x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

গার্গী মালিক

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
#উত্সব
কল্যাণী মিত্র, হসপিটালের সিনিয়র নার্স, প্রচুর দায়িত্ব, সারাদিন কাজের অন্ত নেই - দিনে রাতে বিরাম নেই - তবু সদা হাস্যময়ী! কতজনের কত সমস্যা - সবের সমাধান কল্যাণী। তবু কাজের মধ্যেই যেন তার মুক্তি - বহু যন্ত্রণার অবসান।

আর মাত্র একমাস - তারপরই মা আসছেন। বর্ষার ঘনঘোর সরিয়ে আকাশের সর্বাংশে পেঁজা তুলোর লুটোপুটি - সোনালি রোদের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে খসে পড়ছে প্রকৃতির স্যাঁতসেঁতে ছাতাপড়া মরামাস - নতুন করে সবুজের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত সে আজ। সকাল বেলা এককাপ চায়ের সাথে দুটি বিস্কুট নিয়ে কল্যাণী এসে বসল তার খোলা বারান্দায় - যেখানে প্রতিদিন সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ে , নরম রোদের মিঠে আবেশে এখনো কল্যাণী ফিরে পায় তার মেয়েবেলা 

- স্কুলের পরীক্ষা শেষের পর পূজোর আয়োজন - মনের মধ্যে যেন প্রতি মুহূর্তে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্যি! আজ তার পিঠ ছড়ানো কেশরাশির মাঝে মাঝেই দেখা যায় রুপালি তারের আনাগোনা - কপালে দু তিনটে বলিরেখা - চোখের পাতায় নেমে আসা বয়সের ভার - মনের দরজায় অসংখ্য ভালমন্দ অভিজ্ঞতার কড়ানাড়া ..... তবু ... তবুও যেন কোথায় একটা লুকিয়ে থাকে তার অপরিণত শিশুমন - মায়ের আদরই যেন তার সমস্ত যন্ত্রণার উপশম।

প্রতি বছরই কল্যাণী ভাবে পূজোর ক'দিন একটু মায়ের কাছে যাবে। বয়স্ক মা, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না, সারাদিন সে কত রোগীর সেবা করে তবু মায়ের সেবা আর করে ওঠা হয়না! বাড়িতে প্রতি বছর দূর্গা পূজো হয় - জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও আভিজাত্যটুকু বজায় আছে । ভাইরা আসে - দাদা তো বাড়িতেই থাকে; প্রতিবার বৌদি ফোন করে তাকে আসতে অনুরোধ করে , বলে - "আয় না কল্যাণী , আমরা কতদিন একসাথে অঞ্জলি দিই নি!আমি বুঝি তোর কষ্টটা - সেটা যেমন তোর কষ্ট তেমন কি আমারও নয়? আমিও তো হারিয়েছি আমার দাদা - ভাইপোকে .... জানিস তো দুঃখকে সবসময় ভাগ করে নিতে হয় - তাতে দুঃখ কমে"। 

কল্যাণীর বৌদি দীপা তার ক্লাসমেট ...দুই বান্ধবীই একদিন বাঁধা পড়ে আত্মীয়তার সুত্রে - দুজনই হয়ে ওঠে দুজনের আদরের 'বৌদিমনি'।আজ সাতবছর কল্যাণী পূজায় নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়নি - এই পূজোর দিনেই সমাপ্ত হয় তার জীবনের দুটি অধ্যায় - অষ্টমীর রাত, তিনজনে ঠাকুর দেখে খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরছিল ; হঠাৎ পাঁচটি মদ্যপের জংলি উচ্ছ্বাস মুছে দিল কল্যাণীর জীবনের সব রং ; রুদ্ধশ্বাস এ ধেয়ে আসা চারচাকাটির অতর্কিত আক্রমণে বেসামাল হয়ে গেল তাদের দুইচাকার পালসার। সেদিন কল্যাণী পারেনি দুটি প্রাণকে ফিরিয়ে আনতে - তার সেবা শুশ্রূষার যতই সুখ্যাতি থাক ... সেদিন যেন তার অনেকখানি ঘাটতি পড়েছিল - এরা যে তার আপনজন - তার আত্মার আত্মীয় - এই ক্ষেত্রে মনোবল যে বারবার ধসে পড়ে চোখের জলে! 

এ বছর দীপা বারবার করে বলে দিয়েছে আসার জন্য - মা এর শরীরটাও বিশেষ ভালো যাচ্ছে না, ভীষণভাবে দেখতে চায় তাকে - বাড়ির একমাত্র মেয়ে সে ; ঠিক করেছে - এ বছর সে যাবেই - অনেক আগে থেকেই ছুটির আবেদন পত্র জমা দিয়েছে সে।  - সত্যিই তো! দুঃখের পসরা সাজিয়ে কী লাভ? সে কি কখনো ফিরে পাবে তার হারানো সম্পদ! চাকরি জীবনের প্রথমদিকে এক একটা রোগীর মৃত্যু কল্যাণীকে মর্মাহত করে দিত - আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন ফিরিয়ে আনতে পারতো না একটি অমূল্য প্রাণ ,তখন তাকে গ্রাস করত এক চরম ব্যার্থতা! তন্দ্রাহারা অশ্রুসিক্ত রাতে সুনির্মল তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আর বলত - " কল্যাণী , এই পৃথিবীতে যে যতদিন থাকার সে ততদিনই থাকবে - এর জন্য কষ্ট পেওনা - তুমি তোমার কর্তব্যে অবহেলা করনি - এটাই শেষ কথা - বাকিটা ছেড়ে দাও ঈশ্বরের হাতে..." ।

একমাসের মধ্যেই মৃত্যু তার কাছে হয়ে উঠেছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা - কিন্তু তার জীবনের এই একটি ঘটনা সাতবছর পরেও স্বাভাবিক হল না! " ঈশ্বর যখন প্রাণটিকে টিকিয়েই রেখেছেন - অসংখ্য মানুষের প্রাণ রক্ষার তাগিদে , তখন প্রতিবছর নিজের অতীতের ব্যবচ্ছেদ আর নাই করলাম " - এই কথা ভেবে কল্যাণী ফোন করল দীপাকে - এবারে পূজোর দিনগুলো সে সত্যি সত্যিই মায়ের সেবা করে কাটাবে - কনফার্ম। পূজো আর মাত্র তিন দিন। সমস্ত কেনাকাটা শেষ - অনেকদিন পর সে সবাইকে দেখবে - খালি হাতে কি যাওয়া যায়। তার দেওয়া নতুন সুতোর গন্ধ যেন লেগে থাকে সবার গায় .... 

সন্ধ্যেবেলা ট্রলিব্যাগে গুছিয়ে নিচ্ছে সব; হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল! ড: মুখার্জির ফোন - "কল্যাণী , তুমি এক্ষুনি হসপিটালে এসো - আজ বিকেলে দুটি বাসের মুখোমুখি ধাক্কায় অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে ... আশংকাজনক অবস্থায় রয়েছে অনেক মানুষ; তুমি চলে এসো কল্যাণী ... তুমি ছাড়া এতো বড় দায়িত্ব আমি সামলাই কীভাবে?" 

দুপুর দুটো - হসপিটাল এর জেনারেল বেডে সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধা - এই বয়সে এত বড় ধাক্কা! প্রাণ যেন আঁকুপাঁকু করে খুঁজে ফেরে মুক্তির পথ! কল্যাণী বসে আছে তার নাড়ির গতিপ্রকৃতির হিসেব নিতে - এমন সময় ফোন! - আয়ামাসি এসে ধরিয়ে দিল তার হাতে - ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল- "কল্যাণী , আমি মা বলছি ..." ধরা ধরা অস্পষ্ট গলা -"মা , আমি ভালো আছি ... তুমি কিচ্ছু ভেবোনা আমার জন্য - আসতে পারলে না বলে দুঃখ পেওনা মা; তোমার আনন্দের চেয়ে মানুষের জীবন অনেক দামী - আমি জানি, আমার মেয়ের কল্যাণ স্পর্শে মানুষের যন্ত্রণা লাঘব হয়। তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরোনা মা - আমি তোমার কল্যাণী মুখখানি দেখার আশায় ঠিক বেঁচে থাকবো- তুমি দায়িত্ব কর্তব্য শেষ করেই আমার কাছে এসো .... শুভ বিজয়ার আশীর্বাদ করি ....তুমি ....তুমি ..." আর কিছু শোনা গেল না ... কাশির শব্দে ঢেকে গেল বাকিটুকু। 

এতক্ষণ কল্যাণী কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল! এতদিন এত কাজের চাপে খেয়ালই নেই কখন আগমনীর সুর শেষ হয়েছে বিজয়াতে! - স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল সেই বৃদ্ধার মুখের দিকে - মন যেন বলে উঠল - "জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর "..... 

সম্বিত ফিরল ড:মুখার্জীর ডাকে - অবাক হয়ে দেখল হার্টবিট মনিটর এ গ্রাফের উন্নতি! 

gargimaji1984@gmail.com



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.