x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শুক্রবার, মার্চ ২৭, ২০২০

মৌমিতা ঘোষ / প্রার্থনা

sobdermichil | মার্চ ২৭, ২০২০ |
মৌমিতা ঘোষ / প্রার্থনা

প্রার্থনা
(সত্যি ভূতের কষ্টগল্প)


"উফফ্,খেটে খেটে হাতটা ক্ষয়ে গেলো। আর পারছি না বাপু। "

" যা বলেছিস, এতদিনের বদ অভ্যাস, কাজের লোকের সাহায্য নেওয়ার, তাই এক একখান অপদার্থে পরিণত হয়েছি।"
"আমার তো জুম কলে সারাদিন ক্লাস নিতে হচ্ছে। তার উপর সকালের ব্রেকফাস্ট বানানো চারজনের, তারপর লাঞ্চের ব্যবস্থা করে বাসন মেজে, স্নান করে ফরমাল ড্রেসে বসে পড়া ভিডিও কলে । মাঝখানে দুপুরে খাওয়া। আবার অফিসের কাজ,সেটা শেষ করে , সন্ধেবেলার টিফিন বানানো, আবার রাতের রান্না। যতবার রান্না, ততবার সবজি কাটা, ততবার বাসন ধোয়া। উফফ্।" বলে দ্রিমিতা।

" আমার ও গবেষণার কাজ, অফিসের কাজ, বাড়ির কাজ, পাগল হয়ে যাবো মাইরি।"
" সাবধানে থেকো। রাখছি। একটা অফিসের কল ঢুকছে।"
"হ্যাঁ, বাই। টেক কেয়ার।" রাখে চান্দ্রেয়ী।

আজ  লক ডাউনের  চতুর্থ দিন। তার আগের সাতদিন থেকেই ওরা প্রায় গৃহবন্দি। পৃথিবীর মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে করোনা ভাইরাস। বিচ্ছিন্নতাই একমাত্র রাস্তা বাঁচার । সবরকম ভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা মানুষ আজ বুঝছে মানুষের স্পর্শ তার কত জরুরি ছিল। আজ নতুন করে মানবতার পাঠ নিচ্ছে সভ্যতা।

চারদিকে মৃত্যু মিছিল তাড়া করছে মানুষকে।এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দ্রিমিতা রান্না ঘরে গেল। ছেলেটা চাউমিন ভালোবাসে । সেদ্ধ বসালো একটু সয়াবিন অয়েল জলে মিশিয়ে। একটু গরম হতেই গ্যাস অফ করে রেখে দিল কিছুক্ষণ। তাহলে জড়াবেনা চাউমিন। জয় এসে বলে গেল , "শুধু ছেলেকে খাইওনা, আমার ও খিদে পেয়েছে। "

এটা জানা কথাই। দ্রিমিতা দুজনের মাপেই বসিয়েছে।আলু-পিঁয়াজ ছাড়িয়ে কাটতে বসে দ্রিমিতা। এখন ক্যাপসিকাম, কর্ণ ইত্যাদি কেনার অপশন নেই।সেদ্ধ চাউমিনটাকে নীল ঝুড়িতে ঢেলে দেয় দ্রিমিতা সিঙ্কের উপরে।তারপর জল ঝরে গেলে চাউমিন বানাতে শুরু করে। ঝুড়িটা ধুয়ে মেঝেতে রেখে দেয়। চাউমিন পেয়ে ছেলে রাতুল তো খুব খুশি। 

" মামান, দারুণ হয়েছে খেতে।'

বাপ-বেটার পরিতৃপ্ত মুখ দেখে ও খুশি হয়ে যায়।গরম লাগছে বলে বেডরুমে ফ্যান চালিয়ে বসে সবজি কাটে। জয় নেটফ্লিক্সে ওয়েব সিরিজ দেখছে।

সবজি কাটার পর রান্নাঘরে ফিরে যায় দ্রিমিতা।আরে, ঝুড়িটা কোথায় গেল? এখানে ই তো রেখে গেলাম। গ্যাস ওভেনের আশেপাশে দেখে, মেঝেতে তো রেখেছিলো, নেই। বাসনের তাক থেকে সবজি রাখার লোহার তিনতাক, ঝুড়ি, সব খুঁজে ফেললো। নাহ্। নেই।

" আশ্চর্য, কোথায় যাবে?"

কালকে সকালের জন্য মাছের ঝোল বসালো।" এদিক ওদিক খুঁজলো ও। নাহ্ নেই।ঘরে খুঁজে এলো সয়াবিনের তরকারি বসিয়ে।নেই তো।ওখানে যাওয়ার কোন চান্স নেই, তবু ছেলের ঘর খুঁজে এলো , ছাদে খুঁজে এলো। অস্বস্তি হচ্ছে দ্রিমিতার । এ তো ভূতুড়ে কান্ড! 

জয় কে ডাকে ও। জয় আসতে দেরি করছে দেখে চিৎকার করতে শুরু করে।

" বলো কী হল? 

" দেখো না, আমার নীল ঝুড়িটা পাচ্ছিনা। চাউমিনের জল ঝরিয়ে এখানে ই রেখেছিলাম, কোত্থাও নেই। আমার হয়তো চোখের ভুল হতে পারে, তুমি একবার দেখো তো।"

" বাবা, ঝুড়িশুদ্ধু চাউমিন খেয়ে নিলে?"

" তুমি মজা পাচ্ছো? এরকম ভূতুড়ে একটা ঘটনা!"

জয় হ্যা হ্যা করে হাসে। গা জ্বলে ওঠে দ্রিমিতার । "খোঁজ বলছি। "

জয় খোঁজে। খুঁজতেই থাকে। নাহ্ নেই। ঘামতে শুরু করে দ্রিমিতা। কেমন অস্বস্তিকর ফিলিং হচ্ছে। ওভেনে বসানো দুটো তরকারি ই ফুটছে।ও গিয়ে সোফার উপরে বসে। মনটাকে ডাইভার্ট করতে ফেসবুকে মন দেয়। সবাই আতঙ্কিত। তবু একটাই ভালো কথা, এই প্রথম নিজের স্বার্থে হলেও মানুষ এক হচ্ছে। লোকে অন্যকে সাহায্য করছে, বয়স্ক একা মানুষ কে খাবার, ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে দ্রিমিতার এক বন্ধু।

লোকে পরিচারিকাকে পেইড লিভে পাঠিয়েছে।দ্রিমিতা তো চাল ডাল ও কিনে দিয়েছে। এই প্রথম মানুষ নিজের পরিবারের বাইরে সবার জন্য প্রার্থনা করছে।এই প্রথম সে বুঝেছে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কিছুই তার কোন কাজের নয়।

"নাহ্। তরকারি টা নামাই।"

তরকারি আর মাছ টা নামিয়ে দ্রিমিতা আরেকবার খোঁজে রান্নাঘর থেকে ছাত অবধি। মা'কে ফোন করে সবটা জানায়। " দেখো আমি তো ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু এই ঘটনা ভূতুড়ে ছাড়া কী বলব? এত মানুষ মারা যাচ্ছেন, কতজনের অতৃপ্ত আত্মা হয়তো ঘুরছে। কোন মা হয়তো মারা গেছেন, তার ছেলেও চাউমিন খেতে ভালোবাসতো।তাই হয়তো সে এসেছে।কী করি বলতো?"

মা কিন্তু ওর উৎকন্ঠায় হাসেনা। যদিও ওর মা একেবারেই ভৃত প্রেতে বিশ্বাস করে না। 

মা বলে, " এখন একদম খোঁজা ছেড়ে দে। শান্ত হ। খুঁজিস না একেবারে।"

"আচ্ছা" বলে ফোন রাখে দ্রিমিতা।

তবু মন শান্ত হয়না দ্রিমিতার । শ্বশুর মশাইকে খুঁজতে বলে একবার। উনি বলেন, " এখানে তো দেখেছিলাম যখন শেষবার চায়ের কাপ রাখতে এসেছিলাম।"

" একটু দেখুন না, যদি পান।"

" না, বৌমা । নেই।"

" আচ্ছা।" 

ছেলের জন্য খুব টেনশন হয় ওর মনে। বারবার মনে হতে থাকে কোন অতৃপ্ত মায়ের আত্মা দুঃখ পাচ্ছে।কী করবে ভেবে পায়না। ইষ্টনম জপ করে কিছুক্ষণ। তারপর আবার খুঁজতে শুরু করে। না। নেই। 

সুহৃদ ফোন করে ‌। ওকে বলে ঘটনা টা। ততক্ষণে এক্কেবারে ঘেমে গেছে দ্রিমিতা উৎকন্ঠায়। 
সুহৃদ বলে" তাহলে দ্রিমিতা মুখার্জি ও ভয় পায়? ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দিয়ে রাখতে হবে যে!"

" যা, ভাগ্, কথা বলবো না।"

তারপর চুপটি করে বসে দ্রিমিতা। হাত জোড় করে বসে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলে , " প্লিজ , তুমি যেই হও তোমার কষ্টে আমি সমব্যথী। তোমার ছেলের জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার জন্য ও। তোমার ছেলে ভালো থাকুক, এই প্রার্থনা করি। তোমার প্রতি আমি আমার সমবেদনা থাকলো , সত্যি, সত্যি, সত্যি।"

এইটুকু বলে চোখে জল এলো দ্রিমিতার । তারপর গেলো রান্নাঘরে।আর কী আশ্চর্য সবজি রাখার তিন থাকটার মাঝে আটকে আছে ঝুড়িটা, পিছন দিকে। অবাক হয়ে গেল দ্রিমিতা। মৃতের ও সমবেদনা দরকার হয়? মৃত্যুও একটু সহমর্মিতা দাবি করে বোধহয়।

কাঁদছে দ্রিমিতা। কার জন্য জানেনা।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.