x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

পিনাকি

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
কালো বাক্সের আড়ালে
!!১!!

সবে মাত্র মুড়ির বাটিতে হাত দিয়ে , আচারের তেল দিয়ে মাখা মুড়ি মুখে পুড়লাম ।

-ইস! কেমন যেনও মিইয়ে গেছে ! 

আমি আর মুমিন পাশাপাশি বসেছি । সামনে ত্রিনয়নদা । পা ছড়িয়ে বিছানার উপর বসে আছে। আমরা মেঝেতে বসেছি , মাদুর পেতে । যারা এই বাড়িতে আসেননি , তারা এলে বুঝতে পারবেন এই কলকাতায় যেই সব উপাদান , উপকরণ বাতিল হয়ে যাচ্ছে ; আমারা সেইসব কিছু এখানে মহানন্দে ব্যবহার করছি । এই ঘরে আলমারি , খাট , আর একটা ইজি চেয়ার রাখা আছে । ঘরে ঢুকতেই সোজা খাট পাতা ।খাটের পিছনে লম্বা জানলা , যা দিয়ে ৬৮ বি যোধপুর পার্কের মাঝারি চওড়া রাস্তাটা দেখা যায় । খাটের বাঁদিকে হেলান দেওয়া কেদারা বেশ লম্বা আর শক্ত সেগুন কাঠের হাতল । কেদারার থেকে পাঁচ পা এগিয়ে গেলেই কাঠের আলমারি । পারলৌকিক, হিন্দু দর্শনের, প্রেতচর্চার বই । সাথে বিদেশি ও অন্যান্য ধর্মে মৃত্যু দর্শন এবং নানাদেশের মোটা –মোটা বাঁধানো পুরানো বই । 

মুড়ি মিইয়ে যাওয়ার কথাটা ত্রিনয়নদার। আমি তাকিয়ে বললাম – আপনিই এতো দেরী করে খেলে এমনটাই হবে দাদা। এখন রাত আটটা, আর মুমিন এনেছিল সন্ধ্যা ছটায় !

-দেখো বেদ , এইযে বসে –বসে , হেলেদুলে মজিয়ে রসিয়ে গল্প করতে – করতে খাওয়া । এর মজাই আলাদা । আচারের তেল দিয়ে মুড়ি মাখা আর সাথে লম্বা বেদুনি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে । এই লোভনীয় পরমান্ন এক খাবলায় শেষ করবার নয় । বুঝলে ? 

-তাহলে আটটা ? মানে এটা বাড়াবাড়ি হলনা ?

-তা আগে বুঝিনি । এই মাত্র টের পেলাম । মুচমুচে বেগুনি ভেজা রুমালের মতন ক্যাতক্যাতে হয়ে গিয়েছে । আর মুড়ি ? ভেজা মনে হচ্ছে ।

-এখন তাহলে কি করবেন । 

-না , খেয়েই নেব । 

ঠিক এই সময় বেল বেজে উঠল । জানালা দিয়েই , বাইরের জায়গা দেখা যাচ্ছে । ত্রিনয়নদা দেখে বললেন - বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে । যতটা দেখলাম অবস্থাপন্ন । 

আমরা তিনজন উপরের মানে দ্বোতলার ঘরে বসে রয়েছি । ব্রজদা রান্না ঘরে রাতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত । আমার দিকে তাকিয়ে ত্রিনয়দা বললেন – চাপ নিও না । ব্রজদা দরজা খুলে দেবে । 

সিঁড়িতে শব্দ ভাসছিল , চাপা বুটের শব্দ আমাদের ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে । ঘড়িতে রাত আটটা দশ । মুমিন দরজার দিকে তাকিয়ে বলল - নমস্কার । 

আমি তাকিয়ে দেখলাম একজন বৃদ্ধ , বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের । মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছে।মধ্য উচ্চতার চেহারা । চোখে চওড়া ফ্রেমের চশমা পড়েছেন । গাল ভর্তি চাপদাড়ি । আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – আমি ত্রিনয়ন ঘটকের সাথে কথা বলতে চাই ।

মুমিন আমার দিকে, আমি ত্রিনয়নদার দিকে । আর ত্রিনয়নদা দু’হাত জোর করে বলল- নমস্কার । আমি ত্রিনয়ন ঘটক । বলুন ...

কিছুক্ষণ লোকটি ত্রিনয়নদার দিকে তাকিয়ে রইলেন । তারপর বললেন – আমি কিছু ব্যক্তিগত কথা বলতে চাই । 

ত্রিনয়নদা বলল – দেখুন , আমি আপনাকে চিনতে পারছি না । তাছাড়া আমার কথা আপনাকে কে বলল ? 

-আমি জানতে পেরেছি স্যার । 

-হ্যাঁ কিন্তু আমি আপনার সাথে কথা বলব কেন ? মানে কথা শুনতে আপত্তি নেই , তবে প্রথমেই বলছি আমি যেই বিষয় নিয়ে কাজ করছি বা করে চলেছি , তা কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে সমাজের বৈজ্ঞানিক স্তর দ্বারা স্বীকৃত নয় । তাই এমন কোন কেস আনবেন না , যেখানে কাজ করাটা অসুবিধা হয় । 

-না , আমি আমার ছেলের জন্য এসেছি । আমার ছেলের খুব বিপদ একমাত্র আপনিই পারবেন উদ্ধার করতে ।

-আপনি আগে বসুন । এই খাটে বসুন । 

ত্রিনয়নদা বিছানা থেকে নেমে , ইজি চেয়ারে গিয়ে বসল । বুঝলাম, এই পরিচিয় দৃশ্য মানেই নতুন আত্মার সন্ধান পেতে চলেছি আমরা । মানে, আরেকটি অপশক্তির মুখোমুখি হতে চলেছি আমরা ।

-দেখুন আমার দু’জন সাকরেদ আছে মুমিন আর বেদ । আপনি এদের সামনেই সব কিছু খুলে বলুন । চিন্তা নেই, আমরা গোপনীয়তা লঙ্ঘন করিনা । 

বয়স্ক লোকটি পকেট থেকে রুমাল দিয়ে কপাল আর গাল মুছে , ত্রিনয়নদার দিকে তাকিয়ে বললেন- আমার নাম, রাজারাজ তিওয়ারি। উত্তর কলকাতায় আমাদের একটা বনেদী বাড়ি রয়েছে । তিনপুরুষের শঙ্খের ব্যবসা । বিদেশেও আমাদের তৈরি শাঁখ, শাখা, পলা রপ্তানি হয় । বড়বাজার , রাধাবাজার আর শ্যামবাজারে আমার দোকান আছে । বাবার বাবা মানে আমার ঠাকুরদা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন । আমার বাবা তারপর আমি এই ব্যবসায় লক্ষ্মীর মুখ দেখেছি । 

ত্রিনয়নদা মাথার এলোমেলো চুল গুলোকে ঠিক করে বলল – দেখুন প্রথমেই বলে রাখি আমি ওঝা, তান্ত্রিক বা মন্ত্রপূত তন্ত্রসিদ্ধ সন্ন্যাসী নই। তাই ব্যবসার লাভের জন্য যদি এসে থাকেন , তাহলে আর কথা এগিয়ে লাভ নেই । সময় আপনার আর আমার দু’জনের কাছেই মূল্যবান ।

-না , ঘটক বাবু । আপনাদের জেনারেশনের নই বলে আমাকে এতটা অজ্ঞ ভাবছেন! আমি জানি আপনারা প্রেতসন্ধানী তদন্ত করেন । এই কলকাতায় যে কয়েকটি হাতেগোনা এজেন্সি রয়েছে, আপনি তাদের মধ্যে সেরা। নেগেটিভ এনার্জি নিয়ে আপনার অনেক আর্টিকেল রয়েছে। স্যার আমি হতে পারি ষাট , আমার ফেসবুক প্রোফাইল আছে । তার এতটা বুড়ো ভাববেন না । আপনার সম্বন্ধে সব জেনেই আমি এসেছি এখানে । আমি যে বিপদের মধ্যে রয়েছি তা পুলিসের কর্ম নয় । প্রাইভেট গোয়েন্দার কাজ নয় । এমনকি আপনি ছাড়া আর কেউ সফল হবে বলে মনে হয় না । 

ত্রিনয়নদা হেসে ফেলল । -আপনি বুঝলেন কেমন করে আমি এই কাজে ব্যর্থ হবনা ।

-ত্রিনয়ন বাবু , আপনি ব্যর্থ হলে ভাবব আমার ভাগ্যই পরিহাস করল । একমাত্র ছেলেটা শেষ হয়ে গেল । আর বাঁচাতে পারলাম না ! 

-দেখুন কে বাঁচবে আর কে বাঁচবে না তা সবসময় আমাদের হাতে থাকে না । না আমি কখনই সব কিছু ভাগ্যের হাতে দেওয়ার পক্ষে নই । এটাও সত্যি অদৃশ্য কিছু...

-হ্যাঁ এই দৃশ্যহীন ভয়ই এখন আমাকে তাড়া করে চলেছে ।

এই সময় ঘরে চারকাপ চা নিয়ে ব্রজদা ঘরে ঢুকল । আমাদের চা দিয়ে চলে গেল । ভদ্রলোক বলা শুরু করলেন - একমাসে আমার ছেলে কেমন যেনও পাল্টে গিয়েছে ! 

-যেমন ?

-তাহলে প্রথম থেকেই শুরু করছি । ওকে একবছর আগে আমি পড়াশুনোর জন্য ব্যাঙ্গালোর পাঠিয়ে দিয়েছিলাম । একমাস হলও ফিরেছে । শুরুতে আমাদের সাথে বেশ কথা বলত । তারপর ধীরে –ধীরে যেনও পাল্টে যাচ্ছিল । 

-কেমন ? আপনার ছেলের স্বভাব কেমন ছিল ? 

-হাসিখুশি । শিক্ষিত মার্জিত । আর সবসময় নিজের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিত ।

-এখন ?

-কথা বলেনা । নিজের জন্য একদম আলাদা ঘর নিয়েছে ।

-নিয়েছে মানে ?

-বাড়ির একটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘুপচি মতন ঘর । বন্ধই ছিল । এই ঘরে একা থাকতে শুরু করে। কোন ছবি রাখতে চায়নি । শুধু তাই নয়, আমাদের সাথে খুব একটা কথা বলেনা । এড়িয়ে –এড়িয়ে থাকে । পারিবারিক অনুষ্ঠানে যায়না , জোর করলে ছাড়া –ছাড়া ভাব । ইদানীং সকলের সামনেই আমাকে থ্রেট করেছে ।

-কি ?

-বলেছে , সে আমাকে দেখে নেবে ।

ত্রিনয়নদা চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে বলল – রাগারাগি ?

-না , আমি জানিনা । তবে আমার উপরেই রাগ । বেশ বুঝতে পারছি ।

-কিন্তু এতে তো সাইকোলজিক্যাল সমস্যাও হতে পারে ?

-ঘটনা এরপর ঘটল । একদিন সকালে দেখলাম খোকার ঘরে যাওয়ার সিঁড়ির মুখেই শিবুলালের মৃতদেহ ! 

-মানে ?

-হ্যাঁ , পুলিস পোস্টমর্ডাম করে বলেছে , স্বাভাবিক মৃত্যু । আচমকা স্নায়ুর চাপে হার্টে আঘাত আসে । সেখান থেকেই হার্টএটাক হয়েছিল । 

-তারপর ?

-পুলিস এর হাত থেকে রেহাই পেলেও , তারপর থেকেই কেমন যেনও খোকার ঘরের চারপাশটা অদ্ভুত এক নির্জনতা ঘিরে থাকত । সিঁড়িতে আলোর ব্যবস্থা করলেও তা একদিন অন্তর খারাপ হয়ে যায় । বাড়ির কাজের লোক কোন না কোন ভাবে আহত হয় । আবার আমি নিজেও ইদানীং বুঝতে পারছি একটা অদ্ভুত গা ছমছম পরিস্থিতি । নিজের চেনা পরিবেশ একটু –একটু করে পাল্টে যাচ্ছে ! আমি বুঝতে পারছি বাড়িতে কিছু একটা খারাপ হচ্ছে । আর এই খারাপের জন্যই অনেক কিছু করেছি । শেষে আপনার কথা শুনলাম । আপনি যে সোসাইটিতে আগের মাসে বক্তৃতা দিয়েছিলেন । আমি সেখান থেকেই আপনার ঠিকানা পেয়েছি । ওই সোসাইটিতে আমার কোম্পানি ডোনেশন দেয় । 

ত্রিনয়নদার হাত ধরে ভদ্রলোকটি বললেন – স্যার , আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে দিন । 

ঘড়িতে রাত সাড়ে নটা । পাক্কা আশি মিনিট লোকটি আমাদের সাথে আছেন । আমি বেশ বুঝতে পারছি , মুখে অসহায়তার ছাপ । ত্রিনয়নদা লোকটির হাত ধরে বলল - একদিন সময় নিচ্ছি । ফোন নম্বরটা বেদকে দিয়ে যাবেন । আমাকে ভাবতে দিন ।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন – আমি আপনার ফোনের আশায় থাকব ।

আমরা ভদ্রলোককে এগিয়ে দিলাম । গলির মুখেই ওনার চারচাকা দাঁড়িয়ে ছিল । বলে গেলেন , আমাদের থেকে ফোন গেলেই এখানে গাড়ি পাঠাবেন ।

ঘরে ঢুকেই দেখলাম , আলো বন্ধ । অন্ধকার ঘরের জানালার দিকে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিনয়ন দা । সামনে ইজিচেয়ারটায় আলো এসেছে । জানালার ধার ঘেঁষে বড় গাছ , সেখানে ল্যাম্পপোস্টের আলো এসেছে , সেই আলোর দিকে তাকিয়ে আছে ।

আমি হাই তুলে , হাতদুটো মাথার পিছনে রেখে বললাম –মুমিন বাড়ি চলে গিয়েছে । 

ত্রিনয়নদা বলল – তুই একদিন বাদে ওনাকে জানিয়ে দিবি । কাল সকাল দশটায় মুমিনকে নিয়ে আয় । কেসটা নিয়ে কথা আছে ।

আমার সামনে ত্রিনয়নদা । তার সামনে জানালা। জানালার ওইদিকে বড় জামগাছ , পাশে ল্যাম্পপোস্ট । আমার চোখ এই সব কিছু ছাড়িয়ে যতটুকু দেখছি , ফাঁকা আকাশের দিকে । ঘন নীল আকাশের বুকে নক্ষত্র ! অগুনতি । মনে হচ্ছে কেউ , টুনি বাল্বের জাল বিছিয়েছে। 

!!২!!

সকাল আটটার সময় যোধপুর পার্ক গার্লস স্কুলের সামনে , সাদা রঙের চারচাকা দাঁড়িয়েছে । আমি , মুমিন , আর ত্রিনয়নদা উঠে বসলাম । দুদিনের জন্য জামা কাপর কাপড় আর আমাদের তদন্ত সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি ভর্তি ব্যাগ নিয়েছি । 

গাড়ি গড়িয়াহাট ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে । ড্রাইভার কামাল খান । আমি বিড়লা মন্দিরের দিকে তাকিয়ে আছি । যদিও এখন সকাল আটটা কুড়ি , সূর্যের মিষ্টি আর হাল্কা আলো এসে পড়েছে মন্দিরের চাতালে । এর মধ্যেই অনেক লোক জড়ো হয়েছে । আমি দেখছিলাম , এখন পুজো আসতে একমাস বাকী । এই শহর উৎসবের রাতগুলোতে কেমন ভাবে পাল্টে যায় ! অনেক লোক কোত্থেকে চলে আসে । তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে -দেখতে ত্রিনয়নদার অনেক কথার উপস্থিতি টের পাই । যেমন , আসল আনন্দ আত্মার আনন্দ । এই আনন্দের ক্ষমতা অসীম । 

কানে এলো । ত্রিনয়নদা বলছে - কামাল বাবু , আপনার কথা রাজারাজ বাবু আমাকে জানিয়েছেন । আপনি ওনার খুব বিশ্বস্ত সাথী । 

-বলতে পারেন ।

-তা কত বছর এই পরিবারের সাথে যুক্ত ? 

-স্যার বলতে পারেন , আমার বয়েস এখন পঁয়তাল্লিশ । কুড়ি বছরে দাদার রথের সারথি হই ।

-মানে ?

পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন - গাড়ির ড্রাইভার । তার থেকেও বেশি বিশ্বস্ত সহায়ক । আপনারা দাদার খুব কাছের গেস্ট । আমাকে পাঠালও । অন্য কেউ হলে , দাদার বাকি ড্রাইভার ছিল। 

সিগন্যালে গাড়ি থেমেছে । আমাদের গাড়ি মৌলালিতে । ত্রিনয়নদার সাথে কথা বলতে –বলতে , আমরা কামাল খানের বাড়ি , পরিবার সম্বন্ধে জানলাম । উত্তরপ্রদেশে এক কৃষক পরিবারের ছেলে । কলকাতায় ভাগ্য অন্বেষণে এসেছিলেন। এখানে চোখে পড়ে রাজারাজ বাবুর । তাঁর বয়েস তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ । প্রায় সমবয়সী না হলেও, তাদের পরস্পরের প্রতি সম্পর্ক হতে দেরী হয়নি । বাড়িতে একছেলে আর মেয়ে আছে । দুজনেই গ্রামের বাড়ি ।

সিগন্যাল ছাড়তেই আমরা এগিয়ে গেলাম ।

শ্যামবাজারের গলিতে ঢুকতেই গাড়িটা এতক্ষণ যেই গতিতে ছিল , তা থেকে অনেকটাই কমিয়ে দিল । গাড়িটা বেশ কয়েকটা পাক খেয়ে একটা বাড়ির সামনে এসে থামল । গাড়ি থেকে নামতেই , দেখলাম রাজারাজ এগিয়ে এলেন । বললেন – আসুন , আজ আপনাদের জন্যই আমি গদিতে যাইনি ।

ত্রিনয়নদা বলল - আমাদের জন্য আজকের দিনে আপনার ব্যবসার ক্ষতি হলও ।

-একদম নয় । আমিতো উল্টোটা বলব, আপনার জন্য আমি আজকের দিনে ছুটি পেলাম । আসুন । 

আমরা তিনতলা বাড়ির ভিত্রে ভিতরে ঢুকে চাতালে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছাদে কাপড় শুখাতে দিয়েছে । আমাদের ব্যাগ গুলো আমাদের কাছেই । জামাকাপড়ের ব্যাগ আমার পীঠে । যন্ত্রপাতির ব্যাগ মুমিন নিয়েছে । কামাল খান আমাদের দিকে এগিয়ে এলো । 

রাজারাজ বাবু বললেন – শোন , এনাদের ঘরটা দেখিয়ে দে । আমি বৈঠকখানায় আছি । 

আমরা বাড়ির তিনতলায় বাঁদিকে তিনটে ঘরের পর একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জায়গাটা অপরিচ্ছন্ন। অবশ্য ত্রিনয়নদার পরামর্শেই পরিষ্কার করেনি । ঘর খুলতেই যতটা দেখলাম নোংরা নেই । 

কামাল খান আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল – আপনারা গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নেবেন। ভিতরেই এটার্চ বাথরুম আছে । আপনাদের ঘরের একদম প্রথমেই অনন্তরাজের ঘর ।

আমি বললাম – রাজারাজের ছেলে ?

-হ্যাঁ । আমিই একঘণ্টা বাদে আসব । আশা করছি আপনাদের মুখ ধোয়া হয়ে যাবে ।

ত্রিনয়নদা বলল – কামাল , আপনাকে আসতে হবে না । আমিই রাজারাজ বাবুকে ফোন করে দেব । উনি লোক পাঠিয়ে দেবেন ।

কামাল বলল - আমার অসুবিধা ছিল না। তবে আপনাদের ইচ্ছা । 

আমরা খেতে বসেছি । পাথরের টেবিলে । আমাদের খাবার পরিবেশনা করা হয়েছে । এখন দুপুর দুটো । বৈঠকখানার ঘরে তেমন কথা হলনা । রাজারাজ বাবুর স্ত্রী আমাদের সাথে এসে খুব বেশি কথা বললেন না । তার মুখে আতঙ্ক দেখতে পাচ্ছি । এই বাড়িতে কাজের লোকেরা বেশ মার্জিত এবং অনুগত । দক্ষিণ কলকাতায় ঘরের কাজেরলোকেরা নিজে থেকে এসে পরিচয় করতে ইচ্ছুক, কথা বলেন । উত্তর কলকাতায় কিন্তু অনেকটাই সংযত । আমার মনে হলও , বনেদী বাড়ির বেশ কিছু নিয়মের মধ্যে , এটাও যে তারা বাড়ির কাজের লোক আর মালিকের ভিতরকার অদৃশ্য সীমারেখা কখনই মুছে দিতে রাজি নন । এটাও তাদের পরম্পরাগত ভাবনা । খাওয়ার টেবিলে খুব একটা কথা হল না । 

ছাদে পায়চারি করছিলাম আমরা । ত্রিনয়নদা আমার কাছে এসে বলল – বেদ এখন পর্যন্ত কি কি নোটিশ করলে । মানে গুরুপূর্ণ বিষয় । 

আমি বললাম - দাদা , প্রথমত এই বাড়ির কাজের লোকেরা ভীষণ কম কথা বলেন । রাজারাজের স্ত্রী নিজেও মনে হচ্ছে তেমন খুশি নন । যে ঘরটাতে রয়েছি , গোটা জায়গাটাই থমথমে । বাড়িতে সব কিছু থাকলেও কেমন একটা ছাড়াছাড়া ভাব । 

-আর কিছু ?

-কামাল খান , রাজরাজা তিওয়ারির খুব কাছের । 

-আর কিছু ? 

এমন সময় মুমিন বলল – আমি বলব ?

-হ্যাঁ বলও ।

ত্রিনয়ন দা পাথরে তৈরি বেষ্টনীতে হাত রেখে উল্টো দিকে তাকিয়ে আছে । বলল –আমি শুনতেই চাইছি ।

-দাদা , প্রথম দিন রাজারাজ আমাদের যত কিছু বলেছেন। আজ এতক্ষণ পর্যন্ত যতটা কথা হয়েছে , নতুন কিছু জানতে পারলাম না । শুধু এতটুকু বুঝলাম কামাল খান খুবই কাছের মানুষ ।

আমি দেখলাম ত্রিনয়নদা চুপ করে দূরের দিকে তাকিয়ে দেখছে । আমি বললাম -কিছু বলবে না । 

-আমার মনে হচ্ছে ওরা কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে । কেননা ছেলেটাকে নিয়ে কামাল কিছুই বলল না । বাড়ির বাকী সদস্যরাও চুপ ! যে জায়গায় আমরা রয়েছি , ওনার ছেলের ঘর পেড়িয়েই যেতে হবে । আশা করছি সন্ধ্যায় যখন ফিরব , নিশ্চই দেখা পাবো । রাতে মুমিন যান্ত্রিক কোন সমস্যা যেনও না থাকে । 

!!৩!!

বিকেলের দিকে আমরা বাড়ির পিছনের বাগানে ঘুরছিলাম । ত্রিনয়নদা আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । বলল - কিছুক্ষণ বাদেই আলো নিভে আসবে । এই বাড়ি আরও নিস্তব্ধ , বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠবে । 

পিছনে আমরা দুটো ঘর দেখলাম , একটার জানালা ভাঙা । 

ত্রিনয়নদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল – বেদ তুমি আর মুমিন ঘরে গিয়ে ব্যবস্থা করে এসো । মনে রাখবে ক্যামেরাটা অন থাকবে । আমরা যখন থাকব না তখন রেকর্ড হবে । 

-দাদা আমাদের ঘরে অন রেখে হবে কি ? 

-না আমি আমাদের ঘরে রাখবার কথা বলছিনা আমাদের ঘর থেকে রাজারাজের ছেলের ঘরের মুখ পর্যন্ত নিরাপদ ভাবে রাখতে হবে । এই ক্যামেরায় আমরা আজকের রাতের সমস্তটাই রেকর্ড করব । এই বাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে রাত এগারোটায় । আশা করছি বারোটার পর থেকেই আমরা ই এম এফ মিটার দিয়ে স্পিরিটটার লোকেশন চিহ্নিত করতে পারব । বেদ এগুলো করতে কত সময় নেবে ?

মুমিন বলল – দুঘণ্টা দাও ।

-ঠিকাছে , এখন ছটা বাজল ।

শাঁখের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি । আমি বললাম – নটা পর্যন্ত বাইরে খোঁজখবর নিয়ে , তারপর দশটায় ডিনার । 

-রাজারাজের ছেলের সাথে কথা বলতেই হবে । উনি আটটায় আসবেন । আমার মনে হয়না কিছু লাভ হবে । তাও জিজ্ঞেস করতেই হবে । আজ সে থাকবে বলেই রাজারাজ বাবু আমাদের ডেকেছেন । 

পাড়ায় এই বাড়ির বেশ সুনাম আছে । শুধু তাই নয় এই বাড়ি নিয়ে কেউ তেমন মুখ খুলতে চাইল না । তবে রাজারাজ বেশ ধনী এবং ক্ষমতাবান । নিজের খরচে পাড়ার অনেক সমাজসেবা মূলক কাজে তার হাত আছে । আমরা সন্ধ্যাবেলা পিঁয়াজি আর মুড়ি খেয়ে ফিরছি । সিঁড়িতে দেখলাম কামাল খান আমাদের বললেন – দাদা আপনাকে ফোন করেছিল , ত্রিনয়ন বাবু । আপনি মনে হয় ফোন দেখেননি । 

ত্রিনয়নদা পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল – রাজারাজ বাবুর চোদ্দটা মিস্ ডকল ! 

-ক্ষমা করবেন । আমরা আসলে চারপাশটা একটু ঘুরছিলাম । ছিঃ । লজ্জা লাগছে ।

-অত খারাপ ভাববেন না । আসলে আমাদেরই উচিত ছিল আপনাদের সাথে থাকা । 

-উনি আছেন ?

-সে ঠিকাছে । আপনি আসুন । ত্রিনয়নদা আমাকে আর মুমিনকে পাঠিয়ে দিয়ে , বলল –আপনি ওদের নিয়ে যান । আমি এক্ষুনি আসছি ।

আধ ঘণ্টা বাদেই দেখলাম ত্রিনয়নদা ঘরে এসে ঢুকল । বাড়ির একতলায় খোলামেলা ঘরে রাজারাজ আর আমরা বসে আছি । জলখাবার এসেছে । 

লুচি আর আলুরদম । সাথে রসগোল্লা । খেতে –খেতে আমরা গল্প করলাম । ত্রিনয়নদা তেমন কথা বলছিল না । 

আমরা বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠব । দাদা থেমে গেল । বলল – বেদ , মুমিনকে ই এম এফ মিটারটা । বুঝলি , এই দিক দিয়েই এনার্জির এরিয়া শুরু। আমি নিজে উঠতে আর নামতে টের পেয়েছি। একটা ভারী হাওয়া আমাদের পিছনেই আছে। ক্ষতি করবেনা । সাবধান । 

আমরা উঠছি একটা একটা করে সিঁড়ি , আর বুঝতে পাচ্ছি তিনজন নয়, অদৃশ্য কেউ আছে । মিটারের কাটার তীব্রতা , মানে হাতে যে যন্ত্রটা আছে । মুমিন আরা আমি তাকিয়ে দেখলাম নির্ণায়ক কাটা সবুজ রঙের ঘরের থেকে লাল রঙের ঘরের দিকে যাচ্ছে । এটা স্পষ্ট এখানেই সেই অতৃপ্ত আত্মার অবস্থান রয়েছে ! পুরো জায়গাটা অন্ধকার। ত্রিনয়নদা বলল –নামবার সময় বাল্বটা জ্বলছিল। এখন দেখি কেটে গিয়েছে ।

আমরা আমাদের ঘরের দিকে যাওয়ার আগেই দেখলাম , রাজরাজার বাবুর ছেলের ঘরে লাল আলো জ্বলছে । 

ঘরের কাছে এসে টোকা মারলাম । তিনবার টোকার পর , দরজা খুলে যেতেই , আমরা অবাক ! কোন হরর সিনেমার ডার্ক রুমও এর থেকে কম রহস্যময় হয়। একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা ভরে রয়েছে। লাল হাল্কা আলো ছড়িয়ে রয়েছে, যেনও গ্লাস থেকে লিকার গড়িয়ে গিয়েছে ! ঢুকতেই চোখে কেমন একটা ঝিমুনি ভাব ঝাপটা মারল । 

অগোছালো বিছানা , তার উপর শুয়ে আছে রাজরাজার ছেলে। গোটা ঘর নোংরায় ভরা। জিনিস পত্র ছড়িয়ে। আমরা টের পাচ্ছি আমাদের হাতের আত্মা নির্ধারক যন্ত্রটির সূচক স্থির হয়ে আছে । মানে আত্মা এখন , স্থির হয়ে এই ঘরেই রয়েছে । 

ত্রিনয়নদা ছেলেটির পায়ের কাছে বসল ।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে ত্রিনয়ন দা বলল - আপনি লোকেশ ? 

ছেলেটির মাথা ভর্তি চুল । মুখ ঢেকে গিয়েছে । বলল – এই সব কথা না বলে রহস্যটা ফাঁস করুন ।

-মানে ?

-আমি জানি, সে আছে । আপনি জানেন সে আছে। আমি জানি। আমার সাথে আছে। আপনার সাথে নেই ।

আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। 

ত্রিনয়নদা বলল – সেই রহস্য জানতে আমরাও চাই ।

ছেলেটি এইবার ত্রিনয়নদার দিকে চোখ তুলে বলল – এই বাড়িতে সে আছে। আমি চাইনা সে চলে যাক। তারা তাকে নিয়ে গিয়েছে । সে আসে । আমার কাছে । আমিও তাকে রেখে দেব ।

-সে কে ?

-সেই সে । সে কে ? 

-আমাদের বলুন । 

-সে আমার । আমি দেখি । সে সাথে থাকে । আমিই । 

ঘরের বাইরে দেখলাম ছায়া । ভিতরে এসে কামাল খান বলল – খাবার দিতে বলব ?

রাত দশটা বাজে । ত্রিনয়নদা বলল – আমার পেট ভরা । তোরা খাবি ? 

এমনিতেই বাইরে আর সন্ধ্যার আহারে পেট ভরে গিয়েছে। আবার আজ রাতে জাগতে হবে । স্নায়ুর খেলা চলবে । মুমিনের হাতের যন্ত্রটার সূচকটি লাল রঙের ঘরে যেতেই বুঝতে পারলাম, আত্মা কোন কারনে আমাদের উপস্থিতি সহ্য করতে পাচ্ছে না । দেখলাম ছেলেটি মুমিনের দিকে তেড়ে গেল। কামাল এসে ধরতেই , ছেলেটি বলল - চলে যাও । লজ্জা করছেনা ! 

কামাল তাকিয়ে আছে চোখের দিকে । 

ত্রিনয়ন দা বলল - থাক এখন আমরা পাশের ঘরে যাচ্ছি । 

আমরা থেকে বেড়িয়ে যেতেই , দড়াম শব্দ করে বন্ধ করে দিল দরজা । 

রাতে আমরা দরজা খুলেই গোটা ঘরে হাল্কা লাল আলোর ব্যবস্থা করেছি । ক্যামেরা এত অল্প আলোতেও সমস্তটাই রেকর্ড করে নেবে । আমরা ভীষণ ভাবে সজাগ । কেন জানি আমার লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল ! 

ত্রিনয়নদা ফিসফিস করে বলল আমার কানে - বুঝলি এই বাড়িতে রহস্য আছে । সে রহস্য আমাদের জন্যই অপেক্ষা করে রয়েছে । এই আত্মাটি এখনো প্রেতাত্মা হয়নি । তবে রিস্ক থেকেই যায় । 

মুমিন ,আমি আর ত্রিনয়নদা খাটের পিছন দিকে বসে রয়েছি । দাদার হাতে আত্মার গতিবিধি বুঝে উঠবার যন্ত্র । সারা বাড়ি এখন অন্ধকারে ডুবে রয়েছে । নিস্তব্ধতা শক্ত পাথরের মতন চেপে বসল । টের পাচ্ছিলাম রাতের নিষ্ঠুর নীরবতা ক্রমশই ভাঙছে । বুকে কেমন একটা কষ্ট টের পেলাম ! না ভয়ের নয় । তাহলে ? আত্মাটা আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করছে ! 

আমরা নিজেদের নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছি । আমরা কিছু দেখতে পাচ্ছিনা , অথচ মনে হচ্ছে কেউ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ! 

টের পেলাম আত্মা আমাদের ঘরে নেই । আর সে এই ঘরে আসতেও চায়নি । ফাঁকা পেয়ে এসেছে । ত্রিনয়নদা বলল – মুক্ত আত্মা । মানে সে এই সব জায়গা আগে থেকেই পরিচিত । আমাদের এখন দেখতে হবে আত্মাটা কোথায় যেতে চাইছে ? মুক্ত বলেই সে তার পরিচিত জায়গাতে ঘুরছে । আর নির্দিষ্ট সময় শেষে পুরানো জায়গায় ফিরবে । আমরা সবাই বাসা খুঁজি । পৃথিবীতে সব প্রাণীরই বাসার প্রতি মোহ থাকে । আত্মা সেই স্থানেই ফিরবে , অথচ তাকে পরিচিত জায়গায় একটা উদ্দেশ্য নিয়েই আসতে হচ্ছে। এই উদ্দেশ্য আর পরিচিত জায়গার সাথে তার ফিরে যাওয়ার জায়গার অঙ্ক কষে সমাধান করতে পারলেই , এই রহস্যের সমাধান হবে । আমার মনে হচ্ছে , রাজারাজের কাজের লোকটি আচমকাই এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল । সেখান থেকেই হার্টএট্যাক হয়েছে । সকলের নার্ভ সমান থাকে না ।

এটা সত্যি , যারা ভাবেন ভূত বলে কিছু নেই তারা ঠিকই ভাবেন । ভূত আসলে অতীত । মৃত মানুষের আত্মা হচ্ছে তেমনই চলন্ত অতীত ; সে ভূত নয় । এই অনুভূতি এতটাই খাঁটি যে শুধু বর্ণনা পড়ে কিছুই টের পাওয়া যাবে না । 

আমরা তিনজনেই খুব সন্তর্পণে দেখলাম - ঘরের পাশে যে বন্ধ তালা দেওয়া ঘর রয়েছে , সেখানে যেতেই , ত্রিনয়নদার হাতে ধরে রাখা যন্ত্রের সূচকটি থেমে গিয়েছে ! 

ত্রিনয়নদা বলল - বুঝলি এই আত্মা , সারা বাড়ি ঘুরেছে এমনটা নয় । আসলে সন্ধ্যা সাতটা থেকে এই রাত মানে তিনটে পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। তারপর সে নিস্তেজ হয়ে যায় । এই আত্মার সাথে রাজারাজ ছেলে আর এই ঘরের যোগাযোগ রয়েছে । এখন এই রহস্যের সাথে ছেলেটির আমার কাছে থাকা --- কথা গুলোর কোন যোগাযোগ রয়েছে ? যদি থাকে তাহলে কালকের দিনে আমাদের কাছে অনেক রহস্য উন্মোচনের সম্ভাবনা রইল । 

!!৪!!

-কামাল খান , আমি চাই তুমি সত্যি কথা বলবে । এর জন্যই তোমাকে এখানে একা ডেকেছি ।পাশের ঘর খুলতে হবে ।

-মানে ?

কামাল খানের গলায় উত্তেজনা । তারপর গলা নিস্তেজ হতেই , বলল – দাদা রাজী হবেন না। 

-কেন এমন বলছেন ? আমি এই মাত্র আপনাকে কথাটা বললাম । জিজ্ঞেস না করেই আপনি বললেন কী ভাবে ? আগে জানান । 

-আমি জানি । 

-দেখুন , যেটা বললাম করুন । এখন এইসব কথা বলবার সময় নেই ।আপনি বিনা প্রয়োজনে এতো কথা বলছেন । 

-প্রয়োজনটা আপনার । তাতে এই বাড়ির নিয়ম ভাঙতে পারব না ।

-নিয়ম ! পুরানো ঘরের দরজা খোলার সাথে নিয়মের সম্পর্ক আছে ?

-দেখুন , দাদা বাবুর কথা অমান্য মানে তাকে অসম্মান করা । এটা নিয়মের বাইরের কাজ । উনি আমার কাছে আল্লা ।

-আপনার কাছে উনি যাইহোক না কেন । আমার কাছে আমার কাজটাই আসল। এখানে সখের জন্য আসিনি । আপনার দাদাবাবুই টাকা দিয়েছেন , আমাকে ভাড়া করেছেন এই কাজের জন্য । আপনি যেমন নিজের দায়িত্বে অবহেলা করেন না । তেমনই আমিও পছন্দ করি না । আর আমার দায়িত্বের মধ্যেই কাজটি পড়েছে । সময় নষ্ট না করে খুলুন ।

-কিছুতেই না । 

ত্রিনয়ন দা ডান হাত দিয়ে কপালের উপর নেমে আসা চুল গুলোকে টেনে, হাসতে -হাসতে বলল – স্বীকার করলেন! মানে এতো তাড়াতাড়ি! 

কামাল খান দাঁড়িয়ে গেলেন । বললেন – বাজে না বকে ফুটুন এখান থেকে । আপনার পাওনা দাদা মিটিয়ে দেবেন।

-দেখুন , আপনি বা আপনার দাদা আমাকে এখানে এনেছেন সমস্যার সমাধানের জন্য । আপনার অতীতের কোন রহস্য ওই ঘরে বন্দী রয়েছে । এইখানে রাতে যে অতৃপ্ত আত্মা আপনাদের ঘুমোতে দেয়না , সেই আত্মার অতীত ওই ঘরেই রয়েছে । আর আপনি ভালো করে জানেন । লাভ নেই , কিছুই লুকিয়ে রাখতে পারবেন না । 

কথাটা শুনেই , খাটের উপর কামাল খান ধপ করে বসে পড়লেন । মুখ শক্ত বিষণ্ণ । ত্রিনয়নদা বলল

-আপনি আরও অনেক কিছুই জানেন । আমার মনে হচ্ছে চেপে যাচ্ছেন ।

কামাল খান নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন 

-দেখুন আমার চেপে যাওয়ার মতন কিছুই নেই । এটা একটা অভিশপ্ত জায়গা । বাড়িটায় কেউ তুক করেছে ।

-সত্যি ! আমার আগে কাউকে ডাকেননি কেন ?

-অনেককেই ডেকেছি ।তারা কেউই অভিশাপ মুক্ত করতে পারেনি । দাদার ছেলে , সেও এই অভিশাপে যুক্ত হয়ে পড়ল । 

-অভিশাপ এমনি আসেনা । তাকে ডেকে আনতে হয় । আপনারাও ডেকেছিলেন । আমার কাছে খুলে বলুন । কর্মফল ভোগ করতে মানুষকে অন্য জন্মে যেতে হয়না । এই জন্মেই সে পায় । 

-আমরা কোন অন্যায় করিনি ? বলেই কামাল খান চুপ করে গেল ।

ত্রিনয়নদা হাসল । এখন জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়ছে । সারারাত আমাদের একটা ধকল গিয়েছে । তাই মুখ ধুয়ে , চা খেয়ে , কামাল খানকে আমাদের ঘরেই ডেকে নিয়েছিলাম । রাজারাজ বাবুর ছেলে ঘরেই আছে । সে পুরো উন্মাদ বলব না । তবে এটা ঠিক , সে সুস্থ নয় ।

ত্রিনয়ন দা বলল - কামাল আপনাকে পাশের ঘরের দরজা খুলতেই হবে । সেই ঘরের ভিতর শুধু যে এই বাড়ির গোপন রহস্য আছে , তা নয় । আপনার দাদার একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে রয়েছে । আমি জানিনা , আপনারা কি করবেন । তবে আমাকে এত টাকা দিচ্ছেন , অথচ রাজারাজ বাবুর ছেলের জন্য কিছু করতে পারব না ! আপনার দাদাকে গিয়ে বলুন । 

কামাল আচমকাই মুখে হাত দিয়ে কেঁদে ফেললেন । ত্রিনয়নদা মাথায় হাত বুলিয়ে বলল - দেখুন দোষ করলে শাস্তি পেতেই হয় । তাই বলছি পালিয়ে থেকে লাভ নেই । সব খুলে বলুন ...... 

কামাল খান কাঁপা গলায় বললেন - 

মুনিয়া বলে একটি মেয়ে এই বাড়িতেই থাকত । দাদার ছেলের থেকে বছর দুয়েক ছোট । দাদা তাঁর ছেলেকে ব্যবসায় মনোযোগী করে তুলবার জন্য পাত্রী দেখা শুরু করেন । সে ছেলে নাছোড় বান্দা , এখন দায়িত্ব নিতে চায়না । সে পাত্রী দেখতে যাবেনা বলল । সন্দেহটা হচ্ছিল , আশঙ্কা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত সত্যি হলও !

-মানে ?

-মুনিয়া আর দাদাবাবুর সম্পর্ক আছে । শুধু তাই নয় , এক রাতে আমি নিজের চোখে তাদের একবিছানায় দেখি । 

-তারপর ?

-সেই রাতের তিনদিন বাদে , দাদা তার ছেলেকে ডেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন । উনি ছেলের বারংবার পাত্রী দেখতে না যাওয়ার ব্যাপারটাতেই ধরে ফেলেছিলেন । 

-ছেলেটি অস্বীকার করেছিল ?

মুচকি হেসে কামাল বললেন – তাহলে ভালোই হত । তা না হয়ে দাদার বিপক্ষে গিয়ে বলল , মেয়েটিকে সে বিয়ে করবে । প্রস্তাব রাখল ! শুধু তাই নয় , মুনিয়াকে না পেলে সে নিজেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে । 

-তারপর ? 

-কথাটা দাদার কানে পৌঁছায় । সে আমাকে দায়িত্ব দেয়।

ত্রিনয়ন দা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনছিল । এখন খাটে এসে বসল ।পিছনে আমরা বসে আছি । আর সামনের চেয়ারে কামাল খান । এইসময় চুপ করে ছিলেন । বললেন – বাবু আমি তাকে মারতে চাইনি ।

-মানে !! 

আমিও চমকে উঠলাম ! 

-আমি তারপর মেয়েটিকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম । এরমধ্যে দাদাবাবু তাঁর ছেলেকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়ে দেন । একদিন রাতে , মেয়েটিকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করি । সে বোঝেনি । শেষে রেগে গিয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে , হাতের কাছে ছুরি দিয়ে গলায় কোপ বসিয়ে দিলাম ! 

-মানে ?

-হ্যাঁ , তখন ছিল এই সন্ধ্যা ছটা । সিঁড়ির তলায় অন্ধকারে আমাদের মধ্যে কথা হয় । আমার হাতে সবজী কাটার চাকু ছিল । বুঝতে পারিনি এমন হবে । আমি ওকে তাড়াতাড়িতে নিয়ে এসে এখন যেই ঘরে দাদাবাবুর ছেলে আছেন , সেই ঘরেই বিছানার উপর শুইয়ে দিলাম । গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত ছুটছে ! মুখ , বুক , পেট এমন কী চাদর পর্যন্ত ভিজে গেলো । বাঁচাতে পারলাম না । 

- বডিটা ?

-স্যার , আমি ডাক্তার ডেকেছিলাম। দাদার পরিচিত , ফ্যামিলি ডাক্তার । সে বলে দিল মুনিয়া আর নেই। তারপর দাদাকে সব বলেদিলাম । মেয়েটার মৃতদেহটাকে গভীর রাতে , কালো জং ধরা বাক্সে ঢুকিয়ে রাখলাম । বাক্সটা আপনাদের পাশের ঘরে রেখে , দরজায় তালা দিয়ে রাখলাম । চাবিটা আমার কাছেই । 

ত্রিনয়নদা বলল – কামাল চলুন পাশের ঘর থেকে লাশটা উদ্ধার করি । আমি নিশ্চিত লাশটা ওখানেই আছে । মেয়েটির আত্মা সেই ঘরেই রয়েছে । খুনটা হয়ত সিঁড়ির নীচেই হয়ে থাকবে । আচমকাই । তাই এনার্জি গোটা এরিয়ায় নিজেকে খুঁজতে থাকে । রাজারাজ বাবুর ছেলের সাথে তার সম্পর্ক গভীর ছিল । তাই খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে । আরেকটা কথা আপনি একটা সত্যি এখনো বলেননি । সেই দিন গাড়িতেও চেপে গিয়েছিলেন । 

আমরা অবাক হয়ে কামালের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম ।ত্রিনয়নদা বলল 

-মুনিয়া আপনার মেয়ে । আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এখানে আপনার সাথে আপনার মেয়েও থাকত । রাজারাজের ছেলে একবছর ব্যাঙ্গালোর ছিল । সেই সময়ে এই কাণ্ডটা ঘটান । ওরা ছোটবেলার বন্ধু বিয়েতে মত দিতেই পারতেন ।

কথাটা শুনেই , কামাল খান রেগে গেলেন । বললেন – আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো । তাই বলে আলাদা ধর্মের ছেলে মেয়ের বিয়ে মেনে নেব ! বাপ হয়ে মেয়েকে অন্য ধর্মের হাতে দেব ? রাজারাজও পাক্কা হিন্দু । সে কেনই বা আমার মেয়েকে নেবেন ?

-সেটা ওদের দুজনের হাতে ছেড়ে দিতেন । মাঝখান থেকে দুটো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ফেললেন । এটা ঠিক ? দেখুন অন্যায় করলে শাস্তি পেতেই হবে । আশা রাখছি নিজের অন্যায় স্বীকার করে নেবেন । আপনাকে আর দরজা খুলতে হবেনা । পুলিশ এসেই ভাঙবে । 

ত্রিনয়নদা বারান্দায় এসে ফোন করল । লোকাল থানাকে খবর দিল । 

পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকল । একটা লম্বা জং ধরা লোহার কালো বাক্স দেখলাম । খুলতেই ভিতরে প্রায় গুঁড়ো হয়ে ধুলো হয়ে আসা কঙ্কাল । কালো বাক্সের আড়ালে এতোদিন যে পাপ আত্মগোপন করে ছিল , আজ যেনও তা দিনের আলো দেখেছে ! মেয়েটি এখনো মুক্তি পাবেনা ? মনে হচ্ছে , আত্মার মুক্তি আসন্ন । 

ত্রিনয়নদা বাক্সের ভিতর তাকিয়ে বলল – মেয়েটির কঙ্কাল । এই ঘরেই মেয়েটির আত্মা বন্দী হয়ে রয়েছে । এই বাক্সটি নিয়ে যান । রাজারাজের ছেলে একবছরের জন্য বাইরে চলে যায়, অসম্পূর্ণ ডিগ্রী নিয়েই ফিরে আসে । এর মধ্যেই মেয়েটিকে খুন হয় । এরপর লোকেশ এইখানে এসেছিল , আর মেয়েটির আত্মা তাকে নিয়ন্ত্রিত করতে শুরু করে । ধীরে –ধীরে মেয়েটি প্রভাব বিস্তার করে । মেয়েটির আত্মা লোকেশকে নিজের করবার জন্যই ঘুরে বেড়ায়। এই কালো বাক্সটিই হচ্ছে মেয়েটির অতৃপ্ত অনুভূতির উৎস স্থল। ভারতীয় প্রেত দর্শন বলছে , এই অপূর্ণ অনুভূতিই আত্মাকে প্রেতাত্মায় পরিণত করে । 

!!৫!!

আমরা নিজেরাই ক্যাব বুক করে নিলাম । গাড়ি ছুটছে । আমি বললাম – ভারী অদ্ভুত ! মালিকের এতো কাছের যে তার জন্যই এই খুন । এখনো আমাদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে মূর্খামি রয়ে গিয়েছে !

ত্রিনয়নদা বলল – ব্যাপারটা অত সরল নয় । কামাল খান নিজের মালিকের প্রতি পুরোটাই আত্মসমর্পণ । ধর্মীয় কারনে এই বিয়ে , কামাল খানকে সমাজের কাছে ছোট করত । আবার মালিকের চোখেও বিশ্বাস ঘাতক হয়ে যেত । শুধু তাই নয় , এত কিছু করে সে কি পেত ? মানে মুনিয়াকে যে কয়েক বছর পর রাজারাজের ছেলে ছুড়ে ফেলে দেবে না সে দায়িত্ব কে নেবে ? ভেবে দেখো , একজন পিতা নিজের মেয়ের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবন খোঁজে । দুজনের বাড়িতেই সমস্যা রয়েছে । বেদ তোমার মনে হয়না খুবই জটিল ?

মুমিন বলল – রাজারাজ মনে হয়না ছাড় পাবেন । কামাল খান এর শাস্তি হবে । কিন্তু ছেলেটা । 

ত্রিনয়নদা বলল – পুলিশ রিপোর্ট আসতেই , বাক্সটাকে অন্যত্র সরিয়ে নেবে । ছেলেটাও অন্যত্র চলে যাবে । আমার মনে হচ্ছে , মেয়েটির আত্মা ধীরে – ধীরে নিজের শক্তিকে রূপান্তরিত করতে পারবে । আসলে আচমকাই খুন হয়ে যাওয়ায় নিজের অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারছিল না । যে কাজের লোকটি খুন হয় বা মারা যায় , তা আচমকাই মেয়েটার অশরীরী উপস্থিতি টের পেয়ে । এই জায়গায় নতুন করে পজিটিভ এনার্জি প্রবেশ করাতে হবে । 

আমাদের ক্যাব এগিয়ে চলেছে । আশা রাখছি বাড়ি তিনটের মধ্যেই ফিরতে পারব । এখন দুপুর দুটো । 


chakrabortypinaki50@gmail.com


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.