Header Ads

Breaking News
recent

তপশ্রী পাল

জীবন ও জীবিকা – কিছু প্রশ্ন
আরো একটি ১৫ই আগস্ট ফিরে এলো । ভারতের স্বাধীনতার একাত্তর বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর । প্রায় এক শতাব্দীর তিন চতুর্থাংশ পেরিয়ে এলাম আমরা । দীর্ঘ দুশো বছরের পরাধীনতার পর, অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর, বহু বিপ্লবীর আত্মাহুতির পর অর্জিত এই স্বাধীনতা ছিল অনেক স্বপ্নের । কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও ভারতবর্ষের এক বড় সংখ্যক নাগরিককে, তাদের ন্যূনতম অধিকার অর্থাৎ খাদ্য, বাসস্থান, জীবিকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় নি । বিশাল জনসংখ্যা এবং বিশাল বৈচিত্র ও বৈপরিত্যের এই দেশে, কেন সম্ভব হয় নি সেই প্রশ্নটি এতোই জটিল যে পুরো বিষয়টি এই পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয় । তাই এর যে কোন একটি, অর্থাৎ “জীবিকা” প্রসঙ্গটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।

আমাদের ক্ষুদ্র পরিধিতে অর্থাৎ নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের (বর্তমানে বাংলা) পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি একটু ভেবে দেখা যাক । পশ্চিমবঙ্গ একটি এমন রাজ্য যার শতকরা সত্তর ভাগ গ্রাম, শতকরা কুড়ি থেকে পঁচিশ ভাগ ছোট শহর বা আমরা যাকে বলে মফস্বল এবং বাকি পাঁচ থেকে দশ শতাংশ বড় শহর । জীবিকা ও তার সমস্যার বিষটি এই তিনটি অঞ্চলে তিন রকম । গ্রামে বেশিরভাগ কৃষিজীবি মানুষ অথবা জেলে, কুমোর, কামার ইত্যাদি বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত মানুষ । এরা অনেকেই শহরের মানুষের তুলনায় দরিদ্র, কিন্তু নিজের জীবিকায় নিযুক্ত আছেন । এই শ্রেনীর মানুষের জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার বিভিন্ন সরকারী অনুদান এবং স্বনিযুক্তি কার্যক্রম করেছেন । এছাড়া অন্ততঃ ১০০ দিনের কাজ ইত্যাদি তারা পেয়ে থাকেন । মহিলারা অত্যন্ত অবহেলিত ছিলেন, তারাও আজকাল সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিযুক্ত হচ্ছেন । অর্থাৎ কোন জীবিকা নেই এমন মানুষ গ্রামে কম । কিন্তু আরো উন্নত জীবন ও জীবিকার সন্ধানে প্রতিনিয়ত গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ ছোট ও বড় শহরগুলিতে চলে আসছেন । সমস্যা সেখানে ।

আমাদের রাজ্যে বড় শহর বলতে কলকাতা । কলকাতার ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এ রাজ্যের উন্নতি ও নতুন জীবিকার সন্ধানের ক্ষেত্রে এক বড় বাধা । কিন্তু কেন কলকাতার ওপর এই অত্যধিক নির্ভরশীলতা? কারণ অনেক ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাগুলি যেমন ভাল হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষার ব্যাবস্থা, খেলাধুলার জন্য পরিকাঠামো, ভালো রাস্তাঘাট, বিমান যোগাযোগ অন্য শহরগুলিতে নেই । নেই জীবিকা নির্বাহের জন্য শিল্পের বিকাশ । 

দুর্গাপূর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল মৃতপ্রায় । পুরোনো শিল্পগুলি যেমন ইস্পাত, কয়লা ইত্যাদি ধুঁকছে অথবা উঠে যাচ্ছে । ভগ্নপ্রায় রাস্তাঘাট । পরিকাঠামো যেমন ব্রিজ ইত্যাদির মেরামত হয় নি বহুকাল । কোন শিল্প নতুন করে এই সব জায়গায় গড়ে উঠছে না । তাই এখানকার মানুষেরা হয় অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে অথবা কলকাতায় চলে আসছেন । 

তেমনি হলদীয়া শিল্পাঞ্চলেও বিমান যোগাযোগের অভাব ও রাস্তাঘাটের অবস্থা বিকাশের অন্তরায় । গঙ্গার অতিরিক্ত পলির ফলে বন্দরে জাহাজ এসে লাগতে পারে না । তাই যে পরিকল্পনা করে এখানে শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা হয়েছিল তা অনেকাংশে অসফল । এই অঞ্চলের শিল্পগুলিতে নতুন নিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে । রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও এ ব্যাপারে এক বড় বাধা । 

তেমনি চা বাগান ও চা শিল্প রাজনৈতিক কারণে ও নতুন লগ্নির অভাবে ধুঁকছে । তাই উত্তরবঙ্গেও শিল্পের চূড়ান্ত অভাব । 

উপরিউক্ত সমস্ত অঞ্চলগুলি থেকে এবং প্রতিবেশী রাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এসে ভীড় জমাচ্ছেন কলকাতায় । এমনকি প্রতিবেশী দেশ থেকেও বেআইনী ভাবে বহু মানুষ ঢুকে পড়ছেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় । এখানে তিন ধরণের মানুষ আছেন । উচ্চশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত । উচ্চশিক্ষিত শ্রেনীর মধ্যে কিছু সংখ্যক রাজ্যে কম্পুটার ও তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে কর্মরত । এছাড়া হোটেল, ব্যাঙ্ক, অফিসগুলিতে কিছু সংখ্যক মানুষ কর্মরত । কিন্ত প্রতিবছর যত মানুষ এখানে জীবিকার সন্ধানে আসছেন এবং কলকাতার যত ছেলেমেয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বেরোচ্ছেন তাদের শতকরা ত্রিশ শতাংশকেও চাকরী দেওয়ার ক্ষমতা এই শহরের নেই । কারণ নতুন শিল্প নেই । তাই উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । বহু উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে অন্য রাজ্য এমনকি অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে । কলকাতা অল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষে ভরে উঠছে ।

অল্পশিক্ষিত যারা কলকাতাবাসী মূলত হকারী, অটোচালনা, দালালী, বাড়ি ও বাড়ি তৈরীর সামগ্রীর ব্যাবসা, রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ ইত্যাদিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন । সমস্যা হল বহু উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তি জীবিকার অভাবে এইসব পেশায় আসতে বাধ্য হচ্ছেন । ফলে এইসব পেশাতেও প্রচন্ড চাপ পড়ছে ।

আমাদের শহরের অশিক্ষিত মানুষেরা ঘরে ঘরে কাজের মাসী, মল ও খাবারের দোকানে কর্মরত, সিকুরিটির কাজ করছে অথবা রাস্তা দখল করে গুমটি দোকান খুলে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছে । কিন্তু এই শ্রেনীর মানুষের সংখ্যা এতো বেড়ে উঠছে যে এখানেও বেকারের সংখ্যা প্রচুর । তাই চুরি ডাকাতি দিন দিন বেড়ে চলেছে এবং চিন্তাজনক অবস্থায় পৌছেছে । 

ওপরের সবকটি অবস্থাই দুটি দিকে দিকনির্দেশ করছে । শহরের বিকেন্দ্রীকরন ও অন্যন্য শহরগুলিতে পরিকাঠামো ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যাবস্থা গড়ে তোলা । নতুন শিল্প বিশেষ করে বুনিয়াদী বৃহৎ শিল্পস্থাপন । পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টির অভাব এবং বিনা কারণে রাজনৈতিক কোন্দল স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও আমাদের বিকাশে বাধা দিচ্ছে । মানুষ পাচ্ছে না উপযুক্ত জীবন ও জীবিকা । এর প্রতিকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হওয়া প্রয়োজন । 


তপশ্রী পাল
তপশ্রী পাল
anandapur.ccu@fr.dtdc.com


Blogger দ্বারা পরিচালিত.