃহবন্দি থেকে কিছু না খেয়ে বন্যার নোংরা জল পান করেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছে। যে বুড়ি মরলে কেউ কাঁদবে না, কেউ ভাববে না, কেউ বিপদে পড়বে না, সে বুড়িও বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে, সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আবার বাঁচার চেষ্টা চালিয়েছে যাচ্ছে। এই বুড়ির জীবনস্বপ্নই জয়ন্তর আত্মহত্যার অভিপ্রায় উধাও করে দেয়। সে পায় জীবনে বাঁচর নতুন দিশা।

  ‘পুষ্পাঞ্জলি’ গল্পের শেষে নরোত্তম দাস বাবাজির যে উপদেশ শুনতে পাই –‘’ঈশ্বরকে ভালোবাসো / মানুষকে ভালোবাসা / ফুলকে ভালোবাসা।” – এ বুঝি গল্পকারেই অভিপ্রায়। নিজস্ব ভূগোলের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, চোখের সামনে দেখা বাস্তবতা লেখককে নিয়ে গেছে এক আত্মজিজ্ঞাসায়। তিনি গল্পকে কখনই জটিল করে তোলেন না, তাঁর গল্প পরিণামমুখী। অতি সহজ হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তিনি জীবনের বৃহত্তম সত্যকে ধরে দিতে চান। উপকাহিনির প্রাধান্য তাঁর গল্পে নেই, গল্পের পরিণতি চিন্তা করেই তিনি যেন গল্প শুরু করেছেন, ফলে পাঠককে কেন্দ্রচ্যুত না করে অন্তিমে পৌঁছে দেন, যেখানে পাঠক পান তৃপ্তির স্বাদ, জীবনের নানা দোলাচলতার চিত্র।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.