Friday, January 31, 2020

অপর্ণা চৌধুরী

sobdermichil | January 31, 2020 |
নেমন্তন্ন
হরিপদ বাবুর মত কিপটে খুব একটা দেখা যায় না। উনি নিজে খরচা করে কাউকে ডেকে বাড়ীতে খাইয়েছেন বলে কেউ শোনে নি। কিন্তু কেউ যদি ওনাকে নেমন্তন্ন করে তবে উনি সপরিবারে খেতে আসেননি এটা কখনো হয়না। আর শুধু আসাই নয় ওনার মত খাইয়ে এ তল্লাটে আর পাওয়া যাবে না। দেখে মনে হবে এক সপ্তাহের খাবার উনি একই দিনে খেয়ে যাচ্ছেন। 

ওনার দুটি ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে গুপে আর ছোট মেয়ে মানা। সারা বছর ফেনা ভাতের সঙ্গে শাকপাতা বা তেঁতুল ছাড়া তাদের ভাগ্যে বিশেষ কিছু জোটে না তাই নিমন্ত্রণ শুনলে তাদেরও বড় আহ্লাদ হয়। 

কিন্তু যেদিন নেমন্তন্ন সেদিন সকাল থেকে তাদের উপোষ। কারণ হরিপদ বাবুর মতে ভরা পেটে নেমন্তন্ন খেতে যাওয়া শুধু অনুচিতই নয়, অপরাধ। সারাদিন না খেয়ে খিদেটাকে পাকতে দিতে হয়। যাতে যখন নেমন্তন্ন বাড়ীতে পৌঁছে প্রথম খাবারে গন্ধটা নাকে আসে তখনই পেটের মধ্যে একটা মোচড় দেয়। তাহলে যখন খেতে বসবে তখন শুক্তো থেকে দই মিষ্টি অবধি সমস্ত খাবারের মজা পুরোপুরি পাবে। 

ব্যাচে ব্যাচে বসিয়ে খাওয়ানো হলে হরিপদ বাবু কোনের দিকে নিজের ছেলে আর মেয়েকে দুই পাশে নিয়ে খেতে বসেন। প্রথম ব্যাচে বসে তার দু ব্যাচ পরে ওঠেন। নিজে তদারকি করে ছেলে মেয়েকে ওদের ক্ষমতার দ্বিগুণ খাইয়ে দেন। মেয়েটা ছোট। নিজে ঠিক মত খেতে পারেনা তাই নিজেই মাছের কাঁটা বেছে, ভাত মেখে খাইয়ে দেন। 

আজকাল বুফে হয়ে বড় ভাল হয়েছে। এখন নিজের প্লেট নিয়ে যতক্ষণ ইচ্ছে বসে বসে খাওয়া যায়। শুধু ছেলেটার ওপর একটু নজর রাখতে হয়। নইলেই ডাল আর লুচি খেয়ে পেট ভর্তি করে ফেলবে। মাছ, মাংস এই সব ভাল ভাল জিনিষ খাবার জায়গাই রাখবে না পেটে। 

খাওয়া হল একটা আর্ট। কোন খাবার কতটা খাওয়া উচিৎ, কতক্ষণ ধরে খাওয়া উচিৎ এ সব জানতে হয়। প্রথমেই গপগপ করে গাদা খানেক খেয়ে নিলে পরের দিকে যখন ভালো ভালো খাবারগুলো আসবে সেগুলো খাবার জায়গা থাকবে না। তাই প্রথম কাজ হল মেনুটা জেনে নেওয়া। তারপর হিসাব কষা, কোন খাবারের জন্য কতটা জায়গা রাখতে হবে। যেমন আইসক্রিম বা চাটনির জন্য কোন জায়গা রাখার দরকার নেই। কিন্তু যদি মাছ আর মাংস দু রকমই থাকে সে ক্ষেত্রে মাছের পিসটা তুলে খেয়ে ঝোল ফেলে দিতে হয়। যাতে মাংস খাবার জায়গা থাকে ইত্যাদি।

হরিপদবাবুর শালীর মেয়ের বিয়ে। ভায়রা খুব বড়লোক। বর্ধমানে ওনার বিরাট ব্যবসা। ওদের এই একটিই মেয়ে। তাই এলাহি ব্যবস্থা করছেন বিয়েতে। কলকাতা থেকে ক্যাটারার্স যাচ্ছে রান্না করতে। ওনাদের আইবুড়ো ভাত থেকে বৌভাত অবধি নেমন্তন্ন। বাড়ীতে খুশির আমেজ। হাওড়ার হাট থেকে হরিপদবাবু একটা সার্টিনের বিছানার চাদর কিনে এনেছেন। ওনার বউয়ের ইচ্ছা ছিল একটু হলেও সোনা দেবার কিন্তু উনি তা ভেটো দিয়ে নাকচ করে দিয়েছেন। বেশী ঝামেলা করলে শেষে নেমন্তন্নটাই না মাঠে মারা যায় ভেবে ওনার স্ত্রী চুপ করে গেছেন।

শালীর বাড়ী বর্ধমান। ওদের বাড়ী থেকে হাওড়া স্টেশন বাসে তারপর ট্রেন। জিনিষপত্র নিয়ে সেজেগুজে স্টেশন পৌছতে একটু দেরি হয়ে গেল। ওখানে গিয়ে দেখেন ট্রেনের লাইনে কি সব ঝামেলা হয়েছে ট্রেন দু ঘণ্টার জন্য বন্ধ। 

কোন উপায় নেই ষ্টেশনে বসে থাকা ছাড়া। সকাল থেকে খাওয়া নেই। এদিকে বেশ বেলা হয়ে গেছে । হঠাৎ মানা, জল বমি করে কেমন যেন এলিয়ে পড়লো। 

মানার মা খুব চেঁচামিচি করতে শুরু করলেন,” সকাল থেকে তোমার জন্য কিচ্ছু খায়নি মেয়েটা।শিগগির কিছু কিনে এনে খাওয়াও।“

“ দাঁড়াও দাঁড়াও দেখছি।“ বলে হরিপদ বাবু ইতিউতি দেখতে লাগলেন।

“ টাকায় পাবেন দশ, মুখে দিলে আসবে রস, খেলেই আপনি বস, না কিনলে আমার লস।“ ষ্টেশনে একজন লেবু লজেন্স বিক্রি করছিল।

ডাকটা শুনে হরিপদ বাবুর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এইটাই ঠিক জিনিস। লজেন্স এনার্জি দেবে কিন্তু পেট ভরাবে না। তাড়াতাড়ি পাঁচ টাকার টিকটিকির ডিমের আকারের নানারঙ্গের চিনির গুলি কিনে ফেললেন উনি। 

“ মুখের মধ্যে রেখে দিবি। মাঝে মাঝে হাল্কা করে চুষবি। তাহলে দেখবি অনেকক্ষণ মুখে রয়েছে আর গাওগুলোচ্ছে না। কড়াম কড়াম করে চিবিয়ে খেয়ে শেষ করিস না যেন। লজেন্স খাবারও একটা স্টাইল আছে বুঝলি।“ 

ট্রেন আসতেই ওরা চড়ে বসলো। লজেন্সের মহিমায় বা আসন্ন ভালো খাবারের আশায় আর কোন অঘটন ছাড়াই ওরা পৌঁছে গেল নেমন্তন্ন বাড়ী। 

ওদের দেখে সবাই ছুটে এলো, “ কি ব্যাপার এতো দেরী?”

“ আরে আর বোলো না ট্রেনের গণ্ডগোল......”

“আরে কথা পরে শুনবি ওদের একটু হাথমুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিতে দে।“ বললেন অসীমা, হরিপদ বাবুর শালী।

লুচি তরকারি মিষ্টি সব খাওয়া হল। 

“ বেশী ঠেসে ঠেসে খেও না। এটা আসল খাওয়া নয়। একটু খিদে বাঁচিয়ে খাও। “ খাবার সময় ফিসফিস করে নির্দেশ দিলেন হরিপদ বাবু।

বিয়ের দিন দুপুরে ভালো করে ঘুমিয়ে নিতে বললেন সবাইকে হরিপদবাবু । কারণ ভালো করে খেতে গেলে সুস্থ থাকতে হবে। খাবার ব্যাপারে উনি দারুণ সিরিয়াস আর খুব ফোকাসড।যা উপহার দিচ্ছেন তার দ্বিগুণ যদি উসুল না করা যায় তাহলে আর নেমন্তন্ন খেয়ে কি লাভ। তারপর ট্রেন ভাড়া, বাস ভাড়া। খরচা তো কম হয়নি। 

সারা দুপুর উনি ঘুমলেন ঠিকই কিন্তু ওনার স্ত্রী আর ছেলে মেয়েরা সারা বাড়ীতে হুড়োহুড়ি আর গল্প করে কাটাল। 

বাড়ীর সামনে বিশাল প্যান্ড্যাল বাঁধা হয়েছে। সারা প্যান্ড্যাল অর্কিড দিয়ে সাজানো হয়েছে। ছেলের বাড়ী খুব মডার্ন , বিরাট বড়লোক, ছেলে আমেরিকায় থাকে। তাই বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে একদম অন্য রকম। 

বিকাল বেলায় মার্সিডিজ চড়ে বর এলো। মেয়ের পরনে লাহেঙ্গা চোলি, বেনারসি নয়। ছেলে কুর্তা পাজামা পরা। 

বিয়ের লগ্ন সন্ধ্যার দিকে। বিয়ে শুরু হতেই হরিপদবাবু একবার খাবার জায়গায় চক্কর দিয়ে এলেন। একদিকে বসে খাবার ব্যবস্থা আর অন্যদিকে বুফে। 

“ এরকম কেন?” ক্যাটারার্সদের লোককে জিজ্ঞাসা করলেন হরিপদ বাবু।

“ আরে আপনি জানেননা বুঝি। এদিকটা হল এলেবেলে। আসল খাওয়া তো ওদিকটায়। ছেলের সব সাহেব মেমসাহেব বন্ধুরা আসছে না বিদেশ থেকে তাদের জন্য স্পেশাল।“

হরিপদ বাবু মনে মনে ঠিক করে নিলেন, উনি ঐ স্পেশালেই খাবেন। হাজার টাকার ওপর খরচা হয়ে গেছে। উনি কেন এলেবেলেদের দলে খাবেন?

প্রথম ব্যাচ শুরু হল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ। হরিপদ বাবু দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে বরযাত্রীদের পিছন পিছন ঢুকে পড়লেন সেই স্পেশাল খাবার জায়গায়। মনের ভিতরে এক অভূতপূর্ব আনন্দের অনুভূতি হতে লাগলো। না জানি কি কি অমৃত খাবেন আজ। 

সারি সারি ঝকঝকে পাত্রে লাইন দিয়ে খাবার সাজানো। বিদেশি অতিথিরা নিচু গলায় কথাবার্তা বলতে বলতে লাইন দিয়ে খাবার গুলি নিচ্ছেন আর হাসি হাসি মুখে কাঁটা চামচ দিয়ে খাচ্ছেন। সারা প্যান্ড্যালে কারুর চিৎকার শোনা যাচ্ছেনা। 

হরিপদ বাবু নির্দিষ্ট জায়গা থেকে প্লেট তুলে নিয়ে নিজের অভ্যাস মত একবার ঘুরে দেখতে গেলেন মেনুটা। 

Appetizers – Crispy lettuce salad topped with Kashkaval Cheese and Balsamic Vinaigrette, Smoked Salmon with Crispy Sweet Potato Napoleon and Creamed Parsley, Breadcrumb Goat Cheese Medallions on Vegetable Tartar in a Basil Sauce, Stuffed Mushrooms with Ricotta Cheese Served with Spinach and Leek Sauce.

Main Course – Fillet of Le-Bract with Vegetables, Couscous in Leek Sauce, Fillet of Dennis with Sautéed Radish and Beetroot in Shallots Sauce, Fettuccini with Cream Sauce, White wine Sautéed Salmon and Cauliflower

Desserts – Tiramisu, Ginger Ice Cream with Zabaglione

পরিবেশন কর্তারা, সামনে গেলেই ইংরাজিতে বলছে “ ইয়েস স্যার!”

লজ্জার মাথা খেয়ে তাদের আর নামগুলোর মানে জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না হরিপদ বাবু। যাহ্‌ এত খরচ মাঠে মারা গেল? বুকের বাঁ দিকে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলেন হরিপদ বাবু। নিজের ভায়রার কথা মনে হতেই প্রচণ্ড রাগ হল। সন্ধ্যার সময় হাসি হাসি মুখ করে ওনাকে আবার বলা হল,” আমি তো সম্প্রদানে বসে যাবো, তুমি কিন্তু দেখে বুঝে ভালো করে খেও হরিপদ।“ এই তার ছিরি? শুরু থেকে শেষ, একটা খাবারও চিনতে পারছেন না। 

অগত্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,সবার অলক্ষ্যে চুপচাপ ডিশগুলো রেখে ছেলে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে এলেন প্যান্ড্যাল থেকে।সামনেই এলেবেলেদের প্যান্ড্যাল। আজ ওখানেই খেতে হবে।

“ আসুন দাদা বসে পড়ুন শিগগির। দারুণ মেনু ভেটকির পাতুরি, ইলিশ ভাপা, কচি পাঁঠা । শেষে ভাপা রসগোল্লাটা নিশ্চয়ই খাবেন।“ হই হই করে উঠলেন ক্যাটারারের পাল বাবু।

হরিপদ বাবু আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। এই না হলে খাওয়া। আহা আজ আবার খাবার পর বাস ধরে বাড়ী যাওয়াও নেই।

“ কই ভাই কোনের দিক দেখে একটা জায়গা দাও দেখি আমায়......।“ বিপুল উৎসাহে ছেলে এবং মেয়েকে নিয়ে হরিপদ বাবু খেতে বসে গেলেন।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.