কাজী রুনা লায়লা খানম

"থাকে শুধু অন্ধকার..."
অতি সম্প্রতি ভ্রষ্ট রাজনীতির আরো এক ন্যক্কারজনক ঘটনার সাক্ষী রইলো কলকাতা শহর।সংস্কৃতির শহর, ঐতিহ্যের শহর কলকাতা দেখলো আকন্ঠ রাজনীতির চোলাই পান করা একদল উন্মাদের হিংস্রতা। যাদের হাতে কলুষিত হলো বিদ্যাসাগর কলেজ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী দুটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয় ভারতীয় রেনেসাঁর অন্যতম যুগপুরুষ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তিও ভেঙে ফেলা হলো চরম জিঘাংসায়। "বীরসিংহের সিংহশিশু" র মূর্তি। যাঁর উপাধিই বহন করে তাঁর নামপরিচয়। যিনি একদা বাঙালি জাতিকে 'বর্ণপরিচয়' করিয়ে 'বোধোদয়' ঘটাতে চেয়েছিলেন! যদিও আজকের ঘটনা সচেতন বাংলাভাষীকে তথা সংস্কৃতিবান প্রতিটি নাগরিককে দাঁড় করালো এক গ্লানিময় প্রশ্নচিহ্নের সামনে, আদৌ কি আমাদের 'বর্ণপরিচয়' ঘটেছে? হয়েছে প্রকৃত 'বোধোদয়'?

না,এমন নয় যে এই প্রথম কোন মূর্তি ভাঙা হলো? ভাগাভাগির ভাঙাভাঙির এই খেলা তো প্রাকস্বাধীনতার সময় থেকেই শুরু।আম্বেদকরের মূর্তি, শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি, বিবেকানন্দের মূর্তি, লেনিনের মূর্তি বিভিন্ন সময়ে ভূলুন্ঠিত হয়েছে আত্মক্ষয়িষ্ণু অন্তঃসারশূন্য ভ্রষ্ট রাজনীতির কারবারীদের হাতে। তাহলে আজ দিকে দিকে এতো প্রতিবাদ সভা,  বা এতো মিছিলের হঠাৎ দরকার পড়লো কেন ?

দরকার আছে। সমস্ত শেষের পরেও যেমন একটা শুরুর তাগিদ থাকে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর মানুষ একবার অন্তত মরিয়া হয়ে ওঠে ... হয় মারতে নয় মরতে ঠিক সেই তাগিদ থেকেই আজকের এই প্রতিবাদ।

মূর্তি কি? মূর্তি আসলে বিশ্বাস। মূর্তি আদর্শ। মূর্তি প্রতিবাদ, মূর্তি বিপ্লব! মূর্তি মানবতার প্রতীক। আর যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষ কোন মহাত্মার মূর্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আসলে প্রতিষ্ঠা করে এসেছে তাঁর আদর্শ, তাঁর জীবনদর্শন, জীবনপ্রতীতী। তাঁর অক্ষয় কীর্তির প্রতি সম্মাননা জানাতে, সেই মহৎপ্রাণের আদর্শকে নিজের ভেতর ধারণ করে, লালন করে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেই অক্ষয় উত্তরাধিকার তুলে দিতেই প্রতিষ্ঠা করা মূর্তির। 

বিদ্যাসাগরের মূর্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। 

এবার একটু দেখা যাক, কি করেছিলেন বিদ্যাসাগর? সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কদিনের প্রতিক্রিয়ায় যে বিষয়টির চর্বিত চর্বন হয়ে চলেছে, তা হলো তিনি 'বর্ণপরিচয়' নামে একটি বই লিখেছিলেন। বর্তমান প্রজন্ম অনেকেই চেনেনা সে বই। তবে সে দোষ শুধু বর্তমান প্রজন্মের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে দায় এড়াতে পারেন না কন্টিনেন্টাল সংস্কৃতির ওপরচালাক আমদানী কারক পূর্বজরা। আত্মবিস্মৃত বাঙালি কি মনে রাখতে পেরেছে "বাংলাগদ্যের যথার্থ শিল্পী "the most accomplished master of style বিদ্যাসাগরকে? সংস্কৃত ভাষার অনন্য অনুবাদককে? বাংলাভাষাকে যিনি পদ্যের আঁটসাঁট বাঁধন থেকে মুক্ত করে তাকে দিয়েছেন গদ্যের সাবলীল গতি? শুধু তাই নয়। তাকে দিয়েছেন সুচারু বিন্যাস।

বিদ্যাসাগর সেই মানুষ যিনি কথায় আর কাজে এক থেকেছেন আমরণ। নিজের ছেলের সাথে হরিমতি বাল্যবিধবার বিয়ে দিয়ে তৎকালীন কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে যিনি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন অনন্য চ্যালেঞ্জ।প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিধবাবিবাহ আইন। আর? আর কি করেছিলেন? না এই খর্বদেহী মানুষটা প্রথম চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় রেনেসাঁকে গ্রহন করেছিলেন। না শুধু গ্রহন নয়, তাকে আত্মস্থ করে ভারতীয় মন আর মননের সাথে সম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে নির্মাণ করলেন এক নতুন সমাজভাবনা। উত্তরপুরুষের জন্য রেখে গেলেন নব্য সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। ইউরোপীয়ানদের পোষাক নয়, মদ নয়, নিয়েছিলেন অন্তরের ঐশ্বর্যটুকু। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি ঘোরতর অন্ধকার সময়ে উপলব্ধি করেছিলেন নারী হলো সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ! উপলব্ধি করেছিলেন একজন শিক্ষিত মা ই পারে একটা সুশিক্ষিত সমাজের ধারিণী হতে। একটি মেয়ে শিক্ষিত হওয়া মানে তার সন্তান শিক্ষিত হওয়া! সমাজ শিক্ষিত হওয়া। আমরা মনে রাখিনি এই প্রাতস্মরনীয় পুরুষসিংহকে।

বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন শিক্ষিত হোক নারী। স্বনির্ভর হোক, স্বয়ম্ভর হোক চেতনায়। চেয়েছিলেন উন্নত একটা সমাজ।

আমরা কি পেরেছি সেই উত্তরাধিকারকে রক্ষা করতে? পারিনি। আর পারিনি বলেই আমার রাজ্যে কামদুনি কান্ড ঘটে যায়। ধুপগুড়ি কান্ড ঘটে যায়। এবং প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে এমন আরো অজস্র ঘটনা ঘটে যায় কখনো তা প্রকাশ পায় আর বেশিরভাগটাই থেকে যায় আড়ালে। 

আমরা আসলে প্রতিদিন একটু একটু করে বিদ্যাসাগরকে ভেঙেছি।বিবেকানন্দকে ভেঙেছি, রবীন্দ্রনাথ, লেনিন মার্কস সবাইকে ভেঙে চলেছি প্রতিনিয়ত।যেদিন কলেজ শিক্ষিকার ওপর রাজনীতির ছায়ায় আশ্রিত দুষ্কৃতিরা জলের জগ ছুঁড়ে মারে সেদিন বিদ্যাসাগরকে ভেঙেছি। যতোবার পণের দাবীতে পুড়িয়ে মারা হয়েছে কোন না গৃহবধূকে ততোবার বিদ্যাসাগরকে পুড়িয়েছি।যেদিন শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিকে ঢুকিয়েছি ভোটব্যঙ্ক দখলের লক্ষ্যে সেদিন ভেঙেছি মনিষীদের।যেদিন বাংলা সংস্কৃতি ভুলে বহির্বাংলার সংস্কৃতিকে আমদানী করেছি, সেদিন ভেঙেছি। যেদিন ইভটিজিং রুখতে যাওয়া বাপী সেনকে পিটিয়ে মারলো ইভটিজাররা, আর আমরা সহজাত প্রবণতায় পাশ কাটিয়ে গেলাম কেউ কেউ, যেদিন ভোট করতে গিয়ে রাজকুমার রায়ের মতো শিক্ষক লাশ হয়ে গেলেন যার মৃত্যুর সঠিক কিনারা আজও অধরা।আর আমরা অধিকাংশই চোখ বুজে থাকলাম সেদিনই ভেঙে ফেলেছি বিদ্যাসাগরকে ... বিবেকানন্দকে।যেদিন কবিগুরুর নোবেল চুরি গেলো, আর এতোবড়ো দেশের এতোবড়ো ইন্টেলিজেন্স আজও এ চুরির কিনারা করতে পারলো না।সংসদ ভবন যেদিন ভাঙচুর হলো, সেদিনও ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছে আমাদের ঘূণে খাওয়া সংস্কৃতি, শালীনতা।

যেদিন এম এ পাশ মেধাবী গরীব ছেলেটি মন্ত্রীমশায়ের দাবীমতো মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে না পেরে চাকরী না পেয়ে বেছে নেয় আত্মহননের পথ। যেদিন চাকরীপ্রার্থী ছেলেটি নেতার কথা মানতে ভোটপ্রচারে বেরিয়ে পড়ে। পরিণামে চাকরী নয় বিরোধীদলের হাতে লাশ হয়ে ঘরে ফেরে সেদিন সংস্কৃতির কফিনে ঠুকে দেয়া হয় শেষ পেরেক। আসলে এই ভাঙার খেলাটা আমাদের মজ্জাগত।

এবার সময় এই ভাঙার খেলা বন্ধ করার, রুখে দাঁড়ানোর। অনেক হয়েছে রাজনীতির বলি। আমাদের চিন্তা চেতনাকে প্রতিদিন গলা টিপে মারছে এই ভ্রষ্ট রাজনীতি।এখনও যদি আমরা সচেতন না হইই, যদি সটান দাঁড়িয়ে বলতে না পারি "রাজা তোর কাপড় কোথায়?", যদি সিলিক্টিভ প্রতিবাদীর মতো আঙুল তুলি উল্টোদিকে থাকা মত আর পথের অনুগামীদের, যদি আত্মসমালোচনা করতে না পারি, রাজনীতি নামের পরগাছাগুলোকে বাড়তে দিই প্রশ্নচিহ্নহীন -  তাহলে আগামীর হাতে আত্মধ্বংসী মারণাস্ত্র তুলে দেবার মতো ভুল হয়ে যাবে। যা একাধারে ক্ষমাহীন।

আমরা আমাদের স্বার্থলগ্ন ছোট ছোট গন্ডী ভেঙে বেরোতে পারিনি বলেই, রাজনীতির ভ্রষ্ট ছায়ার নীচে খুঁজে নিয়েছি ওপরে ওঠার সহজ ও নিরাপদ সিঁড়ি। আর তাই আমাদের সংস্কৃতির বুকের ওপর রাজনীতিও অনায়াসে চালিয়ে দিয়েছে বুলডোজার। আর নয়।

সবচেয়ে মজার বিষয় সম্প্রতি মূর্তি ভাঙা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপি বলছে তৃণমূলের পরিকল্পিত এই মূর্তি ভাঙা। তৃণমূল বলছে বিজেপি ভেঙেছে। বামদলগুলো বলছে দুপক্ষই দায়ী।কিন্তু কেউই বলছেনা এ আমাদের সবার ব্যর্থতা। আমরা পারিনি আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে।এ আমাদের ব্যর্থতা।আমাদের মানসিক দৈন্যতা। আর রাখবেই বা কি করে আমাদের রবিঠাকুরের সংস্কৃতি, বিদ্যাসাগর- বিবেকানন্দ- রামমোহনের সংস্কৃতিকে ধর্ষণ করার জন্য প্রতিদিন তাদের মুখনিঃসৃত এক একটা শব্দই যথেষ্ট। আর এই ঘোলাজলে কিছু 'বুদ্ধিজীবী' (মিডিয়া আরোপিত উপাধি!) পরিচয়ধারী আশ্চর্য (মানুষের মতোই যারা চলে ফিরে, কথা বলে আর সময়ের সাথে সাথে টুক করে পাল্টে ফেলে রঙ রূপ) জীব সেজেগুজে ভীষণরকম তর্ক বাঁধায় টেলিভিশনের পর্দায়।আর সময়ান্তে ঢুকে যায় কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ডেরায়।সংস্কৃতিকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙছেন তারাও ( চন্দ্রবিন্দুটা সচেতনভাবেই বাদ দিলাম) ।

পেড মিডিয়া গুলো সমস্ত অন্যায়, অরাজকতাকে দেখে কখনো অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকায় "মাষ্টারমশাই কিছুই দেখেননি ",তো কখনো কলির নারদ হয়ে উত্তেজিত করছে, লড়িয়ে দিচ্ছে মানুষকে।একদিকে যখন ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রঞ্জিত হয়ে উঠছে।তখন তারা সো কলড "দেশপ্রেমিক"রা "পাঁচড়া হলে কি মলম লাগায় "সেই গল্প ফেঁদে  টি আর পি বাড়াচ্ছ।সাধারণের লড়াই, সাধারণের ভুখা পেট, সাধারণের হতশ্রী যাপনকে উপেক্ষা করে ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে,মেকি দেশপ্রেমের ধুয়ো তুলে,সাধারণকে লড়িয়ে দিয়ে,'আর্টিফিসিয়াল ক্রাইসিস' তৈরী করে "নেপোয় দই মারা" র কালচারটা কিন্তু মানুষ বুঝে গেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। সময় সমাগত। কোথাও সংঘবদ্ধ হচ্ছে বিবেক। নিজস্ব গভীরে, কোথাও দীর্ঘায়িত হচ্ছে মিছিল। মানুষের। চেতনার।টের পাই ছুঁয়ে থাকা বুকের বাতাসে। 

anishakrk333@gmail.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন