x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

রাহুল ঘোষ

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৮ |
পরাজিতদের গল্প  শিকড়ের সন্ধানে
য় পর্ব। যেহেতু পরাজিতদের গল্প, তাই কাহিনির বাইরের কাহিনি বোঝার এই কাজ প্রধান পরাজিত চরিত্র রাবণকে দিয়েই শুরু করা যাক। অনেকেই বলেন, বাল্মীকি-রামায়ণের প্রধান খল-চরিত্র হলেও রাবণকে সম্পূর্ণ কালো রঙে বাল্মীকি আঁকেননি। কিন্তু ভালো করে দেখলে আমরা বুঝতে পারবো, রাবণের নানা গুণ ও প্রতিভার উল্লেখের মধ্যে বাল্মীকি যেন তাঁর প্রতি কিঞ্চিৎ দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করেছেন। রাবণ-চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য যদি আমরা দেখি, দেখবো তাঁর ইগো, যাকে শুধুই 'অহং' অর্থে চিহ্নিত করলে বিষয়টি বোঝাই যাবে না! প্রবল অহংবোধের সঙ্গে তীব্র আত্মমর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যবোধকে যুক্ত করলে, তবেই প্রকৃত রাবণকে বোঝা সম্ভব। তিনি অকুতোভয়, নিজের অবস্থানে দৃঢ় এবং নিজের ক্ষমতায় অপার বিশ্বাসী। কোনোরকম অন্তর্ঘাতে সিদ্ধিলাভ করা বা বাঁকাপথে লক্ষ্য অর্জন করার অভ্যাস তাঁর নেই। সম্মুখ সমরে তিনি অপরাজেয়, তাই কারও দয়া-দাক্ষিণ্য গ্রহণ করা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। বাল্মীকি-নির্দেশিত সংকীর্ণ পথে এমন একটি বহুমুখী ও বহুস্তরীয় চরিত্রকে ধরা যাবে না বলেই, রাবণ সম্পর্কিত সমস্ত সম্ভাব্য বিশ্লেষণ আমাদের কাছে জরুরি।

প্রচলিত সব সূত্র অনুযায়ীই আমরা জানি, রাবণ ঋষি বিশ্রবার পুত্র। রাবণের পিতামহ মহর্ষি পুলস্ত্য এবং প্রপিতামহ হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে 'হোলি ট্রিনিটি'-র অন্যতম ব্রহ্মা। রাবণের মায়ের নাম কৈকেশী, মতান্তরে নিকষা বা পুষ্পৎকটা। কৈকেশীর পিতা পরাক্রমশালী অসুররাজ সুমালী, মা যক্ষরাজ সুকেতুর মেয়ে তারকা। অর্থাৎ রাবণ একটি মিশ্র এবং অসবর্ণ বিবাহের সন্তান। পিতৃকুল ব্রাহ্মণ, তথাকথিত দেববংশ এবং মাতৃকুল অসুর বংশ। আজকের আধুনিক ভারতেও যখন রাজনীতি থেকে শুরু করে বৈবাহিক সম্পর্ক পর্যন্ত সবকিছুতেই ধর্ম ও জাতপাত বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তখন সেই প্রাচীনকালেও এমন অসবর্ণ বিবাহের ঘটনা (ইতিহাস ও জনশ্রুতিতে এরকম বিবাহের উদাহরণ আরও আছে) আমাদের বেশ চমকে দেয়। বিশ্রবা-কৈকেশীর এই বিবাহের অন্তরালে অবশ্য একটি নিখুঁত রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু সেই প্রসঙ্গে পরে আসবো। যাই হোক, ঠিক এই মিশ্রবিবাহের সন্তান হওয়ার কারণেই অনেক জায়গায় রাবণ ও তাঁর ভাই-বোনদের 'ব্রহ্মরাক্ষস' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাক্ষস কী? দৈত্য-দানব বা অসুর কারা? অলৌকিকতার আবরণ সরিয়ে এই শব্দগুলির উৎস-সন্ধান যথেষ্টই জটিল। ইংরেজিতে যেমন এক্ষেত্রে Demon শব্দটি ব্যবহার করেই (এবং ক্ষেত্রবিশেষে Ogre) কাজ সেরে ফেলা যায়, আমাদের দেশীয় ভাষায় সেই সুযোগ নেই।

পৌরাণিক গাথা বলছে, ঋষি কাশ্যপের সঙ্গে বিবাহিতা দক্ষের কন্যাদের মধ্যে তিনজন দিতি, অদিতি ও দানু। দিতির সন্তানেরা দৈত্য, অদিতির সন্তানেরা আদিত্য, আর দানুর সন্তানেরা দানব। এঁদের মধ্যে আদিত্যদের দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা 'দেব' এবং 'সুর' নামেও পরিচিত। দৈত্য-দানবদের সঙ্গে এদের লড়াই-বিবাদ চিরন্তন, এবং সেই কারণেই সুরের বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে দৈত্য ও দানবরা 'অসুর' বলে চিহ্নিত। এমনই এক দৈত্য সুকেশের সঙ্গে গন্ধর্বকন্যা দেববতীর বিবাহের ফসল তিন পুত্র---মাল্যবান, সুমাল্য বা সুমালী ও মালী। এই মধ্যমপুত্র সুমালীই রাবণের মাতামহ। সুমালী ও তারকার (মতান্তরে, তাটকা বা তাটকী) আরও দুই সন্তান সুবাহু ও মারীচ। মিথোলজির কিছু-কিছু বর্ণনা এখান থেকেই রাক্ষসদের সূচনা বলতে চেয়েছে, অর্থাৎ তারা দৈত্যদের থেকে উদ্ভূত একটি অসুরপ্রজাতি।

পাশাপাশি অসুর ও রাক্ষসদের আলাদা করে দেখানোর চেষ্টাও অবশ্য কিছু কম নেই! যেমন, দেবতারা আকাশের ও অসুরেরা পাতালের বাসিন্দা। দেব-অসুরের লড়াই মূলত ক্ষমতা, বিশেষত স্বর্গের অধিকার নিয়ে। কিন্তু রাক্ষসেরা এই পৃথিবীতেই থাকে, এবং মানুষকে উত্যক্ত-ভীত করা, মানুষের ধর্মীয় কাজকর্ম পণ্ড করা, তাদের হত্যা করা, এমনকি নরমাংস ভক্ষণ করাই রাক্ষসদের কাজ। তারা নানারকম জাদু, মায়া, ছদ্মবেশ ইত্যাদি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। রূপকথার এসব বর্ণনাকে পাশে রেখেই আমরা যদি যুক্তি দিয়ে 'রাক্ষস' শব্দটির বিচার করতে চাই, তাহলেই বোধহয় ঠিক উত্তর পাবো। ২০০৮-এর ২৮ সেপ্টেম্বর 'সানডে মিডডে' পত্রিকায় প্রকাশিত 'Rakshasas or Rakshaks?' শীর্ষক নিবন্ধে দেবদত্ত পট্টনায়েক মিথোলজি-বর্ণিত সমস্ত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেও লিখেছেন যে উপনিষদে রাক্ষসদের অরণ্যের রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক বলা হয়েছে। তাহলে আমরা বুঝতেই পারি, রাক্ষসেরা আসলে অরণ্যচারী মানুষ, কোনো অতিপ্রাকৃত জীব নয়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের জীবন, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক---সবকিছুই লোকালয়বাসী মানুষের থেকে আলাদা হবে। হিংস্র পশুদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের জঙ্গলে বেঁচে থাকতে হতো, এবং সে-লড়াই ডারউইনের 'Survival of the fittest' তত্ত্বের জন্মের বহু আগের। অতএব তাদের শারীরিক শক্তি যে সাধারণ মানুষের থেকে বহুগুণ বেশি হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! যেমন আশ্চর্যের কিছু নেই তাদের গাছের বাকল বা পশুর চামড়ার পোশাকে, শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করায়, প্রয়োজনে কাঁচা মাংস খাওয়ার অভ্যাসে এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানুষের মাংস খাওয়াতেও। ক্যানিবাল বা নরখাদকের উপস্থিতি কি আধুনিক পৃথিবীও দ্যাখেনি? জাদু-মায়া-ছদ্মবেশ ইত্যাদির ব্যবহার আসলে একধরনের শিল্প। তাতে কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির ছাপ থাকে। শুধু আক্রমণ নয়, আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেও এগুলির ব্যবহার হতে পারে। আর শুধু রাক্ষসেরা কেন, লোকালয়বাসী মানুষেরাও এইসব বিদ্যার চর্চা করে থাকে। এমনকি আমরা যাঁদের 'দেবতা' বলে চিহ্নিত করি ও কিঞ্চিৎ ভক্তি-শ্রদ্ধা করে থাকি, তাঁরাও যে এইসব বিদ্যা কখনও ব্যবহার করেননি, তা নয়! আসলে অরণ্যবাসী মানুষকে শুধুই নরখাদক হিসেবে দেগে দেওয়া, তথাকথিত 'সভ্য' মানুষের একটি সুপ্রাচীন অভ্যাস। আমাদের প্রচলিত ধর্মকথা ও অলৌকিক গাথা যেহেতু ঋষি ও রাজ-অনুগ্রহপ্রাপ্ত সভাকবিদের দ্বারা রচিত, তাই সেই অভ্যাসের প্রভাব পড়েছে কাহিনির প্রতিটি অক্ষরে। ফলে, কোনো ভূখণ্ডের আদি জনগোষ্ঠীকে 'আলোকপ্রাপ্ত' জগৎ দেখেছে সন্দেহ ও সংশয়ের চোখে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করেছে 'অসভ্য' বলে, খুব সামান্য কারণে অথবা অকারণে তাদের বানিয়ে তুলেছে 'অপর' বা প্রতিপক্ষ। লোকালয়বাসী মানুষের ক্রমবর্ধমান লোভ ও জমি দখলের উদগ্র বাসনা যেদিন থেকে তাদের অরণ্যভূমির দখল নিয়ে জনপদ, কৃষিজমি ও পশুপালনের তৃণভূমিতে পরিণত করতে উসকে দিয়েছে, সেদিন থেকেই বনবাসীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ। কারণ, বনবাসীরাও তাদের বিচরণক্ষেত্রের অধিকার সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। 

রামায়ণে দেখতে পাই, ঋষি বিশ্বামিত্র রাজা দশরথকে অনুরোধ করে সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ রাম ও তাঁর অনুজ লক্ষ্মণকে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর আশ্রমের নিরাপত্তার জন্য। কেন নিরাপত্তা প্রয়োজন? কারণ, জঙ্গলের ঠিক পাশে তাঁর আশ্রমে প্রায়ই রাক্ষসেরা হামলা চালাচ্ছে এবং তাঁদের যাগযজ্ঞ পণ্ড করে দিচ্ছে। অতএব, তাঁরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় কাজকর্ম করতে পারেন, তার জন্য রাক্ষসনিধন প্রয়োজন। কিন্তু ধর্মকথার কোনো বর্ণনাকারীর মনেই প্রশ্ন জাগে না যে, কেন আশ্রম স্থাপন করতে ঋষিদের জঙ্গলের মধ্যে বা তার আশপাশেই যেতে হয়, কেন কোনো ধর্মপ্রাণ নৃপতিই তাঁদের লোকালয়ের কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত 'নিরাপদ' এলাকায় আশ্রম স্থাপন করতে উৎসাহ দেন না! অতএব ক্রমশ নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়াই ছিল অরণ্যচারীদের একমাত্র ভবিতব্য, এবং সেই ভবিতব্যকে নিশ্চিত করতেই কথা ও কাহিনিতে সম্পূর্ণ নেতিবাচক করে তাদের ছবি আঁকা! এই প্রবণতা কয়েক হাজার বছরের। বাল্মীকি-রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে আমরা দেখি, রাবণবধের পরে লঙ্কাজয় ও সীতাউদ্ধার সম্পূর্ণ হলে স্বয়ং রাম সাগ্রহে অগস্ত্য মুনির কাছে রাবণের অতীত ও পূর্বসূরীদের কথা শুনছেন। সেখানেও অগস্ত্যের বর্ণনায় দেখা যায়, পৃথিবীর সম্পদ রক্ষাকারীদেরই রাক্ষস বলা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রামায়ণে বর্ণিত রাক্ষসেরা গেল কোথায়? রামায়ণের পরবর্তী মহাকাব্য 'মহাভারত'-এও তারা ছিল, সংখ্যায় কম হলেও। তাদের উজ্জ্বলতম উদাহরণ সম্ভবত হিড়িম্বা। ভীমের সঙ্গে তার বিবাহে প্রাপ্ত পুত্র ঘটোৎকচকেও তো সেই অর্থে রাক্ষসই বলতে হবে। কিন্তু তারপর থেকে কথা ও কাহিনিতে দৈত্য-দানবদের মতোই তাদের অস্তিত্বেরও খোঁজ পাওয়া ভার! এই প্রসঙ্গে কোনো-কোনো ব্যাখ্যাতা মতপ্রকাশ করেছেন যে, শ্রীলঙ্কার বেদ্দা (Vedda) জনজাতি নাকি রাক্ষসদের উত্তরসূরী।

বেদ্দারা শ্রীলঙ্কার আদি বাসিন্দা, সংখ্যাগুরু সিংহলী ও সংখ্যালঘু তামিলদের থেকে তাদের সংস্কৃতি ভিন্ন। নৃতাত্ত্বিকেরা তাদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবোরিজিনালদের কিছু মিল খুঁজে পেয়েছেন। তাদের নিজস্ব ভাষাও আছে, যা সিংহলী ও তামিল ভাষার থেকে আলাদা। তবে এই জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে, তাদের নিজস্ব ভাষাও তাই বিলুপ্তির পথে। এখন তাদের ভাষায় ঢুকে পড়েছে প্রচুর সিংহলী এবং কিছু তামিল শব্দ। সম্পূর্ণ বেদ্দা ভাষায় কথা বলার লোকই এখন বিরল! তবে শ্রীলঙ্কার কিছু অঞ্চলে, যেমন সবরাগামুওয়া প্রদেশের রত্নাপুরা জেলায়, এখনও তাদের লক্ষণীয় উপস্থিতি আছে। প্রসঙ্গত, 'সবরাগামুওয়া' নামটি এসেছে সেখানকার শিকারি উপজাতি 'সবরা'-দের থেকে। এখানে ভারতের প্রাচীন জনগোষ্ঠী শবরদের কথা আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে; কারণ, নামের মিল ছাড়াও তারাও তো কিরাত বা ব্যাধ বলে পরিচিত। লক্ষ করার বিষয় হলো, 'বেদ্দা' শব্দটির একটি দ্রাবিড় উৎস আছে। সম্ভবত তামিল ভাষার 'ভেদান' বা 'ভিদু' (শিকারি বা শিকার করা অর্থে)-র সঙ্গে যার যোগসূত্র পাওয়া যাবে। অন্যদিকে সিংহলী ভাষায় বেদ্দাদের বলা হয় 'ওয়ান্নিয়ালা এত্তো', যার অর্থ বনবাসী মানুষ। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বেদ্দারা হলো অরণ্যচারী শিকারি জনগোষ্ঠী। ধর্মীয়ভাবে এরা ছিল সর্বপ্রাণবাদে (Animism) বিশ্বাসী। কিন্তু সংখ্যার মতো তাদের সাংস্কৃতিক নিজস্বতাও ক্রমক্ষয়িষ্ণু হওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরে সিংহলী-অধ্যুষিত অঞ্চলের বেদ্দাদের ধর্মবিশ্বাসে এসে পড়েছে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব, আর সে-দেশের তামিল-অধ্যুষিত পূর্ব উপকূলের বেদ্দারা গ্রহণ করে নিয়েছে হিন্দু ধর্মের প্রচলিত উপাদানকে। যাই হোক, বেদ্দারা এখনও নিজেদের একইসঙ্গে যক্ষ ও রাক্ষসদের উত্তরসূরী বলে দাবি করে। জাতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মিলের কারণে তাদের সেই দাবি উড়িয়ে দেওয়াও যাবে না। এই প্রসঙ্গে Quora Inc. নামক একটি জ্ঞানচর্চার পোর্টালের সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার মনোরাগালা জেলায় বেদ্দা জনজাতির ঐতিহাসিক বর্ণনা সম্বলিত একটি সংগ্রহশালার প্রদর্শিত তথ্যে বেদ্দাদের স্মরণীয়-শ্রদ্ধেয় পূর্বসূরীদের নামের তালিকায় রাবণও আছেন।

তাহলে কি রাবণকে এককথায় আমরা রাক্ষসই বলবো? তাঁর নামের সঙ্গে 'রাক্ষসরাজ' শব্দটি যেভাবে জড়িয়ে আছে, তাতে সে-কথাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাবণ সেই অর্থে কোনোদিনই অরণ্যবাসী ছিলেন না। পিতা বিশ্রবার আশ্রমে তাঁর শৈশব কেটেছে। আরও সব মুনি-ঋষিদের মতো সেই আশ্রমও অরণ্যের উপকন্ঠে ছিল, ধরে নেওয়াই যায়। এছাড়াও তপস্যা বা দীর্ঘ সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য (আমরা ধরে নেবো, প্রশিক্ষণলাভ ও প্রস্তুতির জন্য) রাবণ ও তাঁর ভাইয়েরা যখন যেখানে গেছেন, সেইসব জনবিরল স্থানও অরণ্য হতেই পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে জঙ্গলে বসবাসের অভ্যাস বা প্রয়োজন, কোনোটাই তাঁদের ছিল না। পুলস্ত্যের মতো মহাজ্ঞানীর উত্তরসূরী হিসেবে তাঁদের পারিবারিক গরিমা ছিল যথেষ্টই। মায়ের দিক থেকে রাবণ এক রাজকীয় অসুর বংশের উত্তরাধিকারী, যদিও তাঁর জন্মের অনেক আগে থেকেই তাঁর মাতৃকুল ক্ষমতাচ্যুত এবং রাজ্য থেকে বিতাড়িত। তাছাড়া, সদ্ভাব না-থাকলেও, রাবণের বৈমাত্রেয় বড়ো ভাই কুবের তখন লঙ্কার সিংহাসনে। ফলে, রাজক্ষমতার থেকে দূরে থাকলেও রাজক্ষমতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তাঁদের বরাবরের। মনে রাখতে হবে, সেইসব রাজত্বের কেন্দ্রবিন্দু অরণ্যে নয়, বরং ছিল ঝলমলে ধনশালী নাগরিক জনপদে। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে রাবণের বিভিন্ন আত্মীয়কে দণ্ডভোগ করতে বা আত্মগোপনের জন্য অথবা রাজনৈতিক কারণে জঙ্গলে থাকতে হয়েছে, সে-সব কথায় প্রসঙ্গান্তরে আসবো। ফলে বলাই যায় যে বাবার দিক থেকে তো বটেই, মায়ের দিক থেকেও রাবণ সেই অর্থে ঠিকঠাক রাক্ষস নন, বরং এককথায় তিনি দেব-অসুরের সংমিশ্রণ। যথেষ্ট দৃঢ়তার সঙ্গে একথাও অনুমান করে নেওয়া যায় যে, রাক্ষসদের মতোই দৈত্য-দানব ইত্যাদি অন্যান্য অসুর সম্প্রদায়ও কোনো অতিপ্রাকৃত জীব নয়, তারা আসলে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী আদি জনগোষ্ঠী। এখন রাবণকে যদি রাক্ষস বলতে না-পারি, তাহলে কি বেদ্দা জনগোষ্ঠীর দাবি সঠিক নয়? এককথায় তাও বলা যায় না। কারণ, বেদ্দারা নিজেদের যক্ষদেরও উত্তরসূরী বলে, এবং রাবণের মাতামহী তারকা যক্ষ-রাজকন্যা ছিলেন। তাই রাবণের সঙ্গে তাদের একটা আত্মীয়তা তো অবশ্যই আছে!

এবার একটু পিছনে ফিরে দেখবো। প্রথম পর্বে লিখেছিলাম, রামায়ণের কোনো ঘটনা নিয়ে যদি অঞ্চলভেদে কোনো মতান্তর থাকে, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে, তাহলে এককথায় তাকে আর্য-দ্রাবিড় সাংস্কৃতিক বিরোধ বলে চিহ্নিত করলে অতি-সরলীকরণ হয়ে যাবে। তামিলনাড়ু রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় এবং উগ্র তামিল জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ডিএমকে একসময় রাবণকে দ্রাবিড় ও তামিল বলে দেখাতে চেয়েছে। একথা ঠিক যে, দ্রাবিড় সংস্কৃতিতে রাবণের যথেষ্ট প্রভাব আছে। কিন্তু লঙ্কা থেকে রাজত্ব শুরু করে পুরো দক্ষিণ ভারত, মাহিষমতী ('বাহুবলী' চলচ্চিত্রের জন্য এখন আমাদের সবার পরিচিত) ও কিষ্কিন্ধ্যা বাদে বাকি মধ্য ভারত হয়ে এই বিশাল ভূখণ্ডের পশ্চিম, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের বিস্তীর্ণ অংশে অসুর-সাম্রাজ্য বিস্তার করলেও একটু খুঁটিয়ে দেখলে রাবণকে তামিল বা দ্রাবিড় বংশজাত বলা মুশকিল। পিতৃকুলের দিক থেকে তিনি অবশ্যই আর্য; এবং মাতৃকুল অসুর হলেও তারা যে দক্ষিণীই ছিল, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কৈকেশী উত্তর বা মধ্য ভারতের কোনো আদিবাসী অসুর সম্প্রদায়ের কন্যাও হয়ে থাকতে পারেন। তাছাড়া আরও একটি মতবাদে অসুরদের আদৌ অনার্য না-বলে, দেব সম্প্রদায়ের মতো আরও একটি ইন্দো-এরিয়ান জনগোষ্ঠী মনে করা হয়; যারা এলাকা দখলের লড়াইয়ে দেবদের কাছে পরাজিত হতে-হতে জঙ্গলে ও অন্য জনবিরল এলাকায় (মহাকাব্য অনুযায়ী, পাতালে) আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়। অনেক নৃতত্ত্ব-গবেষক 'অসুর' (Asura) শব্দটির সঙ্গে প্রাক-জরাথ্রুষ্ট যুগের ইন্দো-ইরানীয়দের মধ্যে প্রচলিত 'আহুরা' (Ahura) শব্দটির যোগসূত্র খুঁজে পান। তাহলে কি এও হওয়া সম্ভব নয় যে, রাবণের মাতৃকুলের পূর্বসূরীরা আসলে ওই আহুরা সম্প্রদায়েরই, যারা দেবদের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধে পরাজিত হতে-হতে ক্রমশ দেব-বিরোধিতার শাস্তি হিসেবেই রাজকবিদের রচনায় ও মুনি-ঋষিদের ধর্মকথায় দুষ্টশক্তি রূপে চিহ্নিত হতে থাকে? এও তো একরকমের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা; এবং কে না-জানে, পৃথিবীতে চিরকালই রাজনীতির মূল কৌশলগুলি একই! 

তাছাড়া ডিএমকে-র তামিল জাতীয়তার তত্ত্ব অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতের সব ব্রাহ্মণেরই শিকড় আসলে উত্তর ভারতে। এই তত্ত্ব মেনে নিলে তো রাবণকে আর দক্ষিণী বলে দাবি করার কোনো সুযোগই থাকছে না! শুধু তাই নয়, তাঁর জন্মস্থান বলে পরিচিত বিশ্রখ (সম্ভবত তাঁর পিতা বিশ্রবার নাম অনুসারে) আজকের উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত, দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে মাত্র ৩৬ কিমি দূরে। রাবণ-মন্দোদরীর বিবাহস্থান মন্দসৌর অবস্থিত আজকের মধ্যপ্রদেশে। রাবণ ও তাঁর ভাই-বোনদের কারও নামকরণই দ্রাবিড় শব্দে করা হয়নি, সবক'টিই সংস্কৃত শব্দ। আরও আশ্চর্যের বিষয়, রাজস্থানের মন্দোর ও যোধপুরের মুদগল গোত্রের দাভে ব্রাহ্মণরা নিজেদের সরাসরি রাবণের বংশজ বলে দাবি করেন। এঁরা আদতে গুজরাতের লোক, পরে রাজস্থান ছাড়াও মধ্যপ্রদেশের কিছু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন। এখানে উল্লিখিত এলাকাগুলি সবই মোটামুটি হিন্দিবলয়ে, এবং এইসব তথ্য রাবণকে আত্তীকরণের দ্রাবিড়-প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তা-সত্ত্বেও দ্রাবিড় সংস্কৃতিতে রাবণের যে-প্রভাব, তার আলোচনায় আবার পরে আসা যাবে। তবে এখান থেকে বোঝা যায়, যে-যে কারণে রাবণকে তামিল বলা যায় না, ঠিক একই যুক্তিতে তাঁকে সিংহলীও বলা যাবে না। 

প্রথম পর্ব শুরুই করেছিলাম, শ্রীলঙ্কায় রাবণের ভাবমূর্তিকে সিংহলী জাতীয়তাবাদে ব্যবহারের প্রচেষ্টার একটি খবরের মধ্যে দিয়ে। এটাই কি যথেষ্ট আশ্চর্যের নয় যে, একটি মহাকাব্যের খল-চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও দু'টি প্রতিবেশী দেশের দু'টি ভিন্ন জাতীয়তাবাদী ভাবনা রাবণকে নিজেদের করে দেখাতে বিশেষ আগ্রহী! রাবণকে কেন সিংহলী বলা যাবে না, তার আরও আলোচনায় পরে আসবো। আপাতত প্রথম পর্বের আরেকটি বিষয় পাঠকদের মনে করিয়ে দিই। অত্যন্ত সুদর্শন রাবণকে যেভাবে প্রায় সর্বত্র ভয়ানক ও বিকটদর্শন করে তুলে ধরা হয়েছে, তা আসলে রামায়ণের প্রচলিত কাহিনিতে তাঁর খল-চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই। মহাকাব্যে পরাজিতদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শুরুতেই শ্রীলঙ্কায় প্রকাশিত দু'টি বইয়ের প্রচ্ছদ আমার নজরে আসে। একটি সিংহলী ভাষায় লেখা 'ঐতিহাসিকা রাভানা', লেখক সুরিয়া গুণাসেকারা। অন্যটি ইংরেজি বই, 'Ravana: Story of the Most Distinguished Lankan Monarch', লেখক অশোকা প্রেমাচন্দ্রা। এছাড়ায় সিংহলী সংবাদপত্রে প্রকাশিত রাবণ-বিষয়ক বেশ কিছু সচিত্র প্রতিবেদন দেখার সুযোগ হয়। সিংহলী ভাষা জানা না-থাকার কারণে সে-সব লেখার পাঠোদ্ধার আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, এক্ষেত্রে সেটা তেমন জরুরিও ছিল না। কিন্তু প্রতিটি লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত বিভিন্ন ইলাস্ট্রেশন এবং উপরোক্ত বইদু'টির প্রচ্ছদ থেকে অনায়াসে বোঝা যায়, শ্রীলঙ্কার চিত্রকরদের কাছে রাবণের প্রতিষ্ঠিত চেহারাটি হলো একজন দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ, বলশালী ও ব্যক্তিত্বময় সুপুরুষের; যাঁর শারীরিক উপস্থিতিতে একধরনের মনোমুগ্ধকর বৈশিষ্ট্য আছে, ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি 'অরা'। তাহলে এই সেই জাদু, যা খল-চরিত্র হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও রাবণকে তামিল ও সিংহলী জাতীয়তাবাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে? এর উত্তর আমরা খোঁজার চেষ্টা করবো আগামী পর্বে। কারণ, মহাকাব্যে পরাজিত কোনো চরিত্রের বিশ্লেষণই সহজে সম্পূর্ণ হওয়ার নয়; রাবণের তো নয়-ই!

রাহুল ঘোষ
রাহুল ঘোষ
bhashaweb@gmail.com



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.