x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শনিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৯

পিনাকি

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৯ |



-তুমি যে কি বলও !

-কেন ? বলতে চাইছিস আমার আগের গল্প তোর পাঠিকার ভালো লাগেনি !

-আমি কিছু বলিনি , পাঠিকা যা আমায় বলেছে তাই বললাম ।

-আরে আমি তো গল্প বলিনি । যা ঘটেছে তাই বলেছি । তোরই দোষ , নির্ঘাত বাহবা নেওয়ার জন্য , নিজের পাঠিকাকে বলেছিস যে গল্পটা তুই লিখেছিস । 

-দেখো সুন্দরী শিক্ষিতা রুচিশীল পাঠিকার কাছে আমার মতন লেখক একটু নিজের বিজ্ঞাপন দেবেই । যতই বড় শিল্পী হোক অনুরাগীদের কাছে সে ভিক্ষুক , নিজের প্রশংসা বাহবা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে । হ্যাঁ নিজের গুরুগম্ভীর ভাব রক্ষা করবার জন্য হয়ত উদাসীনতার অভিনয় করেন । তবে সে বিখ্যাত লেখকদেরই মানায় । আমার মতন চুনোপুঁটিদের নিজের ঢাক নিজেকেই পেটাতে হবে । 

-হ্যাঁ পেটা । আমি বলছি পেটানোর আগে অভ্যাস করে নে , কেমন ভাবে পেটাবি । তা না হলে ফেটে যাবে

যে ! 

-সে যাক । আমার ঢাক যদি ফাটেও , আমার হাতেই ফাটবে ।

-আরে আমি আমাকে বাজাতে দিতে বলছিনা , অন্তত নিজের বিজ্ঞাপন কখন , কেমন , কীরকম ভাবে দিবি --- অন্তত শিখে নে । 

এমন সময় আমরা টের পেলাম কেউ খুব দ্রুতই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে । এই শব্দ শুনে মনে হয়েছে এইদিকেই আসছে । 

ত্রিনুদা দরজায় চোখ রাখতেই দেখলাম মুমিনের মুখ । 

-কি ব্যাপার ! এতো রাতে ।

-রাত ! এই সময়তো অতি উত্তম । মনে আছে আমরা আগে প্রায়ই প্রেত সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তাম ।

আমি বললাম – তোকে ফোন করে বললাম আয় ,তা তুই বললি আজ হয়ত আসতে পারবি না । আমি তাই একাই চলে এলাম । 

মুমিন ঘরে এসে ঢুকল । চেয়ার টেনে বসল ।- বেদদা আজ আমার না এলেও কোন অসুবিধা ছিলা না । তাও আসতে হল ।

-কেন ?

- আসলে আমি এখানে আসবার আগে আমার দাদার এক পরিচিতের বাড়ি গিয়েছিলাম । আলিপুর আদর্শপল্লী ।সেখান থেকেই আসছি ।

ত্রিনুদা পাতলা পাঞ্জাবি আর পাতলা পাজামা পড়ে আছে । গায়ে সাদা চাদর জড়িয়েছে । বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে । বালিশের পাশেই হাজমোলার শিশি । ধাকনা খুলে দুটো হজমিগুলি মুখে পুড়ে দিল । আমরা কেউ খাইনা । এই হজমিগুলি খাওয়াটা ত্রিনয়নদার অভ্যাস । ত্রিনয়নদাকে আমরা ত্রিনুদা বলি । 

ত্রিনুদা বলল – ব্যাপারটা কী ? 

মুমিন টেবিলে রাখা বোতলের জল পান করল । বলল - আমার দাদার বন্ধুর ভাই । ওদের বাড়িতে এই শেষ একমাস থেকেই অদ্ভুত কিছু কাণ্ডকারখানা দেখতে পাচ্ছি । যদিও এই ঘটনার কোন যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা কেউ খুঁজে পায়নি । তাই আমাকে ডাকা হয়েছিল । 

-কেমন ?

ত্রিনুদা বুকের চাদরটা বেশ ভালো করে টেনে নিল । বেশ কয়েকদিন কলকাতায় ভালো ঠাণ্ডা পড়েছে । কিছুক্ষণ আগেই জানালা বন্ধ করা হয়েছে । এখন রাত সাড়ে দশটা । এই অঞ্চলে এখনো বড় –বড় গাছ রয়েছে । অনেক পুরানো বাড়ি রয়েছে । তাই সূর্য ডুবলেই ,অন্ধকারে গাছেদের মাথা থেকে যেনও ঠাণ্ডা ক্রমশই ছড়িয়ে যায় । 

আমি বললাম – মুমিন , গোটা ঘটনা খুলে বল ।

মুমিন বলল – আসলে আমি যার জন্য গিয়েছিলাম তার নাম সব্যসাচী বণিক । পেশায় শিক্ষানবিশ আইনজীবী । অনুশীলন করে আলিপুর কোর্টে । যাইহোক । আমার এই যাওয়ার পিছনে সব্যসাচীর জ্যাঠতুঁতো দাদার সাথে আমার জামাইবাবুর পরিচিতি রয়েছে । সেই সূত্রেই আমাকে ডেকেছে । একমাস ধরে সব্যসাচী যেনও একটু –একটু করে পাল্টে যাচ্ছে ! আগে ছেলেটা খোলামেলা ছিল , কিন্তু ক্রমশই ওর মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে । বাড়ির লোকের কথায় , মাঝরাতে মানে প্রায় একটা থেকে তিনটের মধ্যে দেখা যায় একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে । দু’দিন সব্যসাচীর বাবা দেখেছে । পরের দিন জিজ্ঞেস করতেও , এড়িয়ে যায় । শুধু তাই নয় বাড়িটা যেনও ক্রমশই পাল্টে যাচ্ছে । মানে বাড়ির লোকের মনে কোন আনন্দ নেই । সবটাতেই অজানা এক উদ্বেগ দেখলাম । আমাকে এই সব কথা বলে জামাইবাবুর বন্ধু অলকেশ জানা । সব্যসাচীর জ্যাঠার ছেলে ।

এই অব্দি শুনে , ত্রিনু দা বালিশের পাশে রাখা শিশি থেকে দুটো হজমোলা মুখে পুড়ে নিল । বলল 

-তুই বাড়িতে গিয়ে কি দেখলি ? 

মুমিন চোখ দুটো বড় করে বলল – কিছু যে দেখেছি ,এটা বলব না । তবে কিছু একটা টের পেয়েছি । ছেলেটার সাথে দেখা হতেই মনে হল সুস্থ নয় । তবে আমাকে অবাক করে দিল ,যখন ছেলেটা প্রথম দেখাতেই জানতে চাইল -- আমারে বাড়িতে আসবার পিছনের উদ্দেশ্যটা ! 

ত্রিনুদা বলল –আর কিছু ?

-ছেলেটার মা বললেন , অনেক রাতে ঘুম থেকে উঠে এমন অনেক কথা বলে যার যুক্তি নেই । যেমন এখানে আর কত দিন থাকবে ! ফিরে যাব । এটা ঠিক নয় । ইত্যাদি । আমার হাত ধরে মাসিমা বললেন , এই ছেলেটার মাথার ঠিক নেই । আমার দিকে তাকিয়ে হাসল আর বলল , আমি সবকিছুতে বাড়তি উৎসাহ দেখাই । এতা আমার জন্যই ক্ষতিকারক ।

ত্রিনুদা মুচকি হাসল । এই হাসির অর্থ আমরা বুঝি । ত্রিনয়ন ঘটক পরবর্তী কেসের গন্ধ পাচ্ছে । আমি বুঝতে পারলাম না এখানে এমন কোন রহস্য আছে নাকি ? আমি মন্ত্র শক্তিতে বিশ্বাস করি । ত্রিনুদার সাথে থাকতে –থাকতে এই একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত , জীবনটাকে ,চারপাশের পরিবেশটাকে আমরা যেমন ভাবে দেখি ,তা পুরোটাই তেমন নয় । এই যে জগত যেখানে নিঃশ্বাস ফেলা জীবকেই জীবিত বলি ; নিঃশ্বাস নেয়না এমন কিছু অস্তিত্ব রয়েছে । প্রাণ নেই , তারা প্রাণী নয় । কিন্তু অস্তিত্ব রয়েছে । আচ্ছা অনুভূতি , ভয় , ভালবাসা , ইচ্ছাশক্তি --- এগুলোর প্রাণ নেই ; তাই বলে অস্তিত্ব নেই !! আছে , অস্তিত্ব রয়েছে । মানুষের বেঁচে থাকবার সাথে এগুলো ওতপ্রোত ভাবে জড়িত । এর আগে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে , যা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে । এই যে প্রমাণিত জ্ঞান , তা আমাদের কাছে বিজ্ঞান । আর বিজ্ঞান সম্মত বিশেষ জ্ঞান , যা সবসময় প্রমাণের মাপকাঠিতে থাকে না। আবার প্রমাণ বলতে যদি নিজের উপলব্ধি হয়ে থাকে ,তবে তাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় মানুষ ।

আমি এতো কথা কেন বলছি ? না বলে থাকতে পারছিনা ,কেননা মন্ত্র শক্তি , প্রেত চর্চা , এগুলোর উপস্থিতি আমরা যেমন ভাবে ত্রিনয়নদার কাছে পেয়েছি ; তেমন কোথা থেকেও পাইনি । ত্রিনয়ন ঘটককে আমরা ত্রিনুদা বলে ডাকি । আমাদের এই সম্পর্ক প্রায় পাঁচ বছরের । আমি ত্রিনুদার ক্ষমতা দেখেছি । তাইতো তার কথাই আমি আমার পাঠককে বলতে চাই । 

-তারপর চলে এলি ?

ত্রিনুদা , মুমিনকে জিজ্ঞেস করল । কানে কথা আসতেই আমার হুঁশ ফিরল ! আমি বললাম –এইটুকুতে বড় কিছু বিষয়ে ভাবা যায়না ! 

-না বেদ , এইটুকুতেই অনেক কিছু বোঝা যাচ্ছে ।

-মানে !

আমি ত্রিনুদার দিকে কিছুটা অবাক হয়েই তাকালাম ।

ত্রিনুদা গলার স্বর পাল্টে দিল । বলল - মুমিন দেখ এখন এগারোটা বেজে গিয়েছে । আমি বলছিলাম তোরা এখন বাড়ি যাবি । আমরা এই নিয়ে কালকে আলোচনা করব । আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় । তবে আগামী দিন আমি সন্ধ্যা আটটায় এখানে আয় । আমি এই নিয়ে আলোচনা করব ।

মুমিন বলল – দাদা আমি কিন্তু টাকা চাইতে পারব না।

ত্রিনুদা বলল – আমি পারিশ্রমিক ছাড়া নিজে কাজ করিনা । আমি তোকে সব কিছু বলে দেব । তুই শুধু ওনাদের গিয়ে বুঝিয়ে বলবি । আর বাকী কাজ করবি । 

আমি মুমিনের দিকে তাকিয়ে বললাম – এমন কি কাজ ! বাড়িতে প্রেত শক্তির অবস্থান আছে নাকি আমরা তা জানব কেমন করে ? আর না জানলে মুমিন কেমন ব্যবস্থা নেবে !

ত্রিনুদা আমার কথা শুনল । চুপ করে থেকে বলল – আমি জানিনা মুমিন ওদের দিক থেকে কতটা সাড়া পাবে । তবে এই ঘটনার সাথে তন্ত্র যুক্ত রয়েছে । অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছে । আর সেই তন্ত্র ছেলেটির ইচ্ছাশক্তিকে অনেকটাই দখল করে নিয়েছে । দেখা যাক ,পরের দিন মানে তুই কবে যাবি ?

-দিন দশেক । 

-মুমিন , খুব ভালো ভাবে বাড়ির পরিবেশটাকে পর্যবেক্ষণ করে আসবি ।

আমরা আজকের মতন আড্ডা ভাঙলাম ।

# ২ #

খুব সকালেই ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ! ত্রিনুদা ফোন করেছে । এতো সকালে কেন ?

-হ্যালো ।

-কিরে কটা বাজে ?

-সকাল নটা । আমি আজ দশটা পর্যন্ত ঘুমাবো । আজ রবিবার । তুমি কেন ফোন করলে !

-এগাররোটার মধ্যে চলে আয় । দুপুরে এখানেই খাবি । মুমিন আসবে বলেছে । 

আমি আর না করতে পারলাম না। ত্রিনুদার বাড়ি গিয়ে বেশ জমে গল্প গুজব হয় । শুধু আফসোস ঘুমটা হবে না ! 

আমি খুব দ্রুত খাট থেকে নেমে , বাথরুমে গেলা। আমার ঘর থেকে ডাইনিং পেড়িয়ে বাথরুমে যেতে হয় । মাঝে বারান্দা আছে । যেতেই দেখি বাবার বলল – আজ এই বাড়ি না ওই বাড়ি ?

আমি বললাম – ত্রিনয়নদা কিছুক্ষণ আগেই ফোন করেছিল ।

-তাহলে আমি আর বাজার যাচ্ছি না 

আমরা যে ঘরে তিন মূর্তি জড়ো হয়েছিলাম ,তা হচ্ছে একতলার বসবার ঘর । ত্রিনুদা লাল রঙের টিশার্ট আর ব্লু জিনসের প্যান্ট পড়েছে । মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো । এতো ফিটফাট হয়ে আছে ,মানে নির্ঘাত কেউ আসবে । দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ত্রিনু দা পকেট থেকে হজমোলার শিশি নিয়ে , মুখে পুড়ে দিল । আমরা আজ পর্যন্ত কখনই ত্রিনুদাকে ধূমপান করতে দেখিনি । এই হজমোলা একমাত্র নেশা । দাদা নিজে বহুবার বলেছে , যে কোন নেশায় নাকি তার ধ্যান করতে অসুবিধা হয় । তাও দাদা নিজের একমাত্র নেশা ছাড়তে পারেনি ! 

ঘরের বেল বেজে উঠতেই ,কেষ্টদা দরজা খুলে একজন কে ঘরে নিয়ে এলো ।

চেহারা দেখে বয়সের আন্দাজ করতে পাচ্ছিলাম না ।প্রায় বত্রিশের কাছাকাছি হবে । চোখে কালো চশমা । ফর্সা , হাল্কা চেহারার । জিনস আর টপ পড়েছে । সুন্দরী কাকে বলে জানিনা ! তবে আকর্ষণীয় । 

আমাদের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করলেন । বললেন – ত্রিনয়ন ঘটকের সাথে কথা বলতে পারি ?আমি কিছক্ষণ আগে ওনাকে ফোন করেছিলাম । 

ত্রিনুদা হাত জোর করে বলল –বসুন । আমার সাথেই ফোনে আমার কথা হয়েছিল । এরা আমার সহযোগী , বেদ আচার্য আর মুমিন । আপনার সমস্যার কথা খুলে বলতে পারেন , অসুবিধা নেই । 

ভদ্রমহিলা বসে পড়লেন । তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন 

-আমি বেলেঘাটায় থাকি । এই সমস্যা প্রায় একমাস ধরে হচ্ছে । পেশায় আমি একজন আইনজীবী । আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী । ভগবানে আমার বিশ্বাস নেই । ভূত , প্রেত , অলৌকিকতা –এগুলো সিরিয়াল ,সিনেমার বিষয় বলে মানতাম । কিন্তু গত একমাসে আমার এই ভাবনার পরিবর্তন এসেছে ! জানিনা মানে জানব বলেই আপনার কাছে এসেছি । 

ত্রিনুদা ভারী গলায় বলল – গত একমাসে ঠিক কেমন কি ঘটল ? সুস্মিতা আপনি ভূতের কোন উপস্থিতি পেয়েছেন ? 

-রাত তখন প্রায় দুটো ,আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল!! আমি বুঝতে পারলাম না , এই ঘুম ভাঙবার কারণ ।আগের শেষ রাতে অনুষ্ঠান ছিল , মদ্যপান করেছিলাম । বেশ কয়েক পেগ , কড়া ছিল । এই ঘুম চলে যাওয়ার কারণ তাও হতে পারে । পাশের টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে জল নিয়ে , গলা ভেজালাম । তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ঘুমাতে যাব , এমন সময় খাটের কোনাকুনি থাকা সোফাতে একটা ছায়াকে বসে থাকতে দেখলাম ! হ্যাঁ , সেই মুহূর্তে ভেবেছিলাম আমার মতিভ্রম হবে হয়ত ! ছায়াটা জায়গা ছাড়ল না , পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছায়াই ছিল । মুখ দেখতে পাচ্ছি না । এই যে বসে রয়েছি উল্টো দিক থেকে আল এসে মুখে পড়লে পিছনে ছায়া তৈরি হয় , তেমনই ছায়া ! বুকের ধকপুকানি শুনতে পেলাম । নিজের চোখকে বিশ্বাস করিনি । বেশ কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম , সোফার সেই ছায়া এখন আর নেই ! একটা ছায়া থাকা আর না –থাকবার মধ্যে যে ফারাকটা তা এখন টের পাচ্ছি । আমি ভয় পেলাম , এতটুকু বুঝে গিয়েছি আমার কোন স্নায়ু ঘটিত সমস্যা হয়েছে । তারফলেই চোখের এই ভুল ! 

ত্রিনুদা বলল –এর পরের রাতেও কোন অভিজ্ঞতা ছিল ? নাকি এটাতেই...। 

মেয়েটি হাসলেন – ত্রিনয়ন বাবু , আমি এতো সহজে কাবু হওয়ার মানুষ নই । যত দিন এগোতে লাগল , ততই নানারকমের দৃশ্য দেখতে লাগলাম । আমি আগে বিশ্বাস করতে চাইতাম না , এখন যেনও বিশ্বাসই হচ্ছে শুধু । আমার পরিচিত জগৎ এর পিছনেও ,আরেকটা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা আস্তানা আছে । আমি ক্রমশই সেই পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে উঠছি ! 

-কেন ?

-আমি ক্রমশই নিশাচর হয়ে উঠছি । মানে কোন কারণ না থাকলেও , ছাদে দাঁড়িয়ে থাকি । ছাদে যখন থাকি তখন মনে হয় কেউ আমার উপর নজর রাখছে । আমি ঘুমিয়ে পড়লেই গলা টিপে ধরবে । আমি নিজে লক্ষ্য করলাম , আমি আমার গোছানো জিনিস ভুলে যাচ্ছি ! 

-আপনি একাই থাকেন ?

-মা আর আমার মেয়ে থাকে । 

-মেয়ে ?? 

-আমি ডিভোর্সি । কিন্তু দয়া করে এই নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না । আমি আমার অন্ধকার অতীত ভুলতে চাইছি । 

-তা আমি কি করব ?

-দেখুন সাতদিন আগে রাতের বেলায় আচমকাই মনে হচ্ছিল কেউ বিছানায় আমার পায়ের দিকে বসে রয়েছে ! মেয়েটা মায়ের কাছে ঘুমায় । ঘরে আমি একাই । পায়ের কাছে সেই ছায়া মূর্তিটা , আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি গলা শুকিয়ে আসছে । 

-কোন ভালো মনোবিদ দেখান । এটা নার্ভের সমস্যাও হতে পারে । 

-দেখিয়েছি । ওরা বলেছে স্নায়ুর অতিরিক্ত চাপের জন্য ।

-তাহলে আর আমার কাছে কেন ! মেডিটেশন করুন টেনশন মুক্ত হোন ।

- আমার চেহারা দেখবেন , চশমাটা খুলি ...

চশমা খুলতেই আমরা আঁতকে উঠলাম ! দুটো চোখের কোটরে গর্ত হয়ে উঠেছে । মুখ শুকিয়ে গিয়েছে । 

মহিলা বললেন – আমার মনে হচ্ছে , যতদিন যাচ্ছে ততই কেউ আমার ইচ্ছা শক্তিকে শুষে নিচ্ছে । আমি ক্রমশই বিশ্বাস হারাচ্ছি । ত্রিনয়ন বাবু , অনেক কষ্ট করে আপনার খবর নিয়ে তবে এসেছি , ফিরিয়ে দেবেন না । আমি বাঁচতে চাই । আমার ছোট্ট মেয়ের জন্য আমাকে বাঁচতেই হবে । প্রশাসন কখনই আমাকে বিশ্বাস করবে না । আর তান্ত্রিক , জ্যোতিষীদের টাকা উপার্জনেই আগ্রহ । এমন অবস্থায় , আমি আপনার খবর পরিচিত মাধ্যম থেকেই পেয়েছি। আমাকে বাঁচান স্যার । 

ত্রিনুদা বলল – আমার পারিশ্রমিক ছয় হাজার টাকা ,এই কেসে । দুহাজার টাকা অগ্রিম । কাজ শেষ হলে বাকীটা । কাজ না হলে পাঁচশটাকা নিয়ে পুরোটাই ফেরত পাবেন রঞ্জনা বসু । আমরা কাল সন্ধ্যার দিকে যাব । দরকারে থাকতেও পারি । 

মহিলা হাতজোর করে অগ্রিম দিয়ে গেলেন । যা দেখছি দুহাজার টাকার নতুন নোট , এখন খুচরোর মতন হয়ে গিয়েছে !

ত্রিনুদা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল – দুপুরের খাওয়া খেয়ে আমায় একটু বেরোতে হবে । কাল সন্ধ্যায় । মনে থাকে যেনও । বেলেঘাটা যাব । 

 # ৩ #

ঘরে ঢুকতেই ত্রিনুদা কেমন মুচড়ে গেল ! আমরা বুঝতে পারলাম না । চোখের লাল চশমাটা খুলে রঞ্জনা বসুর দিকে তাকিয়ে ত্রিনুদা বলল – আপনি সত্যিই নিশ্চিত আপনার এখানে কোন অপশক্তি রয়েছে ?

-দেখুন আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা । কিন্তু বিগত একমাসে আমার এই বিশ্বাসে ভাঙন ধরেছে । আমার অভিজ্ঞতা আপনাকে বলেছি । আর নতুন কিছু ঘটেনি । 

-আমি বলছিলাম আপনি নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছেন ?

-মানে ?

আমরা চারজনেই সোফায় বসে আছি । বাইরে সন্ধ্যা মিশে গিয়েছে রাতের বুকের আঁধারে । শহরের মাথায় নক্ষত্ররা মালার মতন ঝরে পড়ছে । আচমকাই আকাশে এতো নক্ষত্র উল্লাস দেখে , আমার ভালোই লেগেছে । প্রেম এই নশ্বর সময়ে , অবিনশ্বর । আকাশে যে তরঙ্গ , তা আমার মনেও ধ্বনি তুলেছে । সেই সুর আমাকে ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দিল !

এতো কথা আমি এর জন্যই বলছি , এখানে এই ঘরে আমরা বসে রয়েছি । আমার সামনে রঞ্জনা বসু । উল্টো দিকে ত্রিনুদা আর মুমিন । ত্রিনুদা এই সন্ধ্যা বিগলিত রাতের কিছু আগের প্রস্তুতির পর্বে চোখে লাল চশমা , টিশার্ট আর ব্লু জিনস পড়েছে । চশমার কাঁচের রঙ লাল । হাতে রুদ্রাক্ষের মালা । এই মালা ধরে মনে –মনে জপ করে । এটা একটা অনুশীলন । মন কে নিজের হাতের মুঠোয় রাখবার । আমার মনে পড়ে গেল একদিন ত্রিনুদা দেখলাম খুব ভোরে ছাদের চাতালে আসন পেতে বসে আছে , আর হাতের মালা জপতে –জপতে বলল – বেদ চারপাশে যে নিস্তব্ধতা রয়েছে , তার ভিতরেও শব্দ রয়েছে । আমি শুনতে পাচ্ছি । এটা কোন গল্প বা অলৌকিক কথা নয় । তুই অনুশীলন করলে শুনতে পারবি । তখন ভোর চারটে হবে । আগের দিন গভীর রাত অব্দি আমরা তিনজনে চার্লি চ্যাপলিনের ছবি দেখেছিলাম । অনেক রাতে শুয়েও ত্রিনুদা পৌনে চারটেতে উঠে যায় । তারপর চলে যোগাভ্যাস । এইসব কিছু তন্ত্র ক্রিয়ার অংশ । ত্রিনয়নদা কী তান্ত্রিক ? এই প্রশ্ন আমরা অনেকবার দাদা কে করেছি । সব সময়ের জন্য হেসে এড়িয়ে গিয়েছে ; বলেছে – না , আমাদের দেশে যে তন্ত্র ঐতিহ্য রয়েছে সেখানে নিজেকে তান্ত্রিক বলতে মাথা নুইয়ে আসে । তবে হ্যাঁ তন্ত্র পরিবারের একজন ভাড়াটে , যেইদিন ভাড়া দিতে পারব না , সরে যাব । 

এই ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাই আমার কাছে পরিচিত নয় । 

ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল –বেদ , এ খন এইসব না ভেবে এইদিকে খেয়াল রাখ । 

আমি জানি , আমার মনের ব্যাপারস্যাপার নির্ঘাত মুখে ফুটে উঠেছে । ত্রিনুদা সেই ভাষা পড়ে ফেলেছে !

আমি নিজের এলোমেলো চিন্তাকে স্থির করে বললাম – দাদা ,উপরের ঘর দেখব না ? 

-আমার মনে হচ্ছে তার আর দরকার হবে না ।

রঞ্জনা বসু ত্রিনুদার দিকে তাকিয়ে বললেন –আপনাদের দরকার পড়লে বলতে পারেন । পুরো বাড়ি দেখাতে অসুবিধা হবে না ।

-আমাদের দরকার হলে ,আপনার অসুবিধা শুনতাম না। ম্যাডাম আত্মা মানুষের মতন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাফেরা করতে পারেনা । সে সীমাবদ্ধ । তাকে নিজের সীমা পেরিয়ে যেতে হলে কোন মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয় । আমার মনে হচ্ছে আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে ।

রঞ্জনা বসুর মুখে এখন একটু উদ্বেগের ছাপ দেখতে পেলাম । বললেন –সেই দিন সবটাই বলেছি ।আর কিছু বাকী নেই । 

চা এসে গেছে । আমরা চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলাম । ত্রিনয়নদা হাসতে –হাসতে বলল –আপনি ঠিক ততটুকুই বলেছেন , যতটুকু আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছি । এখনো বেশ কিছু কথা শোনা বাকী আছে । 

-মানে !

- রঞ্জনা ,আপনি প্রথম কবে এমন অনুভূতি অনুভব করেন ?

-তারিখ মনে নেই ।

-হুবহু দরকার নেই । আপনি বলেছেন একমাস ধরে ।মাসের প্রথমে ,মাঝে না শেষে এইটুকু বলুন । 

-দশ তারিখের পর হবে । আচমকাই মধ্যরাতে ।

-সেই দিন কোথায় গিয়েছিলেন ? মনে করুন । মনে নেই বলবেন না । 

উনি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – অফিস থেকে বাড়ি । আর কোথাও নয় ।

-ভুলে যাচ্ছেন না তো ?

কিছুক্ষণ থেমে বললেন – হ্যাঁ , মাঝে মন্দির গিয়েছিলাম ।

-যেই দিন থেকে এইসব ঘটনা ঘটেছিল , তার কতদিন বাদে আপনার চেহারা ভাঙতে শুরু করে । মেজাজে পরিবর্তন আসে । এমনকি আত্মবিশ্বাস পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায় !

-এটা স্পষ্ট মনে আছে , একসপ্তাহ । হ্যাঁ , এক রবিবার দেখলাম । নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেই চমকে 

গেলাম ! 

-আপনার শরীর ছাড়া বাড়ি র আর কোন মানুষ বা পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে ?

-আমার চোখে পড়েনি । সত্যি বলতে আমি নিজেকে নিয়েই যেনও ঘোরের মধ্যে রয়েছি ! ক্রমশই বুঝতে পারছি , চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছি । ত্রিনয়ন আমি বাঁচতে চাই । আপনি বাঁচান ।

ত্রিনুদা চায়ের কাপে অন্তিম চুমুক দিয়ে ,খালি কাপটা টেবিলের উপর রেখে বলল – আমি কাউকে বাঁচাতে পারিনা । আপনিই নিজের উদ্ধার করতে পারেন । তাইতো বলছি , কিছু লোকাবেন না । যদি এমন কোন কাজ যা নিজের চোখে নিজেকে ছোট করে দিয়েছে --- তাও স্বীকার করুন । 

আমি স্পষ্ট দেখলাম - রঞ্জনা বসুর চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে । 

উনি বললেন – আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন ?

-একেবারেই নয় । তবে রঞ্জনা বসু আপনি যে ঘৃণ্য কাজটা করে ফেলেছেন ,তার জন্য ক্ষমা চাইতে বলছি ...

এই কথাটা শোনা মাত্রই আমি আর মুমিন আচমকাই বিদ্যুৎ -ছোঁয়া খেলাম ! ত্রিনুদার মুখে এই মেয়েটির প্রতি যে বিরক্তি আর কঠোরতা ফুটে উঠেছে , তাতে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না , এই রহস্যের শিকড়ের সন্ধান ত্রিনয়ন ঘটক পেয়েছে ! এই রহস্যের শুরুতে আমাদের যেতেও আর দেরী নেই । 

ত্রিনুদা চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল । বলল – আমাকেই কেন ডাকলেন ? 

চোখ খুলে বলল – ম্যাডাম ,সবকিছু বললেন আর আসল কথাটাই চেপে গেলেন !

-মানে !!!

-আমাকে বিশ্বাস না করতে পারলে , আমি আপনার কোন সহযোগিতা করতে পারব না । চাইলেও না। আমি প্রথমই বলেছি । 

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন । ত্রিনুদা বলল –আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন । আপনি নিজের ছড়ানো জালে জড়িয়ে গিয়েছেন । ক্রমশই আপনার জীবনকে ছায়া ঢেকে ফেলেছে । আপনি হাত বাড়িয়ে সম্পূর্ণ ভাবে আমাকে বলুন । ম্যাডাম ‘তন্ত্র’ অতি প্রাচীন পন্থা । জীবন চর্চা । নিজের ক্ষুদ্র লাভের জন্য , লোভে অনেকেই সেই পন্থাকে নৃশংস ভাবে ব্যবহার করে । মনে রাখবেন , সব ক্রিয়ার সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকবে । এটাই নিয়ম। 

মুহূর্তের জন্য ঘর শান্ত হয়ে গেল ! এখন রাত দশটা । ত্রিনুদা বলল – আমি আপনার সমস্যা মেটাতে পারব না , আপনি আমাকে বিশ্বাস করে না বললে আমার পক্ষে কিছু করবার ক্ষমতা নেই । আপনার ঘরে কোন প্রেত তত্ত্বের উপস্থিতি টের পেলাম না । আমার দৃঢ় বিশ্বাস , আপনি একজনের উপর তন্ত্র ক্রিয়া করেছেন । আর সেই ক্রিয়া বর্তমানে এক ভীষণ ক্ষতিকারক শক্তির রূপ নিয়েছে ! বলতে পারেন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে । আপনাকে এখনই প্রাণে মারবে না । তবে স্নায়ুকে দুর্বল করে ধীরে –ধীরে বাড়ির সকলের মনের শক্তিকে দখল করবে । তারপর নিজের মতন পরিচালনা করবে । আমি নিজেও জানিনা , এই খেলা কোথায় থামবে ! বাড়ির সকলের জন্য নিজেকে বাঁচান । আর হ্যাঁ , আপনার অর্ধেক টাকা আমি ফেরত দিয়ে দেব । যদি আপনি কেসে রাজি না থাকেন ,কালকে আমার বাড়িতে কাউকে পাঠিয়ে দেবেন । আর যদি রাজি থাকেন দু’দিনের মধ্যেই জানিয়ে দেবেন । 

# ৪ #

আমরা হলুদ ট্যাক্সি ধরেছি । এটাই আমাদের যোধপুরপার্কের বাড়িতে নিয়ে যাবে । গাড়ি ছুটছে । ত্রিনুদা পকেটের কৌটো থেকে দুটো হজমোলা মুখে পুড়ল । আমি বাঁদিকে জানালার ধারে বসে আছি । মুমিন মাঝখানে , পাশে ত্রিনুদা ।

ত্রিনুদা বলল - আমাদের চারপাশে অনেক পন্থা আছে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর । এই পথ বাঁকা , ঘোরালো । মনে রাখতে হবে , এটাও পথ । দূর থেকে মনে হবে এই পথে ঢুকে যাই । হ্যাঁ বিপদজনক হবে হয়ত । তা ঢুকেও গেলাম । এখানেই সব কিছু শেষ হয়না । তন্ত্র কখনই কার্য সিদ্ধির সিঁড়ি হতে পারেনা । তবুও আমরা চেষ্টা করি । লোভে পড়েই । 

ত্রিনয়নদা বাইরের দিকে তাকিয়ে এইসব কথা বলছিল । 

আমি বললাম – দাদা তুমি বুঝলে কেমন ভাবে এটা তন্ত্রের খেলা ।

ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল - আসলে ঘ্রাণ শক্তিকে প্রখর করতে হবে । এরজন্যই আমি তোদের বলি সূর্য উঠবার আগে উঠে যোগাভ্যাস কর ,ধ্যান কর । চারপাশের গন্ধকে মনের কারখানায় বিশেষণ কর । আপাতত এটাকে ফালতু কাজ বলে মনে হচ্ছে , কিন্তু করেই দেখনা । আমি ওই ঘরে কোন রকমের অপশক্তির গন্ধ পাইনি । ওখানে থেকে লাভ হবেনা , তাই রাতে থাকিনি । কেননা এটা কোন আত্মার কাজ নয় । প্রেতাত্মা থাকলে চারপাশে তার চিহ্ন ফুটে উঠত । আমি কিন্তু ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখেছি । তাই বাড়িতে ঢুকেই সময় নষ্ট না করে , রঞ্জনার শোওয়ার ঘরেই গিয়ে কথাবার্তা বললাম । অনবরত জপ করছিলাম । 

-কিন্তু তন্ত্র কেমন করে বুঝলে ?

-তন্ত্র আসলে আমাদের ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রেরই অংশ । প্রাচীন বেদ , উপনিষদেরই একটি অংশ । এটা এমন শাস্ত্র যার সাহায্যে মানুষ অতীন্দ্রিয় শক্তি লাভ করতে পারে । তন্ত্র সাধনা যত এগিয়ে যাবে ততই এর ভিতরের কৌশল গুলোর ক্ষমতা আমরা বুঝতে পারব । এমনই কৌশল হচ্ছে বশীকরণ । এই কৌশলে যে কোন জীবিত প্রাণীকে বশ করতে পারবি । তবে মনে রাখবি এই বশ অবশ্যই খুব সাবধানতার সাথে করতে হবে । হিন্দু দর্শনে যে ৮ প্রকার অষ্ট সিদ্ধির কথা বলা হয়েছে , তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঈশিত্ব , এর দ্বারা স্থাবর - অস্থাবর সকলের উপর প্রভুত্ব করবার ক্ষমতা আয়ত্ব করা যায় । এই ক্ষমতার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বশীকরণ । যদি কোন সিদ্ধ পুরুষের সহায়তায় মন্ত্রশক্তিকে কোন জীব আত্মার উপর প্রয়োগ করা হয় এবং সেই জীবাত্মার সাথে নিজের আত্মার একটা তারঙ্গিক যোগসূত্র রচনা করে ফেলি , তাহলে অবশ্যই নিজের মনের মতন সেই মানুষটিকে চালনা করতে পারব । মনে রাখতে হবে , সেই মানুষটির আত্মা যদি ভুল কিছু শক্তিকে নিজের সাথে যুক্ত করে ফেলে তাহলে যার বশে রয়েছে সেও ক্ষতির সম্মুখীন হবে । 

মুমিন বলল – তার মানে ত্রিনুদা তুমি বলতে চাইছো রঞ্জনা বসু কোন মানুষকে বশ করেছেন , নিজের আত্মার মাধ্যমে । আর এখন সেই আত্মাই রঞ্জনার আত্মার উপর প্রভাব বিস্তার করছে !!

-আমাকে ডাকা হয়েছিল , শুধু মাত্র নিজেকে মুক্ত করবার জন্য । উনি সব জেনেই ডেকেছিলেন। যাতে আমি গিয়ে ওনাকে মুক্তি দিতে পারি।কিন্তু এখন উনি নিজেই এই বিপদজনক খেলার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন ! 

আমার সব কিছু কেমন জানি টানটান কোন অলৌকিক অভিযান বলে মনে হচ্ছিল ! কিম্বা এমন একটা রহস্যময় গল্প , সবে শুরু হয়েছে ।রঞ্জনা বসুকে সন্ধ্যা মনে হয়েছিল ,সেখানেও সব কিছু ধূসর !! আমি ঢোঁক গিলে বললাম – গল্প শুরু হলও ?

ত্রিনয়ন ঘটক আমার দিকে তাকিয়ে ,পকেট থেকে হাল্কা লাল রঙের কাঁচের চশমাটা পড়ে নিল । হাতের রুদ্রাক্ষের মালাটা পেঁচিয়ে বলল – বেদ , এতো তাড়াহুড়ো কেন ? পাঠিকাকে আশ্বস্থ করতে পারিস , গল্প সবে শুরু হচ্ছে...


chakrabortypinaki50@gmail.com

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.