x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২০

রিঙ্কি বোস সেন

sobdermichil | এপ্রিল ১৪, ২০২০ | |
ছাতা / রিঙ্কি বোস সেন

হঠাৎ করে একটা চাপা গোঙানি মিহিরের কানে এলো।মিহির তৎক্ষনাৎ চেষ্টা করল সেই গোঙানির উৎস খোঁজার।কিন্তু নেশার মত একটা ঘোর তার চোখ দুটোকে যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে, চেষ্টা করেও চোখ মেলতে পারছে না মিহির। কোনরকমে নিজের শরীর'টাকে সে টেনেহিঁচড়ে বিছানায় বসালো।গোঙানির শব্দ তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।এরপর বেশ খানিক'টা যুদ্ধ করে মিহির আস্তে আস্তে চোখদুটো খুললো।চোখ খুলতেই প্রচন্ড এক আলোর ঝলকানি মিহিরের গোটা শরীরটাকে কাঁপিয়ে দিল।মিহির দেখলো যে সে সূর্যের প্রখর আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে।তীব্র তাপও অনুভব করল মিহির।ঘামে জামা ভিজে এলো।কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না যে ও ঠিক কোথায় রয়েছে।চোখদুটো আচমকা এত আলোর সাথে ঠিক মানিয়ে নিতেও পারছে না।এদিকে গোঙানির শব্দ থামার নয়।খুব চেনা সেই শব্দ, খুব চেনা।খুব কাছের কোন মানুষের গোঙানি, কোন আপনজনের। মিহির মনপ্রাণ দিয়ে সেই শব্দকে চেনার চেষ্টা করছে, এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে সেই শব্দের দিকে।কিন্তু প্রতি পদেই হোঁচট খাওয়ার উপক্রম।আসলে গাঢ় অন্ধকারে যেমন গতি থমকে যায় তেমনি প্রচন্ড আলোতেও বোধহয় ঠিক সেরকমই হয়।

তবে আস্তে আস্তে মিহির এবার চারপাশ'টা চিনতে পারলো।মিহির বুঝতে পারলো যে সে তার নিজের বাড়ির বাগানে দাঁড়িয়ে। পাঁচিলঘেরা মস্ত বড় বাগান।ধবধবে সাদা রঙের পোচ আছে সেই পাঁচিলে।মিহির দেখতে পাচ্ছে সব। পাঁচিলের একদিকে আছে একটা গেট, যেটা সরাসরি সদর রাস্তার দিকে মুখ করা।মিহির সেটাও দেখতে পেলো।এসবকিছুই মিহিরের চেনা দৃশ্য।সবই দেখতে পাচ্ছে, সবই স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।শুধু বাগানের গাছগুলো আর দেখা যাচ্ছে না।নাহ! কোন গাছ নেই, দু-একটা লতাপাতা বাদ দিয়ে।বিশেষ করে চার-চারটে বড় বড় আমগাছ, সেগুলো আর নেই। একেবারে উধাও।

মিহিরের কেমন জানি সন্দেহ হল।তাহলে কী, যা আশঙ্কা করেছিল তাই হল? রাতের অন্ধকারে চুরি? কিন্তু গাছ কেটে নিয়ে গেলে তো কিছু অংশবিশেষ পড়ে থাকবে।সে সব তো কিছু নেই! অদ্ভুত ব্যাপার! কোথাও কোন সবুজ নেই আর! কী করে সম্ভব? এইভাবে একটা আস্ত বাগানকে পুরো নির্জীব জমিতে পরিণত করা কীভাবে সম্ভব? কিছুই তো নেই প্রায়, কিছুই নেই।না আছে, সেই গোঙানিটা আছে।মাঝখানে কয়েক মুহুর্তের জন্য গোঙানিটা উধাও হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু এখন আবার শোনা যাচ্ছে, আবার তীব্র হয়ে উঠছে।

মিহির তাড়াতাড়ি বাগানের দিকে পা বাড়ালো। বাগানের প্রতিটি কোণ খুঁজেপেতে দেখতে লাগলো।কিন্তু কোথাও কোনকিছু পেলো না, কোন মানুষের দেখা পেলো না।অথচ গোঙানিটা থামছে না।তার চেয়েও বড় কথা খুব চেনা কোন মানুষের এই গোঙানি,মিহির বুঝতে পারছে ঠিকই কিন্তু কিছুতেই সনাক্ত করতে পারছে না।একবার মনে হচ্ছে শব্দটা গেটের বাইরে থেকে আসছে, মিহির তখনি ছুটে গেল গেটের বাইরে।তারপর মনে হল শব্দটা আসছে বাগানের কলতলার কাছ থেকে, সেখানেও ছুটে গেল। কিন্তু সেখানেও কিছু পেলো না।মিহিরের হৃৎস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলছে।গোটা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।শেষমুহুর্তে দিশেহারা হয়ে বাগানের লোহার তৈরি চেয়ারটায় বসে পড়লো সে।ভয় হচ্ছে, আশঙ্কাও হচ্ছে।কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না কীভাবে বাগানের এই অবস্থা হল।মাথাটা ঘুরছে।চোখদুটো বুজে আসছে।

আর ঠিক তখনি ঘাড়ের কাছে কারোর নিশ্বাস অনুভব করল মিহির।এক ঝটকায় পিছন ঘুরে তাকালো।কিন্তু কী অদ্ভুত কোথাও কেউ নেই।কয়েক সেকেন্ড পিছনেই তাকিয়ে থাকলো মিহির তারপর ধীরেধীরে সামনের দিকে মুখ ঘোরালো। সামনের দিকে মুখ ঘোরাতেই চমকে উঠলো।সামনে মাটিতে মিহিরের ঠিক পা'য়ের কাছে মৈনাক, মিহিরের আট বছরের ছেলে, পড়ে আছে।শীর্ণকায় শরীর, চোখদুটো কোটরে ঢুকে গেছে, চুল উষ্কখুষ্ক, ধুলোমাখা জামাকাপড়, ঠোঁটদুটো ফেটে রক্ত ঝরছে আর হাতের ইশারায় কিছু একটা বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে।মিহিরের পায়ের তলার জমিটাই যেন কেঁপে উঠলো।নিজের ছেলেকে এই অবস্থায় দেখবে সে কল্পনাও করেনি। তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে নেমে এসে ছেলের মাথা'টা কোলে তুলে নিল মিহির।

--'কী হয়েছে বাবু? কী হয়েছে বল্ আমায়! তোর এরকম অবস্থা কে করল? বল্, কী বলছিস বল্।'__

মৈনাক অনেক কষ্টে কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু মুখ থেকে শুধু 'জল' শব্দটি ছাড়া আর কিছুই বেরলো না।

__'জল খাবি? জল দেবো?'

বলেই মিহির ছেলের মাথাটা বাগানের শুকনো চৌচির হয়ে যাওয়া মাটিতে নামিয়ে রেখে জলের জন্য ছুটে গেল বাগানের কলতলায়।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কলতলা শুকনো খটখটে।কল খুলে এক ফোঁটাও জল পাওয়া গেল না।ছুটে গেল ঘরের দিকে।চমকে উঠলো মিহির, ঘরে ঢোকার দরজা কেউ ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে।চিৎকার করল মিহির কিন্তু কোন সাড়া শব্দ পেলো না।এদিকে মৈনাক জলের জন্য কাতরাচ্ছে।মিহিরের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো।তারপর কী একটা মনে পড়তেই সে ছুটে গেল বাগানের চৌবাচ্চাটার দিকে, সেখানে উঁকি দিয়ে দেখলো, পচা জল হলেও চলবে, কিন্তু জল চাই।কিন্তু নাহ! চৌবাচ্চাটাও শুকিয়ে কাঠ।মিহির ভেবে পাচ্ছে না কী করবে।চোখ পড়লো বাগানের এক কোণায় সামান্য একটু সবুজের দিকে, কয়েকটি পাতা মাত্র, কোন লতানে গাছের অবশিষ্টাংশ।মিহির ছুটে গেল সেদিকে।যেক'টা পাতা পেলো ছিঁড়ে নিয়ে এলো তারপর ছেলের মাথা'টা আবার নিজের কোলে তুলে নিয়ে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা পাতাগুলোকে পিষে ছেলের মুখের কাছে ধরল।দু-এক ফোঁটা পাতার রস মিহিরের হাত বেয়ে গড়িয়ে এলো,

__'নে বাবু, খা খা, খুব তেষ্টা পেয়েছে না, এই যে দ্যাখ আমি কী এনেছি, মুখে নে, মুখে নে দেখবি ঠিক হয়ে যাবি'।

মিহির একনাগাড়ে বলে গেল।কিন্তু মৈনাকের কোন সাড়াশব্দ নেই।সে তখন নিশ্চল দুই চোখ মেলে মিহিরের কোলে শুয়ে।মিহিরের সন্দেহ হল, হাল্কা ঝাঁকুনি দিল, ঝাঁকুনি দিতেই ছেলের মাথা'টা কোল থেকে গড়িয়ে গেল।

ধড়পড় করে উঠে বসল মিহির।চোখের সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার।খুব ভয় হল, ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।চোখ বন্ধ করতেই আবার সেই দৃশ্য ঝলসে উঠলো মিহিরের সামনে।নিমেষে আবার চোখ খুলে দিল। বুক ধড়ফড় করছে দ্রুত গতিতে।গলাটা শুকিয়ে গেছে।জল তেষ্টা পাচ্ছে খুব।জলের কথা মনে পড়তেই ছেলেটার কথা মনে পড়ে গেল, ছেলের সেই নিথর শরীর, জলের জন্য ছটফটানি সব চোখের সামনে ভেসে উঠলো।এক মুহূর্ত আর দেরি না করে মশারী তুলে মিহির ওর ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা ডানদিকের বেডরুমে গেল।দরজা হাল্কা ভেজানো।নিঃশব্দে ভিতরে ঢুকে বিছানার পাশটায় এসে দাঁড়ালো।আস্তে আস্তে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো।খোলা জানলা দিয়ে রাস্তার আলো ঘরে এসে পড়েছে।সেই আলোতেই মিহির দেখলো কী পরম শান্তিতে ছেলেটা তার মা'কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে।ঐ একই শান্তি, একই তৃপ্তি ছেলের মা'য়ের মুখজুড়েও রয়েছে।মিহিরের মন'টা এবার শান্ত হল।বাজে একটা স্বপ্ন মিহিরকে পুরো ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

ছেলে আর মা'কে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেখে মিহির ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে একতলায় নেমে এলো। তারপর ড্রইংরুম দিয়ে সোজা বাগানের সামনেটায় এসে দাঁড়ালো।মস্ত বড় বাগান মিহিরদের।আদ্যপ্রান্ত চওড়া উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা।বাগানে প্রচুর গাছ-গাছালি।ছোটছোট লতাপাতা থেকে শুরু করে বারোমাসি ফুলের গাছ, ফলের গাছ সবই আছে।আর আছে চারটে শক্তপোক্ত আম গাছ, একেবারে রাজকীয় চেহারায় দাঁড়িয়ে তারা।একটা সময় প্রচুর আম হত।গোটা পাড়াকে বিলিয়েও শেষ করা যেতো না।কিন্তু এখন গত আট-ন বছর ধরে আর একটাও ফল হয় না।নতুন করে ফল দেবে বলে এমন কোন আশাও নেই। ঐ বাগানের জায়গা জুড়ে যেটুকু রয়েছে এই যা।

মিহির একটা সিগারেট ধরালো।তারপর লম্বা একটা টান দিয়ে বাগানের একপাশের লোহার চেয়ারটায় এসে হেলান দিয়ে বসল।পরশু দিন পূর্নিমা গেছে।আকাশে তাই চাঁদের প্রভাব এখনো বেশ আছে।হাল্কা রূপোলী আলোয় বাগান'টাকে বেশ মায়াবী দেখাচ্ছে। ঝিঁঝি পোকার একটা হাল্কা শব্দ কানে ভেসে আসছে।যখন যখন জোরে হাওয়া দিচ্ছে তখন তখন সেই শব্দ আরও জোরালো হচ্ছে।মিহির সিগারেটে আবার একটা টান দিল। চোখদুটো তার স্থির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চারটে দৈত্যাকার আমগাছের দিকে।

কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে গেছে। আগামীকাল সকালেই আসছে তারা। কাউন্সিলরকেও ব্যাপারটা জানানো আছে, পরিবর্তে তাকে একটু মিষ্টিমুখ করাতে হবে এই যা।মিহির রাজি হয়েছে, কাউন্সিলরকে হাতে রাখার জন্য এইটুকু তো করতেই হবে।তবে সিদ্ধান্তটা না নিয়ে উপায় ছিল না।যেভাবে পাঁচিলের জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরেছে।আর পাঁচিল ভেঙে পাব্লিকের গায়ে-মাথায় পড়লে নিস্তার নেই, সোজা হাজত।এছাড়াও ফল-টল দিলে না হয় একটা কথা ছিল।আট-ন বছর ধরে একটাও আম আসেনি, উল্টে গোটা বাগানটা আম পাতায় যা-তা হয়ে থাকে।বাড়িতে ঢোকার এন্ট্রেন্স এটা, আর ঢুকেই মনে হবে যেন কোন পরিত্যক্ত বাড়িতে ঢোকা হচ্ছে, চারিদিকে শুকনো পাতা আর সেই পাতায় পা দিলেই মচমচ শব্দ।অনেক চিন্তাভাবনা করেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে মিহির।সামনের বছর বরং নতুন চারা এনে বসাবে কিন্তু এইগুলোকে আর রাখার মানে হয় না।আর দামও ভালো পেয়েছে, এরপর হয়তো খদ্দের পাবে কিন্তু দাম ভালো পাবে না।

সিগারেটটায় লাস্ট একটা বড় টান দিয়ে সেটা মাটিতে ফেলে স্লিপার দিয়ে পিষে দিল মিহির।তারপর হাতদুটো দু'দিকে ছড়িয়ে বড় একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙলো।ঘুম'টা কাঁচা অবস্থায় ভেঙে গেল উদ্ভট একটা স্বপ্নে, কে জানে আজ আর এরপর ঘুম আসবে কী না।যাইহোক চেয়ার ছেড়ে উঠে মিহির ঘরে ঢুকে গেল।দোতলায় উঠে নিজের ঘরের দিকে যাবার সময় কী মনে হল এগিয়ে গিয়ে কোনের ঘরটার সামনে দাঁড়ালো।ভিতর থেকে হাল্কা কাশির শব্দ এলো।

__' বাবা, তুমি এখনও ঘুমওনি?'

মিহির ঘরের দরজাটা আলতো খুলে ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল।আলো-আঁধারি ঘরের বিছানায় নুয়ে বসে থাকা একটা শরীর কোন উত্তর দিল না, আরও দুবার চাপা গলায় কাশলো শুধু।

' খুব কাশি হচ্ছে না? আজ কাফ সিরাপ'টা নিয়েছিলে?'

বলেই মিহির ঘরে ঢুকে বিছানায় এসে বসলো।

__' নিয়েছি রে, নিয়েছি...এটা এ্যালার্জি, জানিসই তো।সিজন চেঞ্জ হচ্ছে, এইসময় একটু হবেই এরকম।বাদ দে, তুই কেন এখনও জেগে?'__

মনীশ, বছর পঁচাত্তরের এক বৃদ্ধ, মিহিরের বাবা, মৃদু স্বরে কথাগুলো বলল।

__'আমি ঘুমোচ্ছিলাম, একটা বাজে স্বপ্নে...ছাড়ো, বলছি এ'কদিন তুমি একটু হাল্কা গরম জল খেও,আমি পিউকে বলব ফ্লাস্কে তোমার জন্য গরম জল রেখে দিতে, তুমি মিশিয়ে খাবে।এখন শোও, ঘুমনোর চেষ্টা কর'।

মিহির তার বাবার কপালে হাত দিয়ে একবার দেখে নিল গা গরম আছে কী না তারপর আশ্বস্ত হয়ে উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালো।

--' বলছি, ওদেরকে কী তাহলে কালকেই দিয়ে দিচ্ছিস?' 

মিহির ঘুরে দাঁড়ালো, অবাক হয়ে, 'কাদেরকে বাবা?'

--' ওই আমার এই বাড়ির চারটে স্তম্ভ'কে!'_

মিহির এবার একটু বিরক্ত হল, 

__'ওফ্ বাবা,তুমি তো সবই জানো। হ্যাঁ,কাল আসবে ওরা, কথা হয়ে গেছে, দাম'টাও ভালো পাচ্ছি।আর তুমি তো দেখছো যে কীভাবে পাঁচিলে ফাটল বাড়ছে, যেকোন দিন একটা বিপদ হয়ে যাবে।আর তারপর কোন আম ধরে না তাহলে কী লাভ শুধু শুধু জায়গা জুড়ে ওগুলো রাখার?'__

__' কোন লাভ নেই বলছিস? কেন ঠান্ডা ছায়া পাস না, জানলা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া পাস না? কতকত পাখির বাসা হচ্ছে, তাদের কিচিরমিচির শুনছিস, কাঠবিড়ালি ছুটোছুটি করছে...এইসব দেখেও তো ভালো লাগে।এইগুলো কোন লাভ নয় বলছিস?'__

মিহির আবার ঘুরে এসে বিছানায় বসল, তারপর বাবার বাঁ হাতের চেটো নিজের হাতে নিয়ে, 

__'দ্যাখা বাবা কাঠবিড়ালি, পাখি এইসব তো তুমি আশে-পাশের অনেক গাছেই দেখতে পাবে, এইতো পাশেই রমেশ কাকুদের বাড়িতে দ্যাখো, ওদের কাঁঠাল গাছ'টা...কত বড় বড় কাঁঠাল দেয় দেখেছো! আমাদের গাছগুলো শেষ, কোন প্রডাক্টিভিটি নেই, তাহলে কেন শুধুশুধু...?'__

মনীশ নিজের হাত'টা ছেলের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে,

__'গাছের প্রোডাক্টিভিটি কী শুধু গাছের ফলের মধ্যেই দেখিস মিহির? আর কোন ভাবে কী গাছ কিছু উৎপাদন করে না?... ছায়া, পাখিদের বাসা, কতকত প্রাণীদের আশ্রয়, আমাদের জন্য অক্সিজেন, জল...এইগুলো গাছ উৎপাদন করছে না?'__

__'গাছ কীভাবে জল উৎপাদন করছে শুনি? হ্যাঁ পৃথিবীতে জলের ভারসাম্য বজায় রাখছে সেটা সবাই জানি'।_

--' জলের ভারসাম্য বজায় রাখাটাও কী জল উৎপাদন নয় বলবি? পৃথিবীর সব গাছ কেটে দিয়ে দেখিস তো খাওয়ার জন্য আর এক ফোঁটাও জল পাস কী না, কোথাও নতুন করে জলের উৎপাদন হয় কী না ! হবে না, নদী-নালা ছেড়ে দে, সাত-সাতটা সমুদ্রও শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।এখনি পৃথিবীর কত দেশে, আমাদের নিজেদের দেশেই দ্যাখ না, জলের জন্য হাহাকার লেগে গেছে।আমার জীবন তো কেটেই গেল, তোর জীবনও যেমন তেমন কেটে যাবে না হয়, কিন্তু তোর পরের প্রজন্মের? তাদের কী হবে? তাদের তো ছটফটিয়ে প্রাণ বেরোবে!__

মিহিরের চোখের সামনে সেই ভয়াবহ স্বপ্নটা আবার ভেসে উঠলো।প্রচন্ড একটা অস্বস্তি হল।আর এক মুহুর্তও সেখানে থাকবে না বলে সে উঠে দাঁড়ালো।আর তখনি তার বাবার কয়েকটি কথা কানে এলো,

--' মিহির, বলছি তোর এমন কেউ জানা আছে যারা এই গাছ চারটের মত আমাকেও মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে যেতে পারবে?... দেখিস না সেরকম কোন এক্সপার্ট যদি কেউ থাকে! এই গাছগুলোর মত আমিও তো বুড়ো হয়েছি, নতুন কোন প্রোডাক্টিভিটি নেই, শুধু শুধু জায়গা জুড়ে আছি...কে জানে তোদের সংসারে, তোর জীবনে আমিও হয়তো নিজের অজান্তেই ফাটল তৈরি করছি! দেখিস যদি আমাকেও উপড়ে ফেলা যায়!'__

কলিং বেল বাজলো বেশ জোরে।পিউ দুপুরের জন্য রান্না সামলাচ্ছিল, রান্নাঘর থেকেই আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ব্যালকনি দিয়ে নিচে উঁকি দিল। 

--' এ্যাই যে শুনছো, মনে হচ্ছে ওরা এসেছে, ওই গাছ-ওয়ালারা, যাও নিচে যাও'।

মিহির খবরের কাগজ'টা ভাঁজ করে ধীর পা'য়ে নিচে গেল।মিনিট কুড়ি-পঁচিশ পর উঠে এলো।

__'কী হল? নিল না?'_

পিউয়ের প্রশ্ন।

__'দিলাম না'।

__'মানে?'

পিউয়ের পাল্টা প্রশ্ন।মিহির খুব শান্ত ভাবে সোফায় এসে বসে খবরের কাগজটা আবার খুললো।

__'কী গো! এই যে বললে ওরা ভালো দাম দিয়েছে, কাউন্সিলরকেও বলে রেখেছ, কোন অব্জেকশন আসবে না....তাহলে?'__

মিহির এবার খবরের কাগজটা নামিয়ে সামনের সোফায় বসে থাকা বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, তারপর পিউয়ের দিকে তাকিয়ে, 

--' কী আর বলব বল, তোমার শ্বশুরের যে খুব শখ জেগেছে উনি তার নাতিকে সঙ্গে নিয়ে আম গাছে কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি দেখবেন, পাখিদের কিচিরমিচির শুনবেন, আরও কত কী উপভোগ করবেন...তাই ডিশিশন চেঞ্জ করলাম।নাও এই আনন্দে এক কাপ ভালো চা' খাওয়াও তো দেখি'।__

পিউ অবাক চোখে একবার মিহিরের দিকে তাকালো তারপর শ্বশুরের দিকে তাকালো। তারপর আবার মিহিরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী একটা বলে রান্নাঘরে চলে গেল।মিহির এবার সোফা ছেড়ে উঠে এসে বাবার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে তার হাতদুটো নিজের হাতে চেপে ধরল, 

__' খুঁজলাম, পেলাম না, সেরকম কেউ নেই যে তোমাকে উপড়ে নিয়ে যাবে বাবা।এমন হিম্মত কারোর নেই।আর তোমাকে ওপড়াতে গেলে তো আমরা সবাই উপড়ে যাবো....আমরা তো তোমারই ডালপালা!'__

মিহিরের কথা শেষ হতেই তার কাঁধদুটো শক্ত করে ধরল মনীশ,শিকড়ের একটা প্রবল জোর অনুভব করল, উপলব্ধি করল এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি।আর এই উপলব্ধি মনীশের দু-চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা জল এনে জড়ো করল।

পূর্ব বর্ধমান
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.