x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

কাজী রুনালায়লা খানম

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৮ | | মিছিলে স্বাগত
"একটি অপ্রকাশিত ইস্তাহার "
মাগরিবের নামাজ শেষে রান্নাঘরের দাওয়ায় খেজুরপাতার পাটি পেতে লন্ঠনের আলোয় মা আমাদের পড়া শেখাতেন ... 

"পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো, 
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল 
রাখাল গোরুর পাল লয়ে যায় মাঠে 
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে। "

আমরা দুলে দুলে সুর মেলাতাম মায়ের সুরে। আমাদের কালো স্লেট জুড়ে আমার মায়ের হাতের চকখড়িতে আলো হয়ে ফুটে উঠতো বর্ণমালা। সেই আলোয় আমার মায়ের মুখের আদলে মিশে যেতো আরো এক মায়ের মুখ। সে আমার দেশ, আমার ভারতবর্ষের মুখ। 

আমি নাজিয়া সুলতানা, উত্তরবঙ্গের মেয়ে।

আমার দেশ ভারতবর্ষ। আমার মাথার ওপরের নীল আকাশটায় আমি খুঁজে পাই আমার বাবার দরাজ বুক।আমার গাঁয়ের সোঁদা মাটির গন্ধে মিশে আছে আমার মায়ের গায়ের গন্ধ। এখানে বাতাসে কান পেতে আমি শুনি আব্বাউদ্দিনের মেঠো সুর। তিস্তা তোর্সা কালজানি আর মুজনাই আমার যাপন জুড়ে রাখে পেলব জলছাপ।আমার পায়ের তলায় পাহাড়দেশের পাথুরে মাটি। আমার বুকে কুলুকুলু বয়ে যায় পাহাড়ি ঝর্ণা। আমার চোখের ওপর ছায়া ফেলে নিবিড় অরণ্য। 

আমার বাংলার শিক্ষক যেদিন আমার মুখে রবীন্দ্রনাথ শুনে বলেছিলেন "আনন্দে -বিষাদে, প্রেমে -অপ্রেমে,রবীন্দ্রনাথই আমাদের শেষতম আশ্রয়। "সেদিন থেকে আমার চেতনায় রবীন্দ্রনাথ, আমার দ্রোহে নজরুল, আমার প্রেমে জয় গোস্বামী, আমার প্রতিবাদে শ্রীজাত।আমার প্রতিদিনের ভোরবেলাকার প্রথম অঞ্জলি বিদ্যাসাগর। যাঁর কথা বলতে বলতে আমার ক্লাস ফোর পাশ মায়ের চোখে খেলে যেতো অসামান্য আলোর দ্যুতি! মা বলতো, কোন ঠাকুর দেবতা নয়,কোন পীর পয়গম্বর নয়, এই মানুষটাকে প্রতিদিন স্মরণ করা উচিত প্রতিটি মেয়ের। যিনি আমাদের মতো পোড়া দেশে মেয়েদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়েছিলেন। 

আমি উত্তরবঙ্গের মেয়ে, নাজিয়া সুলতানা।

সেই যেদিন কলেজ সোশালে আমার বক্তব্য শুনে হলভর্তি লোক হাততালিতে ফেটে পড়েছিলো, আমার 'মানুষগড়ার কারিগর' সম্বোধনে আবেগ বিহ্বল হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আমার বাংলার অধ্যাপিকা। আমার প্রতিটি লোমকূপ হতে চুঁয়ে পড়েছিল আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। আমার মাতৃভাষার প্রতি, আমার বাংলামায়ের প্রতি। ঠিক তার একটু পরেই ফিলোজফির অধ্যাপিকা যখন প্রশ্ন করেছিলেন "তুমি তো মুসলিম মেয়ে, তুমি এতো সুন্দর বাংলা বলো কি করে? "বিশ্বাস করুন আমার করুণা হয়েছিল সেদিন, আমার ডিগ্রীধারী অধ্যাপিকার র মানসিক সংকীর্ণতা দেখে। 

চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে যখন প্রশ্নকর্তা আমার নামটি ভয়ানক খটমট বলে উচ্চারণ করতে গিয়ে তিনবার হোঁচট খেলেন, সেদিনও আমার করুণা হয়েছিল। তাঁর জিভের আড়ষ্টতার জন্য নয়, মানসিক দৈন্যের জন্য। মুখে বলিনি কিছুই। চাকরী করতে গিয়ে সহকর্মীদের মুখে শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি "আমি তো মুসলিম মেয়ে। আমি এতো ভালো বাংলা বলি করে? কি করে এমন করে ঠোঁটের কোলাজে এঁকে যাই রবীন্দ্রনাথকে, জীবনানন্দ, সুনীল গাঙ্গুলি, সুবোধ সরকারকে! নাহ্, আমার পাড়ার হারানকাকা, নন্দিনী মাসি, সুজাতাদিদি কোনদিনও কিন্তু এমন প্রশ্ন করেনি। আমার সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক ব্রাহ্মণ পুরোহিতও বটে, সরস্বতী পুজোয় বসার আগে আমার খোঁজ করতেন। আমার মতো নৈবেদ্য সাজাতে নাকি জীবনে কাউকে দ্যাখেন নি তিনি। ঈদের দিনে প্রথম সেমুই নিয়ে যাকে প্রণাম করতে যাই তিনি আমার সুকল্যাণ জেঠু। কালীপুজোর দিনে বড়মার হাতের ভোগের খিচুড়ির স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে! 

কারো কারো কথা শুনে হেসেছি মনে মনে "তুমি তো বাঙালী নও, তুমি এতো ভালো বাংলা বলো কি করে বলো তো, তুমি তো মুসলমান? " বাংলা বলতে পারার সাথে মুসলমান হওয়ার অঙ্কটা মেলাতে পারিনি কোনদিন। কিংবা বলা চলে মেলানোর চেষ্টা করিনি কোনদিন।যখনই অসহায়তা গ্রাস করেছে রবীন্দ্রনাথকে রক্ষাকবচ করেছি, আঁকড়ে ধরেছি বীজমন্ত্র "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। "

আপনাদের বলছি, শুনছেন আপনারা? যারা এতোকাল আমাকে প্রশ্ন করে এসেছেন, আমার নাম উচ্চারণ করতে যাদের জিভ আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে বারবার । আমার থেকে অনেক নিম্নমেধার হয়েও কথায় কথায় আমায় তাচ্ছিল্য করতে যাদের বাধেনি একবারও তাদের বলছি, আমি পাহাড় দেশের মেয়ে, উত্তর বাংলার মেয়ে নাজিয়া সুলতানা বলছি "হ্যাঁ আমি বাঙালি, বাংলা আমার মাতৃভাষা। আমার চোখের কাজল বাংলাভাষা, আমার মায়ের আঁচলে লেগে থাকা ছোপ ছোপ হলুদ আমার বাংলাভাষা। হৈমন্তী ভোরের শিশির আমার বাংলাভাষা, আমার প্রভাতফেরীর ভোর, আমার শিউলি উঠোন,আমার কাশদোলানো নদীপাড়, আমার হাঁটুজল মুজনাই, আমার সবুজ চা বাগান, আমার জলদাপাড়া, আমার বাংলাভাষা। আমার সরস্বতী পুজোর কাঁচা হলুদ আমার বাংলাভাষা। আমার দুগ্গাপুজোর প্যান্ডেল, আমার পুতুলনাচের সন্ধ্যা, আমার মানিক- বিভূতি- তারাশঙ্কর, আমার মৃণাল- সত্যজিত, আমার ফেলুদা- কিরীটি -কাকাবাবু আমার বাংলাভাষা।

আমার পিদিমজ্বলা সাঁজ, আমার ফড়িং বিকেল,আমার কোজাগরী রাত বাংলাভাষা। আমার এক্কাদোক্কার ছক, গোল্লাছুটের মাঠ, আমার প্রিয় ক্লাসঘর, আমার বুধবারের গাঁয়ের হাট, আমার মায়ের তাঁতের শাড়ি, আমার বাবার ধুতি আমার বাংলাভাষা। আমার দুবেণীদোলানো বাইসাইকেল কিশোরীবেলা, আমার কৃষ্ণচূড়া যুবতীবেলা, আমার প্রেমে পড়ার লজ্জানত চোখের ভাষা বাংলাভাষা। আমার বাবার শেষযাত্রাপথে আমার শোকচিহ্ন আমার বাংলাভাষা। আপনারা শুনছেন? আমার শিকড় বাংলাভাষা, হ্যাঁ বাংলাভাষাটা আমার শিকড়!! শুনছেন আপনারা??

anishakrk333@gmail.com


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.